📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 কুরায়শ প্রতিনিধিরূপে সুহায়ল

📄 কুরায়শ প্রতিনিধিরূপে সুহায়ল


মিকরায রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত আলোচনা করিতেছিল। এমন সময় দেখা গেল কুরায়শদের অন্যতম সরদার সুহায়ল আসিতেছে। কুরায়শগণ অনেক চিন্তা-ভাবনার পর সন্ধি করিতে রাযী হইল। এই উদ্দেশ্যে তাহারা সুহায়ল ইব্‌ন আমরকে চূড়ান্ত সন্ধির মধ্যস্থতার জন্য রাসূলুল্লাহ (স)-এর সমীপে প্রেরণ করিল। তাহারা সুহায়লকে বলিল, যাও, মুহাম্মাদের সহিত সন্ধি করিয়া আইস। তবে সন্ধির শর্তের মধ্যে কোন প্রকার শিথিলতা করিবে না। আর বলিও, "মুহাম্মাদ এই বৎসর মক্কায় প্রবেশের অনুমতি পাইবে না। আগামী বৎসর তাঁহাকে 'উমরাহ করার সুযোগ দেওয়া হইবে।" অন্যথায় আরবগণ বলিবে, মুহাম্মাদ কুরায়শদেরকে পরাভূত করিয়াছে (তাফসীর ইব্‌ন কাছীর, ৪খ., পৃ. ১৭৬)।
সুহায়ল ছিল কুরায়শদের মধ্যে অতিশয় বাগ্মী ও সুবক্তা। কুরায়শদের মধ্যে সে খতীবে কুরায়শ নামে সুপরিচিত ছিল। সুহায়লকে আসিতে দেখিয়া রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তাহারা সুহায়লকে পাঠাইয়াছে। ইহাতে মনে হয় তাহারা যেন সত্যি সত্যিই সন্ধি করিতে সম্মত হইয়াছে। তিনি আরও বলিলেন, "فَدْ سَهُلَ لَكُمْ مِنْ أَمْرِكُمْ আল্লাহ তোমাদের বিষয়টি তোমাদের জন্য কিছুটা সহজ করিয়া দিয়াছেন"। বস্তুত ইহা ছিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর শুভ লক্ষণমূলক উক্তি যাহা সুহায়লের নাম হইতে তিনি উদ্‌ঘাটন করিয়াছিলেন। এই ধরনের “নেকফাল” (শুভ লক্ষণ গ্রহণ বৈধ) (যুরকানী, ২খ., পৃ. ১৯৪)।
সুহায়ল আসিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর সম্মুখে হাঁটু গাড়িয়া বসিল এবং সন্ধির আলোচনা আরম্ভ করিল। সুহায়ল বলিল, আপনাদেরকে এইবার এখান হইতেই মদীনায় ফিরিয়া যাইতে হইবে। মক্কার প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হইবে না। অন্যথায় লোকেরা মনে করিবে, মুসলমানগণ বলপূর্বক 'উমরাহ করিয়া গিয়াছে। ইহা কুরায়শদের জন্য অত্যন্ত অপমানজনক। এইবার এখান হইতে মদীনায় ফিরিয়া যাওয়া যদি কবুল করেন, তবেই কেবল আমি আপনার সহিত সন্ধি সম্পর্কে আলোচনা করিব, ইহাই আমার প্রথম ও প্রধান শর্ত।
সাহাবায়ে কিরাম এই শর্তে সন্ধি করিতে কিছুতেই সম্মত ছিলেন না। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদেরকে সান্ত্বনা দিয়া বলিলেন, "তোমরা বুঝিতে পারিতেছ না, ইহা আমাদের জন্য পরাজয় নহে। ইহার মধ্য দিয়াই আমরা মহাবিজয়ের দিকে অগ্রসর হইব এবং মহাবিজয় লাভ করিতে সমর্থ হইব।” অতঃপর সুহায়লকে সম্বোধন করিয়া তিনি বলিলেন, সুহায়ল! কা'বাঘরের মর্যাদা রক্ষার্থে এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কুরায়শগণ আজ আমার নিকট যাহা কিছু চাহিবে, আমি তাহাই দিব। তোমাদের শর্তেই আমি সন্ধি করিতে রাযী আছি (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ৫৫৬)। দীর্ঘ আলোচনা-পর্যালোচনার পর নিম্নোক্ত শর্তে সন্ধি করার সিদ্ধান্ত হইল:
১. মুসলমানগণ এই বৎসর 'উমরাহ না করিয়াই মদীনায় ফিরিয়া যাইবেন।
২. আগামী বৎসর তাহারা তাহাদের এই মূলতবী 'উমরাহ কাযা করিতে পারিবেন। তবে তিন দিনের বেশি মক্কায় থাকিতে পারিবেন না।
৩. 'উমরাহ করিবার সময় তাহারা কোন প্রকার অস্ত্র বহন করিতে পারিবেন না, শুধু কোষবদ্ধ তরবারি আনিতে পরিবেন।
৪. যে সমস্ত মুসলমান মক্কায় অবস্থান করিতেছে তাহাদের মধ্য হইতে কেহই মুসলমানদের সহিত মদীনায় যাইতে পারিবে না। আর মুসলমান কাফেলা হইতে কেহ মক্কায় থাকিয়া যাইতে চাহিলে তাহাকে রাখিয়া যাইতে হইবে। অনুরূপ মক্কা হইতে কেহ মদীনায় চলিয়া আসিলে তাহাকে মদীনায় ফেরৎ পাঠানো হইবে না।
৫. উভয় পক্ষ প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে বন্ধুত্ব ভাব পোষণ করিবে। এক পক্ষ অপর পক্ষের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কিংবা অপ্রকাশ্যে যুদ্ধের প্রেরণা যোগাইবে না।
৬. আরবের অন্যান্য গোত্রসমূহ স্বেচ্ছায় সন্ধিভুক্ত যে কোন পক্ষের সহিত স্বাধীনভাবে মিত্রতা স্থাপন করিতে পারিবে।
৭. এই সন্ধি দশ বৎসর কাল বলবৎ থাকিবে (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., - পৃ. ৫৬৪)।

মিকরায রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত আলোচনা করিতেছিল। এমন সময় দেখা গেল কুরায়শদের অন্যতম সরদার সুহায়ল আসিতেছে। কুরায়শগণ অনেক চিন্তা-ভাবনার পর সন্ধি করিতে রাযী হইল। এই উদ্দেশ্যে তাহারা সুহায়ল ইব্‌ন আমরকে চূড়ান্ত সন্ধির মধ্যস্থতার জন্য রাসূলুল্লাহ (স)-এর সমীপে প্রেরণ করিল। তাহারা সুহায়লকে বলিল, যাও, মুহাম্মাদের সহিত সন্ধি করিয়া আইস। তবে সন্ধির শর্তের মধ্যে কোন প্রকার শিথিলতা করিবে না। আর বলিও, "মুহাম্মাদ এই বৎসর মক্কায় প্রবেশের অনুমতি পাইবে না। আগামী বৎসর তাঁহাকে 'উমরাহ করার সুযোগ দেওয়া হইবে।" অন্যথায় আরবগণ বলিবে, মুহাম্মাদ কুরায়শদেরকে পরাভূত করিয়াছে (তাফসীর ইব্‌ন কাছীর, ৪খ., পৃ. ১৭৬)।
সুহায়ল ছিল কুরায়শদের মধ্যে অতিশয় বাগ্মী ও সুবক্তা। কুরায়শদের মধ্যে সে খতীবে কুরায়শ নামে সুপরিচিত ছিল। সুহায়লকে আসিতে দেখিয়া রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তাহারা সুহায়লকে পাঠাইয়াছে। ইহাতে মনে হয় তাহারা যেন সত্যি সত্যিই সন্ধি করিতে সম্মত হইয়াছে। তিনি আরও বলিলেন, "فَدْ سَهُلَ لَكُمْ مِنْ أَمْرِكُمْ আল্লাহ তোমাদের বিষয়টি তোমাদের জন্য কিছুটা সহজ করিয়া দিয়াছেন"। বস্তুত ইহা ছিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর শুভ লক্ষণমূলক উক্তি যাহা সুহায়লের নাম হইতে তিনি উদ্‌ঘাটন করিয়াছিলেন। এই ধরনের “নেকফাল” (শুভ লক্ষণ গ্রহণ বৈধ) (যুরকানী, ২খ., পৃ. ১৯৪)।
সুহায়ল আসিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর সম্মুখে হাঁটু গাড়িয়া বসিল এবং সন্ধির আলোচনা আরম্ভ করিল। সুহায়ল বলিল, আপনাদেরকে এইবার এখান হইতেই মদীনায় ফিরিয়া যাইতে হইবে। মক্কার প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হইবে না। অন্যথায় লোকেরা মনে করিবে, মুসলমানগণ বলপূর্বক 'উমরাহ করিয়া গিয়াছে। ইহা কুরায়শদের জন্য অত্যন্ত অপমানজনক। এইবার এখান হইতে মদীনায় ফিরিয়া যাওয়া যদি কবুল করেন, তবেই কেবল আমি আপনার সহিত সন্ধি সম্পর্কে আলোচনা করিব, ইহাই আমার প্রথম ও প্রধান শর্ত।
সাহাবায়ে কিরাম এই শর্তে সন্ধি করিতে কিছুতেই সম্মত ছিলেন না। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদেরকে সান্ত্বনা দিয়া বলিলেন, "তোমরা বুঝিতে পারিতেছ না, ইহা আমাদের জন্য পরাজয় নহে। ইহার মধ্য দিয়াই আমরা মহাবিজয়ের দিকে অগ্রসর হইব এবং মহাবিজয় লাভ করিতে সমর্থ হইব।” অতঃপর সুহায়লকে সম্বোধন করিয়া তিনি বলিলেন, সুহায়ল! কা'বাঘরের মর্যাদা রক্ষার্থে এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কুরায়শগণ আজ আমার নিকট যাহা কিছু চাহিবে, আমি তাহাই দিব। তোমাদের শর্তেই আমি সন্ধি করিতে রাযী আছি (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ৫৫৬)। দীর্ঘ আলোচনা-পর্যালোচনার পর নিম্নোক্ত শর্তে সন্ধি করার সিদ্ধান্ত হইল:
১. মুসলমানগণ এই বৎসর 'উমরাহ না করিয়াই মদীনায় ফিরিয়া যাইবেন।
২. আগামী বৎসর তাহারা তাহাদের এই মূলতবী 'উমরাহ কাযা করিতে পারিবেন। তবে তিন দিনের বেশি মক্কায় থাকিতে পারিবেন না।
৩. 'উমরাহ করিবার সময় তাহারা কোন প্রকার অস্ত্র বহন করিতে পারিবেন না, শুধু কোষবদ্ধ তরবারি আনিতে পরিবেন।
৪. যে সমস্ত মুসলমান মক্কায় অবস্থান করিতেছে তাহাদের মধ্য হইতে কেহই মুসলমানদের সহিত মদীনায় যাইতে পারিবে না। আর মুসলমান কাফেলা হইতে কেহ মক্কায় থাকিয়া যাইতে চাহিলে তাহাকে রাখিয়া যাইতে হইবে। অনুরূপ মক্কা হইতে কেহ মদীনায় চলিয়া গেলে তাহাকে মক্কায় ফেরৎ পাঠাইতে হইবে। কিন্তু মদীনা হইতে কেহ মক্কায় চলিয়া আসিলে তাহাকে মদীনায় ফেরৎ পাঠানো হইবে না।
৫. উভয় পক্ষ প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে বন্ধুত্ব ভাব পোষণ করিবে। এক পক্ষ অপর পক্ষের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কিংবা অপ্রকাশ্যে যুদ্ধের প্রেরণা যোগাইবে না।
৬. আরবের অন্যান্য গোত্রসমূহ স্বেচ্ছায় সন্ধিভুক্ত যে কোন পক্ষের সহিত স্বাধীনভাবে মিত্রতা স্থাপন করিতে পারিবে।
৭. এই সন্ধি দশ বৎসর কাল বলবৎ থাকিবে (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., - পৃ. ৫৬৪)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সন্ধিপত্র লিখার জন্য আলী (রা)-কে নির্দেশ

📄 সন্ধিপত্র লিখার জন্য আলী (রা)-কে নির্দেশ


সন্ধির শর্তাবলী স্থিরীকৃত হওয়ার পর তাহা লিপিবদ্ধ করিবার জন্য রাসূলুল্লাহ (স) হযরত আলী (রা)-কে নির্দেশ দিলেন। তাঁহার নির্দেশানুসারে তিনি সন্ধিপত্র লিখিতে আরম্ভ করিলেন। প্রথমেই তিনি লিখিলেন, بسم الله الرحمن الرحيم (পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহ্ নামে)। কুরায়শ-প্রতিনিধি সুহায়ল আপত্তি করিয়া বলিল, থামুন! এই কথা লিখিতে পারিবেন না। রহমান ও রাহীম কি তাহা আমরা জানি না। আপনি বরং লিখুন, باسمك اللهم (হে আল্লাহ! তোমার নামে)। কারণ, আমরা ইহাই লিখিয়া থাকি। ইহাই আমাদের চিরাচরিত নিয়ম। ইহাই লিখুন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আচ্ছা, তাহাই লিখ। তারপর লিখা হইল :
هذا ما قضى عليه محمد رسول الله ﷺ. "ইহা সেই চুক্তিপত্র যাহার প্রতি আল্লাহ্র রাসূল মুহাম্মাদ (স) স্বীকৃতি প্রদান করিয়াছেন।" সুহায়ল আবার বাধা দিয়া বলিল, থামুন! মুহাম্মাদ যে আল্লাহ্র রাসূল ইহা যদি আমরা মানিতাম, তবে আর আপনাদের সাথে আমাদের যুদ্ধ সংঘাত হইত কিজন্য? এই কথা লিখিতে পারিবেন না; বরং লিখুন, محمد بن عبد الله (আবদুল্লাহ্র পুত্র মুহাম্মাদ)। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তোমরা যদিও অস্বীকার কর, কিন্তু নিঃসন্দেহে আমি আল্লাহ্র রাসূল। আচ্ছা, তুমি যাহা বল তাহাই লিখা হইবে। তৎপর নবী করীম (স) হযরত আলীকে বলিলেন, তুমি رسول الله শব্দটি কাটিয়া দিয়া তদস্থলে محمد بن عبد الله শব্দটি লিখিয়া দাও। হযরত আলী (রা) বলিলেন, আমাকে মাফ করুন! আমি কিছুতেই আপনার নাম হইতে "রাসূলুল্লাহ” শব্দটি মুছিতে পারিব না। তিনি বলিলেন, আচ্ছা, শব্দটি কোথায় আমাকে দেখাইয়া দাও। হযরত আলী দেখাইয়া দিলে তিনি নিজেই "রাসূলুল্লাহ” শব্দটি কাটিয়া দিলেন। তৎপর হযরত আলী সেই স্থানে ইব্‌ন আবদিল্লাহ্ শব্দটি লিখিয়া দেন।
কিন্তু ইমাম মুসলিমের রিওয়ায়াতে আসিয়াছে যে, রাসূলুল্লাহ (স) নিজেই "আবদুল্লাহ” শব্দটি লিখিয়াছিলেন। প্রশ্ন হয় যে, তিনি উম্মী (নিরক্ষর) হইয়া লিখিলেন কিরূপে? আল্লামা কাযী ইয়াদ বলেন, ইহা তাঁহার মু'জিযা ছিল। ইব্‌ন হাজার (র) বলেন, 'তিনি লিখিয়াছেন' অর্থ তিনি লিখিতে আদেশ দিয়াছেন। তাহা ছাড়া শুধু নাম লিখিতে জানিলেই উম্মী হওয়ার গুণ বিলুপ্ত হইয়া যায় না (আসাহ্হুস্ সিয়ার, পৃ. ১৭৫)।

সন্ধির শর্তাবলী স্থিরীকৃত হওয়ার পর তাহা লিপিবদ্ধ করিবার জন্য রাসূলুল্লাহ (স) হযরত আলী (রা)-কে নির্দেশ দিলেন। তাঁহার নির্দেশানুসারে তিনি সন্ধিপত্র লিখিতে আরম্ভ করিলেন। প্রথমেই তিনি লিখিলেন, بسم الله الرحمن الرحيم (পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহ্ নামে)। কুরায়শ-প্রতিনিধি সুহায়ল আপত্তি করিয়া বলিল, থামুন! এই কথা লিখিতে পারিবেন না। রহমান ও রাহীম কি তাহা আমরা জানি না। আপনি বরং লিখুন, باسمك اللهم (হে আল্লাহ! তোমার নামে)। কারণ, আমরা ইহাই লিখিয়া থাকি। ইহাই আমাদের চিরাচরিত নিয়ম। ইহাই লিখুন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আচ্ছা, তাহাই লিখ। তারপর লিখা হইল :
هذا ما قضى عليه محمد رسول الله ﷺ. "ইহা সেই চুক্তিপত্র যাহার প্রতি আল্লাহ্র রাসূল মুহাম্মাদ (স) স্বীকৃতি প্রদান করিয়াছেন।" সুহায়ল আবার বাধা দিয়া বলিল, থামুন! মুহাম্মাদ যে আল্লাহ্র রাসূল ইহা যদি আমরা মানিতাম, তবে আর আপনাদের সাথে আমাদের যুদ্ধ সংঘাত হইত কিজন্য? এই কথা লিখিতে পারিবেন না; বরং লিখুন, محمد بن عبد الله (আবদুল্লাহ্র পুত্র মুহাম্মাদ)। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তোমরা যদিও অস্বীকার কর, কিন্তু নিঃসন্দেহে আমি আল্লাহ্র রাসূল। আচ্ছা, তুমি যাহা বল তাহাই লিখা হইবে। তৎপর নবী করীম (স) হযরত আলীকে বলিলেন, তুমি رسول الله শব্দটি কাটিয়া দিয়া তদস্থলে محمد بن عبد الله শব্দটি লিখিয়া দাও। হযরত আলী (রা) বলিলেন, আমাকে মাফ করুন! আমি কিছুতেই আপনার নাম হইতে "রাসূলুল্লাহ” শব্দটি মুছিতে পারিব না। তিনি বলিলেন, আচ্ছা, শব্দটি কোথায় আমাকে দেখাইয়া দাও। হযরত আলী দেখাইয়া দিলে তিনি নিজেই "রাসূলুল্লাহ” শব্দটি কাটিয়া দিলেন। তৎপর হযরত আলী সেই স্থানে ইব্‌ন আবদিল্লাহ্ শব্দটি লিখিয়া দেন।
কিন্তু ইমাম মুসলিমের রিওয়ায়াতে আসিয়াছে যে, রাসূলুল্লাহ (স) নিজেই "আবদুল্লাহ” শব্দটি লিখিয়াছিলেন। প্রশ্ন হয় যে, তিনি উম্মী (নিরক্ষর) হইয়া লিখিলেন কিরূপে? আল্লামা কাযী ইয়াদ বলেন, ইহা তাঁহার মু'জিযা ছিল। ইব্‌ন হাজার (র) বলেন, 'তিনি লিখিয়াছেন' অর্থ তিনি লিখিতে আদেশ দিয়াছেন। তাহা ছাড়া শুধু নাম লিখিতে জানিলেই উম্মী হওয়ার গুণ বিলুপ্ত হইয়া যায় না (আসাহ্হুস্ সিয়ার, পৃ. ১৭৫)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বন্দী আবূ জান্দাল (রা)-এর আগমন

📄 বন্দী আবূ জান্দাল (রা)-এর আগমন


এখনও সন্ধিপত্র লিখা শেষ হয় নাই। এমন সময় কুরায়শ দূত সুহায়লের পুত্র আবু জান্দাল (রা) শৃংখল বেষ্টিত অবস্থায় আসিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে উপস্থিত হইলেন। ইসলাম গ্রহণ করার অপরাধে দীর্ঘদিন যাবৎ তাঁহার প্রতি অমানুষিক অত্যাচার ও নিপীড়ন চলিয়া আসিতেছিল। ইসলাম ত্যাগ করার জন্য তাঁহাকে শৃংখলবদ্ধ করিয়া রাখা হইয়াছিল। কিন্তু আবূ জান্দাল (রা) ইসলাম ত্যাগ করিতে রাযী হন নাই। তিনি আজ অতি কৌশলে কুরায়শদের বন্দীশালা হইতে পালাইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে হাযির হন।
হযরত আবূ জান্দাল (রা)-কে দেখিয়াই তাঁহার পিতা সুহায়ল ত্রস্তপদে তাঁহার দিকে আগাইয়া গেল এবং তাঁহার মুখমণ্ডলে সজোরে একটি চপেটাঘাত করিল (তাফসীর ইব্‌ন কাছীর, ৪খ., পৃ. ১৭৭)।
অতঃপর সুহায়ল রাসূলুল্লাহ (স)-এর দিকে মুখ করিয়া বলিলেন, হে মুহাম্মাদ! এই চুক্তিপত্রের শর্তানুসারে এখনই আমার পুত্র আবু জান্দালকে আমার নিকট ফিরাইয়া দিন। তিনি বলিলেন, সুহায়ল! এখনও তো সন্ধিপত্র লেখা সম্পূর্ণ হয় নাই, ইহার উপর স্বাক্ষর হয় নাই। সুতরাং শর্ত পালনের কোন কথা আসিতে পারে না। সুহায়ল বলিল, যদি তাহাই হয়, তবে ইহার পর আমি কোন ব্যাপারেই আপনার সহিত কথা বলিতে প্রস্তুত নহি। তিনি বলিলেন, সুহায়ল। আর না হয় আমার খাতিরেই আবূ জান্দালকে আমাদের সহিত মদীনায় যাইতে দাও। সুহায়ল বলিল, ইহা কখনও হইতে পারে না।
তখন মিকরায বলিল, আচ্ছা, আমি অনুমতি দিতেছি। আপনারা আবূ জান্দালকে লইয়া যান। কিন্তু সুহায়ল মিকরাযের কথা প্রত্যাখ্যান করিয়া বলিল, ইহা কখনও হইতে দিব না। অতঃপর সে আবু জান্দাল (রা)-র শৃংখল ধরিয়া টানিয়া নিজের দিকে লইয়া গেল।
হযরত আবূ জান্দাল (রা) চিৎকার করিয়া বলিতে লাগিলেন, হে আমার মুসলমান ভাইগণ! আমি মুসলমান হইয়া তোমাদের নিকট আসিয়াছি। ইহার পরও আমাকে এই যালিম মুশরিকদের হাতে তুলিয়া দেওয়া হইতেছে। তোমরা কি দেখিতেছ না তাহারা আমাকে কী অমানুষিক অত্যাচার করিয়াছে! এই কথা বলিয়া তিনি তাঁহার দেহের ক্ষতসমূহ দেখাইতে লাগিলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) সুহায়লের দাবির প্রেক্ষিতে আবু জান্দালকে তাহার নিকট ফিরাইয়া দিলেন এবং আবু জান্দালকে সান্ত্বনা দিয়া বলিলেন, আবু জান্দাল! ধৈর্য ধারণ কর। আল্লাহ তা'আলা শীঘ্রই তোমাদের মুক্তির ব্যবস্থা করিবেন (যাদুল মা'আদ, ১খ., পৃ. ৩৮৩; তাফসীর ইব্‌ন কাছীর, ৪খ., পৃ. ১৭৭, সীরাতুল মুস্তাফা, ২খ., পৃ. ৩৫৯)। রাসূলুল্লাহ (স) আরও বলিলেন, দেখ, আবু জান্দাল! আমরা তাহাদের সহিত একটি সন্ধিতে উপনীত হইয়াছি। আমরা তাহাদেরকে কতিপয় প্রতিশ্রুতি দিয়াছি। তাহারাও আমাদেরকে কতিপয় প্রতিশ্রুতি দিয়াছে। তাই আমরা বিশ্বাসভঙ্গ করিতে পারি না। তুমি সবর কর, ইহার বিনিময়ে আল্লাহ্ নিকট পুরস্কারের প্রত্যাশী হও। দৃঢ় বিশ্বাস রাখ, আল্লাহ অতিসত্ত্বর তোমার জন্য মুক্তির কোন একটি পথ খুলিয়া দিবেন (তাফসীর ইব্‌ন কাছীর, ৪খ., পৃ. ১৭৭)।
এই করুণ দৃশ্য দেখিয়া মুসলমানগণ ভীষণ দুঃখিত হইলেন। কিন্তু আল্লাহ্র রাসূলের আনুগত্যের কারণে কিছুই বলিলেন না। শুধু দৃষ্টি নত করিয়া দুঃখ ও ক্ষোভ সংবরণ করিলেন এবং অশ্রু বিসর্জন দিলেন। হযরত আবূ জান্দাল (রা)-কে যখন টানিয়া হেঁচড়াইয়া মক্কাভিমুখে লইয়া যাওয়া হইতেছিল তখন হযরত উমার (রা) তাঁহার সহিত কিছু দূর হাঁটিলেন এবং বলিলেন, "আবূ জান্দাল! ধৈর্য ধারণ কর। তাহারা মুশরিক, তাহাদের রক্ত আল্লাহ্র নিকট কুকুরের রক্ততুল্য" (তাফসীর ইবন কাছীর, ৪খ., পৃ. ১৭৭)।

এখনও সন্ধিপত্র লিখা শেষ হয় নাই। এমন সময় কুরায়শ দূত সুহায়লের পুত্র আবু জান্দাল (রা) শৃংখল বেষ্টিত অবস্থায় আসিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে উপস্থিত হইলেন। ইসলাম গ্রহণ করার অপরাধে দীর্ঘদিন যাবৎ তাঁহার প্রতি অমানুষিক অত্যাচার ও নিপীড়ন চলিয়া আসিতেছিল। ইসলাম ত্যাগ করার জন্য তাঁহাকে শৃংখলবদ্ধ করিয়া রাখা হইয়াছিল। কিন্তু আবূ জান্দাল (রা) ইসলাম ত্যাগ করিতে রাযী হন নাই। তিনি আজ অতি কৌশলে কুরায়শদের বন্দীশালা হইতে পালাইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে হাযির হন।
হযরত আবূ জান্দাল (রা)-কে দেখিয়াই তাঁহার পিতা সুহায়ল ত্রস্তপদে তাঁহার দিকে আগাইয়া গেল এবং তাঁহার মুখমণ্ডলে সজোরে একটি চপেটাঘাত করিল (তাফসীর ইব্‌ন কাছীর, ৪খ., পৃ. ১৭৭)।
অতঃপর সুহায়ল রাসূলুল্লাহ (স)-এর দিকে মুখ করিয়া বলিলেন, হে মুহাম্মাদ! এই চুক্তিপত্রের শর্তানুসারে এখনই আমার পুত্র আবু জান্দালকে আমার নিকট ফিরাইয়া দিন। তিনি বলিলেন, সুহায়ল! এখনও তো সন্ধিপত্র লেখা সম্পূর্ণ হয় নাই, ইহার উপর স্বাক্ষর হয় নাই। সুতরাং শর্ত পালনের কোন কথা আসিতে পারে না। সুহায়ল বলিল, যদি তাহাই হয়, তবে ইহার পর আমি কোন ব্যাপারেই আপনার সহিত কথা বলিতে প্রস্তুত নহি। তিনি বলিলেন, সুহায়ল। আর না হয় আমার খাতিরেই আবূ জান্দালকে আমাদের সহিত মদীনায় যাইতে দাও। সুহায়ল বলিল, ইহা কখনও হইতে পারে না।
তখন মিকরায বলিল, আচ্ছা, আমি অনুমতি দিতেছি। আপনারা আবূ জান্দালকে লইয়া যান। কিন্তু সুহায়ল মিকরাযের কথা প্রত্যাখ্যান করিয়া বলিল, ইহা কখনও হইতে দিব না। অতঃপর সে আবু জান্দাল (রা)-র শৃংখল ধরিয়া টানিয়া নিজের দিকে লইয়া গেল।
হযরত আবূ জান্দাল (রা) চিৎকার করিয়া বলিতে লাগিলেন, হে আমার মুসলমান ভাইগণ! আমি মুসলমান হইয়া তোমাদের নিকট আসিয়াছি। ইহার পরও আমাকে এই যালিম মুশরিকদের হাতে তুলিয়া দেওয়া হইতেছে। তোমরা কি দেখিতেছ না তাহারা আমাকে কী অমানুষিক অত্যাচার করিয়াছে! এই কথা বলিয়া তিনি তাঁহার দেহের ক্ষতসমূহ দেখাইতে লাগিলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) সুহায়লের দাবির প্রেক্ষিতে আবু জান্দালকে তাহার নিকট ফিরাইয়া দিলেন এবং আবু জান্দালকে সান্ত্বনা দিয়া বলিলেন, আবু জান্দাল! ধৈর্য ধারণ কর। আল্লাহ তা'আলা শীঘ্রই তোমাদের মুক্তির ব্যবস্থা করিবেন (যাদুল মা'আদ, ১খ., পৃ. ৩৮৩; তাফসীর ইব্‌ন কাছীর, ৪খ., পৃ. ১৭৭, সীরাতুল মুস্তাফা, ২খ., পৃ. ৩৫৯)। রাসূলুল্লাহ (স) আরও বলিলেন, দেখ, আবু জান্দাল! আমরা তাহাদের সহিত একটি সন্ধিতে উপনীত হইয়াছি।
আমরা তাহাদেরকে কতিপয় প্রতিশ্রুতি দিয়াছি। তাহারাও আমাদেরকে কতিপয় প্রতিশ্রুতি দিয়াছে। তাই আমরা বিশ্বাসভঙ্গ করিতে পারি না। তুমি সবর কর, ইহার বিনিময়ে আল্লাহ্ নিকট পুরস্কারের প্রত্যাশী হও। দৃঢ় বিশ্বাস রাখ, আল্লাহ অতিসত্ত্বর তোমার জন্য মুক্তির কোন একটি পথ খুলিয়া দিবেন (তাফসীর ইব্‌ন কাছীর, ৪খ., পৃ. ১৭৭)।
এই করুণ দৃশ্য দেখিয়া মুসলমানগণ ভীষণ দুঃখিত হইলেন। কিন্তু আল্লাহ্র রাসূলের আনুগত্যের কারণে কিছুই বলিলেন না। শুধু দৃষ্টি নত করিয়া দুঃখ ও ক্ষোভ সংবরণ করিলেন এবং অশ্রু বিসর্জন দিলেন।
হযরত আবূ জান্দাল (রা)-কে যখন টানিয়া হেঁচড়াইয়া মক্কাভিমুখে লইয়া যাওয়া হইতেছিল তখন হযরত উমার (রা) তাঁহার সহিত কিছু দূর হাঁটিলেন এবং বলিলেন, "আবূ জান্দাল! ধৈর্য ধারণ কর। তাহারা মুশরিক, তাহাদের রক্ত আল্লাহ্র নিকট কুকুরের রক্ততুল্য" (তাফসীর ইবন কাছীর, ৪খ., পৃ. ১৭৭)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সন্ধিপত্রের স্বাক্ষর

📄 সন্ধিপত্রের স্বাক্ষর


সন্ধিপত্র লেখা সমাপ্ত হইল। উভয় পক্ষ উহাতে স্বাক্ষর করিল। কয়েকজন সাক্ষীও উহাতে স্বাক্ষর করিলেন। মুসলমানদের মধ্য হইতে সাক্ষী হইলেন হযরত আবূ বকর সিদ্দীক, হযরত উমার ফারূক, হযরত উছমান, হযরত আলী, হযরত সা'দ ইব্‌ন আবী ওয়াক্কাস, হযরত আবদুর রহমান ইব্‌ন আওফ, হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন সাহল, মুহাম্মদ ইব্‌ন মাসলামা, আবূ উবায়দা, ইবনুল জাররাহ (রা) প্রমুখ সাহাবীও। মুশরিক পক্ষ হইতে সাক্ষী হইল মিকরায ইবন হাম্স, হুয়ায়তিব ইব্‌ন আবদুল উয্যা প্রমুখ সরদার (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ৫৫৭)। চুক্তিপত্র স্বাক্ষরিত হওয়ার পর উহার একটি কপি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট সোপর্দ করা হইল এবং আরেকটি কপি সুহায়ল ইব্‌ন আমর লইয়া গেল (তাবাকাত ইবন সা'দ, ২খ., পৃ. ৭১)। সন্ধি চুক্তির পরপরই আরবের বানু খুযা'আ গোত্র রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত এবং বানূ বাক্স গোত্র কুরায়শদের সহিত মৈত্রীচুক্তি সম্পাদন করে (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ১৭৭)।

সন্ধিপত্র লেখা সমাপ্ত হইল। উভয় পক্ষ উহাতে স্বাক্ষর করিল। কয়েকজন সাক্ষীও উহাতে স্বাক্ষর করিলেন। মুসলমানদের মধ্য হইতে সাক্ষী হইলেন হযরত আবূ বকর সিদ্দীক, হযরত উমার ফারূক, হযরত উছমান, হযরত আলী, হযরত সা'দ ইব্‌ন আবী ওয়াক্কাস, হযরত আবদুর রহমান ইব্‌ন আওফ, হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন সাহল, মুহাম্মদ ইব্‌ন মাসলামা, আবূ উবায়দা, ইবনুল জাররাহ (রা) প্রমুখ সাহাবীও। মুশরিক পক্ষ হইতে সাক্ষী হইল মিকরায ইবন হাম্স, হুয়ায়তিব ইব্‌ন আবদুল উয্যা প্রমুখ সরদার (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ৫৫৭)। চুক্তিপত্র স্বাক্ষরিত হওয়ার পর উহার একটি কপি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট সোপর্দ করা হইল এবং আরেকটি কপি সুহায়ল ইব্‌ন আমর লইয়া গেল (তাবাকাত ইবন সা'দ, ২খ., পৃ. ৭১)। সন্ধি চুক্তির পরপরই আরবের বানু খুযা'আ গোত্র রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত এবং বানূ বাক্স গোত্র কুরায়শদের সহিত মৈত্রীচুক্তি সম্পাদন করে (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ১৭৭)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00