📄 কুরায়শ প্রতিনিধি হুলায়স
উরওয়ার কথা শুনিয়া বানু কিনানার সরদার হুলায়স ইবন আলকামা আল-কিনানী বলিল, হে কুরায়শ! তোমরা আমাকে একবার অনুমতি দাও, আমি মুহাম্মাদের সহিত আলোচনা করিয়া আসি। তাহারা বলিল, আচ্ছা, যাইতে চাও যাও। রাসূলুল্লাহ্ (স) হুলায়সকে আসিতে দেখিয়া বলিলেন, এই লোকটি বানু কিনানার দলপতি। কুরবানী করা ইহাদের অন্যতম প্রিয় কাজ। আমাদের কুরবানীর পশুগুলি তাহাকে দেখাইয়া দাও। সাহাবীগণ কুরবানীর চিহ্নযুক্ত উটগুলি লইয়া 'লাব্বায়ক, লাব্বায়ক' বলিতে বলিতে হুলায়সের অভ্যর্থনার জন্য অগ্রসর হইলেন। কুরবানীর উটের বিরাট কাফেলা দেখিয়া হুলায়স আর অশ্রু সংবরণ করিতে পারিল না। সে কাঁদিতে কাঁদিতে বলিল, আহা! ইহারা বায়তুল্লাহ্র যিয়ারত প্রত্যাশী। ইহারা কেবল 'উমরাহ্ উদ্দেশ্যেই আসিয়াছে। ইহাদেরকে বাধা দেওয়া কি ঠিক? এই কথা বলিয়া সে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত সাক্ষাৎ না করিয়াই মক্কায় ফিরিয়া গেল (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ১৭৩)।
কুরায়শদের নিকট গিয়া হুলায়স বলিল, "তাহারা যুদ্ধ করিতে আসে নাই, 'উমরাহ করিতে এবং কুরবানী করিতে আসিয়াছে। তাহাদেরকে তোমরা বাধা দিও না। তাহাদেরকে তাহাদের পূণ্যকর্ম সম্পাদন করিতে অনুমতি দাও।" কুরায়শগণ বলিল, তুমি গ্রাম্য লোক, তোমার বুদ্ধি-জ্ঞান কম। তুমি কথা বলিও না, চুপ করিয়া বসিয়া থাক। হুলায়স অত্যন্ত ক্রোধান্বিত হইয়া বলিল, আল্লাহর কসম! আমরা তোমাদের সহিত এইজন্য চুক্তি করি নাই যে, যাহারা বায়তুল্লাহ যিয়ারত করিতে আসিবে তোমরা তাহাদেরকে বাধা দিবে, আর আমরা কিছুই বলিব না। আমি স্পষ্ট বলিতেছি, "যদি তোমরা এখন মুসলমানদের বায়তুল্লাহ যিয়ারত করিতে অনুমতি না দাও তবে আমরা তোমাদের সহিত কৃত মৈত্রীচুক্তি ভঙ্গ করিয়া চলিয়া যাইব"।
হুলায়সের চুক্তি ভঙ্গের হুমকিতে কুরায়শগণ বিচলিত হইয়া তাহাকে তোষামোদ করিতে লাগিল এবং বলিল, আচ্ছা, বসুন। আমরা একটু বুঝাপড়া করিয়া লই (সীরাতুল মুস্তাফা, ২খ., পৃ. ৩৫৬)।
উরওয়ার কথা শুনিয়া বানু কিনানার সরদার হুলায়স ইবন আলকামা আল-কিনানী বলিল, হে কুরায়শ! তোমরা আমাকে একবার অনুমতি দাও, আমি মুহাম্মাদের সহিত আলোচনা করিয়া আসি। তাহারা বলিল, আচ্ছা, যাইতে চাও যাও। রাসূলুল্লাহ্ (স) হুলায়সকে আসিতে দেখিয়া বলিলেন, এই লোকটি বানু কিনানার দলপতি। কুরবানী করা ইহাদের অন্যতম প্রিয় কাজ। আমাদের কুরবানীর পশুগুলি তাহাকে দেখাইয়া দাও। সাহাবীগণ কুরবানীর চিহ্নযুক্ত উটগুলি লইয়া 'লাব্বায়ক, লাব্বায়ক' বলিতে বলিতে হুলায়সের অভ্যর্থনার জন্য অগ্রসর হইলেন। কুরবানীর উটের বিরাট কাফেলা দেখিয়া হুলায়স আর অশ্রু সংবরণ করিতে পারিল না। সে কাঁদিতে কাঁদিতে বলিল, আহা! ইহারা বায়তুল্লাহ্র যিয়ারত প্রত্যাশী। ইহারা কেবল 'উমরাহ্ উদ্দেশ্যেই আসিয়াছে। ইহাদেরকে বাধা দেওয়া কি ঠিক? এই কথা বলিয়া সে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত সাক্ষাৎ না করিয়াই মক্কায় ফিরিয়া গেল (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ১৭৩)।
কুরায়শদের নিকট গিয়া হুলায়স বলিল, "তাহারা যুদ্ধ করিতে আসে নাই, 'উমরাহ করিতে এবং কুরবানী করিতে আসিয়াছে। তাহাদেরকে তোমরা বাধা দিও না। তাহাদেরকে তাহাদের পূণ্যকর্ম সম্পাদন করিতে অনুমতি দাও।" কুরায়শগণ বলিল, তুমি গ্রাম্য লোক, তোমার বুদ্ধি-জ্ঞান কম। তুমি কথা বলিও না, চুপ করিয়া বসিয়া থাক। হুলায়স অত্যন্ত ক্রোধান্বিত হইয়া বলিল, আল্লাহর কসম! আমরা তোমাদের সহিত এইজন্য চুক্তি করি নাই যে, যাহারা বায়তুল্লাহ যিয়ারত করিতে আসিবে তোমরা তাহাদেরকে বাধা দিবে, আর আমরা কিছুই বলিব না। আমি স্পষ্ট বলিতেছি, "যদি তোমরা এখন মুসলমানদের বায়তুল্লাহ যিয়ারত করিতে অনুমতি না দাও তবে আমরা তোমাদের সহিত কৃত মৈত্রীচুক্তি ভঙ্গ করিয়া চলিয়া যাইব"।
হুলায়সের চুক্তি ভঙ্গের হুমকিতে কুরায়শগণ বিচলিত হইয়া তাহাকে তোষামোদ করিতে লাগিল এবং বলিল, আচ্ছা, বসুন। আমরা একটু বুঝাপড়া করিয়া লই (সীরাতুল মুস্তাফা, ২খ., পৃ. ৩৫৬)।
📄 কুরায়শ প্রতিনিধি মিক্রায
কুরায়শ নেতাগণ বসিয়া দীর্ঘক্ষণ পর্যন্ত চিন্তা-ভাবনা ও শলা-পরামর্শ করিল। এক পর্যায়ে মিকরায ইবন হাম্স নামক জনৈক সরদার উঠিয়া বলিল, তোমরা আমাকে অনুমতি দিলে আমিও একবার মুহাম্মাদের সহিত কথা বলিয়া আসিতাম। কুরায়শদের অনুমতি পাইয়া মিকরায রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে আসিতেছিল। মিকরাযকে দেখিয়াই রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, "এই লোকটি দুষ্ট প্রকৃতির।” তিনি এই কথা বলিয়া তাহার অতীতের একটি দুরভিসন্ধির প্রতি ইঙ্গিত করিয়াছেন। ইতোপূর্বে পঞ্চাশজন, মতান্তরে সত্তর অথবা আশিজনের যেই কুরায়শ বাহিনী হুদায়বিয়ায় চোরাগোপ্তা হামলা করার প্রস্তুতি লইয়াছিল এবং পরে মুসলমানদের হাতে ধরা পড়িয়াছিল, সেই বাহিনীর প্রধান ছিল এই মিকরায। কিন্তু সে পালাইয়া যাইতে সক্ষম হয়। মুসলমানগণ তাহার কথা জানিতেন না, তাই রাসূলুল্লাহ (স) এই মন্তব্য করিয়াছিলেন (সীরাতুল মুস্তাফা, ২খ., পৃ. ৩৫৭; তাফসীর ইব্ন কাছীর, ৪খ., পৃ. ১৭৬; প্রতিনিধিদের আগমন ক্রমধারায় কিছু ব্যতিক্রমের জন্য দ্র: ইব্ন হিশাম ও দানাপুরী)।
কুরায়শ নেতাগণ বসিয়া দীর্ঘক্ষণ পর্যন্ত চিন্তা-ভাবনা ও শলা-পরামর্শ করিল। এক পর্যায়ে মিকরায ইবন হাম্স নামক জনৈক সরদার উঠিয়া বলিল, তোমরা আমাকে অনুমতি দিলে আমিও একবার মুহাম্মাদের সহিত কথা বলিয়া আসিতাম। কুরায়শদের অনুমতি পাইয়া মিকরায রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে আসিতেছিল। মিকরাযকে দেখিয়াই রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, "এই লোকটি দুষ্ট প্রকৃতির।” তিনি এই কথা বলিয়া তাহার অতীতের একটি দুরভিসন্ধির প্রতি ইঙ্গিত করিয়াছেন। ইতোপূর্বে পঞ্চাশজন, মতান্তরে সত্তর অথবা আশিজনের যেই কুরায়শ বাহিনী হুদায়বিয়ায় চোরাগোপ্তা হামলা করার প্রস্তুতি লইয়াছিল এবং পরে মুসলমানদের হাতে ধরা পড়িয়াছিল, সেই বাহিনীর প্রধান ছিল এই মিকরায। কিন্তু সে পালাইয়া যাইতে সক্ষম হয়। মুসলমানগণ তাহার কথা জানিতেন না, তাই রাসূলুল্লাহ (স) এই মন্তব্য করিয়াছিলেন (সীরাতুল মুস্তাফা, ২খ., পৃ. ৩৫৭; তাফসীর ইব্ন কাছীর, ৪খ., পৃ. ১৭৬; প্রতিনিধিদের আগমন ক্রমধারায় কিছু ব্যতিক্রমের জন্য দ্র: ইব্ন হিশাম ও দানাপুরী)।
📄 কুরায়শ প্রতিনিধিরূপে সুহায়ল
মিকরায রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত আলোচনা করিতেছিল। এমন সময় দেখা গেল কুরায়শদের অন্যতম সরদার সুহায়ল আসিতেছে। কুরায়শগণ অনেক চিন্তা-ভাবনার পর সন্ধি করিতে রাযী হইল। এই উদ্দেশ্যে তাহারা সুহায়ল ইব্ন আমরকে চূড়ান্ত সন্ধির মধ্যস্থতার জন্য রাসূলুল্লাহ (স)-এর সমীপে প্রেরণ করিল। তাহারা সুহায়লকে বলিল, যাও, মুহাম্মাদের সহিত সন্ধি করিয়া আইস। তবে সন্ধির শর্তের মধ্যে কোন প্রকার শিথিলতা করিবে না। আর বলিও, "মুহাম্মাদ এই বৎসর মক্কায় প্রবেশের অনুমতি পাইবে না। আগামী বৎসর তাঁহাকে 'উমরাহ করার সুযোগ দেওয়া হইবে।" অন্যথায় আরবগণ বলিবে, মুহাম্মাদ কুরায়শদেরকে পরাভূত করিয়াছে (তাফসীর ইব্ন কাছীর, ৪খ., পৃ. ১৭৬)।
সুহায়ল ছিল কুরায়শদের মধ্যে অতিশয় বাগ্মী ও সুবক্তা। কুরায়শদের মধ্যে সে খতীবে কুরায়শ নামে সুপরিচিত ছিল। সুহায়লকে আসিতে দেখিয়া রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তাহারা সুহায়লকে পাঠাইয়াছে। ইহাতে মনে হয় তাহারা যেন সত্যি সত্যিই সন্ধি করিতে সম্মত হইয়াছে। তিনি আরও বলিলেন, "فَدْ سَهُلَ لَكُمْ مِنْ أَمْرِكُمْ আল্লাহ তোমাদের বিষয়টি তোমাদের জন্য কিছুটা সহজ করিয়া দিয়াছেন"। বস্তুত ইহা ছিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর শুভ লক্ষণমূলক উক্তি যাহা সুহায়লের নাম হইতে তিনি উদ্ঘাটন করিয়াছিলেন। এই ধরনের “নেকফাল” (শুভ লক্ষণ গ্রহণ বৈধ) (যুরকানী, ২খ., পৃ. ১৯৪)।
সুহায়ল আসিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর সম্মুখে হাঁটু গাড়িয়া বসিল এবং সন্ধির আলোচনা আরম্ভ করিল। সুহায়ল বলিল, আপনাদেরকে এইবার এখান হইতেই মদীনায় ফিরিয়া যাইতে হইবে। মক্কার প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হইবে না। অন্যথায় লোকেরা মনে করিবে, মুসলমানগণ বলপূর্বক 'উমরাহ করিয়া গিয়াছে। ইহা কুরায়শদের জন্য অত্যন্ত অপমানজনক। এইবার এখান হইতে মদীনায় ফিরিয়া যাওয়া যদি কবুল করেন, তবেই কেবল আমি আপনার সহিত সন্ধি সম্পর্কে আলোচনা করিব, ইহাই আমার প্রথম ও প্রধান শর্ত।
সাহাবায়ে কিরাম এই শর্তে সন্ধি করিতে কিছুতেই সম্মত ছিলেন না। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদেরকে সান্ত্বনা দিয়া বলিলেন, "তোমরা বুঝিতে পারিতেছ না, ইহা আমাদের জন্য পরাজয় নহে। ইহার মধ্য দিয়াই আমরা মহাবিজয়ের দিকে অগ্রসর হইব এবং মহাবিজয় লাভ করিতে সমর্থ হইব।” অতঃপর সুহায়লকে সম্বোধন করিয়া তিনি বলিলেন, সুহায়ল! কা'বাঘরের মর্যাদা রক্ষার্থে এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কুরায়শগণ আজ আমার নিকট যাহা কিছু চাহিবে, আমি তাহাই দিব। তোমাদের শর্তেই আমি সন্ধি করিতে রাযী আছি (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ৫৫৬)। দীর্ঘ আলোচনা-পর্যালোচনার পর নিম্নোক্ত শর্তে সন্ধি করার সিদ্ধান্ত হইল:
১. মুসলমানগণ এই বৎসর 'উমরাহ না করিয়াই মদীনায় ফিরিয়া যাইবেন।
২. আগামী বৎসর তাহারা তাহাদের এই মূলতবী 'উমরাহ কাযা করিতে পারিবেন। তবে তিন দিনের বেশি মক্কায় থাকিতে পারিবেন না।
৩. 'উমরাহ করিবার সময় তাহারা কোন প্রকার অস্ত্র বহন করিতে পারিবেন না, শুধু কোষবদ্ধ তরবারি আনিতে পরিবেন।
৪. যে সমস্ত মুসলমান মক্কায় অবস্থান করিতেছে তাহাদের মধ্য হইতে কেহই মুসলমানদের সহিত মদীনায় যাইতে পারিবে না। আর মুসলমান কাফেলা হইতে কেহ মক্কায় থাকিয়া যাইতে চাহিলে তাহাকে রাখিয়া যাইতে হইবে। অনুরূপ মক্কা হইতে কেহ মদীনায় চলিয়া আসিলে তাহাকে মদীনায় ফেরৎ পাঠানো হইবে না।
৫. উভয় পক্ষ প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে বন্ধুত্ব ভাব পোষণ করিবে। এক পক্ষ অপর পক্ষের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কিংবা অপ্রকাশ্যে যুদ্ধের প্রেরণা যোগাইবে না।
৬. আরবের অন্যান্য গোত্রসমূহ স্বেচ্ছায় সন্ধিভুক্ত যে কোন পক্ষের সহিত স্বাধীনভাবে মিত্রতা স্থাপন করিতে পারিবে।
৭. এই সন্ধি দশ বৎসর কাল বলবৎ থাকিবে (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., - পৃ. ৫৬৪)।
মিকরায রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত আলোচনা করিতেছিল। এমন সময় দেখা গেল কুরায়শদের অন্যতম সরদার সুহায়ল আসিতেছে। কুরায়শগণ অনেক চিন্তা-ভাবনার পর সন্ধি করিতে রাযী হইল। এই উদ্দেশ্যে তাহারা সুহায়ল ইব্ন আমরকে চূড়ান্ত সন্ধির মধ্যস্থতার জন্য রাসূলুল্লাহ (স)-এর সমীপে প্রেরণ করিল। তাহারা সুহায়লকে বলিল, যাও, মুহাম্মাদের সহিত সন্ধি করিয়া আইস। তবে সন্ধির শর্তের মধ্যে কোন প্রকার শিথিলতা করিবে না। আর বলিও, "মুহাম্মাদ এই বৎসর মক্কায় প্রবেশের অনুমতি পাইবে না। আগামী বৎসর তাঁহাকে 'উমরাহ করার সুযোগ দেওয়া হইবে।" অন্যথায় আরবগণ বলিবে, মুহাম্মাদ কুরায়শদেরকে পরাভূত করিয়াছে (তাফসীর ইব্ন কাছীর, ৪খ., পৃ. ১৭৬)।
সুহায়ল ছিল কুরায়শদের মধ্যে অতিশয় বাগ্মী ও সুবক্তা। কুরায়শদের মধ্যে সে খতীবে কুরায়শ নামে সুপরিচিত ছিল। সুহায়লকে আসিতে দেখিয়া রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তাহারা সুহায়লকে পাঠাইয়াছে। ইহাতে মনে হয় তাহারা যেন সত্যি সত্যিই সন্ধি করিতে সম্মত হইয়াছে। তিনি আরও বলিলেন, "فَدْ سَهُلَ لَكُمْ مِنْ أَمْرِكُمْ আল্লাহ তোমাদের বিষয়টি তোমাদের জন্য কিছুটা সহজ করিয়া দিয়াছেন"। বস্তুত ইহা ছিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর শুভ লক্ষণমূলক উক্তি যাহা সুহায়লের নাম হইতে তিনি উদ্ঘাটন করিয়াছিলেন। এই ধরনের “নেকফাল” (শুভ লক্ষণ গ্রহণ বৈধ) (যুরকানী, ২খ., পৃ. ১৯৪)।
সুহায়ল আসিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর সম্মুখে হাঁটু গাড়িয়া বসিল এবং সন্ধির আলোচনা আরম্ভ করিল। সুহায়ল বলিল, আপনাদেরকে এইবার এখান হইতেই মদীনায় ফিরিয়া যাইতে হইবে। মক্কার প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হইবে না। অন্যথায় লোকেরা মনে করিবে, মুসলমানগণ বলপূর্বক 'উমরাহ করিয়া গিয়াছে। ইহা কুরায়শদের জন্য অত্যন্ত অপমানজনক। এইবার এখান হইতে মদীনায় ফিরিয়া যাওয়া যদি কবুল করেন, তবেই কেবল আমি আপনার সহিত সন্ধি সম্পর্কে আলোচনা করিব, ইহাই আমার প্রথম ও প্রধান শর্ত।
সাহাবায়ে কিরাম এই শর্তে সন্ধি করিতে কিছুতেই সম্মত ছিলেন না। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদেরকে সান্ত্বনা দিয়া বলিলেন, "তোমরা বুঝিতে পারিতেছ না, ইহা আমাদের জন্য পরাজয় নহে। ইহার মধ্য দিয়াই আমরা মহাবিজয়ের দিকে অগ্রসর হইব এবং মহাবিজয় লাভ করিতে সমর্থ হইব।” অতঃপর সুহায়লকে সম্বোধন করিয়া তিনি বলিলেন, সুহায়ল! কা'বাঘরের মর্যাদা রক্ষার্থে এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কুরায়শগণ আজ আমার নিকট যাহা কিছু চাহিবে, আমি তাহাই দিব। তোমাদের শর্তেই আমি সন্ধি করিতে রাযী আছি (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ৫৫৬)। দীর্ঘ আলোচনা-পর্যালোচনার পর নিম্নোক্ত শর্তে সন্ধি করার সিদ্ধান্ত হইল:
১. মুসলমানগণ এই বৎসর 'উমরাহ না করিয়াই মদীনায় ফিরিয়া যাইবেন।
২. আগামী বৎসর তাহারা তাহাদের এই মূলতবী 'উমরাহ কাযা করিতে পারিবেন। তবে তিন দিনের বেশি মক্কায় থাকিতে পারিবেন না।
৩. 'উমরাহ করিবার সময় তাহারা কোন প্রকার অস্ত্র বহন করিতে পারিবেন না, শুধু কোষবদ্ধ তরবারি আনিতে পরিবেন।
৪. যে সমস্ত মুসলমান মক্কায় অবস্থান করিতেছে তাহাদের মধ্য হইতে কেহই মুসলমানদের সহিত মদীনায় যাইতে পারিবে না। আর মুসলমান কাফেলা হইতে কেহ মক্কায় থাকিয়া যাইতে চাহিলে তাহাকে রাখিয়া যাইতে হইবে। অনুরূপ মক্কা হইতে কেহ মদীনায় চলিয়া গেলে তাহাকে মক্কায় ফেরৎ পাঠাইতে হইবে। কিন্তু মদীনা হইতে কেহ মক্কায় চলিয়া আসিলে তাহাকে মদীনায় ফেরৎ পাঠানো হইবে না।
৫. উভয় পক্ষ প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে বন্ধুত্ব ভাব পোষণ করিবে। এক পক্ষ অপর পক্ষের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কিংবা অপ্রকাশ্যে যুদ্ধের প্রেরণা যোগাইবে না।
৬. আরবের অন্যান্য গোত্রসমূহ স্বেচ্ছায় সন্ধিভুক্ত যে কোন পক্ষের সহিত স্বাধীনভাবে মিত্রতা স্থাপন করিতে পারিবে।
৭. এই সন্ধি দশ বৎসর কাল বলবৎ থাকিবে (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., - পৃ. ৫৬৪)।
📄 সন্ধিপত্র লিখার জন্য আলী (রা)-কে নির্দেশ
সন্ধির শর্তাবলী স্থিরীকৃত হওয়ার পর তাহা লিপিবদ্ধ করিবার জন্য রাসূলুল্লাহ (স) হযরত আলী (রা)-কে নির্দেশ দিলেন। তাঁহার নির্দেশানুসারে তিনি সন্ধিপত্র লিখিতে আরম্ভ করিলেন। প্রথমেই তিনি লিখিলেন, بسم الله الرحمن الرحيم (পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহ্ নামে)। কুরায়শ-প্রতিনিধি সুহায়ল আপত্তি করিয়া বলিল, থামুন! এই কথা লিখিতে পারিবেন না। রহমান ও রাহীম কি তাহা আমরা জানি না। আপনি বরং লিখুন, باسمك اللهم (হে আল্লাহ! তোমার নামে)। কারণ, আমরা ইহাই লিখিয়া থাকি। ইহাই আমাদের চিরাচরিত নিয়ম। ইহাই লিখুন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আচ্ছা, তাহাই লিখ। তারপর লিখা হইল :
هذا ما قضى عليه محمد رسول الله ﷺ. "ইহা সেই চুক্তিপত্র যাহার প্রতি আল্লাহ্র রাসূল মুহাম্মাদ (স) স্বীকৃতি প্রদান করিয়াছেন।" সুহায়ল আবার বাধা দিয়া বলিল, থামুন! মুহাম্মাদ যে আল্লাহ্র রাসূল ইহা যদি আমরা মানিতাম, তবে আর আপনাদের সাথে আমাদের যুদ্ধ সংঘাত হইত কিজন্য? এই কথা লিখিতে পারিবেন না; বরং লিখুন, محمد بن عبد الله (আবদুল্লাহ্র পুত্র মুহাম্মাদ)। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তোমরা যদিও অস্বীকার কর, কিন্তু নিঃসন্দেহে আমি আল্লাহ্র রাসূল। আচ্ছা, তুমি যাহা বল তাহাই লিখা হইবে। তৎপর নবী করীম (স) হযরত আলীকে বলিলেন, তুমি رسول الله শব্দটি কাটিয়া দিয়া তদস্থলে محمد بن عبد الله শব্দটি লিখিয়া দাও। হযরত আলী (রা) বলিলেন, আমাকে মাফ করুন! আমি কিছুতেই আপনার নাম হইতে "রাসূলুল্লাহ” শব্দটি মুছিতে পারিব না। তিনি বলিলেন, আচ্ছা, শব্দটি কোথায় আমাকে দেখাইয়া দাও। হযরত আলী দেখাইয়া দিলে তিনি নিজেই "রাসূলুল্লাহ” শব্দটি কাটিয়া দিলেন। তৎপর হযরত আলী সেই স্থানে ইব্ন আবদিল্লাহ্ শব্দটি লিখিয়া দেন।
কিন্তু ইমাম মুসলিমের রিওয়ায়াতে আসিয়াছে যে, রাসূলুল্লাহ (স) নিজেই "আবদুল্লাহ” শব্দটি লিখিয়াছিলেন। প্রশ্ন হয় যে, তিনি উম্মী (নিরক্ষর) হইয়া লিখিলেন কিরূপে? আল্লামা কাযী ইয়াদ বলেন, ইহা তাঁহার মু'জিযা ছিল। ইব্ন হাজার (র) বলেন, 'তিনি লিখিয়াছেন' অর্থ তিনি লিখিতে আদেশ দিয়াছেন। তাহা ছাড়া শুধু নাম লিখিতে জানিলেই উম্মী হওয়ার গুণ বিলুপ্ত হইয়া যায় না (আসাহ্হুস্ সিয়ার, পৃ. ১৭৫)।
সন্ধির শর্তাবলী স্থিরীকৃত হওয়ার পর তাহা লিপিবদ্ধ করিবার জন্য রাসূলুল্লাহ (স) হযরত আলী (রা)-কে নির্দেশ দিলেন। তাঁহার নির্দেশানুসারে তিনি সন্ধিপত্র লিখিতে আরম্ভ করিলেন। প্রথমেই তিনি লিখিলেন, بسم الله الرحمن الرحيم (পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহ্ নামে)। কুরায়শ-প্রতিনিধি সুহায়ল আপত্তি করিয়া বলিল, থামুন! এই কথা লিখিতে পারিবেন না। রহমান ও রাহীম কি তাহা আমরা জানি না। আপনি বরং লিখুন, باسمك اللهم (হে আল্লাহ! তোমার নামে)। কারণ, আমরা ইহাই লিখিয়া থাকি। ইহাই আমাদের চিরাচরিত নিয়ম। ইহাই লিখুন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আচ্ছা, তাহাই লিখ। তারপর লিখা হইল :
هذا ما قضى عليه محمد رسول الله ﷺ. "ইহা সেই চুক্তিপত্র যাহার প্রতি আল্লাহ্র রাসূল মুহাম্মাদ (স) স্বীকৃতি প্রদান করিয়াছেন।" সুহায়ল আবার বাধা দিয়া বলিল, থামুন! মুহাম্মাদ যে আল্লাহ্র রাসূল ইহা যদি আমরা মানিতাম, তবে আর আপনাদের সাথে আমাদের যুদ্ধ সংঘাত হইত কিজন্য? এই কথা লিখিতে পারিবেন না; বরং লিখুন, محمد بن عبد الله (আবদুল্লাহ্র পুত্র মুহাম্মাদ)। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তোমরা যদিও অস্বীকার কর, কিন্তু নিঃসন্দেহে আমি আল্লাহ্র রাসূল। আচ্ছা, তুমি যাহা বল তাহাই লিখা হইবে। তৎপর নবী করীম (স) হযরত আলীকে বলিলেন, তুমি رسول الله শব্দটি কাটিয়া দিয়া তদস্থলে محمد بن عبد الله শব্দটি লিখিয়া দাও। হযরত আলী (রা) বলিলেন, আমাকে মাফ করুন! আমি কিছুতেই আপনার নাম হইতে "রাসূলুল্লাহ” শব্দটি মুছিতে পারিব না। তিনি বলিলেন, আচ্ছা, শব্দটি কোথায় আমাকে দেখাইয়া দাও। হযরত আলী দেখাইয়া দিলে তিনি নিজেই "রাসূলুল্লাহ” শব্দটি কাটিয়া দিলেন। তৎপর হযরত আলী সেই স্থানে ইব্ন আবদিল্লাহ্ শব্দটি লিখিয়া দেন।
কিন্তু ইমাম মুসলিমের রিওয়ায়াতে আসিয়াছে যে, রাসূলুল্লাহ (স) নিজেই "আবদুল্লাহ” শব্দটি লিখিয়াছিলেন। প্রশ্ন হয় যে, তিনি উম্মী (নিরক্ষর) হইয়া লিখিলেন কিরূপে? আল্লামা কাযী ইয়াদ বলেন, ইহা তাঁহার মু'জিযা ছিল। ইব্ন হাজার (র) বলেন, 'তিনি লিখিয়াছেন' অর্থ তিনি লিখিতে আদেশ দিয়াছেন। তাহা ছাড়া শুধু নাম লিখিতে জানিলেই উম্মী হওয়ার গুণ বিলুপ্ত হইয়া যায় না (আসাহ্হুস্ সিয়ার, পৃ. ১৭৫)।