📄 সালিশী আলোচনা ও সন্ধির প্রয়াস
এই পরিস্থিতিতেই বুদায়ল ইব্ন ওয়ারাকা খুষা'আ গোত্রের কিছু লোকজনসহ রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর সমীপে উপস্থিত হইলেন। খুযা'আ গোত্র যদিও তখন পর্যন্ত ইসলাম গ্রহণ করে নাই, কিন্তু তাহারা চিরদিনই রাসূলুল্লাহ (স)-এর মঙ্গলাকাংখী ছিলেন। তাহাদের পূর্বপুরুষগণও তাঁহার সহিত অকৃত্রিম ভালবাসা রাখিতেন। মক্কার কাফিরগণ ইসলামের বিরুদ্ধে যখন যেই ষড়যন্ত্র করিত, তাহারা তৎসম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ (স)-কে সতর্ক করিয়া দিতেন। উক্ত গোত্রের প্রধান দলপতি ছিলেন বুদায়ল ইব্ন ওয়ারাকা।
বুদায়ল আসিয়া রাসূলুল্লাহ্ (স)-কে বলিলেন, কুরায়শগণ বিশাল বাহিনী লইয়া আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিবার জন্য প্রস্তুত হইয়া আছে। তাহারা আপনাকে কিছুতেই মক্কায় প্রবেশ করিতে দিবে না। এখন আপনি কি করিতে চান? মহানবী (স) বলিলেন, আমরা যুদ্ধ করিতে আসি নাই, 'উমরাহ করিতে আসিয়াছি। বুদায়ল! তুমি গিয়া কুরায়শদের বলিয়া দাও, তাহারা যেন অযথা আমাদেরকে আক্রমণ না করে। এই পবিত্র মাসে পবিত্র কা'বা শরীফে কেহ কাহারও বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে না। আমরা যুদ্ধ চাই না, আমরা চাই শান্তি। যুদ্ধ করিতে করিতে কুরায়শদের অবস্থা শোচনীয় হইয়া পড়িয়াছে। এখন যুদ্ধ করা তাহাদের জন্য সমীচীন নহে। তাহাদের উচিৎ নির্দিষ্ট সময়ের জন্য আমার সহিত সন্ধি করিয়া লওয়া যাহাতে তাহারা শান্তির নিঃশ্বাস লইতে পারে, আর আমাকে অন্যান্য আরব গোত্রের সহিত বুঝাপড়া করার সুযোগ দেওয়া। যদি আমি পরাজিত হই, তবে বিনাশ্রমে তাহাদের উদ্দেশ্য সফল হইয়া যাইবে। অন্যথায় তখন তাহারা যাহা ভাল মনে করে তাহাই করিতে পারিবে। কুরায়শগণ যদি আমার এই প্রস্তাবে রাযী না হয়, তবে আল্লাহ্ যাহা ইচ্ছা তাহাই হইবে। যে পর্যন্ত আমার দেহে প্রাণ থাকিবে সে পর্যন্ত আমি তাহাদের সহিত যুদ্ধ করিতেই থাকিব (যাদুল মা'আদ, ১খ., পৃ. ৩৮১; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ৫৫৪)।
বুদায়ল মক্কায় ফিরিয়া গিয়া কুরায়শদের নিকট রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর পয়গাম শুনাইবার জন্য অনুমতি চাহিলেন। কিন্তু ইকরিমা ইব্ন আবী জাহল ও হাকাম ইবনুল 'আস-সহ কতিপয় হঠকারী কুরায়শ বলিল, আমরা মুহাম্মাদের পয়গাম শুনিতে চাহি না। কিন্তু দুই-একজন বিচক্ষণ লোক বলিল, আচ্ছা! বলুন দেখি, আপনি কি পয়গাম লইয়া আসিয়াছেন? বুদায়ল রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর পয়গাম শুনাইলেন যে, তিনি শুধু 'উমরাহর উদ্দেশ্যে আসিয়াছেন, যুদ্ধ করিতে আসেন নাই। তিনি তোমাদের সহিত সন্ধি করিতে চাহেন। কুরায়শগণ বলিল, আচ্ছা! তিনি যুদ্ধ করিতে আসেন নাই মানিলাম, তবে মক্কায় প্রবেশ করিতে পারিবেন না (সীরাতুল মুস্তাফা, ২খ., পৃ. ৩৫৪)। ইব্ন হিশামের বর্ণনামতে তাহারা আরও বলে, আরবরা এই কথা জানে যে, মক্কাবাসী কখনও কাহাকেও এই শহরে জোরপূর্বক ঢুকিতে দেয় নাই (সীরাত ইন্ন হিশাম)।
এই পরিস্থিতিতেই বুদায়ল ইব্ন ওয়ারাকা খুষা'আ গোত্রের কিছু লোকজনসহ রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর সমীপে উপস্থিত হইলেন। খুযা'আ গোত্র যদিও তখন পর্যন্ত ইসলাম গ্রহণ করে নাই, কিন্তু তাহারা চিরদিনই রাসূলুল্লাহ (স)-এর মঙ্গলাকাংখী ছিলেন। তাহাদের পূর্বপুরুষগণও তাঁহার সহিত অকৃত্রিম ভালবাসা রাখিতেন। মক্কার কাফিরগণ ইসলামের বিরুদ্ধে যখন যেই ষড়যন্ত্র করিত, তাহারা তৎসম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ (স)-কে সতর্ক করিয়া দিতেন। উক্ত গোত্রের প্রধান দলপতি ছিলেন বুদায়ল ইব্ন ওয়ারাকা।
বুদায়ল আসিয়া রাসূলুল্লাহ্ (স)-কে বলিলেন, কুরায়শগণ বিশাল বাহিনী লইয়া আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিবার জন্য প্রস্তুত হইয়া আছে। তাহারা আপনাকে কিছুতেই মক্কায় প্রবেশ করিতে দিবে না। এখন আপনি কি করিতে চান? মহানবী (স) বলিলেন, আমরা যুদ্ধ করিতে আসি নাই, 'উমরাহ করিতে আসিয়াছি। বুদায়ল! তুমি গিয়া কুরায়শদের বলিয়া দাও, তাহারা যেন অযথা আমাদেরকে আক্রমণ না করে। এই পবিত্র মাসে পবিত্র কা'বা শরীফে কেহ কাহারও বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে না। আমরা যুদ্ধ চাই না, আমরা চাই শান্তি। যুদ্ধ করিতে করিতে কুরায়শদের অবস্থা শোচনীয় হইয়া পড়িয়াছে। এখন যুদ্ধ করা তাহাদের জন্য সমীচীন নহে। তাহাদের উচিৎ নির্দিষ্ট সময়ের জন্য আমার সহিত সন্ধি করিয়া লওয়া যাহাতে তাহারা শান্তির নিঃশ্বাস লইতে পারে, আর আমাকে অন্যান্য আরব গোত্রের সহিত বুঝাপড়া করার সুযোগ দেওয়া। যদি আমি পরাজিত হই, তবে বিনাশ্রমে তাহাদের উদ্দেশ্য সফল হইয়া যাইবে। অন্যথায় তখন তাহারা যাহা ভাল মনে করে তাহাই করিতে পারিবে। কুরায়শগণ যদি আমার এই প্রস্তাবে রাযী না হয়, তবে আল্লাহ্ যাহা ইচ্ছা তাহাই হইবে। যে পর্যন্ত আমার দেহে প্রাণ থাকিবে সে পর্যন্ত আমি তাহাদের সহিত যুদ্ধ করিতেই থাকিব (যাদুল মা'আদ, ১খ., পৃ. ৩৮১; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ৫৫৪)।
বুদায়ল মক্কায় ফিরিয়া গিয়া কুরায়শদের নিকট রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর পয়গাম শুনাইবার জন্য অনুমতি চাহিলেন। কিন্তু ইকরিমা ইব্ন আবী জাহল ও হাকাম ইবনুল 'আস-সহ কতিপয় হঠকারী কুরায়শ বলিল, আমরা মুহাম্মাদের পয়গাম শুনিতে চাহি না। কিন্তু দুই-একজন বিচক্ষণ লোক বলিল, আচ্ছা! বলুন দেখি, আপনি কি পয়গাম লইয়া আসিয়াছেন? বুদায়ল রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর পয়গাম শুনাইলেন যে, তিনি শুধু 'উমরাহর উদ্দেশ্যে আসিয়াছেন, যুদ্ধ করিতে আসেন নাই। তিনি তোমাদের সহিত সন্ধি করিতে চাহেন। কুরায়শগণ বলিল, আচ্ছা! তিনি যুদ্ধ করিতে আসেন নাই মানিলাম, তবে মক্কায় প্রবেশ করিতে পারিবেন না (সীরাতুল মুস্তাফা, ২খ., পৃ. ৩৫৪)। ইব্ন হিশামের বর্ণনামতে তাহারা আরও বলে, আরবরা এই কথা জানে যে, মক্কাবাসী কখনও কাহাকেও এই শহরে জোরপূর্বক ঢুকিতে দেয় নাই (সীরাত ইন্ন হিশাম)।
📄 কুরায়শ প্রতিনিধি উরওয়া ও তাহার অসংযত উক্তি
এই সময় উরওয়া ইব্ন মাসউদ আছ-ছাকাফী নামক জনৈক তায়েফবাসী সরদার কুরায়শদের লক্ষ্য করিয়া বলিল, আপনারা কি আমার পিতৃস্থানীয়? কুরায়শগণ উত্তর করিল, নিশ্চয়। সে আবার বলিল, আমি কি আপনাদের সন্তানতুল্য নহি? তাহারা বলিল, অবশ্যই। তখন সে বলিল, আমার প্রতি কি আপনারা পূর্ণমাত্রায় আস্থাবান নহেন? তাহারা বলিল, নিশ্চয়। সে বলিল, তবে শুনুন! মুহাম্মাদ তোমাদেরকে যে প্রস্তাব দিয়াছেন, তাহা অত্যন্ত যুক্তিসংগত। তোমরা আমাকে অনুমতি দাও, আমি সরাসরি তাঁহার সহিত সাক্ষাত করিয়া সবিস্তার আলোচনা করিয়া আসি। উরওয়ার এই প্রস্তাবে সকলে সম্মতি জ্ঞাপন করিল (যাদুল মা'আদ, ১খ., পৃ. ৩৮৩)।
তখন উরওয়া ইবন মাসউ'দ আছ-ছাকাফী রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর খিদমতে উপস্থিত হইয়া বলিল, আমি কুরায়শদের পক্ষ হইতে আপনার মতামত জানিতে আসিয়াছি। রাসূলুল্লাহ্ (স) তাহার নিকট ঐ কথাগুলিরই পুনরাবৃত্তি করিলেন যাহা বুদায়ল ইব্ন ওয়ারাকার নিকট বলিয়াছিলেন।
উরওয়া বলিল, হে মুহাম্মাদ! আপনি যদি নিজ বংশের লোকদেরকে ধ্বংস করেন, তবে তাহা কি কোন ভাল কাজ হইবে? কেহ নিজ বংশকে ধ্বংস করিয়া দিয়াছে, এমন কোন দৃষ্টান্ত আছে কি? আর যদি যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়া যায় তবে যে সমস্ত ভবঘুরে আপনার চতুষ্পার্শ্বে ভিড় করিয়া আছে তাহারা ধূলিবৎ উড়িয়া যাইবে। তখন আপনি তাহাদের নাম-নিশানাও দেখিতে পাইবেন না (তাফসীর ইব্ন কাছীর, ৪খ., পৃ. ১৭৮)।
তাহার এই অসংলগ্ন উক্তি শুনিয়া সাহাবীগণ অতিমাত্রায় উত্তেজিত হইলেন, এমনকি ধৈর্যের মূর্ত প্রতীক হযরত আবূ বাক্স সিদ্দীক (রা) তাহাকে গালি দিয়া বলিলেন, কি বলিস পাষণ্ড! আমরা রাসূলকে ছাড়িয়া চলিয়া যাইব? উরওয়া তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাঁহার দিকে তাকাইয়া বলিল, ইনি কে? রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিলেন, ইনি আবূ বাক্স। উরওয়া বলিল, হে আবূ বাক্স! তুমি একবার আমার উপকার করিয়াছিলে, আমি উহার প্রতিদান দিতে পারি নাই। তাই তোমার কথার উত্তর দিলাম না। সেই উপকার ছিল এই যে, উরওয়া কোন এক সময় রক্তপণ আদায় করিতে অক্ষম হইলে আবূ বাক্স সিদ্দীক (রা) তাহাকে দশটি উট দিয়া সাহায্য করিয়াছিলেন (যাদুল মা'আদ, ১খ., পৃ. ৩৮৩)।
উরওয়া যখন রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর সহিত আলাপ-আলোচনা করিতেছিল তখন তাহার চাচাতো ভাই হযরত মুগীরা ইব্ন শু'বা (রা) একটি খোলা তরবারি হাতে লইয়া রাসূলের পশ্চাতে দণ্ডায়মান ছিলেন। আরবের সাধারণ নিয়ম অনুসারে উরওয়া কথা বলার সময় বারবার রাসূলুল্লাহ (স)-এর দাঁড়ি মুবারকে হাত লাগাইতেছিল। হযরত মুগীরা (রা) তরবারির বাট দ্বারা তাহার হাতে চাপ দিয়া বলিলেন, "সাবধান! রাসূলের দাঁড়ি মুবারক হইতে হাত হঠাও। কোন মুশরিকের জন্য ইহা সংগত নহে যে, সে রাসূলের দাঁড়ি মুবারক স্পর্শ করিবে।" উরওয়া ইহাতে ক্ষুব্ধ হইয়া মুগীরা (রা)-কে লক্ষ্য করিয়া বলিল, "ওরে বিশ্বাসঘাতক! আমি কি অর্থ-কড়ি দিয়া তোর কৃত অপরাধের ক্ষতিপূরণ করি নাই? আজ তুই আমার সাথে এমন ব্যবহার করছিস?" উরওয়ার ইঙ্গিতের বিষয়টি ছিল এই যে, হযরত মুগীরা (রা) ইসলাম গ্রহণের পূর্বে কিছু লোককে হত্যা করিয়াছিলেন। নিহতদের আত্মীয়-স্বজন তখন হত্যার প্রতিশোধকল্পে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হইয়া যায়। এই সময় উরওয়া নিজের পক্ষ হইতে নিহতদের রক্তপণ পরিশোধ করিয়া তাঁহাকে রক্ষা করিয়াছিল এবং যুদ্ধের দাবানল নির্বাপিত করিয়াছিল (সীরাতুল মুস্তাফা, ২খ., পৃ. ৩৫৫)।
উরওয়া ছিল অতি বিচক্ষণ প্রবীণ ব্যক্তি। সে রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর সহিত আলাপ-আলোচনা করিতে করিতে মনোযোগ সহকারে সাহাবা-ই কিরামের আচার-ব্যবহার, চালচলন ও কথাবার্তা পর্যবেক্ষণ করিতেছিল। রাসূলের প্রতি সাহাবীগণের অগাধ ভক্তি-শ্রদ্ধা, অকৃত্রিম ভালবাসা ও অসামান্য আনুগত্যবোধ দেখিয়া সে অভিভূত হইয়া পড়ে। উরওয়া মক্কায় ফিরিয়া কুরায়শদেরকে বলিল, "আমি বড় বড় রাজা-বাদশাহর দরবারে গিয়াছি। রোম, পারস্য ও আবিসিনিয়ার সম্রাটদের শান-শওকতও দেখিয়াছি। কিন্তু আল্লাহ্র শপথ! মুহাম্মাদের সাহাবীগণ তাঁহাকে যেরূপ ভক্তি ও শ্রদ্ধা করেন, বিশ্বজগতে কোথাও উহার দৃষ্টান্ত দেখি নাই। তিনি যখন কথা বলেন, তখন এই বিশাল কাফেলা একেবারে নীরব থাকে। কেহই তাঁহার দিকে দৃষ্টি উঠাইয়া তাকাইতে সাহস পায় না। তাঁহার সহিত যখন কেহ কিছু বলেন, তখন অতি বিনয় সহকারে মৃদুস্বরে কথা বলেন। তাঁহার আজ্ঞা পালন করার জন্য তাহাদের প্রত্যেকেই ব্যাকুল হইয়া উঠেন। তিনি থু থু ফেলিলে তাহারা কাড়াকাড়ি করিয়া তাহা লইয়া নিজেদের মুখমণ্ডলে এবং শরীরে মাখে। তিনি উযু করিলে তাঁহার পানি লইবার জন্য তাহাদের মধ্যে কাড়াকাড়ি লাগিয়া যায়।"
অতঃপর উরওয়া বলিল, "হে কুরায়শগণ! মুহাম্মাদ তোমাদেরকে অতি ন্যায়সংগত কথাই বলিয়াছেন। তোমরা তাঁহার কথা মানিয়া লও। ইহাতেই তোমাদের মঙ্গল হইবে" (যাদুল-মা'আদ, ১খ., পৃ. ৩৮৮; যুরকানী, ২খ., পৃ. ১৯২)। উরওয়া সাহাবীগণ সম্বন্ধে যেই অভিব্যক্তি প্রকাশ করিয়াছে, ইহা যেন সাহাবীগণ সম্বন্ধে তাহার প্রথম উক্তির কুদরতী প্রতিউত্তর যাহা আল্লাহ্ তা'আলা তাহার মুখেই ব্যক্ত করাইয়াছিলেন।
এই সময় উরওয়া ইব্ন মাসউদ আছ-ছাকাফী নামক জনৈক তায়েফবাসী সরদার কুরায়শদের লক্ষ্য করিয়া বলিল, আপনারা কি আমার পিতৃস্থানীয়? কুরায়শগণ উত্তর করিল, নিশ্চয়। সে আবার বলিল, আমি কি আপনাদের সন্তানতুল্য নহি? তাহারা বলিল, অবশ্যই। তখন সে বলিল, আমার প্রতি কি আপনারা পূর্ণমাত্রায় আস্থাবান নহেন? তাহারা বলিল, নিশ্চয়। সে বলিল, তবে শুনুন! মুহাম্মাদ তোমাদেরকে যে প্রস্তাব দিয়াছেন, তাহা অত্যন্ত যুক্তিসংগত। তোমরা আমাকে অনুমতি দাও, আমি সরাসরি তাঁহার সহিত সাক্ষাত করিয়া সবিস্তার আলোচনা করিয়া আসি। উরওয়ার এই প্রস্তাবে সকলে সম্মতি জ্ঞাপন করিল (যাদুল মা'আদ, ১খ., পৃ. ৩৮৩)।
তখন উরওয়া ইবন মাসউ'দ আছ-ছাকাফী রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর খিদমতে উপস্থিত হইয়া বলিল, আমি কুরায়শদের পক্ষ হইতে আপনার মতামত জানিতে আসিয়াছি। রাসূলুল্লাহ্ (স) তাহার নিকট ঐ কথাগুলিরই পুনরাবৃত্তি করিলেন যাহা বুদায়ল ইব্ন ওয়ারাকার নিকট বলিয়াছিলেন।
উরওয়া বলিল, হে মুহাম্মাদ! আপনি যদি নিজ বংশের লোকদেরকে ধ্বংস করেন, তবে তাহা কি কোন ভাল কাজ হইবে? কেহ নিজ বংশকে ধ্বংস করিয়া দিয়াছে, এমন কোন দৃষ্টান্ত আছে কি? আর যদি যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়া যায় তবে যে সমস্ত ভবঘুরে আপনার চতুষ্পার্শ্বে ভিড় করিয়া আছে তাহারা ধূলিবৎ উড়িয়া যাইবে। তখন আপনি তাহাদের নাম-নিশানাও দেখিতে পাইবেন না (তাফসীর ইব্ন কাছীর, ৪খ., পৃ. ১৭৮)।
তাহার এই অসংলগ্ন উক্তি শুনিয়া সাহাবীগণ অতিমাত্রায় উত্তেজিত হইলেন, এমনকি ধৈর্যের মূর্ত প্রতীক হযরত আবূ বাক্স সিদ্দীক (রা) তাহাকে গালি দিয়া বলিলেন, কি বলিস পাষণ্ড! আমরা রাসূলকে ছাড়িয়া চলিয়া যাইব? উরওয়া তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাঁহার দিকে তাকাইয়া বলিল, ইনি কে? রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিলেন, ইনি আবূ বাক্স। উরওয়া বলিল, হে আবূ বাক্স! তুমি একবার আমার উপকার করিয়াছিলে, আমি উহার প্রতিদান দিতে পারি নাই। তাই তোমার কথার উত্তর দিলাম না। সেই উপকার ছিল এই যে, উরওয়া কোন এক সময় রক্তপণ আদায় করিতে অক্ষম হইলে আবূ বাক্স সিদ্দীক (রা) তাহাকে দশটি উট দিয়া সাহায্য করিয়াছিলেন (যাদুল মা'আদ, ১খ., পৃ. ৩৮৩)।
উরওয়া যখন রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর সহিত আলাপ-আলোচনা করিতেছিল তখন তাহার চাচাতো ভাই হযরত মুগীরা ইব্ন শু'বা (রা) একটি খোলা তরবারি হাতে লইয়া রাসূলের পশ্চাতে দণ্ডায়মান ছিলেন। আরবের সাধারণ নিয়ম অনুসারে উরওয়া কথা বলার সময় বারবার রাসূলুল্লাহ (স)-এর দাঁড়ি মুবারকে হাত লাগাইতেছিল। হযরত মুগীরা (রা) তরবারির বাট দ্বারা তাহার হাতে চাপ দিয়া বলিলেন, "সাবধান! রাসূলের দাঁড়ি মুবারক হইতে হাত হঠাও। কোন মুশরিকের জন্য ইহা সংগত নহে যে, সে রাসূলের দাঁড়ি মুবারক স্পর্শ করিবে।" উরওয়া ইহাতে ক্ষুব্ধ হইয়া মুগীরা (রা)-কে লক্ষ্য করিয়া বলিল, "ওরে বিশ্বাসঘাতক! আমি কি অর্থ-কড়ি দিয়া তোর কৃত অপরাধের ক্ষতিপূরণ করি নাই? আজ তুই আমার সাথে এমন ব্যবহার করছিস?" উরওয়ার ইঙ্গিতের বিষয়টি ছিল এই যে, হযরত মুগীরা (রা) ইসলাম গ্রহণের পূর্বে কিছু লোককে হত্যা করিয়াছিলেন। নিহতদের আত্মীয়-স্বজন তখন হত্যার প্রতিশোধকল্পে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হইয়া যায়। এই সময় উরওয়া নিজের পক্ষ হইতে নিহতদের রক্তপণ পরিশোধ করিয়া তাঁহাকে রক্ষা করিয়াছিল এবং যুদ্ধের দাবানল নির্বাপিত করিয়াছিল (সীরাতুল মুস্তাফা, ২খ., পৃ. ৩৫৫)।
উরওয়া ছিল অতি বিচক্ষণ প্রবীণ ব্যক্তি। সে রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর সহিত আলাপ-আলোচনা করিতে করিতে মনোযোগ সহকারে সাহাবা-ই কিরামের আচার-ব্যবহার, চালচলন ও কথাবার্তা পর্যবেক্ষণ করিতেছিল। রাসূলের প্রতি সাহাবীগণের অগাধ ভক্তি-শ্রদ্ধা, অকৃত্রিম ভালবাসা ও অসামান্য আনুগত্যবোধ দেখিয়া সে অভিভূত হইয়া পড়ে। উরওয়া মক্কায় ফিরিয়া কুরায়শদেরকে বলিল, "আমি বড় বড় রাজা-বাদশাহর দরবারে গিয়াছি। রোম, পারস্য ও আবিসিনিয়ার সম্রাটদের শান-শওকতও দেখিয়াছি। কিন্তু আল্লাহ্র শপথ! মুহাম্মাদের সাহাবীগণ তাঁহাকে যেরূপ ভক্তি ও শ্রদ্ধা করেন, বিশ্বজগতে কোথাও উহার দৃষ্টান্ত দেখি নাই। তিনি যখন কথা বলেন, তখন এই বিশাল কাফেলা একেবারে নীরব থাকে। কেহই তাঁহার দিকে দৃষ্টি উঠাইয়া তাকাইতে সাহস পায় না। তাঁহার সহিত যখন কেহ কিছু বলেন, তখন অতি বিনয় সহকারে মৃদুস্বরে কথা বলেন। তাঁহার আজ্ঞা পালন করার জন্য তাহাদের প্রত্যেকেই ব্যাকুল হইয়া উঠেন। তিনি থু থু ফেলিলে তাহারা কাড়াকাড়ি করিয়া তাহা লইয়া নিজেদের মুখমণ্ডলে এবং শরীরে মাখে। তিনি উযু করিলে তাঁহার পানি লইবার জন্য তাহাদের মধ্যে কাড়াকাড়ি লাগিয়া যায়।"
অতঃপর উরওয়া বলিল, "হে কুরায়শগণ! মুহাম্মাদ তোমাদেরকে অতি ন্যায়সংগত কথাই বলিয়াছেন। তোমরা তাঁহার কথা মানিয়া লও। ইহাতেই তোমাদের মঙ্গল হইবে" (যাদুল-মা'আদ, ১খ., পৃ. ৩৮৮; যুরকানী, ২খ., পৃ. ১৯২)। উরওয়া সাহাবীগণ সম্বন্ধে যেই অভিব্যক্তি প্রকাশ করিয়াছে, ইহা যেন সাহাবীগণ সম্বন্ধে তাহার প্রথম উক্তির কুদরতী প্রতিউত্তর যাহা আল্লাহ্ তা'আলা তাহার মুখেই ব্যক্ত করাইয়াছিলেন।
📄 কুরায়শ প্রতিনিধি হুলায়স
উরওয়ার কথা শুনিয়া বানু কিনানার সরদার হুলায়স ইবন আলকামা আল-কিনানী বলিল, হে কুরায়শ! তোমরা আমাকে একবার অনুমতি দাও, আমি মুহাম্মাদের সহিত আলোচনা করিয়া আসি। তাহারা বলিল, আচ্ছা, যাইতে চাও যাও। রাসূলুল্লাহ্ (স) হুলায়সকে আসিতে দেখিয়া বলিলেন, এই লোকটি বানু কিনানার দলপতি। কুরবানী করা ইহাদের অন্যতম প্রিয় কাজ। আমাদের কুরবানীর পশুগুলি তাহাকে দেখাইয়া দাও। সাহাবীগণ কুরবানীর চিহ্নযুক্ত উটগুলি লইয়া 'লাব্বায়ক, লাব্বায়ক' বলিতে বলিতে হুলায়সের অভ্যর্থনার জন্য অগ্রসর হইলেন। কুরবানীর উটের বিরাট কাফেলা দেখিয়া হুলায়স আর অশ্রু সংবরণ করিতে পারিল না। সে কাঁদিতে কাঁদিতে বলিল, আহা! ইহারা বায়তুল্লাহ্র যিয়ারত প্রত্যাশী। ইহারা কেবল 'উমরাহ্ উদ্দেশ্যেই আসিয়াছে। ইহাদেরকে বাধা দেওয়া কি ঠিক? এই কথা বলিয়া সে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত সাক্ষাৎ না করিয়াই মক্কায় ফিরিয়া গেল (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ১৭৩)।
কুরায়শদের নিকট গিয়া হুলায়স বলিল, "তাহারা যুদ্ধ করিতে আসে নাই, 'উমরাহ করিতে এবং কুরবানী করিতে আসিয়াছে। তাহাদেরকে তোমরা বাধা দিও না। তাহাদেরকে তাহাদের পূণ্যকর্ম সম্পাদন করিতে অনুমতি দাও।" কুরায়শগণ বলিল, তুমি গ্রাম্য লোক, তোমার বুদ্ধি-জ্ঞান কম। তুমি কথা বলিও না, চুপ করিয়া বসিয়া থাক। হুলায়স অত্যন্ত ক্রোধান্বিত হইয়া বলিল, আল্লাহর কসম! আমরা তোমাদের সহিত এইজন্য চুক্তি করি নাই যে, যাহারা বায়তুল্লাহ যিয়ারত করিতে আসিবে তোমরা তাহাদেরকে বাধা দিবে, আর আমরা কিছুই বলিব না। আমি স্পষ্ট বলিতেছি, "যদি তোমরা এখন মুসলমানদের বায়তুল্লাহ যিয়ারত করিতে অনুমতি না দাও তবে আমরা তোমাদের সহিত কৃত মৈত্রীচুক্তি ভঙ্গ করিয়া চলিয়া যাইব"।
হুলায়সের চুক্তি ভঙ্গের হুমকিতে কুরায়শগণ বিচলিত হইয়া তাহাকে তোষামোদ করিতে লাগিল এবং বলিল, আচ্ছা, বসুন। আমরা একটু বুঝাপড়া করিয়া লই (সীরাতুল মুস্তাফা, ২খ., পৃ. ৩৫৬)।
উরওয়ার কথা শুনিয়া বানু কিনানার সরদার হুলায়স ইবন আলকামা আল-কিনানী বলিল, হে কুরায়শ! তোমরা আমাকে একবার অনুমতি দাও, আমি মুহাম্মাদের সহিত আলোচনা করিয়া আসি। তাহারা বলিল, আচ্ছা, যাইতে চাও যাও। রাসূলুল্লাহ্ (স) হুলায়সকে আসিতে দেখিয়া বলিলেন, এই লোকটি বানু কিনানার দলপতি। কুরবানী করা ইহাদের অন্যতম প্রিয় কাজ। আমাদের কুরবানীর পশুগুলি তাহাকে দেখাইয়া দাও। সাহাবীগণ কুরবানীর চিহ্নযুক্ত উটগুলি লইয়া 'লাব্বায়ক, লাব্বায়ক' বলিতে বলিতে হুলায়সের অভ্যর্থনার জন্য অগ্রসর হইলেন। কুরবানীর উটের বিরাট কাফেলা দেখিয়া হুলায়স আর অশ্রু সংবরণ করিতে পারিল না। সে কাঁদিতে কাঁদিতে বলিল, আহা! ইহারা বায়তুল্লাহ্র যিয়ারত প্রত্যাশী। ইহারা কেবল 'উমরাহ্ উদ্দেশ্যেই আসিয়াছে। ইহাদেরকে বাধা দেওয়া কি ঠিক? এই কথা বলিয়া সে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত সাক্ষাৎ না করিয়াই মক্কায় ফিরিয়া গেল (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ১৭৩)।
কুরায়শদের নিকট গিয়া হুলায়স বলিল, "তাহারা যুদ্ধ করিতে আসে নাই, 'উমরাহ করিতে এবং কুরবানী করিতে আসিয়াছে। তাহাদেরকে তোমরা বাধা দিও না। তাহাদেরকে তাহাদের পূণ্যকর্ম সম্পাদন করিতে অনুমতি দাও।" কুরায়শগণ বলিল, তুমি গ্রাম্য লোক, তোমার বুদ্ধি-জ্ঞান কম। তুমি কথা বলিও না, চুপ করিয়া বসিয়া থাক। হুলায়স অত্যন্ত ক্রোধান্বিত হইয়া বলিল, আল্লাহর কসম! আমরা তোমাদের সহিত এইজন্য চুক্তি করি নাই যে, যাহারা বায়তুল্লাহ যিয়ারত করিতে আসিবে তোমরা তাহাদেরকে বাধা দিবে, আর আমরা কিছুই বলিব না। আমি স্পষ্ট বলিতেছি, "যদি তোমরা এখন মুসলমানদের বায়তুল্লাহ যিয়ারত করিতে অনুমতি না দাও তবে আমরা তোমাদের সহিত কৃত মৈত্রীচুক্তি ভঙ্গ করিয়া চলিয়া যাইব"।
হুলায়সের চুক্তি ভঙ্গের হুমকিতে কুরায়শগণ বিচলিত হইয়া তাহাকে তোষামোদ করিতে লাগিল এবং বলিল, আচ্ছা, বসুন। আমরা একটু বুঝাপড়া করিয়া লই (সীরাতুল মুস্তাফা, ২খ., পৃ. ৩৫৬)।
📄 কুরায়শ প্রতিনিধি মিক্রায
কুরায়শ নেতাগণ বসিয়া দীর্ঘক্ষণ পর্যন্ত চিন্তা-ভাবনা ও শলা-পরামর্শ করিল। এক পর্যায়ে মিকরায ইবন হাম্স নামক জনৈক সরদার উঠিয়া বলিল, তোমরা আমাকে অনুমতি দিলে আমিও একবার মুহাম্মাদের সহিত কথা বলিয়া আসিতাম। কুরায়শদের অনুমতি পাইয়া মিকরায রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে আসিতেছিল। মিকরাযকে দেখিয়াই রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, "এই লোকটি দুষ্ট প্রকৃতির।” তিনি এই কথা বলিয়া তাহার অতীতের একটি দুরভিসন্ধির প্রতি ইঙ্গিত করিয়াছেন। ইতোপূর্বে পঞ্চাশজন, মতান্তরে সত্তর অথবা আশিজনের যেই কুরায়শ বাহিনী হুদায়বিয়ায় চোরাগোপ্তা হামলা করার প্রস্তুতি লইয়াছিল এবং পরে মুসলমানদের হাতে ধরা পড়িয়াছিল, সেই বাহিনীর প্রধান ছিল এই মিকরায। কিন্তু সে পালাইয়া যাইতে সক্ষম হয়। মুসলমানগণ তাহার কথা জানিতেন না, তাই রাসূলুল্লাহ (স) এই মন্তব্য করিয়াছিলেন (সীরাতুল মুস্তাফা, ২খ., পৃ. ৩৫৭; তাফসীর ইব্ন কাছীর, ৪খ., পৃ. ১৭৬; প্রতিনিধিদের আগমন ক্রমধারায় কিছু ব্যতিক্রমের জন্য দ্র: ইব্ন হিশাম ও দানাপুরী)।
কুরায়শ নেতাগণ বসিয়া দীর্ঘক্ষণ পর্যন্ত চিন্তা-ভাবনা ও শলা-পরামর্শ করিল। এক পর্যায়ে মিকরায ইবন হাম্স নামক জনৈক সরদার উঠিয়া বলিল, তোমরা আমাকে অনুমতি দিলে আমিও একবার মুহাম্মাদের সহিত কথা বলিয়া আসিতাম। কুরায়শদের অনুমতি পাইয়া মিকরায রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে আসিতেছিল। মিকরাযকে দেখিয়াই রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, "এই লোকটি দুষ্ট প্রকৃতির।” তিনি এই কথা বলিয়া তাহার অতীতের একটি দুরভিসন্ধির প্রতি ইঙ্গিত করিয়াছেন। ইতোপূর্বে পঞ্চাশজন, মতান্তরে সত্তর অথবা আশিজনের যেই কুরায়শ বাহিনী হুদায়বিয়ায় চোরাগোপ্তা হামলা করার প্রস্তুতি লইয়াছিল এবং পরে মুসলমানদের হাতে ধরা পড়িয়াছিল, সেই বাহিনীর প্রধান ছিল এই মিকরায। কিন্তু সে পালাইয়া যাইতে সক্ষম হয়। মুসলমানগণ তাহার কথা জানিতেন না, তাই রাসূলুল্লাহ (স) এই মন্তব্য করিয়াছিলেন (সীরাতুল মুস্তাফা, ২খ., পৃ. ৩৫৭; তাফসীর ইব্ন কাছীর, ৪খ., পৃ. ১৭৬; প্রতিনিধিদের আগমন ক্রমধারায় কিছু ব্যতিক্রমের জন্য দ্র: ইব্ন হিশাম ও দানাপুরী)।