📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 প্রেক্ষাপট

📄 প্রেক্ষাপট


(এক) কুরায়শগণ আরবের বিভিন্ন গোত্রে এই অপপ্রচার করিতেছিল যে, মুসলমানদের অন্তরে বায়তুল্লাহ্র প্রেম-ভক্তি বলিতে কিছুই নাই। ইহার প্রমাণ এই যে, তাহারা এই বায়তুল্লাহ অধ্যুষিত অঞ্চল ছাড়িয়া মদীনায় হিজরত করিয়াছে এবং কখনও হজ্জ ও উমরাহ করিতে আসে নাই (মহানবী (স) জীবনী বিশ্বকোষ, ১খ., পৃ. ৪৬৭)।
প্রকৃত অবস্থা এই ছিল যে, রাসূলুল্লাহ (স) ও মুসলমানগণ মদীনায় আসিবার পর হইতেই কাফির মুশরিকদের উপর্যুপরি আক্রমণ, অভ্যন্তরীণ শত্রুদের বারংবার বিশ্বাসঘাতকতা, আর্থিক অভাব-অভিযোগ প্রভৃতি কারণে আল্লাহর ঘর যিয়ারত করার সুযোগ পান নাই। অন্যথায় সদাসর্বদা মাতৃভূমি মক্কা এবং আল্লাহর ঘর কা'বার বিচ্ছেদ বেদনায় তাঁহাদের অন্তর পীড়িত হইতেছিল। তাঁহাদের অন্তর মাতৃভূমি মক্কার জন্য কি পরিমাণ ব্যথিত ছিল, ইহা হযরত বিলাল (রা)-এর একটি আবৃত্তি হইতে অনুমান করা যায়। যখনই তাঁহার মক্কার কথা স্মরণ হইত তখনই তিনি অস্থির হইয়া কাঁদিতে আরম্ভ করিতেন এবং উচ্চস্বরে আবৃত্তি করিতেন : الا ليت شعري هل أبيتن ليلة + بواد وحولي اذخر وجليل هل أردن يوما مياه مجنة + وهل يبدون لي شامة وطفيل.
"আহা! এমন দিন কি আবার আসিবে যে, আমি মক্কার উপত্যকায় একটি রাত যাপন করিতে পারিব এবং ইযখির ও জালীল ঘাস আমার পার্শ্বে থাকিবে! এমন দিনও কি আসিবে যে, আমি মাজান্নার জলাশয়ে নামিব এবং শামা ও তাফীল পাহাড়দ্বয় আমার দৃষ্টিগোচর হইবে" (বুখারী, সাহীহ, ১খ., পৃ. ৫৫৮)! খন্দক ও বনু কুরায়যার যুদ্ধের পর যখন রাসূলুল্লাহ (স) ও তাঁহার সাহাবীগণ আভ্যন্তরীণ ও বাহিরের শত্রুদের আক্রমণ হইতে অনেকটা নিশ্চিন্ত হইলেন তখন আল্লাহ্র ঘর যিয়ারত করিবার জন্য তাঁহাদের অন্তর অতিমাত্রায় ব্যাকুল হইয়া উঠিল।
ইসলামের আবির্ভাবের পর হইতেই কুরায়শগণ ইসলামের বিরোধিতায় লিপ্ত হয়। তাহাদের অবর্ণনীয় নির্যাতন ও নিপীড়নে অতিষ্ঠ হইয়া মুসলমানগণ প্রথমে হাবশায় এবং পরে মদীনায় হিজরত করেন। শেষ পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (স) আল্লাহর নির্দেশে নিজেও মদীনায় হিজরত করেন। হিজরতের পর মক্কার সাথে মুসলমানদের সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে। ফলে বদর, উহুদ ও খন্দকের ন্যায় বড় বড় যুদ্ধও সংঘটিত হয়। যুদ্ধে সামগ্রিকভাবে কুরায়শগণ চরমভাবে পর্যুদস্ত হয়। ইহা ছাড়া রাসূলুল্লাহ (স) যুদ্ধকৌশল হিসাবে কুরায়শদের বাণিজ্যিক পথগুলি একরকম প্রায় অবরূদ্ধ করিয়া দেন। সিরিয়ার বাণিজ্যিক পথ তো বদরের যুদ্ধের পর বন্ধ হইয়াই যায়। বাকী ছিল নজদের পথ। খন্দকের যুদ্ধের পর নজদের প্রভাবশালী নেতা ছুমামা ইব্‌ন উছাল ইসলাম গ্রহণ করেন এবং এই মর্মে প্রতিজ্ঞা করেন যে, যতদিন পর্যন্ত মক্কার কুরায়শগণ ইসলামের বিরোধিতা হইতে বিরত না হইবে, ততদিন পর্যন্ত তাহাদেরকে নজদ হইতে একটি শস্যদানাও মক্কায় নিতে দেওয়া হইবে না। ইহার ফলে মক্কায় চরম দুর্ভিক্ষ দেখা দিল। এখন মক্কাবাসী বাধ্য হইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট বাণিজ্য অবরোধ প্রত্যাহার করার জন্য আবেদন-অনুরোধ করিতে আসিল। ইহার পর রাসূলুল্লাহ (স) হযরত ছুমামা ইব্‌ন উছাল (রা)-কে বাণিজ্য অবরোধ তুলিয়া লইতে নির্দেশ দেন এবং মক্কাবাসীর প্রতি সহানুভূতির নিদর্শনস্বরূপ কুরায়শ নেতা আবূ সুফ্যানের নিকট পাঁচ শত আশরাফী সাহায্যও পাঠান।
এই সকল কারণে মক্কাবাসীর মধ্যেও চিন্তার উদ্রেক হয় যে, মুহাম্মাদ (স)-এর সহিত শান্তিচুক্তি করিয়া লইতে পারিলেই আমাদের কল্যাণ হইত। কিন্তু নিজেদের শৌর্য-বীর্য ও গোষ্ঠীগত ঐতিহ্যের কারণে এবং মক্কা ও তৎপার্শ্ববর্তী অন্যান্য গোত্র ও সম্প্রদায়ের নিকট নিজেদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হইবার আশংকায় তাহারা এই কথা মুখে প্রকাশ করিত না (ডঃ হামীদুল্লাহ্ 'রাসূলুল্লাহ (স) কী সিয়াসী যিন্দিগী' শীর্ষক নিবন্ধ দ্র.)।
(তিন) পবিত্র কা'বাগৃহ আল্লাহ্ ইবাদাতকেন্দ্র। এই গৃহের উপর কাহারও কোন প্রকার স্বত্বাধিকার ছিল না। কুরায়শগণ শুধু এই গৃহের রক্ষক ও সেবায়েত ছিল। শত্রুকেও আল্লাহ্র ঘর যিয়ারত করিতে বাধা দেওয়ার কোন অধিকার তাহাদের ছিল না। কিন্তু ব্যতিক্রম দেখা দিল মুসলমানদের বেলায়। রাসূলুল্লাহ (স) ও মুসলমানগণ মক্কা হইতে হিজরত করার পর কুরায়শগণ শপথ করিল যে, তাহারা মুহাম্মাদ (স) ও তাঁহার সঙ্গীগণকে কা'বাঘর যিয়ারতের সুযোগ দিবে না। প্রয়োজনে তাহারা যুদ্ধ করিবে (দ্র. ২ঃ ২১৭ এবং ৮: ৩৪, ৩৫, ৩৩৬)।
তবে মুসলমানগণ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করিতেন যে, অতি সত্বর আল্লাহ তা'আলা তাঁহার রাসূলকে বিজয় দান করিবেন এবং তাহারা নির্বিঘ্নে মক্কায় যাইতে সক্ষম হইবেন এবং কা'বাঘর যিয়ারত করিয়াশূন্য হইবেন। তাই তাঁহারা সদা সেই প্রত্যাশিত মুহূর্তটির অপেক্ষায় ছিলেন।
ইতোমধ্যে রাসূলুল্লাহ (স) স্বপ্নযোগে দেখিতে পাইলেন যে, 'তিনি সাহাবীগণকে সঙ্গে লইয়া মক্কায় মসজিদুল হারামে গিয়াছেন। সেখানে কা'বাঘর তাওয়াফ করিয়াছেন। ইহার পর তাঁহার সহযাত্রী সাহাবীগণের কেহ কেহ মাথার চুল ছাটাইয়া ফেলিয়াছেন, আবার কেহ কেহ মাথা মুণ্ডন করিয়াছেন'। রাসূলুল্লাহ (স)-এর এই স্বপ্নের কথা সূরা আল-ফাহে উক্ত হইয়াছে (দ্র. ৪৮:২৭)।
রাসূলুল্লাহ (স) সাহাবীগণকে এই স্বপ্নের কথা জানাইলেন। নবী-রাসূলগণের স্বপ্নও ওহীর অন্তর্ভুক্ত। এই সুসংবাদ শ্রবণে সকলেই উৎফুল্ল হইলেন। যদিও ইহাতে সময়, মাস কিংবা বৎসরের কোন উল্লেখ ছিল না, তথাপি তাঁহাদের এ বিষয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহের উদ্রেক হয় নাই যে, এই স্বপ্ন এই বৎসরই বাস্তবে ফলিবে। সুতরাং সকলেই বায়তুল্লাহ যিয়ারতের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করিতে লাগিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) নিজেও যথারীতি পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করিলেন (তাফসীর ইব্‌ন কাছীর, ৪খ., পৃ. ১৬৫-১৮৪)।

(এক) কুরায়শগণ আরবের বিভিন্ন গোত্রে এই অপপ্রচার করিতেছিল যে, মুসলমানদের অন্তরে বায়তুল্লাহ্র প্রেম-ভক্তি বলিতে কিছুই নাই। ইহার প্রমাণ এই যে, তাহারা এই বায়তুল্লাহ অধ্যুষিত অঞ্চল ছাড়িয়া মদীনায় হিজরত করিয়াছে এবং কখনও হজ্জ ও উমরাহ করিতে আসে নাই (মহানবী (স) জীবনী বিশ্বকোষ, ১খ., পৃ. ৪৬৭)।
প্রকৃত অবস্থা এই ছিল যে, রাসূলুল্লাহ (স) ও মুসলমানগণ মদীনায় আসিবার পর হইতেই কাফির মুশরিকদের উপর্যুপরি আক্রমণ, অভ্যন্তরীণ শত্রুদের বারংবার বিশ্বাসঘাতকতা, আর্থিক অভাব-অভিযোগ প্রভৃতি কারণে আল্লাহর ঘর যিয়ারত করার সুযোগ পান নাই। অন্যথায় সদাসর্বদা মাতৃভূমি মক্কা এবং আল্লাহর ঘর কা'বার বিচ্ছেদ বেদনায় তাঁহাদের অন্তর পীড়িত হইতেছিল। তাঁহাদের অন্তর মাতৃভূমি মক্কার জন্য কি পরিমাণ ব্যথিত ছিল, ইহা হযরত বিলাল (রা)-এর একটি আবৃত্তি হইতে অনুমান করা যায়। যখনই তাঁহার মক্কার কথা স্মরণ হইত তখনই তিনি অস্থির হইয়া কাঁদিতে আরম্ভ করিতেন এবং উচ্চস্বরে আবৃত্তি করিতেন :
الا ليت شعري هل أبيتن ليلة + بواد وحولي اذخر وجليل هل أردن يوما مياه مجنة + وهل يبدون لي شامة وطفيل.
"আহা! এমন দিন কি আবার আসিবে যে, আমি মক্কার উপত্যকায় একটি রাত যাপন করিতে পারিব এবং ইযখির ও জালীল ঘাস আমার পার্শ্বে থাকিবে! এমন দিনও কি আসিবে যে, আমি মাজান্নার জলাশয়ে নামিব এবং শামা ও তাফীল পাহাড়দ্বয় আমার দৃষ্টিগোচর হইবে" (বুখারী, সাহীহ, ১খ., পৃ. ৫৫৮)!
খন্দক ও বনু কুরায়যার যুদ্ধের পর যখন রাসূলুল্লাহ (স) ও তাঁহার সাহাবীগণ আভ্যন্তরীণ ও বাহিরের শত্রুদের আক্রমণ হইতে অনেকটা নিশ্চিন্ত হইলেন তখন আল্লাহ্র ঘর যিয়ারত করিবার জন্য তাঁহাদের অন্তর অতিমাত্রায় ব্যাকুল হইয়া উঠিল।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মদীনা হইতে রওয়ানা

📄 মদীনা হইতে রওয়ানা


রাসূলুল্লাহ (স) গৃহাভ্যন্তরে গোসল সমাপন করিবার পর দুইখানা ইহরামের কাপড় পরিধান করিয়া ঘর হইতে বাহির হইয়া আসিলেন। তাঁহার স্ত্রী হযরত উম্মু সালামা (রা)ও তাঁহার সফরসঙ্গী ছিলেন। মক্কাভিমুখে রওয়ানা করিবার উদ্দেশে মুহাজির-আনসারগণের চৌদ্দ শতের এক বিরাট কাফেলা তাঁহার সফরসঙ্গী হইলেন। রাসূলুল্লাহ (স)-এর স্ত্রী হযরত উম্মু সালামা ছাড়াও আরও তিনজন মহিলা সাহাবী তাঁহাদের মাহরামদের সহিত এই কাফেলায় শরীক হইয়াছিলেন, যথা উম্মু উমারা, উম্মু মানী' ও উম্মু আমের (কিতাবুল মাগাযী, ২খ., পৃ. ৫৭৫)।
রাসূলুল্লাহ (স) সকলকে পরিষ্কার ভাষায় জানাইয়া দিলেন, আমরা উমরা পালনার্থে যাত্রা করিতেছি, যুদ্ধ করিতে নয়। কাজেই যুদ্ধের অস্ত্র-শস্ত্র সঙ্গে লইবার কোনও প্রয়োজন নাই। শুধু কোষবদ্ধ তরবারি ও তীর লইতে পার। উল্লেখ্য যে, বিদেশে যাত্রা করিলে তরবারি ও তীর রাখা আরবদের সাধারণ নিয়ম ছিল। এমনকি মেষ চরাইতে গেলেও কিংবা অন্য কোন প্রয়োজনে মাঠে বাহির হইলেও আকস্মিক বিপদ-আপদ হইতে আত্মরক্ষার জন্য তাহারা সঙ্গে তীর-তরবারি রাখিত (আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৩৭৮)। অবশ্য কোন কোন বর্ণনামতে কিছু দূর যাওয়ার পর হযরত উমার (রা)-এর পরামর্শক্রমে সাবধানতাবশত অস্ত্রের সরকারী ভাণ্ডার আনয়ন করা হয়, কিন্তু উহা বন্ধও রাখা হয় (ইসলামী বিশ্বকোষ, ২৬খ., ১০৪)।
আল-কাস্তয়ার পৃষ্ঠে আরোহণ করিয়া রাসূলুল্লাহ (স) আগে আগে চলিলেন। সাহাবাগণ তাঁহার অনুগমন করিতে লাগিলেন। হযরত 'আব্বাদ ইব্‌ন বিশ্‌র (রা)-এর নেতৃত্বে বিশজনের একটি অশ্বারোহী বাহিনীকে কাফেলার সম্মুখে নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ ও নিশ্চিন্তকরণের জন্য অগ্রে চলিতে নির্দেশ দেন। এই অগ্রবর্তী দলে মিকদাদ, খাব্বাব ও মুহাম্মাদ ইব্‌ন মাসলামা (রা) প্রমুখ সাহাবী শরীক ছিলেন (কিতাবুল মাগাযী, ২খ., পৃ. ৫৭৪)।
রাসূলুল্লাহ (স) কুরবানীর জন্য সাথে সত্তরটি উট লইলেন। তন্মধ্যে আবূ জাহলের সেই উটটিও ছিল যাহা বদর যুদ্ধে গনীতমরূপে তাঁহার অধিকারে আসিয়াছিল। উটটির নাকে একটি চাঁদির রিং ছিল। সাহাবীগণের মধ্যে সামর্থবান অনেকেই সাথে কুরবানীর পশু লইয়াছিলেন। যথা হযরত আবূ বাক্স সিদ্দীক, উছমান, আবদুর রহমান ইব্‌ন আওফ, সা'দ ইব্‌ন উবাদা, তালহা ইব্‌ন আবদিল্লাহ (রা) প্রমুখ (কিবতাবুল মাগাযী, ২খ., পৃ. ৫৭৩; তাফসীর ইব্‌ন কাছীর, ৪খ., পৃ. ১৮৫)।
এই সফরকালে রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার অবর্তমানে মদীনার প্রশাসন ও নামাযের ইমামতির জন্য আবদুল্লাহ ইব্‌ন উম্মে মাকতুম (রা)-কে দায়িত্ব প্রদান করেন (কিতাবুল-মাগাযী, ২খ., পৃ. ৫৭৪)। কেহ কেহ রিওয়ায়াত করিয়াছেন যে, এই সফরকালে মদীনায় তাঁহার স্থলাভিষিক্ত হইয়াছিলেন হযরত নুমায়লা ইব্‌ন আবদুল্লাহ আল-লায়ছী (রা) (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ৫৫২)।

রাসূলুল্লাহ (স) গৃহাভ্যন্তরে গোসল সমাপন করিবার পর দুইখানা ইহরামের কাপড় পরিধান করিয়া ঘর হইতে বাহির হইয়া আসিলেন। তাঁহার স্ত্রী হযরত উম্মু সালামা (রা)ও তাঁহার সফরসঙ্গী ছিলেন। মক্কাভিমুখে রওয়ানা করিবার উদ্দেশে মুহাজির-আনসারগণের চৌদ্দ শতের এক বিরাট কাফেলা তাঁহার সফরসঙ্গী হইলেন। রাসূলুল্লাহ (স)-এর স্ত্রী হযরত উম্মু সালামা ছাড়াও আরও তিনজন মহিলা সাহাবী তাঁহাদের মাহরামদের সহিত এই কাফেলায় শরীক হইয়াছিলেন, যথা উম্মু উমারা, উম্মু মানী' ও উম্মু আমের (কিতাবুল মাগাযী, ২খ., পৃ. ৫৭৫)।
রাসূলুল্লাহ (স) সকলকে পরিষ্কার ভাষায় জানাইয়া দিলেন, আমরা উমরা পালনার্থে যাত্রা করিতেছি, যুদ্ধ করিতে নয়। কাজেই যুদ্ধের অস্ত্র-শস্ত্র সঙ্গে লইবার কোনও প্রয়োজন নাই। শুধু কোষবদ্ধ তরবারি ও তীর লইতে পার। উল্লেখ্য যে, বিদেশে যাত্রা করিলে তরবারি ও তীর রাখা আরবদের সাধারণ নিয়ম ছিল। এমনকি মেষ চরাইতে গেলেও কিংবা অন্য কোন প্রয়োজনে মাঠে বাহির হইলেও আকস্মিক বিপদ-আপদ হইতে আত্মরক্ষার জন্য তাহারা সঙ্গে তীর-তরবারি রাখিত (আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৩৭৮)। অবশ্য কোন কোন বর্ণনামতে কিছু দূর যাওয়ার পর হযরত উমার (রা)-এর পরামর্শক্রমে সাবধানতাবশত অস্ত্রের সরকারী ভাণ্ডার আনয়ন করা হয়, কিন্তু উহা বন্ধও রাখা হয় (ইসলামী বিশ্বকোষ, ২৬খ., ১০৪)।
আল-কাস্তয়ার পৃষ্ঠে আরোহণ করিয়া রাসূলুল্লাহ (স) আগে আগে চলিলেন। সাহাবাগণ তাঁহার অনুগমন করিতে লাগিলেন। হযরত 'আব্বাদ ইব্‌ন বিশ্‌র (রা)-এর নেতৃত্বে বিশজনের একটি অশ্বারোহী বাহিনীকে কাফেলার সম্মুখে নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ ও নিশ্চিন্তকরণের জন্য অগ্রে চলিতে নির্দেশ দেন। এই অগ্রবর্তী দলে মিকদাদ, খাব্বাব ও মুহাম্মাদ ইব্‌ন মাসলামা (রা) প্রমুখ সাহাবী শরীক ছিলেন (কিতাবুল মাগাযী, ২খ., পৃ. ৫৭৪)।
রাসূলুল্লাহ (স) কুরবানীর জন্য সাথে সত্তরটি উট লইলেন। তন্মধ্যে আবূ জাহলের সেই উটটিও ছিল যাহা বদর যুদ্ধে গনীতমরূপে তাঁহার অধিকারে আসিয়াছিল। উটটির নাকে একটি চাঁদির রিং ছিল। সাহাবীগণের মধ্যে সামর্থবান অনেকেই সাথে কুরবানীর পশু লইয়াছিলেন। যথা হযরত আবূ বাক্স সিদ্দীক, উছমান, আবদুর রহমান ইব্‌ন আওফ, সা'দ ইব্‌ন উবাদা, তালহা ইব্‌ন আবদিল্লাহ (রা) প্রমুখ (কিবতাবুল মাগাযী, ২খ., পৃ. ৫৭৩; তাফসীর ইব্‌ন কাছীর, ৪খ., পৃ. ১৮৫)।
এই সফরকালে রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার অবর্তমানে মদীনার প্রশাসন ও নামাযের ইমামতির জন্য আবদুল্লাহ ইব্‌ন উম্মে মাকতুম (রা)-কে দায়িত্ব প্রদান করেন (কিতাবুল-মাগাযী, ২খ., পৃ. ৫৭৪)। কেহ কেহ রিওয়ায়াত করিয়াছেন যে, এই সফরকালে মদীনায় তাঁহার স্থলাভিষিক্ত হইয়াছিলেন হযরত নুমায়লা ইব্‌ন আবদুল্লাহ আল-লায়ছী (রা) (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ৫৫২)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 যুল-হুলায়ফায় যাত্রাবিরতি

📄 যুল-হুলায়ফায় যাত্রাবিরতি


মদীনার বাহিরে পাঁচ-ছয় মাইল দূরের একটি মরু এলাকা যুল-হুলায়ফা। রাসূলুল্লাহ (স) কাফেলাসহ এইখানে অবতরণ করিলেন এবং ইহরাম বাঁধিবার নির্দেশ দিলেন। সকলেই ইহরাম বাঁধিলেন এবং তালবিয়ার (লাব্বায়ক আল্লাহুম্মা লাব্বায়ক) ধ্বনিতে আকাশ-বাতাশ মুখরিত করিলেন।
তৎপর রাসূলুল্লাহ্ (স) কুরবানীর উটগুলিকে কুরবানীর নিদর্শন লাগাইতে আদেশ করিলেন। সাহাবীগণ কতিপয় উটের গলায় ফিতা, চামড়া বা জীর্ণ পাদুকা ঝুলাইয়া দিলেন। ইহাকে আরবীতে কালাদা বলা হয়। আর কুরবানীর নিদর্শনস্বরূপ উটের পিঠের উপর কবরাকৃতির ঝুঁটির উভয় পার্শ্বে ক্ষতচিহ্ন করিয়া দেওয়া হইল। রাসূলুল্লাহ্ (স) নিজহাতে কিছু উটের গায়ে এবং অবশিষ্টগুলিতে হযরত নাজিয়া ইব্‌ন জুনদুব (রা) তাঁহার নির্দেশে চিহ্ন লাগাইয়া দেন। উদ্দেশ্য ছিল, কেহ দূর হইতে দেখিয়া যেন অনায়াসে বুঝিতে পারে যে, ইহা কুরবানীর উট এবং এই কাফেলা হজ্জের কাফেলা (কিতাবুল মাগাযী, ২খ., পৃ. ৫৭৪)।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (স) কুরবানীর পশুগুলির তত্ত্বাবধানের দায়িত্বভার নাজিয়া ইব্‌ন জুনদুব (রা)-এর উপর অর্পণ করিলেন। তিনি উটগুলি লইয়া কাফেলার আগে আগে চলিতে লাগিলেন (আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৩৭৯)।

মদীনার বাহিরে পাঁচ-ছয় মাইল দূরের একটি মরু এলাকা যুল-হুলায়ফা। রাসূলুল্লাহ (স) কাফেলাসহ এইখানে অবতরণ করিলেন এবং ইহরাম বাঁধিবার নির্দেশ দিলেন। সকলেই ইহরাম বাঁধিলেন এবং তালবিয়ার (লাব্বায়ক আল্লাহুম্মা লাব্বায়ক) ধ্বনিতে আকাশ-বাতাশ মুখরিত করিলেন।
তৎপর রাসূলুল্লাহ্ (স) কুরবানীর উটগুলিকে কুরবানীর নিদর্শন লাগাইতে আদেশ করিলেন। সাহাবীগণ কতিপয় উটের গলায় ফিতা, চামড়া বা জীর্ণ পাদুকা ঝুলাইয়া দিলেন। ইহাকে আরবীতে কালাদা বলা হয়। আর কুরবানীর নিদর্শনস্বরূপ উটের পিঠের উপর কবরাকৃতির ঝুঁটির উভয় পার্শ্বে ক্ষতচিহ্ন করিয়া দেওয়া হইল। রাসূলুল্লাহ্ (স) নিজহাতে কিছু উটের গায়ে এবং অবশিষ্টগুলিতে হযরত নাজিয়া ইব্‌ন জুনদুব (রা) তাঁহার নির্দেশে চিহ্ন লাগাইয়া দেন। উদ্দেশ্য ছিল, কেহ দূর হইতে দেখিয়া যেন অনায়াসে বুঝিতে পারে যে, ইহা কুরবানীর উট এবং এই কাফেলা হজ্জের কাফেলা (কিতাবুল মাগাযী, ২খ., পৃ. ৫৭৪)।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (স) কুরবানীর পশুগুলির তত্ত্বাবধানের দায়িত্বভার নাজিয়া ইব্‌ন জুনদুব (রা)-এর উপর অর্পণ করিলেন। তিনি উটগুলি লইয়া কাফেলার আগে আগে চলিতে লাগিলেন (আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৩৭৯)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মক্কাভিমুখে গোয়েন্দা প্রেরণ

📄 মক্কাভিমুখে গোয়েন্দা প্রেরণ


মক্কার বানু খুযা'আ গোত্রের বিশর ইব্‌ন সুফ্যান নামক একজন নও-মুসলিমও রাসূলুল্লাহ (স)-এর সাথে ছিলেন। তিনি যে ইসলাম গ্রহণ করিয়াছেন একথা মক্কাবাসীদের সম্পূর্ণ অবিদিত ছিল। কুরায়শদের হাবভাব অবগত হওয়ার জন্য যুল-হুলায়ফা হইতেই রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে গোয়েন্দারূপে মক্কায় প্রেরণ করিলেন।
কাফেলা যখন উসফান নামক স্থানে পৌঁছিল, তখন হযরত বিশর ইব্‌ন সুফ্যান মক্কা হইতে ফেরৎ আসিলেন। উসফান মক্কা হইতে দুই মনযিল দূরে মক্কা-মদীনার পথে একটি জনপদের নাম। তিনি খবর দিলেন যে, কুরায়শগণ আপনার আগমনের সংবাদ পাইয়া সকল গোত্রের লোকজনকে সমবেত করিয়া যুদ্ধের জন্য পূর্ণ প্রস্তুত হইয়া আছে। তাহারা আপনাকে কোন অবস্থাতেই মক্কায় প্রবেশ করিতে দিবে না। তাহাদের বিরাট প্রতিরোধ বাহিনী মক্কার বাহিরে ইয়ালদাহ নামক স্থানে আপনাদের অপেক্ষা করিতেছে। ওয়ালীদের পুত্র খালিদ এবং আবূ জাহলের পুত্র ইকরিমা দুই শত অশ্বারোহী সৈন্য লইয়া অগ্রসর হইয়া রাবিগ ও জুহফার মধ্যবর্তী কুরাউল গামীম পর্যন্ত পৌঁছিয়া গিয়াছে (যাদুল মা'আদ, ১খ., পৃ. ৩৮০)। এই স্থানটি ছিল উসফান হইতে আট মাইল দূরে।
গোয়েন্দা আরও জানাইলেন যে, যুদ্ধ-বিগ্রহে কুরায়শদের সহযোগী পুরাতন মিত্র কা'ব ইব্‌ন লুওয়াই গোত্র আপনাকে প্রতিরোধ করার জন্য আহাবীশকে একত্র করিয়া রাখিয়াছে (আহাবীশ হইল কতিপয় যুদ্ধবাজ লোক, সাহারা বিভিন্ন গোত্রের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল)। তাহারা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ফৌজ একত্র করিয়াছে। তাহাদের ইচ্ছা হইল, যুদ্ধ করিয়া হইলেও আপনাকে এবং আপনার সঙ্গীগণকে মক্কায় পৌঁছিতে বাধা প্রদান করা (আসাহ্হুস্ সিয়ার, পৃ. ১৬৮)।

মক্কার বানু খুযা'আ গোত্রের বিশর ইব্‌ন সুফ্যান নামক একজন নও-মুসলিমও রাসূলুল্লাহ (স)-এর সাথে ছিলেন। তিনি যে ইসলাম গ্রহণ করিয়াছেন একথা মক্কাবাসীদের সম্পূর্ণ অবিদিত ছিল। কুরায়শদের হাবভাব অবগত হওয়ার জন্য যুল-হুলায়ফা হইতেই রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে গোয়েন্দারূপে মক্কায় প্রেরণ করিলেন।
কাফেলা যখন উসফান নামক স্থানে পৌঁছিল, তখন হযরত বিশর ইব্‌ন সুফ্যান মক্কা হইতে ফেরৎ আসিলেন। উসফান মক্কা হইতে দুই মনযিল দূরে মক্কা-মদীনার পথে একটি জনপদের নাম। তিনি খবর দিলেন যে, কুরায়শগণ আপনার আগমনের সংবাদ পাইয়া সকল গোত্রের লোকজনকে সমবেত করিয়া যুদ্ধের জন্য পূর্ণ প্রস্তুত হইয়া আছে। তাহারা আপনাকে কোন অবস্থাতেই মক্কায় প্রবেশ করিতে দিবে না। তাহাদের বিরাট প্রতিরোধ বাহিনী মক্কার বাহিরে ইয়ালদাহ নামক স্থানে আপনাদের অপেক্ষা করিতেছে। ওয়ালীদের পুত্র খালিদ এবং আবূ জাহলের পুত্র ইকরিমা দুই শত অশ্বারোহী সৈন্য লইয়া অগ্রসর হইয়া রাবিগ ও জুহফার মধ্যবর্তী কুরাউল গামীম পর্যন্ত পৌঁছিয়া গিয়াছে (যাদুল মা'আদ, ১খ., পৃ. ৩৮০)। এই স্থানটি ছিল উসফান হইতে আট মাইল দূরে।
গোয়েন্দা আরও জানাইলেন যে, যুদ্ধ-বিগ্রহে কুরায়শদের সহযোগী পুরাতন মিত্র কা'ব ইব্‌ন লুওয়াই গোত্র আপনাকে প্রতিরোধ করার জন্য আহাবীশকে একত্র করিয়া রাখিয়াছে (আহাবীশ হইল কতিপয় যুদ্ধবাজ লোক, সাহারা বিভিন্ন গোত্রের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল)। তাহারা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ফৌজ একত্র করিয়াছে। তাহাদের ইচ্ছা হইল, যুদ্ধ করিয়া হইলেও আপনাকে এবং আপনার সঙ্গীগণকে মক্কায় পৌঁছিতে বাধা প্রদান করা (আসাহ্হুস্ সিয়ার, পৃ. ১৬৮)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00