📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আবু রাফে'-এর হত্যাকারী

📄 আবু রাফে'-এর হত্যাকারী


অভিযানে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে কাহার তরবারির আঘাতে আল্লাহ্র এই দুশমন নিহত হইয়াছে সেই প্রসঙ্গে বর্ণিত হইয়াছে যে, অংশগ্রহণকারী সকল সাহাবীই নিজেদের তাহার হত্যাকারী বলিয়া দাবি করিলেন। মূলত তাঁহারা সকলেই যেহেতু একই সাথে তাহাকে আঘাত করিয়াছিলেন, সেইজন্য তাঁহাদের দাবি ছিল যথার্থ। তাহার পরও কোন ব্যক্তির সরাসরি আঘাতে আল্লাহর এই দুশমন নিহত হইয়াছিল সূক্ষ্মভাবে তাহা নির্ধারণের জন্য রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাদের সকলকে তাঁহাদের তরবারি রাসূলুল্লাহ (স)-এর সমীপে উপস্থিত করিবার আহবান জানাইলেন। তাঁহাদের সকলেই তাঁহাদের তরবারি রাসূলুল্লাহ (স)-এর সমীপে উপস্থিত করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) দীর্ঘক্ষণ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়া বলিলেন, 'আবদুল্লাহ ইব্‌ন উনায়স-এর তরবারি তাহাকে হত্যা করিয়াছে। কেননা এই তরবারিতে উহার খাদ্যচিহ্ন পরিষ্কারভাবে দেখা যাইতেছে (ইব্‌ন হিশাম, আস-সীরাহ, ৩খ., পৃ. ১০৯৭; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ১৪০)।
সুতরাং বলা যায়, উল্লিখিত অভিযানে অংশগ্রহণকারী ছয়জন সাহাবীই আবু রাফে'-এর হত্যাকাণ্ডে অবদান রাখিয়াছেন, তবে আবদুল্লাহ ইবন উনায়সের আঘাতেই সে নিহত হয়।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ইসলামে ঘুমন্ত অবস্থায় হত্যা ও গুপ্তহত্যা

📄 ইসলামে ঘুমন্ত অবস্থায় হত্যা ও গুপ্তহত্যা


ইমাম বুখারী (র) আবু রাফে' হত্যার ঘটনাসম্বলিত দুইটি বর্ণনা একটি বিশেষ শিরোনামের অধীন উল্লেখ করিয়াছেন। উক্ত শিরোনামটি হইল: "বাব কাতলিন না'ইমিল মুশরিক” (অনুচ্ছেদঃ ঘুমন্ত মুশরিককে হত্যা করা)।
আবু রাফে'কে মূলত ঘুমাইতে যাইবার পূর্ব মুহূর্তে হত্যা করা হইয়াছিল। অথবা যখন বলা হইল, আবু রাফে' কোথায়, তখন সে উত্তরও দিয়াছিল। ইহাতে বুঝা গেল যে, তাহাকে ঘুমন্ত অবস্থায় হত্যা করা হয় নাই। অন্যথায় সে প্রশ্নের উত্তর দিতে সক্ষম হইত না। ইসলামের দৃষ্টিতে দুইটি অবস্থায় ঘুমন্ত থাকিলেও কাফিরকে হত্যা করা বৈধ। (এক) উক্ত কাফিরকে পূর্ব হইতে ইসলামের দাওয়াত দানের পরও সে ইসলাম গ্রহণ না করিলে তাহাকে পুনরায় ঘুম হইতে জাগাইয়া ইসলামের দাওয়াত দান করার কোন প্রয়োজন নাই। এই পরিস্থিতিতে তাহাকে ঘুমন্ত অবস্থায় হত্যা করায় কোন দোষ নাই। (দুই) উক্ত কাফির যদি কুফুরীর মধ্যে এমন আকণ্ঠ নিমজ্জিত থাকে যে, এই কুফুরী হইতে পরিত্রাণ পাইয়া হিদায়াত লাভের সামান্য আশাটুকু নাই, তখনও তাহাকে ঘুমন্ত অবস্থায় হত্যা করা বৈধ (ফাতহুল বারী, ৬খ., পৃ. ১৮০)।
ইসলামী রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান যদি মনে করেন যে, কোন ব্যক্তি ইসলাম ও ইসলামী রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকীস্বরূপ, তাহা হইলে এই ফিতনা নিরসনের লক্ষ্যে তিনি তাহাকে গুপ্তহত্যা করাইবার এখতিয়ার রাখেন। ইসলামে এই পরিস্থিতিতে গুপ্তহত্যা বৈধ (ফাতহুল বারী, ৬খ., পৃ. ১৮০)। কা'ব ইব্‌ন আশরাফ-এর গুপ্তহত্যার ঘটনা (বুখারী, ৫খ., পৃ. ২১০-২১৩) ও আবূ রাফে'-এর গুপ্তহত্যা এই মানদণ্ডে সন্দেহাতীতভাবেই বৈধ ছিল। এই বিষয়ে সামান্য সন্দেহ-সংশয়েরও কোন অবকাশ নাই। রাসূলুল্লাহ (স)-এর জীবদ্দশায় ইসলামের আরও অনেক শত্রু ইসলামের বিরুদ্ধে ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকিলেও তিনি তাহাদিগকে এইভাবে গুপ্তহত্যার ব্যবস্থা করান নাই। ইহাতে বুঝা যায় যে, একটি বিশেষ পর্যায়ে ইসলাম এই গুপ্তহত্যাকে অনুমোদন করিয়াছে।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 এ ঘটনার শিক্ষণীয় দিক

📄 এ ঘটনার শিক্ষণীয় দিক


(১) বিশেষ পরিস্থিতিতে শত্রুকে গুপ্তহত্যা বৈধ: মুশরিককে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছান হইলে সে যদি তাহা প্রত্যাখ্যান করে, নিজের সর্বশক্তি ব্যয় করিয়া ইসলামের বিরোধিতা করে ও নিজের সম্পদ ইসলামকে প্রতিহত করিবার জন্য উৎসর্গ করে- এমন অবস্থায় তাহাকে গুপ্তভাবে হত্যা করা ইসলামে বৈধ (ফাতহুল বারী, ৭খ., পৃ. ৪০০)। এমনকি পূর্বে যদি তাহাকে ইসলামের দিকে আহবান জানানো হইয়া থাকে তাহা হইলে হত্যার পূর্বে তাহাকে পুনরায় দাওয়াত দানের প্রয়োজন নাই। ওহীর মাধ্যমে অথবা বাস্তব অবস্থার প্রেক্ষাপটে যদি বুঝা যায় হিদায়াত লাভের সম্ভাবনা নাই, তাহা হইলে তাহাকেও হত্যা অবৈধ নহে (ফতহুল বারী, ৬খ., পৃ. ১৮০)।
(২) শত্রুনিধনে সুযোগ সন্ধানের বৈধতা: ইসলাম বিশেষ পরিস্থিতিতে শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ অপরিহার্য বলিয়া ঘোষণা করিয়াছে। এই শত্রুদের খবরাখবর গোপনে সংগ্রহ করা বৈধ। তাহদিগকে পরাজিত করা কিংবা হত্যার জন্য গোপনে সুযোগ সন্ধান আপত্তিকর নয়। মূলত ইবন 'উতায়ক এই অভিযানে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করিয়াছেন।
(৩) শত্রুদের সাথে কৃত্রিম ব্যবস্থা অবলম্বন বৈধ: আবদুল্লাহ ইবন 'উতায়কের প্রথম আঘাত ব্যর্থ হইল। তিনি সাহায্যকারীর কণ্ঠ অবলম্বন করিলেন। নিজের কণ্ঠ স্বর পরিবর্তন করিলেন। কি ঘটনা ঘটিয়াছে তাহা তিনি আবু রাফে'-এর নিকট জানিতে চাহিলেন। নিজের কণ্ঠস্বর গোপন করিয়া জানা ঘটনাকে না জানার ভান করা শত্রুনিধনের জন্য ইসলামে বৈধ। প্রাকৃতিক কার্য সম্পাদনের কৃত্রিম দৃশ্যও তিনি তৈরি করিয়াছিলেন। কারণ যাহাতে শত্রুপক্ষ তাহাকে চিনিতে না পারে। ইসলামে ইহাও আপত্তিকর নয়।
(৪) শত্রুর মৃত্যুসংবাদ জানার জন্য অপেক্ষা করা: শত্রু পরিপূর্ণভাবে ধ্বংস হওয়ার মধ্যেই নিহিত থাকে তৃপ্তি। সেইজন্য শত্রু ধ্বংস হইবার নিশ্চিত সংবাদ লাভের জন্য গোপনে অপেক্ষা করা আপত্তিকর নহে। আবদুল্লাহ ইবন 'উতায়ক ভোর না হওয়া পর্যন্ত এই সংবাদের জন্যই দুর্গের নিকট অপেক্ষা করিয়াছিলেন।
(৫) যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি অভিযানের ফলাফল দায়িত্বশীলকে অবহিত করা : আবু রাফে'-এর নিহত হইবার খবর সম্পর্কে সাহাবীগণ নিশ্চিত হওয়ার পর দলপতি তাহাদিগকে এই শুভসংবাদ রাসূলুল্লাহ (স)-কে পৌঁছাইবার নির্দেশ দিলেন। যথাশীঘ্র তাঁহাকে এই সংবাদ পৌঁছানো হইল।
(৬) সাহাবীগণ প্রাথমিক চিকিৎসায় দক্ষ ছিলেন: আবদুল্লাহ ইবন 'উতায়ক পা পিছলাইয়া পড়ি লেন এবং পায়ে প্রচণ্ড আঘাতপ্রাপ্ত হইলেন। এমন অবস্থায় তিনি পাগড়ী দ্বারা আহত স্থান বাঁধিয়া ফেলিলেন। আঘাতপ্রাপ্ত স্থান কাপড় দ্বারা বাঁধার নিয়ম আজও প্রচলিত রহিয়াছে যাহা সেই প্রাচীন আরবেও যে প্রচলিত ছিল, এই বর্ণনা তাহারই প্রমাণ বহন করে।
(৭) রাসূলুল্লাহ (স)-এর মু'জিযা : পায়ে প্রচণ্ড আঘাত, ব্যথায় খোঁড়াইয়া খোঁড়াইয়া চলিতেছেন আবদুল্লাহ ইবন 'উতায়ক। এই অবস্থায় তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর সকাশে উপস্থিত হইলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার নিকট সমস্ত ঘটনা শুনিলেন এবং তাঁহার পা ছড়াইয়া দিতে বলিলেন। তিনি পা ছড়াইয়া দিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার পায়ে পবিত্র হাত বুলাইয়া দিলেন। ফলে তাঁহার পা সম্পূর্ণ সুস্থ হইয়া গেল। এই ঘটনা রাসূলুল্লাহ (স)-এর অন্যতম মু'জিযা।
(৮) সাহাবীগণ ছিলেন খুবই সচেতন ও বুদ্ধিমান : রাসূলুল্লাহ (স) ছিলেন ইনসানে কামিল বা পরিপূর্ণ মানুষ। তিনি ছিলেন ধীশক্তিসম্পন্ন বিচক্ষণ ব্যক্তি। তাঁহারই তত্ত্বাবধানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছিলেন সাহাবীগণ। যোগ্য সেনাধ্যক্ষের যোগ্য সৈন্য ছিলেন তাঁহারা। এই অভিযানে তাঁহারা সেই বুদ্ধিমত্তার দৃষ্টান্তহীন সাক্ষ্য রাখিয়াছেন। দুর্গের পাহারাদার কোথায় চাবির ছড়া রাখে তাহা সাহাবীদের চক্ষু এড়ায় নাই। তাঁহারা দুর্গের ভিতর সকল ঘরের দরজা বাহির হইতে আটকাইয়া দিলেন। নির্বিঘ্নে অভিযান সমাপ্ত হইল। প্রতিরোধের জন্য তাহাদের কেহই বাহিরে আসিতে পারিল না। আবদুল্লাহ ইবন 'উতায়ক গাধার খোঁয়াড়ে আত্মগোপন করিয়া মোক্ষম সুযোগের অনুসন্ধান করিয়াছেন। বাতি নিভিয়া গেল। রাত্রির গালগল্প শেষ করিয়া সবাই স্ব-স্ব গৃহে ফিরিয়া গেল। তাহার পর শুরু হইল অভিযান। মূলত এই ঘটনাগুলি সাহাবীদের বুদ্ধিমত্তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
(৯) আধুনিক প্রতিরক্ষা পদ্ধতি অবলম্বন : যে কোন বিচারে রাসূলুল্লাহ (স) ছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সেনাধ্যক্ষ। নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা পদ্ধতিতে তিনি অভিনব কৌশল অবলম্বন করিতেন। এইগুলি আধুনিক সমরবিদদিগকে আজও হতবাক করে। সেনাবাহিনীকে কোথাও অবস্থান করিতে হইলে তাহাদের নিরাপত্তা বিধান অপরিহার্য। সেই লক্ষ্যে তিনি তাহাদের মধ্য হইতে দুই-একজনকে পাহারাদার নিযুক্ত করিতেন। এই পদ্ধতি আধুনিক বাহিনীতে অনুসৃত হইয়া থাকে। মহান এই সমরবিদের সংস্পর্শে প্রশিক্ষণ লাভ করিয়াছিলেন তাঁহার প্রিয় সাহাবীগণ। আবু রাফে' হত্যা অভিযানে সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিরাপত্তা পদ্ধতি গ্রহণ করিয়াছিলেন। দিনের বেলায় তাহারা আত্মগোপন করিতেন। তাহাদের মধ্য হইতে এই সময় পালাক্রমে একজনকে তাহারা পাহারাদার নিযুক্ত করিতেন। উদ্দেশ্য হইল প্রতিপক্ষের সম্ভাব্য অনিষ্ট হইতে রক্ষা পাওয়া (ফাতহুল বারী, ৭খ., পৃ. ৪০.০)।
(১০) আনুগত্যের উজ্জল দৃষ্টান্ত: সাহাবীগণ ছিলেন রাসূলুল্লাহ (স)-এর শর্তহীন আনুগত্যের বাস্তব নমুনা। যে কোন পরিস্থিতির মুকাবিলা করিয়াও তাঁহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর আনুগত্যের প্রতি অটল থাকিতেন। আবূ রাফে' হত্যা অভিযানে রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদিগকে মহিলা ও শিশুদিগকে হত্যা করিতে নিষেধ করিয়াছিলেন (ইব্‌ন হিশাম, আস-সীরাহ, ৩খ., পৃ. ১০৯৫)। তাঁহাদের একমাত্র মিশন ছিল আবু রাফে'কে হত্যা করা। তাহার স্ত্রী চিৎকার করিয়া উঠিল। পাছে মিশন অকৃতকার্য হয়, সেইজন্য তাহার চিৎকার বন্ধ করানো ছিল অত্যন্ত জরুরী। তাহাকে থামাইয়া দেওয়ার জন্য তরবারি উপরে উঠান হইল। ইত্যবসরে উক্ত সাহাবীর রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিষেধাজ্ঞা মনে পড়িল। রাসূলুল্লাহ (স)-এর আনুগত্যের জ্বলন্ত উদাহরণ এই সাহাবী এই কঠিন পরিস্থিতিতেও তরবারি নামাইয়া ফেলিলেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00