📄 অভিযানে অংশগ্রহণকারিগণ
এই অভিযানে যাহারা অংশগ্রহণ করিয়াছেন তাহাদের সম্পর্কেও মতভেদ রহিয়াছে (ইবন হিশাম, আস-সীরাহ, ৩খ., পৃ. ১০৯৫; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ১৪০; ফাতহুল বারী, ৭খ., পৃ. ৩৯৬-৩৯৭)। আল-হাকেম-এর মতে, এই অভিযানে পাঁচ ব্যক্তি অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন। এই পাঁচজন কে কে সেই সম্পর্কেও বিভিন্ন মত পাওয়া যায়। তবে বর্ণনাকারিগণ একমত যে, তাহারা ছিলেন খাযরাজ গোত্রের বানূ সালামা উপগোত্রের লোক (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ১৪০; ইবন হিশাম, আস্-সীরাহ, ৩খ., পৃ. ১০৯৫)। এই অভিযানে অংশগ্রহণকারিগণ হইলেন- (১) আবদুল্লাহ ইবন 'উতায়ক ইব্ন মালিক ইব্ন আওস (রা) (ইবন হিশাম, আস-সীরাহ, ৩খ., পৃ. ১০৯৫; 'উমদাতুল কারী, ১৭খ., পৃ. ১৩৫)। কেহ কেহ বলিয়াছেন, তিনি ছিলেন উতায়ক ইনুল হারিছ ইব্ন কায়স ইন্ন হাবাসা ইবন হারিছ ইব্ন উমায়্যা ইব্ন যায়দ ইব্ন মু'আবিয়া ইন্ন মালিক ইব্ন আওফ ইব্ন আমর ইব্ন আওফ ইব্ মালিক ইব্ন আওস আল-আনসারী ('উমদাতুল কারী, ১৭খ., পৃ. ১৩৪)। তিনি উহুদের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন। তিনি ইয়ামামার যুদ্ধে শহীদ হন কিনা সে বিষয়েও মতভেদ রহিয়াছে ('উমদাতুল কারী, ১৭খ., পৃ. ১৩৫)। আল-আসকালানী বলিয়াছেন, তিনি ছিলেন বানু সালামার 'উতায়ক ইব্ন কায়স ইব্ন আসওয়াদ (ফাতহুল বারী, ৭খ., পৃ. ১৩৮)।
এখানে এই ব্যক্তির নাম লইয়া তিনটি বর্ণনা উল্লেখ করা হইয়াছে। তিনি ছিলেন আবদুল্লাহ ইবন 'উতায়ক ইব্ন্ন মালিক, যেমনটি ইন্ন হিশাম ও আল-আয়নী উল্লেখ করিয়াছেন। তিনি ছিলেন 'উতায়ক ইবনুল হারিছ ইন্ন কায়স, যেমনটি আল-আয়নী কেহ কেহ বলিয়াছেন বলিয়া উদ্ধৃতি দিয়াছেন। তিনি ছিলেন 'উতায়ক ইব্ন কায়স ইব্ন আসওয়াদ, যেমনটি বলিয়াছেন আল-'আসকালানী। তবে গ্রহণযোগ্য মত হইল, তাহার নাম 'আবদুল্লাহ ইবন 'আতীক। তিনিই ছিলেন এই অভিযানের দলপতি। যেমন বলা হইয়াছে :
فأمر عليهم رسول الله ﷺ عبد الله بن عتيق.
"রাসূলুল্লাহ (স) আবদুল্লাহ ইবন 'আতীককে তাহাদের আমীর বানাইয়াছিলেন” (বুখারী ৫খ., পৃ. ২১০; ইন হিশাম, ৩খ., পৃ. ১০৯৫)।
(২) মাসউদ ইবন সিনান (রা) (ইবন হিশাম, আস-সীরাহ, ৩খ., পৃ. ১০৯)। তিনি উহুদের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন। তিনি ইয়ামামার যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন (উমদাতুল কারী, ১৭খ., পৃ. ১৩৬; ফাতহুল বারী, ৭খ., পৃ. ৩৯৮)।
(৩) আবদুল্লাহ ইব্ন উনায়স (রা) (ইব্ন হিশাম, আস-সীরাহ, ৩খ., পৃ. ১০৯৫), আল-জুহানী আল-আনসারী (ইবনুল আছীর, আত-তাতিম্মাহ, ১খ., পৃ. ৫৬৪) ইব্ন আস'আদ ইন্ন হারাম ইব্ন হাবীব ইবন আল-বারক ইব্ন ওয়াবরাহ ('উমদাতুল কারী, ১৭খ., পৃ. ১৩৫)। কথিত আছে যে, তাঁহার পরিচয় হইল, আবদুল্লাহ ইব্ন উনায়স ইব্ন আস'আদ ইব্ন হারাম ইব্ন মালিক ইন্ন গানাম ইন্ন কা'ব ইব্ন তামীম ইন্ন নাফাছাহ ইব্ন উনায়স ইব্ যারবু' ইবনুল বারক ইন্ন ওয়াবরাহ (আত-তাতিম্মাহ, ২খ., পৃ. ৫৬৪)। তিনি উহুদ ও পরবর্তী যুদ্ধসমূহে অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন। তিনি ৫৪ হিজরী সনে ইনতিকাল করেন ('উমদাতুল কারী, ১৭খ., পৃ. ১৩৬)।
আল-মুনযিরী অভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন যে, আবদুল্লাহ ইব্ন উনায়স আল-জুহানী ও আবদুল্লাহ ইব্ন উনায়স আল-আনসারী একই ব্যক্তি নন, বরং তাহারা ভিন্ন দুই ব্যক্তি। তাহার দৃষ্টিতে যিনি এই অভিযানে অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন তিনি হইলেন আবদুল্লাহ ইব্ন উনায়স আল-আনসারী, আবদুল্লাহ ইব্ন উনায়স আল-জুহানী নহেন। তবে মুনযিরী ব্যতীত অন্যান্যরা এই দুই নাম একজনেরই বলিয়া মনে করেন (ফাতহুল বারী, ৭খ., পৃ. ৩৯৮)।
(৪) আবুল কাতাদা আল-হারিছ ইব্ন রি'ঈ আবু কাতাদা (রা)। তিনি فارس رسول الله صلى الله عليه وسلم )রাসূলুল্লাহ (স)-এর অশ্বারোহী) বিশেষণে ভূষিত ছিলেন। তাঁহার নাম সম্পর্কে মতভেদ রহিয়াছে। এই প্রসঙ্গে পাঁচটি মত পাওয়া যায়।
ক) হারিছ ইব্ন রি'ঈ ইব্ন বালতা'আ।
খ) বালদামাহ ইব্ন খান্নাস ইবন সিনান ইবন উবায়দ ইব্ন আদী ইব্ন গানাম ইব্ন কা'ব সালামা আল-আনসারী ('উমদাতুল কারী, ১৭খ., পৃ. ১৩৬)।
গ) আন-নু'মান আর-রাবী'
ঘ) আন-নু'মান ইব্ন 'আমর
ঙ) আমর ইবন রাবী' ('উমদাতুল কারী, ১৭খ., পৃ. ১৩৬)।
তিনি ৪০ হিজরীতে ৭০ বৎসর বয়সে ইনতিকাল করেন ('উমদাতুল কারী, ১৭ খ., পৃ. ১৩৬)।
(৫) খুযা'ঈ ইব্ন আসওয়াদ (ইবন হিশাম, আস-সীরাহ, ৩খ., পৃ. ১০৯৫) ইব্ন খুযা'ঈ আল-আসলামী। তিনি আনসারদের সহিত সন্ধিচুক্তিতে আবদ্ধ ছিলেন। ইকলীলের বর্ণনা অনুযায়ী তাঁহার নাম আসওয়াদ ইবন হারাম। তিনি সাহাবী ছিলেন কিনা সেই বিষয়ে মতভেদ রহিয়াছে। ইমাম যাহাবী ও অন্যান্যরা তাঁহাকে সাহাবীদের অন্তর্ভুক্ত করিয়াছেন। আবূ 'উমার তাঁহাকে সাহাবীদের মধ্যে গণ্য করেন নাই (ফাতহুল বারী, ৭খ., পৃ. ৩৯১)। আদ-দালাইলিল বায়হাকীতে তাহার নাম আসওয়াদ ইব্ন খুযা'ঈ না আসওয়াদ ইবন হারাম এই বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা হইয়াছে (আল-'আসকালানী, ৭খ., পৃ. ৩৯৮)। আয-যুহরী উপরোল্লিখিত পাঁচজনের নামই উল্লেখ করিয়াছেন (আত-তাবাকাতুল কুবরা, ২খ., পৃ. ২৯৫)। অন্য বর্ণনামতে এই অভিযানে অংশগ্রহণকারী ছিলেন ছয় জন। উপরিউক্ত পাঁচজনসহ আবদুল্লাহ ইবন 'উতবা। তাঁহার নাম প্রসঙ্গে দুইটি বর্ণনা পাওয়া যায়।
ক) আবু 'আমেরের বর্ণনায় আছে, যিনি আবু রাফে'-এর হত্যার অভিযানে অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন তাঁহার নাম আবদুল্লাহ ইবন 'উতবা আবু কায়স আয-যাকওয়ানী। ইমাম যাহাবীর মতে, তিনি ছিলেন একজন সাহাবী ('উমদাতুল কারী, ১৭খ., পৃ. ১৩৬)।
খ) ইবনুল আছীর বলিয়াছেন, যিনি আবু রাফে'-এর হত্যার অভিযানে অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন তাহার নাম আবূ 'ইনাবাহ আবদুল্লাহ ইব্ন 'ইনাবাহ আল-খাওলানী (আত-তাতিম্মাহ, ২খ., পৃ. ৫৮১)। নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে এই অভিযানে আবূ 'ইনাবাহ নামক সাহাবীর অংশগ্রহণের যে ইঙ্গিত ইবনুল আছীরের বর্ণনায় পাওয়া যায় তাহা কোনক্রমেই ঠিক নয়। কেননা গ্রহণযোগ্য মত অনুযায়ী যাহারা এই অভিযানে অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন তাঁহারা হইলেন আনসারীদের অন্তর্ভুক্ত। পক্ষান্তরে ইন্ন 'ইনাবাহ সর্বসম্মতিক্রমে আনসারী ছিলেন না ('উমদাতুল কারী, ৭খ., পৃ. ৩৯৭)। তাহা ছাড়াও অন্য একটি বর্ণনায় তিনি যে আবদুল্লাহ ইব্ন 'উতবা ছিলেন, সেই বিষয়টি পরিষ্কারভাবে উল্লেখ হইয়াছে।
بعث النبي ﷺ إلى أبي رافع عبد الله بن عتيك وعبد الله بن عتبة وناس معهم.
"রাসূলুল্লাহ (স) আবূ রাফে'-এর নিকট আবদুল্লাহ ইবন 'উতায়ক ও আবদুল্লাহ ইব্ন 'উতবা এবং তাহাদের সহিত কতিপয় লোককে পাঠাইয়াছিলেন”।
উল্লিখিত অভিযানে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা সম্পর্কে এখানে 'পাঁচজন' ও ছয়জন' এই দুইটি মত উল্লেখ করা হইল। এই বিষয়ে তৃতীয় মত এই যে, তাহারা ছিলেন চারজন। যেমন আল-'আসকালানী আল-হাকেম-এর 'আল-ইকলীল' গ্রন্থে উদ্ধৃতি দিয়া উল্লেখ করিয়াছেন যে, এই অভিযানে আবদুল্লাহ ইবন 'আতীক, আবদুল্লাহ ইব্ন উনাস, আবু কাতাদাহ, সন্ধি চুক্তিতে আবদ্ধ তাহাদের এক সাথী ও একজন আনসারী অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন (ফাতহুল বারী, ৭খ., পৃ. ৩৯৬)। সুতরাং এই অভিযানে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা সম্পর্কে যে তিনটি বর্ণনা পাওয়া গেল তাহা হইল চার, পাঁচ ও ছয়জনের। তাহা হইলে নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, এই অভিযানে সর্বনিম্ন চার ও সর্বোচ্চ ছয় ব্যক্তি অংশগ্রহণ করেন।
📄 অভিযানের ঘটনাপ্রবাহ
রাসূলুল্লাহ (স)-এর পক্ষ হইতে অনুমতি লাভের পর আবু রাফে' হত্যা অভিযানে অংশগ্রহণকারিগণ অভিযানের প্রস্তুতি গ্রহণ করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) সমগ্র পৃথিবীর জন্য রহমতস্বরূপ ছিলেন। মহান আল্লাহ বলিয়াছেন:
وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِّلْعَالَمِينَ.
"আমি তোমাকে নিখিল বিশ্বের জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করিয়াছি” (আল-কুরআন, ২১: ১০৭)।
রহমতের এই প্রবাদ পুরুষ নিজের শত্রুর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার সময়ও যাহাতে কোন প্রকার অকল্যাণ কিছু সংঘটিত না হয় সেই বিষয়ে ছিলেন খুবই সচেতন। কাহারও প্রতি যাহাতে সামান্য পরিমাণও যুলুম না হয় তিনি সেইদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখিতেন। তাঁহার এই সুষমা সুন্দর অভ্যাস অনুযায়ী তিনি এই অভিযানে অংশগ্রহণকারীদিগকে যে উপদেশ দিয়াছিলেন তাহা নিম্নরূপ:
ونهاهم أن يقتلوا وليدا أو امرأة
"তিনি তাহাদিগকে শিশু অথবা নারীকে হত্যা করিতে নিষেধ করিয়াছেন" (ইবন হিশাম, আস-সীরাহ, ৩খ., পৃ. ১০৯৫; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ১৪০)।
আবু রাফে' হত্যার অভিযানে অংশগ্রহণকারিগণ যথাযথ প্রস্তুতি গ্রহণ করিলেন। আবূ রাফে' মদীনা মুনাওয়ারা হইতে ১৮৪ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত খেজুরবৃক্ষ সুরভিত খায়বারের এক দুর্গে বাস করিত (পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়, উর্দু দাইরায়ে মা'আরিফ ইসলামিয়া, ৯খ., পৃ. ৬৬)। তাঁহারা খায়বারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হইলেন। এই অভিযানের অন্যতম সৈনিক আবদুল্লাহ ইব্ন 'উতায়ক (রা)-এর ইয়াহুদী দুগ্ধমাতা পূর্ব হইতেই খায়বারে বসবাস করিতেছিলেন। 'আতীয়া ইব্ন আবদুল্লাহ ইবন 'উনায়স (রা) তাহার পিতার সূত্রে বর্ণনা করিয়াছেন, তিনি বলেন:
"আমরা ছিলাম পাঁচজন। আমি, আবদুল্লাহ ইবন 'উতায়ক, আবু কাতাদা, আল-আসওয়াদ ইব্ন খুযাঈ এবং মাস'উদ ইবন সিনান। আমরা খায়বারে আসিয়া উপস্থিত হইলাম। আবদুল্লাহ ইবন 'উতায়ক সেখানে অবস্থানকারিণী তাহার ইয়াহুদী দুগ্ধমাতার নিকট গেলেন। তিনি আমাদের আতিথেয়তার জন্য 'কাবিস' নামক একপ্রকার খেজুর ও রুটি লইয়া আবদুল্লাহ ইব্ন 'উতায়কের সহিত আমাদের নিকট উপস্থিত হইলেন। আমরা তাহার আতিথেয়তা গ্রহণ করিলাম এবং পরিতৃপ্তির সাথে তাহার আনীত খাদ্য খাইলাম। তাহারই অনুরোধে তাহার বাড়ীতে আমরা রাত্রিযাপন করিলাম। যখন সকাল হইল, আবদুল্লাহ ইব্ন 'উতায়ক তাহাকে বলিলেন, আমরা খায়বার দুর্গে যাইতে চাই। আপনি আমাদিগকে সেখানে যাওয়ার ব্যবস্থা করুন। তিনি বলিলেন, তোমরা মুহাম্মাদের শিষ্যত্ব গ্রহণ করিয়াছ। খায়বার দুর্গে তোমাদের প্রতিপক্ষ ইয়াহুদীদের চার হাজার সৈন্য মোতায়েন রহিয়াছে। তোমরা সেখানে সহজে যাইতে পারিবে না। তোমরা কেন সেখানে যাইতে চাও? সেখানে তোমাদের যাওয়ার উদ্দেশ্য কি? আবদুল্লাহ ইবন 'উতায়ক বলিলেন, আমি আবূ রাফে'কে হত্যা করিব। তাহার নিকট পৌঁছিতে যাহারা আমাকে বাঁধা সৃষ্টি করিবে আমি তাহাদিগকেও হত্যা করিব (কিতাবুল মাগাযী, ১খ., পৃ. ৩৯১-৩৯২)।
আবদুল্লাহ ইবন 'উতায়কের দুগ্ধমাতা বলিলেন, ইয়াহুদীগণ খুবই অতিথিপরায়ণ। আগন্তুক অতিথিগণ যাহাতে নির্দ্ধিধায় তাহাদের ঘরে প্রবেশ করিতে পারে সেইজন্য তাহারা তাহাদের ঘরের দরজা রাত্রিতে দরজা রাত্রিতে খুলিয়া রাখে। রাত্র গভীর হইলে যখন সাধারণ মানুষের আনগোনা বন্ধ হইবে, তখন তোমরা সন্তর্পণে নির্বিঘ্নে দুর্গের ভিতর প্রবেশ করিতে পারিবে (কিতাবুল মাগাযী, ১খ., পৃ. ৩৯২)। তিনি তাহাদিগকে পরামর্শ দিলেন, তোমরা আবূ রাফে'-এর জন্য লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে কিছু উপঢৌকন লইয়া যাইবে। তাহা হইলে কেহ তোমাদের ব্যাপারে সন্দেহ করিতে পারিবে না। তোমরা কোন বাধা-বিপত্তি ছাড়াই তাহার গৃহে প্রবেশ করিতে পারিবে (কিতাবুল মাগাযী, ১খ., পৃ. ৩৯২)।
আবু রাফে'-এর বাড়ীটি ছিল দুর্গম দুর্গের ভিতর অবস্থিত (আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৩১৯)। ঘরটি ছিল বেশ উঁচু। খেজুর গাছের সিঁড়ির মাধ্যমেই সেখানে উঠানামা করিতে হইত (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ১৪০)। রাত্রি যখন গভীর হইল তখন দুর্গের অধিবাসীরা তাহাদের স্বস্ব গৃহে প্রত্যাবর্তন করিল। আবদুল্লাহ ইবন 'উতায়ক দারওয়ান দুর্গের যে স্থানে চাবি রাখিয়াছিল সেখান হইতে তাহা সংগ্রহ করিয়া দুর্গের দ্বারা খুলিয়া দিলেন (বুখারী, ৫খ., পৃ. ২১১)। তখন অভিযানে অংশগ্রহণকারিগণ দুর্গে প্রবেশ করিলেন। তাহারা নিরাপত্তার দিকে সজাগ দৃষ্টি রাখিয়া সকল গৃহের দরজা বাহিরের দিক হইতে আটকাইয়া দিলেন যাহাতে কেহ নিজেদের গৃহ হইতে বাহির হইয়া তাহাদের কাজে বাধা সৃষ্টি করিতে না পারে (ইবন হিশাম, আস-সীরাহ, ৩খ., পৃ. ১০৯৫; কিতাবুল মাগাযী, ১খ., পৃ. ৩৯২)।
বুখারী শরীফের বর্ণনা হইতে জানা যায় যে, প্রত্যেক সাহাবী একই সাথে দুর্গে প্রবেশ করেন নাই। সকলকে দুর্গের বাহিরে রাখিয়া শুধু আবদুল্লাহ ইব্ন 'উতায়কই প্রথমে একা দুর্গের ভিতরে প্রবেশ করিয়াছিলেন। তারপর তিনি দরজা খুলিয়া দিলে অন্যান্যরা সেখানে প্রবেশ করেন।
সর্বপ্রথম আবদুল্লাহ ইবন 'উতায়ক দুর্গের বাহির হইতে কিভাবে ভিতর প্রবেশ করা যায়, বিভিন্ন কলাকৌশল প্রয়োগ করিয়া সেই সুযোগ খুঁজিতে লাগিলেন। তিনি এইদিক সেইদিক ঘোরাফেরা করিতেছেন, এমন সময় দুর্গের অধিবাসীরা তাহাদের একটি গাধা হারাইয়া যাইবার কারণে বাতি লইয়া তাহা খুঁজিবার জন্য বাহির হইল। আকস্মিক এই অবস্থায় আবদুল্লাহ ইব্ন 'উতায়ক সতর্কতা অবলম্বন করিলেন। যাহাতে তাহারা তাহাকে চিনিতে না পারে সেইজন্য তিনি মাথা হইতে পা পর্যন্ত কাপড় দ্বারা ঢাকিয়া বসিয়া পড়িলেন (বুখারী, ৫খ., পৃ. ২১০)। তিনি প্রাকৃতিক কার্য সম্পন্ন করিতেছেন ইহা বুঝিয়া তাহারা যেন তাহার নিকট আসিতে লজ্জা পায়, সেইজন্য মূলত তিনি এই ছদ্মবেশ ধারণ করেন। তিনি সফল হইলেন। তাহারা তাঁহাকে দেখিয়াও না দেখার ভান করিয়া চলিয়া গেল। কেহ প্রাকৃতিক কর্ম সারিতেছে ভাবিয়া তাহারা বিষয়টিকে মোটেও গুরুত্ব দিল না। তিনি সুযোগ বুঝিয়া দুর্গের মধ্যে প্রবেশ করিলেন। তাঁহার অন্যান্য সাথীর জন্য তিনি দুর্গ খুলিয়া দিলে অথবা অন্য যে কোন উপায়ে তাঁহারাও দুর্গের মধ্যে ঢুকিয়া পড়িলেন।
আবু রাফে'-এর উঁচু গৃহে উঠানামার জন্য যে খেজুর গাছের সিঁড়ির ব্যবস্থা ছিল, তাঁহারা উহার সাহায্যে উপরে উঠিলেন। যখন দুর্গের অধিবাসীরা আবু রাফে'র মজলিসের নৈশকালীন গল্প-গুজব শেষ করিয়া স্ব-স্ব গৃহে প্রত্যাবর্তন করিল তখন আবদুল্লাহ ইব্ন 'আতীক আবূ রাফে'র গৃহের ভিতরে প্রবেশ করিলেন (বুখারী, ৫খ., পৃ. ২১২)। অন্য বর্ণনামতে, তাঁহারা তাহার গৃহের দরজার নিকট পৌছিলেন। আরবদের নিয়ম-নীতি, যাহা ইসলামী নিয়ম-নীতিও বটে, সেই অনুযায়ী তাঁহারা তাহার গৃহে প্রবেশের জন্য অনুমতি চাহিলেন। আবু রাফে'-এর স্ত্রী বাহির হইয়া আসিল এবং অনুমতিপ্রার্থীদের পরিচয় জানিতে চাহিল। তাঁহারা বলিলেন, আমরা বহু দূর হইতে আসিয়াছি। আমরা নেতা আবু রাফে'-এর সহিত সাক্ষাত করিতে আগ্রহী। আমরা আবু রাফে'-এর জন্য কিছু উপহার-সামগ্রী লইয়া আসিয়াছি (আত-তাবাকাতুল কুবরা, ২খ., পৃ. ২৯৫)। উক্ত মহিলা বলিল, তিনি এইখানেই রহিয়াছেন। আপনারা প্রবেশ করিলেই তাহার সাক্ষাত পাইবেন। তাঁহারা স্বচ্ছন্দে আবু রাফে'-এর গৃহে প্রবেশ করিলেন (ইবন হিশাম, আস-সীরাহ, ৩খ., পৃ. ১০৯৬; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ১৪০)।
ইবন সা'দের বর্ণনায় ঘটনাটি নিম্নরূপ: আবদুল্লাহ ইবন 'উতায়ক ইয়াহুদীদের নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করিয়া আবূ রাফে'-এর ঘরের দরজা খুলিয়া দেওয়ার জন্য নির্ধারিত শব্দ উচ্চারণ করিলেন। আবু রাফে'-এর স্ত্রী তাঁহার পরিচয় জানিতে চাহিল। পরিচয় দান না করিয়া তিনি বলিলেন, আবু রাফে'-এর জন্য কিছু মূল্যবান উপঢৌকন লইয়া আসিয়াছি। উহা পৌঁছানোর জন্য ভিতরে প্রবেশ করিতে চাই ('উমদাতুল কারী, ১৭খ., পৃ. ১৩৭)।
আবদুল্লাহ ইব্ন উনায়স সূত্রে বর্ণিত হইয়াছে, তিনি বলেন, আবু রাফে'-এর স্ত্রী পূর্ব হইতেই আবদুল্লাহ ইব্ন উতায়ককে চিনিত। সে তাঁহার কণ্ঠস্বর শুনিয়া বলিল, হে আবু রাফে'। ইহা তো আবদুল্লাহ ইব্ন 'আতীকের কণ্ঠস্বর। আবু রাফে' বিরক্তিবোধ করিয়া বলিল, তোমার মাতা ধ্বংস ইউক! এইখানে আবার আবদুল্লাহ ইবন 'উতায়ক কোথা হইতে আসিবে! এই কণ্ঠস্বর আবদুল্লাহ ইবন 'উতায়কের নয়, সম্ভবত অন্য কাহারও হইবে (ফাতহুল বারী, ৭খ., পৃ. ৩৯৯)। আবূ রাফে' তাহার স্ত্রীকে বলিল, তুমি দরজা খুলিয়া দাও। কোন সম্মানিত ব্যক্তির দরজা হইতে কাহারও এই রাত্রিতে ফিরিয়া যাওয়া সমীচীন নহে (আল-হায়ছামী, বুয়াতুর রায়িদ, ৬খ., পৃ. ২৯২)। এই পরিস্থিতিতে মহিলাটি দরজা খুলিয়া দিল (ইব্ন হিশাম, আস-সীরাহ, ৩খ., পৃ. ১০৯৬; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ১৪০)। সে দরজা খুলিয়াই আগন্তুকের হাতে অস্ত্র দেখিতে পাইল। ভীত-বিহবল হইয়া সে চিৎকার দেওয়ার উপক্রম করিল। আবদুল্লাহ ইব্ন 'উতায়ক তাহাকে তরবারির মাধ্যমে ইংগিত দান করিয়া চিৎকার করিতে নিষেধ করিলেন। আর আবু রাফে' কেথায় অবস্থান করিতেছে তিনি তাহা তাহার স্ত্রীর নিকট হইতে জানিতে চাহিলেন। এই ব্যাপারে তাহাকে সহযোগিতা না করিলে তিনি তাহাকে হত্যা করিবার ভয়ও দেখাইলেন। মহিলাটি ভীত-সন্ত্রস্ত হইয়া যেই ঘরে আবু রাফে' অবস্থান করিতেছিল তাহা আবদুল্লাহ ইব্ন 'উতায়ককে দেখাইয়া দিল (কিতাবুল মাগাযী, ১খ., পৃ. ৩৯২)। তাঁহারা সকলেই আবূ রাফে'-এর ঘরে প্রবেশ করিলেন। বাহির হইতে যেন কেহ সাহায্য-সহযোগিতা না করিতে পারে সেইজন্য তাঁহারা ভিতর হইতে দরজা এমনভাবে আটকাইয়া দিলেন যাহাতে কোন ব্যক্তি ভিতরে প্রবেশ না করিতে পারে (ইব্ন হিশাম, আস-সীরাহ, ৩খ., পৃ. ১০৯৬)।
ঘরটিতে সূচীভেদ্য অন্ধকার বিরাজ করিতেছিল। আবু রাফে'-এর চেহারা ছিল ধবধবে পরিষ্কার। নিকষ অন্ধকারের মধ্যে তাহার চেহারা জ্বলজ্বল করিতেছিল। এই প্রসঙ্গে আবদুল্লাহ ইবন উনায়স (রা) বলেন, আমার দৃষ্টিশক্তি ছিল খুবই দুর্বল। আমি রাত্রিতে তেমন দেখিতে পাইতাম না। তাহার পরও যখন আবূ রাফে'-এর দিকে মনোবিবেশ করিলাম তাহার চেহারা অন্ধকারের মধ্যে জ্বলজ্বল করিয়া জ্বলিতে দেখিলাম (কিতাবুল মাগাযী, ১খ., পৃ. ৩৯৩)।
সাহাবীগণ কালবিলম্ব না করিয়া আবু রাফে'-এর উপর তরবারি লইয়া ঝাঁপাইয়া পড়িলেন। তাহার স্ত্রী আকস্মিক এই ঘটনায় ভীত হইয়া চিৎকার করিয়া উঠিল (কিতাবুল মাগাযী, ১খ., পৃ. ৩৯২)। তাহাকে উচিৎ শিক্ষা দেওয়ার জন্য সাহাবীগণ তাহাকে হত্যা করিতে উদ্যত হইলেন। পরক্ষণে তাহাদের রাসূলুল্লাহ (স)-এর উপদেশ স্মরণ হইল। রাসূলুল্লাহ (স) নারী হত্যাকে নিষিদ্ধ করিয়াছেন। তাঁহারা আবু রাফে'-এর স্ত্রীকে কিছুই বলিলেন না। তাঁহারা আবু রাফে'কে তরবারি আঘাত করিলেন। আবদুল্লাহ ইব্ন উনায়স (রা) তাহার পেটে তরবারি ঢুকাইয়া তাহার পেট দ্বিফোড় করিয়া ফেলিলেন। তরবারি তাহার হাড়ে যাইয়া বাধাপ্রাপ্ত হইল। তিনি হাড়ে তরবারির আঘাতের শব্দ শুনিতে পাইলেন (ফাতহুল বারী, ৭খ., পৃ. ৩৯৯; কিতাবুল মাগাযী, ১খ., পৃ. ৩৯৩)। ইহার পর আবদুল্লাহ ইব্ন উনায়সের অন্যান্য সাথীরাও তাহাকে আঘাত করিলেন (কিতাবুল মাগাযী, ১খ., পৃ. ৩৯৩)। আবূ রাফে' আঘাতের যন্ত্রণায় আহা আহা করিয়া কাতরাইতে শুরু করিল। সে এই আঘাত নিহত হইবে এই আশা লইয়া সাহাবীগণ (রা) তাহার ঘর ত্যাগ করিলেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ১৪০; ইন্ন হিশাম, আস-সীরাহ, ৩খ., পৃ. ১০৯৬)।
স্থান ত্যাগের সময় আবু কাতাদা সেখানে ভুল করিয়া তাহার তীর ফেলিয়া আসিয়াছিলেন। যখন তাহার মনে পড়িল তখন তিনি পুনরায় উক্ত তীর আনিতে চাহিলেন। আসন্ন কোন বিপদের ভয়ে তাঁহার সাথীরা তাঁহাকে পুনরায় সেখানে যাইতে নিষেধ করিলেন। তিনি ছিলেন খুবই সাহসী। তাই তিনি ভয়ভীতিকে উপেক্ষা করিয়া পুনরায় ঘটনাস্থল গমন করিলেন এবং ভুলে ফেলিয়া আসা তীরটি লইয়া ফিরিয়া আসিলেন (কিতাবুল মাগাযী, ১খ., পৃ. ৩৯৩)।
তাঁহারা এই সময় সকলে মিলিয়া নিরাপদ দূরত্বে যাইবার জন্য রওয়ানা হইলেন। দলপতি আবদুল্লাহ ইব্ন 'উতায়ক (রা) ছিলেন দুর্বল দৃষ্টিসম্পন্ন। তিনি সিঁড়ি দিয়া নামিতে পথ ভালভাবে দেখিতে পাইলেন না। সেইজন্য সিঁড়ি দিয়া নামিতে যাইয়া তিনি হঠাৎ পড়িয়া গেলেন এবং পায়ে প্রচণ্ড আঘাত পাইলেন। ব্যথায় তিনি আর হাঁটিতে পারিলেন না। তাঁহার সাথীরা তাঁহাকে কাঁধে বহন করিয়া নিরাপদ দূরত্বে পৌঁছাইলেন। সেই স্থানে তাঁহারা আত্মগোপন করিয়া অপেক্ষা করিতে লাগিলেন (ইন্ন হিশাম, আস-সীরাহ, ৩খ., পৃ. ১০৯৬)। যতক্ষণ পর্যন্ত তাহারা আবূ রাফে'-এর মৃত্যু সম্পর্কে নিশ্চিত না হইবেন ততক্ষণ এই স্থান ত্যাগ না করিবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিলেন।
ইতোমধ্যে গুপ্ত ঘাতক কর্তৃক আবু রাফে'-এর মারাত্মক আহত হইবার সংবাদ বিদ্যুতবেগে দুর্গের মধ্যে ছড়াইয়া পড়িল। দুর্গের অধিবাসীদের মধ্যে ভীষণ তোলপাড় শুরু হইল। কিন্তু পূর্ব হইতেই সাহাবীগণ দুর্গের ভিতরের সকল ঘরের দরজা বাহির হইতে আটকাইয়া দেওয়ার কারণে দীর্ঘক্ষণ যাবত কেহ বাহিরে আসিতে পারিল না। অবশেষে তাহারা দরজা খুলিয়া ফেলিল। যখন তাহারা আবু রাফে'-এর নিকট সমবেত হইল তাহার স্ত্রী বলিল, এই তো কিছুক্ষণ হইল মাত্র, ঘাতকরা আঘাত হানিয়া পলাইয়া গিয়াছে। আল-হারিছ আবূ যায়নাব নামক এক ব্যক্তি তিন হাজার সৈন্য লইয়া ঘাতকদের খোঁজে বাহির হইল। অনেক খোঁজাখুঁজি করিয়া কাহাকেও না পাইয়া ব্যর্থ হইয়া তাহারা পুনরায় দুর্গে ফিরিয়া গেল (কিতাবুল মাগাযী, ১খ., পৃ. ৩৯৩; আত-তাবাকাতুল কুবরা, ২খ., পৃ. ২৯৫)। অন্য বর্ণনায় আসিয়াছে, দুর্গের অধিবাসীরা নিজেরাই আগুনের মশাল লইয়া সম্ভাব্য জায়গাগুলিতে ঘাতকদের খুঁজিয়া ফিরিল। কাহাকেও না পাইয়া তাহারা বিফল মনোরথ হইয়া আহত আবূ রাফে'-এর নিকট ফিরিয়া গেল (ইন্ন হিশাম, আস-সীরাহ, ৩খ., পৃ. ১০৯৬; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ১৪৯)। তাহারা আবু রাফে'-এর স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করিল, সে কি কোন ঘাতককে চিনিতে পারিয়াছে? সে বলিল, আমি তাহাদের মধ্যে আবদুল্লাহ ইবন 'উতায়কের কথা শুনিয়াছি (কিতাবুল মাগাযী, ১খ., পৃ. ৩৯৩)।
আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলের এই দুশমনের মৃত্যুসংবাদ নিশ্চিত হইবার জন্য আসওয়াদ ইব্ন খুযা'ঈ (রা) পুনরায় অত্যন্ত সতর্কতার সহিত দুর্গের মধ্যে প্রবেশ করিলেন। তিনি আবূ রাফে'-এর আশেপাশে সমবেত লোকজনের সাথে এমনভাবে মিশিয়া গেলেন যে, কেহ তাঁহাকে চিনিতে পারিল না। এমনকি সামান্য সন্দেহ পর্যন্ত করিল না। তিনি আবু রাফে'-এর স্ত্রী ও অন্যান্য ইয়াহুদীদিগকে তাহার পাশে অবস্থান করিতে দেখিলেন। তিনি আরও দেখিলেন, তাহার স্ত্রীর হাতে একটি বাতি শোভা পাইতেছে। সে অত্যন্ত বিষণ্ণ মনে নিষ্প্রাণ স্বামীর মুখমণ্ডলের দিকে তাকাইয়া রহিয়াছে। সে অত্যন্ত আবেগ জড়িত কণ্ঠে ইয়াহুদীদের 'উদ্দেশ্যে বলিতে লাগিল, আল্লাহ্র শপথ! আমি ইবন 'উতায়কের কণ্ঠস্বর শুনিয়াছি। আমি কিন্তু মোটেও মিথ্যা বলিতেছি না। আসওয়াদ মহিলার কণ্ঠে এই কথা শুনিয়া নিজেই ইয়াহুদীদের সন্দেহ দূর করিবার জন্য বলিলেন, ইহা একটি বাজে কথা। এখানে ইব্ন 'আতীক কোন স্থান হইতে আসিবেন? মূলত এই কথা দ্বারা ইবন 'উতায়কের এইখানে আসার সম্ভাবনাকে তিনি নাকচ করিয়া দিলেন। মহিলাটি আবু রাফে-এর আরও নিকটে উপস্থিত হইল। সে তাহার মুখমণ্ডল বিচক্ষণতার সহিত পর্যবেক্ষণ করিয়া আবেগ জড়িত কণ্ঠে বলিয়া উঠিল, ইয়াহুদীদের ইলাহার শপথ (ইব্ন হিশাম, আস-সীরাহ, ৩খ., পৃ. ১০৯৬-১০৯৭; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ১৪০)! মূসার ইলাহার শপথ। (কিতাবুল মাগাযী, ১খ., পৃ. ৩৯৪) সে মৃত্যুবরণ করিয়াছে।
এই পরিস্থিতিতে আবূ রাফে'-এর মৃত্যুসংবাদই ছিল আসওয়াদ ইব্ন খুযাঈ (রা)-এর নিকট সর্বাপেক্ষা প্রিয় বিষয়। তিনি আনন্দের আতিশয্যে উল্লসিত হইয়া আবু রাফে'-এর মৃত্যুসংবাদ লইয়া নিজের সাথীদের নিকট ফিরিয়া আসিলেন (ইবন হিশাম ৩খ., পৃ. ১০৯৮; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ১৪০)। আবদুল্লাহ ইব্ন 'উনায়স (রা) আসওয়াদ (রা)-এর নিকট হইতে এই সংবাদ শুনিবার পর আরও নিশ্চিত হইবার জন্য নিজেই পুনরায় দুর্গে প্রবেশ করিলেন। তিনি আবু রাফে'-এর স্পন্দনহীন নিথর দেহ পড়িয়া থাকিতে দেখিয়া তাহার মৃত্যু সম্পর্কে নিশ্চিত হইয়া সাথীদের নিকট ফিরিয়া আসিলেন (কিতাবুল মাগাযী, ১খ., পৃ. ৩৯৪)।
📄 অভিযানে অংশগ্রহণকারীদের মদীনায় প্রত্যাবর্তন
মহান আল্লাহর অপার করুণায় কোন সমস্যা ছাড়াই এই অভিযান সমাপ্ত হইল। ইসলামের ঘোর শত্রু আবু রাফে' হত্যা মিশন সফল হইল। এই অভিযানে অংশগ্রহণকারী সকল সাহাবী মদীনা মুনাওয়ারার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হইলেন। তাঁহারা দুই দিন অপেক্ষা করিলেন। যখন শত্রুদের খোঁজাখুঁজি বন্ধ হইল তখন তাঁহারা রওয়ানা হইলেন (আত-তাবাকাতুল কুবরা, ২খ., পৃ. ২৯৫)। শত্রুপক্ষের অনিষ্ট হইতে নিরাপদ থাকিবার জন্য তাঁহারা অত্যন্ত সতর্কতার সহিত পথ চলিতেন। তাঁহারা রাত্রির অন্ধকারে পথ অতিক্রম করিতেন আর দিনের বেলায় লোকচক্ষুর অন্তরালে অত্যন্ত সন্তর্পণে লুকাইয়া থাকিতেন। তাঁহারা পালাক্রমে একজন করিয়া নিরাপত্তা প্রহরীর দায়িত্ব পালন করিতেন। উক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত সাহাবী কোন সমস্যার মুখামুখী হইলে অথবা কোন সন্দেহ ও সংশয়পূর্ণ কিছু দেখিলে সাথে সাথে অন্যদিগকে সতর্ক করিতেন। এইভাবে তাঁহারা মদীনার নিকট পৌছিলেন। হযরত 'আবদুল্লাহ ইব্ন উনায়স বলেন, 'আমরা মদীনা মুনাওয়ারায় পৌঁছিবার কিছু পূর্বে নিরাপত্তামূলক পাহারার দায়িত্বের পালা আমার উপরই অর্পিত হইয়াছিল। আমি শত্রুদের আনাগোনা অনুমান করিলাম এবং সাথে সাথে আমার সাথীদিগকে সতর্ক করিলাম। তাঁহারা পূর্বাপেক্ষা আরও সতর্ক অবস্থায় পথ চলিতে লাগিলেন। আমি তাঁহাদের পিছনে পিছনে অবস্থা পর্যবেক্ষণ করিতে করিতে অগ্রসর হইতেছিলাম। কিছুক্ষণ পর আমিও তাহাদের সহিত মিলিত হইলাম। আমরা এইভাবে পথ চলিতে চলিতে মদীনা মুনাওয়ারায় পৌছাইয়া গেলাম (ফাতহুল বারী, ৭খ., পৃ. ৪০০)।
📄 একটি অলৌকিক ঘটনা
'আবদুল্লাহ ইবন 'উতায়কের দৃষ্টিশক্তি দুর্বল হইবার কারণে তিনি পড়িয়া যান এবং পায়ে আঘাতপ্রাপ্ত হন। তিনি প্রাথমিক পর্যায়ে প্রচণ্ড ব্যথার কারণে হাঁটিতে পারিতেছিলেন না। এক বর্ণনামতে, অল্প সময়ের ব্যবধানে এই পা এমনভাবে ভাল হইয়া গেল যে, তিনি সারা জীবন ঐ পায়ে আর কখন কোন সমস্যা অনুভব করেন নাই। এই প্রসঙ্গে তিনি নিজেই বলেন:
فلما كان في وجه الصبح صعد الناعية فقال انعى أبا رافع قال فقمت أمشي ما بي قلبة.
"যখন প্রভাত হইল, মৃত্যুর সংবাদ ঘোষণাকারী উপরে উঠিল এবং বলিল, আমি আবূ রাফে'-এর মৃত্যুসংবাদ ঘোষণা করিতেছি। আমি (আবদুল্লাহ) আমি তখন দাঁড়াইলাম এবং কোন ব্যথা অনুভূত হইল না” (বুখারী, ৫খ., পৃ. ২১৩)।
অপর বর্ণনায় আছে, তিনি প্রচণ্ড ব্যথা লইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর সমীপে উপস্থিত হইলে তাহার পায়ে রাসূলুল্লাহ (স) হাত বুলাইয়া দিলেন এবং তাহা সুস্থ হইয়া গেল। যেমন তিনি বলিয়াছেন:
فانتهيت إلى النبي ﷺ فحدثته فقال لى ابسط رجلك فبسطت رجلي. فمسحها فكأنها لم أشتكها قط.
"আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট পৌঁছিয়া তাঁহাকে সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করিলাম। তিনি বলিলেন, তোমার পা বিছাইয়া দাও। আমি আমার পা বিছাইয়া দিলাম, তিনি তাহার উপর হাত বুলাইয়া দিলেন। ইহাতে পা এমন সুস্থ হইয়া গেল যে, কোন সমস্যাই হয় নাই" (সাহীহুল বুখারী, ৫খ., পৃ. ২১১)।
উপরে উল্লিখিত প্রথম বর্ণনায় 'আবদুল্লাহ ইবন 'উতায়কের আঘাতপ্রাপ্ত পা রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত সাক্ষাতের পূর্বেই ভাল হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায় যাহা মূলত দ্বিতীয় বর্ণনার সহিত বাহ্যিক সাংঘর্ষিক মনে হয়। কেননা দ্বিতীয় বর্ণনায় তাঁহার পা রাসূলুল্লাহ (স)-এর স্পর্শে সুস্থ হইবার প্রমাণ পাওয়া যায়। উভয় বর্ণনার মধ্যে এইভাবে সমন্বয় সাধন করা সম্ভব যে, তিনি পায়ে ব্যথা পাইবার পর অভিযানের কাজ সম্পন্ন করা লইয়া শারীরিক ও মানসিক দিক দিয়া এত বেশী পেরেশানীতে ছিলেন যে, পায়ে ব্যথাটুকু উপলব্ধি পর্যন্ত করেন নাই। মহান আল্লাহর নিকৃষ্টতম শত্রুকে নিশ্চিহ্ন করিবার জিহাদে স্বয়ং আল্লাহ তাহার পায়ের ব্যথা ভুলিয়া থাকিবার ব্যবস্থা করিয়া দিয়াছিলেন। ইহার পর যখন তিনি তাঁহার উপর অর্পিত গুরুদায়িত্ব পালন করিয়া মানসিক প্রশান্তি লাভ করিলেন এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট ফিরিয়া আসিলেন তখন পূর্বোক্ত ব্যথা পুনরায় অনুভূত হইল। তিনি বিষয়টি মহানবী (স)-এর নিকট পেশ করিলেন। তিনি তাঁহার আঘাতপ্রাপ্তস্থান হাত দ্বারা স্পর্শ করিলেন। মহান আল্লাহর অফুরন্ত কুদরতে তাঁহার পাটি পরিপূর্ণ ত্রুটিমুক্ত হইয়া সুস্থতা লাভ করিল। সুতরাং উভয় বর্ণনায় কোন বৈপরীত্য নাই বলিয়াই প্রতীয়মান হয়।