📄 বুখারী শরীফের বর্ণনায় আলোচ্য ঘটনা
ইমাম বুখারী (র) তাঁহার সাহীহ গ্রন্থে আল-মাগাযী অধ্যায়ে সাল্লাম ইব্ন আবিল হুকায়কের হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করিয়া একটি পরিচ্ছেদ রচনা করিয়াছেন। উহা এই অধ্যায়ের ষষ্ঠদশ পরিচ্ছেদ। তাহার শিরোনাম হইল: باب قتل أبي رافع عبد الله بن أبي الحقيق ويقال سلام بن أبي الحقيق كان بخيبر ويقال في حصن له بأرض الحجاز وقال الزهرى هو بعد كعب بن الأشرف.
"খায়বারে অবস্থানরত সাল্লাম ইব্ন আবিল হুকায়ক নামে পরিচিত আবু রাফে' আবদুল্লাহ ইব্ন আবিল হুকায়ক-এর হত্যা সম্পর্কিত পরিচ্ছেদ। কথিত আছে যে, হিজায ভূখণ্ডে তাহার একটি দুর্গ ছিল। যুহরী বলিয়াছেন, এই ঘটনা কা'ب ইব্ন আশরাফের হত্যাকাণ্ডের পরে সংঘটিত হইয়াছিল” (বুখারী، ৫খ.، পৃ. ২১০)۔
ইমাম বুখারী (র) এই পরিচ্ছেদে তিনটি হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন। হাদীছ তিনটি ভিন্ন ভিন্ন সনদে বর্ণিত হইলেও এইগুলিতে উল্লিখিত ঘটনাপ্রবাহ ও এইগুলির বর্ণনাকারী একইজন। তবে শব্দের কিছুটা পার্থক্য রহিয়াছে। উল্লিখিত এই তিনটি হাদীছের মধ্যে দুইটি কিছুটা বিস্তৃত। একটি হাদীছ নিম্নে উদ্বৃত হইল: عن البراء بن عازب قال بعث رسول الله ﷺ إلى أبي رافع اليهودي رجالا من الأنصار فأمر عليهم عبد الله بن عتيك وكان أبو رافع يؤذى رسول الله ﷺ ويعين عليه وكان في حصن له بأرض الحجاز فلما دنوا منه وقد غربت الشمس وراح الناس بسرحهم فقال عبد الله لأصحابه اجلسوا مكانكم فأنى منطلق ومتلطف للبواب لعلى أن أدخل فأقبل حتى دنا من الباب ثم تقنع بثوبه كأنه يقضى حاجة وقد دخل الناس فهتف به البواب يا عبد الله إن كنت تريد أن تدخل فادخل فإني أريد أن اغلق الباب فدخلت فكمنت فلما دخل الناس أغلق الباب ثم علق الأغاليق على وتد قال فقمت إلى الأقاليد فأخذتها ففتحت الباب وكان أبو رافع يسمز عنده وكان في علالي له فلما ذهب عنه أهل سمره صعدت إليه فجعلت كلما فتحت بابا أغلقت على من داخل قلت إن القوم لو نذروا بي لم يخلصوا إلى حتى أقتله فانتهيت إليه فإذا هو في بيت مظلم وسط عياله لا أدرى أين هو من البيت فقلت يا أبا رافع فقال من هذا فأهويت نحو الصوت فأضربه ضربة بالسيف وأنا دهش فما أغنيت شيئا وصاح فخرجت من البيت فأمكث غير بعيد ثم دخلت إليه فقلت ما هذا الصوت يا أبا رافع فقال لأمك الويل إن رجلا في البيت ضربني قبل بالسيف قال فأضربه صربة اثخنته ولم أقتله ثم وضعت ضبيب السيف في بطنه حتى أخذ في ظهره فعرفت أني قتلته فجعلت أفتح الأبواب باباً باباً حتى انتهيت إلى درجة له فوضعت رجلى وأنا أرى أني قد انتهيت إلى الأرض فوقعت في ليلة مقمرة فانكسرت ساقی فعصبتها بعمامة ثم انطلقت حتى جلست على الباب فقلت لا أخرج الليلة حتى أعلم اقتلته فلما صاح الديك قام الناعي على السور فقال أنعى أبا رافع تاجر أهل الحجاز فانطلقت إلى أصحابي فقلت النجاء فقد قتل الله أبا رافع فانتهيت إلى النبي ﷺ فحدثته فقال لى ابسط رجلك فبسطت رجلي. فمسحها فكأنها لم اشتكها قط.
"আল-বারা'আ ইব্ন 'আযিব (রা) বলেন، "আবু রাফে' ইয়াহুদীকে হত্যা করিবার জন্য রাসূলুল্লাহ (স) আনসারদের মধ্য হইতে কিছু লোককে পাঠাইলেন এবং আবদুল্লাহ ইন্ন 'আতীককে তাহাদের দলপতি নিয়োগ করিলেন। আবু রাফে' রাসূলুল্লাহ (স)-কে কষ্ট দিত এবং তাঁহার শত্রুপক্ষকে সাহায্য করিত। হিজাযে তাহার একটি দুর্গ ছিল এবং সে সেখানে অবস্থান করিত। যখন তাহারা এই দুর্গের নিকট পৌছাইল তখন সূর্য ডুবিয়া গিয়াছিল এবং জনগণ তাহাদের গৃহপালিত পশু চরানোশেষে স্বগৃহে প্রত্যাবর্তন করিতেছিল। এই অবস্থায় দলপতি আবদুল্লাহ তাহার সঙ্গীদিগকে বলিলেন، আপনারা আপনাদের স্থানে বসিয়া থাকুন। আমি যাইতেছি এবং দুর্গের পাহারাদারদের কাছে ঘুরিয়া-ফিরিয়া দুর্গের মধ্যে প্রবেশ করিতে পারি কিনা দেখি। তিনি দরজার নিকট পৌছিয়া ও নিজেকে কাপড় দ্বারা ঢাকিয়া প্রাকৃতিক প্রয়োজন সম্পন্ন করিবার অবস্থায় বসিয়া পড়িলেন। দুর্গের অধিবাসীরা ভিতরে প্রবেশ করিল। সেই সময়ে দারওয়ান (আমাকে দেখিয়া) চিৎকার করিয়া বলিলেন، হে আল্লাহর বান্দা! আমি দরজা বন্ধ করিব। তুমি চাহিলে ভিতরে প্রবেশ কর। অতএব আমি ভিতরে প্রবেশ করিলাম এবং আত্মগোপন করিয়া রহিলাম। যখন সকলেই প্রবেশ করিল، সে দরজা বন্ধ করিয়া দিল এবং চাবি একটি পেরেকে ঝুলাইয়া রাখিল। তিনি বলেন، আমি چাবির ছড়ার দিকে গেলাম ও তাহা লইয়া দরজা খুলিয়া রাখিলাম। এ সময় আবু رافع-এর কামরায় নৈশ আলাপ চলিতেছিল। যাহারা তাহার সেখানে কথাবার্তা বলিতেছিল যখন তাহারা চলিয়া গেল، আমি উপরে উঠিয়া প্রতিটি দরজাই খুলিলাম এবং সবকটি দরজাই ভিতর হইতে বন্ধ করিয়া দিলাম। আমি মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম، যদি তাহারা আমার সম্পর্কে অবহিত হয় তাহা হইলে আমার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণের পূর্বেই আমি তাহাকে হত্যা করিব। আমি ابو رافع-এর কাছে পৌছিলাম। অনুমান করিলাম যে، সে একটি অন্ধকার কক্ষে তাহার পরিবার-পরিজন বেষ্টিত হইয়া অবস্থান করিতেছে। অন্ধকারের কারণে সে কক্ষে কোন স্থানে (অবস্থান করিতেছে) তাহা দেখিতে পাইতেছিলাম না। আমি ابو رافع' বলিয়া তাহাকে ডাকিলাম। সে প্রতিউত্তরে বলিল، কে؟ আমি তাহার কণ্ঠের শব্দকে অনুমান করিয়া লক্ষ্যবস্তুতে তরবারির আঘাত হানিলাম। আমি এই অবস্থায় খুব বিচলিত ছিলাম। আমার এই আঘাত ফলপ্রসূ হইল না। সে চিৎকার ছাড়িল। আমি ঘর হইতে বাহির হইলাম এবং নিকটেই অবস্থান গ্রহণ করিলাম। আমি পুনরায় তাহার নিকট প্রবেশ করিলাম এবং বলিলাম، হে ابو رافع'۔ এই শব্দটি কিসের؟ সে বলিল، তোমার মায়ের জন্য ধ্বংস অনিবার্য হউক، ঘরের মধ্যে একজন পুরুষ এই মুহূতে আমাকে তরবারির আঘাত করিয়াছে। তিনি (ইহা শুনিয়া) বলিলেন، আমি তাহাকে আরও একটি আঘাত করিলাম। আমি এই আঘাতে তাহাকে পরিপূর্ণভাবে হত্যা করিতে পারিলাম না। ইহার পর তরবারির তীক্ষ্ণ মাথা তাহার পেটে বসাইয়া দিলাম যাহা তাহার পিঠ দিয়া বাহির হইয়া গেল। তখন আমি বুঝিতে পারিলাম যে، আমি তাহাকে নিশ্চিত হত্যা করিতে পারিয়াছি। ইহার পর আমি প্রতিটি দরজা এক এক করিয়া খুলিতে খুলিতে সিঁড়ি পর্যন্ত পৌঁছাইলাম এবং সিঁড়ি বাহিয়া মাটির নিকট আসিয়া পড়িয়াছি মনে করিয়া চাঁদনী রাত হওয়া সত্ত্বেও লক্ষ্যভ্রষ্ট হইয়া পড়িয়া গেলাম। আমার পায়ের হাড় ভাঙ্গিয়া গেল। আমি আমার পা পাগড়ী দ্বারা বাধিয়া লইয়া হাঁটা শুরু করিলাম এবং (দুর্গের শেষ) দরজার কাছে আসিয়া বসিয়া রহিলাম। আমি (মনে মনে) বলিতে লাগিলাম، ابو رافع'কে নিশ্চিত হত্যা করিয়াছি، এই খবর যতক্ষণ জানিতে পারিব না ততক্ষণ এই স্থান হইতে বাহির হইব না। ইহার পর যখন মোরগ ডাকা শুরু করিল তখন মৃত্যু সংবাদ ঘোষণাকারী পাঁচিলের উপরে উঠিল এবং ঘোষণা করিল، "আমি হিজازের ব্যবসায়ী ابو رافع-এর মৃত্যুসংবাদ ঘোষণা করিতেছি"۔ আমি এই কথা শুনিয়া আমার সঙ্গীদের নিকট ফিরিয়া গেলাম এবং বলিলাম، তাড়াতাড়ি এই স্থান ত্যাগ করুন، আল্লাহ ابو رافع-এর হত্যা নিশ্চিত করিয়াছেন। আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর কাছে পৌছিলাম এবং সমস্ত ঘটনা তাঁহাকে বর্ণনা করিলাম। তিনি আমার পা বিছাইয়া দিতে বলিলে আমি তাহা বিছাইয়া দিলাম। তিনি হাত বুলাইয়া দিলেন। ফলে পা এমন সুস্থ গেল যে، আমি যেন কখনও এই পায়ের ব্যথা অনুভব করি নাই” (সحیح البخاری، ۵خ.، পৃ. ২০-২১، নং ৪০৩৯)۔
📄 রাসূলুল্লাহ (স) কর্তৃক হত্যার অনুমতি দান
রাসূলুল্লাহ (س) মদীনা মুনাওয়ারাতে হিজরত করিবার পূর্বে এখানকার প্রভাবশালী দুই গোত্র আওস ও খাযরাজ-এর মধ্যে তিক্ত সম্পর্ক বিরাজ করিতেছিল। তাহারা পরস্পর যুদ্ধ-বিগ্রহে আকণ্ঠ নিমজ্জিত ছিল। ইসলামের অমীয় সুধা পান করিবার পর তাহারা ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হইল এবং কাঁধে কাঁধ মিলাইয়া আল্লাহ্র এই জীবনবিধানকে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জানবাজি লাগাইয়া প্রচেষ্টা শুরু করিল। মহান আল্লাহ্র সন্তুষ্টি লাভে উভয় গোত্র প্রতিযোগিতামূলক মন লইয়া কাজ করিতে লাগিল। আওস গোত্রের লোকেরা ইসলামের জন্য কোন ভাল কাজ করিলে খাযরাজ গোত্রের লোকেরা ঐরূপ অথবা উহা অপেক্ষা আরও ভাল কাজ করিবার জন্য কোমর বাঁধিয়া লাগিয়া যাইত (ইবন হিশাম، ৩খ.، পৃ. ১০৯৫؛ فتحول باری، ৭খ.، পৃ. ৩৯৭؛ أل-بیدیہ وآن-نیہایہ، ৩খ.، পৃ. ১৩৯-১৪۰)۔
আওস গোত্রের মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা ইব্ن সালামা ইب ن خالیদ (را) মহান আল্লাহ، রাসূলুল্লাহ (س) و ইসলামের বিরুদ্ধে রচিত জঘন্য ব্যঙ্গ কবিতার কবি ইয়াহুদী দলনেতা کا'ب ইব ন আশরাফকে হত্যা করেন (আল-'আইनी، ১৭খ.، পৃ. ১৩২)۔ আওس গোত্রের এই উত্তম কাজের প্রতিযোগিতায় অন্য উত্তম কাজ করিবার লক্ষ্যে خازراز গোত্রের লোকেরা রাসূলুল্লাহ (س)-এর নিকট সমবেত হইল। তাহারা کا'ب-এর মত ইসলামের আর এক নিকৃষ্টতম শত্রু খায়বারের ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ইয়াহুদী নেতা ابو রাফে'কে হত্যা করিয়া সত্য প্রতিষ্ঠা প্রতিযোগিতায় সমপর্যায়ে অবদান রাখিবার চিন্তা করিল। বিষয়টি রাসূলুল্লাহ (س)-এর অনুমতি সাপেক্ষেই সম্পাদন করা সম্ভব। সেইজন্য তাহারা তাঁহার নিকট ইসলামের এই নিকৃষ্টতমশত্রু খায়বারে বসবাসরত ابو راফে' আবদুল্লাহ ইব্ن ابیل حکیکকে হত্যা করিবার জন্য অনুমতি প্রার্থনা করিল। আল্লাহ্র এই ঘৃণিত পাপিষ্ঠ দুশمنকে ইসলামের স্বার্থে হত্যা করা ছিল খুবই জরুরী। রাসূলুল্লাহ (س) এই সত্য উপলব্ধি করিলেন এবং তাহাকে হত্যা করিবার জন্য خازراز গোত্রকে অনুমতি দান করিলেন (ابن ہشام، آس-سیرۃ آن-نابابیہ، ۳খ.، পৃ. ۱۰۹۵؛ أل-بیدیہ وآن-نیہایہ، ۳খ.، পৃ. ۱۴۰)۔
📄 হত্যা অভিযানের সময়কাল
এই হত্যা অভিযান কোন্ সময় অনুষ্ঠিত হয় সেই বিষয়ে মতভেদ রহিয়াছে। কা'ب ইবন আশরাফের হত্যাকাণ্ডের পরে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হইয়াছিল" (বুখারী، ৫খ.، পৃ. ২১০)۔ ইমাম যুহরী (ر)-এর মতে، এই হত্যাকাণ্ড অনুষ্ঠিত হয় তৃতীয় ہجری کے رمضان مہینے میں ('اومداۃ القاری، ۱۷خ.، পৃ. ۱۳৪)۔ কিছু লোক कहते हैं कि यह मہم تیسری ہجری کے رجب مہینے میں چلی تھی ('اومداۃ القاری، ۱۷خ.، পৃ. ۱۳৪؛ فتح الباری، ۷خ.، পৃ. ۳۹۷)۔ الواقدی کے مطابق، اس قتل میں حصہ لینے والے ہجرت کے 45 ماہ بعد، ذوالحجہ کے چوتھے دن پیر کی رات مدینہ سے نکلے۔ انہوں نے اس مہم کو چلانے میں دس دن گزارے۔ (كتاب المغازی، ۱خ.، ص. ۳۹۱)۔ اس روایت سے یہ معلوم ہوتا ہے کہ یہ مہم چوتھی ہجری کے آخر میں، ذوالحجہ کے مہینے میں چلائی گئی تھی۔ تاہم، العینی نے الواقدی سے ایک اور روایت نقل کی ہے، جس میں الواقدی نے اس واقعہ کو چھٹی ہجری میں ہونے کی رائے دی ہے۔ ('اومداۃ القاری، ۱۷خ.، ص. ۱۳۴)۔
قاضی سلیمان منصور پوری کے مطابق، یہ مہم پانچویں ہجری کے ذوالقعدہ یا ذوالحجہ میں چلائی گئی تھی۔ (رحمۃ اللعالمین، 3খ.، ص. 215)۔ بعض کتابوں میں کسی کا نام لیے بغیر یہ ذکر کیا گیا ہے کہ یہ مہم پانچویں ہجری کے ذوالحجہ میں چلائی گئی تھی۔ ('اومداۃ القاری، 17খ.، ص. 134; فتح الباری، 7খ.، ص. 397)۔ ابن سعد کے مطابق، یہ چھٹی ہجری کے رمضان میں ہوئی تھی۔ (كتاب المغازی، 1খ.، ص. 395; فتح الباری، 7খ.، ص. 397; اٹ-تبقاتول کبریٰ، 2খ.، ص. 295)۔
اوپر ذکر کردہ تمام رائے سے یہ ظاہر ہوتا ہے کہ یہ مہم تیسری ہجری کے رمضان سے چھٹی ہجری کے رمضان کے درمیان چلائی گئی تھی۔ شاید اسی وجہ سے امام بخاری (رح) نے اس سلسلے میں کوئی مقررہ تاریخ یا مخصوص سال کا ذکر نہیں کیا۔
📄 অভিযানে অংশগ্রহণকারিগণ
এই অভিযানে যাহারা অংশগ্রহণ করিয়াছেন তাহাদের সম্পর্কেও মতভেদ রহিয়াছে (ইবন হিশাম, আস-সীরাহ, ৩খ., পৃ. ১০৯৫; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ১৪০; ফাতহুল বারী, ৭খ., পৃ. ৩৯৬-৩৯৭)। আল-হাকেম-এর মতে, এই অভিযানে পাঁচ ব্যক্তি অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন। এই পাঁচজন কে কে সেই সম্পর্কেও বিভিন্ন মত পাওয়া যায়। তবে বর্ণনাকারিগণ একমত যে, তাহারা ছিলেন খাযরাজ গোত্রের বানূ সালামা উপগোত্রের লোক (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ১৪০; ইবন হিশাম, আস্-সীরাহ, ৩খ., পৃ. ১০৯৫)। এই অভিযানে অংশগ্রহণকারিগণ হইলেন- (১) আবদুল্লাহ ইবন 'উতায়ক ইব্ন মালিক ইব্ন আওস (রা) (ইবন হিশাম, আস-সীরাহ, ৩খ., পৃ. ১০৯৫; 'উমদাতুল কারী, ১৭খ., পৃ. ১৩৫)। কেহ কেহ বলিয়াছেন, তিনি ছিলেন উতায়ক ইনুল হারিছ ইব্ন কায়স ইন্ন হাবাসা ইবন হারিছ ইব্ন উমায়্যা ইব্ন যায়দ ইব্ন মু'আবিয়া ইন্ন মালিক ইব্ন আওফ ইব্ন আমর ইব্ন আওফ ইব্ মালিক ইব্ন আওস আল-আনসারী ('উমদাতুল কারী, ১৭খ., পৃ. ১৩৪)। তিনি উহুদের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন। তিনি ইয়ামামার যুদ্ধে শহীদ হন কিনা সে বিষয়েও মতভেদ রহিয়াছে ('উমদাতুল কারী, ১৭খ., পৃ. ১৩৫)। আল-আসকালানী বলিয়াছেন, তিনি ছিলেন বানু সালামার 'উতায়ক ইব্ন কায়স ইব্ন আসওয়াদ (ফাতহুল বারী, ৭খ., পৃ. ১৩৮)।
এখানে এই ব্যক্তির নাম লইয়া তিনটি বর্ণনা উল্লেখ করা হইয়াছে। তিনি ছিলেন আবদুল্লাহ ইবন 'উতায়ক ইব্ন্ন মালিক, যেমনটি ইন্ন হিশাম ও আল-আয়নী উল্লেখ করিয়াছেন। তিনি ছিলেন 'উতায়ক ইবনুল হারিছ ইন্ন কায়স, যেমনটি আল-আয়নী কেহ কেহ বলিয়াছেন বলিয়া উদ্ধৃতি দিয়াছেন। তিনি ছিলেন 'উতায়ক ইব্ন কায়স ইব্ন আসওয়াদ, যেমনটি বলিয়াছেন আল-'আসকালানী। তবে গ্রহণযোগ্য মত হইল, তাহার নাম 'আবদুল্লাহ ইবন 'আতীক। তিনিই ছিলেন এই অভিযানের দলপতি। যেমন বলা হইয়াছে :
فأمر عليهم رسول الله ﷺ عبد الله بن عتيق.
"রাসূলুল্লাহ (স) আবদুল্লাহ ইবন 'আতীককে তাহাদের আমীর বানাইয়াছিলেন” (বুখারী ৫খ., পৃ. ২১০; ইন হিশাম, ৩খ., পৃ. ১০৯৫)।
(২) মাসউদ ইবন সিনান (রা) (ইবন হিশাম, আস-সীরাহ, ৩খ., পৃ. ১০৯)। তিনি উহুদের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন। তিনি ইয়ামামার যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন (উমদাতুল কারী, ১৭খ., পৃ. ১৩৬; ফাতহুল বারী, ৭খ., পৃ. ৩৯৮)।
(৩) আবদুল্লাহ ইব্ন উনায়স (রা) (ইব্ন হিশাম, আস-সীরাহ, ৩খ., পৃ. ১০৯৫), আল-জুহানী আল-আনসারী (ইবনুল আছীর, আত-তাতিম্মাহ, ১খ., পৃ. ৫৬৪) ইব্ন আস'আদ ইন্ন হারাম ইব্ন হাবীব ইবন আল-বারক ইব্ন ওয়াবরাহ ('উমদাতুল কারী, ১৭খ., পৃ. ১৩৫)। কথিত আছে যে, তাঁহার পরিচয় হইল, আবদুল্লাহ ইব্ন উনায়স ইব্ন আস'আদ ইব্ন হারাম ইব্ন মালিক ইন্ন গানাম ইন্ন কা'ব ইব্ন তামীম ইন্ন নাফাছাহ ইব্ন উনায়স ইব্ যারবু' ইবনুল বারক ইন্ন ওয়াবরাহ (আত-তাতিম্মাহ, ২খ., পৃ. ৫৬৪)। তিনি উহুদ ও পরবর্তী যুদ্ধসমূহে অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন। তিনি ৫৪ হিজরী সনে ইনতিকাল করেন ('উমদাতুল কারী, ১৭খ., পৃ. ১৩৬)।
আল-মুনযিরী অভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন যে, আবদুল্লাহ ইব্ন উনায়স আল-জুহানী ও আবদুল্লাহ ইব্ন উনায়স আল-আনসারী একই ব্যক্তি নন, বরং তাহারা ভিন্ন দুই ব্যক্তি। তাহার দৃষ্টিতে যিনি এই অভিযানে অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন তিনি হইলেন আবদুল্লাহ ইব্ন উনায়স আল-আনসারী, আবদুল্লাহ ইব্ন উনায়স আল-জুহানী নহেন। তবে মুনযিরী ব্যতীত অন্যান্যরা এই দুই নাম একজনেরই বলিয়া মনে করেন (ফাতহুল বারী, ৭খ., পৃ. ৩৯৮)।
(৪) আবুল কাতাদা আল-হারিছ ইব্ন রি'ঈ আবু কাতাদা (রা)। তিনি فارس رسول الله صلى الله عليه وسلم )রাসূলুল্লাহ (স)-এর অশ্বারোহী) বিশেষণে ভূষিত ছিলেন। তাঁহার নাম সম্পর্কে মতভেদ রহিয়াছে। এই প্রসঙ্গে পাঁচটি মত পাওয়া যায়।
ক) হারিছ ইব্ন রি'ঈ ইব্ন বালতা'আ।
খ) বালদামাহ ইব্ন খান্নাস ইবন সিনান ইবন উবায়দ ইব্ন আদী ইব্ন গানাম ইব্ন কা'ব সালামা আল-আনসারী ('উমদাতুল কারী, ১৭খ., পৃ. ১৩৬)।
গ) আন-নু'মান আর-রাবী'
ঘ) আন-নু'মান ইব্ন 'আমর
ঙ) আমর ইবন রাবী' ('উমদাতুল কারী, ১৭খ., পৃ. ১৩৬)।
তিনি ৪০ হিজরীতে ৭০ বৎসর বয়সে ইনতিকাল করেন ('উমদাতুল কারী, ১৭ খ., পৃ. ১৩৬)।
(৫) খুযা'ঈ ইব্ন আসওয়াদ (ইবন হিশাম, আস-সীরাহ, ৩খ., পৃ. ১০৯৫) ইব্ন খুযা'ঈ আল-আসলামী। তিনি আনসারদের সহিত সন্ধিচুক্তিতে আবদ্ধ ছিলেন। ইকলীলের বর্ণনা অনুযায়ী তাঁহার নাম আসওয়াদ ইবন হারাম। তিনি সাহাবী ছিলেন কিনা সেই বিষয়ে মতভেদ রহিয়াছে। ইমাম যাহাবী ও অন্যান্যরা তাঁহাকে সাহাবীদের অন্তর্ভুক্ত করিয়াছেন। আবূ 'উমার তাঁহাকে সাহাবীদের মধ্যে গণ্য করেন নাই (ফাতহুল বারী, ৭খ., পৃ. ৩৯১)। আদ-দালাইলিল বায়হাকীতে তাহার নাম আসওয়াদ ইব্ন খুযা'ঈ না আসওয়াদ ইবন হারাম এই বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা হইয়াছে (আল-'আসকালানী, ৭খ., পৃ. ৩৯৮)। আয-যুহরী উপরোল্লিখিত পাঁচজনের নামই উল্লেখ করিয়াছেন (আত-তাবাকাতুল কুবরা, ২খ., পৃ. ২৯৫)। অন্য বর্ণনামতে এই অভিযানে অংশগ্রহণকারী ছিলেন ছয় জন। উপরিউক্ত পাঁচজনসহ আবদুল্লাহ ইবন 'উতবা। তাঁহার নাম প্রসঙ্গে দুইটি বর্ণনা পাওয়া যায়।
ক) আবু 'আমেরের বর্ণনায় আছে, যিনি আবু রাফে'-এর হত্যার অভিযানে অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন তাঁহার নাম আবদুল্লাহ ইবন 'উতবা আবু কায়স আয-যাকওয়ানী। ইমাম যাহাবীর মতে, তিনি ছিলেন একজন সাহাবী ('উমদাতুল কারী, ১৭খ., পৃ. ১৩৬)।
খ) ইবনুল আছীর বলিয়াছেন, যিনি আবু রাফে'-এর হত্যার অভিযানে অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন তাহার নাম আবূ 'ইনাবাহ আবদুল্লাহ ইব্ন 'ইনাবাহ আল-খাওলানী (আত-তাতিম্মাহ, ২খ., পৃ. ৫৮১)। নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে এই অভিযানে আবূ 'ইনাবাহ নামক সাহাবীর অংশগ্রহণের যে ইঙ্গিত ইবনুল আছীরের বর্ণনায় পাওয়া যায় তাহা কোনক্রমেই ঠিক নয়। কেননা গ্রহণযোগ্য মত অনুযায়ী যাহারা এই অভিযানে অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন তাঁহারা হইলেন আনসারীদের অন্তর্ভুক্ত। পক্ষান্তরে ইন্ন 'ইনাবাহ সর্বসম্মতিক্রমে আনসারী ছিলেন না ('উমদাতুল কারী, ৭খ., পৃ. ৩৯৭)। তাহা ছাড়াও অন্য একটি বর্ণনায় তিনি যে আবদুল্লাহ ইব্ন 'উতবা ছিলেন, সেই বিষয়টি পরিষ্কারভাবে উল্লেখ হইয়াছে।
بعث النبي ﷺ إلى أبي رافع عبد الله بن عتيك وعبد الله بن عتبة وناس معهم.
"রাসূলুল্লাহ (স) আবূ রাফে'-এর নিকট আবদুল্লাহ ইবন 'উতায়ক ও আবদুল্লাহ ইব্ন 'উতবা এবং তাহাদের সহিত কতিপয় লোককে পাঠাইয়াছিলেন”।
উল্লিখিত অভিযানে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা সম্পর্কে এখানে 'পাঁচজন' ও ছয়জন' এই দুইটি মত উল্লেখ করা হইল। এই বিষয়ে তৃতীয় মত এই যে, তাহারা ছিলেন চারজন। যেমন আল-'আসকালানী আল-হাকেম-এর 'আল-ইকলীল' গ্রন্থে উদ্ধৃতি দিয়া উল্লেখ করিয়াছেন যে, এই অভিযানে আবদুল্লাহ ইবন 'আতীক, আবদুল্লাহ ইব্ন উনাস, আবু কাতাদাহ, সন্ধি চুক্তিতে আবদ্ধ তাহাদের এক সাথী ও একজন আনসারী অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন (ফাতহুল বারী, ৭খ., পৃ. ৩৯৬)। সুতরাং এই অভিযানে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা সম্পর্কে যে তিনটি বর্ণনা পাওয়া গেল তাহা হইল চার, পাঁচ ও ছয়জনের। তাহা হইলে নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, এই অভিযানে সর্বনিম্ন চার ও সর্বোচ্চ ছয় ব্যক্তি অংশগ্রহণ করেন।