📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 একটি ভুল ধারণার অপনোদন

📄 একটি ভুল ধারণার অপনোদন


ইসলাম বিরোধী শিবির বানু কুরায়যাকে শাস্তি সম্বন্ধে নিষ্ঠুরতা ও অত্যাচারের জোর আপত্তি তুলিয়াছে। তাহারা শুধু ঘটনার খোলস তথা বাহিরের দিকটাই দেখিয়াছে। উহার অভ্যন্তরে তলাইয়া দেখে নাই, শাস্তির রূপকেই প্রাধান্য দিয়াছে, উহার কারণ লইয়া পর্যালোচনা করে নাই। যদি তাহারা নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ হইতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত বানু কুরায়যার আচরণ গভীরভাবে পর্যালোচনা করিত তাহা হইলে কোনভাবেই নিষ্ঠুরতার অপবাদ উত্থাপন করিত না। নিম্নে প্রকৃত ব্যাপার তুলিয়া ধরা হইতেছে যাহার দ্বারা বুঝা যাইবে, কেন তাহাদের বিরুদ্ধে সা'দ (রা) উপরিউক্ত রায় প্রদান করিয়াছিলেন।
(১) মদীনায় পৌঁছিয়া রাসূলুল্লাহ (স) বানু কুরায়যার সঙ্গে সদয় আচরণ করেন এবং মৈত্রী চুক্তি স্থাপন করেন।
(২) তিনি তাহাদের সঙ্গে যেই চুক্তি সম্পাদন করিয়াছিলেন তাহাতে তাহাদেরকে পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং জানমাল রক্ষার নিশ্চয়তা প্রদান করা হইয়াছিল।
(৩) বানু কুরায়যা বানু নাযীর অপেক্ষা কম মর্যাদাসম্পন্ন হিসাবে বিবেচিত ছিল। বানু নাযীরের কাহারও দ্বারা বানু কুরায়যার কেহ নিহত হইলে তাহার রক্তপণ ছিল অর্ধেক। অপরদিকে বানু কুরায়যার দ্বারা বানু নাযীরের কেহ নিহত হইলে কুরায়যার ইয়াহুদীদিগকে পূর্ণ রক্তপণ পরিশোধ করিতে হইত। মানবতার মুক্তির দিশারী রাসূলুল্লাহ (স) বানু কুরায়যাকে এই সামাজিক বৈষম্যের শৃংখল হইতে মুক্ত করেন। তিনি তাহাদের মর্যাদা বানু নাযীরের সমান করিয়া দেন (আবূ দাউদ, ২খ., পৃ. ২৭৭)।
(৪) রাসূলুল্লাহ (স) বানু নাযীর কে মদীনা হইতে বহিষ্কার করার পর বানু কুরায়যার সঙ্গে চুক্তি নবায়ন করেন। পুনঃ চুক্তির মাধ্যমে তিনি তাহাদিগকে স্বীয় বাসস্থানে অবস্থানের সুযোগ দেন।
(৫) তাহাদের সঙ্গে এত ভাল আচরণ করার পরও মুসলমানগণ যখন তাহাদের জীবনের সর্বাপেক্ষা কঠিন মুহূর্ত অতিক্রম করিতেছিলেন, ইসলাম বিরোধী বহিঃ শত্রুর সম্মিলিত আক্রমণ হইতে দেশ ও জাতিকে রক্ষা করার লক্ষ্যে একাধারে কয়েক দিন ক্ষুধার্ত অবস্থায় দীর্ঘ পরিখা খননের মাধ্যমে রণপ্রস্তুতিতে যখন একেবারে ক্লান্ত ও অবসন্নপ্রায় ঠিক এমন সঙ্কটময় পরিস্থিতি ও নাযুক অবস্থায় তাহারা মদীনার ভিতরে থাকিয়াই রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত কৃত চুক্তি ভঙ্গ করে এবং মুসলমানগণকে সমূলে ধ্বংস করার জন্য ইয়াহুদী-কুরায়শ সামরিক শক্তির পক্ষাবলম্বন করে।
(৬) মুসলিম নারী ও শিশুগণকে হেফাজতের জন্য তাঁবুতে প্রেরণ করা হইলে তাহারা তাঁহাদের উপর আক্রমণ করিতে উদ্যত হয় (সীরাতুন নবী, ১খ., পৃ. ২৫৪)।
(৭) জঘন্য বিশ্বাসঘাতকতা ছাড়াও এই অকৃতজ্ঞ গোষ্ঠী মুসলমানগণের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য পনর শত তরবারি, দুই হাজার বর্শা-বল্লম, তিন শত বর্ম ও পনর শত ঢাল সংগ্রহ করিয়া রাখিয়াছিল যাহা তাহাদের দুর্গ বিজিত হওয়ার পর মুসলিম বাহিনীর হস্তগত হয় (তাবাকাত ইবন সা'দ, পৃ.৭৫)।
(৮) খন্দক যুদ্ধের মূল উস্কানীদাতা "হুয়াই ইব্‌ন আখতাব", যাহাকে বিদ্রোহের অপরাধে মদীনা হইতে বহিষ্কার করা হইয়াছিল এবং যে গোটা আরবকে উস্কানী দিয়া আহযাব (খন্দক) যুদ্ধের আয়োজন করিয়াছিল, বানু কুরায়যা এমন রাষ্ট্রদ্রোহী শত্রু নিজেদের সঙ্গে রাখিয়া গাদ্দারী ও হঠকারিতার পরাকাষ্ঠা দেখায়।
এমতাবস্থায় তাহাদের সঙ্গে উপরিউক্ত আচরণ ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না। তাহারা নিজেদের কুকর্মের ফলে সর্বাপেক্ষা জঘন্য যুদ্ধাপরাধীদের মধ্যে গণ্য হইয়াছিল, যাহাদের প্রাপ্য কেবল মৃত্যুদণ্ডই (আর-রাহীক, পৃ. ২৯০)।
আরবে চুক্তির গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। মৈত্রী চুক্তিকে প্রকৃত ভ্রাতৃত্বের সমতুল্য মনে করা হইত। মৈত্রী বন্ধনের ফলে রক্তের সম্পর্কের ন্যায় অনেক সময় গভীর সম্পর্ক সৃষ্টি হইত। বানু কুরায়যার মিত্র আওসের অবস্থা ছিল ঠিক অনুরূপ। তাহারা মনে-প্রাণে চাহিতেছিল, বানু কুরায়যা যেন কোনরূপ শাস্তির সম্মুখীন না হয়। তাহাদের সঙ্গে যেন ক্ষমা সুন্দর আচরণ করা হয়। তাহাদের ব্যাপারে আওস গোত্রপতি সা'দ ইব্‌ن মু'আয (রা)-র পেরেশানীও কম ছিল না। চুক্তির ব্যাপারে তিনিই ছিলেন প্রকৃত যিম্মাদার। তাহাদের সঙ্গে তাঁহার ঘনিষ্ঠতা ছিল অপেক্ষাকৃত বেশী। তিনি ব্যক্তিগতভাবে ছিলেন তাহাদের বড় হিতাকাঙ্খী। কিন্তু এই হতভাগ্য জাতির অপরাধ এতই মারাত্মক ছিল যে, এত কিছুর পরও তাঁহার (সা'د) পক্ষে উপরিউক্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া ছাড়া আর কোন উপায় ছিলনা (সীরাতুন নবী, পৃ. ২৫৫)। অপরাধ অনুপাতে সা'দ (রা)-র ফয়সালা ছিল পুরাপুরি ন্যায় ও ইনসাফ ভিত্তিক। ইহাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ নাই। এই ঘটনার উপর আলোকপাত করিতে গিয়া R.V.C Bodley তাহার The Messenger The life of Muhammad নামক বিখ্যাত গ্রন্থে লিখিয়াছেন:
"মুহাম্মাদ আরবে একা ছিলেন। এই ভূখণ্ড আকার-আয়তনের দিক দিয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক-তৃতীয়াংশ এবং ইহার লোকসংখ্যা ছিল পঞ্চাশ লাখ। তাহাদের নিকট এমন কোন সৈন্যবাহিনী ছিল না যাহারা জনসাধারণকে আদেশ পালনে ও আনুগত্য প্রদর্শনে বাধ্য করিতে পারে, কেবল একটা ক্ষুদ্র সেনাদল ছাড়া, যাহার সংখ্যা ছিল মাত্র তিন হাজার। এই বাহিনীও আবার পরিপূর্ণরূপে অস্ত্রসজ্জিত ছিল না। এমতাবস্থায় যদি মুহাম্মাদ (স) কোনরূপ শৈথিল্য কিংবা গাফলতিকে প্রশ্রয় দিতেন এবং বানু কুরায়যাকে তাহাদের বিশ্বাস ভঙ্গের কোনরূপ শাস্তি দান ব্যতিরেকে ছাড়িয়া দিতেন তাহা হইলে আরব উপদ্বীপে ইসলামের অস্তিত্ব রক্ষা করা কঠিন হইত। ইহাতে কোন সন্দেহ নাই যে, ইয়াহুদীদের হত্যার ব্যাপার খুবই কঠিন ছিল। কিন্তু ইয়াহুদীদের ধর্মীয় ইতিহাসে উহা কোন নূতন ব্যাপার ছিল না। আবার মুসলমানগণের দিক হইতে ঐ কাজের পিছনে পূর্ণ বৈধতা ও অনুমোদন বর্তমান ছিল (The Messenger The life of Muhammad, London 1946, P. 202-3; নবীয়ে রহমত, পৃ. ২৭৭)। স্যার স্টানলী লেনপুল বলেন, "মনে রাখিতে হইবে যে, তাহাদের অপরাধ ছিল দেশের সঙ্গে গাদ্দারী এবং তাহাও আবার অবরোধের মত সংকটময় অবস্থায় (Selection from the Quran, P. IXV)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সদূরপ্রসারী প্রভাব

📄 সদূরপ্রসারী প্রভাব


উদীয়মান ইসলামী রাষ্ট্রের জন্য হযরত সা'দ ইব্‌ন মু'আয (রা)-র উপরিউক্ত রায়ের প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। উক্ত ফয়সালা কার্যকর হওয়ার ফলে মদীনা ইয়াহুদী ষড়যন্ত্র, প্রতারণা ও বিশৃংখলা, নিরাপত্তাহীনতা ও অস্থিতিশীলতা হইতে মুক্ত ও নিরাপদ হইয়া যায়। মুসলমানগণের জন্য পিছন হইতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা দূরীভূত হইয়া যায়। এই ঘটনার পর মুসলমানদের বিরুদ্ধে কোন রকম অভ্যন্তরীণ চক্রান্ত মাথাচাড়া দিয়া উঠিতে পারে নাই। ফলে তাহারা পূর্বাপেক্ষা নিশ্চিন্ত জীবনের স্বাদ আস্বাদন করিতে শুরু করেন। ইহার পর ভিতর ও বাহির শত্রুর আক্রমণের থাবা হইতে মদীনা অধিকতর নিরাপদ ও সুরক্ষিত হইয়া উঠে।
সা'দ (রা)-এর ঐ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হওয়ার ফলে অপরাপর আরব গোত্রসমূহও কোনরূপ চুক্তি ভঙ্গ ও গাদ্দারী করার পূর্বে বারবার চিন্তা-ভাবনা করিতে বাধ্য হয়। কেননা ইহার পরিণতি কত মারাত্মক হইতে পারে তাহা তাহারা স্বচক্ষেই দেখিয়াছিল যে, মুহাম্মাদ (স) তাঁহার ফয়সালা কার্যকর করার ক্ষমতা রাখেন (The Messenger The life of Muhammad, London 1946, P. 202-3; নবীয়ে রহমত, পৃ. ২৭৭)।
মদীনার ইয়াহুদীদের সর্বশেষ ঘাঁটি বানু কুরায়যার দুর্গ পতনের পর মুনাফিক শিবির স্বাভাবিকভাবেই দুর্বল হইয়া যায়। তাহাদের তৎপরতায় ভাটা পড়ে ও মনোবল ভাঙ্গিয়া যায়। ড. ইসরাঈল ওয়েলফিন্সন-এর মতে, "বানু কুরায়যার পতনের পর মুনাফিকদিগের আওয়াজ উচ্চগ্রাম হইতে নিম্নগ্রামে নামিয়া আসে' (নবীয়ে রহমত, পৃ. ২৭৭)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 কুরায়যার যুদ্ধে নিহত ইয়াহুদীদের সংখ্যা

📄 কুরায়যার যুদ্ধে নিহত ইয়াহুদীদের সংখ্যা


হযরত সা'দ (রা)-র সিদ্ধান্ত অনুসারে বানু কুরায়যার একদলকে প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত করা হয় এবং আরেক দলকে বন্দী করা হয় (দ্র. ৩৩: ২৬)। কিন্তু সেই দিন ঠিক কতজন ইয়াহুদীকে হত্যা করা হয়, সেই ব্যাপারে ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিস্তর মতভেদ পরিলক্ষিত হয়। তবে অধিকাংশ ঐতিহাসিক তাহাদের সংখ্যা ছয় শত হইতে নয় শত পর্যন্ত পৌঁছাইয়া দিয়াছেন যাহা ইউরোপীয় লেখকগণকে মহানবী (স)-এর চরিত্রে কালিমা লেপনে রসদ যোগাইয়াছে। নিম্নোক্ত বিশ্লেষণের মাধ্যমে নিহতদের প্রকৃত ও নির্ভরযোগ্য সংখ্যা পাওয়া যাইবে।
কুরায়যা গোত্রে অভিযানকালে তাহাদের পুরুষলোকদিগের সংখ্যা কত ছিল তাহা তিরমিযী, নাসাঈ প্রভৃতি হাদীছ গ্রন্থে বিশ্বস্ত সূত্রে হযরত জাবির (রা) কর্তৃক এইভাবে বর্ণিত হইয়াছে: (كانوا اربع مائة فلما فرغت من قتلهم الخ الحديث مائة رجل) (তাহাদের পুরুষদের সংখ্যা ছিল চারি শত)। অতঃপর তাহাদিগকে হত্যার পর হযরত সা'দ (রা) ইনতিকাল করেন। এই চারি শত পুরুষের মধ্যে যাহারা যুদ্ধে লিপ্ত বা যুদ্ধে লিপ্ত হইতে সমর্থ কেবল তাহাদিগকে সা'د (রা) হত্যার আদেশ দেন। বুখারী ও মুসলিম শরীফে হযরত সা'দের এতদসংক্রান্ত উক্তিই উহার প্রকৃষ্ট প্রমাণ বহন করে। তিনি বলিয়াছিলেন, إنى احكم فيهم أن تقتل المقاتلة )আমি যুদ্ধে নিযুক্ত বা যুদ্ধ করিতে সক্ষম পুরুষদিগকে হত্যার আদেশ করিতেছি)। সা'د (রা)-র এই উক্তিতে প্রাপ্ত এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক সকল পুরুষ যোদ্ধাকে হত্যা করিবার নির্দেশ প্রদান করা হইয়াছিল, যাহা স্পষ্টতই বুঝা যাইতেছে। কিন্তু নবী (স) তাহাদের মধ্য হইতে কেবল প্রাপ্তবয়স্কদিগকে হত্যার নির্দেশ প্রদান করেন (যাদুল মা'আদ, ৩খ., পৃ. ১৩২; আবূ দাউদ, হাদীছ নং ৪৪০৪; তিরমিযী, পৃ. ১৫৪৮; নাসাঈ, ৬খ.; ইবন মাজা, পৃ. ৪৫৪১)। অপ্রাপ্ত-বয়স্কদিগকে বন্দী করিয়া রাখা হয় (প্রাগুক্ত)। অতঃপর তাহাদিগকে নবী (স) মুক্ত করিয়া দেন। ইহাদের মধ্য হইতে আতিয়া আল-কুরাজীর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি ও তাহার কয়েকজন সঙ্গী প্রাণে রক্ষা পাইয়া মুসলমান হন (আর-রাহীক, পৃ. ২৯১)। প্রখ্যাত মুহাদ্দিছ ইবনে আসাকির কুরায়যার ঘটনা প্রসঙ্গে একখানা হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন, নিম্নে তাহা উল্লেখ করা হইল। রাসূলুল্লাহ্ (স) তাহাদিগের তিন শত পুরুষ হত্যা করিলেন এবং অবশিষ্ট লোকদিগকে বলিলেন, তোমরা সিরিয়া প্রদেশে চলিয়া যাও। অবশ্য আমি তোমাদের গতিবিধির সন্ধান রাখিব। অতঃপর তিনি তাহাদিগকে সিরিয়াতে পাঠাইয়া দিলেন (মোহাম্মদ আকরম খাঁ, মোস্তফা চরিত, পৃ. ৪৭১-৪৭২; কানযুল 'উম্মাল, ৫খ., পৃ. ২৮২)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সা'দ ইব্‌ন মু'আয (রা)-র শাহাদাতবরণ

📄 সা'দ ইব্‌ন মু'আয (রা)-র শাহাদাতবরণ


খন্দক যুদ্ধে আহত হওয়ার পর হযরত সা'দ (রা) আল্লাহ্র দরবারে দু'আ করিয়াছিলেন, “হে আল্লাহ্! তুমি ভালভাবেই জান যে, আমার নিকট ইহা অপেক্ষা প্রিয় আর কিছুই নাই যে, আমি তোমার সন্তুষ্টি বিধানের জন্য ঐ কওমের সঙ্গে জিহাদ করিব যাহারা তোমার রাসূল (স)-কে অস্বীকার করিয়াছে। হে আল্লাহ্! আমার মনে হয় তুমি আমাদের ও তাহাদের মধ্যে যুদ্ধের উপসংহার টানিয়াছ। যদি কুরায়শদের সঙ্গে এখনও যুদ্ধের কোন কিছু অবশিষ্ট থাকে তাহা হইলে আমাকে জীবিত রাখ যাহাতে তোমার রাস্তায় তাহাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করিতে পারি। আর যদি তুমি যুদ্ধ শেষ করিয়া দিয়া থাক, তাহা হইলে এই আঘাতকে বাকী রাখিয়া ইহাকে আমার মৃত্যুর কারণ করিয়া দাও" (বুখারী, ২খ., পৃ. ৫৯১; মুসলিম, ২খ., পৃ. ৯৫)।
শাহাদাতের আকাঙ্খা ব্যক্ত করিয়া তিনি যেই দু'আ করিয়াছিলেন তাহা কবুল হয়, বান্ কুরায়যার যাবতীয় ব্যাপার সম্পন্ন হওয়াব পর তাহার ফলাফল প্রকাশ পায়। তাহাদের করুণ পরিণতি অবলোকন করিয়া তাঁহার চক্ষু শীতল হয়। অতঃপর তাঁহার জখম হইতে রক্ত প্রবাহিত হইতে থাকে। হযরত আয়েশা (রা)-র বর্ণনা অনুযায়ী তাঁহার বক্ষ হইতে প্রবলবেগে রক্ত বাহির হয়। তিনি তখন মসজিদে অবস্থান করিতেছিলেন। উক্ত মসজিদে তাঁহার পার্শ্বেই ছিল বানু গিফার-এর একটি তাঁবু। সা'দ (রা)-এর দিক হইতে হঠাৎ রক্তের স্রোতধারা নিজেদের দিকে আসিতে দেখিয়া তাহারা ভীত-সন্ত্রস্ত ও বিচলিত হইয়া পড়ে। তাহারা হত-বিহ্বল চিত্তে শিবিরস্থ লোকদিগকে জিজ্ঞাসা করে, তোমাদের দিক হইতে ইহা কী আসিতেছে? অনুসন্ধান করিতে গিয়া জানা যায় যে, হযরত সা'দ (রা)-র দেহের ক্ষত হইতে রক্ত প্রবাহিত হইতেছে। প্রচুর রক্ত ক্ষরণে তিনি সেখানেই ইনতিকাল করেন (বুখারী, ২খ., পৃ. ৫৯১; মুসলিম, ২খ., পৃ. ৯৫; ইব্‌ন হিশাম, ৩খ., পৃ. ১৬৩)।
হযরত জিবরাঈল (আ)-এর মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ্ (স) তাঁহার মৃত্যুর সংবাদ পান। জাবির (রা) বলেন, আমি আল্লাহ্র রাসূলকে বলিতে শুনিয়াছি : সা'দ ইব্‌ন মু'আযের মৃত্যুতে আল্লাহ্ আরশ কাঁপিয়া উঠে (বুখারী, ১খ., পৃ. ৫৩৬; মুসলিম, ২খ., পৃ. ২৯৪; তিরমিযী ২খ., পৃ. ২২৫)।
এই ব্যাপারে এক আনসারী (রা)-এর নিম্নলিখিত কবিতাংশ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য: ما اهتز عرش الله موت هالك - سمعنا به الا لسعد ابي عمر
"আমরা আবূ উমার সা'দ ছাড়া কোন ব্যক্তির মৃত্যুতে আল্লাহ্র আরশের কম্পনের কথা শুনি নাই" (ইস্তী'আব, ২খ., পৃ. ৩২; ইব্‌ن হিশাম, ৩খ., পৃ. ১৬৩)।
বানু কুরায়যাকে অবরোধকালে খালিদ ইব্‌ন সুওয়ায়দ (রা) নামক একজন সাহাবী বুনানা নামক কুরায়যার এক নারীর নিক্ষিপ্ত যাতা (চাকতি)-র আঘাতে নিহত হন। তাঁহাকে তিনি দুইজন শহীদের মর্যাদা পাইবেন বলিয়া রাসূলুল্লাহ্ (স) সুসংবাদ দেন (ইব্‌ن হিশام, ৩খ., পৃ. ১৬৪)। অবরোধকালে উক্কাশার ভ্রাতা আবু সিনান ইব্‌ন মিহসান নামক অপর এক সাহাবীও ইনতিকাল করেন। বানু কুরায়যার কবরস্থানে তাঁহাকে দাফন করা হয় (প্রাগুক্ত; আর-রাহীক, পৃ. ১৯২)।

গ্রন্থপঞ্জী : (১) আল-বুখারী, আস-সাহীহ, দেওবন্দ, ভারত ১৩৮৪-১৩৮৭ হি., ১খ., পৃ. ৫৩৬, ২খ., পৃ. ৫৯০-৯১; (২) মুসলিম, আস-সাহীহ, দিল্লী, ভারত ১৩৭৬ হি., ২খ., পৃ. ৯৫, ২৯৪; (৩) আত-তিরমিযী, আল-জামি, দিল্লী, ভারত, তা. বি., ২খ., পৃ. ২২৫; (৪) আবূ দাউদ, আস-সুনান, দেওবন্দ, ভারত, তা. বি., ২খ., পৃ. ১৪, ২৭৭; বৈরূত, লেবানন ১৩৯৪ হি./ ১৯৭৪ খৃ., ৫খ., পৃ. ৩৯০-৯১; (৫) ইব্‌ন হাজার আল-আসকালানী, ফাতহুল বারী, বৈরূত, লেবানন ১৪০২ হি., ৭খ., পৃ. ১২২-২৩, ১১খ., পৃ. ৪১; (৬) ইব্‌ন হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, মিসর, তা. বি., ৩খ., পৃ. ১৪৮-৬৪; (৭) ইব্‌ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, মিসর ১৯৩২ খৃ., ৪খ., পৃ. ১১৮-১২৬; (৮) ইবনুল আছীর, আল-কামিল ফীত তারিখ, বৈরূত, লেবানন, ২খ., পৃ. ৭৫-৭৭; (৯) আবদুর রাউফ দানাপুরী, আসাহ্হুস সিয়ার, দেওবন্দ, ভারত, তা. বি., পৃ. ১৫১; (১০) ইবনুল কায়্যিম, যাদুল মা'আদ, বৈরূত, লেবানন, ২খ., পৃ. ৭২-৭৪; (১১) ইব্‌ন সা'দ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, বৈরূত, লেবানন, তা. বি., ২খ., পৃ. ৭৪-৭৮; (১২) ইব্‌ন সায়্যিদিন নাস, 'উয়ূনুল আছার, বৈরূত, লেবানন, ২খ., পৃ. ৬৮-৭৮; (১৩) ইব্‌ন আবদিল বার, আল-ইসতীআব, কায়রো তা. বি., ২খ., পৃ. ৩২; (১৪) সাফীউর রাহমান মুবারাকপুরী, আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ২৮৮-২৯২; (১৫) ইবনুল জাওযী, তালকীহু ফুহুলি আহলিল আছার, দিল্লী, ভারত, পৃ. ১২; (১৬) সায়্যিদ মাহমূদ আলুসী আল-বাগদাদী, রূহুল মা'আনী, বৈরূত, লেবানন, তা. বি., ৯খ., পৃ. ১৯৫; (১৭) আত্-তাসহীল ফী 'উলূমিত তানযীল, ৩খ., পৃ. ১৩৬; (১৮) মুহাম্মাদ আলী আস্-সাবুনী, সাওয়াতুত তাফাসীর, বৈরূত ১৪০২ হি. ১৯৮১ খৃ., ১খ., পৃ. ৫০০, ২খ., পৃ. ৫২২; (১৯) আল্লামা শিবলী নু'মানী ও সুলায়মান নদবী, সীরাতুন নবী (স), ভারত, ১৯৯৫ খৃ., ১খ., পৃ. ২৫৩-৫৫; (২০) ইদরীস কান্ধলবী, সীরাতুল মুস্তাফা (স), ভারত তা. বি., ২খ., পৃ. ৩২৩-৩৩১; (২১) শাহ্ মু'ঈনুদ্দীন আহমদ নদবী, তারীখ ইসলাম, লাহোর, পাকিস্তান, ১খ., ৬৯; (২২) আবুল হাসান আলী নদবী, নবীয়ে রহমত, অনু. আবু সাঈদ মুহাম্মদ ওমর আলী, ঢাকা, বাংলাদেশ, পৃ. ২৭০-২৭৭; (২৩) পবিত্র বাইবেল, বাংলাদেশ বাইবেল সোসাইটি, ঢাকা ১৯৭৩ খৃ. গণনা পুস্তক, অধ্যায় ৩১, আয়াত ৭-১০; দ্বিতীয় বিবরণ, অধ্যায় ২০, আয়াত ১০-১৪; (২৪) R.V.C. Bodley, The Messenger, The life of Muhammad, London, 1964 Page 202-3; (২৫) মোহাম্মদ আকরম খাঁ, মোস্তফা চরিত, ঢাকা, বাংলাদেশ, জুন ২০০০ খৃ., পৃ. ৪৬৮-৪৭৩; (২৬) আলী মুত্তাকী জৌনপুরী, কানযুল উম্মাল, ৫খ., পৃ. ২৮২।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00