📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 তাওরাতের বিধান মুতাবিক ফায়সালা

📄 তাওরাতের বিধান মুতাবিক ফায়সালা


বানু কুরায়যা সম্বন্ধে সা'দ ইব্‌ন মু'আয (রা)-এর উপরিউক্ত রায় ছিল হুবহু তাওরাতের বিধান অনুযায়ী, যাহা সম্পর্কে তাহারা ছিল পুরাপুরি ওয়াকিফহাল। তাওরাতে বর্ণিত সেই বিধান ছিল নিম্নরূপ:
"যখন তুমি কোন শহরের উপর আক্রমণের উদ্দেশ্যে উহার নিকটে আসিয়া উপনীত হইবে তখন প্রথমে সেই শহরের কর্ণধারের নিকট সন্ধির বার্তা পাঠাইবে। যদি সে সন্ধির প্রস্তাবে সম্মত হইয়া তোমার জন্য শহরের দ্বার উন্মুক্ত করিয়া দেয় তাহা হইলে সেথায় (সেই শহরে) যত লোককে পাওয়া যাইবে তাহারা সবাই তোমার করদাতা (প্রজা) ও দাস হইয়া যাইবে। আর যদি সন্ধি না করে, বরং তোমার সহিত যুদ্ধে লিপ্ত হয় তাহা হইলে ঐ শহর অবরোধ করিয়া রাখিবে। অনন্তর যখন তোমার ঈশ্বর সদাপ্রভু উহা তোমার করায়ত্বে করিয়া দিবেন তখন সেখানকার সকল পুরুষকে খড়গ দ্বারা হত্যা করিবে। অবশিষ্ট নারী, শিশু, জীবজন্তু এবং শহরের সকল জিনিস গণিমতের সম্পদ হিসাবে পরিগণিত হইবে। সুতরাং তোমার ঈশ্বর সদাপ্রভু প্রদত্ত ঐ শত্রুসম্পদ লুট ভোগ করিবে” (দ্বিতীয় বিবরণ, অধ্যায় ২০, পদ ১০-১৪; পবিত্র বাইবেল, বাংলাদেশ বাইবেল সোসাইটি, ঢাকা-১৯৭০; সীরাতুন্নবী (স), পৃ. ২৫৩)।
প্রাচীন কাল হইতেই ঐ বিধান বানু ইসরাঈলের মধ্যে প্রচলিত ছিল। যেমন তাওরাতের এক বর্ণনানুসারে তাহারা (বানু ইসরাঈল) মূসা (আ)-এর উপর আল্লাহ্র প্রত্যাদেশ অনুসারে মাদয়ানবাসীর সহিত যুদ্ধ করিয়া সেখানকার সকল পুরুষকে বধ করে। তাহাদের সহিত মাদয়ানের ইবি, রেশম, সূর, হুর ও রেবা নামক পাঁচ রাজাকে হত্যা করে। খড়গ দ্বারা হত্যা করে বিয়োরের পুত্র বিলিয়মকেও। তাহারা মাদয়ানের সকল স্ত্রীলোক ও বালক-বালিকাদিগকে বন্দী করিয়া লইয়া যায়। তাহাদের সমস্ত পশু, মেষপাল ও সকল সম্পত্তি লুট করিয়া লয়। পোড়াইয়া ফেলে তাহাদের সমস্ত ছাউনী, বাসস্থান ও শহর (পবিত্র বাইবেল, গণনা পুস্তক, ৩১ অধ্যায়, ৭-১০ পদ, বাইবেল সোসাইটি বাংলাদেশ, ঢাকা ১৯৭০; নবীয়ে রহমত, পৃ. ২৭৫)।
সুতরাং বানু কুরায়যার সম্বন্ধে সা'দ (রা)-এর ফায়সালা তাওরাতের ঐ বিধানের সহিত সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল যাহা তাহাদের পূর্বপুরুষ হইতেই প্রচলিত ও অনুসৃত হইয়া আসিতেছিল। উক্ত ফয়সালাকে রাসূলুল্লাহ্ (স) আসমানী ফায়সালা হিসাবে আখ্যা দিয়াছেন। ঐ রায় শোনার পর স্বয়ং ইয়াহুদীদের মুখ হইতে যাহা উচ্চারিত হয় তাহা হইতেও প্রমাণিত হয় যে, তাহারা নিজেরাও উহাকে খোদায়ী বিধানের মতই মনে করিয়াছিল। নিম্নে উহার দৃষ্টান্ত পেশ করা হইলঃ বানু কুরায়যা ফিতনার মূল হোতা হুয়াই ইব্‌ন আখতাবকে ফয়সালা অনুযায়ী বধ করার জন্য উপস্থিত করা হইলে সে রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া বলিয়াছিল, "আল্লাহ্র শপথ!
১০০ তোমার সহিত যেই বৈরী আচরণ ও শত্রুতা করিয়াছি সেইজন্য আমি আদৌ অনুতপ্ত নহি। নিজেকে আমি ঐজন্য বিন্দুমাত্রও ভর্ৎসনা করি না, দেইনা সামান্যতমও ধিক্কার। তবে যেই ব্যক্তি আল্লাহকে পরিত্যাগ করে আল্লাহ্ তাহাকে পরিত্যাগ করেন। অতঃপর উপস্থিত জনগণকে সম্বোধন করিয়া সে বলে, আল্লাহ্র বিধান পালনে আমার কোন অসুবিধা নাই, নাই কোন আপত্তি। ইহাতো (সা'দ-এর ফায়সালা) পূর্ব নির্ধারিত এক খোদায়ী বিধান এবং আল্লাহ্ কর্তৃক বানু ইসরাঈলের ভাগ্যে লিপিবদ্ধ এক অলঙ্ঘনীয় শাস্তি” (সীরাতুন্নবী ১খ., পৃ. ২৫৪; আর-রাহীকুল মাখতুম পৃ. ২৯১)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 দণ্ডাদেশ কার্যকর

📄 দণ্ডাদেশ কার্যকর


সা'দ ইব্‌ন মু'আয (রা)-এর ঘোষিত রায় কার্যকর করার লক্ষ্যে আল্লাহর রাসূলের নির্দেশক্রমে প্রথমত বানু কুরায়যার প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষগণকে মদীনার বানু নাজ্জার গোত্রের এক আনসার মহিলা হারিছ-কন্যা কানীসা (كنيسة)-এর বাড়িতে বন্দী করিয়া রাখা হয়। তাহাদের জন্য খনন করা হয় কতেক পরিখা। অতঃপর উক্ত পরিখাসমূহে একের পর এক লইয়া গিয়া তাহাদের শিরশ্ছেদ করা হইতে থাকে। এক পর্যায়ে বন্দীশালার অবশিষ্ট বন্দীগণ তাহাদের নেতা কা'ব ইব্‌ন আসাদকে বলিল, "আমাদের সঙ্গে কেমন আচরণ করা হইবে বলিয়া আপনার মনে হয়?” উত্তরে সে বলিল, "তোমরা কি সর্বক্ষেত্রেই নির্বোধ? কিছুই বুঝ না? দেখিতেছ না যে, আহবানকারী তোমাদের যাহাকে ডাকিয়া লইয়া যাইতেছে সে আর ফিরিয়া আসিতেছে না? আল্লাহ্র কসম! আমাদেরকে হত্যাই করা হইবে" (আর-রাহীক, পৃ. ২৯০)।
ঐতিহাসিকদের বর্ণনানুযায়ী বানু কুরায়যার গোত্রপতি কা'ব ইব্‌ন আসাদসহ তাহাদের ছয় হইতে সাত, মতান্তরে আট হইতে নয় শত প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের শিরশ্ছেদ করা হয় (আর-রাহীক, পৃ. ২৯০; ইব্‌ন হিশাম, ৩খ., পৃ. ১৫৪)। তবে তিরমিযী, নাসাঈ প্রভৃতি হাদীছ গ্রন্থে চারি শত এবং ইব্‌ন আসাকির-এ তিন শত যোদ্ধাকে হত্যা করা হয় বলিয়া উল্লিখিত হইয়াছে (মাওলানা তাফাজ্জল হোসেন, হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা, পৃ. ৬৩১; মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ, মোস্তফা চরিত, পৃ. ৭১৩-৭১৫)।
এই সংখ্যা আরো অনেক কম ছিল বলিয়া মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ অনেক যুক্তি-প্রমাণ পেশ করিয়াছেন। তাহাদের সঙ্গে বানু নাযীর গোত্রপতি, আহযাব যুদ্ধের শীর্ষ পর্যায়ের এক অপরাধী, উম্মুল মু'মিনীন হযরত সাফিয়‍্যা (صفية) (রা)-র পিতা হুয়াই ইব্‌ন আখতাব, যাহার প্ররোচনায় বানু কুরায়যা রাসূলুল্লাহ (স)-এর সঙ্গে চুক্তি ভঙ্গ করিয়া খন্দক যুদ্ধে আরব মুশরিকদের পক্ষাবলম্বন করিয়াছিল, কুরায়যা গোত্রপতি কা'বকে প্ররোচিত করার সময় বিপদে তাহার পার্শ্বেই থাকিবার যেই প্রতিশ্রুতি দিয়াছিল তাহা রক্ষার্থে অবরোধের পূর্ব হইতেই সে বানু কুরায়যার সঙ্গে তাহাদের দুর্গেই অবস্থান করিয়া আসিতেছিল, তাহাকেও হত্যা করা হয়। হত্যার পূর্বে স্কন্ধের সঙ্গে দুই হাত রশি দ্বারা বাঁধা অবস্থায় বন্দীশালা হইতে বাহির করিয়া পরিখার পার্শ্বে উপস্থিত করা হইলে সে (হুয়াই) রাসূলের নিকট কৃত অপরাধে বিন্দুমাত্র অনুতপ্ত হয় নাই। সে পূর্বেই নিজের পরিধেয় বস্ত্র চতুর্দিক হইতে এক বিঘত পরিমাণ ছিড়িয়া ফেলিয়াছিল যাহাতে উহা কেহ লুণ্ঠন করিতে না পারে (আর-রাহীক, পৃ. ২৯১)।
খাল্লাদ ইব্‌ন সুওয়ায়দ (خلاد بن سوید) নামক একজন মুসলমানকে পেষণযন্ত্র বা প্রস্তর নির্মিত জাতা নিক্ষেপ করিয়া হত্যা করার অপরাধে "বুনানা" (بنانة) নামক বানু কুরায়যার কেবল একজন নারীকে হত্যা করা হয় (সীরাতুল মুস্তফা, ২খ., পৃ. ৩২৯; আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ২৯১)। তাহার স্বামীর নাম ছিল হাকাম আল-কুরাজী (حكم القرظی) ('উয়নুল আছার, ২খ., পৃ. ৭৮)।
উক্ত মহিলা যেই সাহসিকতার সঙ্গে প্রাণ দেয়, বিস্ময়কর ভাব-লেশহীন চিত্তে যেইভাবে মৃত্যুকে বরণ করে তাহা আবূ দাউদ ও সীরাতে ইবন হিশামে নিম্নোল্লেখিতভাবে বর্ণিত হইয়াছে। যাহাদিগকে হত্যা করা হইবে তাহাদের তালিকায় নিজের নাম থাকার কথা ঐ নারী পূর্ব হইতে জানিত। হত্যাস্থানে একেকজন অপরাধী নামানুসারে পর্যায়ক্রমে যাইতেছিল এবং মৃত্যুর শাস্তি গ্রহণ করিতেছিল। ঘোষক একেকজনের নাম ধরিয়া ডাকিতেছিল, উক্ত ধ্বনি তাহার কর্ণে আসিয়া পৌঁছিতেছিল। তাহার পরও একান্ত স্বাভাবিক অবস্থায় হযরত আয়েশা (রা)-এর সঙ্গে সে আলাপচারিতায় লিপ্ত ছিল এবং কথায় কথায় হাসিতেছিল, কখনও সশব্দে—আবার কখনও মুখ চাপিয়া। হঠাৎ তাহার নামের ডাক পড়িলে সে ভাবলেশহীন চিত্তে উঠিয়া দাঁড়ায়। হযরত আয়েশা (র) বলেন, আমি তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, কি ব্যাপার! তোমার কী হইল? কোথায় যাইতেছ? সে বলিল, আমি এক ঘটনা ঘটাইয়াছিলাম, করিয়াছিলাম এক অপরাধ, উহার শাস্তি ভোগ করিতে যাইতেছি। আমাকে এখন হত্যা করা হইবে। এই বলিয়া সে প্রফুল্ল ও সন্তুষ্ট চিত্তে হত্যাস্থলে আসিয়া তরবারির নিচে মাথা রাখে। আয়েশা (রা) এই ঘটনা যখনই বর্ণনা করিতেন, ভাষায় ও বর্ণনায় তাহার বিস্ময়ের প্রকাশ ঘটিত। তিনি বলিতেন, আল্লাহ্ শপথ! অচিরেই হত্যার সম্মুখীন হইতে হইবে ইহা জানা সত্ত্বেও পূর্বক্ষণে আমার সম্মুখে অধিক হাস্য, প্রফুল্লতা ও আনন্দোচ্ছলতার যেই বিস্ময়কর স্মৃতি উক্ত নারী রাখিয়া গিয়াছে তাহা আমি আজিও ভুলিতে পারি নাই (আবূ দাউদ, ২খ., পৃ. ১৪; ইবন হিশাম, ২খ., পৃ. ১৫৫)।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর নির্দেশ ছিল শুধু প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষগণকে হত্যা করার। এইজন্য কিশোর 'আতিয়‍্যা আল-কুরাজী অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার কারণে মৃত্যুদণ্ড হইতে মুক্তিলাভ করে। জীবিত ছাড়া পাইয়া সে ইসলাম গ্রহণ করে (ইবন হিশাম, ঐ, পৃ. ১৫৭)। অপরদিকে রিফা'আ ইব্‌ সামওয়াল আল-কুরাজী (رفاعة بن سموأل القرظي) প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া সত্ত্বেও বাঁচিয়া যায়, প্রাণে রক্ষা পায়—শুধু সালমা বিনত কায়স নামক রাসূলুল্লাহ (স)-এর এক খালার একান্ত আবেদনের ভিত্তিতে। তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর সঙ্গে উভয় কিবলামুখী হইয়া সালাত আদায় করিয়াছিলেন এবং তাঁহার কাছে বায়'আত গ্রহণ করেন। তাহার আবেদনের কারণে রাসূলুল্লাহ (স) রিফাআকে তাঁহার যিম্মায় ছাড়িয়া দিলে সে প্রাণে রক্ষা পায় এবং ইসলাম গ্রহণ করে (ইব্‌ن হিশাম, ঐ, পৃ. ১৫৭)।
ছাবিত ইব্‌ন কায়স (রা)-এর নিকট যুবায়র ইব্‌ন বাতা (الزبير بن باطا)-র প্রাপ্য সম্পত্তি ছিল। রাসূলুল্লাহ (স) যুবায়র, তাহার পরিবার ও সম্পত্তির মালিকানা ছাবিতকে প্রদান করিয়াছিলেন। সেই সূত্রে তিনি তাহার সব কিছুর মালিক হইয়াছিলেন। অতঃপর যুবায়র ছাবিতের নিকট সব কিছুর উপর হইতে মালিকানা ছাড়িয়া দেওয়ার বিনীত আবেদন করিলে তিনি স্বীয় মালিকানা ছাড়িয়া দিয়া বলিলেন, "আল্লাহ্র রাসূল আমার নিকট তোমাকে, তোমার সম্পদ ও পরিবারকে দান করিয়াছিলেন। সেই সূত্রে আমি তোমাদের সব কিছুর মালিক হইয়াছিলাম। এখন সবই তোমার।" যুবায়র যখন তাহার কওমের (বানু কুরায়যা) লোকজনকে হত্যার ব্যাপারে অবহিত হইল, তখন অত্যন্ত মর্মাহত ও নিজের জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হইয়া বলিল, হে ছাবিত! তুমি যদি আমাকে আমার প্রিয়জনদিগের সহিত হত্যার মাধ্যমে মিলিত না কর তাহা হইলে তোমার নিকট আমি আমার সম্পদও চাহিব। অনন্তর তাহার আকাঙ্খানুযায়ী ছাবিত (রা) তাহাকে শিরশ্ছেদের স্থানে পৌছাইয়া দেন। ছাবিত এই ব্যাপারে যুবায়র-পুত্র আবদুর রাহমান্ ইব্‌ন বাতার নিকট তাহার পিতাকে বাঁচাইতে ব্যর্থ হওয়ার কথা জানান। ইহাতে প্রভাবিত হইয়া সে ইসলাম গ্রহণ করে (আর-রাহীক, পৃ. ২৯১)।
হযরত সা'দ ইব্‌ন যায়দ আল-আন্সারী (রা)-র তত্ত্বাবধানে বানু কুরায়যার বন্দী মহিলা ও শিশুদিগকে বিক্রয়ের জন্য নজদ-এ পাঠান হয়। সা'দ উহাদের বিনিময়ে অশ্ব ও অস্ত্র ক্রয় করেন (ইব্‌ন হিশাম, ৩খ., পৃ. ১৫৭; সীরাতুল মুসতাফা, ২খ., পৃ. ৩২৯)।
অবশ্য আমর ইবন খুনাফার কন্যা রায়হানার আবেদনক্রমে রাসূলুল্লাহ (স) কুরায়যার মহিলাদের মধ্য হইতে কেবল তাহাকেই উপরিউক্ত দল হইতে পৃথক করিয়া নিজের মালিকানায় রাখিয়া দেন। পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করিলে তাহার প্রতি তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন। ইব্‌ন ইসহাকের বর্ণনানুযায়ী রাসূলুল্লাহ (স)-এর মৃত্যু পর্যন্ত তিনি তাঁহার মালিকানায় ছিলেন। অর্থাৎ তিনি তাহাকে স্বীয় দাসী অবস্থায় রাখিয়াই ইন্তিকাল করেন (ইব্‌ন হিশাম, ঐ, পৃ. ১৫৭)। আর কালবীর বর্ণনানুযায়ী তিনি তাহাকে মুক্ত করিয়া দেন এবং ৬ষ্ঠ হিজরীতে তাঁহাকে বিবাহ করেন। বিদায় হজ্জ সম্পাদন করিয়া মক্কা হইতে রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর প্রত্যাবর্তনের পর হযরত রায়হানা ইন্তিকাল করেন। তিনি তাঁহাকে জান্নাতুল বাকীতে দাফন করেন (আর-রাহীক, পৃ. ২৯১)। অপর এক বর্ণনামতে রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে তাঁহার পরিবারের সহিত বসবাসের জন্য মুক্ত করিয়া দেন। অতঃপর তিনি তাঁহার পরিবারের নিকট চলিয়া যান (ইসাবা, ৪খ., পৃ. ৪০৯)। ইব্‌ন হিশামের বর্ননানুযায়ী বানু কুরায়যার কিছু সংখ্যক শিশু ও মহিলাকে মুসলমানগণের মধ্যেও বণ্টন করা হইয়াছিল।
বানু কুরায়যা হইতে প্রাপ্ত সকল সম্পদ রাসূলুল্লাহ্ (স) মুসলমানগণের মধ্যে বণ্টন করিয়া দেন। তবে প্রথমে উক্ত সম্পদের এক-পঞ্চমাংশ পৃথক করেন। অতঃপর অশ্বারোহী সৈন্যের জন্য তিন অংশ অর্থাৎ অশ্বের দুই অংশ এবং অশ্বারোহীর জন্য এক অংশ নির্ধারণ করেন। পদাতিক সৈন্যের জন্য এক অংশ ধার্য করেন। যুদ্ধলব্ধ সম্পদে দুই অংশ নির্ধারণ এবং পঞ্চমাংশ পৃথক করার ইহাই ছিল প্রথম ঘটনা। বণ্টনের ঐ নিয়মই তখন হইতে প্রবর্তিত হয় এবং ঐ ধারাই পরবর্তীতে চালু থাকে (ইবন হিশাম, ঐ, পৃ. ১৫৭; আর-রাহীক, পৃ. ২৯১; যুরকানী, ২খ., পৃ. ১৩৭)। প্রাপ্ত সকল সম্পত্তি ৩ হাজার ৭২ অংশে বিভক্ত হয় (তাবাকাত ইবন সা'দ, ২খ., পৃ. ৭৫)।
বানু কুরায়যার অধিবাসীদের মধ্যে মুষ্টিমেয় এমন কিছু লোক ছিল যাহারা অবরোধের শেষ প্রান্তে রাসূলুল্লাহ (স)-এর যে কোন নির্দেশ মানিয়া লওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্ব রাত্রেই ইসলাম গ্রহণ করেন। ফলে তাহাদের জীবন, সম্পদ ও স্ত্রী-পুত্রদিগকে রক্ষা করা হয়। তাহারা যাবতীয় ক্ষতি হইতে নিষ্কৃতি পায়। আমর ইব্‌ন সুদা নামে তাহাদের মধ্যে এমন এক সৌভাগ্যবান ব্যক্তিও ছিল যে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতায় বানু কুরায়যার সঙ্গে অংশগ্রহণ করে নাই। রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিরাপত্তা বাহিনী প্রধান মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা উক্ত রাত্রে দুর্গ হইতে তাহাকে বাহির হইতে দেখেন এবং তাহাকে চিনিতে পারিয়া ছাড়িয়া দেন। তিনি জানিতে পারেন নাই তাহার গন্তব্যস্থল (আর-রাহীক, পৃ. ২৯১)। এইভাবে বানু কুরায়যার কিছু সংখ্যক লোক শাস্তি হইতে রক্ষা পায়। বানু কুরায়যার ঘটনা প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা নিম্নোক্ত আয়াত অবতীর্ণ করেন: وَأَنْزَلَ الَّذِينَ ظَاهَرُوهُمْ مِّنْ أَهْلِ الْكِتَابِ مِنْ صَيَاصِيْهِمْ وَقَذَفَ فِي قُلُوبِهِمُ الرُّعْبَ فَرِيقًا تَقْتُلُونَ وَتَأْسِرُونَ فَرِيقًا . وَأَوْرَثَكُمْ أَرْضَهُمْ وَدِيَارَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ وَأَرْضًا لَّمْ تَطَئُوهَا وَكَانَ اللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ.
"কিতাবীদের মধ্যে যাহারা উহাদিগকে সাহায্য করিয়াছিল তাহাদিগকে তিনি তাহাদের দুর্গ হইতে অবতরণ করাইলেন এবং তাহাদের অন্তরে ভীতি সঞ্চার করিলেন। এখন তোমরা উহাদের কতককে হত্যা করিতেছ এবং কতককে করিতেছ বন্দী। আর তিনি তোমাদিগকে অধিকারী করিলেন উহাদের ভূমি, ঘরবাড়ি ও ধনসম্পদের এবং এমন ভূমির যাহা তোমরা এখনও পদানত কর নাই। আল্লাহ্ সর্ব বিষয়ে সর্বশক্তিমান" (৩৩: ২৬, ২৭)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 একটি ভুল ধারণার অপনোদন

📄 একটি ভুল ধারণার অপনোদন


ইসলাম বিরোধী শিবির বানু কুরায়যাকে শাস্তি সম্বন্ধে নিষ্ঠুরতা ও অত্যাচারের জোর আপত্তি তুলিয়াছে। তাহারা শুধু ঘটনার খোলস তথা বাহিরের দিকটাই দেখিয়াছে। উহার অভ্যন্তরে তলাইয়া দেখে নাই, শাস্তির রূপকেই প্রাধান্য দিয়াছে, উহার কারণ লইয়া পর্যালোচনা করে নাই। যদি তাহারা নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ হইতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত বানু কুরায়যার আচরণ গভীরভাবে পর্যালোচনা করিত তাহা হইলে কোনভাবেই নিষ্ঠুরতার অপবাদ উত্থাপন করিত না। নিম্নে প্রকৃত ব্যাপার তুলিয়া ধরা হইতেছে যাহার দ্বারা বুঝা যাইবে, কেন তাহাদের বিরুদ্ধে সা'দ (রা) উপরিউক্ত রায় প্রদান করিয়াছিলেন।
(১) মদীনায় পৌঁছিয়া রাসূলুল্লাহ (স) বানু কুরায়যার সঙ্গে সদয় আচরণ করেন এবং মৈত্রী চুক্তি স্থাপন করেন।
(২) তিনি তাহাদের সঙ্গে যেই চুক্তি সম্পাদন করিয়াছিলেন তাহাতে তাহাদেরকে পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং জানমাল রক্ষার নিশ্চয়তা প্রদান করা হইয়াছিল।
(৩) বানু কুরায়যা বানু নাযীর অপেক্ষা কম মর্যাদাসম্পন্ন হিসাবে বিবেচিত ছিল। বানু নাযীরের কাহারও দ্বারা বানু কুরায়যার কেহ নিহত হইলে তাহার রক্তপণ ছিল অর্ধেক। অপরদিকে বানু কুরায়যার দ্বারা বানু নাযীরের কেহ নিহত হইলে কুরায়যার ইয়াহুদীদিগকে পূর্ণ রক্তপণ পরিশোধ করিতে হইত। মানবতার মুক্তির দিশারী রাসূলুল্লাহ (স) বানু কুরায়যাকে এই সামাজিক বৈষম্যের শৃংখল হইতে মুক্ত করেন। তিনি তাহাদের মর্যাদা বানু নাযীরের সমান করিয়া দেন (আবূ দাউদ, ২খ., পৃ. ২৭৭)।
(৪) রাসূলুল্লাহ (স) বানু নাযীর কে মদীনা হইতে বহিষ্কার করার পর বানু কুরায়যার সঙ্গে চুক্তি নবায়ন করেন। পুনঃ চুক্তির মাধ্যমে তিনি তাহাদিগকে স্বীয় বাসস্থানে অবস্থানের সুযোগ দেন।
(৫) তাহাদের সঙ্গে এত ভাল আচরণ করার পরও মুসলমানগণ যখন তাহাদের জীবনের সর্বাপেক্ষা কঠিন মুহূর্ত অতিক্রম করিতেছিলেন, ইসলাম বিরোধী বহিঃ শত্রুর সম্মিলিত আক্রমণ হইতে দেশ ও জাতিকে রক্ষা করার লক্ষ্যে একাধারে কয়েক দিন ক্ষুধার্ত অবস্থায় দীর্ঘ পরিখা খননের মাধ্যমে রণপ্রস্তুতিতে যখন একেবারে ক্লান্ত ও অবসন্নপ্রায় ঠিক এমন সঙ্কটময় পরিস্থিতি ও নাযুক অবস্থায় তাহারা মদীনার ভিতরে থাকিয়াই রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত কৃত চুক্তি ভঙ্গ করে এবং মুসলমানগণকে সমূলে ধ্বংস করার জন্য ইয়াহুদী-কুরায়শ সামরিক শক্তির পক্ষাবলম্বন করে।
(৬) মুসলিম নারী ও শিশুগণকে হেফাজতের জন্য তাঁবুতে প্রেরণ করা হইলে তাহারা তাঁহাদের উপর আক্রমণ করিতে উদ্যত হয় (সীরাতুন নবী, ১খ., পৃ. ২৫৪)।
(৭) জঘন্য বিশ্বাসঘাতকতা ছাড়াও এই অকৃতজ্ঞ গোষ্ঠী মুসলমানগণের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য পনর শত তরবারি, দুই হাজার বর্শা-বল্লম, তিন শত বর্ম ও পনর শত ঢাল সংগ্রহ করিয়া রাখিয়াছিল যাহা তাহাদের দুর্গ বিজিত হওয়ার পর মুসলিম বাহিনীর হস্তগত হয় (তাবাকাত ইবন সা'দ, পৃ.৭৫)।
(৮) খন্দক যুদ্ধের মূল উস্কানীদাতা "হুয়াই ইব্‌ন আখতাব", যাহাকে বিদ্রোহের অপরাধে মদীনা হইতে বহিষ্কার করা হইয়াছিল এবং যে গোটা আরবকে উস্কানী দিয়া আহযাব (খন্দক) যুদ্ধের আয়োজন করিয়াছিল, বানু কুরায়যা এমন রাষ্ট্রদ্রোহী শত্রু নিজেদের সঙ্গে রাখিয়া গাদ্দারী ও হঠকারিতার পরাকাষ্ঠা দেখায়।
এমতাবস্থায় তাহাদের সঙ্গে উপরিউক্ত আচরণ ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না। তাহারা নিজেদের কুকর্মের ফলে সর্বাপেক্ষা জঘন্য যুদ্ধাপরাধীদের মধ্যে গণ্য হইয়াছিল, যাহাদের প্রাপ্য কেবল মৃত্যুদণ্ডই (আর-রাহীক, পৃ. ২৯০)।
আরবে চুক্তির গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। মৈত্রী চুক্তিকে প্রকৃত ভ্রাতৃত্বের সমতুল্য মনে করা হইত। মৈত্রী বন্ধনের ফলে রক্তের সম্পর্কের ন্যায় অনেক সময় গভীর সম্পর্ক সৃষ্টি হইত। বানু কুরায়যার মিত্র আওসের অবস্থা ছিল ঠিক অনুরূপ। তাহারা মনে-প্রাণে চাহিতেছিল, বানু কুরায়যা যেন কোনরূপ শাস্তির সম্মুখীন না হয়। তাহাদের সঙ্গে যেন ক্ষমা সুন্দর আচরণ করা হয়। তাহাদের ব্যাপারে আওস গোত্রপতি সা'দ ইব্‌ن মু'আয (রা)-র পেরেশানীও কম ছিল না। চুক্তির ব্যাপারে তিনিই ছিলেন প্রকৃত যিম্মাদার। তাহাদের সঙ্গে তাঁহার ঘনিষ্ঠতা ছিল অপেক্ষাকৃত বেশী। তিনি ব্যক্তিগতভাবে ছিলেন তাহাদের বড় হিতাকাঙ্খী। কিন্তু এই হতভাগ্য জাতির অপরাধ এতই মারাত্মক ছিল যে, এত কিছুর পরও তাঁহার (সা'د) পক্ষে উপরিউক্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া ছাড়া আর কোন উপায় ছিলনা (সীরাতুন নবী, পৃ. ২৫৫)। অপরাধ অনুপাতে সা'দ (রা)-র ফয়সালা ছিল পুরাপুরি ন্যায় ও ইনসাফ ভিত্তিক। ইহাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ নাই। এই ঘটনার উপর আলোকপাত করিতে গিয়া R.V.C Bodley তাহার The Messenger The life of Muhammad নামক বিখ্যাত গ্রন্থে লিখিয়াছেন:
"মুহাম্মাদ আরবে একা ছিলেন। এই ভূখণ্ড আকার-আয়তনের দিক দিয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক-তৃতীয়াংশ এবং ইহার লোকসংখ্যা ছিল পঞ্চাশ লাখ। তাহাদের নিকট এমন কোন সৈন্যবাহিনী ছিল না যাহারা জনসাধারণকে আদেশ পালনে ও আনুগত্য প্রদর্শনে বাধ্য করিতে পারে, কেবল একটা ক্ষুদ্র সেনাদল ছাড়া, যাহার সংখ্যা ছিল মাত্র তিন হাজার। এই বাহিনীও আবার পরিপূর্ণরূপে অস্ত্রসজ্জিত ছিল না। এমতাবস্থায় যদি মুহাম্মাদ (স) কোনরূপ শৈথিল্য কিংবা গাফলতিকে প্রশ্রয় দিতেন এবং বানু কুরায়যাকে তাহাদের বিশ্বাস ভঙ্গের কোনরূপ শাস্তি দান ব্যতিরেকে ছাড়িয়া দিতেন তাহা হইলে আরব উপদ্বীপে ইসলামের অস্তিত্ব রক্ষা করা কঠিন হইত। ইহাতে কোন সন্দেহ নাই যে, ইয়াহুদীদের হত্যার ব্যাপার খুবই কঠিন ছিল। কিন্তু ইয়াহুদীদের ধর্মীয় ইতিহাসে উহা কোন নূতন ব্যাপার ছিল না। আবার মুসলমানগণের দিক হইতে ঐ কাজের পিছনে পূর্ণ বৈধতা ও অনুমোদন বর্তমান ছিল (The Messenger The life of Muhammad, London 1946, P. 202-3; নবীয়ে রহমত, পৃ. ২৭৭)। স্যার স্টানলী লেনপুল বলেন, "মনে রাখিতে হইবে যে, তাহাদের অপরাধ ছিল দেশের সঙ্গে গাদ্দারী এবং তাহাও আবার অবরোধের মত সংকটময় অবস্থায় (Selection from the Quran, P. IXV)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সদূরপ্রসারী প্রভাব

📄 সদূরপ্রসারী প্রভাব


উদীয়মান ইসলামী রাষ্ট্রের জন্য হযরত সা'দ ইব্‌ন মু'আয (রা)-র উপরিউক্ত রায়ের প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। উক্ত ফয়সালা কার্যকর হওয়ার ফলে মদীনা ইয়াহুদী ষড়যন্ত্র, প্রতারণা ও বিশৃংখলা, নিরাপত্তাহীনতা ও অস্থিতিশীলতা হইতে মুক্ত ও নিরাপদ হইয়া যায়। মুসলমানগণের জন্য পিছন হইতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা দূরীভূত হইয়া যায়। এই ঘটনার পর মুসলমানদের বিরুদ্ধে কোন রকম অভ্যন্তরীণ চক্রান্ত মাথাচাড়া দিয়া উঠিতে পারে নাই। ফলে তাহারা পূর্বাপেক্ষা নিশ্চিন্ত জীবনের স্বাদ আস্বাদন করিতে শুরু করেন। ইহার পর ভিতর ও বাহির শত্রুর আক্রমণের থাবা হইতে মদীনা অধিকতর নিরাপদ ও সুরক্ষিত হইয়া উঠে।
সা'দ (রা)-এর ঐ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হওয়ার ফলে অপরাপর আরব গোত্রসমূহও কোনরূপ চুক্তি ভঙ্গ ও গাদ্দারী করার পূর্বে বারবার চিন্তা-ভাবনা করিতে বাধ্য হয়। কেননা ইহার পরিণতি কত মারাত্মক হইতে পারে তাহা তাহারা স্বচক্ষেই দেখিয়াছিল যে, মুহাম্মাদ (স) তাঁহার ফয়সালা কার্যকর করার ক্ষমতা রাখেন (The Messenger The life of Muhammad, London 1946, P. 202-3; নবীয়ে রহমত, পৃ. ২৭৭)।
মদীনার ইয়াহুদীদের সর্বশেষ ঘাঁটি বানু কুরায়যার দুর্গ পতনের পর মুনাফিক শিবির স্বাভাবিকভাবেই দুর্বল হইয়া যায়। তাহাদের তৎপরতায় ভাটা পড়ে ও মনোবল ভাঙ্গিয়া যায়। ড. ইসরাঈল ওয়েলফিন্সন-এর মতে, "বানু কুরায়যার পতনের পর মুনাফিকদিগের আওয়াজ উচ্চগ্রাম হইতে নিম্নগ্রামে নামিয়া আসে' (নবীয়ে রহমত, পৃ. ২৭৭)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00