📄 অনুশোচনার এক অভিনব দৃষ্টান্ত: আবূ লুবাবা (রা)
অবরোধের শৃংখল হইতে মুক্তির জন্য উপস্থাপিত কা'ب-এর প্রস্তাবসমূহ প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর বানু কুরায়যার জন্য রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর সিদ্ধান্ত মানিয়া লওয়া ছাড়া আর কোন উপায় অবশিষ্ট থাকিল না। তবে তাহার পূর্বে তাঁহার সিদ্ধান্ত অবনত মস্তকে মানিয়া লইলে তাহাদের কী অবস্থা হইবে, কোন ধরনের শাস্তি ভোগ করিতে হইবে তাহা অবগত হওয়ার জন্য তাহারা তাহাদের কতক মুসলিম মিত্রের সহিত মিলিত হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করিল। আওস গোত্রের মিত্র বানু আমর ইবন 'আওফ বংশের নেতৃস্থানীয় আনসার সাহাবী আবূ লুবাবা (রা), যাহার আসল নাম রিফা'আ ইব্ন আবদুল মুনযির, ছিলেন বানু কুরায়যার এক ঘনিষ্ঠ মিত্র। তাঁহার সন্তান ও ধন-সম্পদও থাকিত তাহাদের এলাকাতে (আর-রাহীক, পৃ. ২৮৯)। সুতরাং সঙ্গত কারণেই তাহাদের হৃদয়ে এই আশার সঞ্চার হইল যে, সম্ভবত এই বিপদের সময় তিনি অন্তত সুপরামর্শ দিয়া তাহাদের কোন সাহায্য করিতে পারিবেন।
তাহারা তাহার সঙ্গে সরাসরি কথা বলিবার জন্য চিৎকার করিয়া ডাকিল। তিনি বলিলেন, আমি তোমাদের নিকট যাইব না যতক্ষণ না আল্লাহ্র রাসূল (স) আমাকে অনুমতি প্রদান করিবেন (আল-বিদায়া, ৪খ., পৃ. ১২১)। তাহারা নিজেদের ব্যাপারে পরামর্শাদির জন্য আবূ লুবাবা (রা)-কে তাহাদের নিকট পাঠাইবার আবেদন জানাইয়া স্বয়ং রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর নিকট বার্তা পাঠাইল। তিনি তাহাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাহাকে পাঠাইয়া দেন। আবু লুবাবাকে দেখিয়া বানু কুরায়যার পুরুষগণ ছুটিয়া আসিল। তাহার সম্মুখে তাহাদের শিশু ও মহিলাগণ কান্নায় ভাঙ্গিয়া পড়িল। ইহাতে তাহার হৃদয় বিগলিত হইয়া গেল। তাহাদের প্রতি তিনি দয়ার্দ হইয়া উঠিলেন। তাহারা তাহাকে বলিল, "আমরা রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর সিদ্ধান্ত কি মানিয়া লইব? তাঁহার ফয়সালার উপর কি সন্তুষ্ট থাকিব? তিনি বলিলেন, হাঁ, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তিনি হস্ত দ্বারা কণ্ঠনালীর দিকে ইশারা করিয়া বুঝাইয়া দিলেন যে, তাহাদের যবাহ করা হইবে। ইহার পর তিনি সেখান হইতে প্রস্থানের জন্য পা উঠানোর পূর্বেই বুঝিতে পারিলেন যে, গোপনীয়তা ফাঁস করিয়া তিনি আল্লাহ ও তদীয় রাসূলের সহিত বিশ্বাসভঙ্গ করিয়াছেন। তখনই তিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিলেন: (ক) “যেই ভূমিতে এই ঘটনা ঘটিয়াছে সেইখানে তিনি থাকিবেন না (আল-কামিল ফি’ত তারীখ, পৃ.৭৫); (খ) আল্লাহ্র রাসূলের সম্মুখে নিজের চেহারা দেখাইবেন না যতক্ষণ না এমন খাঁটি তওবা করিবেন যাহা কেবল আল্লাহই জানেন (বিদায়া, ৪খ., পৃ. ১২১) (গ) তিনি আল্লাহ্র শপথ করিয়া বলিলেন, যতক্ষণ না আল্লাহ্ আমার তওবা কবুল করিবেন ততক্ষণ আমি পানাহার করিব না। এমনকি এই অবস্থায় আমার মৃত্যু হইয়া গেলেও না” (রূহুল মা’আনী, ৯খ., পৃ. ১৯৫)।
আবূ লুবাবা (রা)-এর উপরিউক্ত ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মু’মিনদের সতর্কীকরণার্থে আল্লাহ তা’আলা নিম্নোক্ত আয়াত অবতীর্ণ করেন: يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَا تَخُونُواْ ٱللَّهَ وَٱلرَّسُولَ وَتَخُونُوٓاْ أَمَٰنَٰتِكُمْ وَأَنتُمْ تَعْلَمُونَ. “হে মুমিনগণ! তোমরা জানিয়া-শুনিয়া আল্লাহ্ ও তাঁহার রাসূলের সহিত বিশ্বাসভঙ্গ করিবে না এবং তোমাদিগের পরস্পরের আমানত সম্পর্কেও না” (৮: ২৭)।
যাহা হউক, তিনি উপরিউক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ পূর্বক কালবিলম্ব না করিয়া দুর্গ হইতে ফিরিয়া আসিলেন এবং রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর খিদমতে উপস্থিত না হইয়া সরাসরি মসজিদে নববীতে আসিয়া উহার এক খুঁটির সঙ্গে নিজেকে বাঁধিয়া ফেলিলেন এবং ঘোষণা করিলেন যে, (ক) যতক্ষণ না আল্লাহ তাহার অপরাধ ক্ষমা করিবেন ততক্ষণ তিনি সেই স্থান ত্যাগ করিবেন না; (খ) তিনি আল্লাহ্ তা’আলার সঙ্গে এই অঙ্গীকার করিলেন যে, ভবিষ্যতে বানু কুরায়যার এলাকায় প্রবেশ করিবেন না (বিদায়া, ৪খ., ১২২; সীরাতুল মুসতাফা, পৃ. ৩২৬-২৭; ইব্ن হিশাম, পৃ. ১৫১); (গ) তিনি ইহাও শপথ করিলেন যে, যতক্ষণ না আল্লাহর রাসূল নিজ হাতে তাঁহার বন্ধন খুলিয়া দিবেন ততক্ষণ তিনি উহা খুলিবেন না বা কাহাকেও খুলিতে দিবেন না (আল-কামিল, পৃ. ৭৫; ইব্ن হিশাম, টীকা ১৫)।
আল্লাহ্র রাসূলের নিকট যখন এই সংবাদ পৌঁছিল তখন তিনি বলিলেন, "আমার অনুপস্থিতিতে আবূ লুবাবা ফেতনায় পতিত হইয়াছে (বিদায়া, পৃ. ১২১)। সরাসরি সে আমার নিকট আসিলে তাহার জন্য আমি ক্ষমা প্রার্থনা করিতাম। যখন সে নিজ বুদ্ধিতে ক্ষমা প্রাপ্তির জন্য ঐ পদ্ধতি অবলম্বন করিয়াই ফেলিয়াছে তখন আমিও তাহাকে স্বহস্তে মুক্ত করিব না যতক্ষণ না আল্লাহ্ তা’আলা তাহার তওবা কবুল করেন" (ইব্ন হিশাম, ৩খ., পৃ. ১৫১; বিদায়া, ৪খ., পৃ. ১১৯)। মসজিদে নববীতে খুঁটির সঙ্গে বন্ধনাবস্থায় ছয় দিন (আল-বিদায়া, ১২২; ইব্ن হিশাম, ঐ ১৫২), মতান্তরে ২০ দিন ছিলেন। প্রত্যেক নামাযের সময় তাহার স্ত্রী আসিয়া নামায আদায়ের জন্য তাহার বন্ধন খুলিয়া দিতেন। নামায শেষ হইতেই তিনি পুনরায় নিজেকে বাঁধিয়া লইতেন। অবশেষে আল্লাহ তাঁহার তওবা কবুল করেন এবং উম্মু সালামার গৃহে অবস্থানরত আল্লাহ্র রাসূলকে নিম্নোক্ত আয়াতের মাধ্যমে সাহরীর সময় তাহা অবহিত করেন : وَآخَرُونَ اعْتَرَفُوا بِذُنُوبِهِمْ خَلَطُوا عَمَلاً صَالِحًا وَآخَرُ سَيِّئًا عَسَى اللَّهُ أَنْ يَتُوبَ عَلَيْهِمْ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ.
"এবং অপর কতক লোক নিজদিগের অপরাধ স্বীকার করিয়াছে, উহারা এক সৎকর্মের সহিত অপর অসৎ কর্ম মিশ্রিত করিয়াছে; আল্লাহ হয়ত উহাদিগকে ক্ষমা করিবেন। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু" (৯: ১০২; ইব্ن হিশাম, ৩খ., পৃ. ১৫২; বিদায়া, ৪খ., পৃ. ১২২)।
এই সংবাদে আল্লাহ্র রাসূল হাসিতে লাগিলেন। হযরত উম্মু সালামা (রা) তাঁহাকে হাসির কারণ জিজ্ঞাসা করিলেন। তিনি বলিলেন, আবু লুবাবার তওবা কবুল হইয়াছে। উম্মু সালামা (রা) স্বয়ং এই সংবাদ আবু লুবাবাকে দেওয়ার জন্য রাসূলের নিকট অনুমতি প্রার্থনা করিলেন। রাসূলুল্লাহ্ তাঁহাকে অনুমতি দিলে তিনি সানন্দ চিত্তে বাহির হইয়া আবূ লুবাবাকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, "সুসংবাদ লও! আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করিয়াছেন।" সাহাবাদের মধ্যে এই সংবাদ ছড়াইয়া পড়িলে তাঁহারা তাঁহাকে বন্ধনমুক্ত করিবার জন্য ছুটিয়া আসিলেন। তখন আবূ লুবাবা বলিলেন, কখনও না, আল্লাহ্র কসম! যতক্ষণ না আল্লাহ্র রাসূল স্বয়ং তাঁহার মুবারক হস্তে আমাকে মুক্ত করিবেন ততক্ষণ আমি এই অবস্থায় থাকিব, কাহারও মাধ্যমেই মুক্ত হইব না। অনন্তর রাসূলুল্লাহ্ (স) ফজরের নামায আদায়ের উদ্দেশে তাঁহার পার্শ্ব দিয়া অতিক্রম কালে তাহার বন্ধন খুলিয়া দিয়া তাহার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করিলেন (বিদায়া, ঐ, পৃ. ১২২-১২৩; ইব্ن হিশাম, ঐ, পৃ. ১৫২)।
📄 ভীত-সন্ত্রস্ত বানু কুরায়যার নমনীয় মনোভাব
বিশ্বাসঘাতকতা ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের জন্য রাসূলুল্লাহ (স)-এর পক্ষ হইতে কেমন কঠিন শাস্তি ভোগ করিতে হইবে তাহা আবু লুবাবার মাধ্যমে অবগত হওয়ার পরও বানু কুরায়যা রাসূলুল্লাহ (স)-এর সিদ্ধান্ত মানিয়া লইতে প্রস্তুত হয়। অথচ তাহারা মুসলমানদের তুলনায় অনেক অনুকূল ও ভাল অবস্থানে ছিল। দীর্ঘ অবরোধের ধকল সামাল দেওয়ার ক্ষমতা তাহাদের ছিল। কারণ তাহাদের পর্যাপ্ত কূপ, পানি ও খাদ্যসামগ্রী মওজুদ ছিল। দুর্গও ছিল বেশ সুরক্ষিত ও দুর্ভেদ্য। অপরদিকে মুসলমানগণ খন্দকের যুদ্ধের পূর্ব হইতে যুদ্ধ সংক্রান্ত কার্যাবলী চালাইয়া আসার কারণে যেমন চরম ক্লান্ত অবস্থায় ছিলেন, আবার বানু কুরায়যাকে অবরোধকালে দুর্গের বাহিরে উন্মুক্ত আকাশের নিচে অবস্থানের ফলে তাহাদেরকে তীব্র ক্ষুধার যন্ত্রণা এবং প্রচণ্ড শীতের কষ্টও ভোগ করিতে হইতেছিল। ইহার পরও এমন কী ঘটিয়াছিল যাহার কারণে তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর ফয়সালা শিরধার্য করিয়া লইতে বাধ্য হয়। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তা'আলা তাহাদের অন্তরে ভীতি সঞ্চার করেন। ফলে তাহারা যুদ্ধ করার সাহস হারাইয়া ফেলে।
হিজরতের পর মদীনায় ইয়াহুদী গোত্রসমূহের অবস্থানসমূহ
বুহায়রা মাজমাউল আস্সায়াল রূমা কূপ উহুদ পর্বতমালা বাগ-বাগিচা আল-কানাত উপত্যকা
উত্তর
আল-আককীক উপত্যকা কালো প্রস্তরময় ভূমি (হাররা) সাল'আ পর্বত বনূ হারিছার বসতি আবদুল আশহাল গোত্রের বসতি বনূ জুফার গোত্রের বসতি
ইয়াসরিব নগরী মসজিদে নববী আল-বকী' বনু কায়নুকার আবাস
ইয়াসরিব নগরী বৃতহান উপত্যকা মাহযূর উপত্যকা মুযায়নীব উপত্যকা আল-আওয়ালী (উচ্চভূমি) বাগানসমূহ
কুবা রানুনা উপত্যকা বাগ-বাগিচা বনূ নাযীরের বসতি কা'ব ইব্ন আশরাফের দুর্গ আইর পাহাড়
যুলহুলায়ফা
কা'ব ইবন আশরাফের ভগ্ন দুর্গ। তাফহীমুল কুরআনের সৌজন্যে (আধুনিক প্রকাশনী)।
📄 সা'দ ইব্ন মু'আয (রা)-এর ফায়সালা
তাহাদের মনোবল ভাঙ্গিয়া পড়ে। এই ভাঙ্গন চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হয়। তখন আলী (রা) ও যুবায়র ইবনুল আওয়াম (রা) উচ্চস্বরে সম্মুখে অগ্রসর হইয়া যান এবং আলী (রা) বলিতে থাকেন, হে ঈমানদার বাহিনী! আল্লাহ্র কসম, হয় হামযা (রা)-র ন্যায় শাহাদাতের স্বাদ আস্বাদন করিব অথবা তাহাদের দুর্গ জয় করিয়া উহাতে আমাদের বিজয়ের পতাকা উড্ডীন করিব। আলী (রা)-এর বীরোচিত ঐ ঘোষণায় তাহারা অতিমাত্রায় ভীত-সন্ত্রস্ত হইয়া দ্রুত রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর যে কোন সিদ্ধান্ত দ্বিধাহীন চিত্তে মানিয়া লইতে সম্মত হয়। রাসূলুল্লাহ (স) এই ঘটনা অবহিত হইয়া বানু কুরায়যার পুরুষদিগকে বন্দী করার নির্দেশ প্রদান করেন। ফলে তাহাদিগকে মুহাম্মাদ ইব্ন সালাম আল-আনসারী সাহাবীর তত্ত্বাবধানে বাঁধিয়া ফেলা হয়। তাহাদের নারী ও শিশুদিগকে পুরুষদিগের নিকট হইতে পৃথক ও বিচ্ছিন্ন করিয়া একপার্শ্বে রাখা হয় (আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ২৮৯)।
খাযরাজ ও বানু কায়নুকা'-এর মধ্যে যেমন মৈত্রী চুক্তির সম্পর্ক ছিল, খাযরাজের মুকাবিলায় আওস বানু কুরায়যার মধ্যেও তেমন ইসলাম-পূর্ব কাল হইতে মৈত্রী চুক্তির বন্ধন ছিল। সুতরাং বানু কুরায়যার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (স) যেই নির্দেশ দিবেন তাহাই তাহারা মানিয়া লইবে, এমন কথা জানার পর আওস গোত্র তাহাদের সাহায্যার্থে রাসূলের নিকট ছুটিয়া আসিয়া আবেদন করিল, “হে আল্লাহর রাসূল! আবদুল্লাহ্ ইবন উবাই ইব্ন সালূলের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের ভাই খাযরাজ গোত্রের মিত্র বানু কায়নুকা-এর সঙ্গে ইতোপূর্বে যেমন ক্ষমার আচরণ করিয়াছিলেন, আমাদের মিত্র বানু কুরায়যার সহিতও অনুরূপ আচরণ করার বিনীত অনুরোধ করিতেছি।" রাসূলুল্লাহ (স) বলেনঃ তোমরা কি ইহাতে সন্তুষ্ট নও যে, তোমাদের মধ্য হইতেই একজন তাহাদের ব্যাপারে ফয়সালা দিবেন? তাহারা জি হাঁ বলিয়া স্বতস্ফূর্ত সম্মতি জ্ঞাপন করিলে তিনি বলিলেনঃ তোমাদের গোত্রপতি সা'দ ইব্ন মু'আযকেই এই দায়িত্ব প্রদান করা হইল। তিনিই এই ব্যাপারে চূড়ান্ত ফয়সালা দিবেন। ইহাতে তাহারা সন্তুষ্টি প্রকাশ করিয়া বলিল, তিনি (সা'দ) যেই রায় প্রদান করিবেন আমরা তাহা মানিয়া লইব (আল-কামিল, পৃ. ৭৫; বিদায়া, পৃ. ১২৩)।
হযরত সা'দ (রা) খন্দকের যুদ্ধে হিববান ইব্ন আল-আরকা নামক এক কুরায়শ সৈন্যের নিক্ষিপ্ত তীরে মারাত্মকভাবে আহত হইয়া রাসূলের নির্দেশে মসজিদে নববীতে যুদ্ধাহত মুসলমানদের জন্য সাময়িকভাবে প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসা শিবিরে রূফায়দা নাম্নী এক মুসলিম মহিলার তত্ত্বাবধানে তখন পর্যন্ত চিকিৎসার্থে অবস্থান করিতেছিলেন (বিদায়া, পৃ. ১২৩; ইব্ন হিশাম, ঐ, পৃ. ১৫৩)। তিনি ছিলেন সুন্দর ও বলিষ্ঠদেহী। বানু কুরায়যা সম্বন্ধে চূড়ান্ত ফয়সালার জন্য তিনি রাসূলুল্লাহ (স) কর্তৃক বিচারক মনোনীত হইলে তাঁহাকে আনিবার জন্য তাঁহার কওমের কয়েকজন লোক সেখানে গমন করে।
অতঃপর তাহারা একটা গাধার পৃষ্ঠে চামড়ার বালিশ স্থাপন করিয়া উহার উপর তাহাদের অসুস্থ নেতাকে আরোহণ করাইয়া রাসূলের দরবারে লইয়া আসেন। পথিমধ্যে তাঁহার দুই পার্শ্বে চলমান আওস গোত্রের লোকজন তাঁহাকে বলিতে থাকে, হে আবূ আমর! আপন মিত্রদের সহিত ভাল আচরণ করিবেন। কেননা রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের সঙ্গে সদাচরণের জন্যই আপনাকে বিচারকের দায়িত্ব প্রদান করিয়াছেন। তাহাদের এই আবেদনের প্রতি কোন মনোযোগ না দিয়া তিনি নীরব থাকেন। কিন্তু তাহারা যখন একই কথা বারবার বলিতে লাগিল, তখন তিনি বলিলেন, ভাগ্যক্রমে সা'দের জন্য আজ যথার্থ সিদ্ধান্ত প্রদানে আল্লাহ্র সন্তুষ্টির মুকাবিলায় কোন ভর্ৎসনাকারীর ভর্ৎসনার পরওয়া না করার সুযোগ আসিয়াছে (ইবন হিশাম, ঐ, পৃ. ১৫৩; বিদায়া, ঐ, পৃ. ১২৩; আল-কামিল, পৃ. ৭৬)।
এতদশ্রবণে তাহাদের অনেকেই বুঝিয়া ফেলিল যে, তিনি হত্যারই নির্দেশ প্রদান করিবেন (কামিল, পৃ. ৭৬)। ফলে সেখান হইতেই তাহাদের কিছু লোক হতাশ হইয়া বানু আবদিল আশহাল-এর আবাসস্থালে প্রত্যাবর্তন করিল। তাহাদের নিকট সা'দের ঐ উক্তি শ্রবণ করিয়া বানু কুরায়যার পুরুষগণ বিলাপ করিতে শুরু করিল।
যাহা হউক, সা'দ (রা) যখন রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর নিকট পৌছিলেন, তখন রাসূলুল্লাহ (স) উপস্থিত সাহাবাগণকে উদ্দেশ্য করিয়া বলিলেন, তোমরা তোমাদের সরদারের উদ্দেশ্যে দণ্ডায়মান হও (বুখারী, ২খ., পৃ. ৫৯১; আবূ দাউদ, ৫খ., পৃ. ৩৯১; মুসলিম, ২খ., পৃ. ৯৫; কামিল, পৃ. ৭৬; বিদায়া, পৃ. ১২৩; ইব্ন হিশাম, পৃ. ১৫৩)। মুহাজিরগণ মনে করিলেন, রাসূলুল্লাহ (স) আনসারগণকে উদ্দেশ্য করিয়াই এই নির্দেশ দিয়াছেন। আনসারগণ ভাবিলেন, তিনি উপস্থিত সকল মুসলমানকে লক্ষ্য করিয়াই উহা বলিয়াছেন (বিদায়া, পৃ. ১২৩)। অনন্তর তাহারা দাঁড়াইয়া গেলেন।
যখন তাঁহাকে অবতরণ করাইয়া নির্দিষ্ট আসনে বসান হইল তখন রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, এই সকল লোক নিজেদের ফায়সালার ভার তোমার উপর অর্পণ করিয়াছে। সাহাবাগণ বলিলেন, ইহারা (বানু কুরায়যা) আপনার সিদ্ধান্ত মানিয়া লইতে প্রস্তুত রহিয়াছে। আপনার যে কোন আদেশ তাহারা শিরোধার্য করিয়া লইবে। তিনি বলিলেন, আমার হুকুম কি তাহাদের উপর কার্যকর হইবে? তাহারা বলিল, হাঁ। তিনি বলিলেন, মুসলমানগণের ক্ষেত্রে? তাহারা বলিলেন, হাঁ, মুসলমানদের ক্ষেত্রেও। এবার তিনি রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর প্রতি ইঙ্গিত করিয়া তাঁহার সম্মানার্থে স্বীয় চেহারা অন্যদিকে ঘুরাইয়া বলিলেন, এখানে যিনি আছেন তাঁহার ক্ষেত্রেও কি আমার ফয়সালা গ্রহণযোগ্য হইবে? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, "হাঁ, আমার ক্ষেত্রেও।” এবার সা'দ (রা) দ্ব্যার্থহীন ভাষায় তাহাদের ব্যাপারে নিজের রায় ঘোষণা করিলেন: (ক) "যোদ্ধা পুরুষদিগকে হত্যা করা হইবে; (খ) তাহাদের ধন-সম্পদ (মুসলমানদের মধ্যে) বণ্টন করা হইবে; (গ) তাহাদের শিশু ও মহিলাদিগকে দাস-দাসীতে পরিণত করা হইবে।" এই রায় শ্রবণ করিয়া আল্লাহ্র রাসূল (স) বলিলেন, তুমি তাহাদের ব্যাপারে অবশ্যই আল্লাহ্র নির্দেশ মুতাবিক ফয়সালা দিয়াছ (ইব্ন হিশাম, ৩খ., পৃ. ১৫৩; বিদায়া, পৃ. ১২৩)।
📄 তাওরাতের বিধান মুতাবিক ফায়সালা
বানু কুরায়যা সম্বন্ধে সা'দ ইব্ন মু'আয (রা)-এর উপরিউক্ত রায় ছিল হুবহু তাওরাতের বিধান অনুযায়ী, যাহা সম্পর্কে তাহারা ছিল পুরাপুরি ওয়াকিফহাল। তাওরাতে বর্ণিত সেই বিধান ছিল নিম্নরূপ:
"যখন তুমি কোন শহরের উপর আক্রমণের উদ্দেশ্যে উহার নিকটে আসিয়া উপনীত হইবে তখন প্রথমে সেই শহরের কর্ণধারের নিকট সন্ধির বার্তা পাঠাইবে। যদি সে সন্ধির প্রস্তাবে সম্মত হইয়া তোমার জন্য শহরের দ্বার উন্মুক্ত করিয়া দেয় তাহা হইলে সেথায় (সেই শহরে) যত লোককে পাওয়া যাইবে তাহারা সবাই তোমার করদাতা (প্রজা) ও দাস হইয়া যাইবে। আর যদি সন্ধি না করে, বরং তোমার সহিত যুদ্ধে লিপ্ত হয় তাহা হইলে ঐ শহর অবরোধ করিয়া রাখিবে। অনন্তর যখন তোমার ঈশ্বর সদাপ্রভু উহা তোমার করায়ত্বে করিয়া দিবেন তখন সেখানকার সকল পুরুষকে খড়গ দ্বারা হত্যা করিবে। অবশিষ্ট নারী, শিশু, জীবজন্তু এবং শহরের সকল জিনিস গণিমতের সম্পদ হিসাবে পরিগণিত হইবে। সুতরাং তোমার ঈশ্বর সদাপ্রভু প্রদত্ত ঐ শত্রুসম্পদ লুট ভোগ করিবে” (দ্বিতীয় বিবরণ, অধ্যায় ২০, পদ ১০-১৪; পবিত্র বাইবেল, বাংলাদেশ বাইবেল সোসাইটি, ঢাকা-১৯৭০; সীরাতুন্নবী (স), পৃ. ২৫৩)।
প্রাচীন কাল হইতেই ঐ বিধান বানু ইসরাঈলের মধ্যে প্রচলিত ছিল। যেমন তাওরাতের এক বর্ণনানুসারে তাহারা (বানু ইসরাঈল) মূসা (আ)-এর উপর আল্লাহ্র প্রত্যাদেশ অনুসারে মাদয়ানবাসীর সহিত যুদ্ধ করিয়া সেখানকার সকল পুরুষকে বধ করে। তাহাদের সহিত মাদয়ানের ইবি, রেশম, সূর, হুর ও রেবা নামক পাঁচ রাজাকে হত্যা করে। খড়গ দ্বারা হত্যা করে বিয়োরের পুত্র বিলিয়মকেও। তাহারা মাদয়ানের সকল স্ত্রীলোক ও বালক-বালিকাদিগকে বন্দী করিয়া লইয়া যায়। তাহাদের সমস্ত পশু, মেষপাল ও সকল সম্পত্তি লুট করিয়া লয়। পোড়াইয়া ফেলে তাহাদের সমস্ত ছাউনী, বাসস্থান ও শহর (পবিত্র বাইবেল, গণনা পুস্তক, ৩১ অধ্যায়, ৭-১০ পদ, বাইবেল সোসাইটি বাংলাদেশ, ঢাকা ১৯৭০; নবীয়ে রহমত, পৃ. ২৭৫)।
সুতরাং বানু কুরায়যার সম্বন্ধে সা'দ (রা)-এর ফায়সালা তাওরাতের ঐ বিধানের সহিত সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল যাহা তাহাদের পূর্বপুরুষ হইতেই প্রচলিত ও অনুসৃত হইয়া আসিতেছিল। উক্ত ফয়সালাকে রাসূলুল্লাহ্ (স) আসমানী ফায়সালা হিসাবে আখ্যা দিয়াছেন। ঐ রায় শোনার পর স্বয়ং ইয়াহুদীদের মুখ হইতে যাহা উচ্চারিত হয় তাহা হইতেও প্রমাণিত হয় যে, তাহারা নিজেরাও উহাকে খোদায়ী বিধানের মতই মনে করিয়াছিল। নিম্নে উহার দৃষ্টান্ত পেশ করা হইলঃ বানু কুরায়যা ফিতনার মূল হোতা হুয়াই ইব্ন আখতাবকে ফয়সালা অনুযায়ী বধ করার জন্য উপস্থিত করা হইলে সে রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া বলিয়াছিল, "আল্লাহ্র শপথ!
১০০ তোমার সহিত যেই বৈরী আচরণ ও শত্রুতা করিয়াছি সেইজন্য আমি আদৌ অনুতপ্ত নহি। নিজেকে আমি ঐজন্য বিন্দুমাত্রও ভর্ৎসনা করি না, দেইনা সামান্যতমও ধিক্কার। তবে যেই ব্যক্তি আল্লাহকে পরিত্যাগ করে আল্লাহ্ তাহাকে পরিত্যাগ করেন। অতঃপর উপস্থিত জনগণকে সম্বোধন করিয়া সে বলে, আল্লাহ্র বিধান পালনে আমার কোন অসুবিধা নাই, নাই কোন আপত্তি। ইহাতো (সা'দ-এর ফায়সালা) পূর্ব নির্ধারিত এক খোদায়ী বিধান এবং আল্লাহ্ কর্তৃক বানু ইসরাঈলের ভাগ্যে লিপিবদ্ধ এক অলঙ্ঘনীয় শাস্তি” (সীরাতুন্নবী ১খ., পৃ. ২৫৪; আর-রাহীকুল মাখতুম পৃ. ২৯১)।