📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আসরের নামায আদায়ের ব্যাপারে মতভেদ

📄 আসরের নামায আদায়ের ব্যাপারে মতভেদ


বানু কুরায়যা অভিমুখে যাত্রার প্রাক্কালে রাসূলুল্লাহ (স)-এর জারীকৃত নির্দেশ "কেহ যেন বানু কুরায়যা ছাড়া অন্য কোথাও আসরের নামাযা না পড়ে"-এর ফলে পথিমধ্যে উক্ত নামাযের ওয়াক্ত হইলে মুসলমানদের মধ্যে তাহা আদায়ের ব্যাপারে মতভেদ সৃষ্টি হয়। একদল বলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর নির্দেশানুযায়ী আমরা বানু কুরায়যায় পৌছার পরই কেবল আসর পড়ি, উহার পূর্বে নহে। আরেক দল বলেন, ঐ নির্দেশ দ্বারা তাঁহার উদ্দেশ্য তো ইহা ছিল না যে, নামায কাযা বা বিলম্বে আদায় করিতে হইবে বরং তাঁহার উদ্দেশ্য ছিল বানু কুরায়যায় দ্রুত গমন যাহাতে সেখানে পৌঁছিয়া আসর পড়া যায়। এই বলিয়া তাহারা পথেই নামায পড়িয়া লন। পরে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট এই বিষয় উত্থাপন করা হইলে তিনি কোন দলকেই ভর্ৎসনা করেন নাই (বুখারী, ২খ., পৃ. ৫৯১; আল-বিদায়া, ৪খ., পৃ. ১২১; সীরাতুল মুসতাফা, ২খ., পৃ. ৩২৪)।
কারণ উভয় দলের নিয়াত ভাল ছিল। মূলত সেই দিন একদল রাসূলুল্লাহ (স)-এর নির্দ্দেশকে আক্ষরিক অর্থে মানিয়াছিলেন, আরেক দল ঐ নির্দেশের মধ্যে রাসূলের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্যকে প্রাধান্য দিয়া তাঁহার হুকুম পালনে সচেষ্ট হন।
বাহ্যিক শব্দ ও অর্থানযায়ী রাসূলুল্লাহ (স) কর্তৃক বিলম্বে নামায আদায়ের ঐ বিশেষ আদেশকে প্রথম দল শরী'আত নির্ধারিত সময়ে নামায আদায়ের সাধারণ হুকুম ও আদেশের উপর অগ্রাধিকার দিয়া সূর্যাস্তের পর (বিদায়া, ৪খ., পৃ. ১২১), এমনকি কেহ কেহ রাত্রে ইশার সময় বানু কুরায়যাতে পৌঁছিয়া আসর নামায আদায় করেন (আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ২৮৮)।
তবে হাফিজ ইব্‌ন কায়্যিম-এর মতে প্রথম দল শুধু রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর হুকুম পালনের ছওয়াব লাভ করিয়াছেন আর দ্বিতীয় দল যেহেতু (ক) ইজতিহাদের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর হুকুম পালন এবং (খ) আসরের ন্যায় বিরাট গুরুত্বপূর্ণ নামায সময়মত আদায় করিয়াছেন যাহার সংরক্ষণ ও যত্নের ব্যাপারে কুরআন করীমে বিশেষ নির্দেশ ও তাকীদ আসিয়াছে (দ্র. ২ঃ ২৩৮) এবং হাদীছ শরীফে সেই নামায সম্বন্ধে বলা হইয়াছেঃ যাহার আসর ছুটিয়াছে তাহার আমল ব্যর্থ ও নিষ্ফল হইয়াছে, তাই উপরিউক্ত দুই কারণে তাহারা দ্বিগুণ ছওয়াব ও মর্যাদার অধিকারী হইয়াছেন (ফাতহুল বারী, ৭খ., পৃ. ৩১৬; সীরাতুল মুসতাফা, ২খ., পৃ. ৩২৫)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 অবরোধ

📄 অবরোধ


মুসলিম বাহিনীর অগ্রাভিযানের সংবাদে বানু কুরায়যার ইয়াহুদীগণ যদি নিজেদের কৃত অপরাধে অনুতপ্ত ও লজ্জিত হইয়া সন্ধি ও বন্ধুত্বের হস্ত প্রসারিত করিত তাহা হইলে তাহাদের নিরাপত্তা প্রাপ্তির সম্ভাবনা ছিল। উহাই ছিল সবেচেয়ে সহজ ও নিরাপদ পন্থা। কিন্তু এই দুরাচার হতভাগ্য সম্প্রদায় ঐ পথে না গিয়া বরং মুকাবিলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে (সীরাতুন্নবী ১খ., পৃ. ২৫৩)। মুসলমানগণ নিকটবর্তী হইলে তাহারা প্রকাশ্যে আল্লাহ্র রাসূল (স)-কে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করিতে থাকে (তারীখে ইসলাম, পৃ. ৬৯)। মুসলিম সৈন্যবাহিনীর অগ্রগামী ইসলামের পতাকাবাহী হযরত আলী (রা) সর্বপ্রথম তাহা শ্রবণ করা মাত্রই সেখান হইতে দ্রুত প্রত্যাবর্তন করেন। পথিমধ্যে রাসূলুল্লাহ (স)-কে তাহার দিকে অগ্রসর হইতে দেখিয়া বিনীতভাবে তাঁহার গতিরোধ করার চেষ্টা করেন। ইয়াহুদীদের অশ্লীল ও নোংরা গালি সরাসরি রাসূলুল্লাহ্ (স) শুনিলে কষ্ট পাইবেন ভাবিয়া তিনি তাঁহাকে সম্মুখে অগ্রসর না হওয়ার জন্য অনুরোধ জানান এবং বলেন, "ইয়া রাসূলাল্লাহ! এই অবাধ্য লম্পটদের নিকটবর্তী হওয়া আপনার জন্য সমীচীন নহে। আপনি বরং প্রত্যাবর্তন করুন। ইহাদের অনিষ্ট হইতে আপনাকে রক্ষার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।"
"সম্মুখে অগ্রসর না হইয়া প্রত্যাবর্তন কেন করিতে হইবে" ইহার কারণ জিজ্ঞাসা করিলে আলী (রা) দুর্গভ্যন্তর হইতে রাসূলুল্লাহ (স) সম্বন্ধে তাহাদের যেইসব অশ্লীল কথাবার্তা শুনিয়াছিলেন তিনি উহা তাহার নিকট গোপন করেন। রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিলেন, মনে হইতেছে তুমি তাহাদের পক্ষ হইতে আমার সম্বন্ধে কষ্টদায়ক কিছু শুনিয়াছ? আলী (রা) ইতিবাচক উত্তর দিলে তিনি বলিলেন, "তাহারা আমাকে দেখিতে পাইলে তুমি যাহা শুনিয়াছ উহার কোন কিছুই বলিতে পারিত না।" এই বলিয়া তিনি সম্মুখে অগ্রসর হইলেন এবং দুর্গের নিকটবর্তী হইয়া দুর্গশীর্ষে অবস্থানরত তাহাদের কয়েকজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের নাম ধরিয়া তাহারা শুনিতে পায় এমন উচ্চস্বরে ডাক দিয়া বলিলেন, উত্তর দাও হে ইয়াহুদী সম্প্রদায়! হে বানরের জ্ঞাতি! আল্লাহ কি তোমাদেরকে অপদস্থ ও লাঞ্ছিত করিয়াছেন? তোমাদের উপর কি তাঁহার শাস্তি অবতীর্ণ করিয়াছেন? বস্তুত তোমাদের জন্য আল্লাহ্র লাঞ্ছনা ও অপমানই অবধারিত।” ইহা শুনিয়া তাহারা উত্তর করিল, হে আবুল কাসিম! তুমি তো এইরূপ মূর্খের মত কথা বলিতে না (ইব্‌ন হিশাম, ৩খ, ১৪৯; আল-বিদায়া, ৪খ, ১২০)। যাহা হউক রাসূলুল্লাহ (স) বানু কুরায়যার ইয়াহুদীদের বিশ্বাসঘাতকতা, ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ ও অশালীন কথাবার্তার সমুচিৎ শাস্তি প্রদানের লক্ষ্যে উপরিউক্ত কথোপকথনের পর কালবিলম্ব না করিয়া তাহাদের উপর অবরোধ আরোপ করেন। এই অবরোধ চলে একাধারে ২৫ দিন। অবশেষে দীর্ঘ অবরোধে তাহারা দুর্বল ও ক্লান্ত হইয়া পড়ে (ইবন হিশাম, ৩খ., পৃ. ১৪৯)।
অবরোধের তীব্রতায় এক পর্যায়ে যখন বানু কুরায়যার হৃদয়ে এই বিশ্বাস ও ধারণা বদ্ধমূল হইল যে, রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদেরকে সমুচিৎ শিক্ষা না দিয়া সেখান হইতে ফিরিয়া যাইবেন না, তখন তাহাদের গোত্রপতি কা'ব ইব্‌ন আসাদ উদ্ভূত সঙ্কট হইতে উত্তরণের লক্ষ্যে সবাইকে একত্র করিয়া বলিল, আমি তোমাদের নিকট তিনটি প্রস্তাব পেশ করিতেছি। ইহার যে কোন একটি গ্রহণ করিয়া তোমরা এই বিপদ হইতে উদ্ধার পাইতে পার।
১. ইসলাম গ্রহণ করিয়া মুহাম্মাদের ধর্মে প্রবেশ করা এবং তাঁহার পরিপূর্ণ অনুসারী হইয়া যাওয়া। আল্লাহর শপথ! ইহা সম্পূর্ণরূপে তোমাদের নিকট পরিষ্কার হইয়া গিয়াছে যে, মুহাম্মাদ নিঃসন্দেহে একজন নবী ও রাসূল। নিশ্চয় তিনিই সেই নবী যাঁহার আলোচনা তোমরা তাওরাতে দেখিতে পাও। সুতরাং তাঁহার উপর ঈমান আনিলে তোমাদের জীবন, সম্পদ, স্ত্রী-পুত্র সকল কিছু নিরাপদ থাকিবে। তাহারা বলিল, আমাদের নিকট ইহা গ্রহণযোগ্য নহে। আমরা আমাদের ধর্ম পরিত্যাগ করিব না, তাওরাতের বিধান ছাড়া অন্য কোন বিধানই মানিব না। কা'ব বলিল, তাহা হইলে আস-
২. "আমরা আমাদের সন্তান ও স্ত্রীগণকে স্বহস্তে হত্যা করিয়া একেবারে চিন্তামুক্ত হইয়া যাই এবং কোষমুক্ত তরবারি হস্তে বাহির হইয়া পূর্ণ সাহস ও বীরত্বের সঙ্গে মুহাম্মাদ ও তাঁহার সাথীদের মুকাবিলা করি। ইহাতে পরাজিত হইলে স্ত্রী-পূত্রের কোন বাড়তি চিন্তা থাকিবে না। আর বিজয় লাভ করিলে নূতন স্ত্রীর অভাব হইবে না। তাহাদের মাধ্যমে পুনরায় সন্তান লাভ করিতে পারিব।” তাহারা বলিল, অযথা এই অসহায় নারী-শিশুদিগকে হত্যার পর নিজেদের বাঁচিয়া থাকার মধ্যে কী স্বাদ ও সার্থকতা রহিয়াছে?
কা'ব: ঠিক আছে তোমাদের নিকট ইহাও যখন গ্রহণযোগ্য নহে তাহা হইলে আমার সর্বশেষ প্রস্তাব হইলঃ ৩. "আমাদের এই সঙ্কট হইতে উত্তরণের জন্য শনিবারের রাত্রিই হইবে উপযুক্ত সময়। যেহেতু শনিবার ইয়াহুদীদের নিকট পবিত্র ও তাঁহার সঙ্গীগণ ঐ রাত্রে আমাদের পক্ষ থেকে আক্রান্ত না হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিন্ত থাকিবে, তাঁহাদের এই অসতর্কতা ও অন্যমনস্কতার সুযোগে তাঁহাদের উপর আকস্মিক আক্রমণ চালাইয়া তাহাদেরকে পর্যুদস্ত করা খুবই সহজ হইবে।"
তাহারা এই প্রস্তাবের উত্তরে বলিল, কা'ب! তোমার ভালভাবেই জানা আছে যে, আমাদের পূর্বপুরুষগণ এই দিনকে কলঙ্কিত করার অপরাধে শূকর ও বানরে রূপান্তরিত হইয়াছিল। তাহার পরও তুমি আমাদিগকে উহার নির্দেশ প্রদান করিতেছ!
বানু কুরায়যা একে একে যখন সকল প্রস্তাবই প্রত্যাখ্যান করিল তখন তাহাদের উপর ক্রোধ ও বিরক্তি প্রকাশ করিয়া কা'ব বলিল, "জন্মলগ্ন হইতে অদ্যাবধি তোমাদের কেহই দৃঢ় সংকল্প ও বিচক্ষণতার সহিত একটা রাত্রিও অতিবাহিত কর নাই” (আল-বিদায়া, ৪খ., পৃ. ১২২; ইব্‌ন হিশাম, ৩খ., পৃ. ১৫০)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 অনুশোচনার এক অভিনব দৃষ্টান্ত: আবূ লুবাবা (রা)

📄 অনুশোচনার এক অভিনব দৃষ্টান্ত: আবূ লুবাবা (রা)


অবরোধের শৃংখল হইতে মুক্তির জন্য উপস্থাপিত কা'ب-এর প্রস্তাবসমূহ প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর বানু কুরায়যার জন্য রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর সিদ্ধান্ত মানিয়া লওয়া ছাড়া আর কোন উপায় অবশিষ্ট থাকিল না। তবে তাহার পূর্বে তাঁহার সিদ্ধান্ত অবনত মস্তকে মানিয়া লইলে তাহাদের কী অবস্থা হইবে, কোন ধরনের শাস্তি ভোগ করিতে হইবে তাহা অবগত হওয়ার জন্য তাহারা তাহাদের কতক মুসলিম মিত্রের সহিত মিলিত হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করিল। আওস গোত্রের মিত্র বানু আমর ইবন 'আওফ বংশের নেতৃস্থানীয় আনসার সাহাবী আবূ লুবাবা (রা), যাহার আসল নাম রিফা'আ ইব্‌ন আবদুল মুনযির, ছিলেন বানু কুরায়যার এক ঘনিষ্ঠ মিত্র। তাঁহার সন্তান ও ধন-সম্পদও থাকিত তাহাদের এলাকাতে (আর-রাহীক, পৃ. ২৮৯)। সুতরাং সঙ্গত কারণেই তাহাদের হৃদয়ে এই আশার সঞ্চার হইল যে, সম্ভবত এই বিপদের সময় তিনি অন্তত সুপরামর্শ দিয়া তাহাদের কোন সাহায্য করিতে পারিবেন।
তাহারা তাহার সঙ্গে সরাসরি কথা বলিবার জন্য চিৎকার করিয়া ডাকিল। তিনি বলিলেন, আমি তোমাদের নিকট যাইব না যতক্ষণ না আল্লাহ্র রাসূল (স) আমাকে অনুমতি প্রদান করিবেন (আল-বিদায়া, ৪খ., পৃ. ১২১)। তাহারা নিজেদের ব্যাপারে পরামর্শাদির জন্য আবূ লুবাবা (রা)-কে তাহাদের নিকট পাঠাইবার আবেদন জানাইয়া স্বয়ং রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর নিকট বার্তা পাঠাইল। তিনি তাহাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাহাকে পাঠাইয়া দেন। আবু লুবাবাকে দেখিয়া বানু কুরায়যার পুরুষগণ ছুটিয়া আসিল। তাহার সম্মুখে তাহাদের শিশু ও মহিলাগণ কান্নায় ভাঙ্গিয়া পড়িল। ইহাতে তাহার হৃদয় বিগলিত হইয়া গেল। তাহাদের প্রতি তিনি দয়ার্দ হইয়া উঠিলেন। তাহারা তাহাকে বলিল, "আমরা রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর সিদ্ধান্ত কি মানিয়া লইব? তাঁহার ফয়সালার উপর কি সন্তুষ্ট থাকিব? তিনি বলিলেন, হাঁ, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তিনি হস্ত দ্বারা কণ্ঠনালীর দিকে ইশারা করিয়া বুঝাইয়া দিলেন যে, তাহাদের যবাহ করা হইবে। ইহার পর তিনি সেখান হইতে প্রস্থানের জন্য পা উঠানোর পূর্বেই বুঝিতে পারিলেন যে, গোপনীয়তা ফাঁস করিয়া তিনি আল্লাহ ও তদীয় রাসূলের সহিত বিশ্বাসভঙ্গ করিয়াছেন। তখনই তিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিলেন: (ক) “যেই ভূমিতে এই ঘটনা ঘটিয়াছে সেইখানে তিনি থাকিবেন না (আল-কামিল ফি’ত তারীখ, পৃ.৭৫); (খ) আল্লাহ্র রাসূলের সম্মুখে নিজের চেহারা দেখাইবেন না যতক্ষণ না এমন খাঁটি তওবা করিবেন যাহা কেবল আল্লাহই জানেন (বিদায়া, ৪খ., পৃ. ১২১) (গ) তিনি আল্লাহ্র শপথ করিয়া বলিলেন, যতক্ষণ না আল্লাহ্ আমার তওবা কবুল করিবেন ততক্ষণ আমি পানাহার করিব না। এমনকি এই অবস্থায় আমার মৃত্যু হইয়া গেলেও না” (রূহুল মা’আনী, ৯খ., পৃ. ১৯৫)।
আবূ লুবাবা (রা)-এর উপরিউক্ত ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মু’মিনদের সতর্কীকরণার্থে আল্লাহ তা’আলা নিম্নোক্ত আয়াত অবতীর্ণ করেন: يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَا تَخُونُواْ ٱللَّهَ وَٱلرَّسُولَ وَتَخُونُوٓاْ أَمَٰنَٰتِكُمْ وَأَنتُمْ تَعْلَمُونَ. “হে মুমিনগণ! তোমরা জানিয়া-শুনিয়া আল্লাহ্ ও তাঁহার রাসূলের সহিত বিশ্বাসভঙ্গ করিবে না এবং তোমাদিগের পরস্পরের আমানত সম্পর্কেও না” (৮: ২৭)।
যাহা হউক, তিনি উপরিউক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ পূর্বক কালবিলম্ব না করিয়া দুর্গ হইতে ফিরিয়া আসিলেন এবং রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর খিদমতে উপস্থিত না হইয়া সরাসরি মসজিদে নববীতে আসিয়া উহার এক খুঁটির সঙ্গে নিজেকে বাঁধিয়া ফেলিলেন এবং ঘোষণা করিলেন যে, (ক) যতক্ষণ না আল্লাহ তাহার অপরাধ ক্ষমা করিবেন ততক্ষণ তিনি সেই স্থান ত্যাগ করিবেন না; (খ) তিনি আল্লাহ্ তা’আলার সঙ্গে এই অঙ্গীকার করিলেন যে, ভবিষ্যতে বানু কুরায়যার এলাকায় প্রবেশ করিবেন না (বিদায়া, ৪খ., ১২২; সীরাতুল মুসতাফা, পৃ. ৩২৬-২৭; ইব্‌ن হিশাম, পৃ. ১৫১); (গ) তিনি ইহাও শপথ করিলেন যে, যতক্ষণ না আল্লাহর রাসূল নিজ হাতে তাঁহার বন্ধন খুলিয়া দিবেন ততক্ষণ তিনি উহা খুলিবেন না বা কাহাকেও খুলিতে দিবেন না (আল-কামিল, পৃ. ৭৫; ইব্‌ن হিশাম, টীকা ১৫)।
আল্লাহ্র রাসূলের নিকট যখন এই সংবাদ পৌঁছিল তখন তিনি বলিলেন, "আমার অনুপস্থিতিতে আবূ লুবাবা ফেতনায় পতিত হইয়াছে (বিদায়া, পৃ. ১২১)। সরাসরি সে আমার নিকট আসিলে তাহার জন্য আমি ক্ষমা প্রার্থনা করিতাম। যখন সে নিজ বুদ্ধিতে ক্ষমা প্রাপ্তির জন্য ঐ পদ্ধতি অবলম্বন করিয়াই ফেলিয়াছে তখন আমিও তাহাকে স্বহস্তে মুক্ত করিব না যতক্ষণ না আল্লাহ্ তা’আলা তাহার তওবা কবুল করেন" (ইব্‌ন হিশাম, ৩খ., পৃ. ১৫১; বিদায়া, ৪খ., পৃ. ১১৯)। মসজিদে নববীতে খুঁটির সঙ্গে বন্ধনাবস্থায় ছয় দিন (আল-বিদায়া, ১২২; ইব্‌ن হিশাম, ঐ ১৫২), মতান্তরে ২০ দিন ছিলেন। প্রত্যেক নামাযের সময় তাহার স্ত্রী আসিয়া নামায আদায়ের জন্য তাহার বন্ধন খুলিয়া দিতেন। নামায শেষ হইতেই তিনি পুনরায় নিজেকে বাঁধিয়া লইতেন। অবশেষে আল্লাহ তাঁহার তওবা কবুল করেন এবং উম্মু সালামার গৃহে অবস্থানরত আল্লাহ্র রাসূলকে নিম্নোক্ত আয়াতের মাধ্যমে সাহরীর সময় তাহা অবহিত করেন : وَآخَرُونَ اعْتَرَفُوا بِذُنُوبِهِمْ خَلَطُوا عَمَلاً صَالِحًا وَآخَرُ سَيِّئًا عَسَى اللَّهُ أَنْ يَتُوبَ عَلَيْهِمْ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ.
"এবং অপর কতক লোক নিজদিগের অপরাধ স্বীকার করিয়াছে, উহারা এক সৎকর্মের সহিত অপর অসৎ কর্ম মিশ্রিত করিয়াছে; আল্লাহ হয়ত উহাদিগকে ক্ষমা করিবেন। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু" (৯: ১০২; ইব্‌ن হিশাম, ৩খ., পৃ. ১৫২; বিদায়া, ৪খ., পৃ. ১২২)।
এই সংবাদে আল্লাহ্র রাসূল হাসিতে লাগিলেন। হযরত উম্মু সালামা (রা) তাঁহাকে হাসির কারণ জিজ্ঞাসা করিলেন। তিনি বলিলেন, আবু লুবাবার তওবা কবুল হইয়াছে। উম্মু সালামা (রা) স্বয়ং এই সংবাদ আবু লুবাবাকে দেওয়ার জন্য রাসূলের নিকট অনুমতি প্রার্থনা করিলেন। রাসূলুল্লাহ্ তাঁহাকে অনুমতি দিলে তিনি সানন্দ চিত্তে বাহির হইয়া আবূ লুবাবাকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, "সুসংবাদ লও! আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করিয়াছেন।" সাহাবাদের মধ্যে এই সংবাদ ছড়াইয়া পড়িলে তাঁহারা তাঁহাকে বন্ধনমুক্ত করিবার জন্য ছুটিয়া আসিলেন। তখন আবূ লুবাবা বলিলেন, কখনও না, আল্লাহ্র কসম! যতক্ষণ না আল্লাহ্র রাসূল স্বয়ং তাঁহার মুবারক হস্তে আমাকে মুক্ত করিবেন ততক্ষণ আমি এই অবস্থায় থাকিব, কাহারও মাধ্যমেই মুক্ত হইব না। অনন্তর রাসূলুল্লাহ্ (স) ফজরের নামায আদায়ের উদ্দেশে তাঁহার পার্শ্ব দিয়া অতিক্রম কালে তাহার বন্ধন খুলিয়া দিয়া তাহার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করিলেন (বিদায়া, ঐ, পৃ. ১২২-১২৩; ইব্‌ن হিশাম, ঐ, পৃ. ১৫২)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ভীত-সন্ত্রস্ত বানু কুরায়যার নমনীয় মনোভাব

📄 ভীত-সন্ত্রস্ত বানু কুরায়যার নমনীয় মনোভাব


বিশ্বাসঘাতকতা ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের জন্য রাসূলুল্লাহ (স)-এর পক্ষ হইতে কেমন কঠিন শাস্তি ভোগ করিতে হইবে তাহা আবু লুবাবার মাধ্যমে অবগত হওয়ার পরও বানু কুরায়যা রাসূলুল্লাহ (স)-এর সিদ্ধান্ত মানিয়া লইতে প্রস্তুত হয়। অথচ তাহারা মুসলমানদের তুলনায় অনেক অনুকূল ও ভাল অবস্থানে ছিল। দীর্ঘ অবরোধের ধকল সামাল দেওয়ার ক্ষমতা তাহাদের ছিল। কারণ তাহাদের পর্যাপ্ত কূপ, পানি ও খাদ্যসামগ্রী মওজুদ ছিল। দুর্গও ছিল বেশ সুরক্ষিত ও দুর্ভেদ্য। অপরদিকে মুসলমানগণ খন্দকের যুদ্ধের পূর্ব হইতে যুদ্ধ সংক্রান্ত কার্যাবলী চালাইয়া আসার কারণে যেমন চরম ক্লান্ত অবস্থায় ছিলেন, আবার বানু কুরায়যাকে অবরোধকালে দুর্গের বাহিরে উন্মুক্ত আকাশের নিচে অবস্থানের ফলে তাহাদেরকে তীব্র ক্ষুধার যন্ত্রণা এবং প্রচণ্ড শীতের কষ্টও ভোগ করিতে হইতেছিল। ইহার পরও এমন কী ঘটিয়াছিল যাহার কারণে তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর ফয়সালা শিরধার্য করিয়া লইতে বাধ্য হয়। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তা'আলা তাহাদের অন্তরে ভীতি সঞ্চার করেন। ফলে তাহারা যুদ্ধ করার সাহস হারাইয়া ফেলে।
হিজরতের পর মদীনায় ইয়াহুদী গোত্রসমূহের অবস্থানসমূহ
বুহায়রা মাজমাউল আস্সায়াল রূমা কূপ উহুদ পর্বতমালা বাগ-বাগিচা আল-কানাত উপত্যকা
উত্তর
আল-আককীক উপত্যকা কালো প্রস্তরময় ভূমি (হাররা) সাল'আ পর্বত বনূ হারিছার বসতি আবদুল আশহাল গোত্রের বসতি বনূ জুফার গোত্রের বসতি
ইয়াসরিব নগরী মসজিদে নববী আল-বকী' বনু কায়নুকার আবাস
ইয়াসরিব নগরী বৃতহান উপত্যকা মাহযূর উপত্যকা মুযায়নীব উপত্যকা আল-আওয়ালী (উচ্চভূমি) বাগানসমূহ
কুবা রানুনা উপত্যকা বাগ-বাগিচা বনূ নাযীরের বসতি কা'ব ইব্‌ন আশরাফের দুর্গ আইর পাহাড়
যুলহুলায়ফা
কা'ব ইবন আশরাফের ভগ্ন দুর্গ। তাফহীমুল কুরআনের সৌজন্যে (আধুনিক প্রকাশনী)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00