📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 পটভূমি

📄 পটভূমি


রাসূলুল্লাহ (স) মদীনায় আগমনের পর মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করেন। তিনি মুসলমানদের নিরাপত্তা, নির্বিঘ্নে জীবন যাপন ও সর্বোপরি মদীনাকে বহিঃশত্রুর আক্রমণ হইতে রক্ষার জন্য সেখানে বসবাসরত ইয়াহুদীদের সহিতও একটি চুক্তি সম্পাদন করেন যাহাতে তাহাদের জীবন, ধনসম্পদ ও ধর্মীয় বিষয়ে পরিপূর্ণ নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা প্রদান করা হয় (শিবলী নু'মানী, সীরাতুন্নবী (স), ১খ., পৃ. ২৫৩)। এই চুক্তিনামার বিশেষ দিক ছিল, ইয়াহুদীদেরকে মুসলমানদের সহযোগী হইয়া থাকিতে হইবে। একই জাতি-গোষ্ঠীর ন্যায় তাহাদের সহিত বসবাস করিতে হইবে। মুসলমানদের বিরুদ্ধে নিজেরা যেমন অস্ত্র ধরিতে পারিবে না, কোন ইয়াহুদী কোন কুরায়শী কাফিরের সম্পদ নিরাপদ আশ্রয়ে রাখিবে না এবং কোন মুসলমানের বিপক্ষে কুরায়শীদের সে সাহায্যও করিবে না। সমবেতভাবে যুদ্ধরত অবস্থায় মুসলমানদের মত তাহাদিগকেও যুদ্ধের যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করিতে হইবে, বহিঃশত্রু কর্তৃক ইয়াছরিব (يَثرِب) অর্থাৎ মদীনা আক্রান্ত হইলে সম্মিলিতভাবে তাহার মুকাবিলা করিবে (ইব্‌ন হিশাম, আস্-সীরতুন নাবাবিয়্যা, ২খ., পৃ. ৫০৩-৪; আবুল হাসান আলী নদভী, নবীয়ে রহমত, পৃ. ২৭১)। মদীনাবাসীদের কল্যাণে এই চুক্তির গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। দেশ ও জাতির স্বার্থ রক্ষায় এই অঙ্গীকারনামা ছিল এক অবিস্মরণীয় ঘটনা ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত যাহা ইতিহাসে মদীনা সনদ নামে খ্যাত।
কুরায়শগণ পত্র প্রেরণের মাধ্যমে ইয়াহুদীগণকে এই চুক্তি ভঙ্গ করার জন্য প্ররোচিত করিতে থাকিলে তাহারা প্রভাবিত হইয়া বিদ্রোহ করিতে শুরু করে। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের সহিত চুক্তি নবায়ন করিতে চাহিলে বানু নাষীর তাহা অস্বীকার করে। ফলে তাহাদেরকে মদীনা হইতে বহিষ্কার করা হয়। অপরদিকে বানু কুরায়যা নূতন করিয়া চুক্তিতে আবদ্ধ হইলে তাহাদেরকে নিরাপত্তা প্রদান করা হয়। এই ঘটনা মুসলিম শরীফে আবদুল্লাহ ইব্‌ন ইম্মান-এর বরাতে এইভাবে বর্ণিত হইয়াছেঃ 'বানু নাষীর ও কুরায়যা রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত বিদ্রোহ করিলে বানু নাযীরকে দেশান্তরিত করা হয় এবং বানু কুরায়যাকে বসবাস করিতে দেওয়া হয় ও তাহাদের উপর অনুগ্রহ প্রদর্শন করা হয়” (মুসলিম শরীফ, ২খ., পৃ. ৯৪ যিকরু ইসরাঈল ইয়াহুদ মিনাল-হিজায অধ্যায়)। মদীনা হইতে বানু নাযীর বহিষ্কৃত হওয়ার পর খায়বারে গিয়া বসতি স্থাপন করে এবং সেখানকার নেতৃত্ব অর্জন করে। তাহাদের সরদার হুয়াই (হুয়ায়্যি) ইন আখতাব প্রতিশোধের নেশায় কুরায়শসহ অন্যান্য আরব গোত্রসমূহে অব্যাহত প্রচারণা চালাইয়া মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাহাদিগকে সংঘবদ্ধ করিয়া মদীনা আক্রমণের ক্ষেত্র রচনা করে। খন্দকের যুদ্ধ মূলত তাহারই চেষ্টার ফল ছিল। ইসলাম বিরোধী এই সংঘবদ্ধ বাহিনীর ব্যাপক আক্রমণ হইতে মদীনাকে রক্ষার জন্য রাসূলুল্লাহ (স) যখন মুসলমানগণকে সঙ্গে লইয়া পরিখা খনন করত রণপ্রস্তুতি নিতেছিলেন তখন পর্যন্তও বানু কুরায়যা চুক্তির উপর বহাল থাকিয়া আলাদা অবস্থান করিতেছিল (সীরাতুন্নবী (স), ১খ., পৃ. ২৫৩)।
বানু নাযীর তাহাদেরকে একত্র করিবার চেষ্টায় লিপ্ত হয়। নাযীর গোত্রপতি হুয়াই ইব্‌ আখতাব কুরায়যা গোত্রপতি কা'ব ইব্‌ন আসাদ আল-কুরাজীকে মুসলমানদের সহিত সম্পাদিত চুক্তি ভঙ্গ করিয়া কুরায়শদের নেতৃত্বে ইসলাম বিরোধী মিত্রজোটে যোগ দিতে প্ররোচিত করার লক্ষ্যে বানু কুরায়যা এলাকায় গমন করে এবং গোত্রপতি কা'ব-এর সাক্ষাতপ্রার্থী হয়। রাসূলুল্লাহ (স) যুদ্ধাক্রান্ত হইলে তাঁহাকে সাহায্য করিতে বানু কুরায়যা যেহেতু প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল, তাই হুয়াই দরজার নিকট উপস্থিত হইলে কা'ব তাহাকে দেখিয়া দরজা বন্ধ করিয়া দেয়, অনেক পীড়াপীড়ির পর তাহা খুলিয়া দেয়। কা'বকে উদ্দেশ্য করিয়া হুয়াই বলে, বর্তমানে কুরায়শসহ গোটা আরব মুহাম্মাদের রক্তপিপাসু। তাহারা ইসলাম ও মুসলিম শক্তির মূলোৎপটনের লক্ষ্যে সম্মিলিত বাহিনী লইয়া মদীনার সীমান্তবর্তী বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থান করিতেছে। তাহারা আমাকে প্রতিশ্রুতি দিয়াছে যে, মুহাম্মাদ ও তাঁহার সঙ্গীদেরকে সমূলে ধ্বংস না করা পর্যন্ত ঘরে ফিরিয়া যাইবে না। যুদ্ধের জন্য আমার বাহিনীকেও প্রস্তুত রাখিয়াছি। ইসলামের মূলোৎপটনের ইহাই মোক্ষম সময়। এই সুযোগ হাতছাড়া করা মোটেও উচিৎ নহে। কা'ব বলিল, "তোমার দুর্ভাগ্য হউক হে হুয়াই! সত্যই তুমি এক অশুভ কুলাঙ্গার। আমি তো মুহাম্মাদের সহিত চুক্তিবদ্ধ আছি। আমাদের পারস্পরিক এই চুক্তি ভঙ্গ করিতে পারিব না। কারণ আমি তাঁহার মধ্যে সততা, সত্যবাদিতা ও বিশ্বস্ততা ছাড়া আর কিছুই দেখি নাই (সীরাতুল মুসতাফা, ২খ., পৃ. ৩১৫)। তাঁহাকে সর্বদা প্রতিশ্রুতি রক্ষাকারী হিসাবে পাইয়াছি। কাজেই অযথা আমার পিছে সময় নষ্ট করিও না। আমাকে আমার অবস্থায় থাকিতে দাও” (আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ২৮৩)।
হুয়াই তবুও নাছোড়বান্দা। তাহাকে নানাভাবে বুঝাইতে ও বাগে আনিবার চেষ্টা চালাইয়া যাইতে থাকিল। এমনকি তাহাকে আল্লাহ্ নামে এই প্রতিশ্রুতি দিল যে, 'কুরায়শ এবং গাতাফান যদি আল্লাহ না করুন আক্রমণ হইতে হাত গুটাইয়া লয় এবং মুহাম্মাদকে কোনরূপ আঘাত না করিয়াই মক্কা প্রত্যাবর্তন করে তাহা হইলে খায়বার ছাড়িয়া আমি তোমার সহিত তোমার দুর্গেই থাকিব। তখন তোমার যাহা হইবে আমারও তাহাই হইবে' (আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ২৮৩)। হুয়াই-এর অব্যাহত প্রচেষ্টা ও তাহার সর্বশেষ এই আকর্ষণীয় বক্তব্যে প্রভাবিত হইয়া কা'ব ইব্‌ন আসাদ নিজের প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে এবং তাহার ও রাসূলুল্লাহ (স)-এর মধ্যে যেইসব সিদ্ধান্ত গৃহীত হইয়াছিল তাহা হইতে সে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করিয়া লয় (ইব্‌ন হিশাম, ৩খ., পৃ. ১৩৮-৩৯; আর-রাহীক, পৃ. ২৮৩; নবীয়ে রহমত, পৃ. ২৭১; সীরাতুল মুসতাফা, ২খ., পৃ. ৩১৫)।
তাহাদের এই চুক্তিভঙ্গের সংবাদ রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট পৌঁছামাত্রই তিনি ইহার সত্যতা যাচাইয়ের জন্য আওস গোত্রপতি সা'দ ইব্‌ন মু'আয (রা), খাযরাজ গোত্রপতি সা'দ ইবন উবাদা, 'আবদুল্লাহ ইব্‌ন রাওয়াহা ও খাওয়াত ইব্‌ন জুবায়র (রা)-কে এই নির্দেশ দিয়া প্রেরণ করিলেন যে, সংবাদটি সত্য প্রমাণিত হইলে সরাসরি আমার নিকট আসিয়া অস্পষ্ট শব্দে তাহা প্রকাশ করিবে যাহাতে কেবল আমিই বুঝিতে পারি, অন্যরা নহে। আর অসত্য হইলে এবং তাহারা প্রতিশ্রুতি ও চুক্তির উপর বহাল থাকিলে তাহা স্পষ্ট ভাষায় জনসমক্ষে প্রকাশ করিবে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখিবার জন্যই তিনি এইরূপ নির্দেশ প্রদান করিয়াছিলেন।
তাহারা সেখানে গিয়া খুবই খারাপ পরিস্থিতির সম্মুখীন হন। বানু কুরায়যার লোকেরা তাহাদেরকে দেখিয়া প্রকাশ্যে শত্রুতা, বাড়াবাড়ি ও গালিগালাজ করে। রাসূলুল্লাহ্ (স) সম্পর্কে অমার্জিত ভাষায় অশোভন কথাবার্তা বলে এবং বিদ্রূপাত্মকভাবে বলিতে থাকে, আল্লাহ্র রাসূল আবার কে? আমাদের এবং মুহাম্মাদের মধ্যে কোন চুক্তি নাই (ইবন হিশাম, ৩খ., পৃ. ১৩৯; আর-রাহীক, পৃ. ২৮৪; নবীয়ে রহমত, পৃ. ২৭১; সীরাতুন্নবী (স), পৃ. ২৪৬)। তাহারা কা'ব ইব্‌ন আসাদের নিকট গিয়া চুক্তির কথা স্মরণ করাইয়া দিলে কা'ب বলে, উহা কেমন চুক্তি! মুহাম্মাদ আবার কে? তাহার সহিত আমার কোন চুক্তি নাই (সীরাতুল মুসতাফা, ২খ., ৩১৬)। তাহারা রীতিমত যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করিয়া দেয় (নবীয়ে রহমত, পৃ. ২৭১; আর-রাহীক, পৃ. ২৮৩)।
মোটকথা তাহারা যতটা শুনিয়াছিলেন সেখানে গিয়া প্রকৃত অবস্থা তাহার চাইতেও ভয়ানক দেখিয়া ফিরিয়া আসলেন এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট পূর্ব নির্দেশিত পন্থায় ইঙ্গিতে তাহা ব্যক্ত করিলেন। তাঁহারা রাসূলুল্লাহ (স)-কে জানাইলেন, আসহাবে রাজী' তথা খুবায়ব (রা)-র সহিত আদাল ও কারা গোত্র যেমন বিশ্বাসঘাতকতা করিয়াছিল, আপনার সহিত ইহাদের বিশ্বাসঘাতকতাও অনুরূপ (আর-রাহীক, পৃ. ২৮৪; ইব্‌ন হিশাম, ৩খ., পৃ. ১৪০; যুরকানী, ১২খ., পৃ. ১১১; সীরাতুল মুসতাফা, ২খ., পৃ. ৩১৬)।
রাসূলুল্লাহ (স) এই সংবাদে অত্যন্ত মর্মাহত হইলেন। মুসলিম বাহিনী যেন মানসিকভাবে ভাঙ্গিয়া না পড়ে সেইজন্য প্রথমদিকে এই ব্যাপারটি গোপন করিবার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু বানূ কুরায়যা প্রকাশ্যে বিশ্বাসঘাতকতামূলক আচরণ করিতে থাকায় পরবর্তীতে তাহা আর গোপন রহিল না। অচিরেই মুসলমানগণ তাহা জানিতে পারিলেন। খন্দকের যুদ্ধে যখন মুসলিম বাহিনী রাত্রির কনকনে শীত ও একাধারে কয়েক দিনের ক্ষুধার তীব্র যন্ত্রণার মধ্যে চরম কষ্টসাধ্য বিশাল পরিখা খনন করিয়া এই যাবৎ কালের সর্ববৃহৎ বহিঃশত্রুর সংঘবদ্ধ বাহিনীর বিরুদ্ধে দীর্ঘ দিন অবরুদ্ধ অবস্থায় অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে ক্লান্ত, এমনি এক নাযুক অবস্থায় মদীনার ভিতর থাকিয়া বানু কুরায়যার আকস্মিক চুক্তিভঙ্গ ও শত্রুদের পক্ষাবলম্বন মুসলমানদিগকে অত্যন্ত সঙ্কটময় অবস্থায় ফেলিয়া দেয়। কারণ এই বিশ্বাসঘাতকদের অদূরেই সম্পূর্ণ অরক্ষিত অবস্থায় মুসলিম নারী ও শিশুগণ অবস্থান করিতেছিল। পশ্চাদ্দিক হইতে তাহাদের আক্রমণ প্রতিহত করিবার কোন ব্যবস্থাও ছিল না। আবার সম্মুখ ভাগের বিশাল বাহিনীকে ফেলিয়া পিছনে আসাও সম্ভব ছিল না। এক কথায় মুসলমানদের জন্য ইহা ছিল এক কঠিন মুহূর্ত। কুরআনুল কারীমের নিম্নোক্ত আয়াতে ঐ অবস্থাকে এইভাবে ব্যক্ত করা হইয়াছে: إِذْ جَاءُوكُمْ مِنْ فَوْقِكُمْ وَمِنْ أَسْفَلَ مِنْكُمْ وَإِذْ زَاغَتِ الْأَبْصَارُ وَبَلَغَتِ الْقُلُوبُ الْحَنَاجِرَ وَتَظُنُّونَ بالله الظُّنُونَا . هُنَالِكَ ابْتُلِيَ الْمُؤْمِنُونَ وَزُلْزِلُوا زِلْزَالاً شَدِيدًا.
"যখন উহারা তোমাদের বিরুদ্ধে সমাগত হইয়াছিল, উচ্চ ও নিম্নাঞ্চল হইতে তোমাদের তোমাদের চক্ষু বিস্ফারিত হইয়াছিল, তোমাদের প্রাণ হইয়া পড়িয়াছিল কণ্ঠাগত এবং তোমরা আল্লাহ সম্বন্ধে নানাবিধ ধারণা পোষণ করিতেছিলে। সেই সময় মুমিনগণ পরীক্ষিত হইয়াছিল এবং তাহারা ভীষণভাবে প্রকম্পিত হইয়াছিল" (৩৩: ১০-১১)।
বানু কুরায়যার আচরণ মুসলমানদের জন্য কত যে কষ্টকর ও বেদনাদায়ক ছিল তাহা নিম্নোক্ত ঘটনা হইতেও অনুমান করা যায়।
হযরত সা'দ ইব্‌ন মু'আয (রা), যিনি তাহাদের সহিত খুবই ঘনিষ্ঠ ছিলেন, বিপদাপদে সর্বদা সাহায্যকারী, সহানুভূতিশীল ও কল্যাণকামী ছিলেন। খন্দকের যুদ্ধে হিব্বান ইবনুল আরাকা (حبان بن العرقة) নামক এক কুরায়শীর (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ১২৪) নিক্ষিপ্ত তীরে মারাত্মকভাবে আহত হইয়া যখন মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে উপনীত তখন তিনি বিনীতভাবে আল্লাহ্র দরবারে দু'আ করিয়াছিলেন যাহার শেষবাক্য ছিলঃ "হে আল্লাহ! আমাকে ততক্ষণ পর্যন্ত মৃত্যু দিও না যতক্ষণ না আমার চক্ষু বানু কুরায়যার ধ্বংস দেখিয়া শীতল হয়" (ইবন হিশাম, ৩খ., পৃ. ১৪৩; সীরাতুল মুস্তাফা, ২খ., পৃ. ৩১৯; আর-রাহীক, পৃ. ২৮৩)।
বানু কুরায়যা চুক্তি ভঙ্গ করিয়া মুসলমানদের বিরুদ্ধে খন্দকের যুদ্ধে মুশরিকদের সহায়তা করে (আর-রাহীক, পৃ. ২৮৩) এবং ইসলামের বড় শত্রু হুয়াই ইব্‌ন আস্তাবকে স্বীয় দুর্গে আশ্রয় দান করে (সীরাতুন্নবী (স), ১খ., পৃ. ২৫৩)। সঙ্গত কারণেই বানু কুরায়যার এই বিশ্বাসঘাতকতামূলক জঘন্য আচরণের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা মুসলমানদের জন্য অপরিহার্য হইয়া পড়ে।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বানু কুরায়যার বিরুদ্ধে অভিযান

📄 বানু কুরায়যার বিরুদ্ধে অভিযান


খন্দকের যুদ্ধে কুরায়শ, গাতাফান ও ইয়াহুদীদের সম্মিলিত বিশাল বাহিনীর ব্যর্থকাম হইয়া অবশেষে রাত্রির অন্ধকারে পলায়নের সংবাদ সাহাবী হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান-এর মাধ্যমে প্রাপ্ত হইয়া রাসূলুল্লাহ (স) পরের দিন অর্থাৎ ৫ম হিজরীর যুল-কা'দা মাসের ২২/২৩ তারিখ (ইব্‌ন সা'দ-এর বর্ণনা অনুযায়ী, আর-রাহীক, পৃ. ২৮৭) বুধবার ফজর নামাযের পর (সীরাতুল মুসতাফা, ২খ., পৃ. ৩২৩) মুসলমানদের লইয়া সেখান হইতে প্রত্যাবর্তন করেন এবং মদীনায় পৌঁছিয়া সবাই যুদ্ধাস্ত্র পরিত্যাগ করেন (যুরকানী, ২খ., পৃ. ১২৬; সীরাতুল মুসতাফা, ২খ., পৃ. ৩২৩)।
দ্বিপ্রহরে রাসূলুল্লাহ (স) যখন উম্মু সালামা (রা)-র গৃহে গোসলখানায় গোসল করিতে উদলা শরীরে একদিকে কেবল পানি ঢালিয়াছেন এমন সময় (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ১৫৩) জিবরাঈল (আ) ঘন, পুরু ও মনোরম রেশমী কাপড়ের পাগড়ী পরিহিত অবস্থায় মখমল আচ্ছাদিত জিনবিশিষ্ট এক বাহনে আরোহণ করিয়া আগমন করেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ১১৮)। তিনি (মসজিদে নববী সংলগ্ন) জানাযা নামাযের জন্য নির্ধারিত জায়গার সন্নিকটে আসিয়া দাঁড়ান (তাবাকাত ইব্‌ন সা'দ, ২খ., পৃ. ৫০) এবং রাসূলুল্লাহ্ (স) সালাম দেন (বিদায়া, পৃ. ১২০)। ইমাম আহমাদ ও বায়হাকী বর্ণিত দুইটি হাদীছ অনুযায়ী হযরত আয়েশা (রা) তাঁহাকে সেই দিন গৃহের অভ্যন্তর হইতে সাহাবী দিয়া কালবীর আকৃতিতে ধুলি ধূসরিত অবস্থায় দেখিতে পান যাহাতে তাঁহার কর্মব্যস্ততার চিত্রই ফুটিয়া উঠিতেছিল (আল-বিদায়া, ৪খ., পৃ. ১১৯-১২০)।
জিবরাঈল (আ) রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! আপনি কি অস্ত্র ত্যাগ করিয়াছেন? তিনি বলিলেন, হাঁ। জিবরাঈল (আ) বলিলেন, আমরা ফেরেস্তাগণ এখনও অস্ত্র পরিত্যাগ করি নাই। আমরা তো মুশরিকদের পশ্চাদ্ধাবন করিতে করিতে হাম্রাউল আসাদ নামক স্থান পর্যন্ত পৌঁছিয়া গিয়াছিলাম (আল-বিদায়া, ৪খ., পৃ. ১১৯-২০)। একটা কওমের সন্ধানেই এখন আবার ফিরিয়া আসিলাম। আল্লাহ আপনাকে বানু কুরায়যা অভিমুখে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দিয়াছেন। আমি আমার সহযাত্রী ফেরেশতাদের লইয়া আপনার আগেই সেই দিকে অগ্রসর হইতেছি যাহাতে তাহাদের ভিতর অস্থিরতা ও ভীতি সৃষ্টি করিতে পারি। আপনি আপনার সহচরদের লইয়া দ্রুত বাহির হউন (ইবন হিশাম, ৩খ., পৃ. ১৪৫)। রাসূলুল্লাহ (স) খন্দকের দীর্ঘ যুদ্ধ হইতে সদ্য প্রত্যাগত সাহাবাদের ক্লান্তি ও পরিশ্রান্তির কথা উত্থাপন করিলে জিবরাঈল (আ) তাঁহাকে উহার চিন্তা না করিয়া তৎক্ষণাত বানু কুরায়যার উদ্দেশে যাত্রার ইঙ্গিত দান করেন (সীরাতুল মুসতাফা, ২খ., পৃ. ৩২৪)। মদীনার নিকটবর্তী আল-বাকী' নামক এলাকায় অবস্থিত (খাযরাজের এক শাখাগোত্র) গানম গোত্রের পল্লী 'আস্-সূরীন" (الصورين) হইয়া তাঁহার (জিবরাঈল) যাওয়ার সময় সেখানকার অলি-গলি ধুলা-বালিতে ভরিয়া যায়। হযরত আনাস (রা) বলেন, "বানু গানম-এর সরু মেঠো পথ অতিক্রমকালে জিবরাঈল (আ)-এর বাহন হইতে যেই ধূলাবালি উঠিতেছিল সেই দৃশ্য যেন আমি এখনও দেখিতে পাইতেছি” (বুখারী, ২খ., পৃ. ৫৯১)।
জিবরাঈল (আ) চলিয়া যাওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (স) বিলাল (রা)-এর মাধ্যমে মুসলমানদিগকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হইয়া দ্রুত রওয়ানা হইতে এবং বানু কুরায়বায় পৌঁছিয়া আসরের নামায আদায় করার জন্য বলেন (ইব্‌ন হিশাম, ৩খ., পৃ. ১৪৮; আর-রাহীক, পৃ. ২৮৮)। তিনি হযরত আলী (র)-এর হস্তে ইসলামের পতাকা প্রদান করিয়া তাঁহাকে বানূ কুরায়যার উদ্দেশ্যে অগ্রে পাঠাইয়া দেন। তিনি তাহাদের দুর্গের নিকটবর্তী হইলে দুর্গাভ্যন্তর হইতে রাসূলুল্লাহ (স) সম্পর্কে ইয়াহুদীদের প্রকাশ্য কটুক্তি ও অশ্লীল কথাবার্তা শুনিতে পান (ইবন হিশাম, ৩খ., পৃ. ১৪৯; আর রাহীক, পৃ. ২৮৮) যাহা ছিল সম্পূর্ণরূপে ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। মদীনার দায়িত্বে হযরত ইব্‌ন উম্মে মাকতুম (রা)-কে নিয়োগ করিয়া এইবার স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (স) আনসার ও মুহাজিরগণকে লইয়া বাহির হন (আল-বিদায়া, ৪খ., পৃ. ১১৮)। তিনি বানু গানমের বসতি 'আস্ সূরীন' অতিক্রমকালে রাস্তায় অপেক্ষমাণ দর্শনার্থীদের নিকট হইতে কারুকার্য খচিত রেশমী বস্ত্রের মখমল সজ্জিত এক সাদা বাহনে সাহাবী দিহয়া ইব্‌ খলীফা আল-কালবী-র আকৃতিতে কিছুক্ষণ আগে জিবরাঈল (আ)-এর গমনের ব্যাপারে নিশ্চিত হন (ইব্‌ন হিশাম, ৩খ., পৃ. ১৪৯; আল-বিদায়া, ৪খ., পৃ. ১২১)। তিনি তাহাদিগকেও বানু কুরায়যার এলাকায় তাঁহার সহিত মিলিত হইয়া সেখানেই আসরের নামায পড়িবার নির্দেশ প্রদান করেন। ফলে সেখান হইতেও একদল মুসলমান বানু কুরায়যার উদ্দেশে গমন করেন (আল-বিদায়া, ৪খ., পৃ. ১২১)। রাসূলুল্লাহ (স) বানু কুরায়যার গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ ও জীবিকা উপার্জনের অন্যতম মাধ্যম হিসাবে বিবেচিত 'বিরে আনা' (بئر أنا) নামক তাহাদের এক কূপের নিকট আসিয়া অবস্থান গ্রহণ করেন। অতঃপর মুসলিম বাহিনী একের পর এক দলে দলে আসিয়া রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর সহিত মিলিত হয়। এমনকি কিছু সংখ্যক লোক ইশার নামাযের পরও আসিয়া উপস্থিত হন (ইব্‌ন হিশাম, ৩খ., পৃ. ১৪৯; বিদায়া, ৪খ, পৃ. ১২২)। এই অভিযানে মুসলমানদের সৈন্যসংখ্যা ছিল তিন হাজার; আর অশ্ব ছিল তিরিশটি (আর-রাহীক, পৃ. ২৮৮), ইবন সা'দ-এর মতে ছত্রিশটি (তাবাকাত, ২খ., পৃ. ৭৪)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আসরের নামায আদায়ের ব্যাপারে মতভেদ

📄 আসরের নামায আদায়ের ব্যাপারে মতভেদ


বানু কুরায়যা অভিমুখে যাত্রার প্রাক্কালে রাসূলুল্লাহ (স)-এর জারীকৃত নির্দেশ "কেহ যেন বানু কুরায়যা ছাড়া অন্য কোথাও আসরের নামাযা না পড়ে"-এর ফলে পথিমধ্যে উক্ত নামাযের ওয়াক্ত হইলে মুসলমানদের মধ্যে তাহা আদায়ের ব্যাপারে মতভেদ সৃষ্টি হয়। একদল বলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর নির্দেশানুযায়ী আমরা বানু কুরায়যায় পৌছার পরই কেবল আসর পড়ি, উহার পূর্বে নহে। আরেক দল বলেন, ঐ নির্দেশ দ্বারা তাঁহার উদ্দেশ্য তো ইহা ছিল না যে, নামায কাযা বা বিলম্বে আদায় করিতে হইবে বরং তাঁহার উদ্দেশ্য ছিল বানু কুরায়যায় দ্রুত গমন যাহাতে সেখানে পৌঁছিয়া আসর পড়া যায়। এই বলিয়া তাহারা পথেই নামায পড়িয়া লন। পরে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট এই বিষয় উত্থাপন করা হইলে তিনি কোন দলকেই ভর্ৎসনা করেন নাই (বুখারী, ২খ., পৃ. ৫৯১; আল-বিদায়া, ৪খ., পৃ. ১২১; সীরাতুল মুসতাফা, ২খ., পৃ. ৩২৪)।
কারণ উভয় দলের নিয়াত ভাল ছিল। মূলত সেই দিন একদল রাসূলুল্লাহ (স)-এর নির্দ্দেশকে আক্ষরিক অর্থে মানিয়াছিলেন, আরেক দল ঐ নির্দেশের মধ্যে রাসূলের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্যকে প্রাধান্য দিয়া তাঁহার হুকুম পালনে সচেষ্ট হন।
বাহ্যিক শব্দ ও অর্থানযায়ী রাসূলুল্লাহ (স) কর্তৃক বিলম্বে নামায আদায়ের ঐ বিশেষ আদেশকে প্রথম দল শরী'আত নির্ধারিত সময়ে নামায আদায়ের সাধারণ হুকুম ও আদেশের উপর অগ্রাধিকার দিয়া সূর্যাস্তের পর (বিদায়া, ৪খ., পৃ. ১২১), এমনকি কেহ কেহ রাত্রে ইশার সময় বানু কুরায়যাতে পৌঁছিয়া আসর নামায আদায় করেন (আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ২৮৮)।
তবে হাফিজ ইব্‌ন কায়্যিম-এর মতে প্রথম দল শুধু রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর হুকুম পালনের ছওয়াব লাভ করিয়াছেন আর দ্বিতীয় দল যেহেতু (ক) ইজতিহাদের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর হুকুম পালন এবং (খ) আসরের ন্যায় বিরাট গুরুত্বপূর্ণ নামায সময়মত আদায় করিয়াছেন যাহার সংরক্ষণ ও যত্নের ব্যাপারে কুরআন করীমে বিশেষ নির্দেশ ও তাকীদ আসিয়াছে (দ্র. ২ঃ ২৩৮) এবং হাদীছ শরীফে সেই নামায সম্বন্ধে বলা হইয়াছেঃ যাহার আসর ছুটিয়াছে তাহার আমল ব্যর্থ ও নিষ্ফল হইয়াছে, তাই উপরিউক্ত দুই কারণে তাহারা দ্বিগুণ ছওয়াব ও মর্যাদার অধিকারী হইয়াছেন (ফাতহুল বারী, ৭খ., পৃ. ৩১৬; সীরাতুল মুসতাফা, ২খ., পৃ. ৩২৫)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 অবরোধ

📄 অবরোধ


মুসলিম বাহিনীর অগ্রাভিযানের সংবাদে বানু কুরায়যার ইয়াহুদীগণ যদি নিজেদের কৃত অপরাধে অনুতপ্ত ও লজ্জিত হইয়া সন্ধি ও বন্ধুত্বের হস্ত প্রসারিত করিত তাহা হইলে তাহাদের নিরাপত্তা প্রাপ্তির সম্ভাবনা ছিল। উহাই ছিল সবেচেয়ে সহজ ও নিরাপদ পন্থা। কিন্তু এই দুরাচার হতভাগ্য সম্প্রদায় ঐ পথে না গিয়া বরং মুকাবিলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে (সীরাতুন্নবী ১খ., পৃ. ২৫৩)। মুসলমানগণ নিকটবর্তী হইলে তাহারা প্রকাশ্যে আল্লাহ্র রাসূল (স)-কে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করিতে থাকে (তারীখে ইসলাম, পৃ. ৬৯)। মুসলিম সৈন্যবাহিনীর অগ্রগামী ইসলামের পতাকাবাহী হযরত আলী (রা) সর্বপ্রথম তাহা শ্রবণ করা মাত্রই সেখান হইতে দ্রুত প্রত্যাবর্তন করেন। পথিমধ্যে রাসূলুল্লাহ (স)-কে তাহার দিকে অগ্রসর হইতে দেখিয়া বিনীতভাবে তাঁহার গতিরোধ করার চেষ্টা করেন। ইয়াহুদীদের অশ্লীল ও নোংরা গালি সরাসরি রাসূলুল্লাহ্ (স) শুনিলে কষ্ট পাইবেন ভাবিয়া তিনি তাঁহাকে সম্মুখে অগ্রসর না হওয়ার জন্য অনুরোধ জানান এবং বলেন, "ইয়া রাসূলাল্লাহ! এই অবাধ্য লম্পটদের নিকটবর্তী হওয়া আপনার জন্য সমীচীন নহে। আপনি বরং প্রত্যাবর্তন করুন। ইহাদের অনিষ্ট হইতে আপনাকে রক্ষার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।"
"সম্মুখে অগ্রসর না হইয়া প্রত্যাবর্তন কেন করিতে হইবে" ইহার কারণ জিজ্ঞাসা করিলে আলী (রা) দুর্গভ্যন্তর হইতে রাসূলুল্লাহ (স) সম্বন্ধে তাহাদের যেইসব অশ্লীল কথাবার্তা শুনিয়াছিলেন তিনি উহা তাহার নিকট গোপন করেন। রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিলেন, মনে হইতেছে তুমি তাহাদের পক্ষ হইতে আমার সম্বন্ধে কষ্টদায়ক কিছু শুনিয়াছ? আলী (রা) ইতিবাচক উত্তর দিলে তিনি বলিলেন, "তাহারা আমাকে দেখিতে পাইলে তুমি যাহা শুনিয়াছ উহার কোন কিছুই বলিতে পারিত না।" এই বলিয়া তিনি সম্মুখে অগ্রসর হইলেন এবং দুর্গের নিকটবর্তী হইয়া দুর্গশীর্ষে অবস্থানরত তাহাদের কয়েকজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের নাম ধরিয়া তাহারা শুনিতে পায় এমন উচ্চস্বরে ডাক দিয়া বলিলেন, উত্তর দাও হে ইয়াহুদী সম্প্রদায়! হে বানরের জ্ঞাতি! আল্লাহ কি তোমাদেরকে অপদস্থ ও লাঞ্ছিত করিয়াছেন? তোমাদের উপর কি তাঁহার শাস্তি অবতীর্ণ করিয়াছেন? বস্তুত তোমাদের জন্য আল্লাহ্র লাঞ্ছনা ও অপমানই অবধারিত।” ইহা শুনিয়া তাহারা উত্তর করিল, হে আবুল কাসিম! তুমি তো এইরূপ মূর্খের মত কথা বলিতে না (ইব্‌ন হিশাম, ৩খ, ১৪৯; আল-বিদায়া, ৪খ, ১২০)। যাহা হউক রাসূলুল্লাহ (স) বানু কুরায়যার ইয়াহুদীদের বিশ্বাসঘাতকতা, ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ ও অশালীন কথাবার্তার সমুচিৎ শাস্তি প্রদানের লক্ষ্যে উপরিউক্ত কথোপকথনের পর কালবিলম্ব না করিয়া তাহাদের উপর অবরোধ আরোপ করেন। এই অবরোধ চলে একাধারে ২৫ দিন। অবশেষে দীর্ঘ অবরোধে তাহারা দুর্বল ও ক্লান্ত হইয়া পড়ে (ইবন হিশাম, ৩খ., পৃ. ১৪৯)।
অবরোধের তীব্রতায় এক পর্যায়ে যখন বানু কুরায়যার হৃদয়ে এই বিশ্বাস ও ধারণা বদ্ধমূল হইল যে, রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদেরকে সমুচিৎ শিক্ষা না দিয়া সেখান হইতে ফিরিয়া যাইবেন না, তখন তাহাদের গোত্রপতি কা'ব ইব্‌ন আসাদ উদ্ভূত সঙ্কট হইতে উত্তরণের লক্ষ্যে সবাইকে একত্র করিয়া বলিল, আমি তোমাদের নিকট তিনটি প্রস্তাব পেশ করিতেছি। ইহার যে কোন একটি গ্রহণ করিয়া তোমরা এই বিপদ হইতে উদ্ধার পাইতে পার।
১. ইসলাম গ্রহণ করিয়া মুহাম্মাদের ধর্মে প্রবেশ করা এবং তাঁহার পরিপূর্ণ অনুসারী হইয়া যাওয়া। আল্লাহর শপথ! ইহা সম্পূর্ণরূপে তোমাদের নিকট পরিষ্কার হইয়া গিয়াছে যে, মুহাম্মাদ নিঃসন্দেহে একজন নবী ও রাসূল। নিশ্চয় তিনিই সেই নবী যাঁহার আলোচনা তোমরা তাওরাতে দেখিতে পাও। সুতরাং তাঁহার উপর ঈমান আনিলে তোমাদের জীবন, সম্পদ, স্ত্রী-পুত্র সকল কিছু নিরাপদ থাকিবে। তাহারা বলিল, আমাদের নিকট ইহা গ্রহণযোগ্য নহে। আমরা আমাদের ধর্ম পরিত্যাগ করিব না, তাওরাতের বিধান ছাড়া অন্য কোন বিধানই মানিব না। কা'ব বলিল, তাহা হইলে আস-
২. "আমরা আমাদের সন্তান ও স্ত্রীগণকে স্বহস্তে হত্যা করিয়া একেবারে চিন্তামুক্ত হইয়া যাই এবং কোষমুক্ত তরবারি হস্তে বাহির হইয়া পূর্ণ সাহস ও বীরত্বের সঙ্গে মুহাম্মাদ ও তাঁহার সাথীদের মুকাবিলা করি। ইহাতে পরাজিত হইলে স্ত্রী-পূত্রের কোন বাড়তি চিন্তা থাকিবে না। আর বিজয় লাভ করিলে নূতন স্ত্রীর অভাব হইবে না। তাহাদের মাধ্যমে পুনরায় সন্তান লাভ করিতে পারিব।” তাহারা বলিল, অযথা এই অসহায় নারী-শিশুদিগকে হত্যার পর নিজেদের বাঁচিয়া থাকার মধ্যে কী স্বাদ ও সার্থকতা রহিয়াছে?
কা'ব: ঠিক আছে তোমাদের নিকট ইহাও যখন গ্রহণযোগ্য নহে তাহা হইলে আমার সর্বশেষ প্রস্তাব হইলঃ ৩. "আমাদের এই সঙ্কট হইতে উত্তরণের জন্য শনিবারের রাত্রিই হইবে উপযুক্ত সময়। যেহেতু শনিবার ইয়াহুদীদের নিকট পবিত্র ও তাঁহার সঙ্গীগণ ঐ রাত্রে আমাদের পক্ষ থেকে আক্রান্ত না হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিন্ত থাকিবে, তাঁহাদের এই অসতর্কতা ও অন্যমনস্কতার সুযোগে তাঁহাদের উপর আকস্মিক আক্রমণ চালাইয়া তাহাদেরকে পর্যুদস্ত করা খুবই সহজ হইবে।"
তাহারা এই প্রস্তাবের উত্তরে বলিল, কা'ب! তোমার ভালভাবেই জানা আছে যে, আমাদের পূর্বপুরুষগণ এই দিনকে কলঙ্কিত করার অপরাধে শূকর ও বানরে রূপান্তরিত হইয়াছিল। তাহার পরও তুমি আমাদিগকে উহার নির্দেশ প্রদান করিতেছ!
বানু কুরায়যা একে একে যখন সকল প্রস্তাবই প্রত্যাখ্যান করিল তখন তাহাদের উপর ক্রোধ ও বিরক্তি প্রকাশ করিয়া কা'ব বলিল, "জন্মলগ্ন হইতে অদ্যাবধি তোমাদের কেহই দৃঢ় সংকল্প ও বিচক্ষণতার সহিত একটা রাত্রিও অতিবাহিত কর নাই” (আল-বিদায়া, ৪খ., পৃ. ১২২; ইব্‌ন হিশাম, ৩খ., পৃ. ১৫০)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00