📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আল্লাহ্ পক্ষ হইতে সুসংবাদ

📄 আল্লাহ্ পক্ষ হইতে সুসংবাদ


রাসূলুল্লাহ (স) স্থান ছাড়িয়া তখনও উঠেন নাই, ওহী নাযিল হওয়ার লক্ষণ দেখা দিল। তাঁহাকে বস্ত্রাচ্ছাদিত করা হইল, তাঁহার মাথার নিচে চামড়ার তৈরী বালিশ দেওয়া হইল। শীতের মৌসুমেও তাঁহার চেহারা মুবারক হইতে মুক্তার দানার মত ঘাম ঝরিতেছিল। আইশা (রা) বলেন: فاما انا فوالله ما فزعت ولا باليت قد عرفت انى برئية وان الله غير ظالمي واما ابواى فما سرى عن رسول الله ﷺ حتى ظننت لتخرجن انفسهما خرقا من ان ياتي من الله تحقيق ما قال الناس.
“যেই সময় রাসূলুল্লাহ (স)-এর উপর ওহী নাযিল শুরু হইল, আল্লাহ্র কসম! আমি মোটেও ভীত হই নাই। কারণ আমি জানি যে, আমি দোষমুক্ত এবং আল্লাহ আমার উপর যুলুম করিবেন না। যতক্ষণ পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (স)-এর সেই বিশেষ অবস্থার অবসান না ঘটিতেছিল ততক্ষণ কিন্তু ভয়ে আমার মা-বাবার এমন অবস্থা হইয়াছিল যে, আমার আশংকা ছিল যদি তাঁহারা প্রাণ হারান। লোকেরা যাহা বলাবলি করিতেছে তাহার সত্যতা বর্ণনা করিয়া যদি আল্লাহ ওহী নাযিল করেন ইহাই ছিল তাঁহাদের ভয়ের কারণ" (ইবন হিশাম, সীরাতুন্নবী, ৩খ, ১৯১; তারীখ তাবারী, ২খ., পৃ. ৬১৬)।
হযরত আবূ বাক্‌র (রা) একবার রাসূলুল্লাহ (স)-এর দিকে, আরেকবার আইশা (র)-এর দিকে তাকাইতে থাকেন। রাসূলুল্লাহ (স)-এর দিকে যখন তাকাইতেন তখন আশংকা করিতেন, না জানি আসমান হইতে কি ফয়সালা অবতীর্ণ হইতেছে, যাহা কিয়ামত পর্যন্ত থাকিবে অম্লান ও অক্ষয়। আইশা (রা)-এর প্রতি তাকাইলে কিছুটা আশার আলো দেখিতেন। আইশা সিদ্দীকা (রা) ছাড়া ঘরের অন্যান্য মানুষেরা আশা- নিরাশার দোলায় হিমশিম খাইতে থাকেন। এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে ওহী অবতরণ সমাপ্ত হইল। রাসূলুল্লাহ (স)-এর পবিত্র চেহারায় আনন্দ ও খুশীর লক্ষণ পরিস্ফুটিত হইল। ললাটের ঘাম মুছিতে মুছিতে রাসূলুল্লাহ (স) আইশা (রা)-কে উদ্দেশ্য করিয়া বলিলেন: ابشري يا عائشة فقد انزل الله برائك.
৪৩ "হে আইশা! সুসংবাদ গ্রহণ কর। মহান আল্লাহ তোমার নির্দোষিতার কথা নাযিল করিয়াছেন” (সহীহ বুখারী, ২খ., পৃ. ৭০০; ইব্‌ন হিশাম, সীরাতুন্নবী, ৩খ, ১৯১-২)।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) সূরা নূরের নিম্নলিখিত দশটি আয়াত তিলাওয়াত করিয়া শুনাইলেনঃ إِنَّ الَّذِينَ جَاءُو بِالافْكِ عُصْبَةٌ مِّنْكُمْ لَا تَحْسَبُوهُ شَرًا لَكُمْ بَلْ هُوَ خَيْرٌ لَكُمْ لِكُلِّ امْرِئٍ مِّنْهُمْ مَّا اكْتَسَبَ مِنَ الإِثْمِ وَالَّذِي تَوَلَّى كِبْرَهُ مِنْهُمْ لَهُ عَذَابٌ عَظِيمٌ. لَوْلَا إِذْ سَمِعْتُمُوهُ ظَنَّ الْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنتُ بِأَنْفُسِهِمْ خَيْرًا وَقَالُوا هذا افْكَ مُّبِينٌ. لَوْلَا جَاءُوْ عَلَيْهِ بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاءَ فَإِذْ لَمْ يَأْتُوا بِالشُّهَدَاء فَأُولَئِكَ عِنْدَ اللهِ هُمُ الكَذِبُونَ. وَلَوْلا فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُهُ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ لَمَسَّكُمْ فِي مَا أَفَضْتُمْ فِيهِ عَذَابٌ عَظِيمٌ إِذْ تَلَقُونَهُ بِالْسِنَتِكُمْ وَتَقُولُونَ بِأَفْوَاهِكُمْ مَّا لَيْسَ لَكُمْ بِهِ عِلْمٌ وَتَحْسَبُونَهُ هَيِّنًا وَهُوَ عِنْدَ اللَّهِ عَظِيمٌ. وَلَوْلَا إِذْ سَمِعْتُمُوهُ قُلْتُمْ مَّا يَكُونُ لَنَا أَنْ نَتَكَلَّمَ بهذا سُبْحَنَكَ هذَا بُهْتَانٌ عَظِيمٌ. يَعِظُكُمُ اللَّهُ أَنْ تَعُودُوا لِمِثْلِهِ أَبَدًا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ. وَيُبَيِّنَ الله لَكُمُ الايتِ وَاللَّهُ عَلِيْمٌ حَكِيمٌ إِنَّ الَّذِينَ يُحِبُّونَ أَنْ تَشِيعَ الْفَاحِشَةُ فِي الَّذِينَ آمَنُوا لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ. وَلَوْلا فَضْلُ اللهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُهُ وَأَنَّ اللَّهَ رَءُوفٌ رَّحِيمٌ.
"যাহারা এই অপবাদ রটনা করিয়াছে, তাহারাতো তোমাদেরই একটি দল। ইহাকে তোমরা তোমাদের জন্য অনিষ্টকর মনে করিও না, বরং ইহা তো তোমাদের জন্য কল্যাণকর, উহাদের প্রত্যেকের জন্য আছে উহাদের কৃত পাপকর্মের ফল এবং উহাদের মধ্যে যে এই ব্যাপারে প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করিয়াছে, তাহার জন্য আছে মহাশাস্তি। যখন তাহারা ইহা শুনিল তখন মু'মিন পুরুষ এবং মু'মিন নারিগণ আপন লোকদের সম্পর্কে কেন ভাল ধারণা করিল না এবং বলিল না, 'ইহা তো সুস্পষ্ট অপবাদ।' তাহারা কেন এই ব্যাপারে চারিজন সাক্ষী উপস্থিত করে নাই? যেহেতু তাহারা সাক্ষী উপস্থিত করে নাই, সে কারণে তাহারা আল্লাহ্র নিকট মিথ্যাবাদী। দুনিয়া ও আখিরাতে তোমাদের প্রতি আল্লাহ্র অনুগ্রহ ও দয়া না থাকিলে তোমরা যাহাতে লিপ্ত ছিলে তজ্জন্য মহাশাস্তি তোমাদিগকে স্পর্শ করিত। যখন তোমরা মুখে মুখে ইহা ছড়াইতেছিলে এবং এমন বিষয় মুখে উচ্চারণ করিতেছিলে যাহার কোন জ্ঞান তোমাদের ছিল না এবং তোমরা ইহাকে তুচ্ছ গণ্য করিয়াছিলে, যদিও আল্লাহ্র নিকট ইহা ছিল গুরুতর বিষয়। এবং তোমরা যখন ইহা শ্রবণ করিলে তখন কেন বলিলে না, এ বিষয়ে বলাবলি করা আমাদের উচিত নহে; আল্লাহ পবিত্র মহান। ইহা তো এক গুরুতর অপরাধ। আল্লাহ তোমাদিগকে উপদেশ দিতেছেন, তোমরা যদি মু'মিন হও তবে কখনও অনুরূপ আচরণের পুনরাবৃত্তি করিও না। আল্লাহ তোমাদের জন্য আয়াতসমূহ সুস্পষ্টভাবে বিবৃত করেন এবং আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। যাহারা মু'মিনদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার কামনা করে তাহাদের জন্য আছে দুনিয়া ও আখিরাতে মর্মন্তুদ শাস্তি এবং আল্লাহ জানেন, তোমরা জাননা। তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়া না থাকিলে তোমাদের কেহই অব্যাহতি পাইতে না এবং আল্লাহ দয়ার্দ্র ও পরম দয়ালু" (২৪ঃ ১১-২০)।
রাসূলুল্লাহ (স) যখন আইশা (রা)-র পবিত্রতা ও দোষমুক্তি সম্পর্কিত পবিত্র কুরআনের উপরিউক্ত দশটি আয়াত তিলাওয়াত সমাপ্ত করিলেন, হযরত আবূ বাক্‌র (রা) আনন্দে উচ্ছসিত হইয়া তৎক্ষণাৎ স্বীয় কন্যা আইশা (রা)-র কপালে চুমা দিলেন। আইশা (রা) বলেন, فلا عزرتنی "আপনি প্রথমেই আমাকে নিরপরাধ ও নির্দোষ মনে করেন নাই কেন"?
এই কথা শুনিয়া হযরত আবূ বাক্‌র সিদ্দীক (রা), যিনি সততা ও ধৈর্যের অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করিয়াছেন, জবাব দিলেন: أى السماء تظلني واى ارض تقلني اذا قلت مالم اعلم واجيب.
"কোন্ আসমান আমাকে ছায়া দান করিবে কান্ যমীন আমাকে ধারণ করিবে, যদি আমি এমন কথা বলি যাহা আমি মোটেই জানি না।" (সায়‍্যদ মাহমূদ আলুসী বাগদাদী, রূহুল মা'আনী, ১৮খ., পৃ. ১০৯)।
হযরত আইশা (রা)-র মা উম্ম কাহারও শুকরিয়া আদায় করিব না। কুলের প্রতি শোকরিয়া জ্ঞাপন কর। আইশা (রা) জলাল করিয়াছেন" (সহীহ বুখারী, ২খ., আল্লাহ্র কসম! আমি উঠিব না, যে কারণে আল্লাহ আমাকে নির্দোষ প্রমাণ করিয়াছেন" (বুখারী, পৃ. ৫৯৬)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মিস্তাহ সম্পর্কে হযরত আবূ বাক্স (রা)-এর ভূমিকা

📄 মিস্তাহ সম্পর্কে হযরত আবূ বাক্স (রা)-এর ভূমিকা


আত্মীয়তার বন্ধন ও দরিদ্রতার কারণে আবূ বাক্‌র (রা) মিসতাহ ইব্‌ন উছাছাকে নিয়মিত আর্থিক সাহায্য করিতেন। নিজ মেয়ে সম্পর্কে কুৎসা রটনায় তিনি সংক্ষুব্ধ হইয়া বলিলেন, আল্লাহ্র কসম! আমি আর কখনও মিস্তাহকে আর্থিক সাহায্য করিব না। এই কথা আল্লাহ তা'আলার পছন্দ হয় নাই। নিম্নোক্ত আয়াত তাহার সম্পর্কে নাযিল করা হয়: وَلَا يَأْتَلِ أُولُوا الْفَضْلِ مِنْكُمْ وَالسَّعَةِ أَنْ يُؤْتُوا أولى القُرْبَى وَالْمَسْكِينَ وَالْمُهجِرِينَ فِي سَبِيلِ اللهِ وَلْيَعْفُوا وَلَيَصْفَحُوا أَلَا تُحِبُّونَ أَنْ يَغْفِرَ اللَّهُ لَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ.
"তোমাদের মধ্যে যাহারা ঐশ্বর্য ও প্রাচুর্যের অধিকারী তাহারা যেন শপথ গ্রহণ না করে যে, তাহারা আত্মীয়-স্বজন ও অভাবগ্রস্তকে এবং আল্লাহ্র রাস্তায় যাহারা হিজরত করিয়াছে তাহাদিগকে কিছুই দিবে না। তাহারা যেন উহাদিগকে ক্ষমা করে এবং উহাদের দোষত্রুটি উপক্ষো করে। তোমরা কি চাহ না যে, আল্লাহ তোমাদিগকে ক্ষমা করুন? এবং আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু” (২৪: ২২)।
এই আয়াত নাযিল হইবার পর হযরত আবূ বাক্‌র (রা) বলিলেন, 'হাঁ আল্লাহর শপথ! অবশ্যই আমি পছন্দ করি যে, আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করুন।' তাই মিস্তাহের জন্য তিনি যে আর্থিক সাহায্য দিতেন তাহা আবার বহাল করিলেন। তিনি বলিলেন: والله لا انزعها منه ابدا . "আল্লাহ্র কসম! আমি কখনও সেই অনুদান তাহার নিকট হইতে কাড়িয়া লইব না” (ইবন হিশাম, সীরাতুন্নবী, ৩খ., ১৯৩; তারীখ তাবারী, ২খ., ৬১৮)।
রাসূলুল্লাহ (স) স্বীয় পত্নী হযরত যয়নব বিন্ত জাহ্শকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি আইশা সম্পর্কে কি জান বা কি দেখিয়াছ? জবাবে তিনি বলিলেন: يا رسول الله احمى سمعي وبصرى والله ما علمت الا خيرا. “হে আল্লাহর রাসূল! আমি আমার কান ও চোখকে রক্ষা করিয়াছি (মিথ্যা বলা হইতে)। আল্লাহর শপথ! আমি তাঁহার সম্পর্কে ভাল ছাড়া মন্দ জানি না।"
হযরত আইশা সিদ্দীকা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর স্ত্রীদের মধ্যে একমাত্র তিনিই (যয়নব) আমার সমকক্ষ ও প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন, কিন্তু তাকওয়ার কারণে আল্লাহ তাঁহাকে রক্ষা করিয়াছেন। অথচ তাঁহার বোন হামনা বিন্ত জাহ্শ- তাঁহার পক্ষ অবলম্বন করিয়া কুৎসা ছড়াইতেছিল। আর এইভাবে সে ধ্বংসপ্রাপ্তদের সহিত ধ্বংস হইল (সহীহ বুখারী, ২খ., ৫৯৬)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 অপরাধীদের শাস্তি প্রদান

📄 অপরাধীদের শাস্তি প্রদান


অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) মসজিদে নববীতে সূরা নূরের দশটি আয়াত সমবেত জনগণকে তিলাওয়াত করিয়া শোনান। হাসান ও তাঁহার সাথীদের ডাকিয়া রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আইশার বিরুদ্ধে তোমরা যে অভিযোগ আনিয়াছ তাহার স্বপক্ষে সাক্ষ্য-প্রমাণ পেশ কর। তাঁহারা সবাই বলিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমাদের নিকট কোন ধরনের সাক্ষ্য-প্রমাণ নাই। এই ব্যাপারে আমাদের অপরাধ স্বীকার করিয়া লইতেছি। সতী-সাধ্বী মহিলার বিরুদ্ধে যাহারা মিথ্যা অপবাদ দেয় যাহা 'কাযাফ' নামে পরিচিত, পবিত্র কুরআনে তাহাদের শাস্তির বিধান রাখা হইয়াছে।
রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের সামনে সংশ্লিষ্ট আয়াত পড়িয়া শোনান: وَالَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَتِ ثُمَّ لَمْ يَأْتُوا بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاءَ فَاجْلِدُوهُمْ ثَمَانِينَ جَلْدَةً وَلَا تَقْبَلُوا لَهُمْ شَهَادَةً أَبَدًا وَأُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ.
"যাহারা সাধ্বী নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে, অতঃপর চারিজন সাক্ষী উপস্থিত করে না তাহাদেরকে আশিটি কশাঘাত করিবে এবং কখনও তাহাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করিবে না। ইহারাই তো সত্যত্যাগী” (২৪:৪)।
সুতরাং আল্লাহ তা'আলার বিধান অনুযায়ী অভিযুক্ত ব্যক্তিদের প্রত্যেককে আশিটি করিয়া কশাঘাত করা হয়। ইহার পর আল্লাহ্র নিকট তাঁহারা তওবা করিয়া পবিত্র হইয়া যান (ইদরীস কান্ধলবী, সীরাতুল মুস্তাফা, ১খ, ৭৭0; সায়্যিদ ওয়াদুদুল হাই নদবী, হায়াতে সিদ্দীকা, পৃ. ৪১)।
হাদীছের অধিকাংশ বর্ণনা অনুযায়ী মুনাফিক দলপতি আবদুল্লাহ ইবন উবাইকে কোনরূপ শাস্তি দেওয়া হয় নাই। অথচ এই দুর্বৃত্তই অপবাদ রটনায় শীর্ষস্থানীয় হওয়া সত্ত্বেও কেন শাস্তি দেওয়া হয় নাই এই প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবে উঠিতে পারে। ইহার কারণ এই যে, যাহাদেরকে শাস্তি দেওয়া হইয়াছে সেই শাস্তির পরিবর্তে তাহারা পরকালে ক্ষমা পাইয়া যাইবে। দুনিয়ার এই শাস্তি তাহাদের গুনাহের কাফফারাস্বরূপ। আবদুল্লাহ ইবন উবাইকে যেহেতু আল্লাহ তা'আলা পরকালে কঠোর শাস্তি দিবেন বলিয়া ঘোষণা দিয়াছেন, এই কারণে তাহাকে পার্থিব কোন শাস্তি দেওয়া হয় নাই (সহীহ বুখারী, ১খ, ৩৬৪, ২খ, ৬৯৬-৮; ইবনুল কায়্যিম, যাদুল মা'আদ, ২খ., পৃ. ১১৩-১৫)।
আসল রহস্য উদঘাটিত হইবার পর মদীনার মুসলমানদের মধ্যে আনন্দের বন্যা বহিয়া যায়। আইশা (রা)- এর পূর্বেকার সম্মান ও মর্যাদা পূনঃ প্রতিষ্ঠিত হয়। রাসূলুল্লাহ (স)- এর নিকট তিনি পূর্বের মত স্নেহ-ভালবাসার পাত্রী হিসাবে পরিগণিত হন এবং পিত্রালয় হইতে রাসূলুল্লাহ (স) -এর গৃহে প্রত্যাবর্তন করেন। অপবাদের অবসান হওয়ায় আইশা (রা)-র স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটে (Dr. Muhammed Husayn Haykal, The Life of Muhammad, p. 334-9)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ইক্কের ঘটনার শিক্ষা ও তাৎপর্য

📄 ইক্কের ঘটনার শিক্ষা ও তাৎপর্য


ইফকের ঘটনা কেবল দুর্ঘটনা নয়। ইহাতে রহিয়াছে বহুবিধ শিক্ষা, হিদায়াত ও তাৎপর্য যাহা কিয়ামত পর্যন্ত উম্মতের জন্য পথনির্দেশিকার ভূমিকা পালন করিবে।
এক: ইফকের ঘটনার মাধ্যমে উম্মুল মু'মিনীন হযরত আইশা (রা)-এর চারিত্রিক দৃঢ়তা, মাহাত্ম্য ও আল্লাহ ভীতির দৃষ্টান্ত স্থাপিত হইয়াছে।
দুইঃ এই সম্পর্কিত যে ১০টি আয়াত নাযিল হইয়াছে তাহাতে তাঁহার পবিত্রতা ও সতীত্ব অনন্তকালের জন্য নিবন্ধিত হইয়া রহিল। দোষমুক্তির সংবাদ স্বয়ং আল্লাহ্র নিকট হইতে আসিয়াছে। হযরত আইশা (রা)-র পবিত্রতার ঘোষণা ও কুৎসা রটনাকারীদের নিন্দাবাদের বর্ণনা কিয়ামত পর্যন্ত প্রতি মসজিদে, প্রতি ইবাদতগাহে, প্রতি ঘরে তিলাওয়াত হইতে থাকিবে। কত বড় মর্যাদা! কত বড় কৃতিত্ব (আল্লামা আশরাফ আলী থানবী, বয়ানুল কুরআন, ৮খ, পৃ. ৮)!
তিন : ইফকের ঘটনাকে কেন্দ্র করিয়া যেসব আয়াত নাযিল হইয়াছে ইহার মধ্যে হযরত আবূ বাক্‌র (রা)-র ধৈর্য, সততা ও ফযীলতের স্বীকৃতি রহিয়াছে। মানবজাতির জন্য ইহা বড় শিক্ষা। নিজের মেয়ে হইয়াও ওহী নাযিল হওয়া পর্যন্ত তিনি চরম ধৈর্যের পরিচয় দিয়াছেন, মেয়ের পক্ষাবলম্বন করেন নাই। প্রচণ্ড উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তার মধ্যে একবার কেবল বলিয়াছিলেন : والله ما قيل لنا هذا في الجاهلية فكيف بعد ما اعز الله بالاسلام.
"আল্লাহ্র কসম! এমনতর কথা জাহিলী যুগে পর্যন্ত আমাদের সম্পর্কে কেহ বলে নাই। আর যখন আল্লাহ আমাদেরকে ইসলামের কারণে ইয্যত দান করিয়াছেন, তখন ইহা কি করিয়া সম্ভব” (ফাতহুল বারী, ৮খ., পৃ. ৩৬৯)?
ولا ياتل اولوا الفضل منكم এই আয়াতের তাফসীর করিতে গিয়া ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী হযরত আবূ বাক্‌রের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে ১৪টি বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করিয়াছেন (সীরাতুল মুস্তাফা, ১খ., পৃ. ৭৭৩)।
চার : ইফকের এই ঘটনা ছিল আল্লাহ্র পক্ষ হইতে নিষ্ঠাবান মু'মিনদের জন্য ঈমান ও ইখলাসের পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় মু'মিনগণ সফলকাম হইয়াছেন।
পাঁচঃ ইফকের ঘটনার মাধ্যমে মুনাফিকদের অন্তরের কদর্যতা ও ষড়যন্ত্রের মুখোশ জনসমক্ষে উন্মোচিত হইয়া যায়। ফলে সমাজের সচেতন মানুষের নিকট তাহারা হেয় প্রতিপন্ন হয়। মুনাফিক নেতা আবদুল্লাহ ইবন উবাই এমনভাবে নাজেহাল হইল যে, সে আর কখনও মাথা তুলিতে পারে নাই (আর-রাহীকুল মাখতূম, পৃ. ৩৬৯)।
ছয় : মহান আল্লাহ এই ঘটনাকে কেন্দ্র করিয়া সূরা নূরের ১০টি আয়াত অবতীর্ণ করিয়াছেন, যাহাতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সম্মানিতা স্ত্রীদের ইয্যত, সতীত্ব, নৈতিক দৃঢ়তা, চারিত্রিক সততা সম্পর্কে আল-কুরআনে উল্লেখ আছে যাহা কিয়ামত পর্যন্ত আবৃত্তি হইতে থাকিবে। আল্লাহ্র রাসূলের সহধর্মিনীদের চরিত্র লইয়া যাহারা বিন্দুমাত্র সন্দেহ পোষণ করিয়া বিরূপ মন্তব্য করিবে তাহারা মুনাফিক অভিধায় চিহ্নিত হইবে।
সাত : ইফকের ঘটনা সংঘটিত হইবার পর প্রায় এক মাস ওহী অবতরণে বিলম্ব ঘটে। ফলে এই এক মাস হযরত আইশা সিদ্দীকা (রা) ভগ্নহৃদয়ে কান্নাকাটি করিয়াছেন, প্রতি মুহূর্তে আল্লাহ্র সাহায্য কামনা করিয়াছেন, আল্লাহ ছাড়া কাহারও উপর তিনি ভরসা রাখেন নাই। ইহাতে তাঁহার মর্যাদা পূর্ণতা লাভ করে।
আট : ইফকের ঘটনা দ্বারা এই কথা প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ তা'আলা ছাড়া গায়েবের সংবাদ আর কেহ জানে না। এক মাস রাসূলুল্লাহ (স) দ্বিধাগ্রস্ত ও উদ্বেগাকুল ছিলেন। ওহী অবতরণের পর তাঁহার সংশয় ও উৎকণ্ঠার অবসান ঘটে।
নয় : ইফকের ঘটনার দ্বারা এই কথা প্রমাণিত হয় যে, রাগের বশবর্তী হইয়া গোত্র ও গোষ্ঠীপ্রীতি অবলম্বন অবৈধ। যেমন সা'দ ইব্‌ন মু'আয সা'দ ইবন উবাদাহকে বলিয়াছিলেন, আপনি মুনাফিক, মুনাফিকদের পক্ষাবলম্বন করিবেন না।
দশ : ইফকের ঘটনা-পরম্পরায় এই কথা স্পষ্টত পরিষ্কার হইয়াছে যে, রাসূলুল্লাহ (স)-এর পরিবারবর্গ সবাই সতী, সাধ্বী ও পুণ্যবতী। তাঁহাদের সম্পর্কে কেহ যদি কোন কটূক্তি করে তাহা হইলে আল্লাহর রাসূল অন্তরে কষ্ট পান। আর আল্লাহ্র রাসূলকে কষ্ট দিলে সমূহ বিপদের আশংকা রহিয়াছে। ইমাম ইবনে তায়মিয়া (রা) এই প্রসঙ্গে বলেন:
مَنْ آذَى الرَّسُولَ فَقَدْ آذَى اللهُ ثُمَّ وَمَنْ آذَى اللهُ فَهُوَ كَافِرٌ حَلالُ الدَّمِ لان مُوذِيَ النَّبِي ﷺ لا تقبل توبته اذا تاب من القذف حتى يسلم اسلاما جديدا .
"যে ব্যক্তি আল্লাহ্র রাসূল (স)-কে কষ্ট দিল সে আল্লাহকে কষ্ট দিল। আর আল্লাহকে যে কষ্ট দিল সে কাফির ও মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধী। রাসূলুল্লাহ (স)-কে কষ্টদানকারী যদি অপবাদ হইতে তওবাও করে তবুও তাহার তওবা কবুল হইবে না যতক্ষণ না নূতনভাবে ইসলাম গ্রহণ করে"।
এগার : ইয়াহুদীরা যেমন হযরত মারয়াম সিদ্দীকা (আ)-এর প্রতি চারিত্রিক অপবাদ দেওয়ার কারণে অভিশপ্ত হইয়াছে, তেমনি রাফেযীগণ হযরত আইশা সিদ্দীকা (রা)-র প্রতি কুৎসা রটনার কারণে অভিশপ্ত।
বার : কাযী আবুস সাইব বলেন, আহলে বায়তের কতিপয় ইমামের সম্মুখে একজন রাফেযী উম্মুল মুমিনীন হযরত আইশা (রা) সম্পর্কে কটুক্তি ও অশালীন মন্তব্য করিলে তাঁহারা ঐ লোকটিকে হত্যা করার জন্য জনৈক ভৃত্যকে হুকুম করেন এবং বলেন: هذا رجل طعن على النبي ﷺ قال الله ثم الخَبِيثَتُ لِلْخَبِيثِينَ وَالْخَبِيثُونَ لِلْخَبِيثَتِ والطيبتُ للطيبين والطيبون للطيبت فان كانت عائشة خبيثة فالنبي ﷺ خبيث فهو کافر فاضربوا عنقه فضربوا عنقه وانا حاضر.
"এই ব্যক্তি আল্লাহ্র রাসূলের প্রতি অশালীন মন্তব্য করিয়াছে, অথচ আল্লাহ বলেন, "দুশ্চরিত্রা নারী দুশ্চরিত্র পুরুষের জন্য; দুশ্চরিত্র পুরুষ দুশ্চরিত্রা নারীর জন্য; সচ্চরিত্রা নারী সচ্চরিত্র পুরুষের জন্য এবং সচ্চরিত্র পুরুষ সচ্চরিত্রা নারীর জন্য"। হযরত আইশা যদি দুশ্চরিত্রা হন তাহা হইলে নবী করীম (স) হইবেন দুশ্চরিত্র। সুতরাং মন্তব্যকারী এই ব্যক্তি কাফির। তাহাকে হত্যা কর। অতঃপর আমার উপস্থিতিতেই তাহাকে হত্যা করা হইল"।
এমনিভাবে হাসান ইব্‌ন যায়দ-এর সম্মুখে এক ইরাকী উম্মুল মু'মিনীন হযরত আইশা (রা)-র শানে অশালীন ও আপত্তিকর মন্তব্য করিলে হযরত হাসান তাঁহার হস্তে রক্ষিত লাঠি দিয়া রটনাকারীর মাথায় এমন জোরে আঘাত হানেন যে, তখনই তাহার মৃত্যু ঘটে (ইমাম ইব্‌ন তায়মিয়া, আস-সারিমুল মাসলুল আলা শাতিমির রাসূল, পৃ. ৫৬৬-৬৭)।
তের: এই কারণে উলামায়ে কিরাম ঐকমত্যে পৌছিয়াছেন যে, সাধারণ মুসলমানের স্ত্রীর উপর যদি কেহ মিথ্যা অপবাদ দেয় সেই ব্যক্তি ফাসিক হইয়া যাইবে। আর নবীদের সম্মানিতা স্ত্রীদের চরিত্রে কলংক আরোপ করিলে মুরতাদ ও কাফির হইয়া যাইবে। আমর ইব্‌ন কায়স বলেন, সচ্চরিত্রা নারীর প্রতি যাহারা কলংক আরোপ করে তাহাদের নব্বই বৎসরের আমল নষ্ট হইয়া যাইবে (আস-সারিমুল মাসলূল, পৃ. ৫০; মাআরিফুল-কুরআন, মদীনা সংস্করণ, পৃ. ১০৯৬)।
চৌদ্দ: ইন্ন কাছীর বলেন, হযরত আইশা সিদ্দীকা (রা)-র বিরুদ্ধে রটিত অপবাদ যে ডাহা মিথ্যা তাহার প্রমাণ এই যে, কোন অপরাধী এইভাবে কাফেলা হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া পরবর্তী দিবালোকে দুইজন একই সঙ্গে জনসমক্ষে হাযির হয় না। দুনিয়ায় সাধারণত অপরাধীরা অপরাধ কর্ম চুপিসারে এবং যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করিয়াই সম্পাদন করিয়া থাকে (তাফসীর ইন কাছীর, ৩খ, পৃ. ৩০১-২)।
পনের: আল্লাহ না করুন! হযরত আইশা সিদ্দীকা (রা) ও হযরত সাফওয়ান (রা) যদি আদৌ অপরাধী হইতেন, একমাস পর হযরত আইশা (রা) পবিত্রতা ও দোষমুক্তির ঘোষণা দিয়া যখন কুরআনের আয়াত অবতীর্ণ হয়, তখন এই দুইজন আল্লাহ্ ওহীর উপর আস্থা হারাইতেন এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর নবুওয়াতের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নসাপেক্ষ হইয়া পড়িত।
ষোল: ইক্কের ঘটনাকে কেন্দ্র করিয়া সূরা নূরে এমন বেশ কিছু আয়াত অবতীর্ণ হইয়াছে যেগুলিতে তমদ্দুনিক রীতি, সুস্থ সমাজ গঠন, নৈতিক চরিত্র দৃঢ়করণ, অশ্লীলতা প্রতিরোধ, অপবাদ ও ব্যভিচারের বিধান সম্পর্কে স্পষ্ট নির্দেশিকা রহিয়াছে যাহা কিয়ামত পর্যন্ত মানুষকে হিদায়াত দান করিবে।
সতের: মুসলিম সমাজে কোন মতলববাজ ও ফাসিক সম্মানিত কোন ব্যক্তির পরিবারের বিরুদ্ধে কোন অপবাদ ছড়াইলে তাহা চক্ষু বন্ধ করিয়া মানিয়া লওয়া উচিৎ হইবে না। ভিত্তিহীন কথা যাহাতে বেশী দূর ছড়াইতে না পারে তাহার ব্যবস্থা নিতে হইবে, অপবাদকারীকে তাহার অভিযোগের স্বপক্ষে সাক্ষ্য প্রমাণ পেশ করিতে হইবে। অভিযোগ প্রমাণ করিতে না পারিলে সে শরীআতের বিধান অনুযায়ী শাস্তি ভোগ করিবে। অভিযুক্ত ব্যক্তির দোষ বা অপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি সামাজিক মর্যাদা ভোগ করিবার অধিকার রাখিবেন (হিফযুর রহমান সিওয়াহারবী, কাসাসুল কুরআন, ৫খ, পৃ. ৫০৫; তাফহীমুল কুরআন, ৩খ., পৃ. ৩১৪-৮)।
আঠার: ইক্কের ঘটনায় হযরত আইশা (রা)-র সতীনরা কোনরূপ কটূক্তি বা আপত্তিকর মন্তব্য করেন নাই, বরং ভাল উক্তি করিয়াছেন। ইহাতে হযরত আইশা সিদ্দীকা (রা)-র চারিত্রিক উৎকর্ষের পরিচয় পাওয়া যায়।
উনিশ: কোন ব্যক্তি যদি ভুলবশত কোন অপরাধ করিয়া থাকে, অপরাধের কারণে তাহার প্রতি যে সাহায্য-সহানুভূতি পূর্বে করা হইত তাহা যেন বন্ধ না হয়। কারণ মিস্তাহ হযরত আইশা (রা)-র বিরুদ্ধে মিথ্যাচার চালাইলেও হযরত আবূ বাক্‌র (রা) তাঁহার প্রদত্ত আর্থিক সাহায্য আল্লাহ্ নিদের্শে অব্যাহত রাখিয়াছিলেন।
বিশ: মাওলানা আবদুল মাজেদ দরিয়াবাদী বলেন, নবী জীবনের এক একটি দিক উম্মতের জন্য হিদায়াতের উৎস। মুসলিম সমাজের নেককার ও সাধ্বী মহিলাদের বিরুদ্ধে যুগে যুগে কলংক আরোপের বহু ঘটনা দেখা যায়। এই বেচারীদিগকে ইক্কের ঘটনা ধৈর্য ও সান্ত্বনা দান করিবে (তাফসীর মাজেদী, পৃ. ৭১২)।
একুশ: প্রাচ্যবিদগণ (Orientalist) অনেকে ইফকের ঘটনাকে অতিরঞ্জিত করিয়া বর্ণনা করিয়াছেন। স্যার উইলিয়াম মুরের মত পণ্ডিতের প্রদত্ত বিবরণ হইতে তাহা প্রমাণিত সত্য। ইফকের ঘটনা বর্ণনায় তিনি দায়িত্ববোধের পরিচয় দিতে পারেন নাই। এতদসত্ত্বেও তিনি স্বীকার করিতে বাধ্য হইয়াছেন: The whole career and life of Aisha before that event as well as after it furnishes unqustionable evidence that she was sincere and innocent. There should, therefore be no hesitancy in rejecting every report of malconduct impute to her.
"এই ঘটনার পূর্বাপর আইশার পূর্ণাঙ্গ জীবন ও কর্ম সন্দেহাতীতরূপে প্রমাণ করিতেছে যে, তিনি ছিলেন সরল ও নিষ্পাপ। তাঁহার প্রতি আরোপিত অসদাচরণের অপবাদ প্রত্যাখ্যানে কোনরূপ ইতস্ততা থাকা উচিৎ নয়" (Sir William Muir, The Life of Muhammad, pp. 303-4)।
বাইশ : হযরত আইশা সিদ্দীকা (রা) ছিলেন মহৎ ও উদার হৃদয়ের অধিকারী এক বিদূষী মহিলা। তাঁহার বিরুদ্ধে অপবাদ আরোপকারীদের মধ্যে বিখ্যাত কবি হাসসান ইব্‌ন ছাবিতও ছিলেন। পরবর্তী সময়ে হাসানকে মিথ্যা অপবাদের অভিযোগে শান্তি প্রদান করা হয় এবং তিনি তওবা করেন। মাঝেমধ্যে কবি হাসান হযরত আইশা (রা)-র নিকট আসিতেন। আইশা (রা) অতীতের তিক্ত স্মৃতির কথা ভুলিয়া তাঁহার সহিত উত্তম ব্যবহার করিতে কুণ্ঠিত হইতেন না। জীবনের এক পর্যায়ে কবি হাসান দৃষ্টিশক্তি হারাইয়া অন্ধ হইয়া যান। কবি হাসানকে কেহ গালি দিলে আইশা (রা) বলিতেন, তাহাকে গালি দিও না। তিনি রাসূলের পক্ষে কাফিরদের বিরুদ্ধে লড়াই করিয়াছেন। একদা তাঁহার সম্মুখে কবি হাসসান একটি কবিতা আবৃত্তি করেন, যাহার একটি শ্লোক হইল: حصان رزان ما تزن بريبة - وتصبح غرثى عن لحوم الغوافل.
"তিনি সতীত্ব ও দৃঢ় নৈতিক চরিত্রের অধিকারিণী ব্যক্তিত্বসম্পন্ন নারী। তাঁহার প্রতি কোন প্রকার সন্দেহ পোষণ শোভা পায় না। তিনি অর্ভুক্ত থাকেন তবুও অনুপস্থিত লোকদের গোশত খান না অর্থাৎ গীবত করেন না"।
হযরত আইশা সিদ্দীকা (রা) কবিতা শুনিয়া মন্তব্য করেন, কিন্তু আপনি যাহা বলিতেছেন নিজে তো তেমন নহেন" (সহীহ বুখারী, ২খ, ৫৯৭)।
মাসরূক (র) বর্ণনা করেন যে, আইশা (রা)-র সম্মুখে হাসান ইব্‌ন ছাবিতকে একবার কবিতা আবৃত্তি করিতে দেখিয়া আমি তাঁহাকে বলিলাম, আপনি হাসান ইব্‌ন ছাবিতকে আপনার নিকট আসিতে অনুমতি দেন কেন? আল্লাহ তা'আলা তো তাঁহার সম্পর্কে পবিত্র। কুরআনে বলিয়াছেন: তাহাদের মধ্যে যে অপবাদ রটনার ব্যাপারে বেশী তৎপর হইয়াছে তাহার জন্য বড় শাস্তি অপেক্ষা করিতেছে। তিনি জবাবে বলিলেন: ای عذاب اشد من العمى انه كان ينافح أو يهاجي عن رسول الله ﷺ.
"অন্ধত্ব হইতে বড় শাস্তি আর কী হইতে পারে? হাসান রাসূলুল্লাহ (স)-এর পক্ষে কাফিরদের মুকাবিলা করিয়াছেন এবং কাফিরদের কুৎসার (কবিতার মাধ্যমে) জবাব দিয়াছেন" (সহীহ্ বুখারী, ২খ, ৫৯৭)।
তেইশ: নিরপরাধ ব্যক্তির বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা ও অপবাদ আরোপ করা অতি বড় পাপ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল। আল্লাহ্ তা'আলা এইজন্য অপবাদকারীকে আশিটি বেত্রাঘাত করিবার বিধান জারি ক'রিয়াছেন যাহাতে সমাজে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার পুনারাবৃত্তি না ঘটে (কাসাসুল কুরাআন, ৪খ, ৫০৫)।
চব্বিশ : ইফকের ঘটনায় হযরত আইশা (রা)-র সহিত যিনি সবচাইতে বেশী যুলুমের শিকার হন তিনি স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (স)। কিন্তু তিনি গাম্ভীর্যপূর্ণ, শান্ত ও আবেগহীন আচরণ দ্বারা যে উদারতা, মহানুভবতা, ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার পরিচয় দেন তাহা এক অনুপম চারিত্রিক গুণ। ইসলামী দাওয়াত ও আন্দোলনের নেতৃত্ব দানকারীদের জন্য ইহা একটি শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত (নাঈম সিদ্দীকী, মুহসিনে ইনসানিয়াত, পৃ. ২৭১)।
পচিশ : কুচক্রী মুনাফিক নেতা কর্তৃক আরোপিত অপবাদ ও অপপ্রচারের এই নোংরা অভিযান দ্বারা মদীনার ইসলামী রাষ্ট্র ও সংগঠন একদিক দিয়া উপকৃত হইয়াছে এবং ইহার পরিণতিতে তাহা পূর্বের চাইতে আরও শক্তিশালী ও সচেতন হইয়াছে (মুহসিনে ইনসানিয়াত, পৃ. ২৭০)।
ছাব্বিশ: পত্নীদের মধ্যে হযরত আইশা (রা) অধিক প্রিয়তমা হওয়া সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ (স) বিনা প্রমাণে ও বিনা অনুসন্ধানে গ্রহণ করেন নাই। তিনি তদন্ত ও প্রমাণ ছাড়াই লোকমুখে শুনিয়া স্ত্রীকে বিসর্জন দিয়া নারীর প্রতি অবিচারও করেন নাই। বিশ্বস্ত সূত্রে ও আল্লাহ্র পক্ষ হইতে তাঁহার সতীত্ব প্রমাণিত হওয়ায় নিঃসংকোচে তাঁহাকে গ্রহণ করিয়াছিলেন। নারীর প্রতি কত বড় মর্যাদা (মুহাম্মদ তফাজ্জল হোসাইন, ড. এইচ. এম. মুজতবা হোছাইন, হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (স) : সমকালীন পরিবেশ ও জীবন, পৃ. ৬০১)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00