📄 আইশা (রা)-এর ধৈর্য ও দৃঢ়তা
আইশা (রা) বলেন, আল্লাহ্র রাসূল যখন তাঁহার কথা সমাপ্ত করিলেন তখন আমার কান্না থামিয়া গেল। চোখে এক বিন্দু অশ্রুও রহিল না। আমি আমার বাবাকে বলিলাম, আপনি আমার পক্ষে জবাব দিন। বাবা বলিলেন, আমার তো কিছু বুঝে আসিতেছে না, আমি কি জবাব দিব। এইবার মাকে বলিলাম জবাব দেওয়ার জন্য। মাও একই জবাব দিলেন। অগত্যা আমি নিজেই জবাব দিলাম : 'আল্লাহ সম্যক অবগত আছেন যে, আমি নির্দোষ। ঘটনাটি আপনাদের মনে এমনভাবে রেখাপাত করিয়াছে যে, আমি যতই নিজেকে বলি নির্দোষ ও পবিত্র এবং আল্লাহ তাহা ভালভাবে জ্ঞাত আছেন, আপনারা কিন্তু বিশ্বাস করিবেন না। আর যদি অগত্যা আমি স্বীকার করিয়া লই, সেইটা হইবে মিথ্যা! অথচ আল্লাহ তা'আলা স্বয়ং জানেন যে, আমি নিরপরাধ, আপনারা তাহা বিশ্বাস করিবেন'। আইশা (রা) কাঁদিয়া বলিয়া উঠিলেন: والله لا اتوب الى الله فما ذكرت ابدا .
"আল্লাহ্র কসম! আপনারা যেই ব্যাপার লইয়া বলাবলি করিতেছেন, আমি কখনও সেই ব্যাপারে আল্লাহর কাছে তাওবা করিব না।" আমি কেবল এইটুকু বলিব যাহা ইউসুফ (আ)-এর পিতা বলিয়াছিলেন: فَصَبْرٌ جَمِيلٌ وَاللهُ الْمُسْتَعَانُ عَلَى مَا تَصِفُونَ.
"সুতরাং পূর্ণ ধৈর্যই শ্রেয়। তোমরা যাহা বলিতেছ সেই বিষয়ে একমাত্র আল্লাহ্ আমার সাহায্যস্থল” (১২: ১৮; ইব্ন হিশাম, সীরাতুন্নবী, ৩খ, ১৯১; তারীখ তাবারী, ২খ., পৃ. ৬১৬)।
এই কথা বলিয়া আইশা (রা) মুখ ফিরাইয়া বিছানায় চুপচাপ শুইয়া পড়িলেন। আইশা (রা) বলেন, 'আল্লাহ তো জানেন যে, সেই মুহূর্তেও আমি পবিত্র। আর আমি ইহাও জানিতাম যে, আল্লাহ আমাকে পবিত্র প্রমাণ করিবেন। তবে আল্লাহ্র কসম! আমি কখনও ধারণা করিয়া নাই যে, আল্লাহ আমার বিষয়ে ওহী নাযিল করিবেন, যাহা পঠিত হইবে। আমার কোন ব্যাপারে আল্লাহ আয়াত নাযিল করিবেন, নিজেকে আমি এতখানি যোগ্য মনে করি নাই; বরং আমি এতটুকু আশা করিতাম যে, তিনি স্বপ্নের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (স)-কে আমার পবিত্রতা সম্পর্কে জানাইয়া দিবেন' (সহীহ্ বুখারী, ২খ., পৃ. ৫৯৬)।
📄 আল্লাহ্ পক্ষ হইতে সুসংবাদ
রাসূলুল্লাহ (স) স্থান ছাড়িয়া তখনও উঠেন নাই, ওহী নাযিল হওয়ার লক্ষণ দেখা দিল। তাঁহাকে বস্ত্রাচ্ছাদিত করা হইল, তাঁহার মাথার নিচে চামড়ার তৈরী বালিশ দেওয়া হইল। শীতের মৌসুমেও তাঁহার চেহারা মুবারক হইতে মুক্তার দানার মত ঘাম ঝরিতেছিল। আইশা (রা) বলেন: فاما انا فوالله ما فزعت ولا باليت قد عرفت انى برئية وان الله غير ظالمي واما ابواى فما سرى عن رسول الله ﷺ حتى ظننت لتخرجن انفسهما خرقا من ان ياتي من الله تحقيق ما قال الناس.
“যেই সময় রাসূলুল্লাহ (স)-এর উপর ওহী নাযিল শুরু হইল, আল্লাহ্র কসম! আমি মোটেও ভীত হই নাই। কারণ আমি জানি যে, আমি দোষমুক্ত এবং আল্লাহ আমার উপর যুলুম করিবেন না। যতক্ষণ পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (স)-এর সেই বিশেষ অবস্থার অবসান না ঘটিতেছিল ততক্ষণ কিন্তু ভয়ে আমার মা-বাবার এমন অবস্থা হইয়াছিল যে, আমার আশংকা ছিল যদি তাঁহারা প্রাণ হারান। লোকেরা যাহা বলাবলি করিতেছে তাহার সত্যতা বর্ণনা করিয়া যদি আল্লাহ ওহী নাযিল করেন ইহাই ছিল তাঁহাদের ভয়ের কারণ" (ইবন হিশাম, সীরাতুন্নবী, ৩খ, ১৯১; তারীখ তাবারী, ২খ., পৃ. ৬১৬)।
হযরত আবূ বাক্র (রা) একবার রাসূলুল্লাহ (স)-এর দিকে, আরেকবার আইশা (র)-এর দিকে তাকাইতে থাকেন। রাসূলুল্লাহ (স)-এর দিকে যখন তাকাইতেন তখন আশংকা করিতেন, না জানি আসমান হইতে কি ফয়সালা অবতীর্ণ হইতেছে, যাহা কিয়ামত পর্যন্ত থাকিবে অম্লান ও অক্ষয়। আইশা (রা)-এর প্রতি তাকাইলে কিছুটা আশার আলো দেখিতেন। আইশা সিদ্দীকা (রা) ছাড়া ঘরের অন্যান্য মানুষেরা আশা- নিরাশার দোলায় হিমশিম খাইতে থাকেন। এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে ওহী অবতরণ সমাপ্ত হইল। রাসূলুল্লাহ (স)-এর পবিত্র চেহারায় আনন্দ ও খুশীর লক্ষণ পরিস্ফুটিত হইল। ললাটের ঘাম মুছিতে মুছিতে রাসূলুল্লাহ (স) আইশা (রা)-কে উদ্দেশ্য করিয়া বলিলেন: ابشري يا عائشة فقد انزل الله برائك.
৪৩ "হে আইশা! সুসংবাদ গ্রহণ কর। মহান আল্লাহ তোমার নির্দোষিতার কথা নাযিল করিয়াছেন” (সহীহ বুখারী, ২খ., পৃ. ৭০০; ইব্ন হিশাম, সীরাতুন্নবী, ৩খ, ১৯১-২)।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) সূরা নূরের নিম্নলিখিত দশটি আয়াত তিলাওয়াত করিয়া শুনাইলেনঃ إِنَّ الَّذِينَ جَاءُو بِالافْكِ عُصْبَةٌ مِّنْكُمْ لَا تَحْسَبُوهُ شَرًا لَكُمْ بَلْ هُوَ خَيْرٌ لَكُمْ لِكُلِّ امْرِئٍ مِّنْهُمْ مَّا اكْتَسَبَ مِنَ الإِثْمِ وَالَّذِي تَوَلَّى كِبْرَهُ مِنْهُمْ لَهُ عَذَابٌ عَظِيمٌ. لَوْلَا إِذْ سَمِعْتُمُوهُ ظَنَّ الْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنتُ بِأَنْفُسِهِمْ خَيْرًا وَقَالُوا هذا افْكَ مُّبِينٌ. لَوْلَا جَاءُوْ عَلَيْهِ بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاءَ فَإِذْ لَمْ يَأْتُوا بِالشُّهَدَاء فَأُولَئِكَ عِنْدَ اللهِ هُمُ الكَذِبُونَ. وَلَوْلا فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُهُ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ لَمَسَّكُمْ فِي مَا أَفَضْتُمْ فِيهِ عَذَابٌ عَظِيمٌ إِذْ تَلَقُونَهُ بِالْسِنَتِكُمْ وَتَقُولُونَ بِأَفْوَاهِكُمْ مَّا لَيْسَ لَكُمْ بِهِ عِلْمٌ وَتَحْسَبُونَهُ هَيِّنًا وَهُوَ عِنْدَ اللَّهِ عَظِيمٌ. وَلَوْلَا إِذْ سَمِعْتُمُوهُ قُلْتُمْ مَّا يَكُونُ لَنَا أَنْ نَتَكَلَّمَ بهذا سُبْحَنَكَ هذَا بُهْتَانٌ عَظِيمٌ. يَعِظُكُمُ اللَّهُ أَنْ تَعُودُوا لِمِثْلِهِ أَبَدًا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ. وَيُبَيِّنَ الله لَكُمُ الايتِ وَاللَّهُ عَلِيْمٌ حَكِيمٌ إِنَّ الَّذِينَ يُحِبُّونَ أَنْ تَشِيعَ الْفَاحِشَةُ فِي الَّذِينَ آمَنُوا لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ. وَلَوْلا فَضْلُ اللهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُهُ وَأَنَّ اللَّهَ رَءُوفٌ رَّحِيمٌ.
"যাহারা এই অপবাদ রটনা করিয়াছে, তাহারাতো তোমাদেরই একটি দল। ইহাকে তোমরা তোমাদের জন্য অনিষ্টকর মনে করিও না, বরং ইহা তো তোমাদের জন্য কল্যাণকর, উহাদের প্রত্যেকের জন্য আছে উহাদের কৃত পাপকর্মের ফল এবং উহাদের মধ্যে যে এই ব্যাপারে প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করিয়াছে, তাহার জন্য আছে মহাশাস্তি। যখন তাহারা ইহা শুনিল তখন মু'মিন পুরুষ এবং মু'মিন নারিগণ আপন লোকদের সম্পর্কে কেন ভাল ধারণা করিল না এবং বলিল না, 'ইহা তো সুস্পষ্ট অপবাদ।' তাহারা কেন এই ব্যাপারে চারিজন সাক্ষী উপস্থিত করে নাই? যেহেতু তাহারা সাক্ষী উপস্থিত করে নাই, সে কারণে তাহারা আল্লাহ্র নিকট মিথ্যাবাদী। দুনিয়া ও আখিরাতে তোমাদের প্রতি আল্লাহ্র অনুগ্রহ ও দয়া না থাকিলে তোমরা যাহাতে লিপ্ত ছিলে তজ্জন্য মহাশাস্তি তোমাদিগকে স্পর্শ করিত। যখন তোমরা মুখে মুখে ইহা ছড়াইতেছিলে এবং এমন বিষয় মুখে উচ্চারণ করিতেছিলে যাহার কোন জ্ঞান তোমাদের ছিল না এবং তোমরা ইহাকে তুচ্ছ গণ্য করিয়াছিলে, যদিও আল্লাহ্র নিকট ইহা ছিল গুরুতর বিষয়। এবং তোমরা যখন ইহা শ্রবণ করিলে তখন কেন বলিলে না, এ বিষয়ে বলাবলি করা আমাদের উচিত নহে; আল্লাহ পবিত্র মহান। ইহা তো এক গুরুতর অপরাধ। আল্লাহ তোমাদিগকে উপদেশ দিতেছেন, তোমরা যদি মু'মিন হও তবে কখনও অনুরূপ আচরণের পুনরাবৃত্তি করিও না। আল্লাহ তোমাদের জন্য আয়াতসমূহ সুস্পষ্টভাবে বিবৃত করেন এবং আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। যাহারা মু'মিনদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার কামনা করে তাহাদের জন্য আছে দুনিয়া ও আখিরাতে মর্মন্তুদ শাস্তি এবং আল্লাহ জানেন, তোমরা জাননা। তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়া না থাকিলে তোমাদের কেহই অব্যাহতি পাইতে না এবং আল্লাহ দয়ার্দ্র ও পরম দয়ালু" (২৪ঃ ১১-২০)।
রাসূলুল্লাহ (স) যখন আইশা (রা)-র পবিত্রতা ও দোষমুক্তি সম্পর্কিত পবিত্র কুরআনের উপরিউক্ত দশটি আয়াত তিলাওয়াত সমাপ্ত করিলেন, হযরত আবূ বাক্র (রা) আনন্দে উচ্ছসিত হইয়া তৎক্ষণাৎ স্বীয় কন্যা আইশা (রা)-র কপালে চুমা দিলেন। আইশা (রা) বলেন, فلا عزرتنی "আপনি প্রথমেই আমাকে নিরপরাধ ও নির্দোষ মনে করেন নাই কেন"?
এই কথা শুনিয়া হযরত আবূ বাক্র সিদ্দীক (রা), যিনি সততা ও ধৈর্যের অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করিয়াছেন, জবাব দিলেন: أى السماء تظلني واى ارض تقلني اذا قلت مالم اعلم واجيب.
"কোন্ আসমান আমাকে ছায়া দান করিবে কান্ যমীন আমাকে ধারণ করিবে, যদি আমি এমন কথা বলি যাহা আমি মোটেই জানি না।" (সায়্যদ মাহমূদ আলুসী বাগদাদী, রূহুল মা'আনী, ১৮খ., পৃ. ১০৯)।
হযরত আইশা (রা)-র মা উম্ম কাহারও শুকরিয়া আদায় করিব না। কুলের প্রতি শোকরিয়া জ্ঞাপন কর। আইশা (রা) জলাল করিয়াছেন" (সহীহ বুখারী, ২খ., আল্লাহ্র কসম! আমি উঠিব না, যে কারণে আল্লাহ আমাকে নির্দোষ প্রমাণ করিয়াছেন" (বুখারী, পৃ. ৫৯৬)।
📄 মিস্তাহ সম্পর্কে হযরত আবূ বাক্স (রা)-এর ভূমিকা
আত্মীয়তার বন্ধন ও দরিদ্রতার কারণে আবূ বাক্র (রা) মিসতাহ ইব্ন উছাছাকে নিয়মিত আর্থিক সাহায্য করিতেন। নিজ মেয়ে সম্পর্কে কুৎসা রটনায় তিনি সংক্ষুব্ধ হইয়া বলিলেন, আল্লাহ্র কসম! আমি আর কখনও মিস্তাহকে আর্থিক সাহায্য করিব না। এই কথা আল্লাহ তা'আলার পছন্দ হয় নাই। নিম্নোক্ত আয়াত তাহার সম্পর্কে নাযিল করা হয়: وَلَا يَأْتَلِ أُولُوا الْفَضْلِ مِنْكُمْ وَالسَّعَةِ أَنْ يُؤْتُوا أولى القُرْبَى وَالْمَسْكِينَ وَالْمُهجِرِينَ فِي سَبِيلِ اللهِ وَلْيَعْفُوا وَلَيَصْفَحُوا أَلَا تُحِبُّونَ أَنْ يَغْفِرَ اللَّهُ لَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ.
"তোমাদের মধ্যে যাহারা ঐশ্বর্য ও প্রাচুর্যের অধিকারী তাহারা যেন শপথ গ্রহণ না করে যে, তাহারা আত্মীয়-স্বজন ও অভাবগ্রস্তকে এবং আল্লাহ্র রাস্তায় যাহারা হিজরত করিয়াছে তাহাদিগকে কিছুই দিবে না। তাহারা যেন উহাদিগকে ক্ষমা করে এবং উহাদের দোষত্রুটি উপক্ষো করে। তোমরা কি চাহ না যে, আল্লাহ তোমাদিগকে ক্ষমা করুন? এবং আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু” (২৪: ২২)।
এই আয়াত নাযিল হইবার পর হযরত আবূ বাক্র (রা) বলিলেন, 'হাঁ আল্লাহর শপথ! অবশ্যই আমি পছন্দ করি যে, আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করুন।' তাই মিস্তাহের জন্য তিনি যে আর্থিক সাহায্য দিতেন তাহা আবার বহাল করিলেন। তিনি বলিলেন: والله لا انزعها منه ابدا . "আল্লাহ্র কসম! আমি কখনও সেই অনুদান তাহার নিকট হইতে কাড়িয়া লইব না” (ইবন হিশাম, সীরাতুন্নবী, ৩খ., ১৯৩; তারীখ তাবারী, ২খ., ৬১৮)।
রাসূলুল্লাহ (স) স্বীয় পত্নী হযরত যয়নব বিন্ত জাহ্শকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি আইশা সম্পর্কে কি জান বা কি দেখিয়াছ? জবাবে তিনি বলিলেন: يا رسول الله احمى سمعي وبصرى والله ما علمت الا خيرا. “হে আল্লাহর রাসূল! আমি আমার কান ও চোখকে রক্ষা করিয়াছি (মিথ্যা বলা হইতে)। আল্লাহর শপথ! আমি তাঁহার সম্পর্কে ভাল ছাড়া মন্দ জানি না।"
হযরত আইশা সিদ্দীকা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর স্ত্রীদের মধ্যে একমাত্র তিনিই (যয়নব) আমার সমকক্ষ ও প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন, কিন্তু তাকওয়ার কারণে আল্লাহ তাঁহাকে রক্ষা করিয়াছেন। অথচ তাঁহার বোন হামনা বিন্ত জাহ্শ- তাঁহার পক্ষ অবলম্বন করিয়া কুৎসা ছড়াইতেছিল। আর এইভাবে সে ধ্বংসপ্রাপ্তদের সহিত ধ্বংস হইল (সহীহ বুখারী, ২খ., ৫৯৬)।
📄 অপরাধীদের শাস্তি প্রদান
অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) মসজিদে নববীতে সূরা নূরের দশটি আয়াত সমবেত জনগণকে তিলাওয়াত করিয়া শোনান। হাসান ও তাঁহার সাথীদের ডাকিয়া রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আইশার বিরুদ্ধে তোমরা যে অভিযোগ আনিয়াছ তাহার স্বপক্ষে সাক্ষ্য-প্রমাণ পেশ কর। তাঁহারা সবাই বলিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমাদের নিকট কোন ধরনের সাক্ষ্য-প্রমাণ নাই। এই ব্যাপারে আমাদের অপরাধ স্বীকার করিয়া লইতেছি। সতী-সাধ্বী মহিলার বিরুদ্ধে যাহারা মিথ্যা অপবাদ দেয় যাহা 'কাযাফ' নামে পরিচিত, পবিত্র কুরআনে তাহাদের শাস্তির বিধান রাখা হইয়াছে।
রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের সামনে সংশ্লিষ্ট আয়াত পড়িয়া শোনান: وَالَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَتِ ثُمَّ لَمْ يَأْتُوا بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاءَ فَاجْلِدُوهُمْ ثَمَانِينَ جَلْدَةً وَلَا تَقْبَلُوا لَهُمْ شَهَادَةً أَبَدًا وَأُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ.
"যাহারা সাধ্বী নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে, অতঃপর চারিজন সাক্ষী উপস্থিত করে না তাহাদেরকে আশিটি কশাঘাত করিবে এবং কখনও তাহাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করিবে না। ইহারাই তো সত্যত্যাগী” (২৪:৪)।
সুতরাং আল্লাহ তা'আলার বিধান অনুযায়ী অভিযুক্ত ব্যক্তিদের প্রত্যেককে আশিটি করিয়া কশাঘাত করা হয়। ইহার পর আল্লাহ্র নিকট তাঁহারা তওবা করিয়া পবিত্র হইয়া যান (ইদরীস কান্ধলবী, সীরাতুল মুস্তাফা, ১খ, ৭৭0; সায়্যিদ ওয়াদুদুল হাই নদবী, হায়াতে সিদ্দীকা, পৃ. ৪১)।
হাদীছের অধিকাংশ বর্ণনা অনুযায়ী মুনাফিক দলপতি আবদুল্লাহ ইবন উবাইকে কোনরূপ শাস্তি দেওয়া হয় নাই। অথচ এই দুর্বৃত্তই অপবাদ রটনায় শীর্ষস্থানীয় হওয়া সত্ত্বেও কেন শাস্তি দেওয়া হয় নাই এই প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবে উঠিতে পারে। ইহার কারণ এই যে, যাহাদেরকে শাস্তি দেওয়া হইয়াছে সেই শাস্তির পরিবর্তে তাহারা পরকালে ক্ষমা পাইয়া যাইবে। দুনিয়ার এই শাস্তি তাহাদের গুনাহের কাফফারাস্বরূপ। আবদুল্লাহ ইবন উবাইকে যেহেতু আল্লাহ তা'আলা পরকালে কঠোর শাস্তি দিবেন বলিয়া ঘোষণা দিয়াছেন, এই কারণে তাহাকে পার্থিব কোন শাস্তি দেওয়া হয় নাই (সহীহ বুখারী, ১খ, ৩৬৪, ২খ, ৬৯৬-৮; ইবনুল কায়্যিম, যাদুল মা'আদ, ২খ., পৃ. ১১৩-১৫)।
আসল রহস্য উদঘাটিত হইবার পর মদীনার মুসলমানদের মধ্যে আনন্দের বন্যা বহিয়া যায়। আইশা (রা)- এর পূর্বেকার সম্মান ও মর্যাদা পূনঃ প্রতিষ্ঠিত হয়। রাসূলুল্লাহ (স)- এর নিকট তিনি পূর্বের মত স্নেহ-ভালবাসার পাত্রী হিসাবে পরিগণিত হন এবং পিত্রালয় হইতে রাসূলুল্লাহ (স) -এর গৃহে প্রত্যাবর্তন করেন। অপবাদের অবসান হওয়ায় আইশা (রা)-র স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটে (Dr. Muhammed Husayn Haykal, The Life of Muhammad, p. 334-9)।