📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 প্রত্যাবর্তনের পথে দুর্ঘটনা

📄 প্রত্যাবর্তনের পথে দুর্ঘটনা


মুস্তালিকের যুদ্ধ সমাপ্ত হওয়ার পর কাফেলা মদীনায় প্রত্যাবর্তনের পথে একটি দুর্ঘটনা ঘটে। উম্মুল মু'মিনীন হযরত আইশা সিদ্দীকা (রা) এই ঘটনার বিবরণ দিয়া বলেন: অবশেষে রাসূলুল্লাহ (স) ঐ যুদ্ধ শেষ করিয়া মদীনার পথে রওয়ানা হইলেন। মাঝপথে এক মনযিলে কাফেলাসহ তিনি বিশ্রাম গ্রহণ করিলেন। শেষ রাত্রিতে ঘোষণা করা হইল যে, কাফেলা কিছুক্ষণের মধ্যে মদীনা অভিমুখে যাত্রা করিবে। ঘোষণার পর আমি প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে পায়ে হাঁটিয়া সেনা ছাউনী পার হইয়া গেলাম এবং প্রয়োজন সারিয়া পুনরায় সওয়ারীর নিকট ফিরিয়া আসিলাম। বুকে হাত দিয়া দেখিতে পাইলাম যে, আমার গলার হার ছিঁড়িয়া কোথায়ও পড়িয়া গিয়াছে। আমি ঐ স্থানে ফিরিয়া তাহা তালাশ করিতে শুরু করিলাম এবং ইহাতে দেরী হইয়া গেল। যেই লোকগুলি সওয়ারীর পিঠে আমার হাওদা উঠাইয়া দিত, তাহারা আসিয়া আমার উটের পিঠে হাওদা তুলিয়া দিল। তাহারা মনে করিয়াছিল যে, আমি হাওদার মধ্যেই আছি। কারণ খাদ্যাভাবে মেয়েরা তখন হালকা-পাতলা হইয়া গিয়াছিল, তাহাদের দেহ মেদবহুল ছিল না। অধিকন্তু আমি ছিলাম তখন অল্পবয়স্কা একজন কিশোরী। তাই তাহারা খালি হাওদা উটের পিঠে উঠানোর সময় বুঝিতে পারে নাই যে, আমি তাহার মধ্যে নাই। অতঃপর তাহারা উট হাঁকাইয়া চলিয়া যায়। সেনাদল রওয়ানা হইবার পর আমি হার খুঁজিয়া পাইলাম এবং ফিরিয়া আসিয়া দেখিলাম যে, সেইখানে কেহ নাই। আমি মনে করিলাম, তাহারা আমাকে দেখিতে না পাইলে অবশ্যই ফিরিয়া আসিবে।
অতএব, আমি যেইখানে রাত্রি যাপন করিয়াছিলাম সেইখানে বসিয়া পড়িলাম। কিছুক্ষণ পর আমি ঘুমের কোলে ঢলিয়া পড়িলাম। সকালবেলা রাসূলুল্লাহ (স)- এর নির্দেশে সুলায়ম গোত্রের সাফওয়ান ইব্‌ন মু'আত্তাল সেনাদলের ফেলিয়া যাওয়া দ্রব্যসামগ্রী কুড়াইয়া আনিবার জন্য সেখানে আসিলেন। আমাকে নিদ্রিতাবস্থায় দেখিয়া তিনি চিনিয়া ফেলিলেন। কারণ পর্দার বিধান নাযিল হওয়ার পূর্বে তিনি আমাকে দেখিয়াছিলেন। তাই আমাকে চিনিতে পারিয়া তিনি 'ইন্না লিল্লাহ্' পড়িলেন এবং আমি তাহা শুনিয়া ঘুম হইতে জাগিয়া উঠলাম আর চাদর টানিয়া মুখমণ্ডল ঢাকিয়া ফেলিলাম। হযরত আইশা (রা) বলেন "আল্লাহর কসম! সাফওয়ানের সহিত আমার কোন কথাবার্তাই হয় নাই। 'ইন্না লিল্লাহ' ছাড়া তাহার নিকট হইতে আর কোন কথাই শুনিতে পাই নাই"।
তিনি সওয়ারী হইতে অবতরণ করিলেন এবং সওয়ারীকে বসাইয়া উহার পা কষিয়া বাঁধিলে আমি গিয়া সওয়ার হইলাম। তিনি তখন সওয়ারীকে টানিয়া আগে আগে চলিতে থাকিলেন। অবশেষে আমরা ঠিক দুপুরবেলা প্রচণ্ড গরমের সময় সেনাদলের সহিত মিলিত হইলাম। সেই সময় তাহারা একটি জায়গায় অবস্থান করিতেছিল। ইহার পর যাহাদের ধ্বংস হওয়ার ছিল তাহারা (আমার প্রতি অপবাদ আরোপ করিয়া) ধ্বংস হইয়া গেল। এই অপবাদ আরোপে নেতৃত্ব দিয়াছিল আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন উবাই ইব্‌ন সালূল' (সহীহ আল-বুখারী, ২খ., পৃ. ৫৯৪)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 অপবাদের ঝড়

📄 অপবাদের ঝড়


মুনাফিক চক্র এই ঘটনাকে সুবর্ণ সুযোগ মনে করিয়া উম্মুল মু'মিনীন হযরত আইশা (রা)-এর চরিত্রে কলংক আরোপ করিল। রটিত অপবাদ মুহূর্তে গোটা বাহিনীর মধ্যে নিদারুণ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করিল। মুনাফিক নেতা আবদুল্লাহ ইবন উবাই ছিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর শত্রু ও দুঃশ্চরিত্র ব্যক্তি। সে নিজে ও যায়দ ইবন রিফাআ এবং তাহার অপরাপর দোসরগণ অপবাদ রটনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। উটের লাগাম ধরিয়া সাফওয়ান (রা) যখন কাফেলার কাছাকাছি আসিয়া পৌছিল, আবদুল্লাহ ইবন উবাই বলিয়া উঠিল, "আল্লাহর শপথ! আইশা ও সাফওয়ান একে অপর হইতে বাঁচিতে পারে নাই। দেখ, তোমাদের নবীর স্ত্রী পরপুরুষের সহিত রাত্রি যাপন করিয়া প্রকাশ্যে ফিরিয়া আসিতেছে।" কতিপয় সরলপ্রাণ মুসলমান কান কথায় সাড়া দিয়া এই আলোচনায় মাতিয়া উঠিল। পুরুষদের মধ্যে কবি হাসান ইব্‌ন ছাবিত, মিস্তাহ ইব্‌ন উছাছা ও নারীদের মধ্যে হামনা বিনত জাহ্শ ছিল অপবাদ প্রচারে সোচ্চার (তাফসীর মাযহারী, ৮খ., ৩০১; তাফহীমুল কুরআন, ৩খ., ৩১২; মাআরিফুল কুরআন, মদীনা সংস্করণ, পৃ. ৯৩২)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 অপবাদ রটনার উদ্দেশ্য

📄 অপবাদ রটনার উদ্দেশ্য


বানু মুস্তালিকের এই যুদ্ধে যাওয়া ও আসার পথে মুনাফিকরা বেশ কয়েকবার ষড়যন্ত্রে মাতিয়া উঠে। আনসার ও মুহাজিরদের মধ্যে ভুল বুঝাবুঝি সৃষ্টি করিয়া দুই দলকে সশস্ত্র অবস্থায় মুখোমুখী করায়। রাসূলুল্লাহ (স)-এর তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপের ফলে বড় ধরনের কোন অঘটন ঘটিতে পারে নাই। মুনাফিক সর্দার আবদুল্লাহ ইবন উবাই প্রকাশ্যে ঘোষণা দিল, لَئِنْ رَجَعْنَا إِلَى الْمَدِينَةِ لَيُخْرِجَنَّ الْأَعَزُّ مِنْهَا الْأَذَلَّ. "আমরা মদীনায় প্রত্যাবর্তন করিলে তথা হইতে প্রবল অবশ্য দুর্বলকে বহিষ্কার করিবে” (৬৩:৮)।
এইখানে ‘প্রবল’ দ্বারা মুনাফিক ও ‘দুর্বল’ দ্বারা মু'মিনকে বুঝানো হইয়াছে। মুনাফিকদের ষড়যন্ত্রের নেপথ্যে বহুবিধ ধর্মীয়, রাজনৈতিক, সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ ও উদ্দেশ্য রহিয়াছে।
এক : রাসূলুল্লাহ (স) ও হযরত আবূ বাক্‌র (রা)-র পরিবারকে জনসমক্ষে অসম্মানিত ও হেয় প্রতিপন্ন করা যাহাতে ইসলামের ধারক-বাহকদের প্রভাব নষ্ট হইয়া যায় (সীরাতে আয়েশা, পৃ. ৯২)।
দুইঃ নবী (স)-এর পারিবারিক জীবনে অশান্তির সৃষ্টি করা।
তিন : মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ ও সামজিক শক্তিকে চূর্ণবিচূর্ণ করিয়া দেওয়া এবং সন্দেহ ও ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি করা।
চার : নৈতিকতা ও চারিত্রিক পবিত্রতা ছিল মুসলমানদের অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি। এই শক্তিই প্রতিপক্ষের উপর সর্বদা তাহাদের বিজয় সুনিশ্চিত করিয়াছে। মুনাফিকদের উদ্দেশ্য ছিল অপবাদ রটনার মাধ্যমে নৈতিকতার ভিতকে ধ্বসাইয়া দেওয়া।
পাঁচ : অপবাদের ঘটনাকে কেন্দ্র করিয়া মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যদি সত্যিই কোন লড়াই বাঁধিয়া যাইত তাহা হইলে মুনাফিক নেতা আবদুল্লাহ ইবন উবাই-এর অসৎ উদ্দেশ্য সফল হইত।
ছয় : নিজ স্ত্রীর চরিত্র সম্পর্কিত কুৎসা ছড়াইয়া আল্লাহ্র রাসূল (স)-কে মানসিকভাবে পর্যুদস্ত করা যাহাতে তাঁহার সাংগঠনিক শক্তি দুর্বল হইয়া পড়ে।
সাত : কবি হাসান ইব্‌ন্ন ছাবিত যে হযরত আইশা (রা)-র বিরুদ্ধে অপবাদ রটনায় যোগ দিলেন ইহার পিছনে হযরত সাওয়ানের বদনাম করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। কারণ হাস্সান ছিলেন মদীনার স্থায়ী বাসিন্দা আর সাফওয়ান অভিবাসী হইয়াও এত খ্যাতি ও সম্মান পাইতেছেন ইহা তিনি সহ্য করিতে পারেন নাই। শ্লেষাত্মক এক কবিতায় তিনি বলেন: أمسى الجلابيب قد محزوا وقد كثروا - ابن الفريعة أمسى بعيضة البلد قد شكلت أمه من كنت صاحبه - أوكان منتشبا في برثن الاسد.
"চাদর পরিহিত লোকেরা শক্তিশালী হইয়া গিয়াছে, সংখ্যায় তাহারা এখন প্রচুর। ফুরায়আর পুত্র এখন শহরের অনন্য ব্যক্তিত্ব। তুমি যাহার সাথী তাহার মা নির্ঘাত সন্তানহারা অথবা সে পড়িয়াছে সিংহের পাঞ্জায়” (ইবন হিশাম, সীরাতুন্নবী, ৩খ, পৃ. ২০৫)।
হামনা বিন্ত জাহ্শ উম্মুল মুমিনীন হযরত যয়নাব বিন্ত জাহশের বোন। হযরত যয়নাব (রা) যেহেতু হযরত আইশা (রা)-র সতীন, তাঁহার কুৎসা রটনা করিলে বোনের রাস্তা পরিষ্কার হইয়া যাইবে, ইহাই তিনি মনে করিয়াছিলেন। মিস্তাহ হযরত আবূ বাক্‌র (রা)-এর খালাত ভাই। আর্থিক দুরবস্থার কারণে হযরত আবূ বাক্‌র (রা) তাহার ভরণ-পোষণ করিতেন (তারীখ তাবারী, ২খ., পৃ. ৬১৪, ৬১৭)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 অপবাদের প্রতিক্রিয়া

📄 অপবাদের প্রতিক্রিয়া


হযরত আইশা সিদ্দীকা (রা) মদীনায় প্রত্যাবর্তনের অব্যবহিত পর অসুস্থ হইয়া পড়েন এবং অসুস্থতার মেয়াদ ছিল প্রায় একমাস। এইদিকে লোকমুখে অপবাদ চর্চা অব্যাহত গতিতে চলিতে লাগিল। এমনকি ইহা রাসূলুল্লাহ (স), হযরত আবূ বাক্‌র (রা) ও হযরত আইশা (রা)-র মাতা উম্মে রূমান (রা)-এর কানে পর্যন্ত পৌঁছিল। কিন্তু হযরত আইশা (রা) এই ব্যাপারে কিছুই জানিতে পারিলেন না, কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স)-এর আচরণের মধ্যে সামান্য পরিবর্তন লক্ষ্য করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) চিন্তাক্লিষ্ট হইয়া পড়িলেন, দিন দিন তাঁহার মানসিক কষ্ট বৃদ্ধি পাইতে লাগিল। পূর্বে হযরত আইশা (রা) রোগাক্রান্ত হইলে আল্লাহর রাসূল (স) যেইভাবে সহমর্মিতা ও আন্তরিকতা প্রদর্শন করিতেন, এইবার যেন তাহার কিছুটা ব্যতিক্রম হইতেছে, আইশা (রা)-র ইহা আর বুঝিতে বাকী রহিল না।
রাসূলুল্লাহ (স) হযরত আইশা (রা)-এর শুশ্রূষাকারীদের নিকট কেবল জিজ্ঞাসা করিতেন, সে কেমন আছে (كيف تيكم)। এমতাবস্থায় হযরত আইশা (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর অনুমতি লইয়া সেবা ও শুশ্রূষা লাভ করিবার উদ্দেশ্যে পিত্রালয়ে চলিয়া যান। এক রাত্রিতে হযরত আইশা (রা) ও মিসতাহের মা (যিনি হযরত আবূ বাক্‌র (রা)-এর খালাত বোন ছিলেন) প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার জন্য মদীনার দূর প্রান্তরে 'আল-মানাসী' নামক স্থানে যাইতেছিলেন। উল্লেখ্য যে, আরবের লোকেরা প্রাচীন যুগে বাড়ীর অভ্যন্তরে শৌচাগার নির্মাণে অভ্যস্ত ছিল না। হাঁটার সময় মিস্তাহের মা পরিধেয় বস্ত্রে হোঁচট খাইয়া বলিয়া উঠিলেন, 'মিসতাহের সর্বনাশ হউক' (تعس مسطح)! হযরত আইশা (রা) বলেন, তুমি তাহার সম্পর্কে এমন বিরূপ মন্তব্য কেন করিতেছ? সে তো হিজরতকারী এবং বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে একজন। বৃদ্ধা জবাব দিলেন, হায়রে আবূ বাক্‌রের সরল মেয়ে! তুমি কি সংবাদটি এখনও পাও নাই? হযরত আইশা (রা) সংবাদটি কি জানিবার আগ্রহ প্রকাশ করিলে বৃদ্ধা ঘটনার আদ্যোপান্ত বর্ণনা দিলেন। ঘটনার আকস্মিকতায় হযরত আইশা (রা) বিহ্বল হইয়া পড়িলেন এবং রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পাইল। প্রাকৃতিক প্রয়োজন না সারিয়াই তিনি গৃহে প্রত্যাবর্তন করিলেন। মিথ্যা কলংকের এই সংবাদে তিনি ভীষণভাবে ব্যথিত হইলেন। অপবাদের কথা জানিবার পর হযরত আইশা (রা) বলেন, আমি অন্তরে এমন দুঃখ পাইয়াছিলাম যে, মাঝে মধ্যে ভাবিতাম, কোন কূপে ঝাপ দিয়া আত্মহত্যা করিলে বোধ হয় বাঁচি (সহীহ বুখারী, ২খ., পৃ. ৫৯৪-৫)।
হযরত আইশা (রা) মা'কে বলিলেন, লোকেরা নানা কথা বলিতেছে অথচ আপনারা তাহার বিন্দুবিসর্গ কিছুই জানাইলেন না। মা জবাবে বলিলেন: يا بنية هوني عليك فو الله لقلما كانت إمراة قط وضية عند رجل يحبها ولها ضرائر إلا أكثرن عليها .
"বেটী! এই বিষয়টি লইয়া বেশী দুশ্চিন্তা করিওনা। কারণ সতীন আছে এমন স্বামীর অতি প্রিয় সুন্দরী নারীকে তাহার সতীনেরা বদনাম করিবে না, এমন খুব কমই হইয়া থাকে” (সহীহ বুখারী, ২খ., পৃ. ৫৯৫)।
ক্ষোভে, দুঃখে ও বেদনায় হযরত আইশা (রা)-র শরীরে কম্পন দেখা দিল। মা তাঁহার গায়ের উপর কাপড় জড়াইয়া দিলেন। সারারাত ধরিয়া তিনি অপবাদের আঘাতে অঝোর ধারায় কাঁদিতে লাগিলেন, এক মুহূর্তের জন্যও অশ্রুধারা বন্ধ হইল না, পানাহার ত্যাগ করিলেন; এইভাবে ভোর হইয়া গেল (সায়্যিদ সুলায়মান নদবী, সীরাতে আইশা, পৃ. ৯০)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00