📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 গনীমত বণ্টন

📄 গনীমত বণ্টন


যুদ্ধশেষে রাসূলুল্লাহ (স) গনীমত সম্পদ মুসলিম যোদ্ধাদের মধ্যে বণ্টন করার নির্দেশ দেন। বন্দীদের বণ্টনের দায়িত্ব প্রদান করেন বুরায়দা ইবনুল খাসীব (রা)-কে আসবাবপত্র, অস্ত্রপাতি, উট, বকরী প্রভৃতি বণ্টনের দায়িত্ব দেন রাসূলুল্লাহ (স)-এর মুক্তদাস শুকরান (রা)-এর উপর, এক পঞ্চমাংশ (খুমুস) বণ্টনের দায়িত্ব দেন মাহমিয়া ইন্ন জায (রা)-এর উপর ('উয়ুনুল আছার, ২খ., পৃ. ১২৯; সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৪খ., পৃ. ৩৪৬)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 জুওয়ায়রিয়া (রা)-এর সহিত রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিবাহ

📄 জুওয়ায়রিয়া (রা)-এর সহিত রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিবাহ


এই যুদ্ধে মুসলমানগণ গনীমত সম্পদ হিসাবে বহু দাস-দাসী লাভ করেন যাহা পূর্বেই উল্লেখ করা হইয়াছে। দাসীদের মধ্যে মুসতালিক গোত্রপতি আল-হারিছ ইব্‌ন আবী দিরারের কন্যা জুওয়ায়রিয়াও ছিলেন, যাহার নাম ছিল তখন বাররা। তিনি ছিলেন অপরূপ সুন্দরী। গনীমত বণ্টনের সময় তিনি ছাবিত ইব্‌ন কায়স ইব্‌ন শাম্মাস (রা) বা তাহার চাচাতো ভাইয়ের ভাগে পড়েন, এক বর্ণনামতে উভয়ের ভাগে পড়েন। কিন্তু ছাবিত (রা) তাহার চাচাতো ভাইকে তাহার অংশের মূল্য পরিশোধ করিয়া উহার একচ্ছত্র মালিক হন। জুওয়ায়রিয়া (রা) তাহার সহিত ৯ উকিয়া স্বর্ণ মুক্তিপণ আদায় পূর্বক মুক্ত হইয়া যাওয়ার চুক্তি করেন।
উম্মু'ল মু'মিনীন হযরত 'আইশা (রা) বলেন, আমরা পানির নিকট থাকিতেই জুওয়ায়রিয়া তাহার অর্থ পরিশোধের ব্যাপারে সাহায্য চাহিবার জন্য রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আগমন করিল এবং তাঁহার নিকট গিয়া বলিল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি এখন মুসলমান। আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নাই। আর আপনি আল্লাহ্র রাসূল। আমি গোত্রপতি আল-হারিছ ইব্‌ন আবী দিরারের কন্যা জুওয়ায়রিয়া। আমি কি বিপদে নিপতিত হইয়াছি তাহা আপনার অজানা নহে। আমি ছাবিত ইব্‌ন কায়স ইব্‌ন শাম্মাস-এর ভাগে পড়িয়াছি। অতঃপর আমি তাহার সহিত অর্থের বিনিময়ে মুক্তির চুক্তি করিয়াছি। এখন আপনার নিকট আমার চুক্তির ব্যাপারে সাহায্য চাহিবার জন্য আগমন করিয়াছি। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তুমি কি ইহা হইতে উত্তম কিছু চাও? জুওয়ায়রিয়া বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তাহা কি? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আমি তোমার মুক্তিলাভের অর্থ পরিশোধ করিয়া দিব এবং তোমাকে বিবাহ করিব। তিনি সম্মতি দিলে রাসূলুল্লাহ (স) ছাবিতকে ডাকাইয়া তাহার অর্থ পরিশোধ করিয়া দিলেন এবং জুওয়ায়রিয়া (রা)-কে আযাদ করিয়া তাহাকে বিবাহ করিলেন (ইবন হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা ৩খ., ২৪০; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ১৫৯)।
অপর এক বর্ণনামতে, রাসূলুল্লাহ (স) তাহার পিতার নিকট প্রস্তাব দিলে পিতাই তাহাকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত বিবাহ প্রদান করেন। উহার বিবরণ নিম্নে প্রদত্ত হইল:
রাসূলুল্লাহ (স) যখন বনূ মুসতালিক যুদ্ধশেষে ফিরিয়া আসিলেন তখন জুওয়ায়রিয়া (রা)-ও বন্দী হিসাবে তাহাদের সহিত ছিলেন। জুওয়ায়রিয়াকে আনসারদের এক লোকের নিকট আমানতস্বরূপ রাখা হইল। তিনি আনসার সাহাবীকে নির্দেশ দিলেন যে, সে যেন জুওয়ায়রিয়া (রা)-কে উত্তমরূপে রক্ষণাবেক্ষণ করে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) মদীনায় পৌঁছিলে আল-হারিছ ইব্‌ন আবী দিরার স্বীয় কন্যা জুওয়ায়রিয়াকে মুক্ত করার জন্য বেশ কিছু উট লইয়া মদীনায় আগমন করিতেছিলেন। আল-'আকীক নামক স্থানে আসিবার পর উত্তম দুইটি উটের দিকে তাহার নজর পড়িল। তিনি উট দুইটির প্রতি আকৃষ্ট হইয়া পড়িলেন এবং উহা তাহার খুবই পছন্দ হইল। তিনি উট দুইটিকে আকীক-এর গুহায় লুকাইয়া রাখিলেন এবং অবশিষ্ট উটগুলি লইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আগমন করিয়া বলিলেন, হে মুহাম্মাদ! আপনারা আমার কন্যাকে বন্দী করিয়া আনিয়াছেন। এই তাহার মুক্তিপণ। তখন রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, সেই দুইটি উট কোথায় যাহা তুমি আকীকের অমুক গুহায় লুকাইয়া রাখিয়াছ? তখন আল-হারিছ বলিয়া উঠিলেন, اشهد ان لا اله الا الله وانك محمد رسول الله "আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে, আল্লাহ্ ছাড়া কোন ইলাহ নাই এবং আপনি মুহাম্মাদ আল্লাহ্র রাসূল"। আল্লাহ্র কসম! এই বিষয়টি আল্লাহ ছাড়া আর কেহই জানে না। এই বলিয়া আল-হারিছ মুসলমান হইয়া গেল। তাহার সহিত তাহার দুই পুত্র এবং তাহার গোত্রের বহু লোক ইসলাম গ্রহণ করিল। অতঃপর তিনি লোক পাঠাইয়া সেই উট দুইটি লইয়া আসিলেন এবং তাহা রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে পেশ করিলেন। অতপর তাহার কন্যা জুওয়ায়রিয়াকে তাঁহার নিকট সোপর্দ করা হইল। তিনিও ইসলাম গ্রহণ করেন এবং একজন নিষ্ঠাবান মুসলমান হিসাবে জীবন যাপন করেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাহার পিতার নিকট জুওয়ায়রিয়াকে বিবাহের প্রস্তাব দিলে পিতা তাহাকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত বিবাহ দেন এবং চারি শত দিরহাম দেন-মোহর ধার্য করেন (ইব্‌ন হিশাম, আস-সীরা, ৩খ., পৃ. ২৪১)। আল-ওয়াকিদীর বর্ণনামতে, বনী মুসতালিকের ৪০ জন, মতান্তরে সকল যুদ্ধবন্দীকে আযাদ করিয়া দেওয়া তাঁহার মোহররূপে ধার্য হয় (আল-ওয়াকিদী, প্রাগুক্ত, ১খ., পৃ. ৪১২; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ১৫৯)।
এই ব্যাপারে জুওয়ায়রিয়া (রা) হইতে আরও একটি রিওয়ায়াত বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, আমার পিতা ছাবিত ইব্‌ন কায়স ইব্‌ন শাম্মাস-এর নিকট হইতে মুক্তিপণ দিয়া আমাকে মুক্ত করেন। অন্যান্য মহিলাদের জন্য যে মুক্তিপণ নির্ধারণ করা হইয়াছিল তিনি সেই পরিমাণ মুক্তিপণ দিয়া আমাকে ছাড়াইয়া লন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) আমার পিতার নিকট আমাকে বিবাহ করার প্রস্তাব দেন। আমার পিতা তাঁহার সহিত আমাকে বিবাহ দেন (আল-ওয়াকিদী, প্রাগুক্ত, ১খ., পৃ. ৪১২)। তবে এইসব বর্ণনার মধ্যে প্রথম বর্ণনাটি অধিকতর সঠিক।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 জুওয়ায়রিয়া (রা)-এর স্বপ্ন

📄 জুওয়ায়রিয়া (রা)-এর স্বপ্ন


এই যুদ্ধের তিন দিন পূর্বে জুওয়ায়রিয়া (রা) একটি স্বপ্ন দেখেন যাহার তাৎপর্য ছিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর তাঁহার সহিত বিবাহ। বলা যায়, স্বপ্নটি ছিল এই বিবাহেরই পূর্ব-সুসংবাদ। উরওয়া ইবনুয-যুবায়র হইতে বর্ণিত। জুওয়ায়রিয়া (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) মুরায়সীতে আগমনের তিন দিন পূর্বে আমি স্বপ্নে দেখিলাম যে, ইয়াছরিব হইতে একটি চাঁদ আসিয়া আমার কোলের উপর পতিত হইল। এই স্বপ্ন আমি কাহারও নিকট প্রকাশ করা পছন্দ করিলাম না। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে আযাদ করিয়া বিবাহ করিলেন। আমি আমার সম্প্রদায়ের কাহাকেও ইহা বলি নাই। এমনকি মুসলমানগণ তাহাদিগকে আযাদ করিয়া দিল। এই সংবাদ আমি অন্য কোন মাধ্যম হইতে জানিতে পারি নাই, কেবল আমার এক চাচাতো বোনই আমাকে এই সংবাদ দেয়। তখন আমি আল্লাহ্র প্রশংসা করি (ইব্‌ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ১৫৯; সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৪খ., পৃ. ৩৪৭; আল-ওয়াকিদী, মাগাযী, ১খ., ৪১২)।
বিবাহের এই সংবাদ মুসলমানদের মধ্যে ছড়াইয়া পড়িলে লোকজন বলাবলি করিতে লাগিল যে, ইহারা তো রাসূলুল্লাহ (স)-এর শ্বশুরের বংশ। তাহারা এই বলিয়া তাহাদের অধীনে যত দাস-দাসী ছিল সবাইকে মুক্ত করিয়া দিল। হযরত আইশা (রা) বলিতেন, তাঁহাকে বিবাহের ফলে বনু মুসতালিক গোত্রের প্রায় এক শত পরিবারকে মুক্ত করিয়া দেওয়া হয়। নিজ কওমের জন্য এমন বরকতসম্পন্না মহিলা আমি আর কখনও দেখি নাই (ইব্‌ন হিশাম, আস-সীরা, ৩খ., পৃ. ২৪০-৪১; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ১৫৯; আত-তাবারী, তারীখ, ২খ., পৃ. ৬১০)।
প্রভাবশালী এই গোত্রের গোত্রপতির কন্যাকে রাসূলুল্লাহ (স) কর্তৃক বিবাহের ফলে গোত্রের সকলেই মুসলমানদের প্রতি এবং মুসলমানগণও উক্ত গোত্রের প্রতি সদয় হইল। ফলে পারস্পরিক হৃদ্যতা বৃদ্ধি পাইল এবং এই অঞ্চল হইতে মুসলমানদের বিরুদ্ধে শত্রুতার আশঙ্কা রহিল না। পরবর্তী কালে গোত্রের সকলেই ইসলাম গ্রহণ করায় মুসলমানদের শক্তি বৃদ্ধি পাইল। এই সফরেই হযরত আইশা (রা)-এর গলার হার হারাইয়া যায় এবং তাঁহার প্রতি মিথ্যা অপবাদ আরোপ করা হয় (এই ব্যাপারে বিস্তারিত দ্র. 'ইফকের ঘটনা' শীর্ষক পরবর্তী নিবন্ধ)।

গ্রন্থপঞ্জী : (১) আল-কুরআনুল কারীম, সূরা আল-মুনাফিকূন; (২) আল-বুখারী, আস-সাহীহ, দারুস সালাম, রিয়াদ ১৪১৭/ ১৯৯৭, ১ম সং.; (৩) আত-তাবারী, তারীখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, বৈরূত তা.বি.; (৪) ইবনুল জাওযী, আল-মুনতাজাম ফী তারীখিল উমাম ওয়াল-মুলুক, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যা, বৈরূত ১৪১২/ ১৯৯২, ১ম সং.; (৫) ইব্‌ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, দারুল ফিক্ আল-আরাবী, জীযা, মিসর ১৩৫১/১৯৩২, ১ম সং.; (৬) ইবনুল আছীর, আল-কামিল ফিত-তারীখ, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যা, বৈরূত ১৪০৭/১৯৮৭, ১ম সং.; (৭) আস-সুহায়লী, আর-রাওদুল উনুফ, দার ইহ্ইয়াউত তুরাছ আল-আরাবী, বৈরূত ১৪১২/১৯৯২, ১ম সং.; (৮) ইব্‌ন হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, কায়রো ১৪০৮/১৯৮৭, ১ম সং.; (৯) মুহাম্মাদ ইবন ইউসুফ আস-সালিহী আশ-শামী, সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ ফী সীরাতি খায়রিল ‘ইবাদ, বৈরূত ১৪১৪/১৯৯৩, ১ম সং.; (১০) আল-ওয়াকিদী, কিতাবুল মাগাযী, ‘আলামুল কুতুব, বৈরূত ১৪০৪/১৯৮৪, ৩য় সং.; (১১) ইব্‌ন সা'দ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, বৈরূত তা.বি.; (১২) আল-কাসতাল্লানী, আল-মাওয়াহিবুল-লাদুন্নিয়্যা, বৈরূত ১৪১২/১৯৯১, ১ম সং.; (১৩) মুহাম্মাদ আবূ যাহরা, খাতামুন-নabiyīn, কায়রো তা.বি.; (১৪) ইব্‌ন কাছীর, আস-সীরাতুন-নাবাবিয়্যা, দার ইহ্ইয়াউত-তুরাছ আল-আরাবী, বৈরূত তা.বি.; (১৫) ইব্‌ন সায়্যিদিন নাস, ‘উয়ূনুল আছার ফী ফুনূনিল মাগাযী ওয়াশ-শামাইল ওয়াস-সিয়ার, দারুল কালাম, বৈরূত ১৪১৪/১৯৯৩, ১ম সং.; (১৬) ইব্‌ন আবদিল বার, আদ-দুরার ফী ইখতিসারিল মাগাযী ওয়াস-সিয়ার, দারুল আন-দালুস আল-খাদরা, কায়রো ১৪১৫/১৯৯৪; (১৭) সাফিয়্যুর রাহমান মুবারকপুরী, আর-রাহীকুল মাখতুম, আল-মাকতাবাতুল ‘আসরিয়্যা, বৈরূত ১৪১৭/১৯৯৬, ১ম সং.; (১৮) ড. মুহাম্মাদ সাঈদ রামাদান আল-বৃতী, ফিকহুস সীরাতিন নাবাবিয়্যা, দারুল ফিক্ আল-মু‘আসির, বৈরূত ১৪১৭/১৯৯৬।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00