📄 মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে সংঘটিত বিবাদ
এই যুদ্ধে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা সংঘটিত হয়, তন্মধ্যে একটি হইল মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে সাময়িক বিবাদ। যুদ্ধ বন্ধ হইবার পর মুসলমানগণ মুরায়সী' কূপের নিকট অবস্থান করিতেছিলেন। কূপে পানি অল্প থাকায় সেখানে খুবই ভীড় ছিল। সকলেই বালতি দ্বারা পানি উঠাইতেছিল। হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রা)-এর সহিত তাঁহার ভৃত্য ছিল গিফার গোত্রের জাহজাহ ইব্ন্ন মাসউদ, মতান্তরে সা'দ (রা)। তিনি উমার (রা)-এর ঘোড়ার লাগাম ধরিয়া টানিয়া লইয়া যাইতেছিলেন। তিনি কূপ হইতে বালতি দ্বারা পানি উঠাইতে গেলেন। অপরদিকে আওফ ইবনুল খাযরাজ গোত্রের মিত্র সিনান ইব্ন ওয়ার আল-জুহানী (রা)-ও পানি উঠাইবার জন্য তাহার বালতি কূপে ফেলিলেন। উভয়ের বালতি টক্কর লাগায় এক বালতিতে পানি উঠিল যাহা উভয়ে দাবি করিতে লাগিলেন। বাদানুবাদের এক পর্যায়ে জাহজাহ (রা) হাত দ্বারা সিনান (রা)-কে আঘাত করিলেন এবং ইহাতে আহত হইয়া তাহার দেহ হইতে রক্ত প্রবাহিত হইতে লাগিল আল-জুহানী চীৎকার করিয়া বলিলেন, হে আনসার দল! আর জাহজাহ (রা) চীৎকার করিযা ডাকিলেন, হে মুহাজির দল!
এই চীৎকার শুনিয়া উভয় দলের লোকজন জড়ো হইয়া গেল। মুহাজিরদের কিছু লোক সিনান (রা)-কে তাহার দাবি ত্যাগ করিতে অনুরোধ করিল। অতঃপর উভয় দলের মধস্থতায় সে তাহার দাবি ত্যাগ করিল এবং বিষয়টির মীমাংসা হইয়া গেল।
এই অবস্থা দেখিয়া মুনাফিক সর্দার আবদুল্লাহ ইবন উবাই ইব্ন সাল্ল ক্রোধান্বিত হইয়া পড়িল। তাহার নিকট তাহার কওমের কিছু লোক ছিল। তাহারা হইলঃ মালিক, দা'ইস, সুওয়ায়দ, আওস ইব্ন কায়জী, মু'আত্তিব ইন্ন কুশায়র, যায়দ ইবনুল লুসায়ত বা সালত ও আবদুল্লাহ ইব্ নাবতাল (আল-ওয়াকিদী, প্রাগুক্ত, ২খ, ৪১৬)। ইহাদের মধ্যে খাঁটি মুসলমান তরুণ যুবক যায়দ ইব্ন আরকাম (রা)-ও ছিল।
আবদুল্লাহ ইবন উবাই বলিল, উহারা এইরূপ আচরণ করিল! অথচ তাহারা আমাদের নিকট আসিয়া আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছে এবং আমাদের দেশে আমাদের চাইতে সংখ্যায় বেশী হইয়া গিয়াছে। আল্লাহ্র কসম! আমি আমাদিগকে ও কুরায়শের এই ময়লা কাপড়গুলিকে সেইরূপই মনে করি যেমন পূর্বকালের কেহ বলিয়াছে, "তোমাদের কুকুরকে খাওয়াইয়া মোটাতাজা কর, সে তোমাকে খাইয়া ফেলিবে।" আল্লাহ্র কসম! আমরা মদীনায় ফিরিয়া গেলে আমাদের সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ তথা হইতে অপদস্থদেরকে তাড়াইয়া দিবে। উল্লেখ্য যে, উবাই এখানে সম্মানিত বলিতে নিজকে ও মদীনার আনসারদেরকে বুঝাইয়াছে এবং অপদস্থ বলিতে রাসূলুল্লাহ (স) ও মুহাজির সাহাবীদেরকে বুঝাইয়াছে। অতঃপর সে তাহার কওমের যাহারা সেখানে উপস্থিত ছিল তাহাদের নিকট গিয়া বলিল, ইহা তোমদের কৃতকর্মেরই ফসল। তোমরা তাহাদিগেকে তোমাদের দেশে জায়গা দিয়াছ এবং তোমাদের সম্পদ তাহাদিগকে বণ্টন করিয়া দিয়াছ। আল্লাহ্র কসম! তোমাদের নিকট যাহা আছে তাহা যদি তাহাদিগকে দেওয়া বন্ধ করিয়া দাও তাহা হইলে অবশ্যই তাহারা তোমাদের দেশ হইতে অন্যত্র চলিয়া যাইবে।
যায়দ ইব্ন আরকাম (রা) ইহা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট গিয়া সব কথা বলিয়া দিল। রাসূলুল্লাহ (স) এই সংবাদ অপছন্দ করিলেন। তাঁহার চেহারা বিবর্ণ হইয়া গেল। তিনি বলিলেন, হে বালক! তুমি হয়তো বা তাহার প্রতি রাগান্বিত হইয়াছ। সে বলিল, না, আল্লাহর কসম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! ইহা আমি তাহার নিকট শুনিয়াছি। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, সম্ভবত তোমার কান ভুল শুনিয়াছে। সে বলিল, না, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আল্লাহ্র কসম! তিনি বলিলেন তাহা হইলে অন্য কেহ উহা বলিয়াছে। সে বলিল, না, আল্লাহর কসম! ইয়া রাসূলাল্লাহ!
এই খবর সেনাবাহিনীর মধ্যে ছড়াইয়া পড়িল। কওমের সকলে কেবল এই আলোচনাই করিতে লাগিল।
আনসারদের একদল লোক যায়দ ইব্ন আরকাম (রা)-কে তিরস্কার করিতে লাগিল যে, তুমি গোত্রপতিকে অপমান করিয়াছ, সে যাহা বলে নাই তাহার অভিযোগ করিয়াছ। ইহার ফলে তুমি জুলুম করিয়াছ এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করিয়াছ। যায়দ ইব্ন আরকাম বলিলেন, আল্লাহ্র কসম! সে যাহা বলিয়াছে আমি তাহাই শুনিয়াছি। আল্লাহ্র কসম! খাযরাজ গোত্রের মধ্যে আমার নিকট তদপেক্ষা প্রিয় ব্যক্তি আর কেহ ছিল না। আল্লাহ্র কসম! এই কথাগুলি যদি আমি আমার পিতার নিকট হইতে শুনিতাম তবুও আমি উহা রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিতাম। আমি আশা করি আল্লাহ তাঁহার রাসূলের উপর এমন কিছু নাযিল করিবেন যদ্বারা আমার কথা সত্য বলিয়া প্রমাণিত হয় (সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৪খ, ২৪৮-৪৯)।
যায়দ ইব্ন আরকাম (রা) যখন রাসূলুল্লাহ (স)-কে বিষয়টি অবহিত করেন তখন উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) তাঁহার নিকট ছিলেন। ইহা শুনিয়া রাগান্বিত হইয়া তিনি বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আব্বাদ ইন্ন বিশরকে নির্দেশ দিন— সে তাহাকে হত্যা করুক। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তাহা কিভাবে হয়, হে উমর! লোকে বলিবে, মুহাম্মাদ তাঁহার সঙ্গীদিগকে হত্যা করে, ইহা হইতে পারে না। তুমি বরং এখান হইতে রওয়ানা হওয়ার ঘোষণা প্রদান কর। ইহা এমন একটি সময় ছিল যখন সাধারণত রাসূলুল্লাহ (স) কোথায়ও রওয়ানা হইতেন না।
অতঃপর লোকজন সকলেই রওয়ানা হইল।
আবদুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সালুল যখন জানিতে পারিল যে, যায়দ ইব্ন আরকাম তাহার নিকট হইতে যাহা কিছু শুনিয়াছে তাহা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট পৌছাইয়া দিয়াছে তখন সে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট গমন করিয়া আল্লাহ্র কসম করিয়া বলিল, আমি উহা কখনও বলি নাই বা কোনরূপ আলোচনাও করি নাই। আবদুল্লাহ ইব্ন উবাই তাহার কওমের মধ্যে সম্ভ্রান্ত ও প্রতাপশালী লোক ছিল। আনসারদের মধ্যে তাহার সঙ্গী যাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট উপস্থিত ছিল তাহারা আবদুল্লাহ ইবন উবাই-এর প্রতি দয়াপরবশ হইয়া তাহাকে দোষ হইতে রক্ষা করিবার জন্য বলিল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! বালকটি হয়তোবা তাহার কথা ভালোমত বুঝিতে পারে নাই এবং স্মরণ রাখিতে পারে নাই। কিন্তু যায়দ ইব্ন আরকাম সর্বদাই তাহার কথার উপর অটল ছিলেন। তিনি বলিতেছিলেন, আমি ঠিক শুনিয়াছি।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) যখন রওয়ানা হইলেন তখন উসায়দ ইবন হুদায়র (রা) তাঁহার সহিত সাক্ষাত করিয়া ইসলামী কায়দায় স্বাগতম জানাইলেন এবং বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি অসময়ে রওয়ানা করিয়াছেন যখন আপনি সাধারণত রওয়ানা করেন না। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে বলিলেন, তোমাদের সঙ্গী কি বলিয়াছে সে খবর কি তোমার কাছে পৌছে নাই? উসায়দ (রা) বলিলেন, কোন সঙ্গী ইয়া রাসূলাল্লাহ? তিনি বলিলেন, আবদুল্লাহ ইবন উবাই। উসায়দ (রা) বলিলেন, সে কী বলিয়াছে? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, সে ধারণা করে যে, মদীনায় ফিরিয়া গেলে সম্মানী লোকেরা অপদস্থ লোকদের তথা হইতে বিতাড়িত করিয়া দিবে। উসায়দ (রা) বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহ্র কসম! সে-ই অপদস্থ এবং আপনি সম্মানিত। অতঃপর তিনি আবদুল্লাহ ইবন উবাই-এর জন্য সুপারিশ করিয়া বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তাহার প্রতি একটু সদয় হউন। আল্লাহ্র কসম! আল্লাহ্ আপনাকে আমাদের মধ্যে আনিয়া দিয়াছেন। অথচ এক সময় আমাদের কওমের লোকজন তাহাকে রাজমুকুট পরাইবার জন্য সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত ছিল (ইবন হিশাম, আস-সীরাতুন-নাবাবিয়্যা, ৩খ., পৃ. ২৩৬-৩৭; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ১৫৭)।
রাসূলুল্লাহ (স) লোকজনসহ সারাদিন ও সারারাত্র পথ চলিলেন। পরদিন সকাল বেলাও তিনি চলিতে থাকিলেন। বেলা বাড়িয়া গেলে রৌদ্রের প্রখরতার কারণে চলিতে কষ্ট হওয়ায় তিনি যাত্রা বিরতি করিলেন। ভূমিতে অবতরণ করিতেই দীর্ঘ সফরের ক্লান্তিতে সকলে ঘুমাইয়া পড়িলেন। রাসূলুল্লাহ (স) এইরূপ এইজন্য করিয়াছিলেন যাহাতে লোকজনের মনোযোগ পূর্বদিনের আলোচিত আবদুল্লাহ ইব্ন উবাইর কথা হইতে অন্যদিকে ফিরিয়া যায়।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) লোকজনসহ আবার চলিতে শুরু করিলেন এবং হিজাযের মধ্য দিয়া চলিলেন। এই সময় তিনি হিজায-এর সামান্য উপরিভাগে অবতরণ করিলেন যাহাকে 'বাকআ', মতান্তরে 'নাকআ' বলা হইত। রাসূলুল্লাহ (স) যখন সেখানে বিশ্রাম লইতেছিলেন তখন প্রচণ্ড এক ঝড় প্রবাহিত হইল। ইহাতে সকলের কষ্ট হইল এবং তাহারা ভীত হইয়া পড়িলেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তোমরা ভয় পাইও না। কাফিরদের বড় কোন এক নেতার মৃত্যুতে এই বাতাস প্রবাহিত হইয়াছে। পরে তাহারা মদীনায় পৌঁছিয়া জানিতে পারিলেন যে, কায়নুকা নামক ইয়াহুদী গোত্রের বড় নেতা এবং মুনাফিকদের সাহায্যকারী রিফাআ ইবন যায়দ ইবনুত তাবূত যেদিন ঝড়ো হাওয়া প্রবাহিত হইয়াছিল ঠিক সেইদিন মারা গিয়াছে (ইবন হিশাম, প্রাগুক্ত, ৩খ., পৃ. ২৩৮; আত-তাবারী, তারীখ, ২খ., ৬০৭)।
অতঃপর আল্লাহ তা'আলা আবদুল্লাহ ইব্ন উবাই ও তাহার সঙ্গী মুনাফিকগণের প্রকৃত অবস্থা জানাইয়া একটি সূরা নাযিল করেন যাহা সূরা আল-মুনাফিকূন নামে পরিচিত। ইহার ফলে মুনাফিকদের স্বরূপ প্রকাশিত হইয়া পড়িল এবং বালক যায়দ ইব্ন আরকাম-এর সততা প্রমাণিত হইল। এই সূরা নাযিল হইলে রাসূলুল্লাহ (স) স্নেহভরে যায়দ ইব্ন আরকাম-এর কান ধরিয়া বলিলেন, আল্লাহ তা'আলা ইহার কান রক্ষা করিয়াছেন।
মুনাফিক সর্দার আবদুল্লাহ ইবন উবাই-এর পুত্র, যাঁহার নামও ছিল আবদুল্লাহ, খাঁটি মুসলমান ছিলেন। তাঁহার পিতার এই সংবাদ যখন তাঁহার নিকট পৌঁছিল তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট গিয়া বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি শুনিয়াছি যে, আবদুল্লাহ ইব্ন উবাই সম্পর্কে আপনার নিকট যে সংবাদ পৌঁছিয়াছে তাহার কারণে আপনি তাহাকে হত্যা করিতে মনস্থ করিয়াছেন। আপনি যদি তাহাই করেন তবে সেই দায়িত্ব আমার উপর অর্পণ করুন। আমিই তাহার মস্তক আপনার নিকট আনিয়া দিব। আল্লাহ্র কসম! খাযরাজ গোত্র জানে যে, তাহাদের মধ্যে পিতার প্রতি ভক্তি ও শ্রদ্ধাশীল ব্যক্তি আমার তুলনায় আর কেহ নাই। আমি আশঙ্কা করিতেছি যে, আপনি তাহাকে হত্যা করার জন্য অন্যকে নির্দেশ দিলে সে যদি তাহাকে হত্যা করে তবে আবদুল্লাহ ইবন উবাই-এর হত্যাকারীকে লোকের মধ্যে চলাফেরা করিতে দেখিয়া আমি নিজকে সংবরণ করিতে পারিব না। ফলে তাহাকে হত্যা করিয়া ফেলিব। তখন কাফিরের বিনিময়ে একজন মুমিনকে হত্যা করার দায়ে আমি জাহান্নামের অধিবাসী হইব। এই কথা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আমরা তাহার সহিত নম্র আচরণ করিব এবং তাহার সহিত সদ্ব্যবহার করিব যতদিন সে আমাদের সঙ্গে থাকে (ইন্ন হিশাম, প্রাগুক্ত; আত-তাবারী, প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ৬০৮; আল-ওয়াকিদী, প্রাগুক্ত, ২খ., ৪২০-২১)।
ইহার পর হইতে যখনই সে কোন অঘটন ঘটাইত তখন তাহার কওম উহার জন্য তাহাকেই দোষারোপ করিত এবং তিরস্কার করিত। তাহাদের এই অবস্থা অবগত হইয়া রাসূলুল্লাহ (স) উমার ইবনুল খাত্তাব (রা)-কে বলিয়াছিলেন, কেমন বুঝিতেছ হে উমার! তুমি সেদিন তাহাকে হত্যা করিতে বলিয়াছিলে। সেই দিন যদি আমি তাহাকে হত্যা করিতাম তবে অনেকেই তাহাতে শোকাহত হইত। আর আজ যদি আমি তাহাকে হত্যা করার নির্দেশ দেই তবে তাহার গোত্রের লোকজনই তাহাকে হত্যা করিবে। উমার (রা) বলিলেন, আল্লাহ্র কসম! আমি বুঝিতে পারিয়াছি যে, রাসূলুল্লাহ (স)-এর পদক্ষেপ আমার পদক্ষেপ হইতে বেশী বরকতময় (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ১৫৮; আত-তাবারী, তারীখ, ২খ., পৃ. ৬০৮-৬০৯)।
ইকরিমা ও ইন্ন যায়দ প্রমুখ বর্ণনা করেন যে, আবদুল্লাহ ইবন উবাই-এর পুত্র আবদুল্লাহ (রা) মদীনার সরু প্রবেশপথে তাঁহার পিতার পথ আগলাইয়া দাঁড়াইয়াছিলেন এবং পিতাকে বলিয়াছিলেন, এইখানে দাঁড়াইয়া থাকুন। আল্লাহ্র কসম! রাসূলুল্লাহ (স) যতক্ষণ আপনাকে মদীনায় প্রবেশের অনুমতি প্রদান না করিবেন ততক্ষণ আপনি মদীনায় প্রবেশ করিতে পারিবেন না। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) সেখানে পৌঁছিয়া তাহাকে মদীনায় প্রবেশের অনুমতি দিলে আবদুল্লাহ তাহার পথ ছাড়িয়া দেন এবং সে মদীনায় প্রবেশ করে (ইব্ন কাছীর, প্রাগুক্ত, ৪খ., ১৫৮)।
📄 গনীমত বণ্টন
যুদ্ধশেষে রাসূলুল্লাহ (স) গনীমত সম্পদ মুসলিম যোদ্ধাদের মধ্যে বণ্টন করার নির্দেশ দেন। বন্দীদের বণ্টনের দায়িত্ব প্রদান করেন বুরায়দা ইবনুল খাসীব (রা)-কে আসবাবপত্র, অস্ত্রপাতি, উট, বকরী প্রভৃতি বণ্টনের দায়িত্ব দেন রাসূলুল্লাহ (স)-এর মুক্তদাস শুকরান (রা)-এর উপর, এক পঞ্চমাংশ (খুমুস) বণ্টনের দায়িত্ব দেন মাহমিয়া ইন্ন জায (রা)-এর উপর ('উয়ুনুল আছার, ২খ., পৃ. ১২৯; সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৪খ., পৃ. ৩৪৬)।
📄 জুওয়ায়রিয়া (রা)-এর সহিত রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিবাহ
এই যুদ্ধে মুসলমানগণ গনীমত সম্পদ হিসাবে বহু দাস-দাসী লাভ করেন যাহা পূর্বেই উল্লেখ করা হইয়াছে। দাসীদের মধ্যে মুসতালিক গোত্রপতি আল-হারিছ ইব্ন আবী দিরারের কন্যা জুওয়ায়রিয়াও ছিলেন, যাহার নাম ছিল তখন বাররা। তিনি ছিলেন অপরূপ সুন্দরী। গনীমত বণ্টনের সময় তিনি ছাবিত ইব্ন কায়স ইব্ন শাম্মাস (রা) বা তাহার চাচাতো ভাইয়ের ভাগে পড়েন, এক বর্ণনামতে উভয়ের ভাগে পড়েন। কিন্তু ছাবিত (রা) তাহার চাচাতো ভাইকে তাহার অংশের মূল্য পরিশোধ করিয়া উহার একচ্ছত্র মালিক হন। জুওয়ায়রিয়া (রা) তাহার সহিত ৯ উকিয়া স্বর্ণ মুক্তিপণ আদায় পূর্বক মুক্ত হইয়া যাওয়ার চুক্তি করেন।
উম্মু'ল মু'মিনীন হযরত 'আইশা (রা) বলেন, আমরা পানির নিকট থাকিতেই জুওয়ায়রিয়া তাহার অর্থ পরিশোধের ব্যাপারে সাহায্য চাহিবার জন্য রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আগমন করিল এবং তাঁহার নিকট গিয়া বলিল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি এখন মুসলমান। আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নাই। আর আপনি আল্লাহ্র রাসূল। আমি গোত্রপতি আল-হারিছ ইব্ন আবী দিরারের কন্যা জুওয়ায়রিয়া। আমি কি বিপদে নিপতিত হইয়াছি তাহা আপনার অজানা নহে। আমি ছাবিত ইব্ন কায়স ইব্ন শাম্মাস-এর ভাগে পড়িয়াছি। অতঃপর আমি তাহার সহিত অর্থের বিনিময়ে মুক্তির চুক্তি করিয়াছি। এখন আপনার নিকট আমার চুক্তির ব্যাপারে সাহায্য চাহিবার জন্য আগমন করিয়াছি। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তুমি কি ইহা হইতে উত্তম কিছু চাও? জুওয়ায়রিয়া বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তাহা কি? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আমি তোমার মুক্তিলাভের অর্থ পরিশোধ করিয়া দিব এবং তোমাকে বিবাহ করিব। তিনি সম্মতি দিলে রাসূলুল্লাহ (স) ছাবিতকে ডাকাইয়া তাহার অর্থ পরিশোধ করিয়া দিলেন এবং জুওয়ায়রিয়া (রা)-কে আযাদ করিয়া তাহাকে বিবাহ করিলেন (ইবন হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা ৩খ., ২৪০; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ১৫৯)।
অপর এক বর্ণনামতে, রাসূলুল্লাহ (স) তাহার পিতার নিকট প্রস্তাব দিলে পিতাই তাহাকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত বিবাহ প্রদান করেন। উহার বিবরণ নিম্নে প্রদত্ত হইল:
রাসূলুল্লাহ (স) যখন বনূ মুসতালিক যুদ্ধশেষে ফিরিয়া আসিলেন তখন জুওয়ায়রিয়া (রা)-ও বন্দী হিসাবে তাহাদের সহিত ছিলেন। জুওয়ায়রিয়াকে আনসারদের এক লোকের নিকট আমানতস্বরূপ রাখা হইল। তিনি আনসার সাহাবীকে নির্দেশ দিলেন যে, সে যেন জুওয়ায়রিয়া (রা)-কে উত্তমরূপে রক্ষণাবেক্ষণ করে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) মদীনায় পৌঁছিলে আল-হারিছ ইব্ন আবী দিরার স্বীয় কন্যা জুওয়ায়রিয়াকে মুক্ত করার জন্য বেশ কিছু উট লইয়া মদীনায় আগমন করিতেছিলেন। আল-'আকীক নামক স্থানে আসিবার পর উত্তম দুইটি উটের দিকে তাহার নজর পড়িল। তিনি উট দুইটির প্রতি আকৃষ্ট হইয়া পড়িলেন এবং উহা তাহার খুবই পছন্দ হইল। তিনি উট দুইটিকে আকীক-এর গুহায় লুকাইয়া রাখিলেন এবং অবশিষ্ট উটগুলি লইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আগমন করিয়া বলিলেন, হে মুহাম্মাদ! আপনারা আমার কন্যাকে বন্দী করিয়া আনিয়াছেন। এই তাহার মুক্তিপণ। তখন রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, সেই দুইটি উট কোথায় যাহা তুমি আকীকের অমুক গুহায় লুকাইয়া রাখিয়াছ? তখন আল-হারিছ বলিয়া উঠিলেন, اشهد ان لا اله الا الله وانك محمد رسول الله "আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে, আল্লাহ্ ছাড়া কোন ইলাহ নাই এবং আপনি মুহাম্মাদ আল্লাহ্র রাসূল"। আল্লাহ্র কসম! এই বিষয়টি আল্লাহ ছাড়া আর কেহই জানে না। এই বলিয়া আল-হারিছ মুসলমান হইয়া গেল। তাহার সহিত তাহার দুই পুত্র এবং তাহার গোত্রের বহু লোক ইসলাম গ্রহণ করিল। অতঃপর তিনি লোক পাঠাইয়া সেই উট দুইটি লইয়া আসিলেন এবং তাহা রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে পেশ করিলেন। অতপর তাহার কন্যা জুওয়ায়রিয়াকে তাঁহার নিকট সোপর্দ করা হইল। তিনিও ইসলাম গ্রহণ করেন এবং একজন নিষ্ঠাবান মুসলমান হিসাবে জীবন যাপন করেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাহার পিতার নিকট জুওয়ায়রিয়াকে বিবাহের প্রস্তাব দিলে পিতা তাহাকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত বিবাহ দেন এবং চারি শত দিরহাম দেন-মোহর ধার্য করেন (ইব্ন হিশাম, আস-সীরা, ৩খ., পৃ. ২৪১)। আল-ওয়াকিদীর বর্ণনামতে, বনী মুসতালিকের ৪০ জন, মতান্তরে সকল যুদ্ধবন্দীকে আযাদ করিয়া দেওয়া তাঁহার মোহররূপে ধার্য হয় (আল-ওয়াকিদী, প্রাগুক্ত, ১খ., পৃ. ৪১২; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ১৫৯)।
এই ব্যাপারে জুওয়ায়রিয়া (রা) হইতে আরও একটি রিওয়ায়াত বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, আমার পিতা ছাবিত ইব্ন কায়স ইব্ন শাম্মাস-এর নিকট হইতে মুক্তিপণ দিয়া আমাকে মুক্ত করেন। অন্যান্য মহিলাদের জন্য যে মুক্তিপণ নির্ধারণ করা হইয়াছিল তিনি সেই পরিমাণ মুক্তিপণ দিয়া আমাকে ছাড়াইয়া লন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) আমার পিতার নিকট আমাকে বিবাহ করার প্রস্তাব দেন। আমার পিতা তাঁহার সহিত আমাকে বিবাহ দেন (আল-ওয়াকিদী, প্রাগুক্ত, ১খ., পৃ. ৪১২)। তবে এইসব বর্ণনার মধ্যে প্রথম বর্ণনাটি অধিকতর সঠিক।
📄 জুওয়ায়রিয়া (রা)-এর স্বপ্ন
এই যুদ্ধের তিন দিন পূর্বে জুওয়ায়রিয়া (রা) একটি স্বপ্ন দেখেন যাহার তাৎপর্য ছিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর তাঁহার সহিত বিবাহ। বলা যায়, স্বপ্নটি ছিল এই বিবাহেরই পূর্ব-সুসংবাদ। উরওয়া ইবনুয-যুবায়র হইতে বর্ণিত। জুওয়ায়রিয়া (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) মুরায়সীতে আগমনের তিন দিন পূর্বে আমি স্বপ্নে দেখিলাম যে, ইয়াছরিব হইতে একটি চাঁদ আসিয়া আমার কোলের উপর পতিত হইল। এই স্বপ্ন আমি কাহারও নিকট প্রকাশ করা পছন্দ করিলাম না। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে আযাদ করিয়া বিবাহ করিলেন। আমি আমার সম্প্রদায়ের কাহাকেও ইহা বলি নাই। এমনকি মুসলমানগণ তাহাদিগকে আযাদ করিয়া দিল। এই সংবাদ আমি অন্য কোন মাধ্যম হইতে জানিতে পারি নাই, কেবল আমার এক চাচাতো বোনই আমাকে এই সংবাদ দেয়। তখন আমি আল্লাহ্র প্রশংসা করি (ইব্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ১৫৯; সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৪খ., পৃ. ৩৪৭; আল-ওয়াকিদী, মাগাযী, ১খ., ৪১২)।
বিবাহের এই সংবাদ মুসলমানদের মধ্যে ছড়াইয়া পড়িলে লোকজন বলাবলি করিতে লাগিল যে, ইহারা তো রাসূলুল্লাহ (স)-এর শ্বশুরের বংশ। তাহারা এই বলিয়া তাহাদের অধীনে যত দাস-দাসী ছিল সবাইকে মুক্ত করিয়া দিল। হযরত আইশা (রা) বলিতেন, তাঁহাকে বিবাহের ফলে বনু মুসতালিক গোত্রের প্রায় এক শত পরিবারকে মুক্ত করিয়া দেওয়া হয়। নিজ কওমের জন্য এমন বরকতসম্পন্না মহিলা আমি আর কখনও দেখি নাই (ইব্ন হিশাম, আস-সীরা, ৩খ., পৃ. ২৪০-৪১; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ১৫৯; আত-তাবারী, তারীখ, ২খ., পৃ. ৬১০)।
প্রভাবশালী এই গোত্রের গোত্রপতির কন্যাকে রাসূলুল্লাহ (স) কর্তৃক বিবাহের ফলে গোত্রের সকলেই মুসলমানদের প্রতি এবং মুসলমানগণও উক্ত গোত্রের প্রতি সদয় হইল। ফলে পারস্পরিক হৃদ্যতা বৃদ্ধি পাইল এবং এই অঞ্চল হইতে মুসলমানদের বিরুদ্ধে শত্রুতার আশঙ্কা রহিল না। পরবর্তী কালে গোত্রের সকলেই ইসলাম গ্রহণ করায় মুসলমানদের শক্তি বৃদ্ধি পাইল। এই সফরেই হযরত আইশা (রা)-এর গলার হার হারাইয়া যায় এবং তাঁহার প্রতি মিথ্যা অপবাদ আরোপ করা হয় (এই ব্যাপারে বিস্তারিত দ্র. 'ইফকের ঘটনা' শীর্ষক পরবর্তী নিবন্ধ)।
গ্রন্থপঞ্জী : (১) আল-কুরআনুল কারীম, সূরা আল-মুনাফিকূন; (২) আল-বুখারী, আস-সাহীহ, দারুস সালাম, রিয়াদ ১৪১৭/ ১৯৯৭, ১ম সং.; (৩) আত-তাবারী, তারীখুল উমাম ওয়াল-মুলুক, বৈরূত তা.বি.; (৪) ইবনুল জাওযী, আল-মুনতাজাম ফী তারীখিল উমাম ওয়াল-মুলুক, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যা, বৈরূত ১৪১২/ ১৯৯২, ১ম সং.; (৫) ইব্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, দারুল ফিক্ আল-আরাবী, জীযা, মিসর ১৩৫১/১৯৩২, ১ম সং.; (৬) ইবনুল আছীর, আল-কামিল ফিত-তারীখ, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যা, বৈরূত ১৪০৭/১৯৮৭, ১ম সং.; (৭) আস-সুহায়লী, আর-রাওদুল উনুফ, দার ইহ্ইয়াউত তুরাছ আল-আরাবী, বৈরূত ১৪১২/১৯৯২, ১ম সং.; (৮) ইব্ন হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, কায়রো ১৪০৮/১৯৮৭, ১ম সং.; (৯) মুহাম্মাদ ইবন ইউসুফ আস-সালিহী আশ-শামী, সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ ফী সীরাতি খায়রিল ‘ইবাদ, বৈরূত ১৪১৪/১৯৯৩, ১ম সং.; (১০) আল-ওয়াকিদী, কিতাবুল মাগাযী, ‘আলামুল কুতুব, বৈরূত ১৪০৪/১৯৮৪, ৩য় সং.; (১১) ইব্ন সা'দ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, বৈরূত তা.বি.; (১২) আল-কাসতাল্লানী, আল-মাওয়াহিবুল-লাদুন্নিয়্যা, বৈরূত ১৪১২/১৯৯১, ১ম সং.; (১৩) মুহাম্মাদ আবূ যাহরা, খাতামুন-নabiyīn, কায়রো তা.বি.; (১৪) ইব্ন কাছীর, আস-সীরাতুন-নাবাবিয়্যা, দার ইহ্ইয়াউত-তুরাছ আল-আরাবী, বৈরূত তা.বি.; (১৫) ইব্ন সায়্যিদিন নাস, ‘উয়ূনুল আছার ফী ফুনূনিল মাগাযী ওয়াশ-শামাইল ওয়াস-সিয়ার, দারুল কালাম, বৈরূত ১৪১৪/১৯৯৩, ১ম সং.; (১৬) ইব্ন আবদিল বার, আদ-দুরার ফী ইখতিসারিল মাগাযী ওয়াস-সিয়ার, দারুল আন-দালুস আল-খাদরা, কায়রো ১৪১৫/১৯৯৪; (১৭) সাফিয়্যুর রাহমান মুবারকপুরী, আর-রাহীকুল মাখতুম, আল-মাকতাবাতুল ‘আসরিয়্যা, বৈরূত ১৪১৭/১৯৯৬, ১ম সং.; (১৮) ড. মুহাম্মাদ সাঈদ রামাদান আল-বৃতী, ফিকহুস সীরাতিন নাবাবিয়্যা, দারুল ফিক্ আল-মু‘আসির, বৈরূত ১৪১৭/১৯৯৬।