📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 যুদ্ধের কারণ

📄 যুদ্ধের কারণ


এই যুদ্ধের মূল কারণ ছিল মুসতালিক গোত্রের কাফিরদের ঔদ্ধত্য ও যুদ্ধোন্মাদনা। রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট এই মর্মে সংবাদ পৌঁছিয়াছিল যে, বানু মুসতালিক মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিবার জন্য সৈন্য সংগ্রহ ও জোরদার প্রস্তুতি গ্রহণ করিতেছে। তাহাদের নেতা ছিল আল-হারিছ ইব্‌ন আবী দিরার, যিনি ছিলেন পরবর্তী কালে উম্মুল মু'মিনীন হযরত জুওয়ায়রিয়া (রা)-এর পিতা। এই যুদ্ধের পরপরই রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে বিবাহ করেন। আল-হারিছ ইব্‌ন আবী দিরার তাহার সম্প্রদায় ও আরবের সক্ষম ব্যক্তিদের দ্বারে দ্বারে গিয়া তাহাদিগকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিতে প্ররোচিত করে। অতঃপর তাহারা বহু সংখ্যক ঘোড়া ও অস্ত্রপাতি ক্রয় করে এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রার পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করে। এমনকি আরোহিগণ তাহাদের আঙ্গিনা হইতে বাহির হইয়া অন্যদের নিকট তাহাদের নিজেদের যাত্রার খবর জানাইয়া দেয়। এই সংবাদ রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট পৌঁছিলে তিনি বুরায়দা ইবনুল হুসায়ব আল-আসলামী (রা)-কে এই সম্পর্কে খোঁজ-খবর লইবার জন্য প্রেরণ করেন। বুরায়দা (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট কিছু (উল্টাপাল্টা) বলিবার অনুমতি প্রার্থনা করিলে রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে অনুমতি প্রদান করেন। অতঃপর তিনি আল-মুরায়সী' নামক পানির কূপের নিকট তাহাদের মধ্যে অবতরণ করেন। সেখানে তিনি অহঙ্কারী এক কওমের সাক্ষাত পান যাহারা বিরাট এক জামা'আতে ঐক্যবদ্ধ ছিল। তাহারা জিজ্ঞাসা করিল, তুমি কে? তিনি বলিলেন, আমি তোমাদেরই লোক। এই লোকটির (মুহাম্মাদ) বিরুদ্ধে তোমাদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার কথা শুনিয়া আমি এখানে আগমন করিয়াছি। তাই এখন আমি আমার কওম ও আমার অনুগত লোকদের নিকট গমন করিব যাহাতে আমরা ঐক্যবদ্ধ শক্তি লইয়া তাঁহাকে ধ্বংস করিতে পারি। আল-হারিছ ইব্‌ন আবী দিরার বলিলেন, আমরা এই অবস্থায় এখানেই আছি। তুমি দ্রুত আমাদের সহিত আসিয়া মিলিত হও। বুরায়দা (রা) বলিলেন, আমি এখনই সওয়ার হইয়া যাইতেছি এবং সত্ত্বর আমার কওম ও অনুগতদের বিশাল একটি দল লইয়া আসিতেছি। ইহাতে তাহারা খুশী হইল (আল-ওয়াকিদী, কিতাবুল মাগাযী, ১খ., পৃ. ৪০৪-৪০৫)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মুসলমানদের প্রস্তুতি

📄 মুসলমানদের প্রস্তুতি


বুরায়দা (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিয়া কাফিরদের সকল সংবাদ অবহিত করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) মুসলমানদিগকে আহ্বান করিয়া শত্রুদের প্রস্তুতির কথা জানাইয়া দিলেন। মুসলমানগণ তাহাদের মুকাবিলায় বাহির হইবার জন্য দ্রুত প্রস্তুতি গ্রহণ করিলেন। তাহাদের সঙ্গে ছিল ৩০টি ঘোড়াঃ মুহাজিরদের দশটি, তন্মধ্যে রাসূলুল্লাহ (স)-এর ২টি, যাহার নাম ছিল লিযায (রিযা) ও আজ-জারিব (আলজ্বারিব)। অবশিষ্ট ৮টির উপর আরোহী ছিলেন হযরত আবূ বাক্‌র (রা), হযরত 'উমার, হযরত উছমান, হযরত আলী, হযরত যুবায়র, হযরত আবদুর রাহমান ইব্‌ন আওফ, হযরত তালহা ইব্‌ন উবায়দিল্লাহ ও হযরত মিকদাদ ইব্‌ন আমর (রা)। আর আনসারদের ছিল ২০টি ঘোড়া, যাহার মালিক ও আরোহী ছিলেন হযরত সা'দ ইব্‌ মু'আয, উসায়দ ইব্‌ন হুদায়র, আবূ 'আপ্স ইব্‌ন জাবর, কাতাদা ইবনুন-নু'মান, উওয়ায়ম ইব্‌ন সা'ইদা, মা'ন ইবন 'আদী, সা'দ ইব্‌ন যায়দ আল-আশহালী, আল-হারিছ ইব্‌ন হাযমা, মতান্তরে খাযমা, মু'আয ইব্‌ন জাবাল, আবূ কাতাদা, উবাই ইব্‌ন কা'ব, আল-হুবাব ইবনুল মুনযির, যিয়াদ ইব্‌ন লাবীদ, ফারওয়া ইব্‌ন 'আমর ও মু'আয ইব্‌ন রিফা'আ ইব্‌ন রাফে' (রা) প্রমুখ (আল-ওয়াকিদী, প্রাগুক্ত; সুবুলুল-হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৪খ., পৃ. ৩৪৪)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 যুদ্ধে রওয়ানা

📄 যুদ্ধে রওয়ানা


অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) আবূ যার আল-গিফারী (রা), মতান্তরে নুমায়লা ইব্‌ন আবদিল্লাহ আল-লায়ছী (রা)-কে মদীনার গভর্নর নিযুক্ত করিয়া মুসলিম যোদ্ধাদের লইয়া রওয়ানা হইলেন। এই যুদ্ধের সফরে বহু মুনাফিক রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত যোগ দেয়, যাহারা ইতোপূর্বে কোন যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত অংশগ্রহণ করে নাই। তাহারা এই সফরে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত যোগ দিয়াছিল জিহাদে উৎসাহী হইয়া নহে, বরং দুনিয়াবী সম্পদ লাভের আশায়। উপরন্তু উক্ত সফরও ছিল নিকটবর্তী স্থানে। তাই সফরের কষ্টও ইহাতে কম ছিল।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) মদীনার নিকটস্থ শস্য ও কূপ সমৃদ্ধ 'আল-হালায়েক'- মতান্তরে আল-খালায়েক নামক স্থানে অবতরণ করেন। সেখানে আবদুল কায়স গোত্রের এক ব্যক্তি আসিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-কে সালাম করিল। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে বলিলেন, তোমার পরিবার কোথায়? সে বলিল, আর-রাওহা নামক স্থানে। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তুমি কোথায় যাইতেছ? লোকটি বলিল, আপনার নিকটই আসিয়াছি। আমি এইজন্য আসিয়াছি যে, আপনার উপর ঈমান আনয়ন করিব, আপনি যাহা লইয়া আগমন করিয়াছেন তাহা সত্য বলিয়া সাক্ষ্য দিব এবং আপনার সঙ্গে থাকিয়া আপনার শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিব। রাসূলুল্লাহ (স) ইহাতে খুশী হইয়া বলিলেন, সকল প্রশংসা সেই আল্লাহ্ যিনি তোমাকে ইসলামের প্রতি পথ প্রদর্শন করিয়াছেন। লোকটি বলিল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! কোন্ আমল আল্লাহ্র নিকট সর্বাধিক পছন্দনীয়? তিনি বলিলেন, প্রথম ওয়াক্তে সালাত আদায় করা (কিতাবুল মাগাযী, ১খ., পৃ. ৪০৫-৪০৬; সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৪খ., পৃ. ৩৪৪)।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) মুসলিম বাহিনীসহ পুনরায় রওয়ানা হইলেন। তাহারা মদীনা হইতে ২৪ মাইল দূরে 'বাকআ' নামক স্থানে পৌঁছিলে মুশরিকদের এক গুপ্তচরের সাক্ষাত পাইলেন। মুসলমানগণ তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমার পিছনে কি? শত্রু সৈন্যগণ কোথায়? সে বলিল, আমি তাহাদের সম্পর্কে কিছুই জানি না। তাহার এই মিথ্যা কথা শুনিয়া উমার (রা) খুবই রাগান্বিত হইলেন। তিনি বলিলেন, তুমি সত্য কথা বল, নতুবা আমি তোমার গর্দান উড়াইয়া দিব। এই হুমকিতে সে ভয় পাইয়া গেল এবং বলিল, আমি বানুল মুসতালিকের এক লোক। আল-হারিছ ইব্‌ন আবী দিরারকে এই অবস্থায় দেখিয়া আসিয়াছি যে, সে তোমাদের বিরুদ্ধে বিশাল এক বাহিনী জড়ো করিয়াছে। আরও বহু লোকজন তাহার সহিত আসিয়া যোগ দিতেছে। সে আমাকে তোমাদের নিকট প্রেরণ করিয়াছে তোমাদের খবর সংগ্রহ করিবার জন্য এবং তোমরা মদীনা হইতে বাহির হইয়াছ কিনা তাহা জানিবার জন্য।
অতঃপর উমার (রা) তাহাকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট লইয়া গেলেন এবং তাহাকে যাবতীয় বিষয় অবহিত করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন। সে তাহা গ্রহণ করিতে অস্বীকার করিয়া বলিল, আমার কওম কি করে তাহা না দেখা পর্যন্ত আমি আপনাদের দীনের অনুসরণ করিব না। তাহারা যদি আপনাদের দীনে শামিল হয় তবে আমিও তাহাদের একজন হইব। আর যদি তাহারা তাহাদের দীনের উপর অটল থাকে তবে আমিও তাহাদের অন্যতম হইব। এই কথা শুনিয়া উমার (রা) বলিলেন, ইহা রাসূলাল্লাহ! আমি তাহার গর্দান উড়াইয়া দিই! লোকটি যেহেতু মুসলমানদের বিরুদ্ধে গোয়েন্দাগিরি করিয়াছে এবং ইসলাম গ্রহণ করিতে সরাসরি অস্বীকার করিয়া ধৃষ্টতার পরিচয় দিয়া হত্যাযোগ্য অপরাধ করিয়াছিল, তাই উমার (রা)-এর প্রস্তাবের পর রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে সম্মুখে বাড়াইয়া দিলেন, অতঃপর তাহাকে হত্যা করা হইল। এই সংবাদ বানুল মুসতালিকের নিকট পৌঁছিয়া গেল। ইহাতে তাহারা ভীষণ ভয় পাইল। তাহাদের মনোবল একেবারে ভাঙ্গিয়া গেল।
এই সম্পর্কে উম্মুল মু'মিনীন হযরত জুওয়ায়রিয়া (রা)-এর বর্ণনা প্রণিধানযোগ্য। পরবর্তী কালে মুসলমান হওয়ার পর তিনি এই ঘটনার স্মৃতিচারণ করিয়া বলিতেন, রাসূলুল্লাহ (স) আমাদের নিকট আগমন করিবার পূর্বে যখন লোকটির নিহত হওয়ার এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর রওয়ানা হওয়ার সংবাদ আমাদের নিকট পৌঁছিল তখন আমার পিতা ও তাহার সঙ্গীগণের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হইল এবং তাহারা ভীষণভাবে ভীত হইয়া পড়িল। আরবের শহরতলী ও বিভিন্ন অঞ্চল হইতে আসিয়া যাহারা আমাদের দলে যোগদান করিয়াছিল তাহারাও পৃথক হইয়া গেল। অতঃপর আমাদের নিজেদের দলের লোকজন ছাড়া আর একজন লোকও অবশিষ্ট রহিল না (কিতাবুল মাগাযী, ১খ., পৃ. ৪০৬)।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) মুরায়সী' নামক স্থানে পৌঁছিলেন। সেখানে অবতরণ করিয়া তাঁহার জন্য একটি চামড়ার তাঁবু নির্মাণ করা হইল। তাঁহার সঙ্গে উম্মুল মু'মিনীনদের মধ্যে হযরত 'আইশা ও উম্মু সালামা (রা) ছিলেন। তাহারা পানির নিকটই সমবেত হইলেন এবং যুদ্ধের জন্য সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার সৃঙ্গীদের লাইন সোজা করিয়া দিলেন। অতঃপর মুহাজিরদের পতাকা হযরত আবূ বাক্‌র সিদ্দীক (রা)-এর হাতে, মতান্তরে আম্মার ইবন ইয়াসির (রা)-এর হাতে অর্পণ করিলেন এবং আনসারদের পতাকা অর্পণ করিলেন হযরত সা'দ ইব্‌ন উবাদা (রা)-এর হাতে (ইন্ন কায়্যিম আল-জাওযিয়্যা, আল-মুনতাজাম, ৩খ., পৃ. ২১৯; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., ১৫)। সেই দিন মুসলমানদের বিশেষ সংকেত ছিল, "ইয়া মানসূর! আমিত, আমিত” “হে সাহায্যপ্রাপ্ত! মৃত্যুর দুয়ারে পৌঁছাইয়া দাও, মৃত্যুর দুয়ারে পৌঁছাইয়া দাও" (সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৪খ., পৃ. ৩৪৫)।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) উমার ইবনুল খাত্তাব (রা)-কে ঘোষণা দিতে নির্দেশ দিলেন : "তোমরা "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" বল, তাহা হইলে তোমরা তোমাদের জান-মালের হেফাজত করিতে পারিবে।” কিন্তু বানুল মুসতালিক ইহা বলিতে অস্বীকার করিল এবং প্রথমে তাহাদের মধ্য হইতে এক ব্যক্তি তীর নিক্ষেপ করিল। ইহার প্রতিউত্তরে মুসলমানগণও কিছুক্ষণ তীর নিক্ষেপ করিলেন। ফলে উভয় পক্ষে তীর নিক্ষেপ শুরু হইয়া গেল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) সাহাবায়ে কিরামকে আক্রমণ পরিচালনার নির্দেশ দিলেন। মুসলিম বাহিনী একযোগে আক্রমণ করিল। ফলে শত্রু সৈন্যদের একজনও পলায়ন করিতে পারিল না। বেশীক্ষণ যুদ্ধ করার প্রয়োজন হইল না, অল্পতেই শত্রুগণ কাবু হইয়া গেল। তাহাদের দশজন লোক নিহত হইল এবং সকলেই বন্দী হইল। নারী-পুরুষ, শিশু নির্বিশেষে সকলকেই রাসূলুল্লাহ (স)-এর নির্দেশে বন্দী করা হইল। উট, ঘোড়া ও বকরী গনীমতের সম্পদ হিসাবে গ্রহণ করা হইল। দুই হাজার উট ও পাঁচ হাজার বকরী মুসলমানগণ গনীমত হিসাবে লাভ করিলেন। বন্দী মহিলার সংখ্যা ছিল দুই শত। রাসূলুল্লাহ (স) আবূ নাদলা আত-তাঈকে এই যুদ্ধের বিজয় সংবাদ দিয়া মদীনায় প্রেরণ করেন (আল-মুনতাজাম, ৩খ., পৃ. ২১৯)। এই যুদ্ধে হযরত আলী (রা) বনী মুসতালিকের মালিক নামে এক ব্যক্তি ও তাহার পুত্রকে হত্যা করেন। আর আবদুর রহমান ইব্‌ন আওফ (রা) একজন অশ্বারোহীকে হত্যা করেন যাহার নাম ছিল আহসার, মতান্তরে উহায়সির (ইন্ন হিশাম, আস-সীরা, ৩খ., পৃ. ২৪০)।
এই যুদ্ধে আল্লাহ্ তা'আলা ফেরেশতা প্রেরণ করিয়া মুসলমানদিগকে সাহায্য করিয়াছিলেন যাহা দেখিয়া শত্রু সৈন্যগণ ঘাবড়াইয়া গিয়াছিল এবং সম্পূর্ণরূপে মনোবল হারাইয়া ফেলিয়াছিল। উম্মুল মুমিনীন হযরত জুওয়ায়রিয়া (রা) বলেন, আমরা মুরায়সী'তে অবস্থানকালে রাসূলুল্লাহ (স) সেখানে আগমন করিলে আমার পিতাকে আমি বলিতে শুনিলাম, "তিনি এমন শক্তি লইয়া আসিয়াছেন যাহার মোকাবিলা করা আমাদের সাধ্য নাই"।
অতঃপর আমি মুসলমানদের সেনা সদস্য ও ঘোড়া এত অধিক সংখ্যক দেখিলাম যাহা বর্ণনাতীত। অতঃপর আমি যখন ইসলাম গ্রহণ করিলাম আর রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে বিবাহ করিলেন এবং আমরা ফিরিয়া চলিলাম তখন আমি মুসলমানদের দিকে তাকাইয়া দেখিতেছিলাম; কিন্তু পূর্বে আমি যেরূপ দেখিয়াছিলাম সেরূপ কিছুই দেখিতে পাইলাম না। তখন আমি বুঝিতে পারিলাম যে, উহা ছিল মুশরিকদের অন্তরে আল্লাহ্র পক্ষ হইতে দেওয়া ভীতি (সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৪খ., পৃ. ৩৪৫)।
ফেরেশতা অবতরণের বিষয়টি আর একটি রিওয়ায়াত দ্বারা সুস্পষ্টরূপে প্রমাণিত হয়। মুশরিক বাহিনীরই এক ব্যক্তি, যিনি পরে ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিলেন এবং খাঁটি মুসলমানরূপে জীবন যাপন করিয়াছিলেন, তিনি বলিতেন, যুদ্ধের ময়দানে আমরা সাদা-কালো মিশ্রিত রংয়ের অশ্বপৃষ্ঠে আরোহণকারী সাদা পোশাক পরিহিত পুরুষ সৈন্যদেরকে দেখিয়াছিলাম, তাহাদিগকে আমরা পূর্বেও কখনও দেখি নাই, পরেও না (কিতাবুল মাগাযী, ১খ., ৪০৮-৪০৯; সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৪খ., পৃ. ৩৪৫)।
এই যুদ্ধে মুসলমানদের একজন সৈন্যও কাফিরদের হাতে শাহাদাত বরণ করে নাই। কেবল হিশাম ইব্‌ন সুবাবা, মতান্তরে হাশিম ইন্ন দুবাবা নামক একজন মুহাজির সাহাবী, কালব ইন্ন আওফ ইব্‌ন আমের গোত্রের লোক, ভুলক্রমে মুসলমানদের হাতে নিহত হন (তারীখুল উমাম ওয়াল মুলুক, ২খ., ৬০৪)। তিনি শত্রু সৈন্যের সন্ধানে বাহির হইয়াছিলেন। ফিরিবার সময় প্রচণ্ড বায়ু প্রবাহিত হইতেছিল এবং সেই সঙ্গে ধূলাবালু উড়িতেছিল। উবাদা ইবনুস সামিত (রা)-এর দলের আওস নামক একজন আনসার সাহাবী তাঁহাকে শত্রুসৈন্য মনে করিয়া হত্যা করেন (আল-ওয়াকিদী, প্রাগুক্ত, ১খ., ৪০৭-৪০৮)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হিশাম ইব্‌ন সুবাবার ভ্রাতা মিক্সাসের ধোঁকা ও তাহার পরিণাম

📄 হিশাম ইব্‌ন সুবাবার ভ্রাতা মিক্সাসের ধোঁকা ও তাহার পরিণাম


হিশাম ইব্‌ন সুবাবা (রা)-এর নিহত হওয়ার সংবাদ পাইয়া তাহার কাফির ভ্রাতা মিয়াস ইন্ন সুবাবা বাহ্যিকভাবে ইসলাম গ্রহণ করার কথা প্রকাশ করিয়া মক্কা হইতে আগমন করে এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট স্বীয় ভ্রাতার রক্তপণ (দিয়াত) দাবি করিয়া বলে, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি ইসলাম গ্রহণ করিয়া আপনার নিকট আগমন করিয়াছি। আমি আমার ভ্রাতার রক্তপণ দাবি করিতে আসিয়াছি, যে ভুলবশত নিহত হইয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে তাহার ভ্রাতার রক্ত পণ প্রদানের নির্দেশ দিলেন। উহা গ্রহণ করিয়া সে অল্প কয়েক দিন রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট অবস্থান করে। অতঃপর সুযোগ পাইয়া সে তাহার ভ্রাতার হত্যাকারীকে হত্যা এবং মুরতাদ্দ হইয়া পলায়ন করিয়া মক্কায় চলিয়া যায় (আত-তাবারী, তারীখ, ২খ., পৃ. ৬০৯)। এই বিশ্বাসঘাতকতা ও প্রতারণার কারণে রাসূলুল্লাহ (স) তাহার উপর ভীষণভাবে ক্ষুব্ধ হন। এইজন্যই পরবর্তী কালে মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ (স) চার ব্যক্তিকে যেখানেই পাওয়া যায় সেখানেই হত্যা করার নির্দেশ দেন। এমনকি তাহাদেরকে কা'বা শরীফের গিলাফ আঁকড়াইয়া ধরা অবস্থায় পাওয়া গেলেও। এই মিয়াস ইব্‌ন সুবাবা ছিল উক্ত চারজনের অন্তর্ভুক্ত (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., ১৬৭)। অতঃপর মক্কা বিজয়ের দিনই নুমায়লা (রা) তাহাকে হত্যা করেন (আল-ওয়াকিদী, প্রাগুক্ত, ১খ, ৪০৮; সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৪খ, ৩৪৫)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00