📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সারিয়‍্যা 'আলী ইব্‌ন আবী তালিব (রা)

📄 সারিয়‍্যা 'আলী ইব্‌ন আবী তালিব (রা)


হযরত আলী ইব্‌ন আবী তালিব (রা) কর্তৃক পরিচালিত এই অভিযানকে ঐতিহাসিকগণ হামদান, মাযিহজ ও নাখ'আ অভিযান নামে অভিহিত করিয়াছেন ('উয়ূনুল আছার, ২খ., পৃ. ৩৪১; মহানবী (স)-এর জীবনচরিত, পৃ. ৬৩৭)। ইয়ামানে হযরত আলী (রা)-এর অভিযান সংখ্যা দুইটি, মতান্তরে তিনটি (আর-রাওদুল উনুফ, ৭খ., পৃ. ৫০৫)। সীরাত গ্রন্থ ও হাদীছের কিতাবসমূহ পর্যালোচনা করিলে প্রতীয়মান হয় যে, আলী (রা) তিনবার ইয়ামানের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রেরিত হইয়াছিলেন:
(ক) হযরত খালিদ ইব্‌ন ওয়ালীদ (রা)-এর ইয়ামানে দাওয়াতী অভিযান ব্যর্থ হইলে রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার স্থলাভিষিক্ত করিয়া হযরত আলী (রা)-কে প্রেরণ করেন, মতান্তরে মালে গনীমতের পঞ্চমাংশ সংগ্রহের জন্য প্রেরণ করেন।
(খ) ইয়ামানের মাযিহজ অঞ্চলে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছাইবার জন্য আলী (রা) তিন শত অশ্বারোহীসহ তথায় প্রেরিত হইয়াছিলেন।
(গ) একাদশ হিজরীর ১৫ মুহাররম সর্বশেষ প্রতিনিধি নাখ'আ প্রতিনিধি দল রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে আসিয়াছিল যাহারা হযরত আলী (রা)-এর অভিযানে পরাজিত হইয়াছিল এবং আত্মসমর্পণ করিয়া ইসলামের দাওয়াত কবুল করিয়াছিল। তাহাদিগকে দীন ইসলাম শিক্ষা দেওয়ার জন্য হযরত আলী (রা)-এর স্থলে হযরত মু'আয ইব্‌ন জাবাল (রা)-কে নিয়োজিত করা হয়। অতঃপর হযরত মু'আয (রা)-এর মাধ্যমে সর্বশেষ প্রতিনিধি দল হিসাবে তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে আসিয়াছিল। তাহারা ছিল ইয়ামানের নাখ'আ সম্প্রদায় (ফাতহুল বারী, ৮খ., পৃ. ৮২; কিতাবুল মাগাযী, ৩খ., পৃ. ১০৭৯; হায়কাল, মহানবীর জীবন চরিত, ৬৩৭-৬৩৮; যাদুল মা'আদ, ৩খ., পৃ. ৩৫; আস-সীরাতুল হালাবিয়্যা, ৩খ., পৃ. ২৩০)।
রাসূলুল্লাহ (স) ইয়ামানে হযরত আলী (রা)-এর নেতৃত্বে ইসলামের দাওয়াত অভিযান প্রেরণ করিয়াছিলেন বিভিন্ন কারণে; যেমন:
ক) ইয়ামানের অধিবাসিগণ ছিল আহলে কিতাব তথা ইয়াহুদী ও খৃস্ট ধর্মাবলম্বী এবং হযরত ইসমা'ঈল (আ)-এর বংশধর; (খ) রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট নবম হিজরীতে হিময়ার বংশীয় শাসকগণের পক্ষ হইতে আত্মসমর্পণ পূর্বক ইসলাম কবুল করার নিমিত্ত কিছু সংখ্যক দূতের আগমন; (গ) ইয়ামানের আশ'আরী প্রতিনিধিদলের আগমন। তাহা ছাড়া ইয়ামান ছিল পারস্য উপসাগর, লোহিত সাগর ও ভারত মহাসাগরের মধ্যবর্তী সুপ্রসিদ্ধ বাণিজ্য কেন্দ্র (তারীখ ইব্‌ন খালদুন, ২খ., পৃ. ৫২; সুফারাউন নবী (স), ১খ., পৃ. ২০০; মহানবী (স)-এর জীবনচরিত, পৃ. ৯০; ইবন সা'দ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, ১খ., পৃ. ১৬৪,১৬৮; ইবনুল কায়্যিম আল-জাওযিয়্যা, যাদুল মা'আদ, ৩খ., পৃ. ৫৪১, ৫৪৪)। রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেনঃ অচিরেই ইয়ামানীগণ মেঘমালার মত (ইসলাম কবুল করিয়া) তোমাদিগের সহিত মিলিত হইবে। তাহারা পৃথিবীর সর্বোত্তম বাসিন্দা (আর রাওদুল উনুফ, ৭খ., পৃ. ১২৫)। উপরোল্লিখিত কারণে ইয়ামানীগণ দীন ইসলামের দাওয়াত প্রাপ্তির দিক হইতে অন্যান্য এলাকা হইতে ছিল অগ্রগণ্য। রাসূলুল্লাহ (স) হযরত আলী (রা)-কে সেনাপতি করিয়া দীন ইসলামের দাওয়াতী অভিযানে ইয়ামানের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রেরণ করেন।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মাযিহজ অভিযান

📄 মাযিহজ অভিযান


দশম হিজরীর রমযান মাসে রাসূলুল্লাহ (স) হযরত আলী (রা)-কে কুবায় মুসলিম সৈন্যশিবির স্থাপন করিতে নির্দেশ দিলেন। অতঃপর নির্দেশমত ৩০০ জন অশ্বারোহীর সমাবেশ করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) মুসলিম বাহিনীর জন্য পতাকা ও হযরত আলী (রা)-এর মাথায় পাগড়ী নিজ হাতে বাঁধিয়া দিলেন। অতঃপর অভিযানে রওয়ানা হইবার পূর্ব মুহূতে রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে লক্ষ্য করিয়া নিম্নোক্ত নসীহত করিলেন:
امض ولا تلتفت فقال على يارسول الله ﷺ كيف أصنع قال اذا نزلت بساحتهم فلا تقاتلهم حتى يقاتلوك فإن قاتلوك فلا تقاتلهم حتى يقتلوا منكم قتيلا فإن قتلوا منكم قتيلا فلا تقاتلهم تلومهم ترهم أناة ثم تقول لهم هل لكم أن تقولوا لا إله إلا الله فإن قالوا نعم فقل هل لكم أن تصلوا فإن قالوا نعم فقل هل لكم أن تخرجوا من اموالكم صدقة تردونها على فقرائكم فإن قالوا نعم فلا تبغ منهم غير ذلك والله لأن يهدى الله على يدك رجلا واحدا خير لك مما طلعت عليه الشمس أو غربت.
"হে আলী! সোজাসুজি নির্ধারিত গন্তব্যে চলিবে, ডানে-বামে লক্ষ্য করিবে না। আলী (রা) বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! যুদ্ধ এড়াইয়া কীভাবে দীনের দাওয়াত পেশ করিব? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, দাওয়াতী এলাকায় পৌঁছিয়া দাওয়াত ব্যতীত প্রথমেই যুদ্ধে জড়াইয়া পড়িবে না যতক্ষণ পর্যন্ত দাওয়াতপ্রাপ্ত ব্যক্তিগণ তোমাদিগকে আক্রমণ না করিবে। এমনকি তাহারা তোমাদিগকে আক্রমণ করিলেও তোমরা তাহাদিগকে আক্রমণ করিবে না, বরং ধৈর্য ধারণ করিবে যতক্ষণ না তোমাদিগের মধ্য হইতে কেহ শাহাদাত বরণ করে। যদি তোমাদের মধ্য হইতে কেহ শাহাদাত বরণ করে তবুও ধৈর্য সহকারে তাহাদিগকে ইসলাম কবুল করিবার জন্য পুনরায় উদাত্ত আহবান করিবে। আর তাহাদিগকে লক্ষ্য করিয়া ঘোষণা করিবেঃ তোমরা কি স্বীকার করিবে 'লাইলাহা ইল্লাল্লাহ'? প্রত্যুত্তরে তাহারা যদি বলে, হাঁ, তবে পুনরায় ঘোষণা করিবেঃ তোমরা কি নামায আদায় করিবে? প্রত্যুত্তরে তাহারা যদি হাঁ বলে; অতঃপর পুনরায় ঘোষণা করিবেঃ তোমরা কি তোমাদের সম্পদ হইতে দরিদ্রদের মাঝে বণ্টনের জন্য যাকাত প্রদান করিবে? প্রত্যুত্তরে তাহারা যদি বলে হাঁ, হে আলী! তাহাদের নিকট ইহা ছাড়া অন্য কিছু প্রত্যাশা করিবে না। আল্লাহ তোমার দ্বারা যদি একটি লোককে ও হিদায়াত দান করেন তবে যতদূর সূর্যের পরিধি বিস্তৃত উহার চাইতে তাহা তোমার জন্য অধিক উত্তম" (কিতাবুল মাগাযী, ৩খ., পৃ. ১০৭৯)।
অপর বর্ণনায় রহিয়াছে, হযরত আলী (রা) স্বীয় দুর্বলতা প্রকাশ করিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আরয করিলেন: يا رسول الله تبعثنى الى قوم أسن منى وأنا حديث السن لا أبصر القضاء قال فوضع يده على صدرى وقال اللهم ثبت لسانه واهد قلبه وقال يا على إذا جلس اليك الخصمان فلا تقض بينهما حتى تسمع من الأخر.
"ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমাকে এমন সম্প্রদায়ের নিকট প্রেরণ করিতেছেন যাহারা আমার চেয়ে বয়সে প্রবীণ আর আমি তাহাদিগের তুলনায় নবীন। আমি এই ব্যাপারে সমাধানের কোন উপায় দেখিতেছি না। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার হাত আমার বুকে রাখিলেন এবং দু'আ করিলেনঃ 'হে আল্লাহ! আলীর যবানকে মযবুত করিয়া দাও এবং তাহার কলবকে হিদায়াতে পরিপূর্ণ করিয়া দাও”। রাসূলুল্লাহ (স) আরও বলিলেনঃ হে আলী! যখন কোন বিবদমান দুই ব্যক্তির মাঝে আপোষ করিতে যাইবে তখন উভয়ের কথা ভালো করিয়া না শুনিয়া কোন একজনের বক্তব্যের ভিত্তিতে ফায়সালা প্রদান করিবে না" (ফাতহুল বারী, ৮খ., পৃ. ৮২)।
আলী (রা) মাযহিজে পৌছিয়া মুবাল্লিগদিগকে চতুর্দিকে পাঠাইয়া দিলেন। ইতোমধ্যে আলী (রা)-এর নিকট মালে গণীমত হিসাবে স্বাধীন নারী, দাসী, শিশু, গবাদি পশু এবং অন্যান্য বস্তুসামগ্রী জমা হইল। আলী (রা) বুরায়দা ইবনুল হুসায়ব (রা)-কে মালে গনীমত সংরক্ষণের দায়িত্ব অর্পণ করিলেন।
অতঃপর আলী (রা) মাযহিজ অধিবাসীদিগকে ইসলাম গ্রহণ করার দাওয়াত দিলেন। তাহারা দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করিল এবং মুসলিম মুবাল্লিগদের উপর পাথর ও তীর নিক্ষেপ করিল। আলী (রা) মুসলিম বাহিনীর পতাকা মাসউদ ইব্‌ন সিনান আস-সুলামী (রা)-এর নিকট অর্পণ করিলেন। তিনি পতাকা লইয়া সম্মুখ সমরে অগ্রসর হইলেন। ইতোমধ্যে মাযহিজ সম্প্রদায়ের জনৈক ব্যক্তি মুসলিম বাহিনীকে সম্মুখ যুদ্ধে আসিবার আহ্বান করিল। তৎক্ষণাৎ মুসলিম বাহিনীর মধ্য হইতে হযরত আসওয়াদ ইবন আল-খুযাঈ আস-সুলামী (রা) মাহিজ সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তির মুখামুখি হইলেন এবং তাহাকে হত্যা করিয়া তাহার সমরাস্ত্র ছিনাইয়া লইলেন। অন্যদিকে হযরত আলী (রা) মাযহিজ সম্প্রদায়ের উপর অতর্কিত চতুর্মুখী হামলা চালাইয়া ২০ জনকে হত্যা করিলেন। তৎক্ষণাত তাহারা ছিন্ন-বিছিন্ন হইয়া পরাজিত হইল এবং পতাকা ফেলিয়া দিল। আলী (রা) এই সুযোগে তাহাদিগকে, পুনরায় ইসলামের দাওয়াত দিলেন। মাযহিজ গোত্রের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ দাওয়াত কবুল করিয়া ঘোষণা করিল, আমরা দাওয়াত কবুল করিয়াছি। অতএব আমাদের সম্প্রদায়ের যাহারা এখনও ইসলাম কবুল করেন নাই তাহারাও বর্তমানে আমাদের শত্রু। আর এই সমস্ত মাল আমাদের সম্পদের সাঙ্কা। ইহা হইতে আল্লাহ্ নির্ধারিত অংশ গ্রহণ করুন (কিতাবুল মাগাযী, ৩খ., পৃ. ১০৭৯-১০৮০)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00