📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সারিয়‍্যা কুতবা ইবন 'আমের

📄 সারিয়‍্যা কুতবা ইবন 'আমের


নবম হিজরীর সফর মাসে/ ৬৩০ খৃ. রাসূলুল্লাহ (স) হযরত কুত্বা ইবন 'আমের (রা)-এর নেতৃত্বে একটি সারিয়‍্যা খাছ'আম গোত্রের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন। সৈন্যসংখ্যা বিশজন, বাহন হিসাবে দশটি উট অর্থাৎ প্রতি দুইজন সৈন্যের জন্য একটি উট (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ৩১১)।

খাছ'আম গোত্রের আবাদী ছিল তিহামা (تهامة) মরু অঞ্চলের তাবালাহ (تباله)-এর নিকটবর্তী একটি এলাকা, ইয়ামানে যাওয়ার পথে অবস্থিত (মুহাম্মাদ রাসূলুল্লাহ, পৃ. ৩৩৪)। তবে ইবন সায়্যিদিন নাসের বর্ণনামতে ইহা তুরাবাহ (ترابه) অঞ্চলের নিকট বীশা (بيشة) এলাকায় অবস্থিত ছিল ('উযূনুল আছার, ২খ., পৃ. ২০৬)।

কুতবা ইন্ন 'আমের (রা) শত্রু এলাকায় পৌঁছিয়া স্থানীয় এক ব্যক্তিকে আটক করিয়া তাহার কাছে খাছ'আমের অবস্থান জানিতে চাহিলেন। কিন্তু লোকটি 'মুক' সাজিয়া গেল, কোন কথাই বলিল না। কিন্তু পরক্ষণেই লোকটি সময়-সুযোগ বুঝিয়া চিৎকার করিয়া কওমের লোকদেরকে ডাকিয়া মুসলমানদের আগমন সম্বন্ধে সতর্ক করিতে লাগিল। মুসলমানগণ তাহার এই প্রতারণার দরুন তাহাকে হত্যা করে। অতঃপর কুতবা (রা) বাহিনীসহ সেখানেই অবস্থান করিলেন (সীরাতে মুস্তাফা, ৩খ., পৃ. ৮০)।

রাত্রিবেলা কতুবা (রা) খাছ'আমীদের উপর হামলা করিলেন। প্রচণ্ড লড়াই হইল। উভয় পক্ষের বহু সৈন্য হতাহত হইল। পরিশেষে মুসলমানদের বিজয় হইল। তাহারা খাছ'আমের বহু নারী-পুরুষ ও গবাদী পশু আটক করিয়া মদীনায় লইয়া আসিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) গনীমত হইতে খুমুস্ পরিশোধের পর অবশিষ্ট গনীমত মুজাহিদদের মাঝে বন্টন করিয়া দিলেন। প্রত্যেক মুজাহিদ চার-চারটি করিয়া উট ভাগে পাইলেন। গনীমত বণ্টনের সময় দশটি ছাগল একটি উটের সমমান নির্ধারিত হয় (সীরাতে মুস্তাফা, ৩খ., পৃ. ৮০)।

অধিকাংশ সীরাতবিদ লিখিয়াছেন যে, এই যুদ্ধে সেনাপতি হযরত কুতবা ইবন 'আমের (রা) রণাঙ্গনে শত্রুর হাতে শাহাদাত বরণ করেন। কিন্তু ইবন হাজার ইব্‌ন হাতিমের সূত্রে লিখিয়াছেন যে, কুতবা (রা) রাসূলের ওফাতের পরও দীর্ঘকাল জীবিত ছিলেন এবং উমার (রা)-এর খেলাফতকালে ইন্তিকাল করেন। ইবন হিব্বানের বর্ণনামতে তিনি হযরত উছমান (রা)-এর খেলাফত কালে ইনতিকাল করেন (আসাহহুস সিয়ার, টীকা ২, পৃ. ৩১১)।

আল্লামা ইবনুল কায়্যিম (রা) যাদুল মা'আদ (২খ., পৃ. ২০৩)-এ লিখিয়াছেন, এই যুদ্ধের ঘটনায় এই কাহিনীও বর্ণিত আছে যে, মুসলমান সৈন্যগণ যখন খাছ'আমীদের আটককৃত নারী ও গবাদী পশু লইয়া মদীনা অভিমুখে ফিরিতেছিল, তখন কতিপয় খাছ'আমী যোদ্ধা তাহাদের পশ্চাদ্ধাবনের চেষ্টা করে। তখন অলৌকিকভাবে এক সয়লাব তাহাদের ও মুসলমানদের মাঝে বাধা হইয়া দাঁড়ায়। খাছ'আমীগণ এই পানির স্রোত অতিক্রম করিতে না পারিয়া অপর প্রান্তেই দাঁড়াইয়া রহিল এবং শুধু তাকাইয়া দেখিল, মুসলমানগণ তাহাদের নারী ও গবাদী পশু সম্পদগুলি নির্বিঘ্নে মদীনার দিকে হাঁকাইয়া লইয়া যাইতেছে।

টিকাঃ
(১) ইবনুল কায়্যিম আল-জাওযিয়্যা, যাদুল মা'আদ, দারুল মা'রিফা, বৈরূত তা. বি., ২খ., পৃ. ২০৩; (২) ইব্ন সায়্যিদিন নাস, 'উয়ূনুল আছার, দারুল মা'রিফা, বৈরূত তা. বি., ২খ., পৃ. ২০৬; (৩) মুহাম্মাদ রিদা, মুহাম্মাদ রাসূলুল্লাহ (স), দারুল কুতুবিল 'ইলমিয়্যা, বৈরূত ১৯৭৫ খৃ., পৃ. ৩৩৪ (৪) ইদরীস কান্ধলাবী, সীরাতুল মুস্তাফা, রব্বানী বুক ডিপো, দিল্লী ১৯৮২, ২খ., পৃ. ২৪১; (৫) আবদুর রউফ দানাপুরী, আসাহহুস সিয়ার, মাকতাবায়ে থানবী, দেওবন্দ, পৃ. ৩১১।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সারিয়‍্যা দাহ্হাক ইন্ন সুফ্যান

📄 সারিয়‍্যা দাহ্হাক ইন্ন সুফ্যান


নবম হিজরীর রবীউল আওয়াল মাসে নাজদের সন্নিহিত এলাকায় অবস্থিত কিলাব গোত্রের জনগণকে ইসলামের দাওয়াত প্রদান ও তাহাদের নিকট হইতে যাকাত সংগ্রহের উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ (স) একটি সেনা অভিযান প্রেরণ করেন। কিলাব গোত্রের অকুতোভয় বীর সেনানী হযরত দাহ্হাক ইব্‌ন সুফয়ান ইব্‌ন আওফ কিলাবীর উপর এই অভিযানের নেতৃত্ব অর্পিত হয়। আসাদ ইব্‌ন সালামা নামক এক সাহাবী তাঁহার সহযোদ্ধা ছিলেন। কিলাব গোত্রের জনগণ ইসলাম গ্রহণে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করে এবং নানা তীর্যক মন্তব্য করিয়া মুসলমানদের অপমানিত করে। ফলে সংঘর্ষ অনিবার্য হইয়া উঠে। যুজ্ (رع) নামক এলাকায় যুদ্ধ সংঘটিত হয়। মুসলিম সেনাবাহিনীর তীব্র প্রতিরোধ ও প্রচণ্ড আক্রমণের মুখে কিলাব গোত্রের অমুসলিম সদস্যগণ যুদ্ধক্ষেত্র হইতে পালাইয়া যায়। যুদ্ধের ময়দানে রুখ নামক একটি কূপ ছিল। লড়াই চলাকালীন সেই কূপের নিকটেই উসায়দ (اسید) ইব্‌ন সালামা তাঁহার পিতা সালামার দেখা পান। সালামা তখন ঘোড়ার উপর সওয়ার ছিলেন। উসায়দ তাঁহার পিতা সালামাকে ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দিয়া নিরাপত্তার আশ্বাস দিলেন। কিন্তু ইসলাম গ্রহণ তো দূরের কথা, সালামা উল্টা তাঁহার ছেলে উসায়দ ও তাঁহার দীনের বিরূপ সমালোচনা করিতে থাকে। তীব্র উত্তেজনায় উসায়দ শাণিত তরবারি দিয়া পিতার ঘোড়ার পায়ে আঘাত করিলে ঘোড়াটি মাটিতে লুটাইয়া পড়ে এবং সালামা রুখ (ع) নামক কূপে পতিত হয়। ঠিক সেই মুহূর্তে একজন মুসলিম যোদ্ধা আগাইয়া আসিয়া তরবারির আঘাতে সালামাকে হত্যা করিলেন। উসায়দ (রা) নিজ হস্তে পিতাকে হত্যা করেন নাই। যুদ্ধশেষে হযরত দাহ্হাক ইব্‌ন সুফ্য়ান (রা) বিপুল সংখ্যক যুদ্ধলব্ধ দ্রব্যসামগ্রী (গনীমত) লইয়া মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন (যাদুল মা'আদ, ২খ., পৃ. ২০৩; তাহযীবুত তাহযীব, ৪খ., পৃ. ৪৪৪; 'উয়ূনুল আছার, ২খ., পৃ. ২৩৯; মুখতাসারু সীরাতির রাসূল, পৃ. ৫০১; সীরাতুল মুসতাফা, ২খ, পৃ. ২৪০; আত-তাবাকাতুল কুবরা, ২খ., পৃ. ১১৭; আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ৩১১-১২)।

রাসূলুল্লাহ (স) দাহ্হাক ইব্‌ন সুফ্য়ান (রা)-এর নেতৃত্বে অভিযান প্রেরণের সময় কিলাব গোত্রের নিকট ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত সম্বলিত একটি পত্র লিখিয়াছিলেন। কিন্তু গোত্রের লোকেরা ইসলাম গ্রহণ তো দূরের কথা, পত্রটি পানিতে ধৌত করিয়া পানি ভর্তি বালতির তলায় চুবাইয়া রাখে। এই সংবাদ রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট পৌঁছিলে তিনি মন্তব্য করেন: তাহাদের কি হইল, আল্লাহ তা'আলা কি তাহাদের জ্ঞান-বুদ্ধি বিলুপ্ত করিয়া দিয়াছেন! রাসূলুল্লাহ (স)-এর মন্তব্যের পর কিলাব গোত্রের একটি লোকের মস্তিষ্কও সুস্থ রহিল না। সকলেই অপ্রকৃতস্থ হইয়া পড়ে। এমনকি অনেকের বাকশক্তি রহিত হইয়া যায়, বোবার মত আচরণ করিতে থাকে। কেহ তাহাদের কথা বুঝিতে সক্ষম হইত না (সীরাতু হালাবিয়া, ৬খ., পৃ. ১০১)।

সামসাময়িক কালের প্রখ্যাত আরব কবি 'আব্বাস ইবন মিরদাস আস-সুলামী সারিয়্যা দাহ্হাক ইবন সুফ্য়ানের উপর মন্তব্য করিয়া বলেনঃ

ان الذين وفوا بما عاهدتهم + جيش بعثت عليهم الضحاكا امرته ضرب النسان كانه + لما تكشفنه العدو براكا طورا يعانق باليدين وتارة + يفرى الجماجم حازما مناكا.

“নিশ্চয় যাহারা আপনার সহিত কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করিয়াছে তাহারা তো সেই বাহিনী যাহাদের নেতৃত্বের ভার দিয়া পাঠাইয়াছিলেন দাহ্হাককে।

যাহাকে আপনি আমীর বানাইয়াছেন তিনি সুদক্ষ সমরকুশলী; শত্রু যখন তাঁহাকে বাধ্য করে তখন যেন তিনি প্রত্যাবর্তন করেন।

কখনও তিনি দুই হাত দিয়া আলিঙ্গন করেন, আর কখনও প্রচণ্ড নিশ্চিত আঘাতে কর্তন করিয়া দেন মস্তকসমূহ” (ইবনুল আছীর, উসদুল গাবা, ৩খ., পৃ. ৭৫)।

হযরত দাহ্হাক ইবন সুফ্য়ান ইব্ন ‘আওফ আল-আমেরী আল-কিলাবী ছিলেন রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রিয় সাহাবী ও দেহরক্ষী। তাঁহার গোত্রের যাহারা ইসলাম কবুল করিয়াছিল তিনি তাহাকে তাহাদের প্রশাসক নিয়োগ করেন।

টিকাঃ
(১) ইব্‌ন কায়্যিম আল-জাওযী, যাদুল মা‘আদ, দারুল কুতুবিল আরাবী, বৈরুত, তা. বি., ২খ., পৃ. ২০০; (২) ইব্‌ন হাজার আল-‘আসকালানী, তাহযীবুত তাহযীব, আল-মাকতাবাতুত তাওফীক্বীয়্যাহ, ১‍১ম সং, লাহোর ১৩২৫ হি, ৪খ., পৃ. ৮৪৪; (৩) আবদুল্লাহ ইব্‌ন শায়েখ মুহাম্মাদ ইব্‌ন আবদুল ওয়াহ্হাব, মুখতাসারু সীরাতির রাসূল, মাকতাবাতুদ্দ দারিস সালাম, ১‍ম সং, রিয়াদ ১৪১৪/১৯৯৪ খৃ.; পৃ. ৫০১; (৪) ইদরীস কান্দলাবী, সীরাতুল মুস্তফা, রব্বানী বুক ডিপো, দিল্লী ১৯৯৫ খৃ., ২খ., পৃ. ২৪০; (৫) আবুল বারাকাত আবদুর রউফ দানাপুরী, আসাহ্হুস সিয়ার, দারুল ইশা‘আত, কলিকাতা ১৩৫১/১৯৩২, পৃ. ৩১১-১২; (৬) ইব্‌ন সাইয়্যিদিন্নাস, ‘উয়ূনুল আছার ফী ফুনূনিল মাগাযী ওয়াশ-শামাইল ওয়াস-সিয়ার, মুআসসাসাতু ইয্‌য়্যিদ্দীন, বৈরুত, ১‍ম সং ১৪০৬/১৯৮৬, ২খ., পৃ. ২০৯; (৭) ইবনুল আছীর, উসদুল গাবা, দার ইহইয়াউত তুরাছিল আরাবী, বৈরুত, তা. বি., ৩খ., পৃ. ৭৪; (৮) ইব্‌ন আবদিল বার্‌র, আল-ইসতী‘আব, দারুল জাবাল, ১‍ম সং, বৈরুত ১৪১৩/১৯৯০, ২খ., পৃ. ৭৪২; (৯) আশিক ইলাহী মিরাঠী, তারিখ-ই ইসলাম, দারুল কিতাব, দেওবন্দ ১৩০০ হি, ৪খ., পৃ. ৩৪৩; (১০) ড. রউফ ইকবাল, আহদে নববীকে গাযওয়া ওয়া সারাঈয়া, ইসলামিক পাবলিকেশন্স লিমিটেড, ১ সং, লাহোর ১৯৮৪ খৃ., পৃ. ২০৫; (১১) আলী ইব্‌ন বুরহানউদ্দীন হালাবী, সীরাতু আল-হালাবিয়্যা, কুতুবখানা কাসেমী, দেওবন্দ ১৩৮৮/১৯৬৯, ৬খ., পৃ. ১০১।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সারিয়‍্যা 'আলকামা ইন্ন মুজাযযি আল-মুদলিজী

📄 সারিয়‍্যা 'আলকামা ইন্ন মুজাযযি আল-মুদলিজী


৮ম হিজরী রাবীউল আখির মাস। আবিসিনিয়ার সমুদ্রতীরে জুদ্দা নামক একটি বসতি ছিল। মদীনায় একটি সংবাদ পৌছিল যে, জুদ্দার একদল আক্রমণকারী নৌকাযোগে জিদ্দায় অবতরণ করিতেছে। আক্রমণ প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে তিন শত মুজাহিদের একটি বাহিনী হযরত 'আলকামা ইব্‌ন মুজাযযিীযের অধিনায়কত্বে প্রেরিত হইল। মুজাহিদ বাহিনী সমুদ্রবক্ষে একটি দ্বীপে অবতরণ করিল। সংবাদ পাইয়া শত্রুদল পলায়ন করিল আর মুজাহিদ বাহিনীও মদীনার পথে রওয়ানা হইল। পথে এক স্থানে তাহারা শিবির স্থাপন করিল। অধিনায়ক বাহিনীকে অগ্নি প্রজ্জ্বলনের আদেশ দিলেন। দাউ দাউ করিয়া অগ্নি প্রজ্জ্বলিত হইলে অধিনায়ক 'আলকামা সৈন্যদিগকে আদেশ করিলেন, "তোমাদের মধ্যে কে আছে এই অগ্নিতে ঝাঁপ দিতে পারে"? কতিপয় সৈনিক কাপড়-চোপড় সামলাইয়া অগ্নিতে ঝাঁপ দিতে উদ্যত হইলে তিনি বলিলেন, ক্ষান্ত হও। আমি তোমাদিগকে উপহাসচ্ছলে এইরূপ আদেশ করিয়াছি। অতঃপর বাহিনী মদীনায় প্রত্যাবর্তন করিল। মহানবী (স)-এর খেদমতে ঘটনাটি বর্ণনা করা হইলে তিনি বলিলেন, "যদি তোমরা উহাতে প্রবেশ করিতে তবে কখনও আর তাহা হইতে বাহির হইতে পারিতে না"। অতঃপর তিনি বলিলেন, "আল্লাহর নাফরমানীমূলক কাজে কখনও নেতার আদেশের অনুসরণ করিতে নাই"। অপর এক বর্ণনায় আসিয়াছে, "নেতাদের কেহ যদি তোমাদিগকে আল্লাহ বিরোধী কাজের আদেশ দেন তাহা হইলে তোমরা তাহার আদেশ পালন করিও না” (ইব্‌ন হিশাম, সীরাতুন নবী, ২খ., পৃ. ৮৭৫; ইব্‌ন সা'দ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, ২খ., পৃ. ১৬৩; ইব্‌ন সায়ি‍্যদিন নাস, উয়ূনুল আছার, ২খ., পৃ. ২৫৭)।

টিকাঃ
(১) ইব্‌ন হিশাম, সীরাতুন নবী, ইতেকাদ পাবলিশিং হাউস, সুইওয়ালান, দিল্লী, আগস্ট ১৯৮২; (২) ইব্‌ন সা'দ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, দারু সাদের, বৈরূত; (৩) ইব্‌ সায়্যিদিন নাস, উয়ূনুল আছার, দারুল কালাম, বৈরূত ১৯৯৩ খৃ।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সারিয়‍্যা 'আলী ইব্‌ন আবী তালিব (রা)

📄 সারিয়‍্যা 'আলী ইব্‌ন আবী তালিব (রা)


হযরত আলী ইব্‌ন আবী তালিব (রা) কর্তৃক পরিচালিত এই অভিযানকে ঐতিহাসিকগণ হামদান, মাযিহজ ও নাখ'আ অভিযান নামে অভিহিত করিয়াছেন ('উয়ূনুল আছার, ২খ., পৃ. ৩৪১; মহানবী (স)-এর জীবনচরিত, পৃ. ৬৩৭)। ইয়ামানে হযরত আলী (রা)-এর অভিযান সংখ্যা দুইটি, মতান্তরে তিনটি (আর-রাওদুল উনুফ, ৭খ., পৃ. ৫০৫)। সীরাত গ্রন্থ ও হাদীছের কিতাবসমূহ পর্যালোচনা করিলে প্রতীয়মান হয় যে, আলী (রা) তিনবার ইয়ামানের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রেরিত হইয়াছিলেন:
(ক) হযরত খালিদ ইব্‌ন ওয়ালীদ (রা)-এর ইয়ামানে দাওয়াতী অভিযান ব্যর্থ হইলে রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার স্থলাভিষিক্ত করিয়া হযরত আলী (রা)-কে প্রেরণ করেন, মতান্তরে মালে গনীমতের পঞ্চমাংশ সংগ্রহের জন্য প্রেরণ করেন।
(খ) ইয়ামানের মাযিহজ অঞ্চলে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছাইবার জন্য আলী (রা) তিন শত অশ্বারোহীসহ তথায় প্রেরিত হইয়াছিলেন।
(গ) একাদশ হিজরীর ১৫ মুহাররম সর্বশেষ প্রতিনিধি নাখ'আ প্রতিনিধি দল রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে আসিয়াছিল যাহারা হযরত আলী (রা)-এর অভিযানে পরাজিত হইয়াছিল এবং আত্মসমর্পণ করিয়া ইসলামের দাওয়াত কবুল করিয়াছিল। তাহাদিগকে দীন ইসলাম শিক্ষা দেওয়ার জন্য হযরত আলী (রা)-এর স্থলে হযরত মু'আয ইব্‌ন জাবাল (রা)-কে নিয়োজিত করা হয়। অতঃপর হযরত মু'আয (রা)-এর মাধ্যমে সর্বশেষ প্রতিনিধি দল হিসাবে তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে আসিয়াছিল। তাহারা ছিল ইয়ামানের নাখ'আ সম্প্রদায় (ফাতহুল বারী, ৮খ., পৃ. ৮২; কিতাবুল মাগাযী, ৩খ., পৃ. ১০৭৯; হায়কাল, মহানবীর জীবন চরিত, ৬৩৭-৬৩৮; যাদুল মা'আদ, ৩খ., পৃ. ৩৫; আস-সীরাতুল হালাবিয়্যা, ৩খ., পৃ. ২৩০)।
রাসূলুল্লাহ (স) ইয়ামানে হযরত আলী (রা)-এর নেতৃত্বে ইসলামের দাওয়াত অভিযান প্রেরণ করিয়াছিলেন বিভিন্ন কারণে; যেমন:
ক) ইয়ামানের অধিবাসিগণ ছিল আহলে কিতাব তথা ইয়াহুদী ও খৃস্ট ধর্মাবলম্বী এবং হযরত ইসমা'ঈল (আ)-এর বংশধর; (খ) রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট নবম হিজরীতে হিময়ার বংশীয় শাসকগণের পক্ষ হইতে আত্মসমর্পণ পূর্বক ইসলাম কবুল করার নিমিত্ত কিছু সংখ্যক দূতের আগমন; (গ) ইয়ামানের আশ'আরী প্রতিনিধিদলের আগমন। তাহা ছাড়া ইয়ামান ছিল পারস্য উপসাগর, লোহিত সাগর ও ভারত মহাসাগরের মধ্যবর্তী সুপ্রসিদ্ধ বাণিজ্য কেন্দ্র (তারীখ ইব্‌ন খালদুন, ২খ., পৃ. ৫২; সুফারাউন নবী (স), ১খ., পৃ. ২০০; মহানবী (স)-এর জীবনচরিত, পৃ. ৯০; ইবন সা'দ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, ১খ., পৃ. ১৬৪,১৬৮; ইবনুল কায়্যিম আল-জাওযিয়্যা, যাদুল মা'আদ, ৩খ., পৃ. ৫৪১, ৫৪৪)। রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেনঃ অচিরেই ইয়ামানীগণ মেঘমালার মত (ইসলাম কবুল করিয়া) তোমাদিগের সহিত মিলিত হইবে। তাহারা পৃথিবীর সর্বোত্তম বাসিন্দা (আর রাওদুল উনুফ, ৭খ., পৃ. ১২৫)। উপরোল্লিখিত কারণে ইয়ামানীগণ দীন ইসলামের দাওয়াত প্রাপ্তির দিক হইতে অন্যান্য এলাকা হইতে ছিল অগ্রগণ্য। রাসূলুল্লাহ (স) হযরত আলী (রা)-কে সেনাপতি করিয়া দীন ইসলামের দাওয়াতী অভিযানে ইয়ামানের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রেরণ করেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00