📄 সারিয়্যা খালিদ ইব্দুল ওয়ালীদ (বানু জাযীমা অভিযান)
মক্কা বিজয়ের পর রাসূলুল্লাহ (স) ইহার বিভিন্ন অংশের নিরাপত্তা ও শান্তি প্রতিষ্ঠাকল্পে এবং ইসলামের প্রচার ও প্রসারের উদ্দেশ্যে বিশিষ্ট সাহাবীগণের নেতৃত্বে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দল প্রেরণ করেন। এই সময় হযরত খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ (রা)-এর নেতৃত্বে সাড়ে তিন শত সাহাবীকে জাযীমা গোত্রের এলাকায় প্রেরণ করেন। এই অভিযানকে সারিয়্যা গুমায়সাও বলা হয় (মুফতী মুহাম্মাদ শফী, সীরাতে খাতিমুল আম্বিয়া, পৃ. ৭৩)। হযরত খালিদ (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর নির্দেশমত তাহাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন। তাহারা আগেই ইসলাম কবুল করিয়াছিল, কিন্তু তাহা সঠিকভাবে প্রকাশ করিতে ব্যর্থ হয়। তাহারা সাহাবীগণকে দেখামাত্র চীৎকার করিয়া বলিতে লাগিল, صبأنا صبأنا (আমরা ধর্মত্যাগ করিয়াছি, আমরা ধর্মত্যাগ করিয়াছি)। অথচ এই বাক্য দ্বারা তাহাদের উদ্দেশ্য ছিল আমরা আমাদের পূর্বপুরুষের পৌত্তলিকতা পরিত্যাগ করিয়া ইসলাম গ্রহণ করিয়াছি। কিন্তু اٰمَنَّا "ঈমান আনিয়াছি” অথবা اَسْلَمْنَا "ইসলাম গ্রহণ করিয়াছি" এই সমস্ত শব্দ না বলাতে হযরত খালিদ (রা) তাহাদিগকে ভুল বুঝিলেন এবং মুসলিম বলিয়া গণ্য করিলেন না, বরং ক্রুদ্ধ হইয়া তাহাদের কয়েকজনকে হত্যা করিলেন। তিনি অবশিষ্ট লোকদিগকে গ্রেফতার করিয়া হেফাজতের জন্য সাহাবীগণের মধ্যে বণ্টন করিয়া দিলেন। সাহাবীগণ বন্দীদিগকে নিজ নিজ পাহারায় রাত্রি যাপন করিলেন।
ভোরে খালিদ (রা) সাহাবীদিগকে নির্দেশ দিলেন, আপনারা নিজ নিজ বন্দীদিগকে হত্যা করুন। বানূ সুলায়ম গোত্রের সাহাবীগণ তাঁহার নির্দেশ অনুযায়ী আপন-বন্দীগণকে হত্যা করিলেন। কিন্তু মুহাজির ও আনসারগণ আপন আপন বন্দীগণকে হত্যা না করিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে উপস্থিত করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) এই সংবাদ জানিতে পারিয়া খুবই দুঃখিত হইলেন এবং আকাশের দিকে হাত তুলিয়া বলিলেন, "হে আল্লাহ! তুমি জান, খালিদ যাহা করিয়াছে তাহার সঙ্গে আমার কোন সম্পর্ক নাই। হে আল্লাহ! তুমি জান, খালিদ যাহা করিয়াছে তাহার সঙ্গে আমার কোন সম্পর্ক নাই" (সহীহুল বুখারী, ১খ., পৃ. ৪৫০; ২খ., পৃ. ৬২২)।
হযরত খালিদ (রা) ভুলবশত এই হত্যা ও গ্রেফতারের নির্দেশ দিয়াছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (স) এইজন্য অনেক দিন পর্যন্ত হযরত খালিদ (রা)-এর প্রতি অসন্তুষ্ট ছিলেন। এই বিষয় লইয়া 'আবদুর রহমান ইব্ন আওফ (রা) ও খালিদ (রা)-এর মধ্যে একবার কথা কাটাকাটি হয়। রাসূলুল্লাহ (স) তাহা শুনিতে পাইয়া অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হইয়া খালিদ (রা)-কে বলিলেন, "তুমি চুপ থাক! যদি তুমি উহুদ পাহাড়ের সমপরিমাণ স্বর্ণও আল্লাহ্র রাস্তায় দান কর, তথাপি তুমি আমার কোন প্রবীণ সাহাবীর সমমর্যাদায় পৌঁছিতে পারিবে না” (তারীখ খালিদ ইবনিল ওয়ালীদ, পৃ. ৭৭)।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) জান-মালের ক্ষতিপূরণ আদায় করিয়া দেওয়ার জন্য বহু অর্থসহ হযরত 'আলী (রা)-কে বানু জাযীমার নিকট প্রেরণ করেন। তিনি তথায় পৌঁছিয়া নিহতদের রক্তপণ আদায় করিয়া দেখিতে পাইলেন যে, কিছু অর্থ বাঁচিয়া গিয়াছে। এমনকি তাহাদের কুকুরের মূল্যও তিনি আদায় করিয়াছিলেন। তিনি উদ্বৃত্ত অর্থও তাহাদের মধ্যে বণ্টন করিয়া দিলেন। বানু জাযীমা রসূলুল্লাহ্ (স)-এর সদ্ব্যবহার দেখিয়া মুগ্ধ হয় এবং তাঁহার প্রতি যারপরনাই সন্তুষ্ট হয় (দিয়ার বাকরী, তারীখুল খামীস, ২খ., পৃ. ৭৭-৯০)।
হযরত 'আলী (রা) মক্কায় প্রত্যাবর্তন করিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট বিস্তারিত ঘটনা বিবৃত করিলেন। এই হত্যাকাণ্ডের কারণে খালিদ (রা) তাঁহার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেন নাই— এই অভিযোগে অভিযুক্ত হইলেন। রাসূলুল্লাহ (স) এইজন্য তাহাকে কঠোর ভাষায় ভর্ৎসনা করেন যাহাতে তিনি ভবিষ্যতে তাহার দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সতর্ক থাকেন যাহা একটি বাহিনীর অধিনায়কের জন্য জরুরী। রাসূলুল্লাহ (স) সাহাবীগণের অনুরোধে খালিদ (রা)-কে এইবারের জন্য ক্ষমা করিলেন।
টিকাঃ
১. ইবন হাম্, জামহারাতু আনসাবিল আরাব, ৩খ., পৃ. ১৯৬
২. আল-আয়নী, উমদাতুল কারী, ১৭খ., পৃ. ১৬৯
৩. ইয়াকৃত আল-হামাবী, মুজামুল বুলদান, ৪খ., পৃ. ১৯১
৪. যুরকানী, শারহুল মাওয়াহিব, ২খ., পৃ. ১৪৭
৫. মুহাম্মাদ রিদা, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্, ১৯৭৫ খৃ., পৃ. ২৪৩
৬. যুরকানী, শারহুল মাওয়াহিব, ২খ., পৃ. ১৪৭
৭. ইব্ন হিশাম, আস-সীরা
৮. হাফিজ ইবন হাযম, প্রাগুক্ত
৯. ইবনুল আছীর, আল-কামিল, ২খ., পৃ. ১৮৮
১০. যুরকানী, প্রাগুক্ত
১১. ড. মুহাম্মাদ হ'সায়ন হায়কাল, বাংলা অনু. মহানবীর জীবন চরিত, পৃ. ৪৫৯
১২. হালাবী, প্রাগুক্ত, ১খ., পৃ. ৬৭৭
১৩. কান্ধলবী, সীরাতুল মুস্তাফা, ২খ., পৃ. ২৯
১৪. দানাপুরী, আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ১৫৩
১৫. ইবনুল কায়্যিম, যাদুল মা'আদ, ২খ., পৃ. ১১৯
১৬. আবদুল্লাহ, মুখতাসারু সীরাতির, রাসূল, লাহোর ৭৯খৃ., পৃ. ২৯২
📄 সারিয়্যা 'আমর ইবনুল 'আস (রা) (যাতুস সালাসিল)
(যাতুস সুলাসিল বা যাতুস সালাসিল স্থানটি ওয়াদিল কুরা অতিক্রম কারিয়া মদীনা হইতে দশ দিনের পথের দূরত্বে অবস্থিত। এই সারিয়্যা অষ্টম হিজরীর জুমাদাল আখিরা মাসে সংঘটিত হয়।
ইন্ন সা'দ উল্লেখ করেন, রাসূলুল্লাহ (স) সংবাদ পাইলেন যে, বানু কুদা'আ গোত্রের একদল লোক মদীনা আক্রমণের জন্য সংঘবদ্ধ হইতেছে। রাসূলুল্লাহ (স) হযরত 'আমর ইবনুল 'আস (রা)-কে এই যুদ্ধের সেনাপতি মনোনীত করেন এবং তাঁহাকে একটি শ্বেত বর্ণের পতাকা এবং দলের জন্য একটি কালো বর্ণের পতাকা দেন। 'আমর ইবনুল 'আস বালী, 'উষরা ও বানুল কায়ন গালী উহারা ও বালকীন গোত্রের সাহায্য গ্রহণ করিতে নির্দেশ দেন। তিন শত জন যোদ্ধা, ত্রিশটি ঘোড়া এবং সেরা আনসার ও মুহাজিরদিগকে তাহার অধীনে যুদ্ধের জন্য প্রেরণ করেন। তাহারা রাতের বেলা পথ চলিতেন এবং দিনের বেলা গোপনে বিশ্রাম নিতেন। এইভাবে চলিতে চলিতে ঘটনাস্থলের নিকটবর্তী হইয়া শত্রুপক্ষের সংখ্যাধিক্য সম্পর্কে অবগত হইলেন। 'আমর ইবনুল 'আস (রা) মদীনায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর সমীপে আরও সৈন্য পাঠাইবার আরয জানাইয়া রাফে' ইব্ন মাকীস (রা)-কে পাঠাইলেন। রাসূলুল্লাহ (স) সংবাদ পাইয়া হযরত আবূ 'উবায়দা ইবনুল জাররাহ (রা)-এর নেতৃত্বে আরও দুই শত সৈন্য প্রেরণ করিলেন। এই দলেও অনেক বিশিষ্টি মুহাজির ও আনসার সাহাবী ছিলেন। যথা হযরত আবূ বাক্স সিদ্দীক (রা), হযরত 'উমার (রা)। যাত্রাকালে রাসূলুল্লাহ (স) অত্যন্ত গুরুত্বসহ বলিলেন, "তোমরা 'আমর ইবনুল 'আসের বাহিনীর সাথে মিলিত হও। সদা আমরের সাথে মিলিয়া কাজ করিবে, মতপার্থক্য করিবে না।” এই কথা বলিবার কারণ এই যে, 'আমর ইবনুল 'আস (রা) মাত্র কয়েক দিন আগে মুসলমান হইয়াছেন। উল্লেখ্য যে, 'আমর ইবনুল 'আস (রা) অষ্টম হিজরীর সফর মাসে ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিলেন (সীরাতুল-মুস্তাফা, ২খ., পৃ. ৪৫৫)। অপরদিকে হযরত 'আবূ 'উবায়দা ইবনুল জাররাহ (রা) এবং তাঁহার সহযাত্রী অন্যান্য সৈন্যদের অনেকেই পুরাতন মুসলমান। তাই তাঁহাদিগের মধ্যে মতপার্থক্য ও ভুল বুঝাবুঝি হইতে পারে।
রাসূলুল্লাহ (স) আবূ 'উবায়দা ইবনুল জাররাহ (রা)-কেও একটি পৃথক ঝাণ্ডা প্রদান করিলেন। তাহারা যখন 'আমর ইবনুল 'আস (রা)-এর দলের সহিত মিলিত হইলেন এবং নামাযের সময় হইল তখন আবূ 'উবায়দা ইমাম হইতে ইচ্ছা করিলেন। কিন্তু হযরত 'আমর তাঁহাকে বাধা দিয়া বলিলেন, আমি সেনাপতি। আপনারা কেবল আমার সাহাযার্থ্যে প্রেরিত হইয়াছেন। আবূ 'উবায়দা (রা) বলিলেন, রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে মতপার্থক্য ও বিবাদ করিতে নিষেধ করিয়াছেন। নতুবা আমি আমার দলের প্রধান, আমি আপনার আনুগত্য করিতে প্রস্তুত। অতঃপর 'আমর ইবনুল 'আস (রা)-ই ইমামত করিতে থাকেন (আর রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৩৯২)।
ইবন ইসহাক লিখিয়াছেন যে, আবূ 'উবায়দা ইবনুল জাররাহ (রা) অত্যন্ত নরম প্রকৃতির লোক ছিলেন। তাই তিনি এই বিষয়ে 'আমর ইবনুল 'আসের সাথে বিবাদে লিপ্ত হন নাই (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ২৪০)।
এই সফরে 'আমর ইবনুল 'আস (রা)-এর সাথে হযরত উমার (রা)-এরও এক পর্যায়ে মনোমালিন্য সৃষ্টি হইয়াছিল। অতঃপর হযরত আবূ বাক্স সিদ্দীক (রা)-এর মধ্যস্থতায় তাহা বিদূরিত হয়। ঘটনা এই যে, একবার কয়েকজন সৈনিক প্রয়োজনবশত আগুন জ্বালাইতে চাহিলেন, কিন্তু হযরত 'আমর (রা) কঠোরভাবে তাহা নিষেধ করিলেন। উমার (রা) বলিলেন, প্রয়োজনবশতই তো আগুন জ্বালানো হইবে, আপনি নিষেধ করিতেছেন কেন? হযরত আবূ বাক্স সিদ্দীক (রা) উমার (রা)-কে বাঁধা দিয়া বলিলেন, হে উমার! যুদ্ধ সম্বন্ধে আমাদের অভিজ্ঞতার চাইতে 'আমর ইবনুল 'আসের অভিজ্ঞতা বেশী আছে বলিয়াই তো রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে আমাদের আমীর নির্বাচিত করিয়াছেন। তাই প্রতিবাদ না করিয়া তাহার ফায়সালা মানিয়া লও (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ২৪০)।
অবশেষে মুসলিম সৈন্যগণ বানু কুদা'আ গোত্রের নিকট উপনীত হইলেন এবং তাহাদের উপর আক্রমণ করিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই শত্রুবাহিনী রণে ভঙ্গ দিয়া পলায়ন করিতে বাধ্য হইল। মুসলমানগণ বিজয়ী হইলেন। সাহাবা-ই কিরাম (রা) হযরত 'আওফ ইবন মালিক (রা)-কে বিজয়ের সংবাদ জানাইবার জন্য মদীনায় প্রেরণ করিলেন। 'আওফ ইবন মালিক (রা) মদীনায় পৌঁছিয়া দেখিলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম সালাতরত আছেন। সালাত সমাপ্ত হইলে ঘরের বাহিরে থাকিয়াই তিনি সালাম জানাইলেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, কে, 'আওফ? তিনি উত্তর করিলেন, হাঁ। অতঃপর 'আওফের নিকট হইতে অভিযানের ফলাফল, আমীরদ্বয়ের মতানৈক্য এবং অন্যন্য ছোটখাট বিষয় সবিস্তারে অবহিত হইয়া রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আল্লাহ তা'আলা আবূ 'উবায়দাকে রহম করুন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ., পৃ. ২৭৮)।
যুদ্ধ বিজয়ের পর সেনাপতি হযরত 'আমর ইবনুল 'আস (রা)-এর নির্দেশে গনীমতের মাল একত্র করা হইল। তাঁহারা সেখানে আরও কিছু দিন অবস্থান করিয়া পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলিতে ছোট ছোট অভিযান পরিচালনা করিলেন, অবশেষে প্রচুর গনীমতের মালসহ বিজয়ী বেশে মদীনায় প্রত্যাবর্তন করিলেন।
এই অভিযান প্রসংগে আল্লামা ইবনুল কায়্যিম জাওযিয়্যা (র) ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল (র) রাসূলুল্লাহ (স)-এর সনদে বর্ণনা করিয়াছন যে, রাসূলুল্লাহ (স) সেনাপতি 'আমর ইবনুল 'আস (রা)-কে বানু বাক্সের উপর হামলা করিবার জন্য নির্দেশ দিয়াছিলেন। কিন্তু সেনাপতি 'আমর বানু বাক্সের পরিবর্তে বানু কুদা'আর উপর হামলা করিলেন। ইহার কারণ এই যে, বানু বাক্সের সাথে তাঁহার আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল। এই পরিস্থিতিতে মুগীরা ইব্ন শু'বা (রা) আবূ 'উবায়দা (রা)-এর নিকট আসিয়া বলিলেন, রাসূলুল্লাহ (স) আপনাকে আমাদের সেনাপতি মনোনীত করিয়াছেন। আমর ইবনুল 'আস গোত্রের পক্ষাবলম্বন করিয়াছে। কাজেই আপনার উচিৎ হইবে না তাহার আনুগত্য করিয়া বানু কুদা'আর বিরুদ্ধে অভিযানে অংশগ্রহণ করা। আবূ 'উবায়দা (রা) বলিলেন, দেখ, রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে বিবাদ করিতে নিষেধ করিয়াছেন এবং আনুগত্যের নির্দেশ দিয়াছেন। আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর আনুগত্য করিতেছি, আমর যাহাই করুক না কেন। ইবন ইসহাক বলেন, হযরত আবু উবায়দা ছিলেন নরম প্রকৃতির লোক, দুনিয়া বিমুখ এবং নেতৃত্বের প্রতি ছিল তাঁহার অনাসক্তি। তাই তিনি এই সকল বিষয়ে বিবাদে যান নাই (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ২৪০)।
ইবনুল কায়্যিম আল-জাওযিয়্যা বর্ণিত উপরোল্লিখিত রিওয়ায়াতটি পর্যালোচনা ও সত্যাসত্য যাচাইয়ের যথেষ্ট অবকাশ রাখে। কারণ ইহার বিষয়বস্তু ইসলামী জিহাদের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য এবং রাসূলের প্রতি সাহাবায়ে কিরামের প্রমাণিত আনুগত্যের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। উপরন্ত এই জামা'আতে শরীক ছিলেন হযরত আবূ বাক্স সিদ্দীক (রা), হযরত উমার (রা), হযরত সা'দ ইবন 'উবাদা (রা) এবং হযরত সা'দ ইবন আবী ওয়াক্কাস (রা)-এর ন্যায় প্রথম সারির মুহাজির ও আনসার সাহাবা কিরাম (রা)। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) ইরশাদ করিয়াছেন, যে আমার আনুগত্য করিল, সে আল্লাহর আনুগত্য করিল এবং যে আমাকে 'অমান্য করিল, সে আল্লাহকে অমান্য করিল (মিশকাত, পৃ. ২৬৩)।
জিহাদের উদ্দেশ্য, সম্বন্ধে রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, 'আল্লাহ্ দীন সমুন্নত হউক' এই উদ্দেশ্যে যে ব্যক্তি লড়াই করিল, তাহার লড়াই আল্লাহর পথে হইয়াছে বলিয়া গণ্য হইবে। পক্ষান্তরে যেই যুদ্ধ গোত্রীয় স্বার্থে কিংবা নিছক জাগতিক উদ্দেশ্যে হইবে, তাহাকে কিছুতেই জিহাদ বলা যাইবে না (মিশকাত, পৃ. ৩৩১)। কাজেই রাসূলুল্লাহ (স) যদি বানু বাক্রের উপর হামলা করিবার জন্য প্রেরণ করিয়া থাকেন আর সেনাপতি 'আমর তাহার আত্মীয়তার খাতিরে তাহা না করিয়া আরেকটি নিরপরাধ গোত্রের উপর হামলা পরিচলনা করিবেন— এই কথা যেমন মানিয়া লওয়া যায় না, অনুরূপ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ সাহাবাগণ প্রকাশ্যে রাসূলের নির্দেশের বিপরীত কাজ দেখিয়াও চুপ পকিবেন কেবল এই অজুহাতে যে, তিনি বিবাদ করিতে নিষেধ করিয়াছেন, ইহাও কল্পনা করা যায় না।
এই অভিযানে আরও একটি ঘটনা ঘটিয়াছিল। তাহা এই যে, তখন খুব শীত পড়িতেছিল। পথিমধ্যে সেনাপতি 'আমর ইবনুল 'আস (রা)-এর গোসল ফরয হইয়া গেল। তিনি শীতের ভয়ে গোসল না করিয়া তায়াম্মুম করিলেন এবং ফজরের নামায ইমামতি করিলেন। মদীনায় ফিরিবার পর রাসূলুল্লাহ (স) খুঁটিনাটি সমস্ত বিষয় অবগত হইয়া 'হযরত আমর ইবনুন 'আস (রা)-এর নিকট তাঁহার কর্মসমূহের কৈফিয়ত চাহিলেন। 'আমর ইবনুল 'আস একে একে সমস্ত ঘটনার কৈফিয়ত দিলেন। তিনি বলিলেন, আগুন জ্বালাইলে দূর হইতে শত্রুগণ আমাদিগকে দেখিতে পাইত এবং আমাদিগের সংখ্যা কম দেখিয়া আমাদিগকে দুর্বল মনে করিত, এই আশংকায় আমি আগুন জ্বালাইতে নিষেধ করিয়াছি।
আর আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করিয়াছেন, "তোমরা নিজকে নিজে হত্যা করিও না। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদিগের প্রতি দয়ালু" (সূরা নিসা: ২৯)।
এই প্রচণ্ড শীতের মধ্যে গোসল করিলে হয়ত আমি মারা যাইতে পারি এই আশঙ্কায় আমি গোসল না করিযা তায়াম্মুম করিয়া নামায পড়াইয়াছি। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার কৈফিয়ত শুনিয়া হাসিলেন আর কিছু বলিলেন না (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ., পৃ. ২৭৩)।
উল্লেখ্য যে, কতিপয় মুহাদ্দিছ ও সীরাত লেখক এই অভিযানকে গাযওয়া নামে অভিহিত করেন, যদিও রাসূলুল্লাহ (স) এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন নাই।
এই যুদ্ধে 'আমের ইবন রাবী'আ (রা) চোখে আঘাত পইয়া অন্ধ হইয়া যান এবং তাঁহার একটি পা নষ্ট হইয়া যায় (বিদায়া, ২খ., পৃ. ২৭৩)।
এই যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (স)-এর একটি মু'জিযা প্রকাশ পাইয়াছিল। বর্ণনাকারী সাহাবী হযরত 'আওফ ইবন মালিক (রা) বলেন, এই যুদ্ধে আমি আবূ বাক্স সিদ্দীক (রা) এবং উমার (রা)-এর সাথে ছিলাম। পথে এক জায়গায় দেখিলাম, একদল লোক একটি উট যবেহ করিয়াছে। কিন্তু তাহারা উহার গোশত বানাইতে পারিতেছে না। আমি ছিলাম দক্ষ কসাই। তাই বলিলাম, ইহা বানাইয়া প্রস্তুত করিয়া দিলে আমাকে একটি ভাগ দিবে কি না? তাহারা রাযী হইল। আমি দ্রুত উহা বানাইয়া আমার ভাগ লইয়া কفেলার সহিত আসিয়া যুক্ত হইলাম। পরে গোস্ত রান্না করিয়া সাথীদিগকে আপ্যায়ন করিলাম। আবূ বাক্র সিদ্দীক (রা) এবং উমার (রা) ঘটনার বৃত্তান্ত শুনিয়া গলায় আঙ্গুল দিয়া বমি করিয়া ভক্ষিত খাবার ফেলিয়া দিলেন। অভিযান শেষে আমি মদীনায় ফিরিয়া আসিলাম। তখন রাসূলুল্লাহ (স) নামায পড়িতেছিলেন। নামায শেষ হইলে আমি সালাম করিলাম। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, কে? আওফ ইবন মালিক, যিনি উটের গোশত বানাইয়া দিয়াছিল? (খাসাইসুল কুবরা, ১খ., পৃ. ২৬১)।
বনূ কুদা'আহ্ গোত্র অষ্টম হিজরীর শেষে অথবা নবম হিজরীর শুরুতে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হইয়াছিল। বর্ণিত আছে যে, 'আমুল উযূদ বা প্রতিনিধি দল সমাগমের বৎসর অর্থাৎ নবম হিজরীতে বনূ কুদা'আর একটি প্রতিনিধি দল মদীনায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে উপস্থিত হন। যখন তাহারা পৌছিলেন তখন রাসূলুল্লাহ (স) মসজিদে নববীর অভ্যন্তরে সুহায়ল ইবন বায়দা (রা)-এর জানাযার নামায পড়াইতেছিলেন। তাহারা জানাযায় অংশগ্রহণ না করিয়া এক স্থানে চুপ করিয়া বসিয়া রহিলেন। তাহারা ভাবিলেন, রাসূলের হাতে বায়'আত হইয়া মুসলমান হইবার পূর্বে জানাযায় শামিল হওয়া যায় না। জানাযা শেষ করিয়া রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করিয়াছ? তাহারা বলিলেন, হাঁ। তিনি বলিলেন, তবে তোমাদের ভাইয়ের জানাযায় শরীক হও নাই কেন? তাহারা আরয করিলেন, আমরা মনে করিয়াছি যে, আপনার হাতে হাত রাখিয়া বায়'আত না করা পর্যন্ত আমরা মুসলমান হইতে পারি নাই এবং কোন ধর্মানুষ্ঠান পালনের অধিকারও আমাদের নাই। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, যখন তোমরা ইসলাম গ্রহণ করিয়াছ তখন হইতেই মুসলমান হইয়াছ। তৎপর তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর দস্তমুবারকে হাত রাখিয়া বায়'আত করিলেন।
তাহাদিগের বাহন এবং মালপত্র দেখাশুনা করিবার জন্য তাহাদের একজনকে বসাইয়া রাখিয়াছিলেন। পরে তাহাকে রাসূলুল্লাহ (স) খেদমতে হাযির করাইয়া তাহারা বলিলেন, এই লোকটি আমাদের মধ্যে অল্পবয়স্ক। এইজন্য আমরা তাহার খেদমত গ্রহণ করি। তিনি বলিলেন, "আসগারুল কাওমি খাদিমুহুম” ছোটদেরকে বড়দের খেদমত করিতে হয়। তৎপর তিনি তাহাকেও বায়আত করিলেন এবং তাহার জন্য দু'আ করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স)-এর দু'আয় লোকটি তাহাদের মধ্যে প্রত্যেক নেক কাজেই শ্রেষ্ঠ ও অগ্রগামী হইলেন। এমনকি রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে বনূ কুদা'আর নেতা ও ইমাম নিযুক্ত করিয়াছিলেন। বিদায়কালে রাসূলুল্লাহ (স) তাহদিগকে অন্যান্য প্রতিনিধি দলের মতই হাদিয়া প্রদান করিলেন। তাহারা দেশে ফিরিয়া আসিয়া গোত্রের সকলেই ইসলাম গ্রহণের দা'ওয়াত দিলেন। ফলে তাহারা মুসলমান হইয়া গেল (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ৪৩৬-৪৩৭)।
এই বর্ণনা হইতে প্রমাণিত হয় যে, বনূ কুদা'আর লোকেরা নবম হিজরীর পূর্বে কোন এক সময় মুসলমান হইয়াছিল। এই কারণেই তাহারা পূর্ণাঙ্গ ইসলাম শিখিবার জন্য রাসূলুল্লাহ (স)-এর খেদমতে প্রতিনিধি দল প্রেরণ করিতে অনুপ্রাণিত হইয়াছিল।
📄 সারিয়্যা সাঈদ ইব্ন যায়দ আল-আশহালী
ইবন হিশামসহ কতিপয় ঐতিহাসিকের মতানুসারে মক্কা ও মদীনার মধ্যস্থলে কুদায়দ অঞ্চলে আওস ও খায়রাজের উপাস্য দেবতা মানাত-এর বিগ্রহ প্রতিষ্ঠিত ছিল। কিন্তু ইবন সা'দ, শায়খ আবদুল হক প্রমুখের অভিমত অনুসারে মুশাল্লাল নামক স্থানে আওস, খাযরাজ ও গাস্সান গোত্রের উপাস্য দেবতা মানাতের বিগ্রহ স্থাপিত ছিল (মাদারিজুন নুবুওয়াহ, ২খ., পৃ. ৫১১; তাবাকাত, ২খ., পৃ. ১৪৬)। অষ্টম হিজরীর রমযান মাসে পবিত্র মক্কা নগরী বিজয়ের পর মহানবী (স) হযরত সাঈদ ইব্ন যায়দের নেতৃত্বে বিশজন অশ্বারোহী সৈনিকের একটি বাহিনী মানাত বিগ্রহ ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে প্রেরণ করিলেন। সাঈদ ইবন যায়দ যখন সেখানে উপস্থিত হইলেন এবং পুরোহিতের সহিত সাক্ষাত করিলেন, তখন অভিযানের উদ্দশ্যে অবগত হইয়া পুরোহিত বলিল, "যাও, মানাত! তোমার রোষের প্রতিফলন দেখাইয়া দাও"। ইবন সায়্যিদিন নাস উল্লেখ করিয়াছেন, ওহে মানাত! আমাদের মধ্যে কিছু বৈরী লোক আছে যাহারা তোমার অপ্রিয়ভাজন ও বিরুদ্ধবাদী। হজরত সাঈদ বিগ্রহের নিকটবর্তী হইলে দেখিতে পাইলেন, একটি নগ্ন কৃষ্ণকায়া নারী আলুলায়িত কেশে সম্মুখে আসিয়া উপস্থিত হইল এবং নিজের বক্ষ চাপড়াইয়া বলিতে লাগিল, হায় সর্বনাশ! হায় সর্বনাশ!! হযরত সাঈদ অসির আঘাতে তাহাকে ছিন্নভিন্ন করিয়া ফেলিলেন। অতঃপর সম্মুখে অগ্রসর হইয়া আঘাত হানিয়া বিগ্রহটিকে চুরমার করিয়া দিলেন। কোষাগারে হানা দিয়া দেখিলেন, কোষাগার একেবারেই শূন্য। অতঃপর তিনি মহানবী (স)-এর দরবারে ফিরিয়া আসিলেন (মাদারিজুন্ নুবুওয়াহ, ২খ., পৃ. ৫১১; তারীখে তাবারী, (উর্দু), ১খ., পৃ. ৪০৬; যাদুল মা'আদ, ২খ., পৃ. ৩৪৯; উয়ূনুল আছার, ২খ., পৃ. ২৩৪)।
📄 গাযওয়া তায়েফ
হুনায়নের যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর হাতে পরাজিত হাওয়াযিন ও ছাকীফ গোত্রের একটি দল পলায়ন করিয়া তায়েফে চলিয়া যায়। তাহাদের সরদার মালিক ইব্ন আওফও ছিল সেই পলাতক দলের অন্তর্ভুক্ত। এই দিকে রাসূলুল্লাহ (স) স্বয়ং একটি বাহিনী লইয়া তায়েফে উপস্থিত হইয়া যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। এই যুদ্ধ অষ্টম হিজরীর শাওয়াল মাসে সংঘটিত হয় (আসাহ্হুস সিয়ার, পৃ. ২৫৩)।
হাওয়াযিনদের মত ছাকীফ গোত্রের লোকজনও যেমন ছিল অভিজাত, তেমনই ছিল যোদ্ধা। তীর নিক্ষেপে তাহারাও ছিল হাওয়াযিনদের মত বিখ্যাত। তাহাদের একটি মযবুত ও সুরক্ষিত দুর্গ ছিল। পলাতক হাওয়াযিন নেতা তাহার সৈন্যদলসহ ছাকীফ গোত্রের লোকজনের সংগে মিলিত হইয়া মুসলিম বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধের আয়োজন শুরু করিল। তাহারা তাহাদের দুর্গটি পুনরায় সংস্কার করিয়া এক বৎসরের প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী ও রণসম্ভার সংগে লইয়া উহাতে প্রবেশ করিল। দুর্গের চতুর্দিকে ভারি ভারি পাথর নিক্ষেপ করার জন্য 'মিনজানীক' নামক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ইহা ব্যবহার করার জন্য সিদ্ধহস্ত সৈন্য মোতায়েন করিল। উপরন্তু তাহারা বিভিন্ন রকমের আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করার ব্যবস্থা গ্রহণ করিল (তারীখুল খামীস, ২খ., পৃ. ১২২; হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (স): সমকালীন পরিবেশ ও জীবন, পৃ. ৮১৫)।
ইবন সা'দ লিখিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ্ (স) তায়েফ যুদ্ধের সংকল্প করিলে তুফায়ল ইব্ন আমর আদ্-দাওসীকে 'যুল-কাফফায়ন'-এর দেবালয় ধ্বংস করিবার জন্য প্রেরণ করিলেন। ইহা ছিল আমর ইব্ন জুম্মা আদ্-দাওসীর কাষ্ঠ নির্মিত মূর্তি। নবী করীম (স) তাহাকে বলিলেন, এই ব্যাপারে তুমি তোমার নিজের সম্প্রদায়ের সাহায্য লইয়া মূর্তি ধ্বংস করার পর তায়েফে আসিয়া আমাদের সংগে মিলিত হইবে। তিনি নবী করীম (স)-এর নিকট হইতে বিদায় লইয়া তড়িৎ গতিতে নিজের সম্প্রদায়ের নিকট উপস্থিত হইলেন এবং যুল-কাফফায়ন-এর মূর্তি ধ্বংস করিয়া ইহার মুখ আগুন দিয়া পোড়াইয়া দিলেন। অতঃপর তিনি তাহার সম্প্রদায়ের চারি শত লোক লইয়া চারদিন পর নবী করীম (স)-এর সংগে তায়েফে আসিয়া মিলিত হইলেন। ঐতিহাসিকগণের সর্বসম্মত মত অনুযায়ী, যুল-কাফফায়ন-এর মূর্তি ধ্বংস করার সময় তিনি নিম্নবর্ণিত কবিতা আবৃত্তি করিতেছিলেন:
يا ذا الكفين لست عبادك + ميلادنا اكبر من ميلادك انى حثوت النار في فؤادك.
“হে যুল-কাফফায়ন মূর্তি! নহি আমি পূজারী তোমার, তোমা হইতে মহত্তর জন্ম আমার। জ্বালাইতেছি আগুন আমি হৃদয়ে তোমার” (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ২৫৩; সীরাতুল মুস্তাফা, ২খ., পৃ. ২২২; যুরকানী, ৩খ., পৃ. ২৮; উয়ূনুল আছার, ২খ., পৃ. ২০)।
ইবন ইসহাক লিখিয়াছেন, নবী করীম (স) হুনায়ন হইতে রওয়ানা হইয়া নাখলা ইয়ামানিয়া, কারন ও মুলায় হইয়া বুরাতুর-রুগাতে আসিয়া পৌঁছেন। ইহা ‘লিয়াহ্’ এলাকায় অবস্থিত। এইখানে তিনি একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। এই লিয়াহ্ নামক স্থানেই ছিল মালিক ইব্ন আওফের দুর্গ। রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর নির্দেশে দুর্গটি ধ্বংস করা হয়। অতঃপর সেইখান হইতে তায়েফে গিয়া সাহাবাগণসহ নবী করীম (স) দুর্গের পার্শ্বে অবস্থান গ্রহণ করেন (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ২৫৩)।
ইবন সা'দ লিখিয়াছেন, নবী করীম (স) যখন হুনায়ন হইতে রওয়ানা করেন তখন তিনি খালিদ ইব্দুল ওয়ালীদকে সেনাদলের অগ্রভাগে মোতায়েন করেন। আর ছাকীফ গোত্র যখন 'আওতাস' হইতে পলায়ন করিতেছিল তখন তাহারা আসিয়া তায়েফের দুর্গে অবস্থান গ্রহণ করিয়া দুর্গটি বন্ধ করিয়া দেয় এবং এক বৎসরের প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী ও রণসম্ভার মওজুদ রাখিয়া যুদ্ধ করার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে। অতঃপর নবী করীম (স) যখন তাঁহার সৈন্যবাহিনী লইয়া দুর্গের নিকটবর্তী হইলেন, তখন তাহারা দুর্গের অভ্যন্তর হইতে অজস্র তীর নিক্ষেপ করিতে থাকে। ফলে অনেক মুসলমান শাহাদাত বরণ করিলেন এবং অনেকে আহত হইলেন। অতঃপর নবী করীম (স) সেই স্থান হইতে সরিয়া গিয়া একটু দূরে অবস্থান নিলেন। আর এই স্থানেই এখন তায়েফের মসজিদ অবস্থিত। এই সময় দুইজন উম্মুল মুমিনীন হযরত উম্মু সালামা (রা) ও হযরত যয়নাব (রা) নবী করীম (স)-এর সংগে ছিলেন। তাঁহাদের দুইজনের জন্য দুইটি গম্বুজরূপী তাঁবু বানানো হইল। তায়েফ অবরোধকালে নবী করীম (স) এই দুই তাঁবুর মধ্যবর্তী স্থানে সালাত আদায় করিতেন। পরবর্তী কালে ছাকীফ গোত্র যখন ইসলাম গ্রহণ করে, তখন আমর ইবন উমায়্যা ইব্ন ওয়াহ্ব এই স্থানটিতে মসজিদ নির্মাণ করেন (ইবন হিশাম, আস্-সীরাতুন নাবabiyyah, ৪খ., পৃ. ৮০-৮১; আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ২৫৪)।
হযরত তুফায়ল আদ্-দাওসী (রা) যুল-কাফফায়ন দেবালয় ধ্বংস করিয়া চারদিন পর দাওস গোত্রের চারি শত লোক সংগে লইয়া দুর্গ ধ্বংস করার উপযোগী বহু যুদ্ধাস্ত্রসহ তায়েফে পৌছিলেন। তিনি 'মিনজানীক' নামক ক্ষেপণাস্ত্র এবং দাব্বাবা সঙ্গে লইয়া আসিলেন যাহা দ্বারা যথাক্রমে ভারি প্রস্তর নিক্ষেপ করিয়া দুর্গের প্রাচীর ভাঙ্গা যায় এবং দুর্গমূলে প্রাচীর সুড়ঙ্গ করা যায়। মুসলমান সৈন্যগণ যখন দাব্বাবায় বসিয়া দুর্গমূলে পৌঁছিলেন তখন শত্রুরা অগ্নিবৎ উত্তপ্ত লৌহশলাকা দাব্বাবার উপর নিক্ষেপ করিতে লাগিল। দাব্বাবাসমূহ কাষ্ঠ ও চর্মনির্মিত হওয়ার দরুন তাহা জ্বলিয়া যাইতে লাগিল। এমতাবস্থায় দাব্বাবার ভিতর হইতে বাহির হইলে মুসলিম বাহিনীর উপর বৃষ্টির ন্যায় তীর বর্ষিত হইতে লাগিল। সুতরাং দুর্গ-প্রাচীর ভাঙ্গা মুসলিম সৈন্যদের পক্ষে কিছুতেই সম্ভব হইল না। অপরদিকে আঙ্গুর বাগানের আড়াল হইতেও তীর নিক্ষিপ্ত হইতে লাগিল। ফলে রাসূলুল্লাহ (স) আঙ্গুর বাগান কাটিয়া স্থানটি পরিষ্কার করিয়া ফেলার নির্দেশ দিলেন। ইহার দরুন মূল্যবান ফলজ সম্পদ নষ্ট হওয়ার উপক্রম হওয়ায় নবী করীম (স) তায়েফের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের অনুরোধে এই কাজ হইতে বিরত রহিলেন (মুল্লা মাজদুদ্দীন, সীরাতে মুস্তাফা, পৃ. ৭১০; ইব্ন হিশাম, আস-সীরাত আন-নাবাবিয়্যা, ৪খ., পৃ. ৮১; আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ২৫৪; শিবলী নু'মানী, সীরাতুন্নাবী, ১খ., পৃ. ৩১২)।
এই সময় রাসূলুল্লাহ্ (স) ঘোষণা করিলেন যে, তায়েফ নগরে যে সমস্ত ক্রীতদাস রহিয়াছে তাহারা যদি মুসলিম বাহিনীর সংগে যোগ দেয় তবে তাহারা দাসত্বমুক্ত হওয়ার সুযোগ পাইবে। এই ঘোষণার ফলে বহু ক্রীতদাস ইসলাম গ্রহণ করিয়া মুসলমানদের সংগে যোগ দিল (ইবনুল কায়্যিম আল-জাওযিয়্যা, পৃ. ৪৯৭)। নুফায় নামক দুর্গত্যাগী এক ক্রীতদাস অতি প্রত্যূষে দুর্গ হইতে বাহির হইয়া আসিয়া ইসলাম গ্রহণ করিয়া মুসলিম বাহিনীর সাথে যোগ দিল। 'অতি প্রত্যুষ' শব্দটির আরবী হইল 'বুব্রা'। যেহেতু তিনি অতি প্রত্যূষে বাহির হইয়া আসিয়া ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিলেন, সেই হেতু তিনি 'বুকরা' নামে অধিক পরিচিত হন এবং শেষ পর্যায়ে তিনি একজন শীর্ষস্থানীয় ও নিষ্ঠাবান সাহাবী হিসাবে পরিগণিত হন।
তায়েফের যুদ্ধে কতজন ক্রীতদাস মুসলিম বাহিনীর সাথে যোগ দিয়াছিল এই বিষয়ে কয়েকটি মত রহিয়াছে। ইমাম বুখারীর মতে তেইশজন ক্রীতদাস মুসলিম সেনাবাহিনীর সাথে মিলিয়া গিয়াছিল (সাহীহ্ বুখারী, ২খ., পৃ. ৬২০)। দানাপুরীর মতানুযায়ী বিশজন ক্রীতদাস বাহির হইয়া আসিয়া মুসলিম সেনাবাহিনীর সাথে যোগদান করেন। নবী করীম (স) তাহাদের সকলকে মুক্ত করিয়া দেন এবং তাহাদিগকে দেখাশোনা করার জন্য বিভিন্ন সাহাবীকে দায়িত্ব প্রদান করেন (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ২৯০; মাওলানা ইদরীস-কান্ধলভী, সীরাতুল মুস্তাফা, ২খ., পৃ. ২২৩; সাহীহ্ বুখারী, ২খ., পৃ. ৬২০)।
মাওলানা শাহ্ আবদুল হক মুহাদ্দিছ দেহলবী (র) লিখিয়াছেন, এই অবরোধ চলাকালে নবী করীম (স) হযরত আলী (রা)-কে আশেপাশের ছাকীফ গোত্রের দেবমন্দিরসমূহ ভাঙ্গিয়া ফেলার জন্য প্রেরণ করেন। তিনি কয়েকদিনের মধ্যেই সমস্ত দেবমন্দির ও তাহাতে রক্ষিত মূর্তিসমূহ ধ্বংস করিয়া ফেলেন। ইহাতে নবী করীম (স) তাঁহার উপর খুবই সন্তুষ্ট হন এবং দীর্ঘক্ষণ তাঁহার সংগে একান্তে আলাপ করেন। সাহাবীগণ তাহা দেখিয়া বিস্ময়াভিভূত হন (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ২৯০)।
ইবন ইসহাক লিখিয়াছেন, তায়েফের অবরোধ চলাকালে নবী করীম (স) একদিন হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা)-কে করিয়া বলিলেন, আমি স্বপ্নে দেখিলাম একটি দুগ্ধপূর্ণ পাত্র আমাকে দেওয়া হইল। সীরাতে ইবন হিশামের বর্ণনামতে, মাখনপূর্ণ পাত্র তাঁহাকে দেওয়া হইল। কিন্তু একটি মোরগ আসিয়া ঠোকর মারিয়া সমস্ত দুধ, মতান্তরে মাখন ফেলিয়া দিল। হযরত আবূ বাক্স সিদ্দীক (রা) বলিলেন, আমার ধারণা, আপনি যে এই দুর্গ বিজয়ের আকাঙ্খা করিতেছেন তাহা এই অভিযানে সফল হইবে না। নবী করীম (স) বলিলেন, আমারও যেন তাহাই মনে হইতেছে। অতঃপর বিষয়টি লইয়া নবী করীম (স) নাওফাল ইব্ন মু'আবিয়া আদ-দীলির সংগে পরামর্শ করিলেন। তিনিও অনুরূপ মত ব্যক্ত করিলেন। আবূ বাক্স সিদ্দীক (রা) উমার (রা)-এর নিকট এই ঘটনা বর্ণনা করিলেন। তদুপরি উছমান ইব্ন মায'উন (রা)-এর স্ত্রী হযরত খাওলা বিন্তে হাকীম (রা) নবী করীম (স)-এর নিকট এই ঘটনার ইঙ্গিত পাইয়া তাহা উমার (রা)-কে জানাইলেন। ইহার পর উমার (রা) নবী করীম (স)-এর খেদমতে উপস্থিত হইলেন এবং জিজ্ঞাসা করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি কি এইরূপ বলিয়াছেন? তিনি বলিলেন, হাঁ। উমার (রা) জিজ্ঞাসা করিলেন, তাহা হইলে এই বিষয়ে আপনিও কি এই পর্যন্ত স্পষ্টভাবে আদিষ্ট হন নাই? তিনি বলিলেন, না। তিনি পুনরায় নবী করীম (স)-কে জিজ্ঞাসা করিলেন, তাহা হইলে কি আমি এই অবরোধ উঠাইয়া সকলকে প্রত্যাবর্তন করিতে বলিব? তিনি বলিলেন, তাহাই কর। অতঃপর তাহাই করা হইল।
এই অবস্থায় জিহাদের চেতনায় উজ্জীবিত সাহাবীগণ বলিলেন, আমরা কি তায়েফ বিজয় না করিয়া ফিরিয়া যাইব? নবী করীম (স) সাহাবীগণের মনোবল দেখিয়া বলিলেনঃ ঠিক আছে, আগামী দিন যুদ্ধ কর। পরদিন মুসলিম বাহিনী বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনাসহ প্রাণপণ যুদ্ধ করিল, কিন্তু কোন লাভ হইল না, বরং ক্ষতি হইল। অতঃপর নবী করীম (স) বলিলেন, আর নয়। ইনশাআল্লাহ্ আমরা আগামী দিন এইখান হইতে রওয়ানা হইব। এই কথা শুনিয়া সকলেই খুশী হইলেন। তাঁহাদের এত দ্রুত এই মানসিক পরিবর্তন দেখিয়া নবী করীম (স) মৃদু হাসিলেন। সাহাবাগণ বলিলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! ছাকীফ গোত্রের লোকদের জন্য আপনি বদদো'আ করুন। নবী করীম (স) দোয়া করিলেন, হে আল্লাহ! ছাকীফ গোত্রকে আপনি হিদায়াত দান করুন। তাহাদেরকে মুসলমান করিয়া আমার নিকট পাঠাইয়া দিন। ইহার পর নবী করীম (স) জি'রানা-এর দিকে রওয়ানা হন।
ইবন ইসহাক লিখিয়াছেন, তায়েফে মোট বারজন সাহাবী শাহাদাত বরণ করেন। তন্মধ্যে সাতজন ছিলেন কুরায়শ, চারজন আনসার এবং অপর একজন ছিলেন লায়ছ গোত্রের। শাহাদাত বরণকারী কুরায়শগণ ছিলেন : (১) সাঈদ ইবনুল আস্, (২) আরাফাত ইব্ন জানাব, (৩) আবূ বাক্স সিদ্দীক (রা)-এর জ্যেষ্ঠ পুত্র আবদুল্লাহ, (৪) আবদুল্লাহ্ ইব্ন আবী উমায়্যা, (৫) আবদুল্লাহ ইব্ন আমের, (৬) সায়েব ইবনুল হারিছ ও (৭) তাঁহার সহোদর ভাই আবদুল্লাহ। আনসারগণের মধ্যে শাহাদাত লাভ করিয়াছিলেন : (১) ছাবিত ইবনুল যাযা, (২) হারিছ ইব্ন সাহল, (৩) মুনযির ইব্ন আবদুল্লাহ ও (৪) রুকায়ম ইব্ন ছাবিত (রা)। ইবন সা'দ লিখিয়াছেন, তায়েফের দুর্গ মোট আঠার দিন অবরুদ্ধ ছিল। তিনি অন্য বর্ণনায় বলিয়াছেন, নবী করীম (স) তায়েফবাসীর উপর চল্লিশ দিন পর্যন্ত মিনজানীক নামক ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন রাখেন। ইবন ইসহাক বলেন, বিশ দিনের অধিক এবং ইব্ন হিশামের বর্ণনায় সতের দিন তায়েফ অবরুদ্ধ ছিল। তবে এই কথা সর্বসম্মত যে, নবী করীম (স) তায়েফের যুদ্ধে মিনজানীক মোতায়েন করিয়াছিলেন। আর ইহাই ইসলামের ইতিহাসে প্রথম মিনজানীক মোতায়েন। তুফায়ল ইব্ন আমর আদ-দাওসী যখন যুল কাফফায়ন-এর দেবালয় ধ্বংস করিতে গিয়াছিলেন তখন তাঁহার সংগে মিনজানীক সামগ্রী এবং দুর্গের প্রাচীর বিধ্বংসী দাব্বাবা নামক যুদ্ধাস্ত্র ছিল (ইবন হিশাম, সীরাত আন-নাবাবিয়্যা, ৪খ., পৃ. ৮০-৮৫; আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ২৯০-২৯২; সীরাতুল মুস্তাফা, ২খ., পৃ. ২২৩; সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৫খ., পৃ. ২৮২- ২৮৯; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ৩৪৫-২৫২)।
অমুসলিমদের সাথে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ন্যায়পরায়ণতার অসাধারণ দৃষ্টান্তের আরেকটি দিক হচ্ছে এ যে, তিনি কখনোই কোনো অমুসলিমের বিপক্ষে সুনির্ধারিত প্রমানাধি ছাড়া বিচারকার্য সঞ্চালন করতেন না।
আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
مَنْ حَلَفَ عَلَى يَمِينٍ وَهُوَ فِيهَا فَاجِرٌ لِيَقْتَطِعَ بِهَا مَالَ امْرِئٍ مُسْلِمٍ لَقِيَ اللَّهَ وَهُوَ عَلَيْهِ غَضْبَانُ قَالَ فَقَالَ الْأَشْعَثُ بْنُ قَيْسٍ فِي وَاللَّهِ كَانَ ذَلِكَ كَانَ بَيْنِي وَبَيْنَ رَجُلٍ مِنْ الْيَهُودِ أَرْضٌ فَجَحَدَنِي فَقَدَّمْتُهُ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ لِي رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَلَكَ بَيْنَةٌ قَالَ قُلْتُ لَا قَالَ فَقَالَ لِلْيَهُودِي احْلِفُ قَالَ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِذًا يَحْلِفَ وَيَذْهَبَ بِمَالِي قَالَ فَأَنْزَلَ اللَّهُ تَعَالَى {إِنَّ الَّذِينَ يَشْتَرُونَ بِعَهْدِ اللَّهِ وَأَيْمَانِهِمْ ثَمَنًا قَلِيلًا إِلَى آخِرِ الْآيَةِ»
"যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের অর্থ-সম্পদ আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যে মিথ্যা শপথ করে সে আল্লাহর সমীপে এমন অবস্থায় হাযির হবে যে, আল্লাহ তার ওপর রাগান্বিত থাকবেন। আশ'আস ইবন কায়েস ¹³⁵ রাদিয়াল্লাহু 'আনহু বলেন, আল্লাহর কসম! এটা আমার সম্পর্কেই ছিল। আমার ও এক ইয়াহুদী ব্যক্তির সাথে যৌথ মালিকানায় এক খণ্ড জমি ছিল। সে আমার মালিকানার অংশ অস্বীকার করে বসল। আমি তাকে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে নিয়ে গেলাম। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন, তোমার কোনো সাক্ষী আছে কি? আমি বললাম, না। তখন তিনি ইয়াহুদীকে বললেন, তুমি কসম কর। আমি তখন বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! সে তো কসম করবে এবং আমার সম্পত্তি নিয়ে নেবে। তখন আল্লাহ তা'আলা (এ আয়াত) নাযিল করেন,
﴿إِنَّ الَّذِينَ يَشْتَرُونَ بِعَهْدِ اللَّهِ وَأَيْمَانِهِمْ ثَمَنًا قَلِيلًا ﴾ [آل عمران: ۷۷]
"যারা আল্লাহর সঙ্গে কৃত প্রতিশ্রুতি এবং নিজেদের শপথকে তুচ্ছমূল্যে বিক্রি করে......"। [সূরা আলে ইমরান: ৭৭] ¹³⁶
নিশ্চয় এটি এক বিরল দৃষ্টান্ত..!!
এটি এমন দু'জনের মধ্যকার বিবাদ, যাদের একজন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবী অন্যজন ইয়াহুদী। তারা পরস্পরের মধ্যে ফায়সালা করে দেওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আসল। কাজেই রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের দু'জনের মাঝে কোনো প্রকার পক্ষপাতিত্ব ব্যতীত শরী'আতের বিধান প্রয়োগ করা ছাড়া অন্য কোনো পন্থা অন্বেষণ করেন নি। আর এ ক্ষেত্রে ইসলামী শরী'আত বাদী আশ'আস ইবন কায়েসকে এ বাধ্যবাধকতা আরোপ করে যে, সে সাক্ষ্য ও প্রমাণ পেশ করবে। যদি সে প্রমাণ ও সাক্ষ্য উপস্থাপনে ব্যর্থ হয় তাহলে বিবাদীকে এ মর্মে শপথ করতে বলা যে, বাদী তার ওপর যে অভিযোগ উত্থাপন করেছে সে ঐ অভিযুগে অভিযুক্ত নয়। তখন বিবাদীর শপথকে সত্যায়ন করা হবে এবং সে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পাবে। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগত হাদীসের অর্থও তাই। তিনি বলেন,
الْبَيِّنَةُ عَلَى المُدَّعِي وَالْيَمِينُ عَلَى مَنْ أَنْكَرَ
"অভিযোগকারী প্রমাণ পেশ করবে। আর (প্রমাণ পেশ করতে না পারলে) যে অস্বীকার করে সে শপথ করবে"।
ইয়াহূদী যে মিথ্যার আশ্রয় নিতে বিন্দুমাত্রও দ্বিধাবোধ করবে না রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ব্যাপারে সম্যক জ্ঞাত ছিলেন। কারণ, তারা শুধু মানুষের সাথে কেন বরং স্বয়ং আল্লাহর ওপরই তো মিথ্যারোপ করে অভ্যস্থ। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَيَقُولُونَ عَلَى اللَّهِ الْكَذِبَ وَهُمْ يَعْلَمُونَ ﴾ [ال عمران: ٧٥]
"আর তারা জেনে-শুনে আল্লাহর প্রতি মিথ্যা বলে।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৭৫]
আর ইয়াহূদী যখন এ কথা জানলো যে সাহাবীর কাছে নিজ মালিকানার স্বপক্ষে কোনো সাক্ষ্য প্রমাণ নেই তার শপথের ভিত্তিতেই বিষয়টি শুরাহা হবে। তখন তার মধ্যে আরো বেশি নৈতিক অবক্ষয় দেখা দিল। অপরদিকে সাহাবীও এটি অনুভব করলেন যে, তার আশা ব্যর্থতায় পর্যবশিত হতে যাচ্ছে। কারণ ইয়াহুদী তো বিনা দ্বিধায় মিথ্যা শপথ করে বসবে। কাজেই রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জন্য কিছুই করতে পারবেন না এবং ইয়াহুদীকে সুযোগ দেওয়া ছাড়া রাসূলের সামনে আর কোনো পথই খোলা থাকবে না।
এটি কি সার্বজনিন ন্যায়পরায়ণতা নয় যার এতো সরল বাস্তবায়ন কোনো মানুষ কল্পনাও করতে পারে না?!
এটাই ইসলাম...।
এটাই সে আসমানী দীন, যা জমিনে মানব জীবন পরিচালনার জন্য এসেছে...।
ইনিই আমাদের মহান রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, যিনি সভ্যতা ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে সৃষ্টিকূলের সেরা...।
কোনো ইয়াহূদীর বিপক্ষে সাক্ষী-প্রমাণের অভাবে মুসলিমের দাবী প্রত্যাখ্যাত হওয়ার মতো ঘটনা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনে শুধু একবার নয়; বরং বারবার ঘটেছে। পৃথিবীতে আরো গুরুতর কলহেরও সৃষ্টি হয়েছে এবং পূর্বোক্ত ঘটনার চেয়ে কঠিনতর পরিস্থিতির অবতারণাও হয়েছে।
কিন্তু সকল ক্ষেত্রেই রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতিক্রিয়া ছিল একই রকম। কেননা তাঁর সকল চিন্তা-চেতনার উৎস তো একই। ধর্ম, চরিত্র ও ন্যায়পরায়ণতা তাঁর মতে এমন বিষয় যা কখনো বিভক্ত হয় না।
সাহল ইবন আবি হাসমাহ রাদিয়াল্লাহু 'আনহু বর্ণনা করেন,
أَنَّ نَفَرًا مِنْ قَوْمِهِ انْطَلَقُوا إِلَى خَيْبَرَ فَتَفَرَّقُوا فِيهَا وَوَجَدُوا أَحَدَهُمْ قَتِيلًا وَقَالُوا لِلَّذِي وُجِدَ فِيهِمْ قَدْ قَتَلْتُمْ صَاحِبَنَا قَالُوا مَا قَتَلْنَا وَلَا عَلِمْنَا قَاتِلًا فَانْطَلَقُوا إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ انْطَلَقْنَا إِلَى خَيْبَرَ فَوَجَدْنَا أَحَدَنَا قَتِيلًا فَقَالَ الْكُبْرَ الْكُبْرَ فَقَالَ لَهُمْ تَأْتُونَ بِالْبَيِّنَةِ عَلَى مَنْ قَتَلَهُ قَالُوا مَا لَنَا بَيِّنَةٌ قَالَ فَيَحْلِفُونَ قَالُوا لَا تَرْضَى بِأَيْمَانِ الْيَهُودِ فَكَرِهَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ يُبْطِلَ دَمَهُ فَوَدَاهُ مِائَةٌ مِنْ إِبْلِ الصَّدَقَةِ»
“তার (সাহল ইবন আবি হাসমাহ-এর) গোত্রের একদল লোক খায়বার গমন করল ও তথায় তারা বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে পড়ল। তারা তাদের একজনকে নিহত অবস্থায় পেল। (খায়বারে তখন ইয়াহুদীদের আবাস ছিল) যাদের কাছে তাকে নিহত অবস্থায় পাওয়া গেল তাদেরকে তারা বলল, তোমরা আমাদের সাথীকে হত্যা করেছ। তারা বলল, আমরা না তাকে হত্যা করেছি, না তার হত্যাকারী সম্পর্কে জানি। এরপর তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে গেল এবং বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা খায়বার গিয়েছিলাম আর আমাদের একজনকে তথায় নিহত অবস্থায় পেলাম। তখন তিনি বললেন, বায়োবৃদ্ধকে বলতে দাও। বায়োবৃদ্ধকে বলতে দাও। ¹³⁷ তারপর তিনি তাদেরকে বললেন, তোমাদেরকে তার হত্যাকারীর বিরুদ্ধে প্রমাণ পেশ করতে হবে। তারা বলল, আমাদের কাছে কোনো প্রমাণ নেই। তিনি বললেন, তাহলে ওরা কসম করে নেবে। তারা বলল, ইহুদীদের কসমে তো আমাদের কোনো আস্থা নেই। এ নিহতের রক্ত মূল্যহীন হয়ে যাক তা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পছন্দ করলেন না। তাই সদকার একশত উট প্রদান করে তার রক্তপণ আদায় করলেন।” ¹³⁸
আল্লাহু আকবার! এটি কতো বড় আশ্চর্যজনক ঘটনা!!
সহীহ মুসলিমের বর্ণনা মতে এ ঘটনাটি খায়বার উপত্যকায় ইয়াহূদীরা মুসলিমদের সাথে পরাজিত হবার পর ইয়াহুদীরা মুসলিমদের সাথে চুক্তি সম্পাদন করে বসবাসের অনুমতি প্রাপ্ত হবার পরের ঘটনা। স্বভাবতই তখন ইয়াহুদীরা দুর্বল অবস্থায় এবং মুসলিমগণ শক্তিশালী অবস্থানে ছিল। মুসলিমগণ চাইলে তাদের এ সামর্থ্য ছিল যে, নিজেদের কোনো মতকে জোরপূর্বক ইয়াহূদীদের ওপর চাপিয়ে দেবেন।
কিন্তু বাস্তবতা পৃথিবী দেখেছে..!
ইমাম মুসলিমের ¹³⁹ বর্ণনা মতে, ইয়াহূদী অধ্যুসিত এলাকায় আব্দুল্লাহ ইবন সাহল রাদিয়াল্লাহু 'আনহু নামীয় এক আনসার সাহাবীকে হত্যা করা হলো। সেই সাথে মুসলিম শিবিরে প্রকট সংশয় ও সন্দেহ সৃষ্টি হলো যে, কোনো ইয়াহূদীই তাকে হত্যা করেছে। কিন্তু তাদের কাছে এ সন্দেহের স্বপক্ষে কোনো প্রমাণ ছিল না। আর অভিযোগ উত্থাপনের ক্ষেত্রে সন্দেহ কখনোই সফল হতে পারে না। এজন্যই রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো ইয়াহূদীকে কোনো ধরণের শাস্তিই প্রদান করেন নি; বরং ইয়াহুদীদের প্রতি শুধুমাত্র এ আহ্বান করলেন যে, তোমরা শপথ করে বল যে, তোমরা এ কাজ কর নি।
এহেন পরিস্থিতিতে আনসারদের মধ্যে হাহাকার রব উঠল। কেননা তারা খুব ভালো করে জানতেন যে, ইয়াহুদীরা মিথ্যা শপথ করতে বিন্দু মাত্র পিছপা হবে না। এ কারণে আনসারদের মধ্যে এ ধারণাও তৈরি হতে চলল যে, তারা তাদের রক্তপণের অধিকার হারাতে বসেছেন। আর আনসারদের বিষণ্ণতা ও প্রমাণহীন দাবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিচারে কোনো প্রভাব ফেলতে পারে নি। তিনি ইয়াহুদীদেরকে জরিমানা করা বা তাদের কাউকে কিসাস হিসেবে হত্যা করা কিংবা কোনো প্রকারের শাস্তি প্রদানের আবেদন প্রত্যাখান করলেন। তখন আনসারদের মাঝে এ অনুভূতি জাগ্রত হলো যে, তারা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন। কারণ তাদের হত্যাকৃত ব্যক্তির রক্তের বিপরীতে তারা কিছুই পাচ্ছেন না। এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন এক ব্যবস্থা গ্রহণ করলেন যা কোনো মানুষ কল্পনাও করতে পারে না...। তিনি নিজ উদ্যোগে মুসলিমদের রাষ্ট্রীয় সম্পদ থেকে ঐ আনসারীর রক্তপণ আদায় করার ব্যবস্থা গ্রহণ করলেন। যেন আনসারদের মন শান্ত হয়ে যায় এবং ইয়াহূদীদের উপর প্রতিশোধ চিন্তা না করে। কাজেই ইয়াহুদীদের প্রতি শুধু সন্দেহের কারণে দণ্ডারোপ করা সম্ভব না হওয়া অবস্থায় ইসলামী রাষ্ট্র সেই রক্তপণের বোঝা বহন করে। এ হাদীসের মন্তব্যে ইমাম নববী ¹⁴⁰ বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ রক্তপণ এ জন্যে আদায় করলেন যেন সংঘাতের পথ বন্ধ হয়ে যায় এবং পারস্পরিক সম্পর্ক সংশোধিত হয়। ¹⁴¹ তিনি চেয়েছেন সংঘাতের পথ চিরতরে বন্ধ হোক। যেন আনসাররা রক্তপণ পেয়ে এ বিষয়টি ভুলে যায় আর ইয়াহুদীরাও প্রতিশোধের আতঙ্ক থেকে নিরাপত্তাবোধ করে।
প্রিয় পাঠক! দেখুন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ পদক্ষেপটি কতো মুগ্ধকর ও অভূতপূর্ব!!
নবম হিজরীতে বনু হানীফার প্রতিনিধি দলের সাথে মুসাইলামাহ আল-হানাফী (পরবর্তীতে মুসাইলামাতুল কাযযাব নামে পরিচিতি) যখন মদীনায় আসল তখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ব্যাপারে যে অবস্থান গ্রহণ করেন সেটি এ ঘটনার চেয়েও বেশি চমকপ্রদ। ¹⁴²
আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বর্ণনা করেন। তিনি বলেন:
قَدِمَ مُسَيْلِمَةُ الْكَذَّابُ عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَجَعَلَ يَقُولُ إِنْ جَعَلَ لِي مُحَمَّدُ الْأَمْرَ مِنْ بَعْدِهِ تَبِعْتُهُ وَقَدِمَهَا فِي بَشَرٍ كَثِيرٍ مِنْ قَوْمِهِ فَأَقْبَلَ إِلَيْهِ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَمَعَهُ ثَابِتُ بْنُ قَيْسِ بْنِ شَمَّاسٍ وَفِي يَدِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قِطْعَةُ جَرِيدٍ حَتَّى وَقَفَ عَلَى مُسَيْلِمَةَ فِي أَصْحَابِهِ فَقَالَ: لَوْ سَأَلْتَنِي هَذِهِ الْقِطْعَةَ مَا أَعْطَيْتُكَهَا وَلَنْ تَعْدُوَ أَمْرَ اللَّهِ فِيكَ وَلَئِنْ أَدْبَرْتَ لَيَعْقِرَنَّكَ اللهُ وَإِنِّي لَأَرَاكَ الَّذِي أُرِيتُ فِيهِ مَا رَأَيْتُ فَأَخْبَرَنِي أَبُو هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ بَيْنَمَا أَنَا نَائِمُ رَأَيْتُ فِي يَدَيَّ سِوَارَيْنِ مِنْ ذَهَبٍ فَأَهَمَّنِي شَأْنُهُمَا فَأُوحِيَ إِلَيَّ فِي الْمَنَامِ أَنْ انْفُخُهُمَا فَنَفَخْتُهُمَا فَطَارًا فَأَوَّلْتُهُمَا كَذَابَيْنِ يَخْرُجَانِ بَعْدِي فَكَانَ أَحَدُهُمَا الْعَنْسِيَّ وَالْآخَرُ مُسَيْلِمَةَ الْكَذَّابَ صَاحِبَ الْيَمَامَةِ»
"(ভণ্ড নবী) মুসায়লামা কাযযাব রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আমলে মদীনায় আসলো। এসে বলতে লাগলো, মুহাম্মাদ যদি তার (মৃত্যুর) পরে নেতৃত্ব আমাকে দেওয়ার অঙ্গীকার করেন, তাহলে আমি তার অনুসরণ করব। সে তার কাওমের অনেক লোকজন নিয়ে মদীনায় আসলো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দিকে এগিয়ে গেলেন। তাঁর সাথে ছিলেন সাবিত ইবন কায়স ইবন শাম্মাস রাদিয়াল্লাহু আনহু। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতে ছিল খেজুর শাখার একটি টুকরা। অবশেষে তিনি সহচর বেষ্টিত মুসায়লামার সামনে গিয়ে থামলেন এবং কথাবার্তার এক পর্যায়ে বললেন তুমি যদি (আমার কাছে এ) নগণ্য খেজুর ডালের টুকরাটিও দাবি কর, তবু আমি তা তোমাকে দেব না এবং আমি কিছুতেই তোমার ব্যাপারে আল্লাহর বিধান লঙ্ঘন করব না। আর যদি তুমি পাশ্চাতে ফিরে যাও (অবাধ্য হও), তাহলে অবশ্যই আল্লাহ তোমাকে ঘায়েল করবেন। আর আমি অবশ্যই মনে করি যে, যা আমাকে স্বপ্নে দেখানো হয়েছে, তা তোমার ব্যাপারেই দেখানো হয়েছে।
তিনি বলেন, আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু 'আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেছেন, আমি ঘুমন্ত ছিলাম, এমতাবস্থায় আমার কাছে পৃথিবীর ভাণ্ডারসমূহ নিয়ে আসা হলো। তখন আমার হাতে দু'টি সোনার কংকন রেখে দেওয়া হলে সে দু'টি আমার জন্য বড় ভারী মনে হলো এবং এগুলো আমাকে দুশ্চিন্তায় ফেলল। তখন আমার কাছে অহীর মাধ্যমে জানান হলো যে, আমি যেন সে দু'টির ওপরে ফুঁক দেই। তখন আমি ফুঁক দিলে সে দু'টি অন্তর্হিত হয়ে গেল। আমি সে দু'টির ব্যাখ্যা করলাম সে হলো মিথ্যুক (ভণ্ড নবী) যে দু'জনের মাঝে আমি রয়েছি (অর্থাৎ) সান'আ অধিবাসী আসওয়াদ আল-আনসী এবং ইয়ামামা অধিবাসী মুসায়লামাতুল কাযযাব। "¹⁴³
আল্লাহু আকবার। কতো বড় বিষ্ময়কর ঘটনা!!
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখলেন যে, এক লোক তার শর্ত না মানার কারণে ইসলামে দিক্ষীত হওয়াকে প্রত্যাখ্যান করছে। অথচ তার সম্প্রদায়ের সকলেই ইসলাম গ্রহণ করে নিয়েছে। অপরদিকে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ নিয়ে এক স্বপ্নও দেখেছেন। আর নবীদের স্বপ্ন তো সত্যই হয়ে থাকে। তিনি দেখলেন যে, ঐ ব্যক্তি তাঁর অবর্তমানে মিথ্যা নবুওয়াতের দাবী করবে। তার এ অপকর্মের ভয়াবহতা ও তার বিভ্রান্তিকর মতবাদের প্রচার প্রসার ও দাওয়াতের কারণে সৃষ্ট সম্ভাব্য বিশৃঙ্খলতার বিষয়েও রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্যক জ্ঞাত ছিলেন। মুসাইলামার এতো সব গুরুতর অপতৎপরতা, সেই সাথে সে সময় রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মুসলিমরা যথেষ্ট ক্ষমতাবান, অপরদিকে সে সময় বনু হানীফা ও আরবদের দৈন্যদশা থাকার পরও রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এহেন পরিস্থিতিতেও তাকে শাস্তি প্রদান বা তাকে প্রতিরোধ প্রক্রিয়া গ্রহণ করেন নি। মদীনায় তার স্বাধীনতাবোধকেও হরণ করেন নি। তার অপচেষ্টার জন্য তাকে কোনো দণ্ডারোপও করেন নি। আর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এরূপ করার কারণ হলো তিনি চান নি শুধুমাত্র স্বপ্নের ফলাফলের ভিত্তিতে তার ওপর কোনো আদেশ জারি করেন। সে কারণেই তার বিপক্ষে প্রকৃত সাক্ষ্য-প্রমাণ ছাড়া কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেন নি। অথচ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখেছিলেন এবং এ বিষয়ে তাঁর সুষ্পষ্ট ধারণা ও বিশ্বাস ছিল যে, মুসায়লামার দ্বারা অদূর ভবিষ্যতে কী অপকর্ম প্রকাশ পাবে? কিন্তু শুধুমাত্র উপস্থিত সময়ে সাক্ষ্য-প্রমাণ বিদ্যমান না থাকার কারণে তিনি মুসায়লামাকে নিরাপদে ছেড়ে দিলেন।
এমনই ছিল রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনন্য ন্যায়পরায়ণতা...।
ভূপৃষ্ঠে বিদ্যমান অপরাপর কোনো ধরণের ন্যায়-নিষ্ঠারই যার সাথে তুলনা হতে পারে না...।
টিকাঃ
¹³⁵. আল-আশ'আস ইবন কায়েস আল-কিন্দী। দশম হিজরীতে ইসলাম গ্রহণের জন্য কিন্দা রাজ্যের প্রতিনিধি হয়ে আসেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মারা যাওয়ার পর মুরতাদ হয়ে গিয়েছিল। অতঃপর আবার ইসলামে ফিরে এসেছেন এবং আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু নিজ বোনকে তার সাথে বিবাহ দেন। তিনি কাদিসিয়্যাহ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুর সাথে সিল্ফীনের যুদ্ধেও অংশ নেন। অতঃপর আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুর শাহাদাত বরণের চল্লিশ দিন পর মারা যান। অধিক জানতে দেখুন: ইবনুল আসীর: উসদুল গাবাহ (১/৯৭), ইবন হাজার: আল-ইসাবাহ (জীবনী নং ২০৫)
¹³⁶. সহীহ বুখারী: (কিতাবুল খুসূমাত: বাব কালামুল খুসূম বা'দুহুম ফী বা'দ) হাদীস নং ২২৮৫; সহীহ মুসলিম: (কিতাবুল ঈমান: বাব ওয়াইদ মান ইক্বতাত্বা'আ হাক্কা মুসলিম বি ইয়ামিন ফাজেরাহ বিন নার) হাদীস নং ২০৯।
¹³⁷. তোমাদের মধ্যে যিনি সিনিয়র তাকে কথা বলতে দাও। অধিক জানতে দেখুন: ইবন হাজার আসকালানী: আল-ফাতহুল বারী (১২/২৩৩,২৩৪)
¹³⁸. সহীহ বুখারী: (كتاب الديات: باب القسامة) হাদীস নং ৬৫০২; সহীহ মুসলিম : ( كتاب القسامة والمحاربين والقصاص والديات: باب القسامة) হাদীস নং ১৬৬১।
¹³⁹. মুসলিম ইবন হাজ্জাজ, আল-ইমাম আল হাফেজ হুজ্জাতুল ইসলাম আবুল হাসান আন-নিসাবুরী। ২০৫ হিজরীতে তার জন্ম হয়। হাদীসের সেই সহীহ গ্রন্থের (সহীহ মুসলিম) প্রণেতা অধিকাংশ আলেমগণ যাকে সহীহ বুখারীর পর সবচেয়ে বিশুদ্ধ গ্রন্থ বলেছেন। ২৬১ হিজরীতে নাইসাবুরে ইন্তেকাল করেন। অধিক জানতে দেখুন: ইবনুল আসীর: আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া: (১১/৩৩), ইমাম যাহাবী: তাযকিরাতুল হুফফায (২/৫৮৮)।
¹⁴⁰. মহীউদ্দিন আবু যাকারিয়া আন-নববী আদ-দামেশক্বী আশ-শাফে'ঈ (২৩১-২৭৬ হিজরী)। স্বীয় যমানায় বড় ফকীহগণের অন্যতম একজন। তিনি অনেক গ্রন্থ রচনা করেন তন্মধ্যে যেগুলো সম্পূর্ণ করতে পেরেছেন তা থেকে শরহে মুসলিম' ও 'আর-রাওজাহ' অন্যতম। আর যে কিতাবগুলো তিনি সম্পূর্ণ করে যেতে পারেন নি তা থেকে উল্লেখ্য শরহুল মুহাযযাব যা 'আল-মাজমু'ঊ' নামে নামকরণ করা হয়। এটি তিনি 'কিতাবুর-রিবা' পর্যন্ত লিখতে পেরেছিলেন। দেখুন: ইবনুল আসীর: আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া: (১৩/২৮৭)।
¹⁴¹. আন-নববী: আল-মিনহাজু শারহু সহীহ মুসলিম ইবন আল-হাজ্জাজ (১১/১৪৭)।
¹⁴². ইবন কাসীর: আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া: (৫/৪৮)
¹⁴³. সহীহ বুখারী: (کتاب المناقب باب علامات النبوة في الإسلام) হাদীস নং ৩৪২৪; সহীহ মুসলিম: (کتاب الرؤيا: باب رؤيا النبي صلى الله عليه وسلم) হাদীস নং ২২৯০।