📄 সারিয়্যা আবু কাতাদা ইব্ন রি'ঈ বা সারিয়্যা আবুল হাদরাদ
পটভূমি: ইন্ন জারীর তাঁহার তারীখ গ্রন্থে উল্লেখ করিয়াছেন, আবদুল্লাহ ইব্ন আবু হাদরাদ আসলামী হইতে বর্ণিত আছে, আমি স্বগোত্রীয় এক মহিলাকে বিবাহ করিয়াছিলাম। বিবাহের মোহরানা ছিল দুই শত দিরহাম যাহা পরিশোধ করা আমার পক্ষে কষ্টকর ছিল। আমি এই প্রত্যাশায় মহানবী (স)-এর নিকট উপস্থিত হইলাম যে, তিনি সদয় হইলে আমি উহা পরিশোধ করিতে পারিব। মহানবী (স) আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, উহা কত ধার্য হইয়াছে? আমি বলিলাম, দুই শত দিরহাম। তিনি বিস্মিত হইয়া বলিলেন, সুবহানল্লাহ! ইহার অধিক মোহর ত আর ধার্য করা যায় না। যাহা হউক বর্তমানে আমার হাতে তোমাকে দেওয়ার মত কিছু নাই। কিছু দিন অপেক্ষা কর।
ইন জারীর তারীখে তাবারীতে উল্লেখ করেন, বানু জুশামের রিফা'আ ইব্ন কায়স নামক নেতৃস্থানীয় এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিরুদ্ধে স্বগোত্রীয় জনগণ ও অনান্যদেরকে যুদ্ধ করিতে প্ররোচিত করিবার উদ্দেশ্যে একটি পার্বত্য গুহায় একত্র করিয়াছিল। মহানবী (স)-এর নিকট ইহার সংবাদ পৌঁছামাত্র তিনি আমাকে এবং অপর দুইজন মুজাহিদকে নির্দেশ দিলেন, তোমরা রিফা'আ ইব্ন কায়সকে বন্দী করিয়া আমার নিকট উপস্থিত কর অথবা তাহাদের সঠিক সংবাদ আমার নিকট পৌঁছাও। আর আমাদের বাহনের জন্য তিনি অতি দুর্বল একটি উট দিলেন। উটটি এতই দুর্বল ছিল যে, উহার পিঠে আরোহণ করার পর তাহা আর উঠিয়া দাঁড়াইতে সক্ষম হইল না। অবশেষে অনেক ধরাধরি করিয়া উহাকে দাঁড় করানো হইল। মহানবী (স) বলিলেন, ঠিক আছে, এইভাবেই তোমরা যাত্রা শুরু কর।
ইবন সা'দ 'আত্-তাবাকাতুল কুবরা' গ্রন্থে উল্লেখ করেন, নজদের মুহারিব অঞ্চলে খজিরাও নামক স্থানে বানু গাতাফানকে উৎখাত করার লক্ষ্যে ৮ম হিজরীর শা'বান মাসে আবু কাতাদা হারিছ ইব্ন রিব'ঈর নেতৃত্বে একটি অভিযান প্রেরিত হইয়াছিল। ইন্ন জারীরের মতে বাহিনীর জনবল ছিল মাত্র তিনজন। আর ইবন সা'দের মতানুসারে মুজাহিদ সংখ্যা ছিল পনরজন।
আবুল হাদরাদ আসলামী বলেন, মহানবী (স)-এর নিকট হইতে বিদায় গ্রহণের পর আমরা যাত্রা শুরু করিলাম। ত্বরিত গতিতে সূর্যাস্তের সাথে সাথে আমরা শত্রুদের গোপন ঘাঁটির নিকটবর্তী হইলাম। আমার সাথীদেরকে এক গোপন স্থানে পাহারায় রাখিয়া আমি অন্যত্র সুযোগের সন্ধানে বসিয়া রহিলাম। তাহাদিগকে পরামর্শ দিয়াছিলাম যে, আক্রমণের সুযোগ আসিলে আমি উচ্চস্বরে তাকবীর ধ্বনি উচ্চারণ পূর্বক আক্রমণ করিব। তোমরাও সঙ্গে সঙ্গে তাকবীর ধ্বনি দিয়া আক্রমণ করিবে। ইত্যবসরে রাত্রি গভীর হইতে চলিল।
শত্রুশিবিরের এক রাখাল অধিক রাত্রি হওয়ার কারণে ঘাটিতে পৌঁছিতে পারে নাই। শত্রুপক্ষ ধারণা করিল সম্ভবত রাখালটির কোন বিপদ ঘটিয়াছে। রিফা'আ ইব্ন কায়স রাখালটির সন্ধানে বাহির হইতে মনস্থ করিল। তাহার সঙ্গী সহগামী হইতে চাহিলে সে তাহাকে নিরস্ত্র করিল। সে একাকীই রাখালটির সন্ধানে বাহির হইল এবং গলদেশে একটি কোষবদ্ধ তরবারি জুলাইয়া নিঃশঙ্ক চিত্তে পথ চলিতে লাগিল। সে আমার নিশানার আওতার মধ্যে আসিলে আমি আমার তৃণ হইতে একটি তীর নিক্ষেপ করিলাম। আত্মার তীর তাহার হৃৎপিণ্ড ভেদ করিল। আমি অগ্রসর হইয়া তাহার মস্তক দেহ হইতে বিছিন্ন করিলাম। এইবার উচ্চস্বরে তাকবীর ধ্বনি উচ্চারণ করিয়া মূল ঘাটিতে আক্রমণ করিলাম। আমার সঙ্গীগণও সঙ্গে সঙ্গে তাকবীর ধ্বনি সহকারে আক্রমণ করিল। আমাদের অতর্কিত আক্রমণ ও ঘন ঘন তাকবীর ধ্বনিতে শত্রুদের মধ্যে ত্রাসের সৃষ্টি হইল এবং যাহার পক্ষে যতটুকু সম্ভব ততটুকু লইয়াই পালাইয়া প্রাণ বাঁচাইল। প্রচুর পরিমাণ যুদ্ধসামগ্রী আমাদের হস্তগত হইল। তন্মধ্যে উট ছিল দুই শত এবং উষ্ট্রশাবক ও ছাগল ছিল দুই হাজার। এক-পঞ্চমাংশ রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্য পৃথক করিয়া অবশিষ্টগুলি মুজাহিদগণের মধ্যে বণ্টন করা হইল। প্রত্যেকেই ১২টি করিয়া উট পাইল। একটি উট দশটি ছাগলের সমপরিমাণ ধরা হইয়াছিল। যুদ্ধবন্দীদের সহিত চারিজন মহিলাও ছিল।
আল-ওয়াকিদী বলেন, মুহাম্মাদ ইব্ন ইয়াহইয়া তাঁহার পিতা হইতে বর্ণনা করেন যে, ঐ 'অভিযানে আবূ কাতাদার সহিত আবুল হাদরাদকেও প্রেরণ করা হইয়াছিল, এবং অভিযানে অংশগ্রহণ করিয়াছিল ষোলজন মুজাহিদ। তাহারা মদীনা নগরীর বাহিরে পনর দিন অতিবাহিত করেন। প্রত্যেক যোদ্ধার অংশে পড়িয়াছিল বারটি করিয়া উট। যুদ্ধলব্ধ সামগ্রীর মধ্যে ছিল চারিজন যুবতী। তন্মধ্যে একজন ষোড়শী রূপবতী যুবতীও ছিল। আবু কাতাদার অংশেই তাহাকে দেওয়া হইল। মাহমিয়া ইন্ন জাম'আ উক্ত যুবতীকে মহানবী (স)-এর জন্য চাহিল। রাসূলুল্লাহ (স) আবূ কাতাদার নিকট তাহাকে চাহিলেন। আবু কাতাদা তাহাকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর হস্তে সমর্পণ করিলে তিনি তাহাকে মাহমিয়া ইব্ন জাম'আকে প্রদান করেন। আবুল হাদরাদ বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) উটগুলির মধ্য হইতে আমাকে তেরটি উট দিয়াছিলেন। উহার দ্বারাই আমি মোহরানা আদায় করিয়া আমার নববধূকে গৃহে আনয়ন করিলাম (তারীখে তাবারী, ৩খ., পৃ. ৩৪: আত্-তাবাকাতুল কুবরা, ২খ., পৃ. ১৩২; উয়ূনুল আছার, ২খ., পৃ. ২০৯; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ২২২)। উক্ত বক্তব্যের প্রেক্ষিতে কেহ কেহ এই অভিযানকে 'সারিয়্যা আবুল হাদরাদ' শিরোনামেও উল্লেখ করিয়াছেন।
📄 সারিয়্যা খালিদ ইব্দুল ওয়ালীদ (বানু জাযীমা অভিযান)
মক্কা বিজয়ের পর রাসূলুল্লাহ (স) ইহার বিভিন্ন অংশের নিরাপত্তা ও শান্তি প্রতিষ্ঠাকল্পে এবং ইসলামের প্রচার ও প্রসারের উদ্দেশ্যে বিশিষ্ট সাহাবীগণের নেতৃত্বে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দল প্রেরণ করেন। এই সময় হযরত খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ (রা)-এর নেতৃত্বে সাড়ে তিন শত সাহাবীকে জাযীমা গোত্রের এলাকায় প্রেরণ করেন। এই অভিযানকে সারিয়্যা গুমায়সাও বলা হয় (মুফতী মুহাম্মাদ শফী, সীরাতে খাতিমুল আম্বিয়া, পৃ. ৭৩)। হযরত খালিদ (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর নির্দেশমত তাহাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন। তাহারা আগেই ইসলাম কবুল করিয়াছিল, কিন্তু তাহা সঠিকভাবে প্রকাশ করিতে ব্যর্থ হয়। তাহারা সাহাবীগণকে দেখামাত্র চীৎকার করিয়া বলিতে লাগিল, صبأنا صبأنا (আমরা ধর্মত্যাগ করিয়াছি, আমরা ধর্মত্যাগ করিয়াছি)। অথচ এই বাক্য দ্বারা তাহাদের উদ্দেশ্য ছিল আমরা আমাদের পূর্বপুরুষের পৌত্তলিকতা পরিত্যাগ করিয়া ইসলাম গ্রহণ করিয়াছি। কিন্তু اٰمَنَّا "ঈমান আনিয়াছি” অথবা اَسْلَمْنَا "ইসলাম গ্রহণ করিয়াছি" এই সমস্ত শব্দ না বলাতে হযরত খালিদ (রা) তাহাদিগকে ভুল বুঝিলেন এবং মুসলিম বলিয়া গণ্য করিলেন না, বরং ক্রুদ্ধ হইয়া তাহাদের কয়েকজনকে হত্যা করিলেন। তিনি অবশিষ্ট লোকদিগকে গ্রেফতার করিয়া হেফাজতের জন্য সাহাবীগণের মধ্যে বণ্টন করিয়া দিলেন। সাহাবীগণ বন্দীদিগকে নিজ নিজ পাহারায় রাত্রি যাপন করিলেন।
ভোরে খালিদ (রা) সাহাবীদিগকে নির্দেশ দিলেন, আপনারা নিজ নিজ বন্দীদিগকে হত্যা করুন। বানূ সুলায়ম গোত্রের সাহাবীগণ তাঁহার নির্দেশ অনুযায়ী আপন-বন্দীগণকে হত্যা করিলেন। কিন্তু মুহাজির ও আনসারগণ আপন আপন বন্দীগণকে হত্যা না করিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে উপস্থিত করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) এই সংবাদ জানিতে পারিয়া খুবই দুঃখিত হইলেন এবং আকাশের দিকে হাত তুলিয়া বলিলেন, "হে আল্লাহ! তুমি জান, খালিদ যাহা করিয়াছে তাহার সঙ্গে আমার কোন সম্পর্ক নাই। হে আল্লাহ! তুমি জান, খালিদ যাহা করিয়াছে তাহার সঙ্গে আমার কোন সম্পর্ক নাই" (সহীহুল বুখারী, ১খ., পৃ. ৪৫০; ২খ., পৃ. ৬২২)।
হযরত খালিদ (রা) ভুলবশত এই হত্যা ও গ্রেফতারের নির্দেশ দিয়াছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (স) এইজন্য অনেক দিন পর্যন্ত হযরত খালিদ (রা)-এর প্রতি অসন্তুষ্ট ছিলেন। এই বিষয় লইয়া 'আবদুর রহমান ইব্ন আওফ (রা) ও খালিদ (রা)-এর মধ্যে একবার কথা কাটাকাটি হয়। রাসূলুল্লাহ (স) তাহা শুনিতে পাইয়া অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হইয়া খালিদ (রা)-কে বলিলেন, "তুমি চুপ থাক! যদি তুমি উহুদ পাহাড়ের সমপরিমাণ স্বর্ণও আল্লাহ্র রাস্তায় দান কর, তথাপি তুমি আমার কোন প্রবীণ সাহাবীর সমমর্যাদায় পৌঁছিতে পারিবে না” (তারীখ খালিদ ইবনিল ওয়ালীদ, পৃ. ৭৭)।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) জান-মালের ক্ষতিপূরণ আদায় করিয়া দেওয়ার জন্য বহু অর্থসহ হযরত 'আলী (রা)-কে বানু জাযীমার নিকট প্রেরণ করেন। তিনি তথায় পৌঁছিয়া নিহতদের রক্তপণ আদায় করিয়া দেখিতে পাইলেন যে, কিছু অর্থ বাঁচিয়া গিয়াছে। এমনকি তাহাদের কুকুরের মূল্যও তিনি আদায় করিয়াছিলেন। তিনি উদ্বৃত্ত অর্থও তাহাদের মধ্যে বণ্টন করিয়া দিলেন। বানু জাযীমা রসূলুল্লাহ্ (স)-এর সদ্ব্যবহার দেখিয়া মুগ্ধ হয় এবং তাঁহার প্রতি যারপরনাই সন্তুষ্ট হয় (দিয়ার বাকরী, তারীখুল খামীস, ২খ., পৃ. ৭৭-৯০)।
হযরত 'আলী (রা) মক্কায় প্রত্যাবর্তন করিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট বিস্তারিত ঘটনা বিবৃত করিলেন। এই হত্যাকাণ্ডের কারণে খালিদ (রা) তাঁহার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেন নাই— এই অভিযোগে অভিযুক্ত হইলেন। রাসূলুল্লাহ (স) এইজন্য তাহাকে কঠোর ভাষায় ভর্ৎসনা করেন যাহাতে তিনি ভবিষ্যতে তাহার দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সতর্ক থাকেন যাহা একটি বাহিনীর অধিনায়কের জন্য জরুরী। রাসূলুল্লাহ (স) সাহাবীগণের অনুরোধে খালিদ (রা)-কে এইবারের জন্য ক্ষমা করিলেন।
টিকাঃ
১. ইবন হাম্, জামহারাতু আনসাবিল আরাব, ৩খ., পৃ. ১৯৬
২. আল-আয়নী, উমদাতুল কারী, ১৭খ., পৃ. ১৬৯
৩. ইয়াকৃত আল-হামাবী, মুজামুল বুলদান, ৪খ., পৃ. ১৯১
৪. যুরকানী, শারহুল মাওয়াহিব, ২খ., পৃ. ১৪৭
৫. মুহাম্মাদ রিদা, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্, ১৯৭৫ খৃ., পৃ. ২৪৩
৬. যুরকানী, শারহুল মাওয়াহিব, ২খ., পৃ. ১৪৭
৭. ইব্ন হিশাম, আস-সীরা
৮. হাফিজ ইবন হাযম, প্রাগুক্ত
৯. ইবনুল আছীর, আল-কামিল, ২খ., পৃ. ১৮৮
১০. যুরকানী, প্রাগুক্ত
১১. ড. মুহাম্মাদ হ'সায়ন হায়কাল, বাংলা অনু. মহানবীর জীবন চরিত, পৃ. ৪৫৯
১২. হালাবী, প্রাগুক্ত, ১খ., পৃ. ৬৭৭
১৩. কান্ধলবী, সীরাতুল মুস্তাফা, ২খ., পৃ. ২৯
১৪. দানাপুরী, আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ১৫৩
১৫. ইবনুল কায়্যিম, যাদুল মা'আদ, ২খ., পৃ. ১১৯
১৬. আবদুল্লাহ, মুখতাসারু সীরাতির, রাসূল, লাহোর ৭৯খৃ., পৃ. ২৯২
📄 সারিয়্যা 'আমর ইবনুল 'আস (রা) (যাতুস সালাসিল)
(যাতুস সুলাসিল বা যাতুস সালাসিল স্থানটি ওয়াদিল কুরা অতিক্রম কারিয়া মদীনা হইতে দশ দিনের পথের দূরত্বে অবস্থিত। এই সারিয়্যা অষ্টম হিজরীর জুমাদাল আখিরা মাসে সংঘটিত হয়।
ইন্ন সা'দ উল্লেখ করেন, রাসূলুল্লাহ (স) সংবাদ পাইলেন যে, বানু কুদা'আ গোত্রের একদল লোক মদীনা আক্রমণের জন্য সংঘবদ্ধ হইতেছে। রাসূলুল্লাহ (স) হযরত 'আমর ইবনুল 'আস (রা)-কে এই যুদ্ধের সেনাপতি মনোনীত করেন এবং তাঁহাকে একটি শ্বেত বর্ণের পতাকা এবং দলের জন্য একটি কালো বর্ণের পতাকা দেন। 'আমর ইবনুল 'আস বালী, 'উষরা ও বানুল কায়ন গালী উহারা ও বালকীন গোত্রের সাহায্য গ্রহণ করিতে নির্দেশ দেন। তিন শত জন যোদ্ধা, ত্রিশটি ঘোড়া এবং সেরা আনসার ও মুহাজিরদিগকে তাহার অধীনে যুদ্ধের জন্য প্রেরণ করেন। তাহারা রাতের বেলা পথ চলিতেন এবং দিনের বেলা গোপনে বিশ্রাম নিতেন। এইভাবে চলিতে চলিতে ঘটনাস্থলের নিকটবর্তী হইয়া শত্রুপক্ষের সংখ্যাধিক্য সম্পর্কে অবগত হইলেন। 'আমর ইবনুল 'আস (রা) মদীনায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর সমীপে আরও সৈন্য পাঠাইবার আরয জানাইয়া রাফে' ইব্ন মাকীস (রা)-কে পাঠাইলেন। রাসূলুল্লাহ (স) সংবাদ পাইয়া হযরত আবূ 'উবায়দা ইবনুল জাররাহ (রা)-এর নেতৃত্বে আরও দুই শত সৈন্য প্রেরণ করিলেন। এই দলেও অনেক বিশিষ্টি মুহাজির ও আনসার সাহাবী ছিলেন। যথা হযরত আবূ বাক্স সিদ্দীক (রা), হযরত 'উমার (রা)। যাত্রাকালে রাসূলুল্লাহ (স) অত্যন্ত গুরুত্বসহ বলিলেন, "তোমরা 'আমর ইবনুল 'আসের বাহিনীর সাথে মিলিত হও। সদা আমরের সাথে মিলিয়া কাজ করিবে, মতপার্থক্য করিবে না।” এই কথা বলিবার কারণ এই যে, 'আমর ইবনুল 'আস (রা) মাত্র কয়েক দিন আগে মুসলমান হইয়াছেন। উল্লেখ্য যে, 'আমর ইবনুল 'আস (রা) অষ্টম হিজরীর সফর মাসে ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিলেন (সীরাতুল-মুস্তাফা, ২খ., পৃ. ৪৫৫)। অপরদিকে হযরত 'আবূ 'উবায়দা ইবনুল জাররাহ (রা) এবং তাঁহার সহযাত্রী অন্যান্য সৈন্যদের অনেকেই পুরাতন মুসলমান। তাই তাঁহাদিগের মধ্যে মতপার্থক্য ও ভুল বুঝাবুঝি হইতে পারে।
রাসূলুল্লাহ (স) আবূ 'উবায়দা ইবনুল জাররাহ (রা)-কেও একটি পৃথক ঝাণ্ডা প্রদান করিলেন। তাহারা যখন 'আমর ইবনুল 'আস (রা)-এর দলের সহিত মিলিত হইলেন এবং নামাযের সময় হইল তখন আবূ 'উবায়দা ইমাম হইতে ইচ্ছা করিলেন। কিন্তু হযরত 'আমর তাঁহাকে বাধা দিয়া বলিলেন, আমি সেনাপতি। আপনারা কেবল আমার সাহাযার্থ্যে প্রেরিত হইয়াছেন। আবূ 'উবায়দা (রা) বলিলেন, রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে মতপার্থক্য ও বিবাদ করিতে নিষেধ করিয়াছেন। নতুবা আমি আমার দলের প্রধান, আমি আপনার আনুগত্য করিতে প্রস্তুত। অতঃপর 'আমর ইবনুল 'আস (রা)-ই ইমামত করিতে থাকেন (আর রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৩৯২)।
ইবন ইসহাক লিখিয়াছেন যে, আবূ 'উবায়দা ইবনুল জাররাহ (রা) অত্যন্ত নরম প্রকৃতির লোক ছিলেন। তাই তিনি এই বিষয়ে 'আমর ইবনুল 'আসের সাথে বিবাদে লিপ্ত হন নাই (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ২৪০)।
এই সফরে 'আমর ইবনুল 'আস (রা)-এর সাথে হযরত উমার (রা)-এরও এক পর্যায়ে মনোমালিন্য সৃষ্টি হইয়াছিল। অতঃপর হযরত আবূ বাক্স সিদ্দীক (রা)-এর মধ্যস্থতায় তাহা বিদূরিত হয়। ঘটনা এই যে, একবার কয়েকজন সৈনিক প্রয়োজনবশত আগুন জ্বালাইতে চাহিলেন, কিন্তু হযরত 'আমর (রা) কঠোরভাবে তাহা নিষেধ করিলেন। উমার (রা) বলিলেন, প্রয়োজনবশতই তো আগুন জ্বালানো হইবে, আপনি নিষেধ করিতেছেন কেন? হযরত আবূ বাক্স সিদ্দীক (রা) উমার (রা)-কে বাঁধা দিয়া বলিলেন, হে উমার! যুদ্ধ সম্বন্ধে আমাদের অভিজ্ঞতার চাইতে 'আমর ইবনুল 'আসের অভিজ্ঞতা বেশী আছে বলিয়াই তো রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে আমাদের আমীর নির্বাচিত করিয়াছেন। তাই প্রতিবাদ না করিয়া তাহার ফায়সালা মানিয়া লও (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ২৪০)।
অবশেষে মুসলিম সৈন্যগণ বানু কুদা'আ গোত্রের নিকট উপনীত হইলেন এবং তাহাদের উপর আক্রমণ করিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই শত্রুবাহিনী রণে ভঙ্গ দিয়া পলায়ন করিতে বাধ্য হইল। মুসলমানগণ বিজয়ী হইলেন। সাহাবা-ই কিরাম (রা) হযরত 'আওফ ইবন মালিক (রা)-কে বিজয়ের সংবাদ জানাইবার জন্য মদীনায় প্রেরণ করিলেন। 'আওফ ইবন মালিক (রা) মদীনায় পৌঁছিয়া দেখিলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম সালাতরত আছেন। সালাত সমাপ্ত হইলে ঘরের বাহিরে থাকিয়াই তিনি সালাম জানাইলেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, কে, 'আওফ? তিনি উত্তর করিলেন, হাঁ। অতঃপর 'আওফের নিকট হইতে অভিযানের ফলাফল, আমীরদ্বয়ের মতানৈক্য এবং অন্যন্য ছোটখাট বিষয় সবিস্তারে অবহিত হইয়া রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আল্লাহ তা'আলা আবূ 'উবায়দাকে রহম করুন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ., পৃ. ২৭৮)।
যুদ্ধ বিজয়ের পর সেনাপতি হযরত 'আমর ইবনুল 'আস (রা)-এর নির্দেশে গনীমতের মাল একত্র করা হইল। তাঁহারা সেখানে আরও কিছু দিন অবস্থান করিয়া পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলিতে ছোট ছোট অভিযান পরিচালনা করিলেন, অবশেষে প্রচুর গনীমতের মালসহ বিজয়ী বেশে মদীনায় প্রত্যাবর্তন করিলেন।
এই অভিযান প্রসংগে আল্লামা ইবনুল কায়্যিম জাওযিয়্যা (র) ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল (র) রাসূলুল্লাহ (স)-এর সনদে বর্ণনা করিয়াছন যে, রাসূলুল্লাহ (স) সেনাপতি 'আমর ইবনুল 'আস (রা)-কে বানু বাক্সের উপর হামলা করিবার জন্য নির্দেশ দিয়াছিলেন। কিন্তু সেনাপতি 'আমর বানু বাক্সের পরিবর্তে বানু কুদা'আর উপর হামলা করিলেন। ইহার কারণ এই যে, বানু বাক্সের সাথে তাঁহার আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল। এই পরিস্থিতিতে মুগীরা ইব্ন শু'বা (রা) আবূ 'উবায়দা (রা)-এর নিকট আসিয়া বলিলেন, রাসূলুল্লাহ (স) আপনাকে আমাদের সেনাপতি মনোনীত করিয়াছেন। আমর ইবনুল 'আস গোত্রের পক্ষাবলম্বন করিয়াছে। কাজেই আপনার উচিৎ হইবে না তাহার আনুগত্য করিয়া বানু কুদা'আর বিরুদ্ধে অভিযানে অংশগ্রহণ করা। আবূ 'উবায়দা (রা) বলিলেন, দেখ, রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে বিবাদ করিতে নিষেধ করিয়াছেন এবং আনুগত্যের নির্দেশ দিয়াছেন। আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর আনুগত্য করিতেছি, আমর যাহাই করুক না কেন। ইবন ইসহাক বলেন, হযরত আবু উবায়দা ছিলেন নরম প্রকৃতির লোক, দুনিয়া বিমুখ এবং নেতৃত্বের প্রতি ছিল তাঁহার অনাসক্তি। তাই তিনি এই সকল বিষয়ে বিবাদে যান নাই (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ২৪০)।
ইবনুল কায়্যিম আল-জাওযিয়্যা বর্ণিত উপরোল্লিখিত রিওয়ায়াতটি পর্যালোচনা ও সত্যাসত্য যাচাইয়ের যথেষ্ট অবকাশ রাখে। কারণ ইহার বিষয়বস্তু ইসলামী জিহাদের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য এবং রাসূলের প্রতি সাহাবায়ে কিরামের প্রমাণিত আনুগত্যের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। উপরন্ত এই জামা'আতে শরীক ছিলেন হযরত আবূ বাক্স সিদ্দীক (রা), হযরত উমার (রা), হযরত সা'দ ইবন 'উবাদা (রা) এবং হযরত সা'দ ইবন আবী ওয়াক্কাস (রা)-এর ন্যায় প্রথম সারির মুহাজির ও আনসার সাহাবা কিরাম (রা)। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) ইরশাদ করিয়াছেন, যে আমার আনুগত্য করিল, সে আল্লাহর আনুগত্য করিল এবং যে আমাকে 'অমান্য করিল, সে আল্লাহকে অমান্য করিল (মিশকাত, পৃ. ২৬৩)।
জিহাদের উদ্দেশ্য, সম্বন্ধে রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, 'আল্লাহ্ দীন সমুন্নত হউক' এই উদ্দেশ্যে যে ব্যক্তি লড়াই করিল, তাহার লড়াই আল্লাহর পথে হইয়াছে বলিয়া গণ্য হইবে। পক্ষান্তরে যেই যুদ্ধ গোত্রীয় স্বার্থে কিংবা নিছক জাগতিক উদ্দেশ্যে হইবে, তাহাকে কিছুতেই জিহাদ বলা যাইবে না (মিশকাত, পৃ. ৩৩১)। কাজেই রাসূলুল্লাহ (স) যদি বানু বাক্রের উপর হামলা করিবার জন্য প্রেরণ করিয়া থাকেন আর সেনাপতি 'আমর তাহার আত্মীয়তার খাতিরে তাহা না করিয়া আরেকটি নিরপরাধ গোত্রের উপর হামলা পরিচলনা করিবেন— এই কথা যেমন মানিয়া লওয়া যায় না, অনুরূপ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ সাহাবাগণ প্রকাশ্যে রাসূলের নির্দেশের বিপরীত কাজ দেখিয়াও চুপ পকিবেন কেবল এই অজুহাতে যে, তিনি বিবাদ করিতে নিষেধ করিয়াছেন, ইহাও কল্পনা করা যায় না।
এই অভিযানে আরও একটি ঘটনা ঘটিয়াছিল। তাহা এই যে, তখন খুব শীত পড়িতেছিল। পথিমধ্যে সেনাপতি 'আমর ইবনুল 'আস (রা)-এর গোসল ফরয হইয়া গেল। তিনি শীতের ভয়ে গোসল না করিয়া তায়াম্মুম করিলেন এবং ফজরের নামায ইমামতি করিলেন। মদীনায় ফিরিবার পর রাসূলুল্লাহ (স) খুঁটিনাটি সমস্ত বিষয় অবগত হইয়া 'হযরত আমর ইবনুন 'আস (রা)-এর নিকট তাঁহার কর্মসমূহের কৈফিয়ত চাহিলেন। 'আমর ইবনুল 'আস একে একে সমস্ত ঘটনার কৈফিয়ত দিলেন। তিনি বলিলেন, আগুন জ্বালাইলে দূর হইতে শত্রুগণ আমাদিগকে দেখিতে পাইত এবং আমাদিগের সংখ্যা কম দেখিয়া আমাদিগকে দুর্বল মনে করিত, এই আশংকায় আমি আগুন জ্বালাইতে নিষেধ করিয়াছি।
আর আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করিয়াছেন, "তোমরা নিজকে নিজে হত্যা করিও না। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদিগের প্রতি দয়ালু" (সূরা নিসা: ২৯)।
এই প্রচণ্ড শীতের মধ্যে গোসল করিলে হয়ত আমি মারা যাইতে পারি এই আশঙ্কায় আমি গোসল না করিযা তায়াম্মুম করিয়া নামায পড়াইয়াছি। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার কৈফিয়ত শুনিয়া হাসিলেন আর কিছু বলিলেন না (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ., পৃ. ২৭৩)।
উল্লেখ্য যে, কতিপয় মুহাদ্দিছ ও সীরাত লেখক এই অভিযানকে গাযওয়া নামে অভিহিত করেন, যদিও রাসূলুল্লাহ (স) এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন নাই।
এই যুদ্ধে 'আমের ইবন রাবী'আ (রা) চোখে আঘাত পইয়া অন্ধ হইয়া যান এবং তাঁহার একটি পা নষ্ট হইয়া যায় (বিদায়া, ২খ., পৃ. ২৭৩)।
এই যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (স)-এর একটি মু'জিযা প্রকাশ পাইয়াছিল। বর্ণনাকারী সাহাবী হযরত 'আওফ ইবন মালিক (রা) বলেন, এই যুদ্ধে আমি আবূ বাক্স সিদ্দীক (রা) এবং উমার (রা)-এর সাথে ছিলাম। পথে এক জায়গায় দেখিলাম, একদল লোক একটি উট যবেহ করিয়াছে। কিন্তু তাহারা উহার গোশত বানাইতে পারিতেছে না। আমি ছিলাম দক্ষ কসাই। তাই বলিলাম, ইহা বানাইয়া প্রস্তুত করিয়া দিলে আমাকে একটি ভাগ দিবে কি না? তাহারা রাযী হইল। আমি দ্রুত উহা বানাইয়া আমার ভাগ লইয়া কفেলার সহিত আসিয়া যুক্ত হইলাম। পরে গোস্ত রান্না করিয়া সাথীদিগকে আপ্যায়ন করিলাম। আবূ বাক্র সিদ্দীক (রা) এবং উমার (রা) ঘটনার বৃত্তান্ত শুনিয়া গলায় আঙ্গুল দিয়া বমি করিয়া ভক্ষিত খাবার ফেলিয়া দিলেন। অভিযান শেষে আমি মদীনায় ফিরিয়া আসিলাম। তখন রাসূলুল্লাহ (স) নামায পড়িতেছিলেন। নামায শেষ হইলে আমি সালাম করিলাম। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, কে? আওফ ইবন মালিক, যিনি উটের গোশত বানাইয়া দিয়াছিল? (খাসাইসুল কুবরা, ১খ., পৃ. ২৬১)।
বনূ কুদা'আহ্ গোত্র অষ্টম হিজরীর শেষে অথবা নবম হিজরীর শুরুতে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হইয়াছিল। বর্ণিত আছে যে, 'আমুল উযূদ বা প্রতিনিধি দল সমাগমের বৎসর অর্থাৎ নবম হিজরীতে বনূ কুদা'আর একটি প্রতিনিধি দল মদীনায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে উপস্থিত হন। যখন তাহারা পৌছিলেন তখন রাসূলুল্লাহ (স) মসজিদে নববীর অভ্যন্তরে সুহায়ল ইবন বায়দা (রা)-এর জানাযার নামায পড়াইতেছিলেন। তাহারা জানাযায় অংশগ্রহণ না করিয়া এক স্থানে চুপ করিয়া বসিয়া রহিলেন। তাহারা ভাবিলেন, রাসূলের হাতে বায়'আত হইয়া মুসলমান হইবার পূর্বে জানাযায় শামিল হওয়া যায় না। জানাযা শেষ করিয়া রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করিয়াছ? তাহারা বলিলেন, হাঁ। তিনি বলিলেন, তবে তোমাদের ভাইয়ের জানাযায় শরীক হও নাই কেন? তাহারা আরয করিলেন, আমরা মনে করিয়াছি যে, আপনার হাতে হাত রাখিয়া বায়'আত না করা পর্যন্ত আমরা মুসলমান হইতে পারি নাই এবং কোন ধর্মানুষ্ঠান পালনের অধিকারও আমাদের নাই। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, যখন তোমরা ইসলাম গ্রহণ করিয়াছ তখন হইতেই মুসলমান হইয়াছ। তৎপর তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর দস্তমুবারকে হাত রাখিয়া বায়'আত করিলেন।
তাহাদিগের বাহন এবং মালপত্র দেখাশুনা করিবার জন্য তাহাদের একজনকে বসাইয়া রাখিয়াছিলেন। পরে তাহাকে রাসূলুল্লাহ (স) খেদমতে হাযির করাইয়া তাহারা বলিলেন, এই লোকটি আমাদের মধ্যে অল্পবয়স্ক। এইজন্য আমরা তাহার খেদমত গ্রহণ করি। তিনি বলিলেন, "আসগারুল কাওমি খাদিমুহুম” ছোটদেরকে বড়দের খেদমত করিতে হয়। তৎপর তিনি তাহাকেও বায়আত করিলেন এবং তাহার জন্য দু'আ করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স)-এর দু'আয় লোকটি তাহাদের মধ্যে প্রত্যেক নেক কাজেই শ্রেষ্ঠ ও অগ্রগামী হইলেন। এমনকি রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে বনূ কুদা'আর নেতা ও ইমাম নিযুক্ত করিয়াছিলেন। বিদায়কালে রাসূলুল্লাহ (স) তাহদিগকে অন্যান্য প্রতিনিধি দলের মতই হাদিয়া প্রদান করিলেন। তাহারা দেশে ফিরিয়া আসিয়া গোত্রের সকলেই ইসলাম গ্রহণের দা'ওয়াত দিলেন। ফলে তাহারা মুসলমান হইয়া গেল (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ৪৩৬-৪৩৭)।
এই বর্ণনা হইতে প্রমাণিত হয় যে, বনূ কুদা'আর লোকেরা নবম হিজরীর পূর্বে কোন এক সময় মুসলমান হইয়াছিল। এই কারণেই তাহারা পূর্ণাঙ্গ ইসলাম শিখিবার জন্য রাসূলুল্লাহ (স)-এর খেদমতে প্রতিনিধি দল প্রেরণ করিতে অনুপ্রাণিত হইয়াছিল।
📄 সারিয়্যা সাঈদ ইব্ন যায়দ আল-আশহালী
ইবন হিশামসহ কতিপয় ঐতিহাসিকের মতানুসারে মক্কা ও মদীনার মধ্যস্থলে কুদায়দ অঞ্চলে আওস ও খায়রাজের উপাস্য দেবতা মানাত-এর বিগ্রহ প্রতিষ্ঠিত ছিল। কিন্তু ইবন সা'দ, শায়খ আবদুল হক প্রমুখের অভিমত অনুসারে মুশাল্লাল নামক স্থানে আওস, খাযরাজ ও গাস্সান গোত্রের উপাস্য দেবতা মানাতের বিগ্রহ স্থাপিত ছিল (মাদারিজুন নুবুওয়াহ, ২খ., পৃ. ৫১১; তাবাকাত, ২খ., পৃ. ১৪৬)। অষ্টম হিজরীর রমযান মাসে পবিত্র মক্কা নগরী বিজয়ের পর মহানবী (স) হযরত সাঈদ ইব্ন যায়দের নেতৃত্বে বিশজন অশ্বারোহী সৈনিকের একটি বাহিনী মানাত বিগ্রহ ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে প্রেরণ করিলেন। সাঈদ ইবন যায়দ যখন সেখানে উপস্থিত হইলেন এবং পুরোহিতের সহিত সাক্ষাত করিলেন, তখন অভিযানের উদ্দশ্যে অবগত হইয়া পুরোহিত বলিল, "যাও, মানাত! তোমার রোষের প্রতিফলন দেখাইয়া দাও"। ইবন সায়্যিদিন নাস উল্লেখ করিয়াছেন, ওহে মানাত! আমাদের মধ্যে কিছু বৈরী লোক আছে যাহারা তোমার অপ্রিয়ভাজন ও বিরুদ্ধবাদী। হজরত সাঈদ বিগ্রহের নিকটবর্তী হইলে দেখিতে পাইলেন, একটি নগ্ন কৃষ্ণকায়া নারী আলুলায়িত কেশে সম্মুখে আসিয়া উপস্থিত হইল এবং নিজের বক্ষ চাপড়াইয়া বলিতে লাগিল, হায় সর্বনাশ! হায় সর্বনাশ!! হযরত সাঈদ অসির আঘাতে তাহাকে ছিন্নভিন্ন করিয়া ফেলিলেন। অতঃপর সম্মুখে অগ্রসর হইয়া আঘাত হানিয়া বিগ্রহটিকে চুরমার করিয়া দিলেন। কোষাগারে হানা দিয়া দেখিলেন, কোষাগার একেবারেই শূন্য। অতঃপর তিনি মহানবী (স)-এর দরবারে ফিরিয়া আসিলেন (মাদারিজুন্ নুবুওয়াহ, ২খ., পৃ. ৫১১; তারীখে তাবারী, (উর্দু), ১খ., পৃ. ৪০৬; যাদুল মা'আদ, ২খ., পৃ. ৩৪৯; উয়ূনুল আছার, ২খ., পৃ. ২৩৪)।