📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 গাযওয়া মু'তা

📄 গাযওয়া মু'তা


এই অধ্যায়ে কোনো কন্টেন্ট এখনো যোগ করা হয়নি।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সারিয়‍্যা যাতুস-সালাসিল

📄 সারিয়‍্যা যাতুস-সালাসিল


যাতুস্-সালাসিল (ذات السلاسل( সুলসুল )سلسل(-এর বহুবচন। ইবন ইসহাকের বর্ণনামতে ইহা একটি কুপের নাম। উহার দিকে সম্পর্কিত করিয়াই এই অভিযানকে সারিয়‍্যা যাতুস্ সালাসিল বলা হয়। উল্লেখ্য যে, শব্দটিকে 'সালাসিল, 'সুলাসিল' বা উভয় উচ্চারণেই পাঠ করা যায়। স্থানটি ওয়াদিউল কুরার )وادی القرى( নিকটবর্তী। মদীনা মুনাওয়ারা হইতে ইহার দূরত্ব দশ মনযিল। এলাকাটিতে "বনূ কুদা'আ"-এর বসতি ছিল (তাবাকাত, ২খ., পৃ. ৯৪; যাদুল মা'আদ, ২খ., পৃ. ১৫৮)।
হিজরী অষ্টম সনের জুমাদাল উখরা মাসে (অকটোবর ৬২৯ খৃ.) রাসূলুল্লাহ (স) এই সারিয়‍্যা প্রেরণ করেন। রাসূলুল্লাহ (স) এই মর্মে সংবাদ পাইলেন যে, মৃ'তার যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী কতিপয় কাফির শত্রু পুনরায় একত্র হইয়া বানু কুদা'আর নেতৃত্বে মদীনা আক্রমণ করিবার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করিতেছে। তাই তিনি তাহাদিগকে দমন করিবার জন্য হযরত 'আমর ইবনুল 'আস (রা)-এর নেতৃত্বে তিন শত পদাতিক সৈন্য এবং ত্রিশজন অশ্বারোহী বাহিনী প্রেরণ করেন। মুহাজির ও আনসারদের মধ্য হইতে অনেক বিশিষ্ট সাহাবা-ই কিরাম এই বাহিনীতে যোগদান করিয়াছিলেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ., পৃ. ২৭২)।
রাসূলুল্লাহ (স) সেনাপতি আমর ইবনুল 'আস (রা)-কে একটি সাদা পতাকা ও একটি কালো পতাকা প্রদান করিলেন (তাবাকাত, ২খ., পৃ. ১৩১) এবং বলিলেন, 'আমর! আমি তোমাকে একটি সৈন্যদলের সেনাপতি করিয়া প্রেরণ করিতেছি। আল্লাহ তা'আলা তোমাদিগকে বিজয় ও গনীমত দান করিবেন এবং তোমাদিগকে নিরাপদে মদীনায় ফিরাইয়া আনিবেন। হযরত আমর ইবনুল 'আস (রা) বলিলেন, আমি তো মালের লোভে ইসলাম গ্রহণ করি নাই? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, "নেক ব্যক্তির জন্য সদুপায়ে অর্জিত সম্পদ কতইনা উত্তম"। 'আমর ইবনুল 'আস (রা)-এর মামা বাড়ী ছিল সেই এলাকায়, তাই রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে পরামর্শ দিলেন যে, সেই এলাকার আশেপাশে বসবাসকারী গোত্রগুলি হইতে সহযোগিতা লইবে। যথা বালী গোত্র, বানু কাঈন গোত্র ইত্যাদি। সাহাবা-ই কিরাম রওয়ানা হইলেন। যুদ্ধ কৌশল হিসাবে তাঁহারা রাতের বেলা পথ চলিতেন এবং দিনের বেলা আত্মগোপন করিয়া থাকিতেন। তাঁহারা জুযাম অঞ্চলে অবস্থিত সালাসিল কুপের নিকটবর্তী পৌঁছিয়া জানিতে পারিলেন যে, শত্রুদের সৈন্যসংখ্যা অনেক বেশী। তাই 'আমর ইবনুল 'আস (রা) মদীনায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর খেদমতে আরও সৈন্য পাঠাইবার আরয জানাইয়া রাফে' ইব্‌ন মাকীস (রা)-কে পাঠাইলেন। রাসূলুল্লাহ (স) সংবাদ পাইয়া হযরত আবূ 'উবায়দা ইবনুল জাররাহ (রা)-এর নেতৃত্বে আরও দুই শত সৈন্য প্রেরণ করিলেন। এই দলেও অনেক বিশিষ্টি মুহাজির ও আনসার সাহাবী ছিলেন।
যথা হযরত আবূ বাক্স সিদ্দীক (রা), হযরত 'উমার (রা)। যাত্রাকালে রাসূলুল্লাহ (স) অত্যন্ত গুরুত্বসহ বলিলেন, "তোমরা 'আমর ইবনুল 'আসের বাহিনীর সাথে মিলিত হও। সদা আমরের সাথে মিলিয়া কাজ করিবে, মতপার্থক্য করিবে না।” এই কথা বলিবার কারণ এই যে, 'আমর ইবনুল 'আস (রা) মাত্র কয়েক দিন আগে মুসলমান হইয়াছেন। উল্লেখ্য যে, 'আমর ইবনুল 'আস (রা) অষ্টম হিজরীর সফর মাসে ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিলেন (সীরাতুল-মুস্তাফা, ২খ., পৃ. ৪৫৫)। অপরদিকে হযরত 'আবূ 'উবায়দা ইবনুল জাররাহ (রা) এবং তাঁহার সহযাত্রী অন্যান্য সৈন্যদের অনেকেই পুরাতন মুসলমান। তাই তাঁহাদিগের মধ্যে মতপার্থক্য ও ভুল বুঝাবুঝি হইতে পারে।
রাসূলুল্লাহ (স) আবূ 'উবায়দা ইবনুল জাররাহ (রা)-কেও একটি পৃথক ঝাণ্ডা প্রদান করিলেন। তাহারা যখন 'আমর ইবনুল 'আস (রা)-এর দলের সহিত মিলিত হইলেন এবং নামাযের সময় হইল তখন আবূ 'উবায়দা ইমাম হইতে ইচ্ছা করিলেন। কিন্তু হযরত 'আমর তাঁহাকে বাধা দিয়া বলিলেন, আমি সেনাপতি। আপনারা শুধু আমার সাহাযার্থ্যে প্রেরিত হইয়াছেন। আবূ 'উবায়দা (রা) বলিলেন, রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে মতপার্থক্য ও বিবাদ করিতে নিষেধ করিয়াছেন। নতুবা আমি আমার দলের প্রধান, আমি আপনার আনুগত্য করিতে প্রস্তুত। অতঃপর 'আমর ইবনুল 'আস (রা)-ই ইমামত করিতে থাকেন (আর রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৩৯২)।
ইবন ইসহাক লিখিয়াছেন যে, আবূ 'উবায়দা ইবনুল জাররাহ (রা) অত্যন্ত নরম প্রকৃতির লোক ছিলেন। তাই তিনি এই বিষয়ে 'আমর ইবনুল 'আসের সাথে বিবাদে লিপ্ত হন নাই (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ২৪০)।
এই সফরে 'আমর ইবনুল 'আস (রা)-এর সাথে হযরত উমার (রা)-এরও এক পর্যায়ে মনোমালিন্য সৃষ্টি হইয়াছিল। অতঃপর হযরত আবূ বাক্স সিদ্দীক (রা)-এর মধ্যস্থতায় তাহা বিদূরিত হয়। ঘটনা এই যে, একবার কয়েকজন সৈনিক প্রয়োজনবশত আগুন জ্বালাইতে চাহিলেন, কিন্তু হযরত 'আমর (রা) কঠোরভাবে তাহা নিষেধ করিলেন। উমার (রা) বলিলেন, প্রয়োজনবশতই তো আগুন জ্বালানো হইবে, আপনি নিষেধ করিতেছেন কেন? হযরত আবূ বাক্স সিদ্দীক (রা) উমার (রা)-কে বাঁধা দিয়া বলিলেন, হে উমার! যুদ্ধ সম্বন্ধে আমাদের অভিজ্ঞতার চাইতে 'আমর ইবনুল 'আসের অভিজ্ঞতা বেশী আছে বলিয়াই তো রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে আমাদের আমীর নির্বাচিত করিয়াছেন। তাই প্রতিবাদ না করিয়া তাহার ফায়সালা মানিয়া লও (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ২৪০)।
অবশেষে মুসলিম সৈন্যগণ বানু কুদা'আ গোত্রের নিকট উপনীত হইলেন এবং তাহাদের উপর আক্রমণ করিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই শত্রুবাহিনী রণে ভঙ্গ দিয়া পলায়ন করিতে বাধ্য হইল। মুসলমানগণ বিজয়ী হইলেন। সাহাবা-ই কিরাম (রা) হযরত 'আওফ ইবন মালিক (রা)-কে বিজয়ের সংবাদ জানাইবার জন্য মদীনায় প্রেরণ করিলেন। 'আওف ইবন মালিক (রা) মদীনায় পৌঁছিয়া দেখিলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম সালাতরত আছেন।
সালাত সমাপ্ত হইলে ঘরের বাহিরে থাকিয়াই তিনি সালাম জানাইলেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, কে, 'আওফ? তিনি উত্তর করিলেন, হাঁ। অতঃপর 'আওফের নিকট হইতে অভিযানের ফলাফল, আমীরদ্বয়ের মতানৈক্য এবং অন্যন্য ছোটখাট বিষয় সবিস্তারে অবহিত হইয়া রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আল্লাহ তা'আলা আবূ 'উবায়দাকে রহম করুন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ., পৃ. ২৭৮)।
যুদ্ধ বিজয়ের পর সেনাপতি হযরত 'আমর ইবনুল 'আস (রা)-এর নির্দেশে গনীমতের মাল একত্র করা হইল। তাঁহারা সেখানে আরও কিছু দিন অবস্থান করিয়া পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলিতে ছোট ছোট অভিযান পরিচালনা করিলেন, অবশেষে প্রচুর গনীমতের মালসহ বিজয়ী বেশে মদীনায় প্রত্যাবর্তন করিলেন।
এই অভিযান প্রসংগে আল্লামা ইবনুল কায়্যিম জাওযিয়্যা (R) ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল (R) রাসূলুল্লাহ (স)-এর সনদে বর্ণনা করিয়াছন যে, রাসূলুল্লাহ (স) সেনাপতি 'আমর ইবনুল 'আস (রা)-কে বানু বাক্সের উপর হামলা করিবার জন্য নির্দেশ দিয়াছিলেন। কিন্তু সেনাপতি 'আমর বানু বাক্সের পরিবর্তে বানু কুদা'আর উপর হামলা করিলেন। ইহার কারণ এই যে, বানু বাক্সের সাথে তাঁহার আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল। এই পরিস্থিতিতে মুগীরা ইব্‌ন শু'বা (রা) আবূ 'উবায়দা (রা)-এর নিকট আসিয়া বলিলেন, রাসূলুল্লাহ (স) আপনাকে আমাদের সেনাপতি মনোনীত করিয়াছেন। আমর ইবনুল 'আস গোত্রের পক্ষাবলম্বন করিয়াছে। কাজেই আপনার উচিৎ হইবে না তাহার আনুগত্য করিয়া বানু কুদা'আর বিরুদ্ধে অভিযানে অংশগ্রহণ করা। আবূ 'উবায়দা (রা) বলিলেন, দেখ, রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে বিবাদ করিতে নিষেধ করিয়াছেন এবং আনুগত্যের নির্দেশ দিয়াছেন। আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর আনুগত্য করিতেছি, আমর যাহাই করুক না কেন। ইবন ইসহাক বলেন, হযরত আবু উবায়দা ছিলেন নরম প্রকৃতির লোক, দুনিয়া বিমুখ এবং নেতৃত্বের প্রতি ছিল তাঁহার অনাসক্তি। তাই তিনি এই সকল বিষয়ে বিবাদে যান নাই (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ২৪০)।
ইবনুল কায়্যিম আল-জাওযিয়্যা বর্ণিত উপরোল্লিখিত রিওয়ায়াতটি পর্যালোচনা ও সত্যাসত্য যাচাইয়ের যথেষ্ট অবকাশ রাখে। কারণ ইহার বিষয়বস্তু ইসলামী জিহাদের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য এবং রাসূলের প্রতি সাহাবায়ে কিরামের প্রমাণিত আনুগত্যের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। উপরন্ত এই জামা'আতে শরীক ছিলেন হযরত আবূ বাক্স সিদ্দীক (রা), হযরত উমার (রা), হযরত সা'দ ইবন 'উবাদা (রা) এবং হযরত সা'দ ইবন আবী ওয়াক্কাস (রা)-এর ন্যায় প্রথম সারির মুহাজির ও আনসার সাহাবা কিরাম (রা)। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) ইরশাদ করিয়াছেন, যে আমার আনুগত্য করিল, সে আল্লাহর আনুগত্য করিল এবং যে আমাকে 'অমান্য করিল, সে আল্লাহকে অমান্য করিল (মিশকাত, পৃ. ২৬৩)।
জিহাদের উদ্দেশ্য, সম্বন্ধে রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, 'আল্লাহ্ দীন সমুন্নত হউক' এই উদ্দেশ্যে যে ব্যক্তি লড়াই করিল, তাহার লড়াই আল্লাহর পথে হইয়াছে বলিয়া গণ্য হইবে। পক্ষান্তরে যেই যুদ্ধ গোত্রীয় স্বার্থে কিংবা নিছক জাগতিক উদ্দেশ্যে হইবে, তাহাকে কিছুতেই জিহাদ বলা যাইবে না (মিশকাত, পৃ. ৩৩১)। কাজেই রাসূলুল্লাহ (স) যদি বানু বাক্রের উপর হামলা করিবার জন্য প্রেরণ করিয়া থাকেন আর সেনাপতি 'আমর তাহার আত্মীয়তার খাতিরে তাহা না
করিয়া আরেকটি নিরপরাধ গোত্রের উপর হামলা পরিচলনা করিবেন— এই কথা যেমন মানিয়া লওয়া যায় না, অনুরূপ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ সাহাবাগণ প্রকাশ্যে রাসূলের নির্দেশের বিপরীত কাজ দেখিয়াও চুপ পকিবেন কেবল এই অজুহাতে যে, তিনি বিবাদ করিতে নিষেধ করিয়াছেন, ইহাও কল্পনা করা যায় না।
এই অভিযানে আরও একটি ঘটনা ঘটিয়াছিল। তাহা এই যে, তখন খুব শীত পড়িতেছিল। পথিমধ্যে সেনাপতি 'আমর ইবনুল 'আস (রা)-এর গোসল ফরয হইয়া গেল। তিনি শীতের ভয়ে গোসল না করিয়া তায়াম্মুম করিলেন এবং ফজরের নামায ইমামতি করিলেন। মদীনায় ফিরিবার পর রাসূলুল্লাহ (স) খুঁটিনাটি সমস্ত বিষয় অবগত হইয়া 'হযরত আমর ইবনুন 'আস (রা)-এর নিকট তাঁহার কর্মসমূহের কৈফিয়ত চাহিলেন। 'আমর ইবনুল 'আস একে একে সমস্ত ঘটনার কৈফিয়ত দিলেন। তিনি বলিলেন, আগুন জ্বালাইলে দূর হইতে শত্রুগণ আমাদিগকে দেখিতে পাইত এবং আমাদিগের সংখ্যা কম দেখিয়া আমাদিগকে দুর্বল মনে করিত, এই আশংকায় আমি আগুন জ্বালাইতে নিষেধ করিয়াছি।
আর আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করিয়াছেন, "তোমরা নিজকে নিজে হত্যা করিও না। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদিগের প্রতি দয়ালু" (সূরা নিসা: ২৯)।
এই প্রচণ্ড শীতের মধ্যে গোসল করিলে হয়ত আমি মারা যাইতে পারি এই আশঙ্কায় আমি গোসল না করিযা তায়াম্মুম করিয়া নামায পড়াইয়াছি। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার কৈফিয়ত শুনিয়া হাসিলেন আর কিছু বলিলেন না (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ., পৃ. ২৭৩)।
উল্লেখ্য যে, কতিপয় মুহাদ্দিছ ও সীরাত লেখক এই অভিযানকে গাযওয়া নামে অভিহিত করেন, যদিও রাসূলুল্লাহ (স) এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন নাই।
এই যুদ্ধে 'আমের ইবন রাবী'আ (রা) চোখে আঘাত পইয়া অন্ধ হইয়া যান এবং তাঁহার একটি পা নষ্ট হইয়া যায় (বিদায়া, ২খ., পৃ. ২৭৩)।
এই যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (স)-এর একটি মু'জিযা প্রকাশ পাইয়াছিল। বর্ণনাকারী সাহাবী হযরত 'আওফ ইবন মালিক (রা) বলেন, এই যুদ্ধে আমি আবূ বাক্স সিদ্দীক (রা) এবং উমার (রা)-এর সাথে ছিলাম। পথে এক জায়গায় দেখিলাম, একদল লোক একটি উট যবেহ করিয়াছে। কিন্তু তাহারা উহার গোশত বানাইতে পারিতেছে না। আমি ছিলাম দক্ষ কসাই। তাই বলিলাম, ইহা বানাইয়া প্রস্তুত করিয়া দিলে আমাকে একটি ভাগ দিবে কি না? তাহারা রাযী হইল। আমি দ্রুত উহা বানাইয়া আমার ভাগ লইয়া কফেলার সহিত আসিয়া যুক্ত হইলাম। পরে গোস্ত রান্না করিয়া সাথীদিগকে আপ্যায়ন করিলাম। আবূ বাক্স সিদ্দীক (রা) এবং উমার (রা) ঘটনার বৃত্তান্ত শুনিয়া গলায় আঙ্গুল দিয়া বমি করিয়া ভক্ষিত খাবার ফেলিয়া দিলেন। অভিযান শেষে আমি মদীনায় ফিরিয়া আসিলাম। তখন রাসূলুল্লাহ (স) নামায পড়িতেছিলেন। নামায শেষ হইলে আমি সালাম করিলাম। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, কে? আওফ ইবন মালিক, যিনি উটের গোশত বানাইয়া দিয়াছিল? (খাসাইসুল কুবরা, ১খ., পৃ. ২৬১)।
বনূ কুদা'আহ্ গোত্র অষ্টম হিজরীর শেষে অথবা নবম হিজরীর শুরুতে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হইয়াছিল। বর্ণিত আছে যে, 'আমুল উযূদ বা প্রতিনিধি দল সমাগমের বৎসর অর্থাৎ নবম
হিজরীতে বনূ কুদা'আর একটি প্রতিনিধি দল মদীনায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে উপস্থিত হন। যখন তাহারা পৌছিলেন তখন রাসূলুল্লাহ (স) মসজিদে নববীর অভ্যন্তরে সুহায়ল ইবন বায়দা (রা)-এর জানাযার নামায পড়াইতেছিলেন। তাহারা জানাযায় অংশগ্রহণ না করিয়া এক স্থানে চুপ করিয়া বসিয়া রহিলেন। তাহারা ভাবিলেন, রাসূলের হাতে বায়'আত হইয়া মুসলমান হইবার পূর্বে জানাযায় শামিল হওয়া যায় না। জানাযা শেষ করিয়া রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করিয়াছ? তাহারা বলিলেন, হাঁ। তিনি বলিলেন, তবে তোমাদের ভাইয়ের জানাযায় শরীক হও নাই কেন? তাহারা আরয করিলেন, আমরা মনে করিয়াছি যে, আপনার হাতে হাত রাখিয়া বায়'আত না করা পর্যন্ত আমরা মুসলমান হইতে পারি নাই এবং কোন ধর্মানুষ্ঠান পালনের অধিকারও আমাদের নাই। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, যখন তোমরা ইসলাম গ্রহণ করিয়াছ তখন হইতেই মুসলমান হইয়াছ। তৎপর তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর দস্তমুবারকে হাত রাখিয়া বায়'আত করিলেন।
তাহাদিগের বাহন এবং মালপত্র দেখাশুনা করিবার জন্য তাহাদের একজনকে বসাইয়া রাখিয়াছিলেন। পরে তাহাকে রাসূলুল্লাহ (স) খেদমতে হাযির করাইয়া তাহারা বলিলেন, এই লোকটি আমাদের মধ্যে অল্পবয়স্ক। এইজন্য আমরা তাহার খেদমত গ্রহণ করি। তিনি বলিলেন, "আসগারুল কাওমি খাদিমুহুম” ছোটদেরকে বড়দের খেদমত করিতে হয়। তৎপর তিনি তাহাকেও বায়আত করিলেন এবং তাহার জন্য দু'আ করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স)-এর দু'আয় লোকটি তাহাদের মধ্যে প্রত্যেক নেক কাজেই শ্রেষ্ঠ ও অগ্রগামী হইলেন। এমনকি রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে বনূ কুদা'আর নেতা ও ইমাম নিযুক্ত করিয়াছিলেন। বিদায়কালে রাসূলুল্লাহ (স) তাহদিগকে অন্যান্য প্রতিনিধি দলের মতই হাদিয়া প্রদান করিলেন। তাহারা দেশে ফিরিয়া আসিয়া গোত্রের সকলেই ইসলাম গ্রহণের দা'ওয়াত দিলেন। ফলে তাহারা মুসলমান হইয়া গেল (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ৪৩৬-৪৩৭)।
এই বর্ণনা হইতে প্রমাণিত হয় যে, বনূ কুদা'আর লোকেরা নবম হিজরীর পূর্বে কোন এক সময় মুসলমান হইয়াছিল। এই কারণেই তাহারা পূর্ণাঙ্গ ইসলাম শিখিবার জন্য রাসূলুল্লাহ (স)-এর খেদমতে প্রতিনিধি দল প্রেরণ করিতে অনুপ্রাণিত হইয়াছিল।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সারিয়‍্যা আবু কাতাদা ইব্‌ন রিব'ঈ

📄 সারিয়‍্যা আবু কাতাদা ইব্‌ন রিব'ঈ


৮ম হিজরীর রমযান মাস। তিন শত মুজাহিদের একটি বাহিনী পরিচালিত হয় ইজাম অভিমুখে। মদীনা হইতে উহার দূরত্ব ছিল তিন বুরুজ। ইব্‌ন হিশাম হইতে বর্ণিত আছে, ইব্‌ন ইসহাক সূত্রে আবদুল্লাহ ইব্‌ন হাদরাদ বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) একদল মুসিলম মুজাহিদসহ আমাদিগকে ইজামে প্রেরণ করেন। আবু কাতাদা হারিছ ইব্‌ন রি'ঈ এবং মুহাল্লিম ইব্‌ন জাছ্‌ছামও এই দলে ছিলেন। আমরা যখন বাতনে ইজামে পৌঁছিলাম তখন ঘটনাক্রমে আমের ইব্‌ন আদবাত আশজাঈ উটের পিঠে আরোহণ করিয়া আমাদের পার্শ্ব দিয়া যাইতেছিল। তাহার সাথে ছিল সামান্য কিছু মালপত্র ও দুধের একটি পাত্র। সে আমাদের পার্শ্ব দিয়া অতিক্রমকালে ইসলামী রীতিতে আমাদিগকে সালাম করিল। তাহার পক্ষ হইতে আমরা নিরস্ত্র রহিলাম। কিন্তু আমাদের সঙ্গী মুহাল্লিম ইন জাহ্ছাম তাহার উপর আক্রমণ করিয়া বসিল তাহাকে হত্যা করিল এবং তাহার উট ও পাথেয় যাহা কিছু ছিল হস্তগত করিল। বস্তুত তাহাদের মধ্যে ছিল পূর্ব শত্রুতা যাহার জের হিসাবেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। বাহিনী মদীনাভিমুখে প্রত্যাবর্তন পথে আমরা সংবাদ পাইলাম যে, রাসূলুল্লাহ (স) মক্কা অভিযানে বাহির হইয়াছেন। তাই আমরাও পথ পরিবর্তন করিয়া দ্রুত গতিতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত মিলিত হইলাম। তাঁহাকে আনুপূর্বিক ঘটনা অবহিত করিলে তিনি মুহাল্লিমকে জিজ্ঞাসা করিলেন, "আমি ইসলাম গ্রহণ করিয়াছি" মতান্তরে "আমি মুসলমান হইয়াছি" বলার পর তুমি তাহাকে হত্যা করিলে কেন? সে বলিল, সে তলোয়ারের ভয়ে কলেমা উচ্চারণ করিয়াছে। তিনি রাগতস্বরে বলিলেন, "তুমি তাহার অন্তর বিদীর্ণ করিলে না কেন?” সে বলিল, কেন ইয়া রাসূলাল্লাহ? তিনি বলিলেন, তাহা হইলে তুমি জানিতে পারিতে সে মিথ্যাবাদী না সত্যবাদী। অন্যত্র বর্ণিত হইয়াছে, "সে যাহা বলিল বিশ্বাস করিলে না কেন? অথচ তাহার অন্তরে যাহা আছে, তুমি তাহা অবগত নও।”
মুহাল্লিম বলিল, আপনি আল্লাহ পাকের নিকট আমার মার্জনার জন্য প্রার্থনা করুন। তিনি বলিলেন, আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা না করুন। "মুহাল্লিম চাদরের প্রান্ত দ্বারা অশ্রু মুছিতে মুছিতে তথা হইতে প্রস্থান করিল। আল্লাহ পাক এই সম্পর্কে ইরশাদ করেন:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا ضَرَبْتُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَتَبَيِّنُوا وَلَا تَقُولُوا لِمَنْ أَلْقَى إِلَيْكُمُ السَّامَ لَسْتَ مُؤْمِنًا تَبْتَغُوْنَ عَرَضَ الْحَيَوةِ الدُّنْيَا فَعِنْدَ اللَّهِ مَغَانِمُ كَثِيرَةٌ.
"হে মুমিনগণ! তোমরা যখন আল্লাহর পথে যাত্রা করিবে তখন পরীক্ষা করিয়া লইবে এবং কেহ তোমাদিগকে সালাম করিলে ইহ জীবনের সম্পদের আকাঙ্ক্ষায় তাহাকে বলিও না, তুমি মুমিন নহ। কারণ আল্লাহ্র নিকট অনায়াসলভ্য সম্পদ প্রচুর রহিয়াছে” (৪: ৯৩)।
ঘটনাটি অপর একটি অভিযানের সহিত সংশ্লিষ্ট বিধায় হুনায়ন যুদ্ধের আংশিক ঘটনা ইহার সহিত সংযুক্ত হইল।
ইবন ইসহাক বলেন, নির্ভরযোগ্য সূত্রে উরওয়া ইন্ন যুবায়র তাঁহার দাদা হইতে বর্ণনা করিয়াছেন যে, তাঁহারা দুইজনই হুনায়ন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন। উরওয়ার দাদা বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) আমাদিগকে লইয়া যুহরের সালাত আদায় করিলেন এবং সালাত সমাপনান্তে একটি বৃক্ষতলে উপবেশন করিলেন। আমরাও তাঁহার সহিত বসিলাম। এই সময় আক্রা ইব্‌ন হাবিস ও উয়ায়না ইন্ন হিস্স বাদানুবাদ করিতে করিতে তাঁহার নিকট উপস্থিত হইলেন। তাঁহাদের বিতণ্ডা ছিল ইব্‌ন আদবাত আশজাঈ'র হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে। উয়ায়নার দাবি, সে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট 'আমের ইব্‌ন আদবাত আশজাঈ'র হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রার্থনা করিবে। যেহেতু সে ছিল সমকালীন গাতাফান গোত্রের নেতা। আর আক্র। ইবন হাবিস ছিল খিনজিফের একজন মর্যাদাশালী ব্যক্তি। তিনি মুহাল্লিম ইবন জাছছামার পক্ষ হইতে তাহার দাবি প্রত্যাখ্যান করিতেছিলেন। আক্র' দাবি পেশ করিলেন। আমরা সকলেই শুনিতেছিলাম।
উয়ায়না বলিলেন, "আল্লাহর শপথ! ইয়া রাসূলাল্লাহ! যতক্ষণ না আমি তাহার মহিলাদিগকে সেই অন্তর্দাহ ভোগ করাইব যে অন্তর্জালা ভোগ করিয়াছিল আমার মহিলাগণ, ততক্ষণ পর্যন্ত আমি তাহাকে নিস্কৃতি দিব না। ইহাতে রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, না, বরং তোমরা রক্তপণ পাইবে। এখন পাইবে পঞ্চাশটি উট। আর প্রত্যাবর্তনের পর পাইবে পঞ্চাশটি উট। উয়ায়না কিন্তু প্রত্যাখ্যান করিয়া যাইতেছিল। ইত্যবসরে বানু লায়ছের এক ব্যক্তি উঠিয়া দাঁড়াইল। তাহার নাম মুকায়ছির। ইবন হিশামের মতে, তাহার নাম মুকায়তিল। তিনি বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! ইসলামের প্রাথমিক অবস্থাদৃষ্টে এই নিহতের দৃষ্টান্ত ইহা ব্যতীত আর তো কিছু দেখা যায় না যে, একদল ছাগল কোন এক ঘাটে পানি পান করিতে আসিল। একজন শিকারী তীর নিক্ষেপ পূর্বক প্রথম ছাগলটিকে আহত করিল। আর উহাতেই সকল ছাগল পালাইয়া প্রাণ রক্ষা করিল। কাজেই আজ আপনি কিসাস (প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ) আদায়ের নির্দেশ দিন। আগামীতে আপনি রক্তপণের কথা চিন্তা করিবেন।
এই কথা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার হাত মোবারক উত্তোলন করিলেন। বলিলেন, তোমরা রক্তপণই পাইবে। আমাদের এই অভিযানে পাইবে পঞ্চাশটি উট, আর মদীনা প্রত্যাবর্তনের পর পাইবে পঞ্চাশটি। অবশেষে তাহারা রক্তপণ গ্রহণে সম্মত হইল। অতঃপর তাহারা জনতাকে লক্ষ্য করিয়া বলিল, তোমাদের সেই হত্যাকারী কোথায়? রাসূলুল্লাহ (স) তাহার জন্য আল্লাহ পাকের দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করিবেন। তখন গৌরবর্ণের ছিপছিপে দীর্ঘাঙ্গী
একটি লোক উঠিয়া দাঁড়াইল। তাহার পরিধানে ছিল একজোড়া বস্ত্র যাহা পরিধান করিয়া সে হত্যাকান্ড ঘটাইয়াছিল। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমার নাম কি? সে বলিল, আমি মুহালিম ইব্‌ন জাছছামা। তখন মহানবী (স) তাঁহার হস্তদ্বয় উত্তোলন পূর্বক কলিলেন, “হে আল্লাহ! তুমি জাছছামা তনয় মুহাল্লিমকে ক্ষমা করিও না"। তিনি এইরকম প্রার্থনা করিলেন তিনবার। মুহালিম চাদরের প্রান্ত দ্বারা চোখ মুছিতে মুছিতে প্রস্থান করিল। আমরা বলাবলি করিতেছিলাম, সম্ভবত রাসূলুল্লাহ (স) তাহার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করিবেন। পক্ষান্তরে তাঁহার যবান মোবারক হইতে যাহা বাহির হইল তাহা আমাদের সকলকেই বিস্মিত করিল।
হাসান বাসরী (র) বলেন, ইহার মাত্র সাতদিন পর মুহাল্লিম ইন্তেকাল করে। সেই সত্তার শপথ যাহার হস্তে হাসানের প্রাণ! ইন্তেকালের পর তাহাকে দাফন করা হইল অভ্যন্তর হইতে মাটি তাহাকে বাহিরে নিক্ষেপ করিল। পুনর্বার তাহাকে দাফন করা হইলে পরপর তিনবার একই ঘটনা ঘটে। তাহার এই পরিণতির কথা রাসূলুল্লাহ (স)-এর কর্ণগোচর করা হইলে তিনি মন্তব্য করিলেন, আল্লাহর শপথ! তাহার চেয়েও অধিক নিকৃষ্ট মানুষকে মাটি গর্ভে ধারণ করিয়াছে। কিন্তু ইহা আল্লাহ পাকের পক্ষ হইতে একটি অনন্য নিদর্শন যে, পারস্পরিক জানমালের নিরাপত্তার গুরুত্ব কতখানি তাহা তোমাগিদকে প্রদর্শন করা (ইবন হিশাম, সীরাতুন নবী, ২খ., পৃ. ৭৬৯; আত্-তাবাকাতুল কুবরা, ২খ., পৃ. ১৩৩; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ২৫৫; তারীখে তাবারী, ৩খ., ৩৫)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সারিয়‍্যা আবু কাতাদা ইব্‌ন রি'ঈ বা সারিয়‍্যা আবুল হাদরাদ

📄 সারিয়‍্যা আবু কাতাদা ইব্‌ন রি'ঈ বা সারিয়‍্যা আবুল হাদরাদ


পটভূমি: ইন্ন জারীর তাঁহার তারীখ গ্রন্থে উল্লেখ করিয়াছেন, আবদুল্লাহ ইব্‌ন আবু হাদরাদ আসলামী হইতে বর্ণিত আছে, আমি স্বগোত্রীয় এক মহিলাকে বিবাহ করিয়াছিলাম। বিবাহের মোহরানা ছিল দুই শত দিরহাম যাহা পরিশোধ করা আমার পক্ষে কষ্টকর ছিল। আমি এই প্রত্যাশায় মহানবী (স)-এর নিকট উপস্থিত হইলাম যে, তিনি সদয় হইলে আমি উহা পরিশোধ করিতে পারিব। মহানবী (স) আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, উহা কত ধার্য হইয়াছে? আমি বলিলাম, দুই শত দিরহাম। তিনি বিস্মিত হইয়া বলিলেন, সুবহানল্লাহ! ইহার অধিক মোহর ত আর ধার্য করা যায় না। যাহা হউক বর্তমানে আমার হাতে তোমাকে দেওয়ার মত কিছু নাই। কিছু দিন অপেক্ষা কর।
ইন জারীর তারীখে তাবারীতে উল্লেখ করেন, বানু জুশামের রিফা'আ ইব্‌ন কায়স নামক নেতৃস্থানীয় এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিরুদ্ধে স্বগোত্রীয় জনগণ ও অনান্যদেরকে যুদ্ধ করিতে প্ররোচিত করিবার উদ্দেশ্যে একটি পার্বত্য গুহায় একত্র করিয়াছিল। মহানবী (স)-এর নিকট ইহার সংবাদ পৌঁছামাত্র তিনি আমাকে এবং অপর দুইজন মুজাহিদকে নির্দেশ দিলেন, তোমরা রিফা'আ ইব্ন কায়সকে বন্দী করিয়া আমার নিকট উপস্থিত কর অথবা তাহাদের সঠিক সংবাদ আমার নিকট পৌঁছাও। আর আমাদের বাহনের জন্য তিনি অতি দুর্বল একটি উট দিলেন। উটটি এতই দুর্বল ছিল যে, উহার পিঠে আরোহণ করার পর তাহা আর উঠিয়া দাঁড়াইতে সক্ষম হইল না। অবশেষে অনেক ধরাধরি করিয়া উহাকে দাঁড় করানো হইল। মহানবী (স) বলিলেন, ঠিক আছে, এইভাবেই তোমরা যাত্রা শুরু কর।
ইবন সা'দ 'আত্-তাবাকাতুল কুবরা' গ্রন্থে উল্লেখ করেন, নজদের মুহারিব অঞ্চলে খজিরাও নামক স্থানে বানু গাতাফানকে উৎখাত করার লক্ষ্যে ৮ম হিজরীর শা'বান মাসে আবু কাতাদা হারিছ ইব্‌ন রিব'ঈর নেতৃত্বে একটি অভিযান প্রেরিত হইয়াছিল। ইন্ন জারীরের মতে বাহিনীর জনবল ছিল মাত্র তিনজন। আর ইবন সা'দের মতানুসারে মুজাহিদ সংখ্যা ছিল পনরজন।
আবুল হাদরাদ আসলামী বলেন, মহানবী (স)-এর নিকট হইতে বিদায় গ্রহণের পর আমরা যাত্রা শুরু করিলাম। ত্বরিত গতিতে সূর্যাস্তের সাথে সাথে আমরা শত্রুদের গোপন ঘাঁটির নিকটবর্তী হইলাম। আমার সাথীদেরকে এক গোপন স্থানে পাহারায় রাখিয়া আমি অন্যত্র সুযোগের সন্ধানে বসিয়া রহিলাম। তাহাদিগকে পরামর্শ দিয়াছিলাম যে, আক্রমণের সুযোগ আসিলে আমি উচ্চস্বরে তাকবীর ধ্বনি উচ্চারণ পূর্বক আক্রমণ করিব। তোমরাও সঙ্গে সঙ্গে তাকবীর ধ্বনি দিয়া আক্রমণ করিবে। ইত্যবসরে রাত্রি গভীর হইতে চলিল।
শত্রুশিবিরের এক রাখাল অধিক রাত্রি হওয়ার কারণে ঘাটিতে পৌঁছিতে পারে নাই। শত্রুপক্ষ ধারণা করিল সম্ভবত রাখালটির কোন বিপদ ঘটিয়াছে। রিফা'আ ইব্‌ন কায়স রাখালটির সন্ধানে বাহির হইতে মনস্থ করিল। তাহার সঙ্গী সহগামী হইতে চাহিলে সে তাহাকে নিরস্ত্র করিল। সে একাকীই রাখালটির সন্ধানে বাহির হইল এবং গলদেশে একটি কোষবদ্ধ তরবারি জুলাইয়া নিঃশঙ্ক চিত্তে পথ চলিতে লাগিল। সে আমার নিশানার আওতার মধ্যে আসিলে আমি আমার তৃণ হইতে একটি তীর নিক্ষেপ করিলাম। আত্মার তীর তাহার হৃৎপিণ্ড ভেদ করিল। আমি অগ্রসর হইয়া তাহার মস্তক দেহ হইতে বিছিন্ন করিলাম। এইবার উচ্চস্বরে তাকবীর ধ্বনি উচ্চারণ করিয়া মূল ঘাটিতে আক্রমণ করিলাম। আমার সঙ্গীগণও সঙ্গে সঙ্গে তাকবীর ধ্বনি সহকারে আক্রমণ করিল। আমাদের অতর্কিত আক্রমণ ও ঘন ঘন তাকবীর ধ্বনিতে শত্রুদের মধ্যে ত্রাসের সৃষ্টি হইল এবং যাহার পক্ষে যতটুকু সম্ভব ততটুকু লইয়াই পালাইয়া প্রাণ বাঁচাইল। প্রচুর পরিমাণ যুদ্ধসামগ্রী আমাদের হস্তগত হইল। তন্মধ্যে উট ছিল দুই শত এবং উষ্ট্রশাবক ও ছাগল ছিল দুই হাজার। এক-পঞ্চমাংশ রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্য পৃথক করিয়া অবশিষ্টগুলি মুজাহিদগণের মধ্যে বণ্টন করা হইল। প্রত্যেকেই ১২টি করিয়া উট পাইল। একটি উট দশটি ছাগলের সমপরিমাণ ধরা হইয়াছিল। যুদ্ধবন্দীদের সহিত চারিজন মহিলাও ছিল।
আল-ওয়াকিদী বলেন, মুহাম্মাদ ইব্‌ন ইয়াহইয়া তাঁহার পিতা হইতে বর্ণনা করেন যে, ঐ 'অভিযানে আবূ কাতাদার সহিত আবুল হাদরাদকেও প্রেরণ করা হইয়াছিল, এবং অভিযানে অংশগ্রহণ করিয়াছিল ষোলজন মুজাহিদ। তাহারা মদীনা নগরীর বাহিরে পনর দিন অতিবাহিত করেন। প্রত্যেক যোদ্ধার অংশে পড়িয়াছিল বারটি করিয়া উট। যুদ্ধলব্ধ সামগ্রীর মধ্যে ছিল চারিজন যুবতী। তন্মধ্যে একজন ষোড়শী রূপবতী যুবতীও ছিল। আবু কাতাদার অংশেই তাহাকে দেওয়া হইল। মাহমিয়া ইন্ন জাম'আ উক্ত যুবতীকে মহানবী (স)-এর জন্য চাহিল। রাসূলুল্লাহ (স) আবূ কাতাদার নিকট তাহাকে চাহিলেন। আবু কাতাদা তাহাকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর হস্তে সমর্পণ করিলে তিনি তাহাকে মাহমিয়া ইব্‌ন জাম'আকে প্রদান করেন। আবুল হাদরাদ বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) উটগুলির মধ্য হইতে আমাকে তেরটি উট দিয়াছিলেন। উহার দ্বারাই আমি মোহরানা আদায় করিয়া আমার নববধূকে গৃহে আনয়ন করিলাম (তারীখে তাবারী, ৩খ., পৃ. ৩৪: আত্-তাবাকাতুল কুবরা, ২খ., পৃ. ১৩২; উয়ূনুল আছার, ২খ., পৃ. ২০৯; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ২২২)। উক্ত বক্তব্যের প্রেক্ষিতে কেহ কেহ এই অভিযানকে 'সারিয়‍্যা আবুল হাদরাদ' শিরোনামেও উল্লেখ করিয়াছেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00