📄 সারিয়্যা ইবন আবিল 'আওজা
আল-ওয়াকিদীর বর্ণনা অনুসারে সপ্তম হিজরী সনের যুল-কা'দা (মতান্তরে যুল-হিজ্জা, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ২৬৮) মাসে, "উমরাতুল কাযা” সমাপনের পর মক্কা হইতে প্রত্যাবর্তন করিয়া রাসূলুল্লাহ (স) হযরত আখরাম ইব্ন আবিল 'আওজা আস-সুলামী (রা)-এর অধীনে পঞ্চাশ জন অশ্বারোহীর একটি দল তাহারই গোত্র বানু সুলায়মের নিকট ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানোর জন্য প্রেরণ করেন। গুপ্তচরের মাধ্যমে মুসলমানদের এই অভিযানের আগাম সংবাদ পাইয়া সেই গোত্রের অনেক লোক একত্র হইল। ইতোমধ্যে হযরত ইব্ন আবিল 'আওজাও তথায় পৌঁছিলেন। তিনি গোত্রের লোকদিগকে তথায় একত্র দেখিতে পাইয়া তাহাদিগকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন। কিন্তু তখন তাহারা ছিল মুসলমানদের মুকাবিলার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। অতএব তাহারা দাওয়াত অগ্রাহ্য করিল এবং বলিল, “যেই জিনিসের দাওয়াত তোমরা আমাদিগকে দিয়াছ, উহার কোন প্রয়োজন আমাদের নাই"।
অতঃপর তাহারা মুসলমানদের প্রতি তীর নিক্ষেপ করা আরম্ভ করিল। নিরুপায় হইয়া তখন মুসলমানগণ যুদ্ধে লিপ্ত হইলেন। উভয় পক্ষের মধ্যে কিছুক্ষণ তীর বিনিময় হইল। ইহার মধ্যে বানু সুলায়ম গোত্রের লোকদের জন্য পিছন হইতে সাহায্য আসিতে লাগিল। এক পর্যায়ে তাহারা মুসলমানদের ক্ষুদ্র এই দলটিকে ঘিরিয়া ফেলিল। হযরত ইব্ন আলি 'আওজা (রা) তখন প্রচণ্ডভাবে তাহাদের উপর আক্রমণ করিলেন। তিনি তাহাদিগকে প্রতিরোধ করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করিলেন। কিন্তু ফল কিছুই হইল না। কারণ বিরোধী পক্ষের তুলনায় মুসলমানদের সংখ্যা ছিল খুবই নগণ্য।
শেষ পর্যন্ত ঐ যুদ্ধে হযরত ইব্ন আবিল 'আওজার সঙ্গীদের প্রায় সকলেই শহীদ হইলেন। তিনি নিজেও গুরুতর আহত হইলেন। কাফিরগণ তাঁহাকে মৃত ভাবিয়া ত্যাগ করিয়া চলিয়া গেলে তিনি তাহার অবশিষ্ট সঙ্গীদেরকে লইয়া অতিকষ্টে অষ্টম হিজরী সনের সফর মাসের প্রথম তারিখে মদীনায় পৌঁছেন (তাবাকাত, ২খ., পৃ. ১২৩)।
📄 সারিয়্যা যাতু আল্লাহ্
রাসূলুল্লাহ (স) অষ্টম হিজরী সনের রবী'উল আওয়াল মাসে হযরত কা'ব ইবন 'উমায়র আল-গিফারী (রা)-এর নেতৃত্বে পনর জনের একটি দল সিরিয়ার "যাতু আল্লাহ" অঞ্চলে প্রেরণ করেন। এই স্থানটি সিরিয়ার সীমান্ত এলাকা 'ওয়াদিল কুরা"-এর পশ্চাতে অবস্থিত। সেইখানে পৌছিয়া হযরত কা'ব কাফিরদের একটি বিরাট দল দেখিতে পাইলেন। তিনি তাহাদিগকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন। কিন্তু কাফিররা উহা গ্রহণ করিতে অস্বীকৃতি জানাইল এবং মুসলমানদের প্রতি তীর নিক্ষেপ করিতে আরম্ভ করিল। তখন মুসলমানগণও নিরুপায় হইয়া যুদ্ধে অবতীর্ণ হইলেন।
এই যুদ্ধে মাত্র একজন গুরুতর আহত ব্যক্তি ব্যতীত (যাঁহাকে কাফিররা মৃত মনে করিয়া ফেলিয়া গিয়াছিল) মুসলমানদের বাকী সকলেই শহীদ হইলেন। রাত্রির অন্ধকার ও নিস্তব্ধতা যখন চতুর্দিকে ছাইয়া গেল, তখন তিনি (অর্থাৎ সেই আহত ব্যক্তি) অতি কষ্টে উঠিয়া সেই স্থান ত্যাগ করেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ২৪৭)। তিনি মদীনায় পৌছিলে রাসূলুল্লাহ (স) তাহার নিকট হইতে এই মর্মবিদারক কাহিনী শুনিতে পাইলেন। তিনি (স) উহার প্রতিশোধ লইতে মনস্থ করিয়াছিলেন। কিন্তু ততক্ষণে কাফিররা সেই স্থান ত্যাগ করিয়া অন্যত্র চলিয়া গিয়াছে। তাই রাসূলুল্লাহ (স) সেইদিকে আর অভিযান প্রেরণ করেন নাই।
📄 গাযওয়া মু'তা
এই অধ্যায়ে কোনো কন্টেন্ট এখনো যোগ করা হয়নি।
📄 সারিয়্যা যাতুস-সালাসিল
যাতুস্-সালাসিল (ذات السلاسل( সুলসুল )سلسل(-এর বহুবচন। ইবন ইসহাকের বর্ণনামতে ইহা একটি কুপের নাম। উহার দিকে সম্পর্কিত করিয়াই এই অভিযানকে সারিয়্যা যাতুস্ সালাসিল বলা হয়। উল্লেখ্য যে, শব্দটিকে 'সালাসিল, 'সুলাসিল' বা উভয় উচ্চারণেই পাঠ করা যায়। স্থানটি ওয়াদিউল কুরার )وادی القرى( নিকটবর্তী। মদীনা মুনাওয়ারা হইতে ইহার দূরত্ব দশ মনযিল। এলাকাটিতে "বনূ কুদা'আ"-এর বসতি ছিল (তাবাকাত, ২খ., পৃ. ৯৪; যাদুল মা'আদ, ২খ., পৃ. ১৫৮)।
হিজরী অষ্টম সনের জুমাদাল উখরা মাসে (অকটোবর ৬২৯ খৃ.) রাসূলুল্লাহ (স) এই সারিয়্যা প্রেরণ করেন। রাসূলুল্লাহ (স) এই মর্মে সংবাদ পাইলেন যে, মৃ'তার যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী কতিপয় কাফির শত্রু পুনরায় একত্র হইয়া বানু কুদা'আর নেতৃত্বে মদীনা আক্রমণ করিবার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করিতেছে। তাই তিনি তাহাদিগকে দমন করিবার জন্য হযরত 'আমর ইবনুল 'আস (রা)-এর নেতৃত্বে তিন শত পদাতিক সৈন্য এবং ত্রিশজন অশ্বারোহী বাহিনী প্রেরণ করেন। মুহাজির ও আনসারদের মধ্য হইতে অনেক বিশিষ্ট সাহাবা-ই কিরাম এই বাহিনীতে যোগদান করিয়াছিলেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ., পৃ. ২৭২)।
রাসূলুল্লাহ (স) সেনাপতি আমর ইবনুল 'আস (রা)-কে একটি সাদা পতাকা ও একটি কালো পতাকা প্রদান করিলেন (তাবাকাত, ২খ., পৃ. ১৩১) এবং বলিলেন, 'আমর! আমি তোমাকে একটি সৈন্যদলের সেনাপতি করিয়া প্রেরণ করিতেছি। আল্লাহ তা'আলা তোমাদিগকে বিজয় ও গনীমত দান করিবেন এবং তোমাদিগকে নিরাপদে মদীনায় ফিরাইয়া আনিবেন। হযরত আমর ইবনুল 'আস (রা) বলিলেন, আমি তো মালের লোভে ইসলাম গ্রহণ করি নাই? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, "নেক ব্যক্তির জন্য সদুপায়ে অর্জিত সম্পদ কতইনা উত্তম"। 'আমর ইবনুল 'আস (রা)-এর মামা বাড়ী ছিল সেই এলাকায়, তাই রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে পরামর্শ দিলেন যে, সেই এলাকার আশেপাশে বসবাসকারী গোত্রগুলি হইতে সহযোগিতা লইবে। যথা বালী গোত্র, বানু কাঈন গোত্র ইত্যাদি। সাহাবা-ই কিরাম রওয়ানা হইলেন। যুদ্ধ কৌশল হিসাবে তাঁহারা রাতের বেলা পথ চলিতেন এবং দিনের বেলা আত্মগোপন করিয়া থাকিতেন। তাঁহারা জুযাম অঞ্চলে অবস্থিত সালাসিল কুপের নিকটবর্তী পৌঁছিয়া জানিতে পারিলেন যে, শত্রুদের সৈন্যসংখ্যা অনেক বেশী। তাই 'আমর ইবনুল 'আস (রা) মদীনায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর খেদমতে আরও সৈন্য পাঠাইবার আরয জানাইয়া রাফে' ইব্ন মাকীস (রা)-কে পাঠাইলেন। রাসূলুল্লাহ (স) সংবাদ পাইয়া হযরত আবূ 'উবায়দা ইবনুল জাররাহ (রা)-এর নেতৃত্বে আরও দুই শত সৈন্য প্রেরণ করিলেন। এই দলেও অনেক বিশিষ্টি মুহাজির ও আনসার সাহাবী ছিলেন।
যথা হযরত আবূ বাক্স সিদ্দীক (রা), হযরত 'উমার (রা)। যাত্রাকালে রাসূলুল্লাহ (স) অত্যন্ত গুরুত্বসহ বলিলেন, "তোমরা 'আমর ইবনুল 'আসের বাহিনীর সাথে মিলিত হও। সদা আমরের সাথে মিলিয়া কাজ করিবে, মতপার্থক্য করিবে না।” এই কথা বলিবার কারণ এই যে, 'আমর ইবনুল 'আস (রা) মাত্র কয়েক দিন আগে মুসলমান হইয়াছেন। উল্লেখ্য যে, 'আমর ইবনুল 'আস (রা) অষ্টম হিজরীর সফর মাসে ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিলেন (সীরাতুল-মুস্তাফা, ২খ., পৃ. ৪৫৫)। অপরদিকে হযরত 'আবূ 'উবায়দা ইবনুল জাররাহ (রা) এবং তাঁহার সহযাত্রী অন্যান্য সৈন্যদের অনেকেই পুরাতন মুসলমান। তাই তাঁহাদিগের মধ্যে মতপার্থক্য ও ভুল বুঝাবুঝি হইতে পারে।
রাসূলুল্লাহ (স) আবূ 'উবায়দা ইবনুল জাররাহ (রা)-কেও একটি পৃথক ঝাণ্ডা প্রদান করিলেন। তাহারা যখন 'আমর ইবনুল 'আস (রা)-এর দলের সহিত মিলিত হইলেন এবং নামাযের সময় হইল তখন আবূ 'উবায়দা ইমাম হইতে ইচ্ছা করিলেন। কিন্তু হযরত 'আমর তাঁহাকে বাধা দিয়া বলিলেন, আমি সেনাপতি। আপনারা শুধু আমার সাহাযার্থ্যে প্রেরিত হইয়াছেন। আবূ 'উবায়দা (রা) বলিলেন, রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে মতপার্থক্য ও বিবাদ করিতে নিষেধ করিয়াছেন। নতুবা আমি আমার দলের প্রধান, আমি আপনার আনুগত্য করিতে প্রস্তুত। অতঃপর 'আমর ইবনুল 'আস (রা)-ই ইমামত করিতে থাকেন (আর রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৩৯২)।
ইবন ইসহাক লিখিয়াছেন যে, আবূ 'উবায়দা ইবনুল জাররাহ (রা) অত্যন্ত নরম প্রকৃতির লোক ছিলেন। তাই তিনি এই বিষয়ে 'আমর ইবনুল 'আসের সাথে বিবাদে লিপ্ত হন নাই (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ২৪০)।
এই সফরে 'আমর ইবনুল 'আস (রা)-এর সাথে হযরত উমার (রা)-এরও এক পর্যায়ে মনোমালিন্য সৃষ্টি হইয়াছিল। অতঃপর হযরত আবূ বাক্স সিদ্দীক (রা)-এর মধ্যস্থতায় তাহা বিদূরিত হয়। ঘটনা এই যে, একবার কয়েকজন সৈনিক প্রয়োজনবশত আগুন জ্বালাইতে চাহিলেন, কিন্তু হযরত 'আমর (রা) কঠোরভাবে তাহা নিষেধ করিলেন। উমার (রা) বলিলেন, প্রয়োজনবশতই তো আগুন জ্বালানো হইবে, আপনি নিষেধ করিতেছেন কেন? হযরত আবূ বাক্স সিদ্দীক (রা) উমার (রা)-কে বাঁধা দিয়া বলিলেন, হে উমার! যুদ্ধ সম্বন্ধে আমাদের অভিজ্ঞতার চাইতে 'আমর ইবনুল 'আসের অভিজ্ঞতা বেশী আছে বলিয়াই তো রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে আমাদের আমীর নির্বাচিত করিয়াছেন। তাই প্রতিবাদ না করিয়া তাহার ফায়সালা মানিয়া লও (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ২৪০)।
অবশেষে মুসলিম সৈন্যগণ বানু কুদা'আ গোত্রের নিকট উপনীত হইলেন এবং তাহাদের উপর আক্রমণ করিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই শত্রুবাহিনী রণে ভঙ্গ দিয়া পলায়ন করিতে বাধ্য হইল। মুসলমানগণ বিজয়ী হইলেন। সাহাবা-ই কিরাম (রা) হযরত 'আওফ ইবন মালিক (রা)-কে বিজয়ের সংবাদ জানাইবার জন্য মদীনায় প্রেরণ করিলেন। 'আওف ইবন মালিক (রা) মদীনায় পৌঁছিয়া দেখিলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম সালাতরত আছেন।
সালাত সমাপ্ত হইলে ঘরের বাহিরে থাকিয়াই তিনি সালাম জানাইলেন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, কে, 'আওফ? তিনি উত্তর করিলেন, হাঁ। অতঃপর 'আওফের নিকট হইতে অভিযানের ফলাফল, আমীরদ্বয়ের মতানৈক্য এবং অন্যন্য ছোটখাট বিষয় সবিস্তারে অবহিত হইয়া রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আল্লাহ তা'আলা আবূ 'উবায়দাকে রহম করুন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ., পৃ. ২৭৮)।
যুদ্ধ বিজয়ের পর সেনাপতি হযরত 'আমর ইবনুল 'আস (রা)-এর নির্দেশে গনীমতের মাল একত্র করা হইল। তাঁহারা সেখানে আরও কিছু দিন অবস্থান করিয়া পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলিতে ছোট ছোট অভিযান পরিচালনা করিলেন, অবশেষে প্রচুর গনীমতের মালসহ বিজয়ী বেশে মদীনায় প্রত্যাবর্তন করিলেন।
এই অভিযান প্রসংগে আল্লামা ইবনুল কায়্যিম জাওযিয়্যা (R) ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল (R) রাসূলুল্লাহ (স)-এর সনদে বর্ণনা করিয়াছন যে, রাসূলুল্লাহ (স) সেনাপতি 'আমর ইবনুল 'আস (রা)-কে বানু বাক্সের উপর হামলা করিবার জন্য নির্দেশ দিয়াছিলেন। কিন্তু সেনাপতি 'আমর বানু বাক্সের পরিবর্তে বানু কুদা'আর উপর হামলা করিলেন। ইহার কারণ এই যে, বানু বাক্সের সাথে তাঁহার আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল। এই পরিস্থিতিতে মুগীরা ইব্ন শু'বা (রা) আবূ 'উবায়দা (রা)-এর নিকট আসিয়া বলিলেন, রাসূলুল্লাহ (স) আপনাকে আমাদের সেনাপতি মনোনীত করিয়াছেন। আমর ইবনুল 'আস গোত্রের পক্ষাবলম্বন করিয়াছে। কাজেই আপনার উচিৎ হইবে না তাহার আনুগত্য করিয়া বানু কুদা'আর বিরুদ্ধে অভিযানে অংশগ্রহণ করা। আবূ 'উবায়দা (রা) বলিলেন, দেখ, রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে বিবাদ করিতে নিষেধ করিয়াছেন এবং আনুগত্যের নির্দেশ দিয়াছেন। আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর আনুগত্য করিতেছি, আমর যাহাই করুক না কেন। ইবন ইসহাক বলেন, হযরত আবু উবায়দা ছিলেন নরম প্রকৃতির লোক, দুনিয়া বিমুখ এবং নেতৃত্বের প্রতি ছিল তাঁহার অনাসক্তি। তাই তিনি এই সকল বিষয়ে বিবাদে যান নাই (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ২৪০)।
ইবনুল কায়্যিম আল-জাওযিয়্যা বর্ণিত উপরোল্লিখিত রিওয়ায়াতটি পর্যালোচনা ও সত্যাসত্য যাচাইয়ের যথেষ্ট অবকাশ রাখে। কারণ ইহার বিষয়বস্তু ইসলামী জিহাদের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য এবং রাসূলের প্রতি সাহাবায়ে কিরামের প্রমাণিত আনুগত্যের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। উপরন্ত এই জামা'আতে শরীক ছিলেন হযরত আবূ বাক্স সিদ্দীক (রা), হযরত উমার (রা), হযরত সা'দ ইবন 'উবাদা (রা) এবং হযরত সা'দ ইবন আবী ওয়াক্কাস (রা)-এর ন্যায় প্রথম সারির মুহাজির ও আনসার সাহাবা কিরাম (রা)। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) ইরশাদ করিয়াছেন, যে আমার আনুগত্য করিল, সে আল্লাহর আনুগত্য করিল এবং যে আমাকে 'অমান্য করিল, সে আল্লাহকে অমান্য করিল (মিশকাত, পৃ. ২৬৩)।
জিহাদের উদ্দেশ্য, সম্বন্ধে রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, 'আল্লাহ্ দীন সমুন্নত হউক' এই উদ্দেশ্যে যে ব্যক্তি লড়াই করিল, তাহার লড়াই আল্লাহর পথে হইয়াছে বলিয়া গণ্য হইবে। পক্ষান্তরে যেই যুদ্ধ গোত্রীয় স্বার্থে কিংবা নিছক জাগতিক উদ্দেশ্যে হইবে, তাহাকে কিছুতেই জিহাদ বলা যাইবে না (মিশকাত, পৃ. ৩৩১)। কাজেই রাসূলুল্লাহ (স) যদি বানু বাক্রের উপর হামলা করিবার জন্য প্রেরণ করিয়া থাকেন আর সেনাপতি 'আমর তাহার আত্মীয়তার খাতিরে তাহা না
করিয়া আরেকটি নিরপরাধ গোত্রের উপর হামলা পরিচলনা করিবেন— এই কথা যেমন মানিয়া লওয়া যায় না, অনুরূপ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ সাহাবাগণ প্রকাশ্যে রাসূলের নির্দেশের বিপরীত কাজ দেখিয়াও চুপ পকিবেন কেবল এই অজুহাতে যে, তিনি বিবাদ করিতে নিষেধ করিয়াছেন, ইহাও কল্পনা করা যায় না।
এই অভিযানে আরও একটি ঘটনা ঘটিয়াছিল। তাহা এই যে, তখন খুব শীত পড়িতেছিল। পথিমধ্যে সেনাপতি 'আমর ইবনুল 'আস (রা)-এর গোসল ফরয হইয়া গেল। তিনি শীতের ভয়ে গোসল না করিয়া তায়াম্মুম করিলেন এবং ফজরের নামায ইমামতি করিলেন। মদীনায় ফিরিবার পর রাসূলুল্লাহ (স) খুঁটিনাটি সমস্ত বিষয় অবগত হইয়া 'হযরত আমর ইবনুন 'আস (রা)-এর নিকট তাঁহার কর্মসমূহের কৈফিয়ত চাহিলেন। 'আমর ইবনুল 'আস একে একে সমস্ত ঘটনার কৈফিয়ত দিলেন। তিনি বলিলেন, আগুন জ্বালাইলে দূর হইতে শত্রুগণ আমাদিগকে দেখিতে পাইত এবং আমাদিগের সংখ্যা কম দেখিয়া আমাদিগকে দুর্বল মনে করিত, এই আশংকায় আমি আগুন জ্বালাইতে নিষেধ করিয়াছি।
আর আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করিয়াছেন, "তোমরা নিজকে নিজে হত্যা করিও না। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদিগের প্রতি দয়ালু" (সূরা নিসা: ২৯)।
এই প্রচণ্ড শীতের মধ্যে গোসল করিলে হয়ত আমি মারা যাইতে পারি এই আশঙ্কায় আমি গোসল না করিযা তায়াম্মুম করিয়া নামায পড়াইয়াছি। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার কৈফিয়ত শুনিয়া হাসিলেন আর কিছু বলিলেন না (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ., পৃ. ২৭৩)।
উল্লেখ্য যে, কতিপয় মুহাদ্দিছ ও সীরাত লেখক এই অভিযানকে গাযওয়া নামে অভিহিত করেন, যদিও রাসূলুল্লাহ (স) এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন নাই।
এই যুদ্ধে 'আমের ইবন রাবী'আ (রা) চোখে আঘাত পইয়া অন্ধ হইয়া যান এবং তাঁহার একটি পা নষ্ট হইয়া যায় (বিদায়া, ২খ., পৃ. ২৭৩)।
এই যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (স)-এর একটি মু'জিযা প্রকাশ পাইয়াছিল। বর্ণনাকারী সাহাবী হযরত 'আওফ ইবন মালিক (রা) বলেন, এই যুদ্ধে আমি আবূ বাক্স সিদ্দীক (রা) এবং উমার (রা)-এর সাথে ছিলাম। পথে এক জায়গায় দেখিলাম, একদল লোক একটি উট যবেহ করিয়াছে। কিন্তু তাহারা উহার গোশত বানাইতে পারিতেছে না। আমি ছিলাম দক্ষ কসাই। তাই বলিলাম, ইহা বানাইয়া প্রস্তুত করিয়া দিলে আমাকে একটি ভাগ দিবে কি না? তাহারা রাযী হইল। আমি দ্রুত উহা বানাইয়া আমার ভাগ লইয়া কফেলার সহিত আসিয়া যুক্ত হইলাম। পরে গোস্ত রান্না করিয়া সাথীদিগকে আপ্যায়ন করিলাম। আবূ বাক্স সিদ্দীক (রা) এবং উমার (রা) ঘটনার বৃত্তান্ত শুনিয়া গলায় আঙ্গুল দিয়া বমি করিয়া ভক্ষিত খাবার ফেলিয়া দিলেন। অভিযান শেষে আমি মদীনায় ফিরিয়া আসিলাম। তখন রাসূলুল্লাহ (স) নামায পড়িতেছিলেন। নামায শেষ হইলে আমি সালাম করিলাম। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, কে? আওফ ইবন মালিক, যিনি উটের গোশত বানাইয়া দিয়াছিল? (খাসাইসুল কুবরা, ১খ., পৃ. ২৬১)।
বনূ কুদা'আহ্ গোত্র অষ্টম হিজরীর শেষে অথবা নবম হিজরীর শুরুতে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হইয়াছিল। বর্ণিত আছে যে, 'আমুল উযূদ বা প্রতিনিধি দল সমাগমের বৎসর অর্থাৎ নবম
হিজরীতে বনূ কুদা'আর একটি প্রতিনিধি দল মদীনায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে উপস্থিত হন। যখন তাহারা পৌছিলেন তখন রাসূলুল্লাহ (স) মসজিদে নববীর অভ্যন্তরে সুহায়ল ইবন বায়দা (রা)-এর জানাযার নামায পড়াইতেছিলেন। তাহারা জানাযায় অংশগ্রহণ না করিয়া এক স্থানে চুপ করিয়া বসিয়া রহিলেন। তাহারা ভাবিলেন, রাসূলের হাতে বায়'আত হইয়া মুসলমান হইবার পূর্বে জানাযায় শামিল হওয়া যায় না। জানাযা শেষ করিয়া রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করিয়াছ? তাহারা বলিলেন, হাঁ। তিনি বলিলেন, তবে তোমাদের ভাইয়ের জানাযায় শরীক হও নাই কেন? তাহারা আরয করিলেন, আমরা মনে করিয়াছি যে, আপনার হাতে হাত রাখিয়া বায়'আত না করা পর্যন্ত আমরা মুসলমান হইতে পারি নাই এবং কোন ধর্মানুষ্ঠান পালনের অধিকারও আমাদের নাই। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, যখন তোমরা ইসলাম গ্রহণ করিয়াছ তখন হইতেই মুসলমান হইয়াছ। তৎপর তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর দস্তমুবারকে হাত রাখিয়া বায়'আত করিলেন।
তাহাদিগের বাহন এবং মালপত্র দেখাশুনা করিবার জন্য তাহাদের একজনকে বসাইয়া রাখিয়াছিলেন। পরে তাহাকে রাসূলুল্লাহ (স) খেদমতে হাযির করাইয়া তাহারা বলিলেন, এই লোকটি আমাদের মধ্যে অল্পবয়স্ক। এইজন্য আমরা তাহার খেদমত গ্রহণ করি। তিনি বলিলেন, "আসগারুল কাওমি খাদিমুহুম” ছোটদেরকে বড়দের খেদমত করিতে হয়। তৎপর তিনি তাহাকেও বায়আত করিলেন এবং তাহার জন্য দু'আ করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স)-এর দু'আয় লোকটি তাহাদের মধ্যে প্রত্যেক নেক কাজেই শ্রেষ্ঠ ও অগ্রগামী হইলেন। এমনকি রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে বনূ কুদা'আর নেতা ও ইমাম নিযুক্ত করিয়াছিলেন। বিদায়কালে রাসূলুল্লাহ (স) তাহদিগকে অন্যান্য প্রতিনিধি দলের মতই হাদিয়া প্রদান করিলেন। তাহারা দেশে ফিরিয়া আসিয়া গোত্রের সকলেই ইসলাম গ্রহণের দা'ওয়াত দিলেন। ফলে তাহারা মুসলমান হইয়া গেল (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ৪৩৬-৪৩৭)।
এই বর্ণনা হইতে প্রমাণিত হয় যে, বনূ কুদা'আর লোকেরা নবম হিজরীর পূর্বে কোন এক সময় মুসলমান হইয়াছিল। এই কারণেই তাহারা পূর্ণাঙ্গ ইসলাম শিখিবার জন্য রাসূলুল্লাহ (স)-এর খেদমতে প্রতিনিধি দল প্রেরণ করিতে অনুপ্রাণিত হইয়াছিল।