📄 সারিয়্যা বানু মুররা
রাসূলুল্লাহ (স) সপ্তম হিজরী সনের শা'বান মাসে হযরত বাশীর ইবন সা'দ আল-আনসারী (রা)-কে বান্ মুররা অভিমুখে প্রেরণ করেন। তাঁহার সহিত ত্রিশজন যোদ্ধা সাহাবীও প্রেরণ করেন। ফাদাক নামক স্থানে বানু মুররা বাস করিত। তাহাদের অবাধ্যআচরণ দমন করিতে এবং ইসলামের নির্দেশ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এই ক্ষুদ্র অভিযান প্রেরণ করা হইয়াছিল।
হযরত বাশীর ইবন সা'দ (রা) সঙ্গীদের লইয়া 'ফাদাক'-এর নিকটবর্তী হইলেন এবং এক রাখালকে বকরী চরাইতে দেখিলেন। তাহাকে লোকজন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিলেন এবং পরিস্থিতি আঁচ করিতে চাহিলেন। তাহাকে জানানো হইল যে, লোকেরা তাহাদের কৃষিকাজে ব্যস্ত। তাহারা দূরে চলিয়া গিয়াছে। তিনি উটগুলি এবং বকরী হাঁকাইতে লাগিলেন এবং মদীনা শরীফ অভিমুখে আনিতে চাহিলেন। তখন উচ্চস্বরে চিৎকার দিতে দিতে উক্ত রাখাল চলিয়া গেল এবং অধিবাসীদের সংবাদ দিল। ঐদিকে বাশীর (রা) সঙ্গীদের লইয়া সম্মুখে অগ্রসর হইতেছিলেন। পথিমধ্যে রাত হইয়া গেল। আর তখনি অতর্কিতে ফাদাকের অধিবাসীরা আসিয়া তাহাদেরকে আক্রমণ করিতে লাগিল। তখন বাশীর (রা)-এর পক্ষ হইতে সঙ্গীগণ তীর নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন। শেষ অবধি সাহাবীগণের তীর নিঃশেষ হইয়া গেল। তখন তাঁহারা ভোর হওয়ার অপেক্ষা করিতেছিলেন। আর অমনি স্থানীয় লোকজন আসিয়া তাঁহাদের উপর
চড়াও হইল এবং বাশীর (রা)-এর সঙ্গীদের মারাত্মকভাবে আহত করিতে লাগিল। হযরত বাশীর (রা) প্রাণপণে যুদ্ধ করিয়া মৃতপ্রায় হইয়া জ্ঞান হারাইয়া ফেলিলেন। তাঁহার উরুতেও ভীষণভাবে আঘাত লাগিল। এমনকি কেহ কেহ বলিল যে, তিনি মারা গিয়াছেন। ইহার পর স্থানীয় অবাধ্যাচরণকারীরা তাহাদের উট-বকরীগুলি লইয়া গেল। এই সংবাদ গাল্লা ইব্ন যায়দ (রা) সর্বাগ্রে রাসূলুল্লাহ (সা) কে জানান এবং তারপর বাশীর ইবন সা'দ (রা) মদীনা শরীফে প্রত্যাবর্তন করেন (আত্-তাবাকাতুল কুবরা, ২খ., পৃ. ১১৮)।
এই প্রসঙ্গে আরও বর্ণিত হইয়াছে, বানু মুররা-এর উদ্ধত আচরণ দমনে রাসূলুল্লাহ (স) বাশীর ইবন সা'দ আল-আনসারী (রা)-কে প্রেরণ করিয়াছিলেন। তিনি তাঁহার পছন্দানুযায়ী ত্রিশজন যোদ্ধাকে সঙ্গে লইয়াছিলেন। তাঁহারা বিজয়ী হওয়ার প্রচণ্ড অভিলাষে যথাসম্ভব দ্রুত সেখানে পৌঁছান। সেখানে তাহারা স্থানীয়দিগকে বিক্ষিপ্তভাবে কাজে নিয়োজিত দেখেন। তখন তাহাদের উট ও বকরীগুলি কাছে পাইয়া দ্রুত সেইগুলি হাঁকাইয়া প্রত্যাবর্তন করিতে লাগিলেন। কিন্তু নেতৃস্থানীয় কিছু লোক তাঁহাদের আগলাইয়া দাঁড়াইল। বাশীর (রা)-এর সঙ্গীগণ অনবরত তীর বর্ষণ করিয়া তাহাদিগকে তাড়াইয়া দিলেন। তবে তাহাদের আক্রমণে বাশীর (রা) মারাত্মকভাবে আহত হন। তিনি পথভ্রষ্ট বানু মুররা-এর তীরের আঘাতে আক্রান্ত হইয়াছিলেন। শেষ পর্যন্ত মুসলিম দল বিজয়ী বেশে গনীমতসহ প্রত্যাবর্তন করে। (আল-মুক্তাফা মিন সীরাতিল মুসতাফা, ১খ., পৃ. ১৮৫)।
আবার আল-বিদায়া ওয়ান-নিয়াহা গ্রন্থকারের উপস্থাপন অনুযায়ী ইমাম বায়হাকী (র) আল-ওয়াকিদী (র)-এর নিকট হইতে ধারাবাহিক বর্ণনাসূত্রে উল্লেখ করিয়াছেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) বাশীর ইবন সা'দ (রা)-কে ত্রিশজন অশ্বারোহী সাহাবী (রা)-সহ ফাদাক অভিমুখে প্রেরণ করেন। সেখানে তাঁহারা (বানু মুররা-এর) উট লইয়া আসিতে চাহিলে তাহারা বাধা দেয় এবং তাঁহার সঙ্গীদিগকে হত্যা করিতে থাকে। তিনি সেদিন মহাপরীক্ষায় উপনীত হন এবং পরম ধৈর্য ধারণ করেন। সেখানে তিনি সঙ্গীদিগকে লইয়া যথাসম্ভব যুদ্ধ জয়ের আশায় শত্রুদিগের সামনে টিকিয়া থাকিতে প্রয়াস চালান। কিন্তু শেষ অবধি শত্রুপক্ষ তাহাকে পাইয়া মৃত মনে করিয়া আহতাবস্থায় রাখিয়া চলিয়া যায়। তিনি সর্বশেষে ফাদাকের এক ইয়াহূদীর নিকট রাত্রিযাপন করেন। তাহার পর আহতাবস্থায় মদীনায় ফিরিয়া আসেন।
আল-ওয়াকিদী আরও বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) ইহার পর গালিব ইব্ন আবদিল্লাহ (রা)-কে একদল সাহাবী (রা) সহ বানু মুররা-এর দিকে প্রেরণ করেন। গালিব ইবন আবদিল্লাহ (রা)-এর নেতৃত্বে কয়েকজন প্রবীণ সাহাবী (রা) এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তন্মধ্যে উসামা ইব্ন যায়দ, আবূ মাস'উদ আল-বাদরী ও কা'ব ইব্ন উজরা (রা) উল্লেখযোগ্য। এই যুদ্ধে উসামা ইব্ন যায়দ (রা) মিদ্রাস ইব্ নুহায়ক নামক বানু মুরা-এর এক ব্যক্তিকে হত্যা করেন। এই প্রসঙ্গে ইউনুস ইব্ন বুকায়র (র) ইবন ইসহাক (র) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন, তিনি বানু সালমা-এর বয়স্ক এক ব্যক্তি হইতে, তিনি স্বীয় সম্প্রদায়ের কয়েক ব্যক্তি হইতে উল্লেখ করিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স) গালিব ইব্ন আবদিল্লাহ আল-কালবী (রা)-কে বানু মুরা-এর দিকে প্রেরণ করেন। সেখানে মিরদাস ইন্ন নুহায়ক আক্রমণের শিকার হন। এই ব্যক্তি ছিল বানু মুররা-এর সাথে চুক্তিবদ্ধ। তাহাকে উসামা ইব্ন যায়দ (রা) হত্যা করেন।
ইবন ইসহাক ধারাবাহিক বর্ণনাসূত্রে উসামা ইব্ন যায়দ (রা) বর্ণনা হইতে করেন, তিনি বলেন, আমি সেখানে মিরdas ইবন নুহায়ক নামক ব্যক্তিকে প্রতিপক্ষের সহিত দেখিতে পাইয়া আক্রমণ করি। তাহার উপর আমরা তরবারি চালাইতে উদ্যত হইলে সে বলিতে লাগিল:
اشهد ان لا اله الا الله.
আমরা তাহার নিকট হইতে তরবারি ফিরাইয়া আনিলাম না, এমনকি তাহাকে হত্যা করা হইল। তাহার পর যুদ্ধশেষে রাসূলুল্লাহ (স)-কে যখন আমরা এই ব্যাপারে বলিলাম তখন তিনি আমাকে বলিলেন, হে উসামা! لا اله الا الله -এর ব্যাপারে তোমার কার্যকলাপ কেমন হইয়া গেল? আমি বলিলাম, হে আল্লাহ্র রাসূল! সেই ব্যক্তি নিহত হওয়া হইতে রক্ষা পাওয়ার জন্য لا اله الا الله বলিয়াছে। রাসূলল্লাহ (স) বারবার শুধু বলিতে লাগিলেন, হে উমাসা! لا اله الا الله -এর ব্যাপারে তোমার কার্যকলাপ কেমন হইয়া গেল? আল্লাহ্র শপথ! যিনি তাঁহাকে সত্যের সাথে প্রেরণ করিয়াছেন, আমি বলিতে লাগিলাম, আমার ইসলাম গ্রহণের পর হইতে কখনও এমনটি হয় নাই। আমি তাহার পর আরও বলিলাম, আমি আল্লাহ্ নামে ওয়াদা করিতেছি, আর কখনও এমন লোককে আমি হত্যা করিব না যে বলে, لا اله الا الله ; নবী করীম (স) বলিলেন, (এই ওয়াদা) আমার পরও (পালন করিবে তো), হে উসামা! আমি বলিলাম, আপনার পরও।
এই প্রসঙ্গে ইমাম আহমাদ (র) ধারাবাহিক সূত্রে বর্ণনা করিয়াছেন, হযরত উসামা ইব্ন যায়দ (রা) বলিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স) একবার আমাদের কয়েকজনকে 'হুরুকাতে' প্রেরণ করলেন। আমরা সেখানে প্রভাত করিলাম। সেখানে এক ব্যক্তির আচরণ এমন ছিল, যখন আমরা লোকজনের উপর আক্রমণ করিতে উদ্যত হইতাম তখন সে আমাদের বিরুদ্ধে তাহাদের পক্ষে কঠোর অবস্থান নিত। আর যখন তাহারা পালাইতে চাহিত, সেই ব্যক্তি তাহাদের আশ্রয় দিত। আমি এবং আনসারী এক সাহাবী সেই ব্যক্তিকে আক্রমণ করিলাম। সে আমাদের কবলে পড়িয়া বলিল, لا اله الا الله; ইহাতে আনসারী সাহাবী পরবর্তী আক্রমণ হইতে বিরত থাকিলেন, কিন্তু আমি লোকটাকে হত্যা করিলাম। ইহার পর এই সংবাদ রাসূলল্লাহ (স)-এর নিকট পৌঁছিলে তিনি আমাকে বলিলেন, হে উসামা! লোকটি لا اله الا الله বলার পরও তুমি তাহাকে হত্যা করিলে? আমি বলিলাম, হে আল্লাহর রাসূল! সে তো হত্যা হইতে বাঁচিবার জন্য لا اله الا الله পড়িয়াছে। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) উক্ত বাণীটি বারবার বলিতে লাগিলেন। আমি মনে করিলাম, আমি পূর্বে মুসলমান না হইয়া আজই যদি মুসলমান হইতাম (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ২২১)!
📄 সারিয়্যা বাশীর ইবন সা'দ আল-আনসারী (রা)
৭ম হিজরীর শা'বান/৬২৮ খৃস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে হযরত বাশীর ইবন সা'দ আল-আনসারী (রা)-এর নেতৃত্বে ৩০ জন সৈন্যের একটি বাহিনীর ফাদাকের নিকটবর্তী বানু মুররা এলাকায় একটি অভিযান পরিচালিত হইয়াছিল (তারীখ, তাবারী ৩খ., পৃ. ৯৯, তাবাকাত, ২খ., পৃ. ১১৮, ১১৯; আল-মাওয়াহিব, ১খ., পৃ. ১৪১; সীরাত হালাবী, ৩খ., পৃ. ১৮৬; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ২৫২)। ফাদাক ছিল খায়বারের পার্শ্ববর্তী একটি কৃষি প্রধান ইয়াহুদী বসতি। মদীনা হইতে ইহার দূরত্ব দুই অথবা তিন দিনের পথ (মু'জামুল বুলদান, ৪খ., পৃ. ২৩৮; আল-মুনজিদ ফিল-আলাম, পৃ. ৫২০)। মুসলিম সৈন্যগণ বানু মুররার এলাকায় পৌঁছিলে সেখানে বহু সংখ্যক পশুসহ রাখালদিগকে দেখিতে পাইলেন, গোত্রের লোকজনকে দেখিতে পাইলেন না। রাখালদের নিকট তাহাদের সন্ধান চাওয়া হইলে তাহারা জানাইল যে, তাহারা বিভিন্ন স্থানে তাহাদের কর্মক্ষেত্রে ব্যস্ত আছে। তাহারা আজ এই জলাশয় কেন্দ্রিক বসতিতে অবস্থান করিতেছে না (শারহুল মাওয়াহিব, ২খ., পৃ. ২৫০; সীরাত হালাবী, ২খ., পৃ. ১৮৬; তাবাকাত ইবন সা'দ, ২খ., পৃ. ১১৯)। অগত্যা হযরত বাশীর (রা)-এর বাহিনী তাহাদের বকরী ও উস্ত্রীসমূহ হাঁকাইয়া লইয়া মদীনা মুনাওয়ারার দিকে ফিরিয়া চলিলেন।
ইতোমধ্যে তাহাদের সতর্ককারীর বিকট চিৎকারে মুররা গোত্রের লোকজন ঐক্যবদ্ধ হইয়া (হযরত বাশীর (রা)-এর বাহিনীর) পশ্চাদ্ধাবন করিল এবং সন্ধ্যার দিকে তাহাদের নাগাল পাইয়া তীর বর্ষণ আরম্ভ করিল। দুই পক্ষের মধ্যে সারারাত্রি তীর-ধনুকের তুমুল সংঘর্ষ চলিল। এক পর্যায়ে হযরত বাশীর (রা)-এর বাহিনীর সকল তীর নিঃশেষিত হইয়া গেল। অতি প্রত্যূষে তাহারা একযোগে কঠিন আক্রমণ চালাইয়া বাশীর (রা)-এর অধিকাংশ সৈন্যকে, মতান্তরে কিছু সংখ্যক সৈন্যকে শহীদ করিল (যাদুল মা'আদ, ২খ., পৃ. ১৪৮; কিতাবুল মাগাযী, ২খ., পৃ. ৭২৩; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ২৫০; সীরাত আল-হালাবী, ৩খ., পৃ. ১৮৬; হযরত মুহাম্মাদ, পৃ. ২৮৫; আয়নুল ইয়াকীন, পৃ. ১১০; নূরুল ইয়াকীন, পৃ. ২৩৪; তাবাকাত ইবন সা'দ, ২খ., পৃ. ১১৯) হযরত বাশীর ইবন সা'দ (রা) প্রাণপণ যুদ্ধ করিয়া মারাত্মকভাবে আহত হইলেন এবং লাশের সারিতে মৃতবৎ পড়িয়া রহিলেন। তাহারা তাঁহার পায়ের গোড়ালীতে প্রচণ্ড আঘাত করিলেও তিনি বিন্দুমাত্র নড়াচড়া করিলেন না। তাহারা মনে করিল, তিনি জীবিত নাই। তাহারা তাহাদের বকরী ও উস্ত্রীসমূহ লইয়া নিজেদের এলাকায় ফিরিয়া গেল (তাবাকাত ইবন সা'দ, ২খ., পৃ. ১১৯)।
এই যুদ্ধে মুসলিম সৈন্যগণের বিপর্যয়ের সংবাদ লইয়া হযরত উল্লা ইন্ন যায়দ আল-হারিছী আল-আওসী যথাশীঘ্র রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট চলিয়া আসিলেন (আল-ইসাবা, ২খ., পৃ. ৪৯৯; আল-ইসতী'আব, ৩খ., পৃ. ১২৪৫; শারহু আল-মাওয়াহিব, ২খ., পৃ. ২৫০)। এদিকে যুদ্ধাহত হযরত বাশীর (রা) লাশের সারি হইতে উঠিয়া চুপিসারে পথ চলিয়া ফাদাক পৌঁছাইলেন এবং তাঁহার একজন ইয়াহুদী বন্ধুর নিকট আশ্রয় লইলেন। ফাদাকে এক রাত্র, মতান্তরে কয়েক রাত্র অবস্থানের পর কিছু সুস্থ হইয়া তিনি মদীনায় ফিরিয়া আসিলেন (আল-মাগাযী, ২খ., পৃ. ৭২৩; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪খ., পৃ. ২৫২; যাদুল মা'আদ, ২খ., পৃ. ১৪৮; আর-রাহীক আল-মাখতুম, ৪২৯; আসাহ্হুস্ সিয়ার, পৃ. ২১৭)।
বানু মুররা এলাকায় যুদ্ধ শেষ করিয়া যুদ্ধাহত সেনাধ্যক্ষ হযরত বাশীর (রা) ঘটনাক্রমে ফাদাকে পৌঁছাইয়াছিলেন বলিয়া এই যুদ্ধাভিযানের সহিত ফাদাক নামক স্থানটির উল্লেখ করা হইয়া থাকে। প্রকৃতপক্ষে যুদ্ধক্ষেত্র তথা বানু মুররা এলাকা এবং ফাদাক এলাকা অভিন্ন নহে। এই কারণে ফাদাককে যুদ্ধস্থান শনাক্ত না করিয়া ফাদাক-এর নিকটবর্তী বানু মুররা এলাকাকে যুদ্ধস্থান শনাক্ত করা অধিকতর সহীহ। মুররা গোত্র ফাদাকে বসবাস করিত না, তাহারা বসবাস করিত ফাদাক-এর কাছাকাছি এক এলাকায় (সীরাত আল-হালাবী, ৩খ., পৃ. ১৮৬; শারহু আল-মাওয়াহিব, ২খ., পৃ. ২৫০)।
বানু মুররা কর্তৃক হযরত বাশীর (রা) ও তাঁহার সৈনিকগণের আক্রান্ত হওয়ার সংবাদ শুনিবার পর রাসূলুল্লাহ (স) ইহার প্রতিশোধ গ্রহণের নিমিত্তে হযরত গালিব ইব্ন আবদিল্লাহ আল-লায়ছী (রা)-এর নেতৃত্বে ২০০ সৈন্যের একটি শক্তিশালী বাহিনী উক্ত এলাকায় যথাশীঘ্র প্রেরণ করিলেন (কিতাবুল মাগাযী, ২খ., পৃ. ৭২৪; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ২৫২; রাসূল মুহাম্মদ (স)-এর সরকার কাঠামো, পৃ. ৩৫২)। ভিন্নমতে হযরত বাশীর (রা)-এর অভিযানের প্রায় দুই মাস পর অর্থাৎ ৮ম হিজরীর সাফার/ ৬২৯ খৃস্টাব্দের জুন মাসে রাসূলুল্লাহ (সা) হযরত গালিব (রা)-কে (দ্র. ফাদাক-এর বানু মুররা এলাকায় হযরত গালিব ইব্ন আবদিল্লাহ আল-লায়ছী (রা)-এর অভিযান) উক্ত এলাকায় প্রেরণ করিয়াছিলেন (তাবাকাত ইন সা'দ, ২খ., পৃ. ১২৬; সীরাত হালাবী, ৩খ., পৃ. ১৮৯; আল-মাওয়াহিব, ১খ., পৃ. ১৪৪)।
📄 সারিয়্যা ইবন আবিল 'আওজা
আল-ওয়াকিদীর বর্ণনা অনুসারে সপ্তম হিজরী সনের যুল-কা'দা (মতান্তরে যুল-হিজ্জা, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ২৬৮) মাসে, "উমরাতুল কাযা” সমাপনের পর মক্কা হইতে প্রত্যাবর্তন করিয়া রাসূলুল্লাহ (স) হযরত আখরাম ইব্ন আবিল 'আওজা আস-সুলামী (রা)-এর অধীনে পঞ্চাশ জন অশ্বারোহীর একটি দল তাহারই গোত্র বানু সুলায়মের নিকট ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানোর জন্য প্রেরণ করেন। গুপ্তচরের মাধ্যমে মুসলমানদের এই অভিযানের আগাম সংবাদ পাইয়া সেই গোত্রের অনেক লোক একত্র হইল। ইতোমধ্যে হযরত ইব্ন আবিল 'আওজাও তথায় পৌঁছিলেন। তিনি গোত্রের লোকদিগকে তথায় একত্র দেখিতে পাইয়া তাহাদিগকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন। কিন্তু তখন তাহারা ছিল মুসলমানদের মুকাবিলার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। অতএব তাহারা দাওয়াত অগ্রাহ্য করিল এবং বলিল, “যেই জিনিসের দাওয়াত তোমরা আমাদিগকে দিয়াছ, উহার কোন প্রয়োজন আমাদের নাই"।
অতঃপর তাহারা মুসলমানদের প্রতি তীর নিক্ষেপ করা আরম্ভ করিল। নিরুপায় হইয়া তখন মুসলমানগণ যুদ্ধে লিপ্ত হইলেন। উভয় পক্ষের মধ্যে কিছুক্ষণ তীর বিনিময় হইল। ইহার মধ্যে বানু সুলায়ম গোত্রের লোকদের জন্য পিছন হইতে সাহায্য আসিতে লাগিল। এক পর্যায়ে তাহারা মুসলমানদের ক্ষুদ্র এই দলটিকে ঘিরিয়া ফেলিল। হযরত ইব্ন আলি 'আওজা (রা) তখন প্রচণ্ডভাবে তাহাদের উপর আক্রমণ করিলেন। তিনি তাহাদিগকে প্রতিরোধ করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করিলেন। কিন্তু ফল কিছুই হইল না। কারণ বিরোধী পক্ষের তুলনায় মুসলমানদের সংখ্যা ছিল খুবই নগণ্য।
শেষ পর্যন্ত ঐ যুদ্ধে হযরত ইব্ন আবিল 'আওজার সঙ্গীদের প্রায় সকলেই শহীদ হইলেন। তিনি নিজেও গুরুতর আহত হইলেন। কাফিরগণ তাঁহাকে মৃত ভাবিয়া ত্যাগ করিয়া চলিয়া গেলে তিনি তাহার অবশিষ্ট সঙ্গীদেরকে লইয়া অতিকষ্টে অষ্টম হিজরী সনের সফর মাসের প্রথম তারিখে মদীনায় পৌঁছেন (তাবাকাত, ২খ., পৃ. ১২৩)।
📄 সারিয়্যা যাতু আল্লাহ্
রাসূলুল্লাহ (স) অষ্টম হিজরী সনের রবী'উল আওয়াল মাসে হযরত কা'ব ইবন 'উমায়র আল-গিফারী (রা)-এর নেতৃত্বে পনর জনের একটি দল সিরিয়ার "যাতু আল্লাহ" অঞ্চলে প্রেরণ করেন। এই স্থানটি সিরিয়ার সীমান্ত এলাকা 'ওয়াদিল কুরা"-এর পশ্চাতে অবস্থিত। সেইখানে পৌছিয়া হযরত কা'ব কাফিরদের একটি বিরাট দল দেখিতে পাইলেন। তিনি তাহাদিগকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন। কিন্তু কাফিররা উহা গ্রহণ করিতে অস্বীকৃতি জানাইল এবং মুসলমানদের প্রতি তীর নিক্ষেপ করিতে আরম্ভ করিল। তখন মুসলমানগণও নিরুপায় হইয়া যুদ্ধে অবতীর্ণ হইলেন।
এই যুদ্ধে মাত্র একজন গুরুতর আহত ব্যক্তি ব্যতীত (যাঁহাকে কাফিররা মৃত মনে করিয়া ফেলিয়া গিয়াছিল) মুসলমানদের বাকী সকলেই শহীদ হইলেন। রাত্রির অন্ধকার ও নিস্তব্ধতা যখন চতুর্দিকে ছাইয়া গেল, তখন তিনি (অর্থাৎ সেই আহত ব্যক্তি) অতি কষ্টে উঠিয়া সেই স্থান ত্যাগ করেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ২৪৭)। তিনি মদীনায় পৌছিলে রাসূলুল্লাহ (স) তাহার নিকট হইতে এই মর্মবিদারক কাহিনী শুনিতে পাইলেন। তিনি (স) উহার প্রতিশোধ লইতে মনস্থ করিয়াছিলেন। কিন্তু ততক্ষণে কাফিররা সেই স্থান ত্যাগ করিয়া অন্যত্র চলিয়া গিয়াছে। তাই রাসূলুল্লাহ (স) সেইদিকে আর অভিযান প্রেরণ করেন নাই।