📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সারিয়‍্যা গালিব ইব্‌ন আবদিল্লাহ (রা)

📄 সারিয়‍্যা গালিব ইব্‌ন আবদিল্লাহ (রা)


৮ম হিজরীর সাফার/৬২৯ খৃ. জুন হযরত গালিব ইব্‌ন আব্দিল্লাহ আল-লায়ছী (রা)-এর নেতৃত্বে দুই শত মুজাহিদের একটি বাহিনী 'ফাদাক' -এর 'বানু মুররা' এলাকায় একটি অভিযানে প্রেরিত হয় (তাবাকাত ইবন সা'দ, ২খ., পৃ. ১২৬; আল-মাওয়াহিব, ১খ., পৃ. ১৪৪; সীরাত আল-হালাবী ৩খ., পৃ. ১৮৬)। 'ফাদাক' হইল 'খায়বার'-এর পাশ্ববর্তী একটি কৃষিপ্রধান ইয়াহুদী বসতী, মদীনা মুনাওওয়ারা হইতে ইহার দূরত্ব দুই দিনের অথবা তিন দিনের পথ (মু'জামুল বুলদান, ৪খ., পৃ. ২৩৮; আল মুনজিদ ফিল আ'লামা, পৃ. ৫২০) মতান্তরে ছয় মাইল (সীরাত আল-হালাবী, ৩খ., পৃ. ১৮৬; শারহ আল-মাওয়াহিব, ২খ., পৃ. ২৫০; আল-ইসাবা, ৩খ., পৃ. ১৮৪)।
কোন কোন সূত্রে 'গালিব ইব্‌ن আব্দিল্লাহ' নামের পরিবর্তে 'আবদুল্লাহ ইব্‌ন গালিব', মতান্তরে গালিব ইবন 'উবায়দুল্লাহ, মতান্তরে 'গালিব ইব্‌ن ফুদালা' (রা) নাম পাওয়া যায় (সুনান আবী দাউদ, ভারতীয় সং ২খ., পৃ. ১৫: মুসনাদ আহমাদ, ৫খ., পৃ. ২০০, ২০৭; বাযলুল মাজহুদ, ১২খ., পৃ. ১৫২, ২১৪; আল-ইসতী'আব, ৩খ., পৃ. ১২৫২; আল-ইসাবা ৩খ., পৃ. ১৮৩, ১৮৪; জামিউল উসূল, ৩খ., পৃ. ২২১, পাদটীকা; তাফসীর কুরতুবী, ৫খ., পৃ. ৩৩৭; আল-কাশশাফ, ১খ., পৃ. ২৯১)। অবশ্য হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন গালিব আল-লায়ছী (রা) নামক একজন সাহাবীর নেতৃত্বে একটি বাহিনীকে রাসূলুল্লাহ (স) দ্বিতীয় হিজরীতে ফাদাক অঞ্চলে প্রেরণ করিয়াছিলেন বলিয়া হযরত আবূ 'আমর (র) সূত্রে জানা যায় (আল-ইসাবা, ২খ., পৃ. ৩৫৭; উসদুল গাবা, ৩খ., পৃ. ২৪২; বাযলুল মাজহুদ, ১২ খ., পৃ. ২১৪; 'আওনুল মা'বুদ, ৭খ., পৃ. ৮৮৮)। ৭ম হিজরীর প্রারম্ভে 'ফাদাক' রাসূলুল্লাহ (স)-এর হস্তগত হওয়ার পূর্বে বা পরে কোন এক সময়ে হযরত গালিব ইব্‌ن ফুদালা আল-লায়ছী (রা) উক্ত অঞ্চলে এক সৈন্যবহর লইয়া অভিযান পরিচালনা করিয়াছেন বলিয়াও অন্য এক সূত্রে জানা যায় (আল-ইসাবা, ৩খ., পৃ. ১৮৪, আল-কাশশাফ, ১খ., পৃ. ২৭১; তাফসীর কাবীর, ১১খ., পৃ. ৩)।
এই অভিযানের কারণ ছিল এই যে, ছয় মাস পূর্বে অর্থাৎ ৭ম হিজরীর শা'বান মাসে হযরত বাশীর ইবন সা'দ (রা)-এব নেতৃত্বাধীন একদল সৈন্য বানু মুররা কর্তৃক মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হইয়াছিলেন (তারীখ তাবারী, ৩খ., পৃ. ১৯; আল-মাওয়াহিব, ১খ., পৃ. ১৪১; শারহ আল-মাওয়াহিব, ২খ., পৃ. ৫০)। তাহাদিগকে শায়েস্তা করিবার জন্য রাসূলুল্লাহ (স) প্রথমে হযরত যুবায়র ইবনুল আওয়াম (রা)-কে অভিযানের জন্য প্রস্তুত করিয়া বলিয়াছিলেন, "যুবায়র! তুমি বানু মুররা এলাকায় পৌছিয়া বাশীরের বাহিনী আক্রান্ত হওয়ার প্রতিশোধ গ্রহণ কর। আল্লাহ তোমাদিগকে বিজয়ী করিলে তোমরা উহাদিগের মধ্যে অবস্থান করিবে না"। ইহা বলিয়া রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার হাতে যুদ্ধের পতাকাও তুলিয়া দিয়াছিলেন। কিন্তু এমন সময় হযরত গালিব ইব্‌ন আব্দিল্লাহ আল-লায়ছী (রা) আল-কাদীদ অভিযান [দ্র. গালিব ইব্‌ন আব্দিল্লাহ আল্-লায়ছী (রা)-এর আল-কাদীদ অভিযান] সমাপ্ত করিয়া বিজয়ী বেশে মদীনা মুনাওওয়ারায় ফিরিয়া আসিলে রাসূলুল্লাহ (স) হযরত যুবায়র (রা)-এর পরিবর্তে তাহাকে প্রেরণ করিলেন (সীরাত আল-হালাবী, ৩খ., পৃ. ১৮১: তাবাকাত ইবন সা'দ, ২খ., পৃ. ১২৬)।
কোন কোন সূত্রে জানা যায়, হযরত বাশীর (রা) ও তাঁহার বাহিনীর আক্রান্ত হওয়ার সংবাদ প্রাপ্তির পরপরই রাসূলুল্লাহ (স) হযরত গালিব (রা)-কে সসৈন্যে তথায় প্রেরণ করিয়াছিলেন। এই মতানুযায়ী উপরিউক্ত দুই অভিযানের মধ্যে সময়-কালের তেমন ব্যবধান থাকে না, বরং উভয় অভিযানই প্রায় অভিন্ন সময়ে অর্থাৎ ৭ম হিজরীর শাবান/৬২৮ খৃস্টাব্দের ডিসেম্বরে পরিচালিত হইয়াছিল (মাগাযী আল-ওয়াকিদী, ২খ., পৃ. ৭২৪; দালাইল আল-বায়হাকী, ২খ., পৃ. ২৯৫; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ২৫২; রাসূল মুহাম্মদ (স)-এর সরকার কাঠামো, পৃ. ৩৫২; আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৪২৯)।
হযরত গালিব ইব্‌ন আবদিল্লাহ (রা)-এর নেতৃত্বাধীন এই বাহিনীতে হযরত উব্বা ইব্‌ন 'আমর (রা), হযরত আবূ মাস'উদ আল-বাদরী (রা), হযরত কা'ব ইব্‌ন উজরা (রা) ও হযরত উসামা ইব্‌ন যায়দ (রা) প্রমুখ সাহাবা-ই কিরাম অন্তর্ভুক্ত ছিলেন (তাবাকাত ইবন সা'দ, ২খ., পৃ. ১২৬; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ২৫২, উয়ূনুল আছার ২খ., পৃ. ১৫২)।
তাঁহারা সন্ধ্যারাত্রিতে বানু মুররা এলাকার কাছাকাছি পৌছিয়া শিবির স্থাপন করিলেন এবং গুপ্তচর পাঠাইয়া উহাদের খবরাখবর লইলেন। সেনাধ্যক্ষ হযরত গালিব (রা) এই সময় তাঁহার সৈন্যবাহিনীরকে এক ভাষণে বলিলেনঃ "আমি তোমাদিগকে এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহকে ভয় করার এবং আমাকে অনুসরণের জন্য উপদেশ প্রদান করিতেছি। সাবধান! আমার নির্দেশ অমান্য করিবে না। মনে রাখিও, যাহার আনুগত্য করা হয় না তাহার কোন মূল্য থাকে না। রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, 'যে ব্যক্তি আমার সেনাধ্যক্ষের আনুগত্য করে সে আমারই আনুগত্য করে, আর যে ব্যক্তি তাঁহার অবাধ্য হয় সে আমারই অবাধ্য হয়।' তোমরা আমার অবাধ্য হইলে প্রকারান্তরে নবী করীম (স)-এর অবাধ্য হইবে।" ইহার পর তিনি দুই দুইজনকে জুটি করিয়া কাতার সাজাইয়া বলিলেন, এই জুটির একজন অপরজনকে কখনও বিচ্ছিন্ন হইতে দিবে না। আমি যদি জিজ্ঞাসা করি, অমুকের সাথী কোথায় সে যেন এই উত্তর না দেয়, আমি জানি না। আমি যখন তাকবীর বলিব, তোমরা সবাই একসংগে তাকবীর বলিবে এবং তরবারি কোষমুক্ত করিবে (তাবাকাত ইব্‌ন সা'দ, ২খ., পৃ. ১২৬; সীরাত আল-হালাবী, ৩খ., পৃ. ১৮১; আয়নুল-ইয়াকীন, পৃ. ১২৩)। প্রত্যুষে সকল সৈন্য একযোগে অকস্মাৎ শত্রুর উপর ঝাপাইয়া পড়িল। যিনি যেখানে যাহাকে পাইলেন হত্যা করিলেন। এই যুদ্ধে মুসলিম স্যৈগণের সংকেত ছিল امت آمت মারিয়া ফেল, মারিয়া ফেল (তাবাকাত ইব্‌ن সা'দ, ২খ., পৃ. ১২৬; যাদুল মা'আদ, ২খ., পৃ. ১৪৮; সীরাত আল-হালাবী, ৩খ., পৃ. ১৮৯; উয়ূনুল আছার, ২খ., পৃ. ১৫২, নূরুল-ইয়াকীন, পৃ. ৩৩৮)।
এই মুররা গোত্রের হালীফ (মিত্র) ছিল 'জুহায়না' গোত্রের শাখা আল-হুরাকা উপ-গোত্র। আল-হুরাকা গোত্রের লোকজন সম্ভবত মিত্রতা সূত্রে বানু মুররা সংগে এই যুদ্ধে যোগ দিয়াছিল। অধিকাংশ সীরাত বিশারদের মতে, এই যুদ্ধে হযরত উসামা ইব্‌ন যায়দ (রা) আল-হুরাকা গোত্রীয় এক ব্যক্তিকে কলেমা পাঠ করিবার পরও হত্যা করিয়াছিলেন (আল-মাগাযী আল ওয়াকিদী, ২খ., পৃ. ৭২৪)।
অন্য একদল সীরাত বিশারদের মতে, হযরত উসামা ইব্‌ن যায়দ (রা) কর্তৃক আল-হুরাকা গোত্রীয় উক্ত ব্যক্তিকে হত্যার ঘটনা হযরত গালিব ইব্‌ن আবদুল্লাহ (রা)-এর 'আল-মায়ফাআ' নামক এক ভিন্ন অভিযানে ঘটিয়াছিল (তাবাকাত ইবন সা'দ, ২খ., পৃ. ১১৯; তারীখ তাবারী, ৩খ., পৃ. ৯৯)।
তৃতীয় একদল সীরাত বিশারদের মতে হযরত উসামা (রা) কর্তৃক উপরিউক্ত হত্যার ঘটনাটি হযরত গালিব (রা)-র নেতৃত্বাধীন 'আল-মায়ফাআ অভিযানে' বা বানু মুরারা অভিযানে সংঘটিত হয় নাই, বরং স্বয়ং হযরত উসামা ইব্‌ন যায়দ (রা)-এর নেতৃত্বে পরিচালিত আল-হুরাকা অভিযান নামক এক স্বতন্ত্র অভিযানে সংঘটিত হইয়াছিল (সহীহ বুখারী, ২খ., পৃ. ৬১২; আল-ইকলীল আল হাকিম, শারহ আল-মাওয়াহিব, ২খ., পৃ. ২৫১)।
হযরত উসামা (রা) বর্ণনা করিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স) আমাদিগকে জুহায়নার শাখা হুরাকা গোত্রের বিরুদ্ধে অভিযানে প্রেরণ করিলেন। আমরা অতি প্রত্যুষে উক্ত গোত্রকে আক্রমণ করিয়া পরাজিত করিলাম। আমি ও একজন আনসার ব্যক্তি এক ব্যক্তির পশ্চাদ্ধাবন করিলাম। আমরা যখন তাহাকে বাগে পাইয়া ঘিরিয়া ফেলিলাম তখন সে বলিয়া উঠিল, لا اله الا الله আমার সাথী আনসার ব্যক্তি তাহার মুখে 'কলেমা' শুনিয়া নিবৃত্ত হইলেন, কিন্তু আর্মি তাহাকে বল্লম দ্বারা আঘাত করিয়া হত্যা করিলাম। আমরা যুদ্ধক্ষেত্র হইতে ফিরিয়া আসিলে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট খবরটি পৌঁছিল। তিনি আমাকে ডাকিয়া বলিলেন, হে উসামা! তুমি কি তাহাকে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু বলিবার পরও হত্যা করিয়াছ? আমি বলিলাম, সে তো আত্মরক্ষার জন্য এই কলেমা বলিয়াছিল। রাসূলুল্লাহ (স) আবার বলিলেন, তুমি কি তাহাকে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু বলিবার পরও হত্যা করিয়াছ হে উসামা! এইভাবে রাসূলুল্লাহ (س) বারবার আমাকে উক্ত একই কথা বলিতে থকিলেন। শেষ পর্যন্ত আমার মনে এই আকাঙ্খার উদয় হইল, হায়! আমি যদি আজিকার দিনের পূর্বে ইসলাম গ্রহণ না করিতাম!
হযরত উসামা (রা) যাহাকে হত্যা করিয়াছিলেন তাহার নাম ছিল নাহীক ইন মিরদাস অথবা মিরদাস ইব্‌ন নাহীক আল-ফাযারী, মতান্তরে মিরদাস ইব্‌ন 'আমর আল-ফাদাকী (ফাতহুল বারী, ১২খ., পৃ. ১৬৩; আল-ইসাবা, ৩খ., পৃ. ১৮৩)। এই নামের বংশীয় পরিচয় হিসাবে আল-গাতাফানী, আল-আসলামী, আদ-দামরী (الضمری) প্রভৃতি বিভিন্ন বিশেষণ উল্লিখিত হয় (শারহ আল-মাওয়াহিব, ২খ., পৃ. ২৫১; তাফসীর কুরতুবী, ৫খ., পৃ. ৩৩৭)।
হযরত উসামা (রা)-এর জুটির অন্য সদস্য বা তাঁহার সাথী আনসার ব্যক্তির নাম সম্পর্কে ইব্‌ن হাজার আসকালানী (র) মন্তব্য করিয়াছেন, কোন সূত্রেই তিনি তাঁহার নাম উদ্ধার করিতে পারেন নাই (ফাতহুল বারী, ১২খ., পৃ. ১৬৩; উমদাতুল কারী, ১৭খ., পৃ. ২৭২)। অবশ্য হাফিজ আল-কাস্স্তাল্পানী (র) বলিয়াছেন, তাঁহার নাম সম্ভবত হযরত আবূ দারদা (রা)। 'আবদুর রাহমান ইবন যায়দ (ر)-এর সূত্রে ইহার সমর্থন পাওয়া যায় (শারহ আল-মাওয়াহিব, ২খ., পৃ. ২৫২)।
হয়রত উসামা (রা) উক্ত ব্যক্তিকে কলেমা পাঠের পরও কেন হত্যা করিলেন ইহার কারণ হিসাবে খাত্তাবী বলিয়াছেন, সম্ভবত তিনি আল্লাহর বাণী:
فَلَمْ يَكُ يَنْفَعُهُمْ إَيْمَانُهُمْ لَمَّا رَأَوْا بَأْسَنَا .
"তাহারা যখন আমার শান্তি প্রত্যক্ষ করিল তখন তাহাদের ঈমান আনয়ন তাহাদের কোন উপকারে আসিল না" (৪: ৮৫) তাহার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বলিয়া মনে করিয়াছেন। এই হেতু রাসূলুল্লাহ (স)-ও তাহার ওযর গ্রহণ করিয়াছেন এবং তাহার উপর দিয়াত (রক্তপণ) আরোপ করেন নাই (ফাতহুল বারী, ১২খ., পৃ. ১৬৪; উমদাতুল কারী, ২৪খ., পৃ. ৩৬)।
অবশ্য হযরত উসামা (রা) উক্ত কলেমা উচ্চারণকারীকে হত্যা করিবার যে কারণ বলিয়াছেন তাহা অন্য একটি হাদীছে সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায়। হাদীছটি এইরূপঃ হযরত জুনদুব ইব্‌ন মাকীছ (রা) বর্ণনা করিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স) মুসলিমগণের একটি বাহিনী মুশরিকদিগের বিরুদ্ধে পাঠাইলেন। উভয় দল পরস্পর সম্মুখীন হইল। মুশরিক বাহিনীতে এক ব্যক্তি ছিল, সে যখনই কোন মুসলিমকে দেখিত তাঁহাকে লক্ষ্য করিয়া ঝাঁপাইয়া পড়িত এবং তাহাকে হত্যা করিত। একজন মুসলিম তাহার অসতর্ক মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করিতে লাগিলেন। বর্ণনাকারী হযরত জুনদুব (রা) বলিয়াছেন, তিনি হইলেন হযরত উসামা ইব্‌ن যায়দ (রা)। হযরত উসামা (রা) যখন তাহার উপর তলোয়ার উত্তোলন করিলেন তখন সে (উক্ত মুশরিক) বলিয়া উঠিল, لا اله الا الله তবুও তিনি তাহাকে হত্যা করিলেন। দূত যুদ্ধে জয়লাভের সংবাদ লইয়া রাসূলুল্লাহ (س)-এর খেদমতে হাযির হইল। রাসুলুল্লাহ (س) তাহার নিকট যুদ্ধ পরিস্থিতি জানিতে চাহিলে তিনি সব ঘটনা খুলিয়া বলিলেন, এমনকি উসামা (রা) কর্তৃক হত্যার ঘটনাও। রাসূলুল্লাহ (س) উসামা (রা)-কে ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি তাহাকে কেন হত্যা করিয়াছ? উসামা (রা) বলিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! সে অনেক মুসলিম সৈন্যকে ঘায়েল করিয়াছে, অমুক অমুককে হত্যা করিয়াছে। সে যাঁহাকে যাঁহাকে হত্যা করিয়াছে তাঁহাদের নামও উসামা (রা) উল্লেখ করিলেন। আমি যখন তাহাকে আক্রমণ করিলাম এবং সে আমার তলোয়ার অবলোকন করিল অমনি সে বলিয়া উঠিল, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তুমি কি তাহাকে একেবারে মারিয়া ফেলিলে? তিনি উত্তর দিলেন, হাঁ। রাসূলুল্লাহ (س) বলিলেন, কিয়ামত দিবসে যখন সে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ-সহ উপস্থিত হইবে তখন তুমি কি করিবে? রাসূলুল্লাহ (স) বারবার একই কথা বলিতেছিলেন (সহীহ মুসলিম, ১খ., পৃ. ৬৮)।
অন্য হাদীছে আছে, উসামা (রা)-কে রাসূলুল্লাহ (س) বলিয়াছিলেন, "তুমি কেন তাহার অন্তর চিরিয়া দেখিলে না, সে সত্য বলিয়াছিল, না মিথ্যা বলিয়াছিল? তুমি কি তাহার অন্তর চিরিয়া দেখিয়াছ যে, সে তাহা অস্ত্রের ভয়ে বলিয়াছিল" (সহীহ মুসলিম, ১খ., পৃ. ৬৮; সুনান বায়হাকী, ৮খ., পৃ. ১৯২ ও পৃ. ১৯৬; মুসনাদ আহমাদ, ৫খ., ২০০, ২০৭: ৪খ., পৃ. ৪২৯)।
এই হাদীছের ব্যাখ্যায় ইমাম নববী (র) বলিয়াছেন, 'তুমি যেহেতু তাহার অন্তর চিরিয়া দেখিতে সমর্থ নহ সেহেতু তাহার মুখের কথাই তোমার বিশ্বাস করা উচিত ছিল' (শারহ মুসলিম লিন্নাবাবী, ১খ., পৃ. ৬৮, ৬৯)। ইমাম কুরতুবী (র) বলিয়াছেন, ইহাতে এই প্রমাণ রহিয়াছে যে, শরী'আতের হুকুম-আহকাম প্রয়োগে বাহ্যিক অবস্থার উপর নির্ভর করিতে হয়, অভ্যন্তরীণ অবস্থার উপর নহে (ফাতহুল বারী, ১২ খ., পৃ. ১৬৫)।
রাসূলুল্লাহ (স) এক পর্যায়ে হযরত উসামা (রা)-কে আরও বলিয়াছিলেন, তুমি আমাকে কথা দাও, ভবিষ্যতে তুমি এই ধরনের কোন ব্যক্তিকে হত্যা করিবে না। উসামা (রা) বলিয়াছিলেন, আল্লাহ আমাকে এই অংগীকারের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখুন যে, আমি ভবিষ্যতে এমন কাহাকেও হত্যা করিব না বা এমন কাহারও বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিব না যে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলিবে (আসাহ্হুস সিয়ার, প. ২১৭, ২১৮; যাদুল মা'আদ, ২খ., পৃ. ১৪৮ ও ১৪৯; তাবাকাত ইবন সা'দ, ২খ., পৃ. ১১৯; সীরাত হালাবী, ৩খ., পৃ. ১৮৮)।
এই কারণে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হযরত উসামা (রা) হযরত আলী (রা)-এর সহিত মুসলিম বিদ্রোহীদিগের বিরুদ্ধে কোন যুদ্ধেই অংশ গ্রহণ করেন নাই। তিনি হযরত আলী (রা)-কে তাহার অসম্মতির কথা জানাইয়া বিনীতভাবে বলিয়াছিলেন, হে আলী! আপনি যদি একটি গাধীর মুখে আপনার হাত ঢুকাইয়া দেন তাহা হইলে আমিও আমার হাত আপনার হাতের সহিত ঢুকাইয়া দিব। তবে আপনি তো জানেন, একজন কলেমা উচ্চারণকারীকে হত্যার পর রাসূলুল্লাহ আমাকে কি বলিয়াছিলেন! হযরত উসামা (রা)-এর মত হযরত সা'দ ইব্‌ন আবী ওয়াক্কাস (রা)-ও মুসলিমগণের কোন গৃহযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন নাই। একজন খারিজী তাঁহাকে প্রশ্ন করিয়াছিল, আল্লাহ কি ফিতনা দূরীভূত না হওয়া পর্যন্ত লড়াই অব্যাহত রাখিতে বলেন নাই? সা'দ (রা) বলিয়াছিলেন, 'আমরা তো কাফিরদিগের বিরুদ্ধে এইজন্য লড়াই করিয়াছি যাহাতে ফিতনা দূরীভূত হয়। আর তুমি ও তোমার সংগী খারিজীগণ তো এইজন্য লড়াই করিতেছ যাহাতে ফিতনা সৃষ্টি হয়' (সহীহ মুসলিম, ১খ., পৃ. ৬৮, ৬৯; সীরাত হালাবী, ৩খ., পৃ. ১৮৮; সুনান আল-বায়হাকী, ৮খ., পৃ. ১৯, ১৯২ ও ১৯৬; সীরাত ইব্‌ن হিশাম, ৪খ., পৃ. ২০০-২০১)।
হযরত উসামা (রা)-এর এই অভিযানে অসতর্ক হত্যা প্রসংগে কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল হইয়াছে বলিয়া বিভিন্ন তাফসীর গ্রন্থে বর্ণিত আছে: يُأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا ضَرَبْتُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَتَبَيِّنُوا وَلَا تَقُولُوا لِمَنْ الْقَى إِلَيْكُمُ السَّلمَ لَسْتَ مُؤْمِنًا . "হে মুমিনগণ! তোমরা যখন আল্লাহর পথে যাত্রা করিবে তখন পরীক্ষা করিয়া লইবে এবং কেহ তোমাদিগকে সালাম করিলে ইহ জীবনের সম্পদের আকাঙ্ক্ষায় তাহাকে বলিও না, তুমি মুমিন নহ। কারণ আল্লাহ্র নিকট অনায়াসলভ্য সম্পদ প্রচুর রহিয়াছে" (৪: ৯৩)।
মুফাসসিরগণ বলিয়াছেন, মিরদাস ইব্‌ن নাহীক নামক এক ব্যক্তি ফাদাক অঞ্চলের বাসিন্দা ছিল। সে ইসলাম গ্রহণ করিল, কিন্তু তাহার গোত্রের অন্য কেহ ইসলাম গ্রহণ করিল না। এমতাবস্থায় উহাদের নিকট রাসূলুল্লাহ (স) একটি অভিযান প্রেরণ করিলেন হযরত গালিব আল-লায়ছী (রা)-এর নেতৃত্বে। মুসলিম বাহিনী উহাদের নিকট পৌছিলে উহারা ভয়ে পালাইয়া গেল। কিন্তু মিরদাস ইসলাম গ্রহণের কারণে না পালাইয়া রহিয়া গেল। যখন সে মুসলিমগণের অশ্বারোহীদল দেখিতে পাইল সে তখন তাহার বকরীসমূহ পাহাড়ের আড়ালে রাখিয়া পাহাড়ের উপরে আরোহণ করিল। মুসলিম বাহিনী তাকবীর ধ্বনি করিয়া যুদ্ধ শুরু করিলে সেও তাকবীর ধ্বনি করিল এবং মুসলিম বহিনীর নিকট নামিয়া আসিয়া বলিলঃ لا إِلهَ إِلَّا اللَّهُ مُحَمَّدٌ رَّسُولُ اللَّهِ السَّلَامُ عَلَيْكُمْ.
কিন্তু হযরত উসামা (রা) তাহাকে হত্যা করিলেন এবং তাহার বকরীসমূহ হাঁকাইয়া লইয়া আসিলেন। তাহারা ঘটনাটি রাসূলুল্লাহ (স)-এর গোচরীভূত করিলে তিনি খুবই মর্মাহত হইলেন এবং হযরত উসামা (রা)-কে তিরস্কার করিলেন। হযরত উসামা (রা)-কে রাসূলুল্লাহ (স) উক্ত আয়াতটি শুনাইলেন। হযরত উসামা (রা) বলিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে একটি দাসমুক্তির উপদেশ দিলেন (তাফসীর কাশশাফ, ১খ., পৃ. ২৭১)।
উপরিউক্ত আয়াতের শানে নুযূল হিসাবে ঘটনাটি ছাড়াও ইহার প্রায় অনুরূপ একাধিক ঘটনার উল্লেখ করা হয়। কোন কোন বর্ণনায় দেখা যায়, হত্যাকারী হযরত মুহাল্লিম ইব্‌ জাছছামা এবং নিহত ব্যক্তি আমের ইবনুল আদবাত আল-আশজা'ঈ ছিলেন। অন্যান্য বর্ণনায় দেখা যায়, হত্যাকারী হযরত মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদ (রা), মতান্তরে আবু কাতাদা, মতান্তরে হযরত আবুদ দারদা (রা) এবং নিহত ব্যক্তির নাম জানা যায় নাই। হযরত আবদুল্লাহ ইব্‌ن আব্বাস (রা) সূত্রে বর্ণিত আছে, এক ব্যক্তি তাহার বকরী চরাইতেছিল, এমতাবস্থায় তাহার সহিত একদল মুসলিমের সাক্ষাত ঘটিল। সে তাহাদিগকে বলিল, আসসালামু আলায়কুম। কিন্তু তাহারা তাহাকে হত্যা করিল এবং তাহার বকরীসমূহ হাঁকাইয়া লইয়া আসিল। তাহাদের প্রসংগে উক্ত আয়াত অবতীর্ণ হয় (সহীহ বুখারী, ২খ., পৃ. ৬৬০)।
অন্য বর্ণনায় আছে, সালিম গোত্রের এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (স)-এর একদল সাহাবীর পাশ দিয়া তাহার বকরীর পাল চরাইতে চরাইতে পথ অতিক্রম করিতেছিল। সে তাহাদিগকে সালামও দিয়াছিল, কিন্তু তাঁহারা বলাবলি করিতে লাগিলেন, আমাদের হাত হইতে আত্মরক্ষা করিবার জন্যই সে আমাদিগকে সালাম দিয়াছে। ফলে তাঁহারা তাহার উপর ঝাঁপাইয়া পড়িলেন এবং তাহাকে হত্যা করিলেন। তাঁহারা তাহার বকরীর পাল লইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট উপনীত হইলেন। এই প্রসংগে উক্ত আয়াত অবতীর্ণ হয় (ফাতুহল কাদীর, ১খ., পৃ. ৫০২; তাফসীর তাবারী, ৪খ., পৃ. ১৩৯-১৪৩)।
ইমাম কুরতুবী (র) মন্তব্য করিয়াছেন, সম্ভবত উপরিউক্ত ভিন্ন ভিন্ন ঘটনাসমূহ মোটামুটি কাছাকাছি সময়ে সংঘটিত হইয়াছিল। ফলে উক্ত সকল ঘটনা সম্পর্কেই উক্ত আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এই মতানুযায়ী শানে নুযূলগুলির মধ্যে বৈপরীত্য থাকে না (তাফসীর কুরতুবী, ৫খ., পৃ. ৩৩৭; তাফসীর কারীর, ১১খ., পৃ. ৩০)।
মাগাযী সম্পর্কিত হাদীছসমূহের বর্ণনা প্রসংগে ইমাম বুখারী (র) সুস্পষ্ট ইংগিত দিয়াছেন যে, এই সারিয়‍্যা বা যুদ্ধাভিযানের সেনাধ্যক্ষ ছিলেন হযরত উসামা ইবন যায়দ (রা)। তিনি তাঁহার মতের স্বপক্ষে একাধিক হাদীছও উল্লেখ করিয়াছেন। তিনি এই যুদ্ধাভিযানের শিরোনাম দিয়াছেন:
باب بعث النبي اسامة بن زيد الى الحرقات من جهينة.
"জুহায়নার আল-হুরকা গোত্রের বিরুদ্ধে হযরত উসামা ইন্ন যায়দ (রা) কে প্রেরণের অনুচ্ছেদ” (সহীহ বুখারী, কিতাবুল মাগাযী, ২খ., পৃ. ৬১২)।
ইমাম বুখারী (র) কর্তৃক উক্তরূপ শিরোনামে অনুচ্ছেদ রচনার প্রেক্ষিতে শায়খ আদ্‌-দাউদীসহ কেহ কেহ প্রশ্ন তুলিয়াছেন, অপ্রাপ্তবয়স্ক হযরত উসামা (রা) সেনাধ্যক্ষ নিযুক্ত হইলেন কিভাবে? ইহার উত্তর দুইভাবে প্রদান করা হয়। প্রথমত, হযরত উসামা (রা) যে সেনাধ্যক্ষ ছিলেন ইহার আভাষ আছে মাত্র এইখানে, ইহার দ্ব্যর্থহীন উল্লেখ এইখানে নাই। হইতে পারে হযরত উসামা (রা) ঘটনার মূল নায়ক ছিলেন বলিয়া সরাসরি তাঁহার নামেই ইমাম বুখারী (ر) অনুচ্ছেদ রচনা করিয়াছেন (সহীহ বুখারী, ২খ., পৃ. ৬১২; টীকা নং ৪; ফাতহুল-বারী, ১২খ., পৃ. ১৬৩-১৬৪; উমদাতুল কারী ১৭খ., পৃ. ২৭২)। দ্বিতীয়ত, হযরত উসামা ইন্ন যায়দ (রা) তখন অপ্রাপ্তবয়স্ক ছিলেন না, তিনি ছিলেন পূর্ণবয়স্ক। রাসূলুল্লাহ (স)-এর ইনতিকালের সময় তাহার বয়স ছিল কমপক্ষে ১৮, মতান্তরে ১৯ বা ২০ বৎসর। এই যুদ্ধাভিযান ৮ম হিজরীতে সংঘটিত হইয়া থাকিলে তখন হযরত উসামা (را)-এর বয়স ছিল অন্যূন ১৫, ১৬ কিংবা ১৭ বৎসর। সুতরাং উক্ত বয়সের একজন যুবকের জন্য রাসূলুল্লাহ (س) কর্তৃক সেনাধ্যক্ষ পদে নিযুক্তি লাভ করা অস্বাভাবিক নয়। তিনি একান্তভাবে রাসূলুল্লাহ (س)-এর প্রিয়পাত্র ছিলেন (আল-ইসতী'আব, ১খ., পৃ. ৭৫-৭৮; উসদুল গাবা, ১খ., পৃ. ৬৪-৬৬; আল-ইসাবা, ১খ, পৃ. ৩১; সহীহ বুখারী, ২খ, পৃ. ৬১২, টীকা নং ৪; ফাতহুল-বারী, ১২খ., পৃ. ১৬৩-১৬৪):
ইমাম আল-হাকেম (র) তাঁহার আল-ইকলীল গ্রন্থে উসামা (রা)-কে সেনাধ্যক্ষ উল্লেখপূর্বক আল-হুরাকাতে তাঁহার নেতৃত্বাধীন যুদ্ধাভিযান প্রসংগ স্বতন্ত্রভাবে উল্লেখ করিয়াছেন (শারহ আল-মাওয়াহিব, ২খ., পৃ. ২৫১)। হাফিজ ইব্‌ন কায়্যিম (র)-সহ আরও কিছু সংখ্যক সীরাতকার উপরিউক্ত ধারার অনুসরণ করিয়াছেন (যাদুল মা'আদ, ২খ., পৃ. ১৪৮; আসাহ্হুস সিয়ার, পৃ. ২১৭, ২১৮)।
হযরত উসামা (রা) সেনাধ্যক্ষ নিযুক্ত হইয়া থাকিলে এই যুদ্ধাভিযান অবশ্যই ৮ম হিজরীর জুমাদাল-উলা/৬২৯ খৃস্টাব্দের সেপ্টেম্বরে মৃতা অভিযানের পরে সংঘটিত হইয়াছিল। কারণ মৃতা অভিযানে শাহাদাত বরণকারী তাহার পিতা ও সেনাধ্যক্ষ হযরত যায়দ ইব্‌ন হারিছা (রা) জীবিত থাকিতে তিনি যে সেনাধ্যক্ষ নিযুক্ত হন নাই তাহা এক ঐতিহাসিক সত্য। এই কারণে ইমাম বুখারী (র) সময়ের ধারাবাহিকতায় মৃত। অভিযানের পরেই হযরত উসামা (রা)-এর অভিযানের অবস্থান নির্ধারণ করিয়াছেন (সহীহ বুখারী, ২খ., পৃ. ২, সূচীপত্র এবং পৃ. ৬১১ ও ৬১২ এবং ৪ নং টীকা, এবং পৃ. ৬৪১, ৬৪২; আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৪৩৫-৪৪০)।
আর যদি উসামা (রা) একজন সাধারণ সৈন্য হিসাবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিয়া থাকেন তাহা হইলে এই যুদ্ধাভিযান মৃতা যুদ্ধের পূর্বে সংঘটিত হইয়াছিল। ইহাতে কোন সমস্যাই থাকে না এবং এই ক্ষেত্রে সেনাধ্যক্ষ ছিলেন হযরত গালিব ইব্‌ন আব্দিল্লাহ। সীরাতকারদিগের অভিমত ইহাই (সহীহ বুখারী, ২খ., পৃ. ৬১২, ৪ নং টাকা; ফাতহুল বারী, ৭খ., পৃ. ৫১৮)।
মুসলিম বাহিনী এই যুদ্ধে বহু সংখ্যক উট ও বকরী গনীমত হিসাবে লাভ করে, অনেক কাফির মুশরিককে হত্যা করে, অন্য অনেককে বন্দী করিয়া মদীনা লাইয়া আসে। এক একজন মুজাহিদ ১০টি করিযা উট কিংবা প্রতিটি উটের পরিবর্তে ১০টি করিয়া বকরী গনীমত পাইয়াছিলেন (যাদুল মা'আদ, ২খ., পৃ. ১৪৮; সীরাত হালাবী, ৩খ., পৃ. ১৮৯)।

৮ম হিজরীর সাফার/৬২৯ খৃ. জুন হযরত গালিব ইব্‌ন আব্দিল্লাহ আল-লায়ছী (রা)-এর নেতৃত্বে দুই শত মুজাহিদের একটি বাহিনী 'ফাদাক' -এর 'বানু মুররা' এলাকায় একটি অভিযানে প্রেরিত হয় (তাবাকাত ইবন সা'দ, ২খ., পৃ. ১২৬; আল-মাওয়াহিব, ১খ., পৃ. ১৪৪; সীরাত আল-হালাবী ৩খ., পৃ. ১৮৬)। 'ফাদাক' হইল 'খায়বার'-এর পাশ্ববর্তী একটি কৃষিপ্রধান ইয়াহুদী বসতী, মদীনা মুনাওওয়ারা হইতে ইহার দূরত্ব দুই দিনের অথবা তিন দিনের পথ (মু'জামুল বুলদান, ৪খ., পৃ. ২৩৮; আল মুনজিদ ফিল আ'লামা, পৃ. ৫২০) মতান্তরে ছয় মাইল (সীরাত আল-হালাবী, ৩খ., পৃ. ১৮৬; শারহ আল-মাওয়াহিব, ২খ., পৃ. ২৫০; আল-ইসাবা, ৩খ., পৃ. ১৮৪)।
কোন কোন সূত্রে 'গালিব ইব্‌ন আব্দিল্লাহ' নামের পরিবর্তে 'আবদুল্লাহ ইব্‌ন গালিব, মতান্তরে গালিব ইবন 'উবায়দুল্লাহ, মতান্তরে 'গালিব ইব্‌ন ফুদালা' (রা) নাম পাওয়া যায় (সুনান আবী দাউদ, ভারতীয় সং ২খ., পৃ. ১৫: মুসনাদ আহমাদ, ৫খ., পৃ. ২০০, ২০৭; বাযলুল মাজহুদ, ১২খ., পৃ. ১৫২, ২১৪; আল-ইসতী'আব, ৩খ., পৃ. ১২৫২; আল-ইসাবা ৩খ., পৃ. ১৮৩, ১৮৪; জামিউল উসূল, ৩খ., পৃ. ২২১, পাদটীকা; তাফসীর কুরতুবী, ৫খ., পৃ. ৩৩৭; আল-কাশশাফ, ১খ., পৃ. ২৯১)। অবশ্য হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন গালিব আল-লায়ছী (রা) নামক একজন সাহাবীর নেতৃত্বে একটি বাহিনীকে রাসূলুল্লাহ (স) দ্বিতীয় হিজরীতে ফadাক অঞ্চলে প্রেরণ করিয়াছিলেন বলিয়া হযরত আবূ 'আমর (র) সূত্রে জানা যায় (আল-ইসাবা, ২খ., পৃ. ৩৫৭; উসদুল গাবা, ৩খ., পৃ. ২৪২; বাযলুল মাজহুদ, ১২ খ., পৃ. ২১৪; 'আওনুল মা'বুদ, ৭খ., পৃ. ৮৮৮)। ৭ম হিজরীর প্রারম্ভে 'ফাদাক' রাসূলুল্লাহ (স)-এর হস্তগত হওয়ার পূর্বে বা পরে কোন এক সময়ে হযরত গালিব ইব্‌ন ফুদালা আল-লায়ছী (রা) উক্ত অঞ্চলে এক সৈন্যবহর লইয়া অভিযান পরিচালনা করিয়াছেন বলিয়াও অন্য এক সূত্রে জানা যায় (আল-ইসাবা, ৩খ., পৃ. ১৮৪, আল-কাশশাফ, ১খ., পৃ. ২৭১; তাফসীর কাবীর, ১১খ., পৃ. ৩)।
এই অভিযানের কারণ ছিল এই যে, ছয় মাস পূর্বে অর্থাৎ ৭ম হিজরীর শা'বান মাসে হযরত বাশীর ইবন সা'দ (রা)-এব নেতৃত্বাধীন একদল সৈন্য বানু মুররা কর্তৃক মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হইয়াছিলেন (তারীখ তাবারী, ৩খ., পৃ. ১৯; আল-মাওয়াহিব, ১খ., পৃ. ১৪১; শারহ আল-মাওয়াহিব, ২খ., পৃ. ৫০)। তাহাদিগকে শায়েস্তা করিবার জন্য রাসূলুল্লাহ (স) প্রথমে
হযরত যুবায়র ইবনুল আওয়াম (রা)-কে অভিযানের জন্য প্রস্তুত করিয়া বলিয়াছিলেন, "যুবায়র! তুমি বানু মুররা এলাকায় পৌছিয়া বাশীরের বাহিনী আক্রান্ত হওয়ার প্রতিশোধ গ্রহণ কর। আল্লাহ তোমাদিগকে বিজয়ী করিলে তোমরা উহাদিগের মধ্যে অবস্থান করিবে না"। ইহা বলিয়া রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার হাতে যুদ্ধের পতাকাও তুলিয়া দিয়াছিলেন। কিন্তু এমন সময় হযরত গালিব ইব্‌ন আব্দিল্লাহ আল-লায়ছী (রা) আল-কাদীদ অভিযান [দ্র. গালিব ইব্‌ন আব্দিল্লাহ আল্-লায়ছী (রা)-এর আল-কাদীদ অভিযান] সমাপ্ত করিয়া বিজয়ী বেশে মদীনা মুনাওওয়ারায় ফিরিয়া আসিলে রাসূলুল্লাহ (স) হযরত যুবায়র (রা)-এর পরিবর্তে তাহাকে প্রেরণ করিলেন (সীরাত আল-হালাবী, ৩খ., পৃ. ১৮১: তাবাকাত ইবন সা'দ, ২খ., পৃ. ১২৬)।
কোন কোন সূত্রে জানা যায়, হযরত বাশীর (রা) ও তাঁহার বাহিনীর আক্রান্ত হওয়ার সংবাদ প্রাপ্তির পরপরই রাসূলুল্লাহ (স) হযরত গালিব (রা)-কে সসৈন্যে তথায় প্রেরণ করিয়াছিলেন। এই মতানুযায়ী উপরিউক্ত দুই অভিযানের মধ্যে সময়-কালের তেমন ব্যবধান থাকে না, বরং উভয় অভিযানই প্রায় অভিন্ন সময়ে অর্থাৎ ৭ম হিজরীর শাবান/৬২৮ খৃস্টাব্দের ডিসেম্বরে পরিচালিত হইয়াছিল (মাগাযী আল-ওয়াকিদী, ২খ., পৃ. ৭২৪; দালাইল আল-বায়হাকী, ২খ., পৃ. ২৯৫; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ২৫২; রাসূল মুহাম্মদ (স)-এর সরকার কাঠামো, পৃ. ৩৫২; আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৪২৯)।
হযরত গালিব ইব্‌ন আবদিল্লাহ (রা)-এর নেতৃত্বাধীন এই বাহিনীতে হযরত উব্বা ইব্‌ন 'আমর (রা), হযরত আবূ মাস'উদ আল-বাদরী (রা), হযরত কা'ব ইব্‌ন উজরা (রা) ও হযরত উসামা ইব্‌ন যায়দ (রা) প্রমুখ সাহাবা-ই কিরাম অন্তর্ভুক্ত ছিলেন (তাবাকাত ইবন সা'দ, ২খ., পৃ. ১২৬; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ২৫২, উয়ূনুল আছার ২খ., পৃ. ১৫২)।
তাঁহারা সন্ধ্যারাত্রিতে বানু মুররা এলাকার কাছাকাছি পৌছিয়া শিবির স্থাপন করিলেন এবং গুপ্তচর পাঠাইয়া উহাদের খবরাখবর লইলেন। সেনাধ্যক্ষ হযরত গালিব (রা) এই সময় তাঁহার সৈন্যবাহিনীরকে এক ভাষণে বলিলেন: "আমি তোমাদিগকে এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহকে ভয় করার এবং আমাকে অনুসরণের জন্য উপদেশ প্রদান করিতেছি। সাবধান! আমার নির্দেশ অমান্য করিবে না। মনে রাখিও, যাহার আনুগত্য করা হয় না তাহার কোন মূল্য থাকে না। রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, 'যে ব্যক্তি আমার সেনাধ্যক্ষের আনুগত্য করে সে আমারই আনুগত্য করে, আর যে ব্যক্তি তাঁহার অবাধ্য হয় সে আমারই অবাধ্য হয়।' তোমরা আমার অবাধ্য হইলে প্রকারান্তরে নবী করীম (স)-এর অবাধ্য হইবে।" ইহার পর তিনি দুই দুইজনকে জুটি করিয়া কাতার সাজাইয়া বলিলেন, এই জুটির একজন অপরজনকে কখনও বিচ্ছিন্ন হইতে দিবে না। আমি যদি জিজ্ঞাসা করি, অমুকের সাথী কোথায় সে যেন এই উত্তর না দেয়, আমি জানি না। আমি যখন তাকবীর বলিব, তোমরা সবাই একসংগে তাকবীর বলিবে এবং তরবারি কোষমুক্ত করিবে (তাবাকাত ইব্‌ন সা'দ, ২খ., পৃ. ১২৬; সীরাত আল-হালাবী, ৩খ., পৃ. ১৮১; আয়নুল-ইয়াকীন, পৃ. ১২৩)। প্রত্যুষে সকল সৈন্য একযোগে অকস্মাৎ শত্রুর উপর ঝাপাইয়া
পড়িল। যিনি যেখানে যাহাকে পাইলেন হত্যা করিলেন। এই যুদ্ধে মুসলিম স্যৈগণের সংকেত ছিল امت آمت মারিয়া ফেল, মারিয়া ফেল (তাবাকাত ইব্‌ন সা'দ, ২খ., পৃ. ১২৬; যাদুল মা'আদ, ২খ., পৃ. ১৪৮; সীরাত আল-হালাবী, ৩খ., পৃ. ১৮৯; উয়ূনুল আছার, ২খ., পৃ. ১৫২, নূরুল-ইয়াকীন, পৃ. ৩৩৮)।
এই মুররা গোত্রের হালীফ (মিত্র) ছিল 'জুহায়না' গোত্রের শাখা আল-হুরাকা উপ-গোত্র। আল-হুরাকা গোত্রের লোকজন সম্ভবত মিত্রতা সূত্রে বানু মুররা সংগে এই যুদ্ধে যোগ দিয়াছিল। অধিকাংশ সীরাত বিশারদের মতে, এই যুদ্ধে হযরত উসামা ইব্‌ন যায়দ (রা) আল-হুরাকা গোত্রীয় এক ব্যক্তিকে কলেমা পাঠ করিবার পরও হত্যা করিয়াছিলেন (আল-মাগাযী আল ওয়াকিদী, ২খ., পৃ. ৭২৪)।
অন্য একদল সীরাত বিশারদের মতে, হযরত উসামা ইব্‌ন যায়দ (রা) কর্তৃক আল-হুরাকা গোত্রীয় উক্ত ব্যক্তিকে হত্যার ঘটনা হযরত গালিব ইব্‌ন আবদুল্লাহ (রা)-এর 'আল-মায়ফাআ' নামক এক ভিন্ন অভিযানে ঘটিয়াছিল (তাবাকাত ইবন সা'দ, ২খ., পৃ. ১১৯; তারীখ তাবারী, ৩খ., পৃ. ৯৯)।
তৃতীয় একদল সীরাত বিশারদের মতে হযরত উসামা (রা) কর্তৃক উপরিউক্ত হত্যার ঘটনাটি হযরত গালিব (রা)-র নেতৃত্বাধীন 'আল-মায়ফাআ অভিযানে' বা বানু মুরারা অভিযানে সংঘটিত হয় নাই, বরং স্বয়ং হযরত উসামা ইব্‌ন যায়দ (রা)-এর নেতৃত্বে পরিচালিত আল-হুরাকা অভিযান নামক এক স্বতন্ত্র অভিযানে সংঘটিত হইয়াছিল (সহীহ বুখারী, ২খ., পৃ. ৬১২; আল-ইকলীল আল হাকিম, শারহ আল-মাওয়াহিব, ২খ., পৃ. ২৫১)।
হযরত উসামা (রা) বর্ণনা করিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স) আমাদিগকে জুহায়নার শাখা হুরাকা গোত্রের বিরুদ্ধে অভিযানে প্রেরণ করিলেন। আমরা অতি প্রত্যুষে উক্ত গোত্রকে আক্রমণ করিয়া পরাজিত করিলাম। আমি ও একজন আনসার ব্যক্তি এক ব্যক্তির পশ্চাদ্ধাবন করিলাম। আমরা যখন তাহাকে বাগে পাইয়া ঘিরিয়া ফেলিলাম তখন সে বলিয়া উঠিল, لا اله الا الله আমার সাথী আনসার ব্যক্তি তাহার মুখে 'কলেমা' শুনিয়া নিবৃত্ত হইলেন, কিন্তু আর্মি তাহাকে বল্লম দ্বারা আঘাত করিয়া হত্যা করিলাম। আমরা যুদ্ধক্ষেত্র হইতে ফিরিয়া আসিলে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট খবরটি পৌঁছিল। তিনি আমাকে ডাকিয়া বলিলেন, হে উসামা! তুমি কি তাহাকে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু বলিবার পরও হত্যা করিয়াছ? আমি বলিলাম, সে তো আত্মরক্ষার জন্য এই কলেমা বলিয়াছিল। রাসূলুল্লাহ (স) আবার বলিলেন, তুমি কি তাহাকে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু বলিবার পরও হত্যা করিয়াছ হে উসামা! এইভাবে রাসূলুল্লাহ (স) বারবার আমাকে উক্ত একই কথা বলিতে থকিলেন। শেষ পর্যন্ত আমার মনে এই আকাঙ্খার উদয় হইল, হায়! আমি যদি আজিকার দিনের পূর্বে ইসলাম গ্রহণ না করিতাম!
হযরত উসামা (রা) যাহাকে হত্যা করিয়াছিলেন তাহার নাম ছিল নাহীক ইন মিরদাস অথবা মিরদাস ইব্‌ন নাহীক আল-ফাযারী, মতান্তরে মিরদাস ইব্‌ন 'আমর আল-ফাদাকী
(ফাতহুল বারী, ১২খ., পৃ. ১৬৩; আল-ইসাবা, ৩খ., পৃ. ১৮৩)। এই নামের বংশীয় পরিচয় হিসাবে আল-গাতাফানী, আল-আসলামী, আদ-দামরী (الضمری) প্রভৃতি বিভিন্ন বিশেষণ উল্লিখিত হয় (শারহ আল-মাওয়াহিব, ২খ., পৃ. ২৫১; তাফসীর কুরতুবী, ৫খ., পৃ. ৩৩৭)।
হযরত উসামা (রা)-এর জুটির অন্য সদস্য বা তাঁহার সাথী আনসার ব্যক্তির নাম সম্পর্কে ইব্‌ন হাজার আসকালানী (র) মন্তব্য করিয়াছেন, কোন সূত্রেই তিনি তাঁহার নাম উদ্ধার করিতে পারেন নাই (ফাতহুল বারী, ১২খ., পৃ. ১৬৩; উমদাতুল কারী, ১৭খ., পৃ. ২৭২)। অবশ্য হাফিজ আল-কাস্স্তাল্পানী (র) বলিয়াছেন, তাঁহার নাম সম্ভবত হযরত আবূ দারদা (রা)। 'আবদুর রাহমান ইবন যায়দ (র)-এর সূত্রে ইহার সমর্থন পাওয়া যায় (শারহ আল-মাওয়াহিব, ২খ., পৃ. ২৫২)।
হয়রত উসামা (রা) উক্ত কলেমা উচ্চারণকারীকে হত্যা করিবার যে কারণ বলিয়াছেন তাহা অন্য একটি হাদীছে সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায়। হাদীছটি এইরূপঃ হযরত জুনদুব ইব্‌ন মাকীছ (রা) বর্ণনা করিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স) মুসলিমগণের একটি বাহিনী মুশরিকদিগের বিরুদ্ধে পাঠাইলেন। উভয় দল পরস্পর সম্মুখীন হইল। মুশরিক বাহিনীতে এক ব্যক্তি ছিল, সে যখনই কোন মুসলিমকে দেখিত তাঁহাকে লক্ষ্য করিয়া ঝাঁপাইয়া পড়িত এবং তাহাকে হত্যা করিত। একজন মুসলিম তাহার অসতর্ক মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করিতে লাগিলেন। বর্ণনাকারী হযরত জুনদুব (রা) বলিয়াছেন, তিনি হইলেন হযরত উসামা ইব্‌ন যায়দ (রা)। হযরত উসামা (রা) যখন তাহার উপর তলোয়ার উত্তোলন করিলেন তখন সে (উক্ত মুশরিক) বলিয়া উঠিল, لا اله الا الله তবুও তিনি তাহাকে হত্যা করিলেন। দূত যুদ্ধে জয়লাভের সংবাদ লইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর খেদমতে হাযির হইল। রাসুলুল্লাহ (স) তাহার নিকট যুদ্ধ পরিস্থিতি জানিতে চাহিলে তিনি সব ঘটনা খুলিয়া বলিলেন, এমনকি উসামা (রা) কর্তৃক হত্যার ঘটনাও। রাসূলুল্লাহ (স) উসামা (রা)-কে ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি তাহাকে কেন হত্যা করিয়াছ? উসামা (রা) বলিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! সে অনেক মুসলিম সৈন্যকে ঘায়েল করিয়াছে, অমুক অমুককে হত্যা করিয়াছে। সে যাঁহাকে যাঁহাকে হত্যা করিয়াছে তাঁহাদের নামও উসামা (রা) উল্লেখ করিলেন। আমি যখন তাহাকে আক্রমণ করিলাম এবং সে আমার তলোয়ার অবলোকন
করিল অমনি সে বলিয়া উঠিল, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তুমি কি তাহাকে একেবারে মারিয়া ফেলিলে? তিনি উত্তর দিলেন, হাঁ। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, কিয়ামত দিবসে যখন সে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ-সহ উপস্থিত হইবে তখন তুমি কি করিবে? রাসূলুল্লাহ (স) বারবার একই কথা বলিতেছিলেন (সহীহ মুসলিম, ১খ., পৃ. ৬৮)।
অন্য হাদীছে আছে, উসামা (রা)-কে রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছিলেন, "তুমি কেন তাহার অন্তর চিরিয়া দেখিলে না, সে সত্য বলিয়াছিল, না মিথ্যা বলিয়াছিল? তুমি কি তাহার অন্তর চিরিয়া দেখিয়াছ যে, সে তাহা অস্ত্রের ভয়ে বলিয়াছিল" (সহীহ মুসলিম, ১খ., পৃ. ৬৮; সুনান বায়হাকী, ৮খ., পৃ. ১৯২ ও পৃ. ১৯৬; মুসনাদ আহমাদ, ৫খ., ২০০, ২০৭: ৪খ., পৃ. ৪২৯)।
এই হাদীছের ব্যাখ্যায় ইমাম নববী (র) বলিয়াছেন, 'তুমি যেহেতু তাহার অন্তর চিরিয়া দেখিতে সমর্থ নহ সেহেতু তাহার মুখের কথাই তোমার বিশ্বাস করা উচিত ছিল' (শারহ মুসলিম লিন্নাবাবী, ১খ., পৃ. ৬৮, ৬৯)। ইমাম কুরতুবী (র) বলিয়াছেন, ইহাতে এই প্রমাণ রহিয়াছে যে, শরী'আতের হুকুম-আহকাম প্রয়োগে বাহ্যিক অবস্থার উপর নির্ভর করিতে হয়, অভ্যন্তরীণ অবস্থার উপর নহে (ফাতহুল বারী, ১২ খ., পৃ. ১৬৫)।
রাসূলুল্লাহ (স) এক পর্যায়ে হযরত উসামা (রা)-কে আরও বলিয়াছিলেন, তুমি আমাকে কথা দাও, ভবিষ্যতে তুমি এই ধরনের কোন ব্যক্তিকে হত্যা করিবে না। উসামা (রা) বলিয়াছিলেন, আল্লাহ আমাকে এই অংগীকারের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখুন যে, আমি ভবিষ্যতে এমন কাহাকেও হত্যা করিব না বা এমন কাহারও বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিব না যে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলিবে (আসাহ্হুস সিয়ার, প. ২১৭, ২১৮; যাদুল মা'আদ, ২খ., পৃ. ১৪৮ ও ১৪৯; তাবাকাত ইবন সা'দ, ২খ., পৃ. ১১৯; সীরাত হালাবী, ৩খ., পৃ. ১৮৮)।
এই কারণে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হযরত উসামা (রা) হযরত আলী (রা)-এর সহিত মুসলিম বিদ্রোহীদিগের বিরুদ্ধে কোন যুদ্ধেই অংশ গ্রহণ করেন নাই। তিনি হযরত আলী (রা)-কে তাহার অসম্মতির কথা জানাইয়া বিনীতভাবে বলিয়াছিলেন, হে আলী! আপনি যদি একটি গাধীর মুখে আপনার হাত ঢুকাইয়া দেন তাহা হইলে আমিও আমার হাত আপনার হাতের সহিত ঢুকাইয়া দিব। তবে আপনি তো জানেন, একজন কলেমা উচ্চারণকারীকে হত্যার পর রাসূলুল্লাহ আমাকে কি বলিয়াছিলেন! হযরত উসামা (রা)-এর মত হযরত সা'দ ইব্‌ন আবী ওয়াক্কাস (রা)-ও মুসলিমগণের কোন গৃহযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন নাই। একজন খারিজী তাঁহাকে প্রশ্ন করিয়াছিল, আল্লাহ কি ফিতনা দূরীভূত না হওয়া পর্যন্ত লড়াই অব্যাহত রাখিতে বলেন নাই? সা'দ (রা) বলিয়াছিলেন, 'আমরা তো কাফিরদিগের বিরুদ্ধে এইজন্য লড়াই করিয়াছি যাহাতে ফিতনা দূরীভূত হয়। আর তুমি ও তোমার সংগী খারিজীগণ তো এইজন্য লড়াই করিতেছ যাহাতে ফিতনা সৃষ্টি হয়' (সহীহ মুসলিম, ১খ., পৃ. ৬৮, ৬৯; সীরাত হালাবী, ৩খ., পৃ. ১৮৮; সুনান আল-বায়হাকী, ৮খ., পৃ. ১৯, ১৯২ ও ১৯৬; সীরাত ইব্‌ন হিশাম, ৪খ., পৃ. ২০০-২০১)।
হযরত উসামা (রা)-এর এই অভিযানে অসতর্ক হত্যা প্রসংগে কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল হইয়াছে বলিয়া বিভিন্ন তাফসীর গ্রন্থে বর্ণিত আছে: يُأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا ضَرَبْتُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَتَبَيِّنُوا وَلَا تَقُولُوا لِمَنْ الْقَى إِلَيْكُمُ السَّلمَ لَسْتَ مُؤْمِنًا تَبْتَغُوْنَ عَرَضَ الْحَيَوةِ الدُّنْيَا فَعِنْدَ اللَّهِ مَغَانِمُ كَثِيرَةٌ.
"হে মুমিনগণ! তোমরা যখন আল্লাহর পথে যাত্রা করিবে তখন পরীক্ষা করিয়া লইবে এবং কেহ তোমাদিগকে সালাম করিলে ইহ জীবনের সম্পদের আকাঙ্ক্ষায় তাহাকে বলিও না, তুমি মুমিন নহ। কারণ আল্লাহ্র নিকট অনায়াসলভ্য সম্পদ প্রচুর রহিয়াছে" (৪: ৯৪; তাফসীর কুরতুবী, ৫খ., পৃ. ৩৩৭; তাফসীর কাবীর, ১খ., পৃ. ৩)।
মুফাসসিরগণ বলিয়াছেন, মিরদাস ইব্‌ন নাহীক নামক এক ব্যক্তি ফাদাক অঞ্চলের বাসিন্দা ছিল। সে ইসলাম গ্রহণ করিল, কিন্তু তাহার গোত্রের অন্য কেহ ইসলাম গ্রহণ করিল না। এমতাবস্থায় উহাদের নিকট রাসূলুল্লাহ (স) একটি অভিযান প্রেরণ করিলেন হযরত গালিব আল-লায়ছী (রা)-এর নেতৃত্বে। মুসলিম বাহিনী উহাদের নিকট পৌছিলে উহারা ভয়ে পালাইয়া গেল। কিন্তু মিরদাস ইসলাম গ্রহণের কারণে না পালাইয়া রহিয়া গেল। যখন সে মুসলিমগণের অশ্বারোহীদল দেখিতে পাইল সে তখন তাহার বকরীসমূহ পাহাড়ের আড়ালে রাখিয়া পাহাড়ের উপরে আরোহণ করিল। মুসলিম বাহিনী তাকবীর ধ্বনি করিয়া যুদ্ধ শুরু করিলে সেও তাকবীর ধ্বনি করিল এবং মুসলিম বহিনীর নিকট নামিয়া আসিয়া বলিল: لا إِلهَ إِلَّا اللَّهُ مُحَمَّدٌ رَّسُولُ اللَّهِ السَّلَامُ عَلَيْكُمْ.
কিন্তু হযরত উসামা (রা) তাহাকে হত্যা করিলেন এবং তাহার বকরীসমূহ হাঁকাইয়া লইয়া আসিলেন। তাহারা ঘটনাটি রাসূলুল্লাহ (স)-এর গোচরীভূত করিলে তিনি খুবই মর্মাহত হইলেন এবং হযরত উসামা (রা)-কে তিরস্কার করিলেন। হযরত উসামা (রা)-কে রাসূলুল্লাহ (স) উক্ত আয়াতটি শুনাইলেন। হযরত উসামা (রা) বলিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে একটি দাসমুক্তির উপদেশ দিলেন (তাফসীর কাশশাফ, ১খ., পৃ. ২৭১)।
উপরিউক্ত আয়াতের শানে নুযূল হিসাবে ঘটনাটি ছাড়াও ইহার প্রায় অনুরূপ একাধিক ঘটনার উল্লেখ করা হয়। কোন কোন বর্ণনায় দেখা যায়, হত্যাকারী হযরত মুহাল্লিম ইব্‌ জাছছামা এবং নিহত ব্যক্তি আমের ইবনুল আদবাত আল-আশজা'ঈ ছিলেন। অন্যান্য বর্ণনায় দেখা যায়, হত্যাকারী হযরত মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদ (রা), মতান্তরে আবু কাতাদা, মতান্তরে হযরত আবুদ দারদা (রা) এবং নিহত ব্যক্তির নাম জানা যায় নাই। হযরত আবদুল্লাহ ইব্‌ন আব্বাস (রা) সূত্রে বর্ণিত আছে, এক ব্যক্তি তাহার বকরী চরাইতেছিল, এমতাবস্থায় তাহার সহিত একদল মুসলিমের সাক্ষাত ঘটিল। সে তাহাদিগকে বলিল, আসসালামু আলায়কুম। কিন্তু তাহারা তাহাকে হত্যা করিল এবং তাহার বকরীসমূহ হাঁকাইয়া লইয়া আসিল। তাহাদের প্রসংগে উক্ত আয়াত অবতীর্ণ হয় (সহীহ বুখারী, ২খ., পৃ. ৬৬০)।
অন্য বর্ণনায় আছে, সালিম গোত্রের এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (স)-এর একদল সাহাবীর পাশ দিয়া তাহার বকরীর পাল চরাইতে চরাইতে পথ অতিক্রম করিতেছিল। সে তাহাদিগকে সালামও দিয়াছিল, কিন্তু তাঁহারা বলাবলি করিতে লাগিলেন, আমাদের হাত হইতে আত্মরক্ষা করিবার জন্যই সে আমাদিগকে সালাম দিয়াছে। ফলে তাঁহারা তাহার উপর ঝাঁপাইয়া পড়িলেন এবং তাহাকে হত্যা করিলেন। তাঁহারা তাহার বকরীর পাল লইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট উপনীত হইলেন। এই প্রসংগে উক্ত আয়াত অবতীর্ণ হয় (ফাতুহল কাদীর, ১খ., পৃ. ৫০২; তাফসীর তাবারী, ৪খ., পৃ. ১৩৯-১৪৩)।
ইমাম কুরতুবী (র) মন্তব্য করিয়াছেন, সম্ভবত উপরিউক্ত ভিন্ন ভিন্ন ঘটনাসমূহ মোটামুটি কাছাকাছি সময়ে সংঘটিত হইয়াছিল। ফলে উক্ত সকল ঘটনা সম্পর্কেই উক্ত আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এই মতানুযায়ী শানে নুযূলগুলির মধ্যে বৈপরীত্য থাকে না (তাফসীর কুরতুবী, ৫খ., পৃ. ৩৩৭; তাফসীর কারীর, ১১খ., পৃ. ৩০)।
মাগাযী সম্পর্কিত হাদীছসমূহের বর্ণনা প্রসংগে ইমাম বুখারী (র) সুস্পষ্ট ইংগিত দিয়াছেন যে, এই সারিয়‍্যা বা যুদ্ধাভিযানের সেনাধ্যক্ষ ছিলেন হযরত উসামা ইবন যায়দ (রা)। তিনি তাঁহার মতের স্বপক্ষে একাধিক হাদীছও উল্লেখ করিয়াছেন। তিনি এই যুদ্ধাভিযানের শিরোনাম দিয়াছেন:
باب بعث النبي اسامة بن زيد الى الحرقات من جهينة.
"জুহায়নার আল-হুরকা গোত্রের বিরুদ্ধে হযরত উসামা ইন্ন যায়দ (রা) কে প্রেরণের অনুচ্ছেদ” (সহীহ বুখারী, কিতাবুল মাগাযী, ২খ., পৃ. ৬১২)।
ইমাম বুখারী (র) কর্তৃক উক্তরূপ শিরোনামে অনুচ্ছেদ রচনার প্রেক্ষিতে শায়খ আদ্‌-দাউদীসহ কেহ কেহ প্রশ্ন তুলিয়াছেন, অপ্রাপ্তবয়স্ক হযরত উসামা (রা) সেনাধ্যক্ষ নিযুক্ত হইলেন কিভাবে? ইহার উত্তর দুইভাবে প্রদান করা হয়। প্রথমত, হযরত উসামা (রা) যে সেনাধ্যক্ষ ছিলেন ইহার আভাষ আছে মাত্র এইখানে, ইহার দ্ব্যর্থহীন উল্লেখ এইখানে নাই। হইতে পারে হযরত উসামা (রা) ঘটনার মূল নায়ক ছিলেন বলিয়া সরাসরি তাঁহার নামেই ইমাম বুখারী (র) অনুচ্ছেদ রচনা করিয়াছেন (সহীহ বুখারী, ২খ., পৃ. ৬১২; টীকা নং ৪; ফাতহুল-বারী, ১২খ., পৃ. ১৬৩-১৬৪; উমদাতুল কারী ১৭খ., পৃ. ২৭২)। দ্বিতীয়ত, হযরত উসামা ইন্ন যায়দ (রা) তখন অপ্রাপ্তবয়স্ক ছিলেন না, তিনি ছিলেন পূর্ণবয়স্ক। রাসূলুল্লাহ (স)-এর ইনতিকালের সময় তাহার বয়স ছিল কমপক্ষে ১৮, মতান্তরে ১৯ বা ২০ বৎসর। এই যুদ্ধাভিযান ৮ম হিজরীতে সংঘটিত হইয়া থাকিলে তখন হযরত উসামা (রা)-এর বয়স ছিল অন্যূন ১৫, ১৬ কিংবা ১৭ বৎসর। সুতরাং উক্ত বয়সের একজন যুবকের জন্য রাসূলুল্লাহ (স) কর্তৃক সেনাধ্যক্ষ পদে নিযুক্তি লাভ করা অস্বাভাবিক নয়। তিনি একান্তভাবে রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রিয়পাত্র ছিলেন (আল-ইসতী'আব, ১খ., পৃ. ৭৫-৭৮; উসদুল গাবা, ১খ., পৃ. ৬৪-৬৬; ৬৪-৬৬; আল-ইসাবা, ১খ, পৃ. ৩১; সহীহ বুখারী, ২খ, পৃ. ৬১২, টীকা নং ৪; ফাতহুল-বারী, ১২খ., পৃ. ১৬৩-১৬৪):
ইমাম বুখারী (র)-এর অনুসরণে ইমাম আল-হাকেম (র) তাঁহার আল-ইকলীল গ্রন্থে উসামা (রা)-কে সেনাধ্যক্ষ উল্লেখপূর্বক আল-হুরাকাতে তাঁহার নেতৃত্বাধীন যুদ্ধাভিযান প্রসংগ স্বতন্ত্রভাবে উল্লেখ করিয়াছেন (শারহ আল-মাওয়াহিব, ২খ., পৃ. ২৫১)। হাফিজ ইব্‌ন কায়্যিম (র)-সহ আরও কিছু সংখ্যক সীরাতকার উপরিউক্ত ধারার অনুসরণ করিয়াছেন (যাদুল মা'আদ, ২খ., পৃ. ১৪৮; আসাহ্হুস সিয়ার, পৃ. ২১৭, ২১৮)।
হযরত উসামা (রা) সেনাধ্যক্ষ নিযুক্ত হইয়া থাকিলে এই যুদ্ধাভিযান অবশ্যই ৮ম হিজরীর জুমাদাল-উলা/৬২৯ খৃস্টাব্দের সেপ্টেম্বরে মৃতা অভিযানের পরে সংঘটিত হইয়াছিল। কারণ মৃতা অভিযানে শাহাদাত বরণকারী তাহার পিতা ও সেনাধ্যক্ষ হযরত যায়দ ইব্‌ন হারিছা (রা) জীবিত থাকিতে তিনি যে সেনাধ্যক্ষ নিযুক্ত হন নাই তাহা এক ঐতিহাসিক সত্য। এই কারণে ইমাম বুখারী (র) সময়ের ধারাবাহিকতায় মৃত। অভিযানের পরেই হযরত উসামা (রা)-এর অভিযানের অবস্থান নির্ধারণ করিয়াছেন (সহীহ বুখারী, ২খ., পৃ. ২, সূচীপত্র এবং পৃ. ৬১১ ও ৬১২ এবং ৪ নং টীকা, এবং পৃ. ৬৪১, ৬৪২; আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৪৩৫-৪৪০)।
আর যদি উসামা (রা) একজন সাধারণ সৈন্য হিসাবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিয়া থাকেন তাহা হইলে এই যুদ্ধাভিযান মৃতা যুদ্ধের পূর্বে সংঘটিত হইয়াছিল। ইহাতে কোন সমস্যাই থাকে না এবং এই ক্ষেত্রে সেনাধ্যক্ষ ছিলেন হযরত গালিব ইব্‌ন আব্দিল্লাহ। সীরাতকারদিগের অভিমত ইহাই (সহীহ বুখারী, ২খ., পৃ. ৬১২, ৪ নং টাকা; ফাতহুল বারী, ৭খ., পৃ. ৫১৮)।
মুসলিম বাহিনী এই যুদ্ধে বহু সংখ্যক উট ও বকরী গনীমত হিসাবে লাভ করে, অনেক কাফির মুশরিককে হত্যা করে, অন্য অনেককে বন্দী করিয়া মদীনা লাইয়া আসে। এক একজন মুজাহিদ ১০টি করিযা উট কিংবা প্রতিটি উটের পরিবর্তে ১০টি করিয়া বকরী গনীমত পাইয়াছিলেন (যাদুল মা'আদ, ২খ., পৃ. ১৪৮; সীরাত হালাবী, ৩খ., পৃ. ১৮৯)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সারিয়‍্যা শুজা' ইব্‌ন ওয়াহ্ আল-আসাদী (রা)

📄 সারিয়‍্যা শুজা' ইব্‌ন ওয়াহ্ আল-আসাদী (রা)


অষ্টম হিজরীর রবীউল আওয়াল মাসে রাসূলুল্লাহ্ (স) সংবাদ পাইলেন যে, বানু হাওয়াযিন গোত্রের শাখা বানু 'আমেরের লোকজন মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করিতেছে। মদীনা হইতে পাঁচ মনযিল দূরে বানু 'আমেরের লোকজন মক্কা এবং বসরার সড়কে নজদের সিয়্যি নামক স্থানে বসবাস করিত। সেখানে সিয়্যি নামের একটি কূপ তাহাদের দখলে ছিল। রাসূলুল্লাহ (স) হযরত শুজা' (রা)-কে বানু 'আমেরের উৎখাতের জন্য প্রেরণ করিলেন। তাঁহার সহিত ছিলেন চব্বিশজন মুজাহিদ। হযরত শুজা' (রা) এবং তাঁহার সঙ্গীরা মদীনা হইতে সিয়্যি পর্যন্ত অত্যন্ত গোপনে পথ অতিক্রম করিলেন। তাঁহারা দিনের বেলা পাহাড়, বালির টিলা অথবা বৃক্ষের আড়ালে লুকাইয়া থাকিতেন এবং রাত্রিবেলা পথ চলিতেন। এইভাবে তাঁহারা বানু আমেরের নিকটবর্তী হইলেন। বানু আমেরের জনগণ হঠাৎ একদিন তাহাদের মাথার উপর মুসলমানদের দেখিতে পাইল। মুসলমানদের এমন আকস্মিক আক্রমণে তাহারা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া সবকিছু ছাড়িয়া পালাইয়া গেল। গনীমত হিসাবে মুসলমানরা অন্যান্য সামগ্রী ছাড়াও অনেক উট এবং ভেড়া-বকরী পাইল। এই সকল সামগ্রী ও উট-বকরীসহ মুসলমানগণ মদীনায় ফিরিয়া আসিলেন। এই সারিয়‍্যা ১৫টি রাত্র পর্যন্ত স্থায়ী হইয়াছিল।
ইবন সা'দ বর্ণনা করেন, গনীমতের মাল বণ্টন করা হইল। প্রত্যেক মুজাহিদ ১৫টি করিয়া উট পাইলেন। কোন কোন সাহাবী উটের পরিবর্তে ভেড়া-বকরী নিলেন। বিনিময় হার একটি উটের পরিবর্তে বিশটি ভেড়া এবং বকরী ধার্য করা হইয়াছিল (আল-মাগাযী; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ., পৃ. ৭৫৩, ৫৪; ৪খ., পৃ. ২৪০)।
ইবন উমার (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (স) নাজদের দিকে একটি সেনাদল প্রেরণ করেন। তাহাদের মধ্যে ইবন উমার (রা)-ও ছিলেন। যুদ্ধলব্ধ সম্পদের বণ্টনে তাহাদের ভাগে পড়িয়াছিল বারটি উট। ইহা ছাড়াও অতিরিক্ত একটি করিয়া উট দেওয়া হইয়াছিল। রাসূলুল্লাহ (স) তাহা পরিবর্তন করেন নাই (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ২৭৪; সহীহ মুসলিম, ২খ., কিতাবুল জিহাদ, পৃ. ৮৬; বুখারী, কিতাবুল মাগাযী, ২খ., পৃ. ৬২২)।
বানু 'আমেরের লোকজন পরবর্তী কালে মদীনায় আসিয়া ইসলাম গ্রহণ করিলে রাসূলুল্লাহ (স) সাহাবীগণের সহিত পরামর্শক্রমে তাহাদের নিকট হইতে গনীমতস্বরূপ প্রাপ্ত ধন-সম্পদ তাহাদিগকে ফেরত প্রদানের ব্যবস্থা করেন (বিদায়া, ৪খ.)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সারিয়‍্যা কা'ব ইবন উমায়র আল-গিফারী (রা)

📄 সারিয়‍্যা কা'ব ইবন উমায়র আল-গিফারী (রা)


হযরত কা'ব ইব্‌ন উমায়র আল-গিফারী (রা)-কে রাসূলুল্লাহ (স) অনেক সারিয়‍্যা অভিযানের নেতৃত্ব দিয়া পাঠাইয়াছিলেন। সিরিয়ার 'যাতুল-আতলাহ' অভিযান ইহার অন্তর্ভুক্ত। রবীউল আওয়াল ৮ম হিজরী / ৬২৯ খৃ. রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে পনেরজন সেনার একটি বাহিনীসহ সিরিয়ার যাতুল-আতলাহ নামক স্থানের অধিবাসী বানু কুদা'আর বিরুদ্ধে প্রেরণ করেন। ওয়াকিদী বর্ণনা করিয়াছেন, যাতুল-আল্লাহ ছিল সিরিয়ার এক প্রান্তে অবস্থিত। বানু কুদা'আর বসবাস ছিল সেখানে। তাহাদের নেতার নাম ছিল সাদুস )سدوس( )তাবারী, তারীখ, ৩খ., পৃ. ২৯; উসদুল গাবা, ৪খ., পৃ. ৪৮৫)।
এই প্রসঙ্গে ইন্ন ফুদায়ল বর্ণনা করিয়াছেন, "কা'ব (রা) দিনের বেলায় অবস্থান করিতেন এবং রাতের বেলায় ভ্রমণ করিতেন। এইভাবে ভ্রমণ করিতে করিতে অবশেষে তাহাদের অতি নিকটে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। কিন্তু তাহাদের এক গোয়েন্দা তাহাকে দেখিয়া ফেলে এবং তাহাদের সেনাবাহিনীর সংখ্যাল্পতার সংবাদ নিজ গোত্রের নিকট ব্যক্ত করে। তারপর তাহারা অস্ত্রে সজ্জিত হইয়া মুসলমানদের সাথে প্রচণ্ড যুদ্ধে লিপ্ত হয়” (মাগাযী, ২খ., পৃ. ৭৫৩)।
ইমাম যুহরীর উদ্ধৃতি দিয়া আল-ওয়াকিদী আরও বর্ণনা করিয়াছেন, তারপর তাহারা সেখানে উপস্থিত হইয়া তাহাদের সমবেত একটি দলকে দেখিতে পাইল। তাহারা প্রথমেই তাহাদিগকে ইসলাম গ্রহণ করিতে আহবান জানাইল। কিন্তু তাহারা দাওয়াতে কোনরূপ কর্ণপাত করে নাই এবং ইসলামও গ্রহণ করে নাই, বরং উল্টা মুসলমানদের প্রতি তীর নিক্ষেপ করিতে লাগিল। সাহাবা-ই কিরাম তাহাদিগকে আক্রমণ করিতে দেখিয়া তাঁহারাও তাহাদের সাথে প্রচণ্ড যুদ্ধে লিপ্ত হইলেন। কিন্তু তাঁহারা বানু কুদা'আর প্রচণ্ড আক্রমণের মুখে টিকিতে পারেন নাই। তাঁহাদের একজন ব্যতীত সকলেই শহীদ হইলেন। তবে একজন আহত অবস্থায় বাঁচিয়া যান। তারপর যখন রাত্রি নামিয়া আসে। তাঁহাকে বহন করিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আনা হয়। তারপর রাসূলুল্লাহ (স)-কে সমস্ত ঘটনা খুলিয়া বর্ণনা করা হইল। সংবাদ শুনিয়া তিনি অত্যন্ত মর্মাহত হইলেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ২৭৪; আল-মাগাযী, ২খ., পৃ. ৭৫২; আস্-সীরাতুল হালাবিয়্যা, ৩খ., পৃ. ১৯০; তারিখে তাবারী, ৩খ., পৃ. ২৯; রাহমাতুল-লিল আলামিন, ২খ., পৃ. ২৩২; আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৪৩১)।
ইবনুল আছীরের বর্ণনামতে, যিনি আহত অবস্থায় বাঁচিয়া যান তিনি হইলেন সেনাপতি কা'ব ইবন উমায়র আল-গিফারী (রা)। তবে কে তাঁহাকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট পৌছাইয়া দিয়াছিল তাহার পরিচয় জানা যায় নাই (মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়্যা, ১খ., পৃ. ৫৪৮৯)।
ফলাফল: এই সারিয়‍্যার ফলাফল ছিল অত্যন্ত মর্মান্তিক ও বেদনাদায়ক। মুসলিম সেনাবাহিনীর পনের জন সদস্যের মাঝে চৌদ্দজনই শাহাদাত বরণ করেন। জীবিত ছিলেন মাত্র একজন এবং তিনিও যুদ্ধে মারাত্মক আহত হইয়াছিলেন। তিনি ছিলেন সেনাপতি কা'ব ইব্‌ন উমায়র আল-গিফারী (রা)। مُغَلْطَائِ অনুরূপ বর্ণনা করিয়াছেন (তারীখ তাবারী, ২খ., পৃ. ২৯; মাদারিজুন-নুবুওয়্যাত, ২খ., পৃ. ২৪৬; রাসূল মুহাম্মদ (স)-এর সরকার কাঠামো, পৃ. ৩৫২; মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়্যা, ৩খ., পৃ. ২৬৭)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সারিয়‍্যা বানু মুররা

📄 সারিয়‍্যা বানু মুররা


রাসূলুল্লাহ (স) সপ্তম হিজরী সনের শা'বান মাসে হযরত বাশীর ইবন সা'দ আল-আনসারী (রা)-কে বান্ মুররা অভিমুখে প্রেরণ করেন। তাঁহার সহিত ত্রিশজন যোদ্ধা সাহাবীও প্রেরণ করেন। ফাদাক নামক স্থানে বানু মুররা বাস করিত। তাহাদের অবাধ্যআচরণ দমন করিতে এবং ইসলামের নির্দেশ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এই ক্ষুদ্র অভিযান প্রেরণ করা হইয়াছিল।
হযরত বাশীর ইবন সা'দ (রা) সঙ্গীদের লইয়া 'ফাদাক'-এর নিকটবর্তী হইলেন এবং এক রাখালকে বকরী চরাইতে দেখিলেন। তাহাকে লোকজন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিলেন এবং পরিস্থিতি আঁচ করিতে চাহিলেন। তাহাকে জানানো হইল যে, লোকেরা তাহাদের কৃষিকাজে ব্যস্ত। তাহারা দূরে চলিয়া গিয়াছে। তিনি উটগুলি এবং বকরী হাঁকাইতে লাগিলেন এবং মদীনা শরীফ অভিমুখে আনিতে চাহিলেন। তখন উচ্চস্বরে চিৎকার দিতে দিতে উক্ত রাখাল চলিয়া গেল এবং অধিবাসীদের সংবাদ দিল। ঐদিকে বাশীর (রা) সঙ্গীদের লইয়া সম্মুখে অগ্রসর হইতেছিলেন। পথিমধ্যে রাত হইয়া গেল। আর তখনি অতর্কিতে ফাদাকের অধিবাসীরা আসিয়া তাহাদেরকে আক্রমণ করিতে লাগিল। তখন বাশীর (রা)-এর পক্ষ হইতে সঙ্গীগণ তীর নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন। শেষ অবধি সাহাবীগণের তীর নিঃশেষ হইয়া গেল। তখন তাঁহারা ভোর হওয়ার অপেক্ষা করিতেছিলেন। আর অমনি স্থানীয় লোকজন আসিয়া তাঁহাদের উপর
চড়াও হইল এবং বাশীর (রা)-এর সঙ্গীদের মারাত্মকভাবে আহত করিতে লাগিল। হযরত বাশীর (রা) প্রাণপণে যুদ্ধ করিয়া মৃতপ্রায় হইয়া জ্ঞান হারাইয়া ফেলিলেন। তাঁহার উরুতেও ভীষণভাবে আঘাত লাগিল। এমনকি কেহ কেহ বলিল যে, তিনি মারা গিয়াছেন। ইহার পর স্থানীয় অবাধ্যাচরণকারীরা তাহাদের উট-বকরীগুলি লইয়া গেল। এই সংবাদ গাল্লা ইব্‌ন যায়দ (রা) সর্বাগ্রে রাসূলুল্লাহ (সা) কে জানান এবং তারপর বাশীর ইবন সা'দ (রা) মদীনা শরীফে প্রত্যাবর্তন করেন (আত্-তাবাকাতুল কুবরা, ২খ., পৃ. ১১৮)।
এই প্রসঙ্গে আরও বর্ণিত হইয়াছে, বানু মুররা-এর উদ্ধত আচরণ দমনে রাসূলুল্লাহ (স) বাশীর ইবন সা'দ আল-আনসারী (রা)-কে প্রেরণ করিয়াছিলেন। তিনি তাঁহার পছন্দানুযায়ী ত্রিশজন যোদ্ধাকে সঙ্গে লইয়াছিলেন। তাঁহারা বিজয়ী হওয়ার প্রচণ্ড অভিলাষে যথাসম্ভব দ্রুত সেখানে পৌঁছান। সেখানে তাহারা স্থানীয়দিগকে বিক্ষিপ্তভাবে কাজে নিয়োজিত দেখেন। তখন তাহাদের উট ও বকরীগুলি কাছে পাইয়া দ্রুত সেইগুলি হাঁকাইয়া প্রত্যাবর্তন করিতে লাগিলেন। কিন্তু নেতৃস্থানীয় কিছু লোক তাঁহাদের আগলাইয়া দাঁড়াইল। বাশীর (রা)-এর সঙ্গীগণ অনবরত তীর বর্ষণ করিয়া তাহাদিগকে তাড়াইয়া দিলেন। তবে তাহাদের আক্রমণে বাশীর (রা) মারাত্মকভাবে আহত হন। তিনি পথভ্রষ্ট বানু মুররা-এর তীরের আঘাতে আক্রান্ত হইয়াছিলেন। শেষ পর্যন্ত মুসলিম দল বিজয়ী বেশে গনীমতসহ প্রত্যাবর্তন করে। (আল-মুক্তাফা মিন সীরাতিল মুসতাফা, ১খ., পৃ. ১৮৫)।
আবার আল-বিদায়া ওয়ান-নিয়াহা গ্রন্থকারের উপস্থাপন অনুযায়ী ইমাম বায়হাকী (র) আল-ওয়াকিদী (র)-এর নিকট হইতে ধারাবাহিক বর্ণনাসূত্রে উল্লেখ করিয়াছেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) বাশীর ইবন সা'দ (রা)-কে ত্রিশজন অশ্বারোহী সাহাবী (রা)-সহ ফাদাক অভিমুখে প্রেরণ করেন। সেখানে তাঁহারা (বানু মুররা-এর) উট লইয়া আসিতে চাহিলে তাহারা বাধা দেয় এবং তাঁহার সঙ্গীদিগকে হত্যা করিতে থাকে। তিনি সেদিন মহাপরীক্ষায় উপনীত হন এবং পরম ধৈর্য ধারণ করেন। সেখানে তিনি সঙ্গীদিগকে লইয়া যথাসম্ভব যুদ্ধ জয়ের আশায় শত্রুদিগের সামনে টিকিয়া থাকিতে প্রয়াস চালান। কিন্তু শেষ অবধি শত্রুপক্ষ তাহাকে পাইয়া মৃত মনে করিয়া আহতাবস্থায় রাখিয়া চলিয়া যায়। তিনি সর্বশেষে ফাদাকের এক ইয়াহূদীর নিকট রাত্রিযাপন করেন। তাহার পর আহতাবস্থায় মদীনায় ফিরিয়া আসেন।
আল-ওয়াকিদী আরও বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) ইহার পর গালিব ইব্‌ন আবদিল্লাহ (রা)-কে একদল সাহাবী (রা) সহ বানু মুররা-এর দিকে প্রেরণ করেন। গালিব ইবন আবদিল্লাহ (রা)-এর নেতৃত্বে কয়েকজন প্রবীণ সাহাবী (রা) এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তন্মধ্যে উসামা ইব্‌ন যায়দ, আবূ মাস'উদ আল-বাদরী ও কা'ব ইব্‌ন উজরা (রা) উল্লেখযোগ্য। এই যুদ্ধে উসামা ইব্‌ন যায়দ (রা) মিদ্রাস ইব্‌ নুহায়ক নামক বানু মুরা-এর এক ব্যক্তিকে হত্যা করেন। এই প্রসঙ্গে ইউনুস ইব্‌ন বুকায়র (র) ইবন ইসহাক (র) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন, তিনি বানু সালমা-এর বয়স্ক এক ব্যক্তি হইতে, তিনি স্বীয় সম্প্রদায়ের কয়েক ব্যক্তি হইতে উল্লেখ করিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স) গালিব ইব্‌ন আবদিল্লাহ আল-কালবী (রা)-কে বানু মুরা-এর দিকে প্রেরণ করেন। সেখানে মিরদাস ইন্ন নুহায়ক আক্রমণের শিকার হন। এই ব্যক্তি ছিল বানু মুররা-এর সাথে চুক্তিবদ্ধ। তাহাকে উসামা ইব্‌ন যায়দ (রা) হত্যা করেন।
ইবন ইসহাক ধারাবাহিক বর্ণনাসূত্রে উসামা ইব্‌ন যায়দ (রা) বর্ণনা হইতে করেন, তিনি বলেন, আমি সেখানে মিরdas ইবন নুহায়ক নামক ব্যক্তিকে প্রতিপক্ষের সহিত দেখিতে পাইয়া আক্রমণ করি। তাহার উপর আমরা তরবারি চালাইতে উদ্যত হইলে সে বলিতে লাগিল:
اشهد ان لا اله الا الله.
আমরা তাহার নিকট হইতে তরবারি ফিরাইয়া আনিলাম না, এমনকি তাহাকে হত্যা করা হইল। তাহার পর যুদ্ধশেষে রাসূলুল্লাহ (স)-কে যখন আমরা এই ব্যাপারে বলিলাম তখন তিনি আমাকে বলিলেন, হে উসামা! لا اله الا الله -এর ব্যাপারে তোমার কার্যকলাপ কেমন হইয়া গেল? আমি বলিলাম, হে আল্লাহ্র রাসূল! সেই ব্যক্তি নিহত হওয়া হইতে রক্ষা পাওয়ার জন্য لا اله الا الله বলিয়াছে। রাসূলল্লাহ (স) বারবার শুধু বলিতে লাগিলেন, হে উমাসা! لا اله الا الله -এর ব্যাপারে তোমার কার্যকলাপ কেমন হইয়া গেল? আল্লাহ্র শপথ! যিনি তাঁহাকে সত্যের সাথে প্রেরণ করিয়াছেন, আমি বলিতে লাগিলাম, আমার ইসলাম গ্রহণের পর হইতে কখনও এমনটি হয় নাই। আমি তাহার পর আরও বলিলাম, আমি আল্লাহ্ নামে ওয়াদা করিতেছি, আর কখনও এমন লোককে আমি হত্যা করিব না যে বলে, لا اله الا الله ; নবী করীম (স) বলিলেন, (এই ওয়াদা) আমার পরও (পালন করিবে তো), হে উসামা! আমি বলিলাম, আপনার পরও।
এই প্রসঙ্গে ইমাম আহমাদ (র) ধারাবাহিক সূত্রে বর্ণনা করিয়াছেন, হযরত উসামা ইব্‌ন যায়দ (রা) বলিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স) একবার আমাদের কয়েকজনকে 'হুরুকাতে' প্রেরণ করলেন। আমরা সেখানে প্রভাত করিলাম। সেখানে এক ব্যক্তির আচরণ এমন ছিল, যখন আমরা লোকজনের উপর আক্রমণ করিতে উদ্যত হইতাম তখন সে আমাদের বিরুদ্ধে তাহাদের পক্ষে কঠোর অবস্থান নিত। আর যখন তাহারা পালাইতে চাহিত, সেই ব্যক্তি তাহাদের আশ্রয় দিত। আমি এবং আনসারী এক সাহাবী সেই ব্যক্তিকে আক্রমণ করিলাম। সে আমাদের কবলে পড়িয়া বলিল, لا اله الا الله; ইহাতে আনসারী সাহাবী পরবর্তী আক্রমণ হইতে বিরত থাকিলেন, কিন্তু আমি লোকটাকে হত্যা করিলাম। ইহার পর এই সংবাদ রাসূলল্লাহ (স)-এর নিকট পৌঁছিলে তিনি আমাকে বলিলেন, হে উসামা! লোকটি لا اله الا الله বলার পরও তুমি তাহাকে হত্যা করিলে? আমি বলিলাম, হে আল্লাহর রাসূল! সে তো হত্যা হইতে বাঁচিবার জন্য لا اله الا الله পড়িয়াছে। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) উক্ত বাণীটি বারবার বলিতে লাগিলেন। আমি মনে করিলাম, আমি পূর্বে মুসলমান না হইয়া আজই যদি মুসলমান হইতাম (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ২২১)!

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00