📄 সারিয়্যা মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা)
রাসূলুল্লাহ (স) ষষ্ঠ হিজরী সনের ১০ মুহাররম হযরত মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা আনসারী আল্হালী (রা)-এর অধীনে ত্রিশজন অশ্বারোহীর একটি সৈন্যদল 'কুরতা' নামক স্থানে প্রেরণ করেন (কুরতা বনূ বাক্স গোত্রের একটি শাখা। বসরা হইতে মক্কা গমনের পথে অবস্থিত দারিবা (ضرية) অঞ্চলে ছিল তাহাদের বসতি। মদীনা হইতে এই স্থানটির দূরত্ব ছিল ৭ (সাত) দিনের (যুরকানী, শারহুল মাওয়াহিব, ২খ., পৃ. ১৪৩)। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদিগকে রাত্রিতে ভ্রমণ এবং দিবসে আত্মগোপন করিয়া থাকার নির্দেশ দিলেন। নির্দেশমত মুসলিম সৈন্যদলটি সেই অঞ্চলে পৌঁছিয়া কুরতার লোকদিগের উপর আক্রমণ চালাইল (ইবন সা'দ, তাবাকাত, উর্দু, ১খ., পৃ. ৩৮৭)। ঐতিহাসিক ওয়াকিদীর মতে এই অভিযানে কাফির পক্ষের মোট দশজন লোক নিহত হইল এবং অবশিষ্টগণ পালাইয়া গেল। এই যুদ্ধে দেড় শত (১৫০টি) উষ্ট্র এবং তিন সহস্র বকরী যুদ্ধলব্ধ মাল হিসাবে মুসলমানগুণের হস্তগত হইল। অভিযান সমাপ্তির পর যুদ্ধলব্ধ সমুদয় মাল লইয়া মুসলিম মুজাহিদগণ মদীনায় রওয়ানা হইলেন। দীর্ঘ ঊনিশ দিনের পথ পরিক্রমার পর উনত্রিশ মুহাররম তাহারা মদীনায় প্রত্যাগমন করেন। তখন রাসূলুল্লাহ (স) যুদ্ধলব্ধ সমুদয় মালের এক-পঞ্চমাংশ বায়তুল মালের জন্য রাখিয়া অবশিষ্ট মাল মুজাহিদগণের মাঝে বণ্টন করিয়া দেন। তিনি একটি উষ্ট্রকে দশটি বকরীর সমতুল্য গণ্য করিয়াছিলেন (ইদরীস কান্ধলবী, সীরাতুল মুস্তাফা, ২খ., পৃ. ৩৩৭)। ফিরার পথে হযরত ইবন মাসলামা ইয়ামামার বনূ হানীফা গোত্রের ছুমামা ইব্ন উছাল নামীয় এক ব্যক্তিকে পথিমধ্যে গ্রেফতার করিয়া মদীনায় লইয়া আসেন। রাসূলের সংশ্রবে আসিয়া ছুমামা ইব্ন উছাল মাত্র তিন দিনে তাঁহার একনিষ্ঠ অনুচরে পরিণত হইয়াছিলেন (যুরকানী, শারহুল মাওয়াহিব, ২য় খণ্ড, পৃ. ১৪৪)।
রাসূলুল্লাহ (স) ষষ্ঠ হিজরী সনের ১০ মুহাররম হযরত মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা আনসারী আল্হালী (রা)-এর অধীনে ত্রিশজন অশ্বারোহীর একটি সৈন্যদল 'কুরতা' নামক স্থানে প্রেরণ করেন (কুরতা বনূ বাক্স গোত্রের একটি শাখা। বসরা হইতে মক্কা গমনের পথে অবস্থিত দারিবা (ضرية) অঞ্চলে ছিল তাহাদের বসতি। মদীনা হইতে এই স্থানটির দূরত্ব ছিল ৭ (সাত) দিনের (যুরকানী, শারহুল মাওয়াহিব, ২খ., পৃ. ১৪৩)। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদিগকে রাত্রিতে ভ্রমণ এবং দিবসে আত্মগোপন করিয়া থাকার নির্দেশ দিলেন। নির্দেশমত মুসলিম সৈন্যদলটি সেই অঞ্চলে পৌঁছিয়া কুরতার লোকদিগের উপর আক্রমণ চালাইল (ইবন সা'দ, তাবাকাত, উর্দু, ১খ., পৃ. ৩৮৭)। ঐতিহাসিক ওয়াকিদীর মতে এই অভিযানে কাফির পক্ষের মোট দশজন লোক নিহত হইল এবং অবশিষ্টগণ পালাইয়া গেল। এই যুদ্ধে দেড় শত (১৫০টি) উষ্ট্র এবং তিন সহস্র বকরী যুদ্ধলব্ধ মাল হিসাবে মুসলমানগুণের হস্তগত হইল। অভিযান সমাপ্তির পর যুদ্ধলব্ধ সমুদয় মাল লইয়া মুসলিম মুজাহিদগণ মদীনায় রওয়ানা হইলেন। দীর্ঘ ঊনিশ দিনের পথ পরিক্রমার পর উনত্রিশ মুহাররম তাহারা মদীনায় প্রত্যাগমন করেন। তখন রাসূলুল্লাহ (স) যুদ্ধলব্ধ সমুদয় মালের এক-পঞ্চমাংশ বায়তুল মালের জন্য রাখিয়া অবশিষ্ট মাল মুজাহিদগণের মাঝে বণ্টন করিয়া দেন। তিনি একটি উষ্ট্রকে দশটি বকরীর সমতুল্য গণ্য করিয়াছিলেন (ইদরীস কান্ধলবী, সীরাতুল মুস্তাফা, ২খ., পৃ. ৩৩৭)। ফিরার পথে হযরত ইবন মাসলামা ইয়ামামার বনূ হানীফা গোত্রের ছুমামা ইব্ন উছাল নামীয় এক ব্যক্তিকে পথিমধ্যে গ্রেফতার করিয়া মদীনায় লইয়া আসেন। রাসূলের সংশ্রবে আসিয়া ছুমামা ইব্ন উছাল মাত্র তিন দিনে তাঁহার একনিষ্ঠ অনুচরে পরিণত হইয়াছিলেন (যুরকানী, শারহুল মাওয়াহিব, ২য় খণ্ড, পৃ. ১৪৪)।
📄 সারিয়্যা যুল-কাসসা
ষষ্ঠ হিজরী সনের রবী'উল আওওয়াল মাসে রাসূলুল্লাহ (স) হযরত মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা)-কে দশজন মুসলিম মুজাহিদের একটি ক্ষুদ্র দলের সেনাপতি করিয়া যুল-কাস্সা নামক স্থানে প্রেরণ করেন। উদ্দেশ্য সেই অঞ্চলের অধিবাসী বনূ ছা'লাবা ও বনু 'উওয়াল (بنو عوال)-কে শায়েস্তা করা। উল্লেখ্য যে, যুল-কাস্সা (ذوا القصه) ছিল মদীনা হইতে ২০ (বিশ) মাইল দূরত্বে অবস্থিত একটি স্থানের নাম (যুরকানী, শারহুল মাওয়াহিব, ২খ., পৃ. ১৫৪)।
মুসলিম মুজাহিদগণ যখন তথায় পৌঁছেন, তখন সেই এলাকা ছিল জনশূন্য। ততক্ষণে তাহারা (অর্থাৎ কাফিরগণ) আগাম মুসলমানগণের অভিযানের বিষয়ে জানিতে পারিয়া আত্মগোপন করিয়া রহিল। শত্রু পক্ষের কোন লোকজন না দেখিয়া রাত্রিবেলা বিশ্রামের জন্য যখন মুসলমানগণ শয়ন করিলেন, ঠিক তখনই কাফিরগণ তাহাদের উপর অতর্কিত হামলা চালাইল। তাহারা হযরত মুহাম্মদ ইবন মাসলামার সঙ্গীগণের সকলকেই শহীদ করিল এবং তাহাদিগকে উলঙ্গ করিয়া তাহাদের পরিধেয় বস্ত্রাদিসহ সমুদয় মালামাল লুট করিয়া লইয়া গেল। পায়ের গিরায় গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত হইয়া ইবন মাসলামা সংজ্ঞাহীন অবস্থায় পড়িয়া রহিলেন। কাফিরগণ তাহাকে মৃত ভাবিয়া সেই অবস্থায়ই ফেলিয়া চলিয়া গেল। এক মুসলিম পথিক মুসলিম মুজাহিদগণের এই নির্মম পরিণতি দেখিয়া চিৎকার করিয়া ইন্নালিল্লাহ্ বলিয়া উঠিলেন। আওয়াজ শুনিয়া হযরত মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা) নড়িয়া উঠিলেন। কিন্তু পায়ের গিরার আঘাতের কারণে তিনি উঠিয়া দাঁড়াইতে পারিলেন না। পথিক তখন তাঁহাকে আপন পৃষ্ঠে উঠাইয়া লইলেন এবং তাঁহাকে লইয়া মদীনায় আসিলেন (আসাহ্হুস্ সিয়ার, পৃ. ১৫৯)।
যুরকানীর বর্ণনা অনুসারে এই যুদ্ধে কাফির পক্ষের এক শত সশস্ত্র ব্যক্তি প্রথমে মুসলমানগণের ঘুমন্ত এই ক্ষুদ্র দলটিকে ঘিরিয়া ফেলে এবং তাঁহাদের প্রতি তীর নিক্ষেপ করিতে থাকে। অতঃপর মুসলমানগণ জাগ্রত হইয়া পাল্টা আক্রমণ করেন। অতঃপর বর্শা-বল্লম লইয়া বেদুঈন কাফিরগণ মুসলমানদিগের উপর আক্রমণ করিল। ইহাতে মুসলমানগণের মধ্য হইতে তিনজন শহীদ হইলেন। তখন মুসলমানগণ ইবন মাসলামার নিকট জড় হইলেন এবং একযোগে কাফিরগণের উপর আক্রমণ চালাইলেন। ইহাতে কাফির পক্ষের এক ব্যক্তি নিহত হইল। অতঃপর কাফিরগণ পাল্টা আক্রমণ করিয়া ইবন মাসলামা ব্যতীত বাকী সকলকেই শহীদ করিল (শারহুল মাওয়াহিব, ২খ., পৃ. ১৫৪)।
ষষ্ঠ হিজরী সনের রবী'উল আওওয়াল মাসে রাসূলুল্লাহ (স) হযরত মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা)-কে দশজন মুসলিম মুজাহিদের একটি ক্ষুদ্র দলের সেনাপতি করিয়া যুল-কাস্সা নামক স্থানে প্রেরণ করেন। উদ্দেশ্য সেই অঞ্চলের অধিবাসী বনূ ছা'লাবা ও বনু 'উওয়াল (بنو عوال)-কে শায়েস্তা করা। উল্লেখ্য যে, যুল-কাস্সা (ذوا القصه) ছিল মদীনা হইতে ২০ (বিশ) মাইল দূরত্বে অবস্থিত একটি স্থানের নাম (যুরকানী, শারহুল মাওয়াহিব, ২খ., পৃ. ১৫৪)।
মুসলিম মুজাহিদগণ যখন তথায় পৌঁছেন, তখন সেই এলাকা ছিল জনশূন্য। ততক্ষণে তাহারা (অর্থাৎ কাফিরগণ) আগাম মুসলমানগণের অভিযানের বিষয়ে জানিতে পারিয়া আত্মগোপন করিয়া রহিল। শত্রু পক্ষের কোন লোকজন না দেখিয়া রাত্রিবেলা বিশ্রামের জন্য যখন মুসলমানগণ শয়ন করিলেন, ঠিক তখনই কাফিরগণ তাহাদের উপর অতর্কিত হামলা চালাইল। তাহারা হযরত মুহাম্মদ ইবন মাসলামার সঙ্গীগণের সকলকেই শহীদ করিল এবং তাহাদিগকে উলঙ্গ করিয়া তাহাদের পরিধেয় বস্ত্রাদিসহ সমুদয় মালামাল লুট করিয়া লইয়া গেল। পায়ের গিরায় গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত হইয়া ইবন মাসলামা সংজ্ঞাহীন অবস্থায় পড়িয়া রহিলেন। কাফিরগণ তাহাকে মৃত ভাবিয়া সেই অবস্থায়ই ফেলিয়া চলিয়া গেল। এক মুসলিম পথিক মুসলিম মুজাহিদগণের এই নির্মম পরিণতি দেখিয়া চিৎকার করিয়া ইন্নালিল্লাহ্ বলিয়া উঠিলেন। আওয়াজ শুনিয়া হযরত মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা) নড়িয়া উঠিলেন। কিন্তু পায়ের গিরার আঘাতের কারণে তিনি উঠিয়া দাঁড়াইতে পারিলেন না। পথিক তখন তাঁহাকে আপন পৃষ্ঠে উঠাইয়া লইলেন এবং তাঁহাকে লইয়া মদীনায় আসিলেন (আসাহ্হুস্ সিয়ার, পৃ. ১৫৯)।
যুরকানীর বর্ণনা অনুসারে এই যুদ্ধে কাফির পক্ষের এক শত সশস্ত্র ব্যক্তি প্রথমে মুসলমানগণের ঘুমন্ত এই ক্ষুদ্র দলটিকে ঘিরিয়া ফেলে এবং তাঁহাদের প্রতি তীর নিক্ষেপ করিতে থাকে। অতঃপর মুসলমানগণ জাগ্রত হইয়া পাল্টা আক্রমণ করেন। অতঃপর বর্শা-বল্লম লইয়া বেদুঈন কাফিরগণ মুসলমানদিগের উপর আক্রমণ করিল। ইহাতে মুসলমানগণের মধ্য হইতে তিনজন শহীদ হইলেন। তখন মুসলমানগণ ইবন মাসলামার নিকট জড় হইলেন এবং একযোগে কাফিরগণের উপর আক্রমণ চালাইলেন। ইহাতে কাফির পক্ষের এক ব্যক্তি নিহত হইল। অতঃপর কাফিরগণ পাল্টা আক্রমণ করিয়া ইবন মাসলামা ব্যতীত বাকী সকলকেই শহীদ করিল (শারহুল মাওয়াহিব, ২খ., পৃ. ১৫৪)।
📄 সারিয়্যা কাদীদ
রাসূলুল্লাহ (স) সংবাদ পাইলেন যে, বানু লায়ছের একটি শাখা বানুল মুলাওওয়াহ, যাহারা আল-কাদীদ নামক স্থানে বাস করিত, ইসলাম বিরোধী চক্রান্তে লিপ্ত আছে। তাই তিনি ৮ম হিজরীর সফর (৬২৯ খৃ. -এর জুন মাসে) হযরত গালিব ইব্ন আব্দুল্লাহ আল-লায়ছী (রা)-এর নেতৃত্বে দশ, 'বার বা তদুর্ধ সংখ্যক সাহাবীর একটি ক্ষুদ্র বাহিনী 'আল-কাদীদ' নামক স্থানের বানু আল-মুলাওওয়াহ-এর উদ্দেশ্যে প্রেরণ করিলেন (তারীখ তাবারী, ৩খ., পৃ. ১০২; উয়নুল আছার, পৃ. ১৫০-৫১; আল-মাওয়াহিব, ১খ., পৃ. ১৪৪; তাবাকাত ইবন সা'দ, ২খ., পৃ. ১২৪)। কোন কোন সীরাত বিশারদের মতে, ইহার সময়কাল ৭ম হিজরীর সফর কিংবা রাবীউল আওয়াল (আর-রাহীকুল মাথূম, পৃ. ৪২৯)। হাফিজ আবু 'আমর বলিয়াছেন, উল্লিখিত অভিযান ৫ম হিজরীতে সংঘটিত হইয়াছিল (আল-ইসাবা, ৩খ., পৃ. ১৮৪; আল-ইসতী'আব, ৩খ., পৃ. ১২৫২)।
হাফিজ ইব্ন কাছীর (র) আল-ওয়াকিদী (র) সূত্রে বর্ণনা করিয়াছেন যে, এই অভিযানে সাহাবীগণের সৈন্যসংখ্যা ছিল ১৩০ জন (কিতাবুল-মাগাযী, ২খ., পৃ. ৭২৬; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ২৫৩)। সীরাতকার আশ্-শামী এই বর্ণনা প্রত্যাখ্যান করিয়া বলিয়াছেন, ১৩০ জন সৈন্য ছিল হযরত গালিব (রা)-এর আল-মায়ফা'আ অভিযানে। তাঁহার আল-কাদীদ অভিযানে সৈন্যসংখ্যা উপরিউক্ত দশোৰ্দ্ধই ছিল (শারহু মাওয়াহিব, ১খ., পৃ. ২৬৪; সীরাত হালাবী, ৩খ., পৃ. ১৮৮)। কোন কোন সূত্রে জানা যায়, তাঁহারা ছিলেন ৬০ জন অশ্বারোহী সৈন্য (উসদুল গাবা, ৪খ., পৃ. ১৬৮)।
উপরিউক্ত হযরত গালিব ইবন 'আব্দুল্লাহ (রা)-এর নাম উল্টাভাবে 'আবদুল্লাহ ইব্ন গালিব' (রা) উল্লিখিত হইয়াছে একটি হাদীছ গ্রন্থে (সুনান আবূ দাউদ, ভারতীয় সং ২খ., পৃ. ১৫, ৩খ., (লেবানন), পৃ. ১২৮]। এই সমস্যার সমাধানে বিজ্ঞ উলামা-ই কিরাম বলিয়াছেন, ক্ষেত্রবিশেষে পিতা-পুত্রের নাম এইভাবে পরস্পর উল্টাইয়া যাইতে পারে। বিশুদ্ধমতে তাঁহার নাম গালিব ইবন 'আবদুল্লাহ। হাদীছ ও সীরাতের অধিকাংশ সূত্র হইতে ইহার সমর্থন পাওয়া যায় (সুনান আবূ দাউদ, ২খ., ভারত, পৃ. ১৫; টীকা, ৩খ., লেবানন, পৃ. ১২৮; জামিউল উসূল, ৩খ., পৃ. ২২১-এর ১নং টীকা; আল-ইসাবা, ৩খ., পৃ. ১৮৪; আওনুল মা'বূদ, ৭খ., পৃ. ৩৩৮)। অবশ্য হযরত আবদুল্লাহ ইব্ন গালিব আল-লায়ছী (রা) নামক একজন সাহাবীর নেতৃত্বে একটি বাহিনীকে রাসূলুল্লাহ (স) দ্বিতীয় হিজরীতে ফাদাক অঞ্চলে প্রেরণ করিয়াছিলেন বলিয়া হাফিজ আবূ 'আমর (র) সূত্রে জানা যায় (উসদুল গাবা, ৩খ., পৃ. ২৪১; বাযলুল মাজহুদ, ১২খ., পৃ. ২৯৪; আওনুল মা'বুদ, ৭খ., পৃ. ৩৩৮; আল-ইসাবা, ২খ., পৃ. ৩৫৭)।
আল-কাদীদ হইল মক্কা মুআজ্জামা নগরীর মোটামুটি নিকটবর্তী একটি বহুল প্রসিদ্ধ ঝরনার নাম-যাহ! কুদায়দ (قُدَید) ও উসফান (عُسْفَان) নামক দুইটি স্থানের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত (সহীহ বুখারী, ১খ., পৃ. ২৬০, ২খ., পৃ. ৬১৩; শারহু মুসলিম, নাওয়াবী, ২খ., পৃ. ৩৫৫)।
মক্কা বিজয়ের প্রাক্কালে রাসূলূল্লাহ (স) ও তাঁহার সাহাবা-ই কিরাম এই আল-কাদীদ নামক স্থানে পৌছিয়া সফরের কারণে তাঁহাদের সিয়াম ভংগ করিয়াছিলেন (সহীহ বুখারী, ২খ., পৃ. ৬১৩; সহীহ মুসলিম, ২খ., পৃ. ৩৫৫)। মক্কা হইতে আল-কাদীদের দূরত্ব হইল ৪২ মাইল, মতান্তরে ৪৮ মাইল আর আল-কাদীদ হইতে কুদায়দের দূরত্ব হইল ১৬ মাইল (উমদাতুল কারী, ১৭খ., পৃ. ২৭৬; মু'জামুল বুলদান, ৪খ., পৃ. ৩১৩ এবং পৃ. ৪৪২)।
আল-কাদীদে অবস্থানরত বানূল মুলাওওয়াহ ছিল ইসলাম ও মুসলিমগণের চরম দুশমন। এই গোত্রের লোকজন হযরত বাশীর ইব্ন সুওয়ায়দ (রা)-এর সংগী-সাথিগণকে হত্যা করিয়াছিল (আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৪২৯)। রাসূলুল্লাহ (স) ইহার প্রতিশোধ গ্রহণের জন্যই হযরত গালিব ইব্ন আব্দুল্লাহ (রা)-কে প্রেরণ করিলেন। তিনি তাঁহার বাহিনী লইয়া আল-কাদীদ-এর উদ্দেশে সফরকালে পথিমধ্যে কুদায়দ নামক স্থানে যাত্রাবিরতি করিলেন। এই অভিযানের অন্যতম সৈনিক হযরত জুনদুব ইব্ন মাকীছ (রা) বলেন, আমি এই সৈন্যবাহিনীর অন্তর্ভুক্ত ছিলাম। আমরা যখন কুদায়দে পৌছিলাম, হারিছ ইবন মালিক, মতান্তরে হযরত ইব্ন মালিক ইবনুল বারসা আল-লায়ছী নামক একজন লোককে আমরা নাগালে পাইলাম। আমরা তাহাকে পাকড়াও করিলাম। সে বলিল, "আমি ইসলাম গ্রহণের উদ্দেশ্যেই আসিয়াছি। রাসুলুল্লাহ (স)-এর সাক্ষাত লাভই আমার উদ্দেশ্য"। তাহার কথা শুনিয়া হযরত গালিব (রা) বলিলেন, তুমি যদি ইসলাম গ্রহণ করিয়া থাক কিংবা ইসলাম গ্রহণের জন্যই আসিয়া থাক তাহা হইলে একদিন একরাত আমাদের প্রহরাধীনে থাকিলে তোমার কোন ক্ষতি হইবে না। আর যদি তোমার অন্য কোন উদ্দেশ্য থাকে তাহা হইলে আমরা তোমা হইতে নিরাপদ থাকিলাম না। ইহার পর আমরা তাহাকে রশি দ্বারা বাঁধিলাম। তাহাকে এক কৃষ্ণাঙ্গ সৈনিকের প্রহরায় রাখিয়া তাহাকে বলিলাম, বন্দী লোকটির সহিত তুমি এখানে থাকিয়া যাও যতক্ষণ না আমরা ফিরিয়া আসি। লোকটি যদি তোমাকে কাবু করিতে চায় তুমি তাহাকে হত্যা করিও (সুনান আবু দাউদ, লেবানন, ৩খ., পৃ. ১২৮; মুসনাদ আহমাদ, ৩খ., পৃ. ৪৬৮; তারীখ তাবারী, ৩খ., পৃ. ১০২; সীরাত ইন্ন হিশাম, ৪খ., পৃ. ১৮৯-১৯১; তাবাকাত ইন্ন সা'দ, ২খ., পৃ. ১২৪; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ২৫৩)। তাহাকে পাহারা দেওয়ার জন্য যে কৃষ্ণাঙ্গ সৈনিককে নিয়োজিত করা হয় তাহার নাম সুওয়ায়দ ইব্ন সাখারী (সীরাত হালাবী, ৩খ, পৃ. ১৮৮)।
ইহার পর হযরত গালিব (রা) ও তাঁহার সেনাদল গন্তব্যের উদ্দেশে পথচলা আরম্ভ করিলেন এবং সন্ধ্যার পূর্বে আল-কাদীদ উপত্যকায় পৌছিয়া লোকচক্ষুর অন্তরালে শিবির স্থাপন করিলেন (তাবাকাত ইবন সা'দ, ২খ., পৃ. ১২৪)। কেবল সুনান আবু দাউদ সূত্রে জানা যায়, উল্লিখিত ইবনুল বারসা কে পাকড়াও করার ঘটনা এই আল-কাদীদে সংঘটিত হয়, কুদায়দে নহে।
আল-কাদীদে শিবির স্থাপন করিয়া হযরত গালিব (রা) তাঁহার অন্যতম সৈনিক হযরত জুনদুব ইব্ন মাকীছ (রা)-কে গুপ্তচররূপে বসতিতে প্রেরণ করিলেন। হযরত জুন্দুব (রা) পথ চলিতে চলিতে সূর্যাস্তকালে একটি টিলার উপর অবস্থান গ্রহণ করিলেন। টিলাটির নিকটেই ছিল বসতি। তিনি টিলায় মাথা গুঁজিয়া রাখিয়া দেখিতে পাইলেন, বসতির ছাউনি হইতে বাহির হইয়া এক ব্যক্তি তাঁহাকে অস্পষ্টভাবে অবলোকন করিতেছে এবং নিজ স্ত্রীকে বলিতেছে, আমি টিলার উপর একটি ছায়ামূর্তি দেখিতেছি, দিবসের প্রথম ভাগে তাহা আমি দেখিতে পাই নাই। তুমি অনুসন্ধান করিয়া দেখ তোমার তাঁবুর কিছু হারাইয়া গিয়াছে কি না! তোমার বাসনপত্রের কোনটি কুকুর লইয়া গিয়াছে কি না! স্ত্রী সবকিছু দেখিয়া শুনিয়া বলিল না, আল্লাহ্র কসম! কোন কিছুই হারাইয়া যায় নাই। ইহাতে লোকটির সন্দেহ বাড়িয়া গেল। সে তীর-ধনুক প্রস্তুত করিয়া একটি তীর নিক্ষেপ করিলে তীরটি হযরত জুন্দুব (রা)-এর পাঁজরে আসিয়া বিদ্ধ হইল। তিনি বিন্দুমাত্র নড়াচড়া না করিয়া অবিচল রহিলেন এবং তীরটি টানিয়া বাহির করিয়া ফেলিলেন। ইহার পর সে আরেকটি তীর নিক্ষেপ করিলে তীরটি তাঁহার কাঁধে বিদ্ধ হইল। তিনি ইহাও পূর্ববৎ টানিয়া বাহির করিয়া ফেলিলেন এবং বিন্দুমাত্র নড়াচড়া না করিয়া অবিচল রহিলেন। লোকটি তাহার স্ত্রীকে বলিল, 'ছায়ামূর্তিটি শত্রুদিগের গুপ্তচর হইয়া থাকিলে অবশ্যই নড়াচড়া করিত। আমার দুইট তীরই তো তাহার শরীরে বিধিয়াছে। তুমি প্রত্যূষে গিয়া তীর দুইটি কুড়াইয়া আনিবে, কুকুরকে তাহাতে মুখ লাগাইবার সুযোগ দিবে না।' ইহার পর তাহারা উভয়ে তাঁবুতে ঢুকিয়া পড়িল (সীরাত হালাবী, ৩খ., পৃ. ১৮৮; তাবাকাত ইব্ন সাঁদ, ২খ., পৃ. ১২৪-১২৫; সীরাত ইন্ন ইসহাক, ৩খ., পৃ. ৩৬৪-৩৬৫)।
হযরত গালিব (রা)-এর সেনাদল উক্ত বসতিতে আক্রমণের প্রস্তুতি গ্রহণ করিলেন। উহারা উহাদিগের বকরী ও উস্ত্রী যথানিয়মে আস্তাবলে ফিরাইয়া আনিল এবং দুধ দোহন করিল। ঘুমাইবার সময় হইলে উহারা নিশ্চিন্তে নির্বিঘ্নে ঘুমাইয়া পড়িল। রাত্রির প্রথম প্রহর অতিবাহিত হওয়ার পর হযরত গালিব (রা)-এর সেনাদল একযোগে অকস্মাৎ উহাদিগের উপর আক্রমণ করিলেন (তাবাকাত ইবন সা'দ, ২খ., পৃ. ১২৫; তারীখ তাবারী, ৩খ., পৃ. ১০২; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ২৫৩)। এক বর্ণনামতে এই আক্রমণ রাত্রির শেষাংশে সংঘটিত হইয়াছিল (সীরাত ইব্ন হিশাম, ৪খ., পৃ. ১৯০; আর-রাহীক, পৃ. ৪২৯; সীরাত ইবন ইসহাক, ৩খ., পৃ. ৩৬৪, ৩৬৫)। তাহারা উহাদিগের জান ও মালের ব্যাপক ক্ষতি সাধন করিতে সক্ষম হইলেন, উহাদিগের অনেককে হত্যা করিলেন এবং অনেককে বন্দী করিলেন। এই সংঘর্ষ চলাকালে মুসলিম সৈনিকগণের সংকেত ছিল امت (মারিয়া ফেল, মারিয়া ফেল) (সীরাত ইন্ন হিশাম, ৪খ., পৃ. ১৯১)।
তাহারা উহাদিগের বহু সংখ্যক বকরী ও উষ্ট্রী হস্তগত করিলেন। যুদ্ধশেষে উক্ত বন্দী গবাদিপশুসমূহ হাঁকাইয়া লইয়া তাহারা মদীনার উদ্দেশে প্রত্যাবর্তন করিলেন। কুদায়দে পৌছিয়া তাহারা পূর্বদিনের গ্রেফতারকৃত ইবনুল বার্সা ও তাহার প্রহরীকে সংগে লইলেন। ওদিকে উক্ত আক্রমণে পালাইয়া যাওয়া ও আক্রান্ত হওয়া কাফির মুশরিকগণ হাঁক-ডাক করিয়া উহাদিগের মিত্র ও পড়শীদিগকে দ্রুত জড়ো করিল। উহারা সবাই একজোট হইয়া অবিলম্বে মুসলিম বাহিনীর পশ্চাদ্ধাবন করিল এবং কুদায়দের কাছাকাছি আসিয়া পৌছিল। এই মুশরিক বাহিনী সংখ্যায় এত অধিক ছিল যে, স্বল্প-সংখ্যক মুসলিম বাহিনীর পক্ষে উহাদিগের প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল না। এই দুই বাহিনী এক পর্যায়ে এত কাছাকাছি হইল যে, উভয় বাহিনীর মধ্যে কেবল কুদায়দ উপত্যকার ব্যবধান ছিল।
মুসলিম সৈন্যগণের এই নাযুক পরিস্থিতিতে আল্লাহ তা'আলা সাহায্য করিলেন। তিনি কুদায়দ উপত্যকায় অকস্মাৎ ঢল প্রবাহিত করিলেন। হযরত জুনদুব (রা) বলেন, 'আল্লাহই ভাল জানেন সেই ঢল কোথা হইতে কিভাবে আসিল। কোন মেঘ বা বৃষ্টি আমাবা দেখিতে পাই নাই। আল্লাহ এমন মারাত্মক ঢল প্রবাহিত করিলেন যাহা প্রতিহত করার ক্ষমতা উহাদিগের কাহারও ছিল না এবং তাহা অতিক্রম করিয়া আমাদের নাগাল পাওয়ার সাধ্যও উহাদিগের ছিল না। উহারা নিরূপায় ইহয়া দাঁড়াইয়া রহিল এবং শুধু তাকাইয়া দেখিল, মুসলমানগণ উহাদিগের বকরী ও উষ্ট্রী হাঁকাইয়া লইয়া আসিতেছি। উহাদিগের একজনও আমাদিগের কাছে আসিতে সক্ষম হইল না। অবশেষে আমরা মদীনায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট চলিয়া আসিলাম (তাবাকাত ইবন সা'দ, ২খ., পৃ. ১২৫; সীরাত আল-হালাবী, ৩খ., পৃ. ১৮৯; সীরাত ইন্ন হিশাম, ৪খ., পৃ. ১৯০. ১৯১)।
মুহাম্মাদ ইবন উমার (র)-এর রিওয়ায়াতে জানা যায়, এই যুদ্ধাভিযান হইতে ফিরিয়া আসিবার পথে একজন মুজাহিদ সাহাবী যুদ্ধলব্ধ উষ্ট্রীগুলি হাঁকাইয়া লইয়া আসিবার সময় নিম্নোক্ত কবিতা আবৃত্তি করিতেছিলেন:
أَبِي أَبُوا الْقَاسِمِ أَنْ تَغَزَّبِي + فِي خَضْلٍ نَبَاتُهُ مُغْلُولُب صَفَرَ أَعَالِيَهُ كَلَوْنَ الْمُذْهَبَ + وَذَالِكَ قَوْلُ صَادِقٍ لَمْ يَكْذِبِ
"আবুল কাসিম অস্বীকৃতি জানায় তোমার (উষ্ট্রীর) হারাইয়া যাইতে সবুজ বুনো ঘাসের জঙ্গলে যাহার উপরিভাগে হলুদ সোনালী আভা সাচ্চা লোকের কথা ইহা, বলেনি মিথ্যা" (তাবাকাত ইবন সা'দ, ২খ., পৃ. ১২৪; তারীখ তাবারী, ৩খ., পৃ. ১০২; শারহ আল-মাওয়াহিব, ১খ., পৃ. ২৬৪; সীরাত ইবন হিশাম, ৪খ., পৃ. ১৯১; সীরাত ইবন ইসহাক, ৩খ., পৃ. ৬৬৫)।
কুদায়দে গ্রেফতারকৃত ইবনুল বারসা আল-লায়ছী (রা) তাহার পূর্বোক্ত দাবির সত্যতা প্রমাণ করিয়াছিলেন। তিনি সত্যই ইসলামের আকর্ষণে মুসলিম মুজাহিদগণের সহিত সাক্ষাত করিয়াছিলেন। পরবর্তী কালে তিনি একনিষ্ঠ মুসলিমরূপে জীবন যাপন করিয়া হযরত মু'আবিয়া (রা)-এর খিলাফতের শেষভাগে ইনতিকাল করেন (আল-ইসাবা, ১খ., পৃ. ২৮৯)।
রাসূলুল্লাহ (স) সংবাদ পাইলেন যে, বানু লায়ছের একটি শাখা বানুল মুলাওওয়াহ, যাহারা আল-কাদীদ নামক স্থানে বাস করিত, ইসলাম বিরোধী চক্রান্তে লিপ্ত আছে। তাই তিনি ৮ম হিজরীর সফর (৬২৯ খৃ. -এর জুন মাসে) হযরত গালিব ইব্ন আব্দুল্লাহ আল-লায়ছী (রা)-এর নেতৃত্বে দশ, 'বার বা তদুর্ধ সংখ্যক সাহাবীর একটি ক্ষুদ্র বাহিনী 'আল-কাদীদ' নামক স্থানের বানু আল-মুলাওওয়াহ-এর উদ্দেশ্যে প্রেরণ করিলেন (তারীখ তাবারী, ৩খ., পৃ. ১০২; উয়নুল আছার, পৃ. ১৫০-৫১; আল-মাওয়াহিব, ১খ., পৃ. ১৪৪; তাবাকাত ইবন সা'দ, ২খ., পৃ. ১২৪)। কোন কোন সীরাত বিশারদের মতে, ইহার সময়কাল ৭ম হিজরীর সফর কিংবা রাবীউল আওয়াল (আর-রাহীকুল মাথূম, পৃ. ৪২৯)। হাফিজ আবু 'আমর বলিয়াছেন, উল্লিখিত অভিযান ৫ম হিজরীতে সংঘটিত হইয়াছিল (আল-ইসাবা, ৩খ., পৃ. ১৮৪; আল-ইসতী'আব, ৩খ., পৃ. ১২৫২)।
হাফিজ ইব্ন কাছীর (র) আল-ওয়াকিদী (র) সূত্রে বর্ণনা করিয়াছেন যে, এই অভিযানে সাহাবীগণের সৈন্যসংখ্যা ছিল ১৩০ জন (কিতাবুল-মাগাযী, ২খ., পৃ. ৭২৬; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ২৫৩)। সীরাতকার আশ্-শামী এই বর্ণনা প্রত্যাখ্যান করিয়া বলিয়াছেন, ১৩০ জন সৈন্য ছিল হযরত গালিব (রা)-এর আল-মায়ফা'আ অভিযানে। তাঁহার আল-কাদীদ অভিযানে সৈন্যসংখ্যা উপরিউক্ত দশোৰ্দ্ধই ছিল (শারহু মাওয়াহিব, ১খ., পৃ. ২৬৪; সীরাত হালাবী, ৩খ., পৃ. ১৮৮)। কোন কোন সূত্রে জানা যায়, তাঁহারা ছিলেন ৬০ জন অশ্বারোহী সৈন্য (উসদুল গাবা, ৪খ., পৃ. ১৬৮)।
উপরিউক্ত হযরত গালিব ইবন 'আব্দুল্লাহ (রা)-এর নাম উল্টাভাবে 'আব্দুল্লাহ ইব্ন গালিব' (রা) উল্লিখিত হইয়াছে একটি হাদীছ গ্রন্থে (সুনান আবূ দাউদ, ২খ., (ভারত), পৃ. ১৫, ৩খ., (লেবানন), পৃ. ১২৮]। এই সমস্যার সমাধানে বিজ্ঞ উলামা-ই কিরাম বলিয়াছেন, ক্ষেত্রবিশেষে পিতা-পুত্রের নাম এইভাবে পরস্পর উল্টাইয়া যাইতে পারে। বিশুদ্ধমতে তাঁহার নাম গালিব ইবন 'আবদুল্লাহ। হাদীছ ও সীরাতের অধিকাংশ সূত্র হইতে ইহার সমর্থন পাওয়া যায় (সুনান আবূ দাউদ, ২খ., ভারত, পৃ. ১৫; টীকা, ৩খ., লেবানন, পৃ. ১২৮; জামিউল উসূল, ৩খ., পৃ. ২২১-এর ১নং টীকা; আল-ইসাবা, ৩খ., পৃ. ১৮৪; আওনুল মা'বূদ, ৭খ., পৃ. ৩৩৮)। অবশ্য হযরত আবদুল্লাহ ইব্ন গালিব আল-লায়ছী (রা) নামক একজন সাহাবীর নেতৃত্বে একটি বাহিনীকে রাসূলুল্লাহ (স) দ্বিতীয় হিজরীতে ফাদাক অঞ্চলে প্রেরণ করিয়াছিলেন
বলিয়া হাফিজ আবূ 'আমর (র) সূত্রে জানা যায় (উসদুল গাবা, ৩খ., পৃ. ২৪১; বাযলুল মাজহুদ, ১২খ., পৃ. ২৯৪; আওনুল মা'বুদ, ৭খ., পৃ. ৩৩৮; আল-ইসাবা, ২খ., পৃ. ৩৫৭)।
আল-কাদীদ হইল মক্কা মুআজ্জামা নগরীর মোটামুটি নিকটবর্তী একটি বহুল প্রসিদ্ধ ঝরনার নাম-যাহ! কুদায়দ (قُدَید) ও উসফান (عُسْفَان) নামক দুইটি স্থানের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত (সহীহ বুখারী, ১খ., পৃ. ২৬০, ২খ., পৃ. ৬১৩; শারহু মুসলিম, নাওয়াবী, ২খ., পৃ. ৩৫৫)।
মক্কা বিজয়ের প্রাক্কালে রাসূলূল্লাহ (স) ও তাঁহার সাহাবা-ই কিরাম এই আল-কাদীদ নামক স্থানে পৌছিয়া সফরের কারণে তাঁহাদের সিয়াম ভংগ করিয়াছিলেন (সহীহ বুখারী, ২খ., পৃ. ৬১৩; সহীহ মুসলিম, ২খ., পৃ. ৩৫৫)। মক্কা হইতে আল-কাদীদের দূরত্ব হইল ৪২ মাইল, মতান্তরে ৪৮ মাইল আর আল-কাদীদ হইতে কুদায়দের দূরত্ব হইল ১৬ মাইল (উমদাতুল কারী, ১৭খ., পৃ. ২৭৬; মু'জামুল বুলদান, ৪খ., পৃ. ৩১৩ এবং পৃ. ৪৪২)।
আল-কাদীদে অবস্থানরত বানূল মুলাওওয়াহ ছিল ইসলাম ও মুসলিমগণের চরম দুশমন। এই গোত্রের লোকজন হযরত বাশীর ইব্ন সুওয়ায়দ (রা)-এর সংগী-সাথিগণকে হত্যা করিয়াছিল (আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৪২৯)। রাসূলুল্লাহ (স) ইহার প্রতিশোধ গ্রহণের জন্যই হযরত গালিব ইব্ন আব্দুল্লাহ (রা)-কে প্রেরণ করিলেন। তিনি তাঁহার বাহিনী লইয়া আল-কাদীদ-এর উদ্দেশে সফরকালে পথিমধ্যে কুদায়দ নামক স্থানে যাত্রাবিরতি করিলেন। এই অভিযানের অন্যতম সৈনিক হযরত জুনদুব ইব্ন মাকীছ (রা) বলেন, আমি এই সৈন্যবাহিনীর অন্তর্ভুক্ত ছিলাম। আমরা যখন কুদায়দে পৌছিলাম, হারিছ ইবন মালিক, মতান্তরে হযরত ইব্ন মালিক ইবনুল বারসা আল-লায়ছী নামক একজন লোককে আমরা নাগালে পাইলাম। আমরা তাহাকে পাকড়াও করিলাম। সে বলিল, "আমি ইসলাম গ্রহণের উদ্দেশ্যেই আসিয়াছি। রাসুলুল্লাহ (স)-এর সাক্ষাত লাভই আমার উদ্দেশ্য"। তাহার কথা শুনিয়া হযরত গালিব (রা) বলিলেন, তুমি যদি ইসলাম গ্রহণ করিয়া থাক কিংবা ইসলাম গ্রহণের জন্যই আসিয়া থাক তাহা হইলে একদিন একরাত আমাদের প্রহরাধীনে থাকিলে তোমার কোন ক্ষতি হইবে না। আর যদি তোমার অন্য কোন উদ্দেশ্য থাকে তাহা হইলে আমরা তোমা হইতে নিরাপদ থাকিলাম না। ইহার পর আমরা তাহাকে রশি দ্বারা বাঁধিলাম। তাহাকে এক কৃষ্ণাঙ্গ সৈনিকের প্রহরায় রাখিয়া তাহাকে বলিলাম, বন্দী লোকটির সহিত তুমি এখানে থাকিয়া যাও যতক্ষণ না আমরা ফিরিয়া আসি। লোকটি যদি তোমাকে কাবু করিতে চায় তুমি তাহাকে হত্যা করিও (সুনান আবু দাউদ, লেবানন, ৩খ., পৃ. ১২৮; মুসনাদ আহমাদ, ৩খ., পৃ. ৪৬৮; তারীখ তাবারী, ৩খ., পৃ. ১০২; সীরাত ইন্ন হিশাম, ৪খ., পৃ. ১৮৯-১৯১; তাবাকাত ইন্ন সা'দ, ২খ., পৃ. ১২৪; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ২৫৩)। তাহাকে পাহারা দেওয়ার জন্য যে কৃষ্ণাঙ্গ সৈনিককে নিয়োজিত করা হয় তাহার নাম সুওয়ায়দ ইব্ন সাখারী (সীরাত হালাবী, ৩খ, পৃ. ১৮৮)।
ইহার পর হযরত গালিব (রা) ও তাঁহার সেনাদল গন্তব্যের উদ্দেশে পথচলা আরম্ভ করিলেন এবং সন্ধ্যার পূর্বে আল-কাদীদ উপত্যকায় পৌছিয়া লোকচক্ষুর অন্তরালে শিবির স্থাপন করিলেন (তাবাকাত ইবন সা'দ, ২খ., পৃ. ১২৪)। কেবল সুনান আবু দাউদ সূত্রে জানা যায়, উল্লিখিত ইবনুল বারসা কে পাকড়াও করার ঘটনা এই আল-কাদীদে সংঘটিত হয়, কুদায়দে নহে।
আল-কাদীদে শিবির স্থাপন করিয়া হযরত গালিব (রা) তাঁহার অন্যতম সৈনিক হযরত জুনদুব ইব্ন মাকীছ (রা)-কে গুপ্তচররূপে বসতিতে প্রেরণ করিলেন। হযরত জুন্দুব (রা) পথ চলিতে চলিতে সূর্যাস্তকালে একটি টিলার উপর অবস্থান গ্রহণ করিলেন। টিলাটির নিকটেই ছিল বসতি। তিনি টিলায় মাথা গুঁজিয়া রাখিয়া দেখিতে পাইলেন, বসতির ছাউনি হইতে বাহির হইয়া এক ব্যক্তি তাঁহাকে অস্পষ্টভাবে অবলোকন করিতেছে এবং নিজ স্ত্রীকে বলিতেছে, আমি টিলার উপর একটি ছায়ামূর্তি দেখিতেছি, দিবসের প্রথম ভাগে তাহা আমি দেখিতে পাই নাই। তুমি অনুসন্ধান করিয়া দেখ তোমার তাঁবুর কিছু হারাইয়া গিয়াছে কি না! তোমার বাসনপত্রের কোনটি কুকুর লইয়া গিয়াছে কি না! স্ত্রী সবকিছু দেখিয়া শুনিয়া বলিল না, আল্লাহ্র কসম! কোন কিছুই হারাইয়া যায় নাই। ইহাতে লোকটির সন্দেহ বাড়িয়া গেল। সে তীর-ধনুক প্রস্তুত করিয়া একটি তীর নিক্ষেপ করিলে তীরটি হযরত জুন্দুব (রা)-এর পাঁজরে আসিয়া বিদ্ধ হইল। তিনি বিন্দুমাত্র নড়াচড়া না করিয়া অবিচল রহিলেন এবং তীরটি টানিয়া বাহির করিয়া ফেলিলেন। ইহার পর সে আরেকটি তীর নিক্ষেপ করিলে তীরটি তাঁহার কাঁধে বিদ্ধ হইল। তিনি ইহাও পূর্ববৎ টানিয়া বাহির করিয়া ফেলিলেন এবং বিন্দুমাত্র নড়াচড়া না করিয়া অবিচল রহিলেন। লোকটি তাহার স্ত্রীকে বলিল, 'ছায়ামূর্তিটি শত্রুদিগের গুপ্তচর হইয়া থাকিলে অবশ্যই নড়াচড়া করিত। আমার দুইট তীরই তো তাহার শরীরে বিধিয়াছে। তুমি প্রত্যূষে গিয়া তীর দুইটি কুড়াইয়া আনিবে, কুকুরকে তাহাতে মুখ লাগাইবার সুযোগ দিবে না।' ইহার পর তাহারা উভয়ে তাঁবুতে ঢুকিয়া পড়িল (সীরাত হালাবী, ৩খ., পৃ. ১৮৮; তাবাকাত ইব্ন সাঁদ, ২খ., পৃ. ১২৪-১২৫; সীরাত ইন্ন ইসহাক, ৩খ., পৃ. ৩৬৪-৩৬৫)।
হযরত গালিব (রা)-এর সেনাদল উক্ত বসতিতে আক্রমণের প্রস্তুতি গ্রহণ করিলেন। উহারা উহাদিগের বকরী ও উস্ত্রী যথানিয়মে আস্তাবলে ফিরাইয়া আনিল এবং দুধ দোহন করিল। ঘুমাইবার সময় হইলে উহারা নিশ্চিন্তে নির্বিঘ্নে ঘুমাইয়া পড়িল। রাত্রির প্রথম প্রহর অতিবাহিত হওয়ার পর হযরত গালিব (রা)-এর সেনাদল একযোগে অকস্মাৎ উহাদিগের উপর আক্রমণ করিলেন (তাবাকাত ইবন সা'দ, ২খ., পৃ. ১২৫; তারীখ তাবারী, ৩খ., পৃ. ১০২; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ২৫৩)। এক বর্ণনামতে এই আক্রমণ রাত্রির শেষাংশে সংঘটিত হইয়াছিল (সীরাত ইব্ন হিশাম, ৪খ., পৃ. ১৯০; আর-রাহীক, পৃ. ৪২৯; সীরাত ইবন ইসহাক, ৩খ., পৃ. ৩৬৪, ৩৬৫)। তাহারা উহাদিগের জান ও মালের ব্যাপক ক্ষতি সাধন করিতে সক্ষম হইলেন, উহাদিগের অনেককে হত্যা করিলেন এবং অনেককে বন্দী করিলেন। এই সংঘর্ষ
চলাকালে মুসলিম সৈনিকগণের সংকেত ছিল امت (মারিয়া ফেল, মারিয়া ফেল) (সীরাত ইন্ন হিশাম, ৪খ., পৃ. ১৯১)।
তাহারা উহাদিগের বহু সংখ্যক বকরী ও উষ্ট্রী হস্তগত করিলেন। যুদ্ধশেষে উক্ত বন্দী গবাদিপশুসমূহ হাঁকাইয়া লইয়া তাহারা মদীনার উদ্দেশে প্রত্যাবর্তন করিলেন। কুদায়দে পৌছিয়া তাহারা পূর্বদিনের গ্রেফতারকৃত ইবনুল বার্সা ও তাহার প্রহরীকে সংগে লইলেন। ওদিকে উক্ত আক্রমণে পালাইয়া যাওয়া ও আক্রান্ত হওয়া কাফির মুশরিকগণ হাঁক-ডাক করিয়া উহাদিগের মিত্র ও পড়শীদিগকে দ্রুত জড়ো করিল। উহারা সবাই একজোট হইয়া অবিলম্বে মুসলিম বাহিনীর পশ্চাদ্ধাবন করিল এবং কুদায়দের কাছাকাছি আসিয়া পৌছিল। এই মুশরিক বাহিনী সংখ্যায় এত অধিক ছিল যে, স্বল্প-সংখ্যক মুসলিম বাহিনীর পক্ষে উহাদিগের প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল না। এই দুই বাহিনী এক পর্যায়ে এত কাছাকাছি হইল যে, উভয় বাহিনীর মধ্যে কেবল কুদায়দ উপত্যকার ব্যবধান ছিল।
মুসলিম সৈন্যগণের এই নাযুক পরিস্থিতিতে আল্লাহ তা'আলা সাহায্য করিলেন। তিনি কুদায়দ উপত্যকায় অকস্মাৎ ঢল প্রবাহিত করিলেন। হযরত জুনদুব (রা) বলেন, 'আল্লাহই ভাল জানেন সেই ঢল কোথা হইতে কিভাবে আসিল। কোন মেঘ বা বৃষ্টি আমাবা দেখিতে পাই নাই। আল্লাহ এমন মারাত্মক ঢল প্রবাহিত করিলেন যাহা প্রতিহত করার ক্ষমতা উহাদিগের কাহারও ছিল না এবং তাহা অতিক্রম করিয়া আমাদের নাগাল পাওয়ার সাধ্যও উহাদিগের ছিল না। উহারা নিরূপায় ইহয়া দাঁড়াইয়া রহিল এবং আমাদিগকে দেখিতে লগিল যে, আমরা উহাদিগের বকরী ও উষ্ট্রী হাঁকাইয়া লইয়া আসিতেছি। উহাদিগের একজনও আমাদিগের কাছে আসিতে সক্ষম হইল না। অবশেষে আমরা মদীনায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট চলিয়া আসিলাম (তাবাকাত ইবন সা'দ, ২খ., পৃ. ১২৫; সীরাত আল-হালাবী, ৩খ., পৃ. ১৮৯; সীরাত ইন্ন হিশাম, ৪খ., পৃ. ১৯০. ১৯১)।
মুহাম্মাদ ইবন উমার (র)-এর রিওয়ায়াতে জানা যায়, এই যুদ্ধাভিযান হইতে ফিরিয়া আসিবার পথে একজন মুজাহিদ সাহাবী যুদ্ধলব্ধ উষ্ট্রীগুলি হাঁকাইয়া লইয়া আসিবার সময় নিম্নোক্ত কবিতা আবৃত্তি করিতেছিলেন:
أَبِي أَبُوا الْقَاسِمِ أَنْ تَغَزَّبِي + فِي خَضْلٍ نَبَاتُهُ مُغْلُولُب صَفَرَ أَعَالِيَهُ كَلَوْنَ الْمُذْهَبَ + وَذَالِكَ قَوْلُ صَادِقٍ لَمْ يَكْذِبِ
"আবুল কাসিম অস্বীকৃতি জানায় তোমার (উষ্ট্রীর) হারাইয়া যাইতে সবুজ বুনো ঘাসের জঙ্গলে
যাহার উপরিভাগে হলুদ সোনালী আভা সাচ্চা লোকের কথা ইহা, বলেনি মিথ্যা"।
(তাবাকাত ইবন সা'দ, ২খ., পৃ. ১২৪; তারীখ তাবারী, ৩খ., পৃ. ১০২; শারহ আল-মাওয়াহিব, ১খ., পৃ. ২৬৪; সীরাত ইবন হিশাম, ৪খ., পৃ. ১৯১; সীরাত ইবন ইসহাক, ৩খ., পৃ. ৬৬৫)।
কুদায়দে গ্রেফতারকৃত ইবনুল বারসা আল-লায়ছী (রা) তাহার পূর্বোক্ত দাবির সত্যতা প্রমাণ করিয়াছিলেন। তিনি সত্যই ইসলামের আকর্ষণে মুসলিম মুজাহিদগণের সহিত সাক্ষাত করিয়াছিলেন। পরবর্তী কালে তিনি একনিষ্ঠ মুসলিমরূপে জীবন যাপন করিয়া হযরত মু'আবিয়া (রা)-এর খিলাফতের শেষভাগে ইনতিকাল করেন (আল-ইসাবা, ১খ., পৃ. ২৮৯)।
📄 সারিয়্যা গালিব ইব্ন আবদিল্লাহ (রা)
৮ম হিজরীর সাফার/৬২৯ খৃ. জুন হযরত গালিব ইব্ন আব্দিল্লাহ আল-লায়ছী (রা)-এর নেতৃত্বে দুই শত মুজাহিদের একটি বাহিনী 'ফাদাক' -এর 'বানু মুররা' এলাকায় একটি অভিযানে প্রেরিত হয় (তাবাকাত ইবন সা'দ, ২খ., পৃ. ১২৬; আল-মাওয়াহিব, ১খ., পৃ. ১৪৪; সীরাত আল-হালাবী ৩খ., পৃ. ১৮৬)। 'ফাদাক' হইল 'খায়বার'-এর পাশ্ববর্তী একটি কৃষিপ্রধান ইয়াহুদী বসতী, মদীনা মুনাওওয়ারা হইতে ইহার দূরত্ব দুই দিনের অথবা তিন দিনের পথ (মু'জামুল বুলদান, ৪খ., পৃ. ২৩৮; আল মুনজিদ ফিল আ'লামা, পৃ. ৫২০) মতান্তরে ছয় মাইল (সীরাত আল-হালাবী, ৩খ., পৃ. ১৮৬; শারহ আল-মাওয়াহিব, ২খ., পৃ. ২৫০; আল-ইসাবা, ৩খ., পৃ. ১৮৪)।
কোন কোন সূত্রে 'গালিব ইব্ن আব্দিল্লাহ' নামের পরিবর্তে 'আবদুল্লাহ ইব্ন গালিব', মতান্তরে গালিব ইবন 'উবায়দুল্লাহ, মতান্তরে 'গালিব ইব্ن ফুদালা' (রা) নাম পাওয়া যায় (সুনান আবী দাউদ, ভারতীয় সং ২খ., পৃ. ১৫: মুসনাদ আহমাদ, ৫খ., পৃ. ২০০, ২০৭; বাযলুল মাজহুদ, ১২খ., পৃ. ১৫২, ২১৪; আল-ইসতী'আব, ৩খ., পৃ. ১২৫২; আল-ইসাবা ৩খ., পৃ. ১৮৩, ১৮৪; জামিউল উসূল, ৩খ., পৃ. ২২১, পাদটীকা; তাফসীর কুরতুবী, ৫খ., পৃ. ৩৩৭; আল-কাশশাফ, ১খ., পৃ. ২৯১)। অবশ্য হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন গালিব আল-লায়ছী (রা) নামক একজন সাহাবীর নেতৃত্বে একটি বাহিনীকে রাসূলুল্লাহ (স) দ্বিতীয় হিজরীতে ফাদাক অঞ্চলে প্রেরণ করিয়াছিলেন বলিয়া হযরত আবূ 'আমর (র) সূত্রে জানা যায় (আল-ইসাবা, ২খ., পৃ. ৩৫৭; উসদুল গাবা, ৩খ., পৃ. ২৪২; বাযলুল মাজহুদ, ১২ খ., পৃ. ২১৪; 'আওনুল মা'বুদ, ৭খ., পৃ. ৮৮৮)। ৭ম হিজরীর প্রারম্ভে 'ফাদাক' রাসূলুল্লাহ (স)-এর হস্তগত হওয়ার পূর্বে বা পরে কোন এক সময়ে হযরত গালিব ইব্ن ফুদালা আল-লায়ছী (রা) উক্ত অঞ্চলে এক সৈন্যবহর লইয়া অভিযান পরিচালনা করিয়াছেন বলিয়াও অন্য এক সূত্রে জানা যায় (আল-ইসাবা, ৩খ., পৃ. ১৮৪, আল-কাশশাফ, ১খ., পৃ. ২৭১; তাফসীর কাবীর, ১১খ., পৃ. ৩)।
এই অভিযানের কারণ ছিল এই যে, ছয় মাস পূর্বে অর্থাৎ ৭ম হিজরীর শা'বান মাসে হযরত বাশীর ইবন সা'দ (রা)-এব নেতৃত্বাধীন একদল সৈন্য বানু মুররা কর্তৃক মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হইয়াছিলেন (তারীখ তাবারী, ৩খ., পৃ. ১৯; আল-মাওয়াহিব, ১খ., পৃ. ১৪১; শারহ আল-মাওয়াহিব, ২খ., পৃ. ৫০)। তাহাদিগকে শায়েস্তা করিবার জন্য রাসূলুল্লাহ (স) প্রথমে হযরত যুবায়র ইবনুল আওয়াম (রা)-কে অভিযানের জন্য প্রস্তুত করিয়া বলিয়াছিলেন, "যুবায়র! তুমি বানু মুররা এলাকায় পৌছিয়া বাশীরের বাহিনী আক্রান্ত হওয়ার প্রতিশোধ গ্রহণ কর। আল্লাহ তোমাদিগকে বিজয়ী করিলে তোমরা উহাদিগের মধ্যে অবস্থান করিবে না"। ইহা বলিয়া রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার হাতে যুদ্ধের পতাকাও তুলিয়া দিয়াছিলেন। কিন্তু এমন সময় হযরত গালিব ইব্ন আব্দিল্লাহ আল-লায়ছী (রা) আল-কাদীদ অভিযান [দ্র. গালিব ইব্ন আব্দিল্লাহ আল্-লায়ছী (রা)-এর আল-কাদীদ অভিযান] সমাপ্ত করিয়া বিজয়ী বেশে মদীনা মুনাওওয়ারায় ফিরিয়া আসিলে রাসূলুল্লাহ (স) হযরত যুবায়র (রা)-এর পরিবর্তে তাহাকে প্রেরণ করিলেন (সীরাত আল-হালাবী, ৩খ., পৃ. ১৮১: তাবাকাত ইবন সা'দ, ২খ., পৃ. ১২৬)।
কোন কোন সূত্রে জানা যায়, হযরত বাশীর (রা) ও তাঁহার বাহিনীর আক্রান্ত হওয়ার সংবাদ প্রাপ্তির পরপরই রাসূলুল্লাহ (স) হযরত গালিব (রা)-কে সসৈন্যে তথায় প্রেরণ করিয়াছিলেন। এই মতানুযায়ী উপরিউক্ত দুই অভিযানের মধ্যে সময়-কালের তেমন ব্যবধান থাকে না, বরং উভয় অভিযানই প্রায় অভিন্ন সময়ে অর্থাৎ ৭ম হিজরীর শাবান/৬২৮ খৃস্টাব্দের ডিসেম্বরে পরিচালিত হইয়াছিল (মাগাযী আল-ওয়াকিদী, ২খ., পৃ. ৭২৪; দালাইল আল-বায়হাকী, ২খ., পৃ. ২৯৫; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ২৫২; রাসূল মুহাম্মদ (স)-এর সরকার কাঠামো, পৃ. ৩৫২; আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৪২৯)।
হযরত গালিব ইব্ন আবদিল্লাহ (রা)-এর নেতৃত্বাধীন এই বাহিনীতে হযরত উব্বা ইব্ন 'আমর (রা), হযরত আবূ মাস'উদ আল-বাদরী (রা), হযরত কা'ব ইব্ন উজরা (রা) ও হযরত উসামা ইব্ন যায়দ (রা) প্রমুখ সাহাবা-ই কিরাম অন্তর্ভুক্ত ছিলেন (তাবাকাত ইবন সা'দ, ২খ., পৃ. ১২৬; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ২৫২, উয়ূনুল আছার ২খ., পৃ. ১৫২)।
তাঁহারা সন্ধ্যারাত্রিতে বানু মুররা এলাকার কাছাকাছি পৌছিয়া শিবির স্থাপন করিলেন এবং গুপ্তচর পাঠাইয়া উহাদের খবরাখবর লইলেন। সেনাধ্যক্ষ হযরত গালিব (রা) এই সময় তাঁহার সৈন্যবাহিনীরকে এক ভাষণে বলিলেনঃ "আমি তোমাদিগকে এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহকে ভয় করার এবং আমাকে অনুসরণের জন্য উপদেশ প্রদান করিতেছি। সাবধান! আমার নির্দেশ অমান্য করিবে না। মনে রাখিও, যাহার আনুগত্য করা হয় না তাহার কোন মূল্য থাকে না। রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, 'যে ব্যক্তি আমার সেনাধ্যক্ষের আনুগত্য করে সে আমারই আনুগত্য করে, আর যে ব্যক্তি তাঁহার অবাধ্য হয় সে আমারই অবাধ্য হয়।' তোমরা আমার অবাধ্য হইলে প্রকারান্তরে নবী করীম (স)-এর অবাধ্য হইবে।" ইহার পর তিনি দুই দুইজনকে জুটি করিয়া কাতার সাজাইয়া বলিলেন, এই জুটির একজন অপরজনকে কখনও বিচ্ছিন্ন হইতে দিবে না। আমি যদি জিজ্ঞাসা করি, অমুকের সাথী কোথায় সে যেন এই উত্তর না দেয়, আমি জানি না। আমি যখন তাকবীর বলিব, তোমরা সবাই একসংগে তাকবীর বলিবে এবং তরবারি কোষমুক্ত করিবে (তাবাকাত ইব্ন সা'দ, ২খ., পৃ. ১২৬; সীরাত আল-হালাবী, ৩খ., পৃ. ১৮১; আয়নুল-ইয়াকীন, পৃ. ১২৩)। প্রত্যুষে সকল সৈন্য একযোগে অকস্মাৎ শত্রুর উপর ঝাপাইয়া পড়িল। যিনি যেখানে যাহাকে পাইলেন হত্যা করিলেন। এই যুদ্ধে মুসলিম স্যৈগণের সংকেত ছিল امت آمت মারিয়া ফেল, মারিয়া ফেল (তাবাকাত ইব্ن সা'দ, ২খ., পৃ. ১২৬; যাদুল মা'আদ, ২খ., পৃ. ১৪৮; সীরাত আল-হালাবী, ৩খ., পৃ. ১৮৯; উয়ূনুল আছার, ২খ., পৃ. ১৫২, নূরুল-ইয়াকীন, পৃ. ৩৩৮)।
এই মুররা গোত্রের হালীফ (মিত্র) ছিল 'জুহায়না' গোত্রের শাখা আল-হুরাকা উপ-গোত্র। আল-হুরাকা গোত্রের লোকজন সম্ভবত মিত্রতা সূত্রে বানু মুররা সংগে এই যুদ্ধে যোগ দিয়াছিল। অধিকাংশ সীরাত বিশারদের মতে, এই যুদ্ধে হযরত উসামা ইব্ন যায়দ (রা) আল-হুরাকা গোত্রীয় এক ব্যক্তিকে কলেমা পাঠ করিবার পরও হত্যা করিয়াছিলেন (আল-মাগাযী আল ওয়াকিদী, ২খ., পৃ. ৭২৪)।
অন্য একদল সীরাত বিশারদের মতে, হযরত উসামা ইব্ن যায়দ (রা) কর্তৃক আল-হুরাকা গোত্রীয় উক্ত ব্যক্তিকে হত্যার ঘটনা হযরত গালিব ইব্ن আবদুল্লাহ (রা)-এর 'আল-মায়ফাআ' নামক এক ভিন্ন অভিযানে ঘটিয়াছিল (তাবাকাত ইবন সা'দ, ২খ., পৃ. ১১৯; তারীখ তাবারী, ৩খ., পৃ. ৯৯)।
তৃতীয় একদল সীরাত বিশারদের মতে হযরত উসামা (রা) কর্তৃক উপরিউক্ত হত্যার ঘটনাটি হযরত গালিব (রা)-র নেতৃত্বাধীন 'আল-মায়ফাআ অভিযানে' বা বানু মুরারা অভিযানে সংঘটিত হয় নাই, বরং স্বয়ং হযরত উসামা ইব্ন যায়দ (রা)-এর নেতৃত্বে পরিচালিত আল-হুরাকা অভিযান নামক এক স্বতন্ত্র অভিযানে সংঘটিত হইয়াছিল (সহীহ বুখারী, ২খ., পৃ. ৬১২; আল-ইকলীল আল হাকিম, শারহ আল-মাওয়াহিব, ২খ., পৃ. ২৫১)।
হযরত উসামা (রা) বর্ণনা করিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স) আমাদিগকে জুহায়নার শাখা হুরাকা গোত্রের বিরুদ্ধে অভিযানে প্রেরণ করিলেন। আমরা অতি প্রত্যুষে উক্ত গোত্রকে আক্রমণ করিয়া পরাজিত করিলাম। আমি ও একজন আনসার ব্যক্তি এক ব্যক্তির পশ্চাদ্ধাবন করিলাম। আমরা যখন তাহাকে বাগে পাইয়া ঘিরিয়া ফেলিলাম তখন সে বলিয়া উঠিল, لا اله الا الله আমার সাথী আনসার ব্যক্তি তাহার মুখে 'কলেমা' শুনিয়া নিবৃত্ত হইলেন, কিন্তু আর্মি তাহাকে বল্লম দ্বারা আঘাত করিয়া হত্যা করিলাম। আমরা যুদ্ধক্ষেত্র হইতে ফিরিয়া আসিলে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট খবরটি পৌঁছিল। তিনি আমাকে ডাকিয়া বলিলেন, হে উসামা! তুমি কি তাহাকে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু বলিবার পরও হত্যা করিয়াছ? আমি বলিলাম, সে তো আত্মরক্ষার জন্য এই কলেমা বলিয়াছিল। রাসূলুল্লাহ (স) আবার বলিলেন, তুমি কি তাহাকে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু বলিবার পরও হত্যা করিয়াছ হে উসামা! এইভাবে রাসূলুল্লাহ (س) বারবার আমাকে উক্ত একই কথা বলিতে থকিলেন। শেষ পর্যন্ত আমার মনে এই আকাঙ্খার উদয় হইল, হায়! আমি যদি আজিকার দিনের পূর্বে ইসলাম গ্রহণ না করিতাম!
হযরত উসামা (রা) যাহাকে হত্যা করিয়াছিলেন তাহার নাম ছিল নাহীক ইন মিরদাস অথবা মিরদাস ইব্ন নাহীক আল-ফাযারী, মতান্তরে মিরদাস ইব্ন 'আমর আল-ফাদাকী (ফাতহুল বারী, ১২খ., পৃ. ১৬৩; আল-ইসাবা, ৩খ., পৃ. ১৮৩)। এই নামের বংশীয় পরিচয় হিসাবে আল-গাতাফানী, আল-আসলামী, আদ-দামরী (الضمری) প্রভৃতি বিভিন্ন বিশেষণ উল্লিখিত হয় (শারহ আল-মাওয়াহিব, ২খ., পৃ. ২৫১; তাফসীর কুরতুবী, ৫খ., পৃ. ৩৩৭)।
হযরত উসামা (রা)-এর জুটির অন্য সদস্য বা তাঁহার সাথী আনসার ব্যক্তির নাম সম্পর্কে ইব্ن হাজার আসকালানী (র) মন্তব্য করিয়াছেন, কোন সূত্রেই তিনি তাঁহার নাম উদ্ধার করিতে পারেন নাই (ফাতহুল বারী, ১২খ., পৃ. ১৬৩; উমদাতুল কারী, ১৭খ., পৃ. ২৭২)। অবশ্য হাফিজ আল-কাস্স্তাল্পানী (র) বলিয়াছেন, তাঁহার নাম সম্ভবত হযরত আবূ দারদা (রা)। 'আবদুর রাহমান ইবন যায়দ (ر)-এর সূত্রে ইহার সমর্থন পাওয়া যায় (শারহ আল-মাওয়াহিব, ২খ., পৃ. ২৫২)।
হয়রত উসামা (রা) উক্ত ব্যক্তিকে কলেমা পাঠের পরও কেন হত্যা করিলেন ইহার কারণ হিসাবে খাত্তাবী বলিয়াছেন, সম্ভবত তিনি আল্লাহর বাণী:
فَلَمْ يَكُ يَنْفَعُهُمْ إَيْمَانُهُمْ لَمَّا رَأَوْا بَأْسَنَا .
"তাহারা যখন আমার শান্তি প্রত্যক্ষ করিল তখন তাহাদের ঈমান আনয়ন তাহাদের কোন উপকারে আসিল না" (৪: ৮৫) তাহার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বলিয়া মনে করিয়াছেন। এই হেতু রাসূলুল্লাহ (স)-ও তাহার ওযর গ্রহণ করিয়াছেন এবং তাহার উপর দিয়াত (রক্তপণ) আরোপ করেন নাই (ফাতহুল বারী, ১২খ., পৃ. ১৬৪; উমদাতুল কারী, ২৪খ., পৃ. ৩৬)।
অবশ্য হযরত উসামা (রা) উক্ত কলেমা উচ্চারণকারীকে হত্যা করিবার যে কারণ বলিয়াছেন তাহা অন্য একটি হাদীছে সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায়। হাদীছটি এইরূপঃ হযরত জুনদুব ইব্ন মাকীছ (রা) বর্ণনা করিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স) মুসলিমগণের একটি বাহিনী মুশরিকদিগের বিরুদ্ধে পাঠাইলেন। উভয় দল পরস্পর সম্মুখীন হইল। মুশরিক বাহিনীতে এক ব্যক্তি ছিল, সে যখনই কোন মুসলিমকে দেখিত তাঁহাকে লক্ষ্য করিয়া ঝাঁপাইয়া পড়িত এবং তাহাকে হত্যা করিত। একজন মুসলিম তাহার অসতর্ক মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করিতে লাগিলেন। বর্ণনাকারী হযরত জুনদুব (রা) বলিয়াছেন, তিনি হইলেন হযরত উসামা ইব্ن যায়দ (রা)। হযরত উসামা (রা) যখন তাহার উপর তলোয়ার উত্তোলন করিলেন তখন সে (উক্ত মুশরিক) বলিয়া উঠিল, لا اله الا الله তবুও তিনি তাহাকে হত্যা করিলেন। দূত যুদ্ধে জয়লাভের সংবাদ লইয়া রাসূলুল্লাহ (س)-এর খেদমতে হাযির হইল। রাসুলুল্লাহ (س) তাহার নিকট যুদ্ধ পরিস্থিতি জানিতে চাহিলে তিনি সব ঘটনা খুলিয়া বলিলেন, এমনকি উসামা (রা) কর্তৃক হত্যার ঘটনাও। রাসূলুল্লাহ (س) উসামা (রা)-কে ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি তাহাকে কেন হত্যা করিয়াছ? উসামা (রা) বলিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! সে অনেক মুসলিম সৈন্যকে ঘায়েল করিয়াছে, অমুক অমুককে হত্যা করিয়াছে। সে যাঁহাকে যাঁহাকে হত্যা করিয়াছে তাঁহাদের নামও উসামা (রা) উল্লেখ করিলেন। আমি যখন তাহাকে আক্রমণ করিলাম এবং সে আমার তলোয়ার অবলোকন করিল অমনি সে বলিয়া উঠিল, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তুমি কি তাহাকে একেবারে মারিয়া ফেলিলে? তিনি উত্তর দিলেন, হাঁ। রাসূলুল্লাহ (س) বলিলেন, কিয়ামত দিবসে যখন সে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ-সহ উপস্থিত হইবে তখন তুমি কি করিবে? রাসূলুল্লাহ (স) বারবার একই কথা বলিতেছিলেন (সহীহ মুসলিম, ১খ., পৃ. ৬৮)।
অন্য হাদীছে আছে, উসামা (রা)-কে রাসূলুল্লাহ (س) বলিয়াছিলেন, "তুমি কেন তাহার অন্তর চিরিয়া দেখিলে না, সে সত্য বলিয়াছিল, না মিথ্যা বলিয়াছিল? তুমি কি তাহার অন্তর চিরিয়া দেখিয়াছ যে, সে তাহা অস্ত্রের ভয়ে বলিয়াছিল" (সহীহ মুসলিম, ১খ., পৃ. ৬৮; সুনান বায়হাকী, ৮খ., পৃ. ১৯২ ও পৃ. ১৯৬; মুসনাদ আহমাদ, ৫খ., ২০০, ২০৭: ৪খ., পৃ. ৪২৯)।
এই হাদীছের ব্যাখ্যায় ইমাম নববী (র) বলিয়াছেন, 'তুমি যেহেতু তাহার অন্তর চিরিয়া দেখিতে সমর্থ নহ সেহেতু তাহার মুখের কথাই তোমার বিশ্বাস করা উচিত ছিল' (শারহ মুসলিম লিন্নাবাবী, ১খ., পৃ. ৬৮, ৬৯)। ইমাম কুরতুবী (র) বলিয়াছেন, ইহাতে এই প্রমাণ রহিয়াছে যে, শরী'আতের হুকুম-আহকাম প্রয়োগে বাহ্যিক অবস্থার উপর নির্ভর করিতে হয়, অভ্যন্তরীণ অবস্থার উপর নহে (ফাতহুল বারী, ১২ খ., পৃ. ১৬৫)।
রাসূলুল্লাহ (স) এক পর্যায়ে হযরত উসামা (রা)-কে আরও বলিয়াছিলেন, তুমি আমাকে কথা দাও, ভবিষ্যতে তুমি এই ধরনের কোন ব্যক্তিকে হত্যা করিবে না। উসামা (রা) বলিয়াছিলেন, আল্লাহ আমাকে এই অংগীকারের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখুন যে, আমি ভবিষ্যতে এমন কাহাকেও হত্যা করিব না বা এমন কাহারও বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিব না যে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলিবে (আসাহ্হুস সিয়ার, প. ২১৭, ২১৮; যাদুল মা'আদ, ২খ., পৃ. ১৪৮ ও ১৪৯; তাবাকাত ইবন সা'দ, ২খ., পৃ. ১১৯; সীরাত হালাবী, ৩খ., পৃ. ১৮৮)।
এই কারণে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হযরত উসামা (রা) হযরত আলী (রা)-এর সহিত মুসলিম বিদ্রোহীদিগের বিরুদ্ধে কোন যুদ্ধেই অংশ গ্রহণ করেন নাই। তিনি হযরত আলী (রা)-কে তাহার অসম্মতির কথা জানাইয়া বিনীতভাবে বলিয়াছিলেন, হে আলী! আপনি যদি একটি গাধীর মুখে আপনার হাত ঢুকাইয়া দেন তাহা হইলে আমিও আমার হাত আপনার হাতের সহিত ঢুকাইয়া দিব। তবে আপনি তো জানেন, একজন কলেমা উচ্চারণকারীকে হত্যার পর রাসূলুল্লাহ আমাকে কি বলিয়াছিলেন! হযরত উসামা (রা)-এর মত হযরত সা'দ ইব্ন আবী ওয়াক্কাস (রা)-ও মুসলিমগণের কোন গৃহযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন নাই। একজন খারিজী তাঁহাকে প্রশ্ন করিয়াছিল, আল্লাহ কি ফিতনা দূরীভূত না হওয়া পর্যন্ত লড়াই অব্যাহত রাখিতে বলেন নাই? সা'দ (রা) বলিয়াছিলেন, 'আমরা তো কাফিরদিগের বিরুদ্ধে এইজন্য লড়াই করিয়াছি যাহাতে ফিতনা দূরীভূত হয়। আর তুমি ও তোমার সংগী খারিজীগণ তো এইজন্য লড়াই করিতেছ যাহাতে ফিতনা সৃষ্টি হয়' (সহীহ মুসলিম, ১খ., পৃ. ৬৮, ৬৯; সীরাত হালাবী, ৩খ., পৃ. ১৮৮; সুনান আল-বায়হাকী, ৮খ., পৃ. ১৯, ১৯২ ও ১৯৬; সীরাত ইব্ن হিশাম, ৪খ., পৃ. ২০০-২০১)।
হযরত উসামা (রা)-এর এই অভিযানে অসতর্ক হত্যা প্রসংগে কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল হইয়াছে বলিয়া বিভিন্ন তাফসীর গ্রন্থে বর্ণিত আছে: يُأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا ضَرَبْتُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَتَبَيِّنُوا وَلَا تَقُولُوا لِمَنْ الْقَى إِلَيْكُمُ السَّلمَ لَسْتَ مُؤْمِنًا . "হে মুমিনগণ! তোমরা যখন আল্লাহর পথে যাত্রা করিবে তখন পরীক্ষা করিয়া লইবে এবং কেহ তোমাদিগকে সালাম করিলে ইহ জীবনের সম্পদের আকাঙ্ক্ষায় তাহাকে বলিও না, তুমি মুমিন নহ। কারণ আল্লাহ্র নিকট অনায়াসলভ্য সম্পদ প্রচুর রহিয়াছে" (৪: ৯৩)।
মুফাসসিরগণ বলিয়াছেন, মিরদাস ইব্ن নাহীক নামক এক ব্যক্তি ফাদাক অঞ্চলের বাসিন্দা ছিল। সে ইসলাম গ্রহণ করিল, কিন্তু তাহার গোত্রের অন্য কেহ ইসলাম গ্রহণ করিল না। এমতাবস্থায় উহাদের নিকট রাসূলুল্লাহ (স) একটি অভিযান প্রেরণ করিলেন হযরত গালিব আল-লায়ছী (রা)-এর নেতৃত্বে। মুসলিম বাহিনী উহাদের নিকট পৌছিলে উহারা ভয়ে পালাইয়া গেল। কিন্তু মিরদাস ইসলাম গ্রহণের কারণে না পালাইয়া রহিয়া গেল। যখন সে মুসলিমগণের অশ্বারোহীদল দেখিতে পাইল সে তখন তাহার বকরীসমূহ পাহাড়ের আড়ালে রাখিয়া পাহাড়ের উপরে আরোহণ করিল। মুসলিম বাহিনী তাকবীর ধ্বনি করিয়া যুদ্ধ শুরু করিলে সেও তাকবীর ধ্বনি করিল এবং মুসলিম বহিনীর নিকট নামিয়া আসিয়া বলিলঃ لا إِلهَ إِلَّا اللَّهُ مُحَمَّدٌ رَّسُولُ اللَّهِ السَّلَامُ عَلَيْكُمْ.
কিন্তু হযরত উসামা (রা) তাহাকে হত্যা করিলেন এবং তাহার বকরীসমূহ হাঁকাইয়া লইয়া আসিলেন। তাহারা ঘটনাটি রাসূলুল্লাহ (স)-এর গোচরীভূত করিলে তিনি খুবই মর্মাহত হইলেন এবং হযরত উসামা (রা)-কে তিরস্কার করিলেন। হযরত উসামা (রা)-কে রাসূলুল্লাহ (স) উক্ত আয়াতটি শুনাইলেন। হযরত উসামা (রা) বলিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে একটি দাসমুক্তির উপদেশ দিলেন (তাফসীর কাশশাফ, ১খ., পৃ. ২৭১)।
উপরিউক্ত আয়াতের শানে নুযূল হিসাবে ঘটনাটি ছাড়াও ইহার প্রায় অনুরূপ একাধিক ঘটনার উল্লেখ করা হয়। কোন কোন বর্ণনায় দেখা যায়, হত্যাকারী হযরত মুহাল্লিম ইব্ জাছছামা এবং নিহত ব্যক্তি আমের ইবনুল আদবাত আল-আশজা'ঈ ছিলেন। অন্যান্য বর্ণনায় দেখা যায়, হত্যাকারী হযরত মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদ (রা), মতান্তরে আবু কাতাদা, মতান্তরে হযরত আবুদ দারদা (রা) এবং নিহত ব্যক্তির নাম জানা যায় নাই। হযরত আবদুল্লাহ ইব্ن আব্বাস (রা) সূত্রে বর্ণিত আছে, এক ব্যক্তি তাহার বকরী চরাইতেছিল, এমতাবস্থায় তাহার সহিত একদল মুসলিমের সাক্ষাত ঘটিল। সে তাহাদিগকে বলিল, আসসালামু আলায়কুম। কিন্তু তাহারা তাহাকে হত্যা করিল এবং তাহার বকরীসমূহ হাঁকাইয়া লইয়া আসিল। তাহাদের প্রসংগে উক্ত আয়াত অবতীর্ণ হয় (সহীহ বুখারী, ২খ., পৃ. ৬৬০)।
অন্য বর্ণনায় আছে, সালিম গোত্রের এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (স)-এর একদল সাহাবীর পাশ দিয়া তাহার বকরীর পাল চরাইতে চরাইতে পথ অতিক্রম করিতেছিল। সে তাহাদিগকে সালামও দিয়াছিল, কিন্তু তাঁহারা বলাবলি করিতে লাগিলেন, আমাদের হাত হইতে আত্মরক্ষা করিবার জন্যই সে আমাদিগকে সালাম দিয়াছে। ফলে তাঁহারা তাহার উপর ঝাঁপাইয়া পড়িলেন এবং তাহাকে হত্যা করিলেন। তাঁহারা তাহার বকরীর পাল লইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট উপনীত হইলেন। এই প্রসংগে উক্ত আয়াত অবতীর্ণ হয় (ফাতুহল কাদীর, ১খ., পৃ. ৫০২; তাফসীর তাবারী, ৪খ., পৃ. ১৩৯-১৪৩)।
ইমাম কুরতুবী (র) মন্তব্য করিয়াছেন, সম্ভবত উপরিউক্ত ভিন্ন ভিন্ন ঘটনাসমূহ মোটামুটি কাছাকাছি সময়ে সংঘটিত হইয়াছিল। ফলে উক্ত সকল ঘটনা সম্পর্কেই উক্ত আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এই মতানুযায়ী শানে নুযূলগুলির মধ্যে বৈপরীত্য থাকে না (তাফসীর কুরতুবী, ৫খ., পৃ. ৩৩৭; তাফসীর কারীর, ১১খ., পৃ. ৩০)।
মাগাযী সম্পর্কিত হাদীছসমূহের বর্ণনা প্রসংগে ইমাম বুখারী (র) সুস্পষ্ট ইংগিত দিয়াছেন যে, এই সারিয়্যা বা যুদ্ধাভিযানের সেনাধ্যক্ষ ছিলেন হযরত উসামা ইবন যায়দ (রা)। তিনি তাঁহার মতের স্বপক্ষে একাধিক হাদীছও উল্লেখ করিয়াছেন। তিনি এই যুদ্ধাভিযানের শিরোনাম দিয়াছেন:
باب بعث النبي اسامة بن زيد الى الحرقات من جهينة.
"জুহায়নার আল-হুরকা গোত্রের বিরুদ্ধে হযরত উসামা ইন্ন যায়দ (রা) কে প্রেরণের অনুচ্ছেদ” (সহীহ বুখারী, কিতাবুল মাগাযী, ২খ., পৃ. ৬১২)।
ইমাম বুখারী (র) কর্তৃক উক্তরূপ শিরোনামে অনুচ্ছেদ রচনার প্রেক্ষিতে শায়খ আদ্-দাউদীসহ কেহ কেহ প্রশ্ন তুলিয়াছেন, অপ্রাপ্তবয়স্ক হযরত উসামা (রা) সেনাধ্যক্ষ নিযুক্ত হইলেন কিভাবে? ইহার উত্তর দুইভাবে প্রদান করা হয়। প্রথমত, হযরত উসামা (রা) যে সেনাধ্যক্ষ ছিলেন ইহার আভাষ আছে মাত্র এইখানে, ইহার দ্ব্যর্থহীন উল্লেখ এইখানে নাই। হইতে পারে হযরত উসামা (রা) ঘটনার মূল নায়ক ছিলেন বলিয়া সরাসরি তাঁহার নামেই ইমাম বুখারী (ر) অনুচ্ছেদ রচনা করিয়াছেন (সহীহ বুখারী, ২খ., পৃ. ৬১২; টীকা নং ৪; ফাতহুল-বারী, ১২খ., পৃ. ১৬৩-১৬৪; উমদাতুল কারী ১৭খ., পৃ. ২৭২)। দ্বিতীয়ত, হযরত উসামা ইন্ন যায়দ (রা) তখন অপ্রাপ্তবয়স্ক ছিলেন না, তিনি ছিলেন পূর্ণবয়স্ক। রাসূলুল্লাহ (স)-এর ইনতিকালের সময় তাহার বয়স ছিল কমপক্ষে ১৮, মতান্তরে ১৯ বা ২০ বৎসর। এই যুদ্ধাভিযান ৮ম হিজরীতে সংঘটিত হইয়া থাকিলে তখন হযরত উসামা (را)-এর বয়স ছিল অন্যূন ১৫, ১৬ কিংবা ১৭ বৎসর। সুতরাং উক্ত বয়সের একজন যুবকের জন্য রাসূলুল্লাহ (س) কর্তৃক সেনাধ্যক্ষ পদে নিযুক্তি লাভ করা অস্বাভাবিক নয়। তিনি একান্তভাবে রাসূলুল্লাহ (س)-এর প্রিয়পাত্র ছিলেন (আল-ইসতী'আব, ১খ., পৃ. ৭৫-৭৮; উসদুল গাবা, ১খ., পৃ. ৬৪-৬৬; আল-ইসাবা, ১খ, পৃ. ৩১; সহীহ বুখারী, ২খ, পৃ. ৬১২, টীকা নং ৪; ফাতহুল-বারী, ১২খ., পৃ. ১৬৩-১৬৪):
ইমাম আল-হাকেম (র) তাঁহার আল-ইকলীল গ্রন্থে উসামা (রা)-কে সেনাধ্যক্ষ উল্লেখপূর্বক আল-হুরাকাতে তাঁহার নেতৃত্বাধীন যুদ্ধাভিযান প্রসংগ স্বতন্ত্রভাবে উল্লেখ করিয়াছেন (শারহ আল-মাওয়াহিব, ২খ., পৃ. ২৫১)। হাফিজ ইব্ন কায়্যিম (র)-সহ আরও কিছু সংখ্যক সীরাতকার উপরিউক্ত ধারার অনুসরণ করিয়াছেন (যাদুল মা'আদ, ২খ., পৃ. ১৪৮; আসাহ্হুস সিয়ার, পৃ. ২১৭, ২১৮)।
হযরত উসামা (রা) সেনাধ্যক্ষ নিযুক্ত হইয়া থাকিলে এই যুদ্ধাভিযান অবশ্যই ৮ম হিজরীর জুমাদাল-উলা/৬২৯ খৃস্টাব্দের সেপ্টেম্বরে মৃতা অভিযানের পরে সংঘটিত হইয়াছিল। কারণ মৃতা অভিযানে শাহাদাত বরণকারী তাহার পিতা ও সেনাধ্যক্ষ হযরত যায়দ ইব্ন হারিছা (রা) জীবিত থাকিতে তিনি যে সেনাধ্যক্ষ নিযুক্ত হন নাই তাহা এক ঐতিহাসিক সত্য। এই কারণে ইমাম বুখারী (র) সময়ের ধারাবাহিকতায় মৃত। অভিযানের পরেই হযরত উসামা (রা)-এর অভিযানের অবস্থান নির্ধারণ করিয়াছেন (সহীহ বুখারী, ২খ., পৃ. ২, সূচীপত্র এবং পৃ. ৬১১ ও ৬১২ এবং ৪ নং টীকা, এবং পৃ. ৬৪১, ৬৪২; আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৪৩৫-৪৪০)।
আর যদি উসামা (রা) একজন সাধারণ সৈন্য হিসাবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিয়া থাকেন তাহা হইলে এই যুদ্ধাভিযান মৃতা যুদ্ধের পূর্বে সংঘটিত হইয়াছিল। ইহাতে কোন সমস্যাই থাকে না এবং এই ক্ষেত্রে সেনাধ্যক্ষ ছিলেন হযরত গালিব ইব্ন আব্দিল্লাহ। সীরাতকারদিগের অভিমত ইহাই (সহীহ বুখারী, ২খ., পৃ. ৬১২, ৪ নং টাকা; ফাতহুল বারী, ৭খ., পৃ. ৫১৮)।
মুসলিম বাহিনী এই যুদ্ধে বহু সংখ্যক উট ও বকরী গনীমত হিসাবে লাভ করে, অনেক কাফির মুশরিককে হত্যা করে, অন্য অনেককে বন্দী করিয়া মদীনা লাইয়া আসে। এক একজন মুজাহিদ ১০টি করিযা উট কিংবা প্রতিটি উটের পরিবর্তে ১০টি করিয়া বকরী গনীমত পাইয়াছিলেন (যাদুল মা'আদ, ২খ., পৃ. ১৪৮; সীরাত হালাবী, ৩খ., পৃ. ১৮৯)।
৮ম হিজরীর সাফার/৬২৯ খৃ. জুন হযরত গালিব ইব্ন আব্দিল্লাহ আল-লায়ছী (রা)-এর নেতৃত্বে দুই শত মুজাহিদের একটি বাহিনী 'ফাদাক' -এর 'বানু মুররা' এলাকায় একটি অভিযানে প্রেরিত হয় (তাবাকাত ইবন সা'দ, ২খ., পৃ. ১২৬; আল-মাওয়াহিব, ১খ., পৃ. ১৪৪; সীরাত আল-হালাবী ৩খ., পৃ. ১৮৬)। 'ফাদাক' হইল 'খায়বার'-এর পাশ্ববর্তী একটি কৃষিপ্রধান ইয়াহুদী বসতী, মদীনা মুনাওওয়ারা হইতে ইহার দূরত্ব দুই দিনের অথবা তিন দিনের পথ (মু'জামুল বুলদান, ৪খ., পৃ. ২৩৮; আল মুনজিদ ফিল আ'লামা, পৃ. ৫২০) মতান্তরে ছয় মাইল (সীরাত আল-হালাবী, ৩খ., পৃ. ১৮৬; শারহ আল-মাওয়াহিব, ২খ., পৃ. ২৫০; আল-ইসাবা, ৩খ., পৃ. ১৮৪)।
কোন কোন সূত্রে 'গালিব ইব্ন আব্দিল্লাহ' নামের পরিবর্তে 'আবদুল্লাহ ইব্ন গালিব, মতান্তরে গালিব ইবন 'উবায়দুল্লাহ, মতান্তরে 'গালিব ইব্ন ফুদালা' (রা) নাম পাওয়া যায় (সুনান আবী দাউদ, ভারতীয় সং ২খ., পৃ. ১৫: মুসনাদ আহমাদ, ৫খ., পৃ. ২০০, ২০৭; বাযলুল মাজহুদ, ১২খ., পৃ. ১৫২, ২১৪; আল-ইসতী'আব, ৩খ., পৃ. ১২৫২; আল-ইসাবা ৩খ., পৃ. ১৮৩, ১৮৪; জামিউল উসূল, ৩খ., পৃ. ২২১, পাদটীকা; তাফসীর কুরতুবী, ৫খ., পৃ. ৩৩৭; আল-কাশশাফ, ১খ., পৃ. ২৯১)। অবশ্য হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন গালিব আল-লায়ছী (রা) নামক একজন সাহাবীর নেতৃত্বে একটি বাহিনীকে রাসূলুল্লাহ (স) দ্বিতীয় হিজরীতে ফadাক অঞ্চলে প্রেরণ করিয়াছিলেন বলিয়া হযরত আবূ 'আমর (র) সূত্রে জানা যায় (আল-ইসাবা, ২খ., পৃ. ৩৫৭; উসদুল গাবা, ৩খ., পৃ. ২৪২; বাযলুল মাজহুদ, ১২ খ., পৃ. ২১৪; 'আওনুল মা'বুদ, ৭খ., পৃ. ৮৮৮)। ৭ম হিজরীর প্রারম্ভে 'ফাদাক' রাসূলুল্লাহ (স)-এর হস্তগত হওয়ার পূর্বে বা পরে কোন এক সময়ে হযরত গালিব ইব্ন ফুদালা আল-লায়ছী (রা) উক্ত অঞ্চলে এক সৈন্যবহর লইয়া অভিযান পরিচালনা করিয়াছেন বলিয়াও অন্য এক সূত্রে জানা যায় (আল-ইসাবা, ৩খ., পৃ. ১৮৪, আল-কাশশাফ, ১খ., পৃ. ২৭১; তাফসীর কাবীর, ১১খ., পৃ. ৩)।
এই অভিযানের কারণ ছিল এই যে, ছয় মাস পূর্বে অর্থাৎ ৭ম হিজরীর শা'বান মাসে হযরত বাশীর ইবন সা'দ (রা)-এব নেতৃত্বাধীন একদল সৈন্য বানু মুররা কর্তৃক মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হইয়াছিলেন (তারীখ তাবারী, ৩খ., পৃ. ১৯; আল-মাওয়াহিব, ১খ., পৃ. ১৪১; শারহ আল-মাওয়াহিব, ২খ., পৃ. ৫০)। তাহাদিগকে শায়েস্তা করিবার জন্য রাসূলুল্লাহ (স) প্রথমে
হযরত যুবায়র ইবনুল আওয়াম (রা)-কে অভিযানের জন্য প্রস্তুত করিয়া বলিয়াছিলেন, "যুবায়র! তুমি বানু মুররা এলাকায় পৌছিয়া বাশীরের বাহিনী আক্রান্ত হওয়ার প্রতিশোধ গ্রহণ কর। আল্লাহ তোমাদিগকে বিজয়ী করিলে তোমরা উহাদিগের মধ্যে অবস্থান করিবে না"। ইহা বলিয়া রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার হাতে যুদ্ধের পতাকাও তুলিয়া দিয়াছিলেন। কিন্তু এমন সময় হযরত গালিব ইব্ন আব্দিল্লাহ আল-লায়ছী (রা) আল-কাদীদ অভিযান [দ্র. গালিব ইব্ন আব্দিল্লাহ আল্-লায়ছী (রা)-এর আল-কাদীদ অভিযান] সমাপ্ত করিয়া বিজয়ী বেশে মদীনা মুনাওওয়ারায় ফিরিয়া আসিলে রাসূলুল্লাহ (স) হযরত যুবায়র (রা)-এর পরিবর্তে তাহাকে প্রেরণ করিলেন (সীরাত আল-হালাবী, ৩খ., পৃ. ১৮১: তাবাকাত ইবন সা'দ, ২খ., পৃ. ১২৬)।
কোন কোন সূত্রে জানা যায়, হযরত বাশীর (রা) ও তাঁহার বাহিনীর আক্রান্ত হওয়ার সংবাদ প্রাপ্তির পরপরই রাসূলুল্লাহ (স) হযরত গালিব (রা)-কে সসৈন্যে তথায় প্রেরণ করিয়াছিলেন। এই মতানুযায়ী উপরিউক্ত দুই অভিযানের মধ্যে সময়-কালের তেমন ব্যবধান থাকে না, বরং উভয় অভিযানই প্রায় অভিন্ন সময়ে অর্থাৎ ৭ম হিজরীর শাবান/৬২৮ খৃস্টাব্দের ডিসেম্বরে পরিচালিত হইয়াছিল (মাগাযী আল-ওয়াকিদী, ২খ., পৃ. ৭২৪; দালাইল আল-বায়হাকী, ২খ., পৃ. ২৯৫; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ২৫২; রাসূল মুহাম্মদ (স)-এর সরকার কাঠামো, পৃ. ৩৫২; আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৪২৯)।
হযরত গালিব ইব্ন আবদিল্লাহ (রা)-এর নেতৃত্বাধীন এই বাহিনীতে হযরত উব্বা ইব্ন 'আমর (রা), হযরত আবূ মাস'উদ আল-বাদরী (রা), হযরত কা'ব ইব্ন উজরা (রা) ও হযরত উসামা ইব্ন যায়দ (রা) প্রমুখ সাহাবা-ই কিরাম অন্তর্ভুক্ত ছিলেন (তাবাকাত ইবন সা'দ, ২খ., পৃ. ১২৬; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ২৫২, উয়ূনুল আছার ২খ., পৃ. ১৫২)।
তাঁহারা সন্ধ্যারাত্রিতে বানু মুররা এলাকার কাছাকাছি পৌছিয়া শিবির স্থাপন করিলেন এবং গুপ্তচর পাঠাইয়া উহাদের খবরাখবর লইলেন। সেনাধ্যক্ষ হযরত গালিব (রা) এই সময় তাঁহার সৈন্যবাহিনীরকে এক ভাষণে বলিলেন: "আমি তোমাদিগকে এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহকে ভয় করার এবং আমাকে অনুসরণের জন্য উপদেশ প্রদান করিতেছি। সাবধান! আমার নির্দেশ অমান্য করিবে না। মনে রাখিও, যাহার আনুগত্য করা হয় না তাহার কোন মূল্য থাকে না। রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, 'যে ব্যক্তি আমার সেনাধ্যক্ষের আনুগত্য করে সে আমারই আনুগত্য করে, আর যে ব্যক্তি তাঁহার অবাধ্য হয় সে আমারই অবাধ্য হয়।' তোমরা আমার অবাধ্য হইলে প্রকারান্তরে নবী করীম (স)-এর অবাধ্য হইবে।" ইহার পর তিনি দুই দুইজনকে জুটি করিয়া কাতার সাজাইয়া বলিলেন, এই জুটির একজন অপরজনকে কখনও বিচ্ছিন্ন হইতে দিবে না। আমি যদি জিজ্ঞাসা করি, অমুকের সাথী কোথায় সে যেন এই উত্তর না দেয়, আমি জানি না। আমি যখন তাকবীর বলিব, তোমরা সবাই একসংগে তাকবীর বলিবে এবং তরবারি কোষমুক্ত করিবে (তাবাকাত ইব্ন সা'দ, ২খ., পৃ. ১২৬; সীরাত আল-হালাবী, ৩খ., পৃ. ১৮১; আয়নুল-ইয়াকীন, পৃ. ১২৩)। প্রত্যুষে সকল সৈন্য একযোগে অকস্মাৎ শত্রুর উপর ঝাপাইয়া
পড়িল। যিনি যেখানে যাহাকে পাইলেন হত্যা করিলেন। এই যুদ্ধে মুসলিম স্যৈগণের সংকেত ছিল امت آمت মারিয়া ফেল, মারিয়া ফেল (তাবাকাত ইব্ন সা'দ, ২খ., পৃ. ১২৬; যাদুল মা'আদ, ২খ., পৃ. ১৪৮; সীরাত আল-হালাবী, ৩খ., পৃ. ১৮৯; উয়ূনুল আছার, ২খ., পৃ. ১৫২, নূরুল-ইয়াকীন, পৃ. ৩৩৮)।
এই মুররা গোত্রের হালীফ (মিত্র) ছিল 'জুহায়না' গোত্রের শাখা আল-হুরাকা উপ-গোত্র। আল-হুরাকা গোত্রের লোকজন সম্ভবত মিত্রতা সূত্রে বানু মুররা সংগে এই যুদ্ধে যোগ দিয়াছিল। অধিকাংশ সীরাত বিশারদের মতে, এই যুদ্ধে হযরত উসামা ইব্ন যায়দ (রা) আল-হুরাকা গোত্রীয় এক ব্যক্তিকে কলেমা পাঠ করিবার পরও হত্যা করিয়াছিলেন (আল-মাগাযী আল ওয়াকিদী, ২খ., পৃ. ৭২৪)।
অন্য একদল সীরাত বিশারদের মতে, হযরত উসামা ইব্ন যায়দ (রা) কর্তৃক আল-হুরাকা গোত্রীয় উক্ত ব্যক্তিকে হত্যার ঘটনা হযরত গালিব ইব্ন আবদুল্লাহ (রা)-এর 'আল-মায়ফাআ' নামক এক ভিন্ন অভিযানে ঘটিয়াছিল (তাবাকাত ইবন সা'দ, ২খ., পৃ. ১১৯; তারীখ তাবারী, ৩খ., পৃ. ৯৯)।
তৃতীয় একদল সীরাত বিশারদের মতে হযরত উসামা (রা) কর্তৃক উপরিউক্ত হত্যার ঘটনাটি হযরত গালিব (রা)-র নেতৃত্বাধীন 'আল-মায়ফাআ অভিযানে' বা বানু মুরারা অভিযানে সংঘটিত হয় নাই, বরং স্বয়ং হযরত উসামা ইব্ন যায়দ (রা)-এর নেতৃত্বে পরিচালিত আল-হুরাকা অভিযান নামক এক স্বতন্ত্র অভিযানে সংঘটিত হইয়াছিল (সহীহ বুখারী, ২খ., পৃ. ৬১২; আল-ইকলীল আল হাকিম, শারহ আল-মাওয়াহিব, ২খ., পৃ. ২৫১)।
হযরত উসামা (রা) বর্ণনা করিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স) আমাদিগকে জুহায়নার শাখা হুরাকা গোত্রের বিরুদ্ধে অভিযানে প্রেরণ করিলেন। আমরা অতি প্রত্যুষে উক্ত গোত্রকে আক্রমণ করিয়া পরাজিত করিলাম। আমি ও একজন আনসার ব্যক্তি এক ব্যক্তির পশ্চাদ্ধাবন করিলাম। আমরা যখন তাহাকে বাগে পাইয়া ঘিরিয়া ফেলিলাম তখন সে বলিয়া উঠিল, لا اله الا الله আমার সাথী আনসার ব্যক্তি তাহার মুখে 'কলেমা' শুনিয়া নিবৃত্ত হইলেন, কিন্তু আর্মি তাহাকে বল্লম দ্বারা আঘাত করিয়া হত্যা করিলাম। আমরা যুদ্ধক্ষেত্র হইতে ফিরিয়া আসিলে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট খবরটি পৌঁছিল। তিনি আমাকে ডাকিয়া বলিলেন, হে উসামা! তুমি কি তাহাকে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু বলিবার পরও হত্যা করিয়াছ? আমি বলিলাম, সে তো আত্মরক্ষার জন্য এই কলেমা বলিয়াছিল। রাসূলুল্লাহ (স) আবার বলিলেন, তুমি কি তাহাকে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু বলিবার পরও হত্যা করিয়াছ হে উসামা! এইভাবে রাসূলুল্লাহ (স) বারবার আমাকে উক্ত একই কথা বলিতে থকিলেন। শেষ পর্যন্ত আমার মনে এই আকাঙ্খার উদয় হইল, হায়! আমি যদি আজিকার দিনের পূর্বে ইসলাম গ্রহণ না করিতাম!
হযরত উসামা (রা) যাহাকে হত্যা করিয়াছিলেন তাহার নাম ছিল নাহীক ইন মিরদাস অথবা মিরদাস ইব্ন নাহীক আল-ফাযারী, মতান্তরে মিরদাস ইব্ন 'আমর আল-ফাদাকী
(ফাতহুল বারী, ১২খ., পৃ. ১৬৩; আল-ইসাবা, ৩খ., পৃ. ১৮৩)। এই নামের বংশীয় পরিচয় হিসাবে আল-গাতাফানী, আল-আসলামী, আদ-দামরী (الضمری) প্রভৃতি বিভিন্ন বিশেষণ উল্লিখিত হয় (শারহ আল-মাওয়াহিব, ২খ., পৃ. ২৫১; তাফসীর কুরতুবী, ৫খ., পৃ. ৩৩৭)।
হযরত উসামা (রা)-এর জুটির অন্য সদস্য বা তাঁহার সাথী আনসার ব্যক্তির নাম সম্পর্কে ইব্ন হাজার আসকালানী (র) মন্তব্য করিয়াছেন, কোন সূত্রেই তিনি তাঁহার নাম উদ্ধার করিতে পারেন নাই (ফাতহুল বারী, ১২খ., পৃ. ১৬৩; উমদাতুল কারী, ১৭খ., পৃ. ২৭২)। অবশ্য হাফিজ আল-কাস্স্তাল্পানী (র) বলিয়াছেন, তাঁহার নাম সম্ভবত হযরত আবূ দারদা (রা)। 'আবদুর রাহমান ইবন যায়দ (র)-এর সূত্রে ইহার সমর্থন পাওয়া যায় (শারহ আল-মাওয়াহিব, ২খ., পৃ. ২৫২)।
হয়রত উসামা (রা) উক্ত কলেমা উচ্চারণকারীকে হত্যা করিবার যে কারণ বলিয়াছেন তাহা অন্য একটি হাদীছে সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায়। হাদীছটি এইরূপঃ হযরত জুনদুব ইব্ন মাকীছ (রা) বর্ণনা করিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স) মুসলিমগণের একটি বাহিনী মুশরিকদিগের বিরুদ্ধে পাঠাইলেন। উভয় দল পরস্পর সম্মুখীন হইল। মুশরিক বাহিনীতে এক ব্যক্তি ছিল, সে যখনই কোন মুসলিমকে দেখিত তাঁহাকে লক্ষ্য করিয়া ঝাঁপাইয়া পড়িত এবং তাহাকে হত্যা করিত। একজন মুসলিম তাহার অসতর্ক মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করিতে লাগিলেন। বর্ণনাকারী হযরত জুনদুব (রা) বলিয়াছেন, তিনি হইলেন হযরত উসামা ইব্ন যায়দ (রা)। হযরত উসামা (রা) যখন তাহার উপর তলোয়ার উত্তোলন করিলেন তখন সে (উক্ত মুশরিক) বলিয়া উঠিল, لا اله الا الله তবুও তিনি তাহাকে হত্যা করিলেন। দূত যুদ্ধে জয়লাভের সংবাদ লইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর খেদমতে হাযির হইল। রাসুলুল্লাহ (স) তাহার নিকট যুদ্ধ পরিস্থিতি জানিতে চাহিলে তিনি সব ঘটনা খুলিয়া বলিলেন, এমনকি উসামা (রা) কর্তৃক হত্যার ঘটনাও। রাসূলুল্লাহ (স) উসামা (রা)-কে ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি তাহাকে কেন হত্যা করিয়াছ? উসামা (রা) বলিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! সে অনেক মুসলিম সৈন্যকে ঘায়েল করিয়াছে, অমুক অমুককে হত্যা করিয়াছে। সে যাঁহাকে যাঁহাকে হত্যা করিয়াছে তাঁহাদের নামও উসামা (রা) উল্লেখ করিলেন। আমি যখন তাহাকে আক্রমণ করিলাম এবং সে আমার তলোয়ার অবলোকন
করিল অমনি সে বলিয়া উঠিল, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তুমি কি তাহাকে একেবারে মারিয়া ফেলিলে? তিনি উত্তর দিলেন, হাঁ। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, কিয়ামত দিবসে যখন সে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ-সহ উপস্থিত হইবে তখন তুমি কি করিবে? রাসূলুল্লাহ (স) বারবার একই কথা বলিতেছিলেন (সহীহ মুসলিম, ১খ., পৃ. ৬৮)।
অন্য হাদীছে আছে, উসামা (রা)-কে রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছিলেন, "তুমি কেন তাহার অন্তর চিরিয়া দেখিলে না, সে সত্য বলিয়াছিল, না মিথ্যা বলিয়াছিল? তুমি কি তাহার অন্তর চিরিয়া দেখিয়াছ যে, সে তাহা অস্ত্রের ভয়ে বলিয়াছিল" (সহীহ মুসলিম, ১খ., পৃ. ৬৮; সুনান বায়হাকী, ৮খ., পৃ. ১৯২ ও পৃ. ১৯৬; মুসনাদ আহমাদ, ৫খ., ২০০, ২০৭: ৪খ., পৃ. ৪২৯)।
এই হাদীছের ব্যাখ্যায় ইমাম নববী (র) বলিয়াছেন, 'তুমি যেহেতু তাহার অন্তর চিরিয়া দেখিতে সমর্থ নহ সেহেতু তাহার মুখের কথাই তোমার বিশ্বাস করা উচিত ছিল' (শারহ মুসলিম লিন্নাবাবী, ১খ., পৃ. ৬৮, ৬৯)। ইমাম কুরতুবী (র) বলিয়াছেন, ইহাতে এই প্রমাণ রহিয়াছে যে, শরী'আতের হুকুম-আহকাম প্রয়োগে বাহ্যিক অবস্থার উপর নির্ভর করিতে হয়, অভ্যন্তরীণ অবস্থার উপর নহে (ফাতহুল বারী, ১২ খ., পৃ. ১৬৫)।
রাসূলুল্লাহ (স) এক পর্যায়ে হযরত উসামা (রা)-কে আরও বলিয়াছিলেন, তুমি আমাকে কথা দাও, ভবিষ্যতে তুমি এই ধরনের কোন ব্যক্তিকে হত্যা করিবে না। উসামা (রা) বলিয়াছিলেন, আল্লাহ আমাকে এই অংগীকারের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখুন যে, আমি ভবিষ্যতে এমন কাহাকেও হত্যা করিব না বা এমন কাহারও বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিব না যে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলিবে (আসাহ্হুস সিয়ার, প. ২১৭, ২১৮; যাদুল মা'আদ, ২খ., পৃ. ১৪৮ ও ১৪৯; তাবাকাত ইবন সা'দ, ২খ., পৃ. ১১৯; সীরাত হালাবী, ৩খ., পৃ. ১৮৮)।
এই কারণে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হযরত উসামা (রা) হযরত আলী (রা)-এর সহিত মুসলিম বিদ্রোহীদিগের বিরুদ্ধে কোন যুদ্ধেই অংশ গ্রহণ করেন নাই। তিনি হযরত আলী (রা)-কে তাহার অসম্মতির কথা জানাইয়া বিনীতভাবে বলিয়াছিলেন, হে আলী! আপনি যদি একটি গাধীর মুখে আপনার হাত ঢুকাইয়া দেন তাহা হইলে আমিও আমার হাত আপনার হাতের সহিত ঢুকাইয়া দিব। তবে আপনি তো জানেন, একজন কলেমা উচ্চারণকারীকে হত্যার পর রাসূলুল্লাহ আমাকে কি বলিয়াছিলেন! হযরত উসামা (রা)-এর মত হযরত সা'দ ইব্ন আবী ওয়াক্কাস (রা)-ও মুসলিমগণের কোন গৃহযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন নাই। একজন খারিজী তাঁহাকে প্রশ্ন করিয়াছিল, আল্লাহ কি ফিতনা দূরীভূত না হওয়া পর্যন্ত লড়াই অব্যাহত রাখিতে বলেন নাই? সা'দ (রা) বলিয়াছিলেন, 'আমরা তো কাফিরদিগের বিরুদ্ধে এইজন্য লড়াই করিয়াছি যাহাতে ফিতনা দূরীভূত হয়। আর তুমি ও তোমার সংগী খারিজীগণ তো এইজন্য লড়াই করিতেছ যাহাতে ফিতনা সৃষ্টি হয়' (সহীহ মুসলিম, ১খ., পৃ. ৬৮, ৬৯; সীরাত হালাবী, ৩খ., পৃ. ১৮৮; সুনান আল-বায়হাকী, ৮খ., পৃ. ১৯, ১৯২ ও ১৯৬; সীরাত ইব্ন হিশাম, ৪খ., পৃ. ২০০-২০১)।
হযরত উসামা (রা)-এর এই অভিযানে অসতর্ক হত্যা প্রসংগে কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল হইয়াছে বলিয়া বিভিন্ন তাফসীর গ্রন্থে বর্ণিত আছে: يُأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا ضَرَبْتُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَتَبَيِّنُوا وَلَا تَقُولُوا لِمَنْ الْقَى إِلَيْكُمُ السَّلمَ لَسْتَ مُؤْمِنًا تَبْتَغُوْنَ عَرَضَ الْحَيَوةِ الدُّنْيَا فَعِنْدَ اللَّهِ مَغَانِمُ كَثِيرَةٌ.
"হে মুমিনগণ! তোমরা যখন আল্লাহর পথে যাত্রা করিবে তখন পরীক্ষা করিয়া লইবে এবং কেহ তোমাদিগকে সালাম করিলে ইহ জীবনের সম্পদের আকাঙ্ক্ষায় তাহাকে বলিও না, তুমি মুমিন নহ। কারণ আল্লাহ্র নিকট অনায়াসলভ্য সম্পদ প্রচুর রহিয়াছে" (৪: ৯৪; তাফসীর কুরতুবী, ৫খ., পৃ. ৩৩৭; তাফসীর কাবীর, ১খ., পৃ. ৩)।
মুফাসসিরগণ বলিয়াছেন, মিরদাস ইব্ন নাহীক নামক এক ব্যক্তি ফাদাক অঞ্চলের বাসিন্দা ছিল। সে ইসলাম গ্রহণ করিল, কিন্তু তাহার গোত্রের অন্য কেহ ইসলাম গ্রহণ করিল না। এমতাবস্থায় উহাদের নিকট রাসূলুল্লাহ (স) একটি অভিযান প্রেরণ করিলেন হযরত গালিব আল-লায়ছী (রা)-এর নেতৃত্বে। মুসলিম বাহিনী উহাদের নিকট পৌছিলে উহারা ভয়ে পালাইয়া গেল। কিন্তু মিরদাস ইসলাম গ্রহণের কারণে না পালাইয়া রহিয়া গেল। যখন সে মুসলিমগণের অশ্বারোহীদল দেখিতে পাইল সে তখন তাহার বকরীসমূহ পাহাড়ের আড়ালে রাখিয়া পাহাড়ের উপরে আরোহণ করিল। মুসলিম বাহিনী তাকবীর ধ্বনি করিয়া যুদ্ধ শুরু করিলে সেও তাকবীর ধ্বনি করিল এবং মুসলিম বহিনীর নিকট নামিয়া আসিয়া বলিল: لا إِلهَ إِلَّا اللَّهُ مُحَمَّدٌ رَّسُولُ اللَّهِ السَّلَامُ عَلَيْكُمْ.
কিন্তু হযরত উসামা (রা) তাহাকে হত্যা করিলেন এবং তাহার বকরীসমূহ হাঁকাইয়া লইয়া আসিলেন। তাহারা ঘটনাটি রাসূলুল্লাহ (স)-এর গোচরীভূত করিলে তিনি খুবই মর্মাহত হইলেন এবং হযরত উসামা (রা)-কে তিরস্কার করিলেন। হযরত উসামা (রা)-কে রাসূলুল্লাহ (স) উক্ত আয়াতটি শুনাইলেন। হযরত উসামা (রা) বলিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে একটি দাসমুক্তির উপদেশ দিলেন (তাফসীর কাশশাফ, ১খ., পৃ. ২৭১)।
উপরিউক্ত আয়াতের শানে নুযূল হিসাবে ঘটনাটি ছাড়াও ইহার প্রায় অনুরূপ একাধিক ঘটনার উল্লেখ করা হয়। কোন কোন বর্ণনায় দেখা যায়, হত্যাকারী হযরত মুহাল্লিম ইব্ জাছছামা এবং নিহত ব্যক্তি আমের ইবনুল আদবাত আল-আশজা'ঈ ছিলেন। অন্যান্য বর্ণনায় দেখা যায়, হত্যাকারী হযরত মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদ (রা), মতান্তরে আবু কাতাদা, মতান্তরে হযরত আবুদ দারদা (রা) এবং নিহত ব্যক্তির নাম জানা যায় নাই। হযরত আবদুল্লাহ ইব্ন আব্বাস (রা) সূত্রে বর্ণিত আছে, এক ব্যক্তি তাহার বকরী চরাইতেছিল, এমতাবস্থায় তাহার সহিত একদল মুসলিমের সাক্ষাত ঘটিল। সে তাহাদিগকে বলিল, আসসালামু আলায়কুম। কিন্তু তাহারা তাহাকে হত্যা করিল এবং তাহার বকরীসমূহ হাঁকাইয়া লইয়া আসিল। তাহাদের প্রসংগে উক্ত আয়াত অবতীর্ণ হয় (সহীহ বুখারী, ২খ., পৃ. ৬৬০)।
অন্য বর্ণনায় আছে, সালিম গোত্রের এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (স)-এর একদল সাহাবীর পাশ দিয়া তাহার বকরীর পাল চরাইতে চরাইতে পথ অতিক্রম করিতেছিল। সে তাহাদিগকে সালামও দিয়াছিল, কিন্তু তাঁহারা বলাবলি করিতে লাগিলেন, আমাদের হাত হইতে আত্মরক্ষা করিবার জন্যই সে আমাদিগকে সালাম দিয়াছে। ফলে তাঁহারা তাহার উপর ঝাঁপাইয়া পড়িলেন এবং তাহাকে হত্যা করিলেন। তাঁহারা তাহার বকরীর পাল লইয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট উপনীত হইলেন। এই প্রসংগে উক্ত আয়াত অবতীর্ণ হয় (ফাতুহল কাদীর, ১খ., পৃ. ৫০২; তাফসীর তাবারী, ৪খ., পৃ. ১৩৯-১৪৩)।
ইমাম কুরতুবী (র) মন্তব্য করিয়াছেন, সম্ভবত উপরিউক্ত ভিন্ন ভিন্ন ঘটনাসমূহ মোটামুটি কাছাকাছি সময়ে সংঘটিত হইয়াছিল। ফলে উক্ত সকল ঘটনা সম্পর্কেই উক্ত আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। এই মতানুযায়ী শানে নুযূলগুলির মধ্যে বৈপরীত্য থাকে না (তাফসীর কুরতুবী, ৫খ., পৃ. ৩৩৭; তাফসীর কারীর, ১১খ., পৃ. ৩০)।
মাগাযী সম্পর্কিত হাদীছসমূহের বর্ণনা প্রসংগে ইমাম বুখারী (র) সুস্পষ্ট ইংগিত দিয়াছেন যে, এই সারিয়্যা বা যুদ্ধাভিযানের সেনাধ্যক্ষ ছিলেন হযরত উসামা ইবন যায়দ (রা)। তিনি তাঁহার মতের স্বপক্ষে একাধিক হাদীছও উল্লেখ করিয়াছেন। তিনি এই যুদ্ধাভিযানের শিরোনাম দিয়াছেন:
باب بعث النبي اسامة بن زيد الى الحرقات من جهينة.
"জুহায়নার আল-হুরকা গোত্রের বিরুদ্ধে হযরত উসামা ইন্ন যায়দ (রা) কে প্রেরণের অনুচ্ছেদ” (সহীহ বুখারী, কিতাবুল মাগাযী, ২খ., পৃ. ৬১২)।
ইমাম বুখারী (র) কর্তৃক উক্তরূপ শিরোনামে অনুচ্ছেদ রচনার প্রেক্ষিতে শায়খ আদ্-দাউদীসহ কেহ কেহ প্রশ্ন তুলিয়াছেন, অপ্রাপ্তবয়স্ক হযরত উসামা (রা) সেনাধ্যক্ষ নিযুক্ত হইলেন কিভাবে? ইহার উত্তর দুইভাবে প্রদান করা হয়। প্রথমত, হযরত উসামা (রা) যে সেনাধ্যক্ষ ছিলেন ইহার আভাষ আছে মাত্র এইখানে, ইহার দ্ব্যর্থহীন উল্লেখ এইখানে নাই। হইতে পারে হযরত উসামা (রা) ঘটনার মূল নায়ক ছিলেন বলিয়া সরাসরি তাঁহার নামেই ইমাম বুখারী (র) অনুচ্ছেদ রচনা করিয়াছেন (সহীহ বুখারী, ২খ., পৃ. ৬১২; টীকা নং ৪; ফাতহুল-বারী, ১২খ., পৃ. ১৬৩-১৬৪; উমদাতুল কারী ১৭খ., পৃ. ২৭২)। দ্বিতীয়ত, হযরত উসামা ইন্ন যায়দ (রা) তখন অপ্রাপ্তবয়স্ক ছিলেন না, তিনি ছিলেন পূর্ণবয়স্ক। রাসূলুল্লাহ (স)-এর ইনতিকালের সময় তাহার বয়স ছিল কমপক্ষে ১৮, মতান্তরে ১৯ বা ২০ বৎসর। এই যুদ্ধাভিযান ৮ম হিজরীতে সংঘটিত হইয়া থাকিলে তখন হযরত উসামা (রা)-এর বয়স ছিল অন্যূন ১৫, ১৬ কিংবা ১৭ বৎসর। সুতরাং উক্ত বয়সের একজন যুবকের জন্য রাসূলুল্লাহ (স) কর্তৃক সেনাধ্যক্ষ পদে নিযুক্তি লাভ করা অস্বাভাবিক নয়। তিনি একান্তভাবে রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রিয়পাত্র ছিলেন (আল-ইসতী'আব, ১খ., পৃ. ৭৫-৭৮; উসদুল গাবা, ১খ., পৃ. ৬৪-৬৬; ৬৪-৬৬; আল-ইসাবা, ১খ, পৃ. ৩১; সহীহ বুখারী, ২খ, পৃ. ৬১২, টীকা নং ৪; ফাতহুল-বারী, ১২খ., পৃ. ১৬৩-১৬৪):
ইমাম বুখারী (র)-এর অনুসরণে ইমাম আল-হাকেম (র) তাঁহার আল-ইকলীল গ্রন্থে উসামা (রা)-কে সেনাধ্যক্ষ উল্লেখপূর্বক আল-হুরাকাতে তাঁহার নেতৃত্বাধীন যুদ্ধাভিযান প্রসংগ স্বতন্ত্রভাবে উল্লেখ করিয়াছেন (শারহ আল-মাওয়াহিব, ২খ., পৃ. ২৫১)। হাফিজ ইব্ন কায়্যিম (র)-সহ আরও কিছু সংখ্যক সীরাতকার উপরিউক্ত ধারার অনুসরণ করিয়াছেন (যাদুল মা'আদ, ২খ., পৃ. ১৪৮; আসাহ্হুস সিয়ার, পৃ. ২১৭, ২১৮)।
হযরত উসামা (রা) সেনাধ্যক্ষ নিযুক্ত হইয়া থাকিলে এই যুদ্ধাভিযান অবশ্যই ৮ম হিজরীর জুমাদাল-উলা/৬২৯ খৃস্টাব্দের সেপ্টেম্বরে মৃতা অভিযানের পরে সংঘটিত হইয়াছিল। কারণ মৃতা অভিযানে শাহাদাত বরণকারী তাহার পিতা ও সেনাধ্যক্ষ হযরত যায়দ ইব্ন হারিছা (রা) জীবিত থাকিতে তিনি যে সেনাধ্যক্ষ নিযুক্ত হন নাই তাহা এক ঐতিহাসিক সত্য। এই কারণে ইমাম বুখারী (র) সময়ের ধারাবাহিকতায় মৃত। অভিযানের পরেই হযরত উসামা (রা)-এর অভিযানের অবস্থান নির্ধারণ করিয়াছেন (সহীহ বুখারী, ২খ., পৃ. ২, সূচীপত্র এবং পৃ. ৬১১ ও ৬১২ এবং ৪ নং টীকা, এবং পৃ. ৬৪১, ৬৪২; আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৪৩৫-৪৪০)।
আর যদি উসামা (রা) একজন সাধারণ সৈন্য হিসাবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিয়া থাকেন তাহা হইলে এই যুদ্ধাভিযান মৃতা যুদ্ধের পূর্বে সংঘটিত হইয়াছিল। ইহাতে কোন সমস্যাই থাকে না এবং এই ক্ষেত্রে সেনাধ্যক্ষ ছিলেন হযরত গালিব ইব্ন আব্দিল্লাহ। সীরাতকারদিগের অভিমত ইহাই (সহীহ বুখারী, ২খ., পৃ. ৬১২, ৪ নং টাকা; ফাতহুল বারী, ৭খ., পৃ. ৫১৮)।
মুসলিম বাহিনী এই যুদ্ধে বহু সংখ্যক উট ও বকরী গনীমত হিসাবে লাভ করে, অনেক কাফির মুশরিককে হত্যা করে, অন্য অনেককে বন্দী করিয়া মদীনা লাইয়া আসে। এক একজন মুজাহিদ ১০টি করিযা উট কিংবা প্রতিটি উটের পরিবর্তে ১০টি করিয়া বকরী গনীমত পাইয়াছিলেন (যাদুল মা'আদ, ২খ., পৃ. ১৪৮; সীরাত হালাবী, ৩খ., পৃ. ১৮৯)।