📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সারিয়‍্যা 'উমার ইবনুল খাত্তাব (রা)

📄 সারিয়‍্যা 'উমার ইবনুল খাত্তাব (রা)


৭ম হিজরী সনের শা'বান মাসে রাসূলুল্লাহ (স) হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রা)-কে হাওয়াযিন গোত্রের উদ্দেশ্যে "তুরবা” নামক স্থানের দিকে প্রেরণ করেন। এলাকাটি ছিল সান'আ' এবং নাজরানের পথে হযরত 'উমার (রা) ত্রিশজন সাহাবী সঙ্গে লইয়া রওয়ানা হইলেন। ইহাতে প্রধানত তাঁহারা তীর-ধনুক বহন করেন। ইহা ছাড়াও সাথে নেওয়া হয় হিলাল গোত্রের প্রাজ্ঞ পথ-প্রদর্শক। পথিমধ্যে সকলেই রাত্রে ভ্রমণ করিতেন এবং দিনে বিশ্রাম নিতেন। এমনিভাবে তাহারা হাওয়াযিন গোত্রের সীমানায় পদার্পণ করিলেন এবং দেখিলেন যে, অনেকেই পালাইয়া গিয়াছে। এমনকি তাহারা ব্যবহার্য বহু পণ্যও সাথে নিয়া গিয়াছিল। হযরত 'উমার (রা) ও তাঁহাব দলবল তাহাদিগকে না পাইয়া ও তাহাদের কোন নিদর্শন না দেখিয়া মদীনার দিকে রওয়ানা হন। ইহাতে উল্লেখযোগ্য কোন আক্রমণ বা সংঘর্ষ হয় নাই (আল-হাসান ইব্‌ন উমর ইবন হাবীব, আল-মুকতাফা মিন সীরাতিল মুসতাফা, ১খ., পৃ. ১৮২)।
এই প্রসঙ্গে আল-ওয়াকিদী হইতে ধারাবাহিক সূত্রে ইমাম বায়হাকী (র) একটি হাদীছ উল্লেখ করিয়াছেন: রাসূলুল্লাহ (স) ত্রিশজন অশ্বারোহী সৈন্যসহ হযরত 'উমার ইবনুল খাত্তাব (রা)-কে তুরবা-এর দিকে প্রেরণ করেন। তাঁহার সাথে হিলাল গোত্রের একজন পথপ্রদর্শক ছিলেন। তাঁহারা রাত্রে পথ চলিতেন আর দিনে বিশ্রাম নিতেন। যখন শত্রুভূমিতে তাঁহারা আগমন করিলেন, তখন শত্রুরা টের পাইয়া দ্রুত পালাইয়া যায়। হযরত 'উমার (রা) অতঃপর মদীনা অভিমুখে রওয়ানা হন। তখন তাঁহাকে বলা হয়, আপনি কি "খাছ'আম-এর প্রতি আক্রমণ করিতে চান না? তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে শুধু হাওয়াযিন গোত্রের সহিত যুদ্ধ করার জন্য পাঠাইয়াছেন, খাছ'আম গোত্রের সথে যুদ্ধ করিতে বলা হয় নাই। শুধু হাওয়াযিনদের অঞ্চলেই এই অভিযান সীমিত (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ২২১)।

৭ম হিজরী সনের শা'বান মাসে রাসূলুল্লাহ (স) হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রা)-কে হাওয়াযিন গোত্রের উদ্দেশ্যে "তুরবা” নামক স্থানের দিকে প্রেরণ করেন। এলাকাটি ছিল সান'আ' এবং নাজরানের পথে হযরত 'উমার (রা) ত্রিশজন সাহাবী সঙ্গে লইয়া রওয়ানা হইলেন। ইহাতে প্রধানত তাঁহারা তীর-ধনুক বহন করেন। ইহা ছাড়াও সাথে নেওয়া হয় হিলাল গোত্রের প্রাজ্ঞ পথ-প্রদর্শক। পথিমধ্যে সকলেই রাত্রে ভ্রমণ করিতেন এবং দিনে বিশ্রাম নিতেন। এমনিভাবে তাহারা হাওয়াযিন গোত্রের সীমানায় পদার্পণ করিলেন এবং দেখিলেন যে, অনেকেই পালাইয়া গিয়াছে। এমনকি তাহারা ব্যবহার্য বহু পণ্যও সাথে নিয়া গিয়াছিল। হযরত 'উমার (রা) ও তাঁহাব দলবল তাহাদিগকে না পাইয়া ও তাহাদের কোন নিদর্শন না দেখিয়া মদীনার দিকে রওয়ানা হন। ইহাতে উল্লেখযোগ্য কোন আক্রমণ বা সংঘর্ষ হয় নাই (আল-হাসান ইব্‌ন উমর ইবন হাবীব, আল-মুকতাফা মিন সীরাতিল মুসতাফা, ১খ., পৃ. ১৮২)।
এই প্রসঙ্গে আল-ওয়াকিদী হইতে ধারাবাহিক সূত্রে ইমাম বায়হাকী (র) একটি হাদীছ উল্লেখ করিয়াছেন: রাসূলুল্লাহ (স) ত্রিশজন অশ্বারোহী সৈন্যসহ হযরত 'উমার ইবনুল খাত্তাব (রা)-কে তুরবা-এর দিকে প্রেরণ করেন। তাঁহার সাথে হিলাল গোত্রের একজন পথপ্রদর্শক ছিলেন। তাঁহারা রাত্রে পথ চলিতেন আর দিনে বিশ্রাম নিতেন। যখন শত্রুভূমিতে তাঁহারা আগমন করিলেন, তখন শত্রুরা টের পাইয়া দ্রুত পালাইয়া যায়। হযরত 'উমার (রা) অতঃপর মদীনা অভিমুখে রওয়ানা হন। তখন তাঁহাকে বলা হয়, আপনি কি "খাছ'আম-এর প্রতি আক্রমণ করিতে চান না? তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে শুধু হাওয়াযিন গোত্রের সহিত যুদ্ধ করার জন্য পাঠাইয়াছেন, খাছ'আম গোত্রের সথে যুদ্ধ করিতে বলা হয় নাই। শুধু হাওয়াযিনদের অঞ্চলেই এই অভিযান সীমিত (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ২২১)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সারিয়‍্যা মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা)

📄 সারিয়‍্যা মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা)


রাসূলুল্লাহ (স) ষষ্ঠ হিজরী সনের ১০ মুহাররম হযরত মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা আনসারী আল্হালী (রা)-এর অধীনে ত্রিশজন অশ্বারোহীর একটি সৈন্যদল 'কুরতা' নামক স্থানে প্রেরণ করেন (কুরতা বনূ বাক্স গোত্রের একটি শাখা। বসরা হইতে মক্কা গমনের পথে অবস্থিত দারিবা (ضرية) অঞ্চলে ছিল তাহাদের বসতি। মদীনা হইতে এই স্থানটির দূরত্ব ছিল ৭ (সাত) দিনের (যুরকানী, শারহুল মাওয়াহিব, ২খ., পৃ. ১৪৩)। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদিগকে রাত্রিতে ভ্রমণ এবং দিবসে আত্মগোপন করিয়া থাকার নির্দেশ দিলেন। নির্দেশমত মুসলিম সৈন্যদলটি সেই অঞ্চলে পৌঁছিয়া কুরতার লোকদিগের উপর আক্রমণ চালাইল (ইবন সা'দ, তাবাকাত, উর্দু, ১খ., পৃ. ৩৮৭)। ঐতিহাসিক ওয়াকিদীর মতে এই অভিযানে কাফির পক্ষের মোট দশজন লোক নিহত হইল এবং অবশিষ্টগণ পালাইয়া গেল। এই যুদ্ধে দেড় শত (১৫০টি) উষ্ট্র এবং তিন সহস্র বকরী যুদ্ধলব্ধ মাল হিসাবে মুসলমানগুণের হস্তগত হইল। অভিযান সমাপ্তির পর যুদ্ধলব্ধ সমুদয় মাল লইয়া মুসলিম মুজাহিদগণ মদীনায় রওয়ানা হইলেন। দীর্ঘ ঊনিশ দিনের পথ পরিক্রমার পর উনত্রিশ মুহাররম তাহারা মদীনায় প্রত্যাগমন করেন। তখন রাসূলুল্লাহ (স) যুদ্ধলব্ধ সমুদয় মালের এক-পঞ্চমাংশ বায়তুল মালের জন্য রাখিয়া অবশিষ্ট মাল মুজাহিদগণের মাঝে বণ্টন করিয়া দেন। তিনি একটি উষ্ট্রকে দশটি বকরীর সমতুল্য গণ্য করিয়াছিলেন (ইদরীস কান্ধলবী, সীরাতুল মুস্তাফা, ২খ., পৃ. ৩৩৭)। ফিরার পথে হযরত ইবন মাসলামা ইয়ামামার বনূ হানীফা গোত্রের ছুমামা ইব্‌ন উছাল নামীয় এক ব্যক্তিকে পথিমধ্যে গ্রেফতার করিয়া মদীনায় লইয়া আসেন। রাসূলের সংশ্রবে আসিয়া ছুমামা ইব্‌ন উছাল মাত্র তিন দিনে তাঁহার একনিষ্ঠ অনুচরে পরিণত হইয়াছিলেন (যুরকানী, শারহুল মাওয়াহিব, ২য় খণ্ড, পৃ. ১৪৪)।

রাসূলুল্লাহ (স) ষষ্ঠ হিজরী সনের ১০ মুহাররম হযরত মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা আনসারী আল্হালী (রা)-এর অধীনে ত্রিশজন অশ্বারোহীর একটি সৈন্যদল 'কুরতা' নামক স্থানে প্রেরণ করেন (কুরতা বনূ বাক্স গোত্রের একটি শাখা। বসরা হইতে মক্কা গমনের পথে অবস্থিত দারিবা (ضرية) অঞ্চলে ছিল তাহাদের বসতি। মদীনা হইতে এই স্থানটির দূরত্ব ছিল ৭ (সাত) দিনের (যুরকানী, শারহুল মাওয়াহিব, ২খ., পৃ. ১৪৩)। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদিগকে রাত্রিতে ভ্রমণ এবং দিবসে আত্মগোপন করিয়া থাকার নির্দেশ দিলেন। নির্দেশমত মুসলিম সৈন্যদলটি সেই অঞ্চলে পৌঁছিয়া কুরতার লোকদিগের উপর আক্রমণ চালাইল (ইবন সা'দ, তাবাকাত, উর্দু, ১খ., পৃ. ৩৮৭)। ঐতিহাসিক ওয়াকিদীর মতে এই অভিযানে কাফির পক্ষের মোট দশজন লোক নিহত হইল এবং অবশিষ্টগণ পালাইয়া গেল। এই যুদ্ধে দেড় শত (১৫০টি) উষ্ট্র এবং তিন সহস্র বকরী যুদ্ধলব্ধ মাল হিসাবে মুসলমানগুণের হস্তগত হইল। অভিযান সমাপ্তির পর যুদ্ধলব্ধ সমুদয় মাল লইয়া মুসলিম মুজাহিদগণ মদীনায় রওয়ানা হইলেন। দীর্ঘ ঊনিশ দিনের পথ পরিক্রমার পর উনত্রিশ মুহাররম তাহারা মদীনায় প্রত্যাগমন করেন। তখন রাসূলুল্লাহ (স) যুদ্ধলব্ধ সমুদয় মালের এক-পঞ্চমাংশ বায়তুল মালের জন্য রাখিয়া অবশিষ্ট মাল মুজাহিদগণের মাঝে বণ্টন করিয়া দেন। তিনি একটি উষ্ট্রকে দশটি বকরীর সমতুল্য গণ্য করিয়াছিলেন (ইদরীস কান্ধলবী, সীরাতুল মুস্তাফা, ২খ., পৃ. ৩৩৭)। ফিরার পথে হযরত ইবন মাসলামা ইয়ামামার বনূ হানীফা গোত্রের ছুমামা ইব্‌ন উছাল নামীয় এক ব্যক্তিকে পথিমধ্যে গ্রেফতার করিয়া মদীনায় লইয়া আসেন। রাসূলের সংশ্রবে আসিয়া ছুমামা ইব্‌ন উছাল মাত্র তিন দিনে তাঁহার একনিষ্ঠ অনুচরে পরিণত হইয়াছিলেন (যুরকানী, শারহুল মাওয়াহিব, ২য় খণ্ড, পৃ. ১৪৪)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সারিয়‍্যা যুল-কাসসা

📄 সারিয়‍্যা যুল-কাসসা


ষষ্ঠ হিজরী সনের রবী'উল আওওয়াল মাসে রাসূলুল্লাহ (স) হযরত মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা)-কে দশজন মুসলিম মুজাহিদের একটি ক্ষুদ্র দলের সেনাপতি করিয়া যুল-কাস্সা নামক স্থানে প্রেরণ করেন। উদ্দেশ্য সেই অঞ্চলের অধিবাসী বনূ ছা'লাবা ও বনু 'উওয়াল (بنو عوال)-কে শায়েস্তা করা। উল্লেখ্য যে, যুল-কাস্সা (ذوا القصه) ছিল মদীনা হইতে ২০ (বিশ) মাইল দূরত্বে অবস্থিত একটি স্থানের নাম (যুরকানী, শারহুল মাওয়াহিব, ২খ., পৃ. ১৫৪)।
মুসলিম মুজাহিদগণ যখন তথায় পৌঁছেন, তখন সেই এলাকা ছিল জনশূন্য। ততক্ষণে তাহারা (অর্থাৎ কাফিরগণ) আগাম মুসলমানগণের অভিযানের বিষয়ে জানিতে পারিয়া আত্মগোপন করিয়া রহিল। শত্রু পক্ষের কোন লোকজন না দেখিয়া রাত্রিবেলা বিশ্রামের জন্য যখন মুসলমানগণ শয়ন করিলেন, ঠিক তখনই কাফিরগণ তাহাদের উপর অতর্কিত হামলা চালাইল। তাহারা হযরত মুহাম্মদ ইবন মাসলামার সঙ্গীগণের সকলকেই শহীদ করিল এবং তাহাদিগকে উলঙ্গ করিয়া তাহাদের পরিধেয় বস্ত্রাদিসহ সমুদয় মালামাল লুট করিয়া লইয়া গেল। পায়ের গিরায় গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত হইয়া ইবন মাসলামা সংজ্ঞাহীন অবস্থায় পড়িয়া রহিলেন। কাফিরগণ তাহাকে মৃত ভাবিয়া সেই অবস্থায়ই ফেলিয়া চলিয়া গেল। এক মুসলিম পথিক মুসলিম মুজাহিদগণের এই নির্মম পরিণতি দেখিয়া চিৎকার করিয়া ইন্নালিল্লাহ্ বলিয়া উঠিলেন। আওয়াজ শুনিয়া হযরত মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা) নড়িয়া উঠিলেন। কিন্তু পায়ের গিরার আঘাতের কারণে তিনি উঠিয়া দাঁড়াইতে পারিলেন না। পথিক তখন তাঁহাকে আপন পৃষ্ঠে উঠাইয়া লইলেন এবং তাঁহাকে লইয়া মদীনায় আসিলেন (আসাহ্হুস্ সিয়ার, পৃ. ১৫৯)।
যুরকানীর বর্ণনা অনুসারে এই যুদ্ধে কাফির পক্ষের এক শত সশস্ত্র ব্যক্তি প্রথমে মুসলমানগণের ঘুমন্ত এই ক্ষুদ্র দলটিকে ঘিরিয়া ফেলে এবং তাঁহাদের প্রতি তীর নিক্ষেপ করিতে থাকে। অতঃপর মুসলমানগণ জাগ্রত হইয়া পাল্টা আক্রমণ করেন। অতঃপর বর্শা-বল্লম লইয়া বেদুঈন কাফিরগণ মুসলমানদিগের উপর আক্রমণ করিল। ইহাতে মুসলমানগণের মধ্য হইতে তিনজন শহীদ হইলেন। তখন মুসলমানগণ ইবন মাসলামার নিকট জড় হইলেন এবং একযোগে কাফিরগণের উপর আক্রমণ চালাইলেন। ইহাতে কাফির পক্ষের এক ব্যক্তি নিহত হইল। অতঃপর কাফিরগণ পাল্টা আক্রমণ করিয়া ইবন মাসলামা ব্যতীত বাকী সকলকেই শহীদ করিল (শারহুল মাওয়াহিব, ২খ., পৃ. ১৫৪)।

ষষ্ঠ হিজরী সনের রবী'উল আওওয়াল মাসে রাসূলুল্লাহ (স) হযরত মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা)-কে দশজন মুসলিম মুজাহিদের একটি ক্ষুদ্র দলের সেনাপতি করিয়া যুল-কাস্সা নামক স্থানে প্রেরণ করেন। উদ্দেশ্য সেই অঞ্চলের অধিবাসী বনূ ছা'লাবা ও বনু 'উওয়াল (بنو عوال)-কে শায়েস্তা করা। উল্লেখ্য যে, যুল-কাস্সা (ذوا القصه) ছিল মদীনা হইতে ২০ (বিশ) মাইল দূরত্বে অবস্থিত একটি স্থানের নাম (যুরকানী, শারহুল মাওয়াহিব, ২খ., পৃ. ১৫৪)।
মুসলিম মুজাহিদগণ যখন তথায় পৌঁছেন, তখন সেই এলাকা ছিল জনশূন্য। ততক্ষণে তাহারা (অর্থাৎ কাফিরগণ) আগাম মুসলমানগণের অভিযানের বিষয়ে জানিতে পারিয়া আত্মগোপন করিয়া রহিল। শত্রু পক্ষের কোন লোকজন না দেখিয়া রাত্রিবেলা বিশ্রামের জন্য যখন মুসলমানগণ শয়ন করিলেন, ঠিক তখনই কাফিরগণ তাহাদের উপর অতর্কিত হামলা চালাইল। তাহারা হযরত মুহাম্মদ ইবন মাসলামার সঙ্গীগণের সকলকেই শহীদ করিল এবং তাহাদিগকে উলঙ্গ করিয়া তাহাদের পরিধেয় বস্ত্রাদিসহ সমুদয় মালামাল লুট করিয়া লইয়া গেল। পায়ের গিরায় গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত হইয়া ইবন মাসলামা সংজ্ঞাহীন অবস্থায় পড়িয়া রহিলেন। কাফিরগণ তাহাকে মৃত ভাবিয়া সেই অবস্থায়ই ফেলিয়া চলিয়া গেল। এক মুসলিম পথিক মুসলিম মুজাহিদগণের এই নির্মম পরিণতি দেখিয়া চিৎকার করিয়া ইন্নালিল্লাহ্ বলিয়া উঠিলেন। আওয়াজ শুনিয়া হযরত মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা) নড়িয়া উঠিলেন। কিন্তু পায়ের গিরার আঘাতের কারণে তিনি উঠিয়া দাঁড়াইতে পারিলেন না। পথিক তখন তাঁহাকে আপন পৃষ্ঠে উঠাইয়া লইলেন এবং তাঁহাকে লইয়া মদীনায় আসিলেন (আসাহ্হুস্ সিয়ার, পৃ. ১৫৯)।
যুরকানীর বর্ণনা অনুসারে এই যুদ্ধে কাফির পক্ষের এক শত সশস্ত্র ব্যক্তি প্রথমে মুসলমানগণের ঘুমন্ত এই ক্ষুদ্র দলটিকে ঘিরিয়া ফেলে এবং তাঁহাদের প্রতি তীর নিক্ষেপ করিতে থাকে। অতঃপর মুসলমানগণ জাগ্রত হইয়া পাল্টা আক্রমণ করেন। অতঃপর বর্শা-বল্লম লইয়া বেদুঈন কাফিরগণ মুসলমানদিগের উপর আক্রমণ করিল। ইহাতে মুসলমানগণের মধ্য হইতে তিনজন শহীদ হইলেন। তখন মুসলমানগণ ইবন মাসলামার নিকট জড় হইলেন এবং একযোগে কাফিরগণের উপর আক্রমণ চালাইলেন। ইহাতে কাফির পক্ষের এক ব্যক্তি নিহত হইল। অতঃপর কাফিরগণ পাল্টা আক্রমণ করিয়া ইবন মাসলামা ব্যতীত বাকী সকলকেই শহীদ করিল (শারহুল মাওয়াহিব, ২খ., পৃ. ১৫৪)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সারিয়‍্যা কাদীদ

📄 সারিয়‍্যা কাদীদ


রাসূলুল্লাহ (স) সংবাদ পাইলেন যে, বানু লায়ছের একটি শাখা বানুল মুলাওওয়াহ, যাহারা আল-কাদীদ নামক স্থানে বাস করিত, ইসলাম বিরোধী চক্রান্তে লিপ্ত আছে। তাই তিনি ৮ম হিজরীর সফর (৬২৯ খৃ. -এর জুন মাসে) হযরত গালিব ইব্‌ন আব্দুল্লাহ আল-লায়ছী (রা)-এর নেতৃত্বে দশ, 'বার বা তদুর্ধ সংখ্যক সাহাবীর একটি ক্ষুদ্র বাহিনী 'আল-কাদীদ' নামক স্থানের বানু আল-মুলাওওয়াহ-এর উদ্দেশ্যে প্রেরণ করিলেন (তারীখ তাবারী, ৩খ., পৃ. ১০২; উয়নুল আছার, পৃ. ১৫০-৫১; আল-মাওয়াহিব, ১খ., পৃ. ১৪৪; তাবাকাত ইবন সা'দ, ২খ., পৃ. ১২৪)। কোন কোন সীরাত বিশারদের মতে, ইহার সময়কাল ৭ম হিজরীর সফর কিংবা রাবীউল আওয়াল (আর-রাহীকুল মাথূম, পৃ. ৪২৯)। হাফিজ আবু 'আমর বলিয়াছেন, উল্লিখিত অভিযান ৫ম হিজরীতে সংঘটিত হইয়াছিল (আল-ইসাবা, ৩খ., পৃ. ১৮৪; আল-ইসতী'আব, ৩খ., পৃ. ১২৫২)।
হাফিজ ইব্‌ন কাছীর (র) আল-ওয়াকিদী (র) সূত্রে বর্ণনা করিয়াছেন যে, এই অভিযানে সাহাবীগণের সৈন্যসংখ্যা ছিল ১৩০ জন (কিতাবুল-মাগাযী, ২খ., পৃ. ৭২৬; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ২৫৩)। সীরাতকার আশ্-শামী এই বর্ণনা প্রত্যাখ্যান করিয়া বলিয়াছেন, ১৩০ জন সৈন্য ছিল হযরত গালিব (রা)-এর আল-মায়ফা'আ অভিযানে। তাঁহার আল-কাদীদ অভিযানে সৈন্যসংখ্যা উপরিউক্ত দশোৰ্দ্ধই ছিল (শারহু মাওয়াহিব, ১খ., পৃ. ২৬৪; সীরাত হালাবী, ৩খ., পৃ. ১৮৮)। কোন কোন সূত্রে জানা যায়, তাঁহারা ছিলেন ৬০ জন অশ্বারোহী সৈন্য (উসদুল গাবা, ৪খ., পৃ. ১৬৮)।
উপরিউক্ত হযরত গালিব ইবন 'আব্দুল্লাহ (রা)-এর নাম উল্টাভাবে 'আবদুল্লাহ ইব্‌ন গালিব' (রা) উল্লিখিত হইয়াছে একটি হাদীছ গ্রন্থে (সুনান আবূ দাউদ, ভারতীয় সং ২খ., পৃ. ১৫, ৩খ., (লেবানন), পৃ. ১২৮]। এই সমস্যার সমাধানে বিজ্ঞ উলামা-ই কিরাম বলিয়াছেন, ক্ষেত্রবিশেষে পিতা-পুত্রের নাম এইভাবে পরস্পর উল্টাইয়া যাইতে পারে। বিশুদ্ধমতে তাঁহার নাম গালিব ইবন 'আবদুল্লাহ। হাদীছ ও সীরাতের অধিকাংশ সূত্র হইতে ইহার সমর্থন পাওয়া যায় (সুনান আবূ দাউদ, ২খ., ভারত, পৃ. ১৫; টীকা, ৩খ., লেবানন, পৃ. ১২৮; জামিউল উসূল, ৩খ., পৃ. ২২১-এর ১নং টীকা; আল-ইসাবা, ৩খ., পৃ. ১৮৪; আওনুল মা'বূদ, ৭খ., পৃ. ৩৩৮)। অবশ্য হযরত আবদুল্লাহ ইব্‌ন গালিব আল-লায়ছী (রা) নামক একজন সাহাবীর নেতৃত্বে একটি বাহিনীকে রাসূলুল্লাহ (স) দ্বিতীয় হিজরীতে ফাদাক অঞ্চলে প্রেরণ করিয়াছিলেন বলিয়া হাফিজ আবূ 'আমর (র) সূত্রে জানা যায় (উসদুল গাবা, ৩খ., পৃ. ২৪১; বাযলুল মাজহুদ, ১২খ., পৃ. ২৯৪; আওনুল মা'বুদ, ৭খ., পৃ. ৩৩৮; আল-ইসাবা, ২খ., পৃ. ৩৫৭)।
আল-কাদীদ হইল মক্কা মুআজ্জামা নগরীর মোটামুটি নিকটবর্তী একটি বহুল প্রসিদ্ধ ঝরনার নাম-যাহ! কুদায়দ (قُدَید) ও উসফান (عُسْفَان) নামক দুইটি স্থানের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত (সহীহ বুখারী, ১খ., পৃ. ২৬০, ২খ., পৃ. ৬১৩; শারহু মুসলিম, নাওয়াবী, ২খ., পৃ. ৩৫৫)।
মক্কা বিজয়ের প্রাক্কালে রাসূলূল্লাহ (স) ও তাঁহার সাহাবা-ই কিরাম এই আল-কাদীদ নামক স্থানে পৌছিয়া সফরের কারণে তাঁহাদের সিয়াম ভংগ করিয়াছিলেন (সহীহ বুখারী, ২খ., পৃ. ৬১৩; সহীহ মুসলিম, ২খ., পৃ. ৩৫৫)। মক্কা হইতে আল-কাদীদের দূরত্ব হইল ৪২ মাইল, মতান্তরে ৪৮ মাইল আর আল-কাদীদ হইতে কুদায়দের দূরত্ব হইল ১৬ মাইল (উমদাতুল কারী, ১৭খ., পৃ. ২৭৬; মু'জামুল বুলদান, ৪খ., পৃ. ৩১৩ এবং পৃ. ৪৪২)।
আল-কাদীদে অবস্থানরত বানূল মুলাওওয়াহ ছিল ইসলাম ও মুসলিমগণের চরম দুশমন। এই গোত্রের লোকজন হযরত বাশীর ইব্‌ন সুওয়ায়দ (রা)-এর সংগী-সাথিগণকে হত্যা করিয়াছিল (আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৪২৯)। রাসূলুল্লাহ (স) ইহার প্রতিশোধ গ্রহণের জন্যই হযরত গালিব ইব্‌ন আব্দুল্লাহ (রা)-কে প্রেরণ করিলেন। তিনি তাঁহার বাহিনী লইয়া আল-কাদীদ-এর উদ্দেশে সফরকালে পথিমধ্যে কুদায়দ নামক স্থানে যাত্রাবিরতি করিলেন। এই অভিযানের অন্যতম সৈনিক হযরত জুনদুব ইব্‌ন মাকীছ (রা) বলেন, আমি এই সৈন্যবাহিনীর অন্তর্ভুক্ত ছিলাম। আমরা যখন কুদায়দে পৌছিলাম, হারিছ ইবন মালিক, মতান্তরে হযরত ইব্‌ন মালিক ইবনুল বারসা আল-লায়ছী নামক একজন লোককে আমরা নাগালে পাইলাম। আমরা তাহাকে পাকড়াও করিলাম। সে বলিল, "আমি ইসলাম গ্রহণের উদ্দেশ্যেই আসিয়াছি। রাসুলুল্লাহ (স)-এর সাক্ষাত লাভই আমার উদ্দেশ্য"। তাহার কথা শুনিয়া হযরত গালিব (রা) বলিলেন, তুমি যদি ইসলাম গ্রহণ করিয়া থাক কিংবা ইসলাম গ্রহণের জন্যই আসিয়া থাক তাহা হইলে একদিন একরাত আমাদের প্রহরাধীনে থাকিলে তোমার কোন ক্ষতি হইবে না। আর যদি তোমার অন্য কোন উদ্দেশ্য থাকে তাহা হইলে আমরা তোমা হইতে নিরাপদ থাকিলাম না। ইহার পর আমরা তাহাকে রশি দ্বারা বাঁধিলাম। তাহাকে এক কৃষ্ণাঙ্গ সৈনিকের প্রহরায় রাখিয়া তাহাকে বলিলাম, বন্দী লোকটির সহিত তুমি এখানে থাকিয়া যাও যতক্ষণ না আমরা ফিরিয়া আসি। লোকটি যদি তোমাকে কাবু করিতে চায় তুমি তাহাকে হত্যা করিও (সুনান আবু দাউদ, লেবানন, ৩খ., পৃ. ১২৮; মুসনাদ আহমাদ, ৩খ., পৃ. ৪৬৮; তারীখ তাবারী, ৩খ., পৃ. ১০২; সীরাত ইন্ন হিশাম, ৪খ., পৃ. ১৮৯-১৯১; তাবাকাত ইন্ন সা'দ, ২খ., পৃ. ১২৪; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ২৫৩)। তাহাকে পাহারা দেওয়ার জন্য যে কৃষ্ণাঙ্গ সৈনিককে নিয়োজিত করা হয় তাহার নাম সুওয়ায়দ ইব্‌ন সাখারী (সীরাত হালাবী, ৩খ, পৃ. ১৮৮)।
ইহার পর হযরত গালিব (রা) ও তাঁহার সেনাদল গন্তব্যের উদ্দেশে পথচলা আরম্ভ করিলেন এবং সন্ধ্যার পূর্বে আল-কাদীদ উপত্যকায় পৌছিয়া লোকচক্ষুর অন্তরালে শিবির স্থাপন করিলেন (তাবাকাত ইবন সা'দ, ২খ., পৃ. ১২৪)। কেবল সুনান আবু দাউদ সূত্রে জানা যায়, উল্লিখিত ইবনুল বারসা কে পাকড়াও করার ঘটনা এই আল-কাদীদে সংঘটিত হয়, কুদায়দে নহে।
আল-কাদীদে শিবির স্থাপন করিয়া হযরত গালিব (রা) তাঁহার অন্যতম সৈনিক হযরত জুনদুব ইব্‌ন মাকীছ (রা)-কে গুপ্তচররূপে বসতিতে প্রেরণ করিলেন। হযরত জুন্দুব (রা) পথ চলিতে চলিতে সূর্যাস্তকালে একটি টিলার উপর অবস্থান গ্রহণ করিলেন। টিলাটির নিকটেই ছিল বসতি। তিনি টিলায় মাথা গুঁজিয়া রাখিয়া দেখিতে পাইলেন, বসতির ছাউনি হইতে বাহির হইয়া এক ব্যক্তি তাঁহাকে অস্পষ্টভাবে অবলোকন করিতেছে এবং নিজ স্ত্রীকে বলিতেছে, আমি টিলার উপর একটি ছায়ামূর্তি দেখিতেছি, দিবসের প্রথম ভাগে তাহা আমি দেখিতে পাই নাই। তুমি অনুসন্ধান করিয়া দেখ তোমার তাঁবুর কিছু হারাইয়া গিয়াছে কি না! তোমার বাসনপত্রের কোনটি কুকুর লইয়া গিয়াছে কি না! স্ত্রী সবকিছু দেখিয়া শুনিয়া বলিল না, আল্লাহ্র কসম! কোন কিছুই হারাইয়া যায় নাই। ইহাতে লোকটির সন্দেহ বাড়িয়া গেল। সে তীর-ধনুক প্রস্তুত করিয়া একটি তীর নিক্ষেপ করিলে তীরটি হযরত জুন্দুব (রা)-এর পাঁজরে আসিয়া বিদ্ধ হইল। তিনি বিন্দুমাত্র নড়াচড়া না করিয়া অবিচল রহিলেন এবং তীরটি টানিয়া বাহির করিয়া ফেলিলেন। ইহার পর সে আরেকটি তীর নিক্ষেপ করিলে তীরটি তাঁহার কাঁধে বিদ্ধ হইল। তিনি ইহাও পূর্ববৎ টানিয়া বাহির করিয়া ফেলিলেন এবং বিন্দুমাত্র নড়াচড়া না করিয়া অবিচল রহিলেন। লোকটি তাহার স্ত্রীকে বলিল, 'ছায়ামূর্তিটি শত্রুদিগের গুপ্তচর হইয়া থাকিলে অবশ্যই নড়াচড়া করিত। আমার দুইট তীরই তো তাহার শরীরে বিধিয়াছে। তুমি প্রত্যূষে গিয়া তীর দুইটি কুড়াইয়া আনিবে, কুকুরকে তাহাতে মুখ লাগাইবার সুযোগ দিবে না।' ইহার পর তাহারা উভয়ে তাঁবুতে ঢুকিয়া পড়িল (সীরাত হালাবী, ৩খ., পৃ. ১৮৮; তাবাকাত ইব্‌ন সাঁদ, ২খ., পৃ. ১২৪-১২৫; সীরাত ইন্ন ইসহাক, ৩খ., পৃ. ৩৬৪-৩৬৫)।
হযরত গালিব (রা)-এর সেনাদল উক্ত বসতিতে আক্রমণের প্রস্তুতি গ্রহণ করিলেন। উহারা উহাদিগের বকরী ও উস্ত্রী যথানিয়মে আস্তাবলে ফিরাইয়া আনিল এবং দুধ দোহন করিল। ঘুমাইবার সময় হইলে উহারা নিশ্চিন্তে নির্বিঘ্নে ঘুমাইয়া পড়িল। রাত্রির প্রথম প্রহর অতিবাহিত হওয়ার পর হযরত গালিব (রা)-এর সেনাদল একযোগে অকস্মাৎ উহাদিগের উপর আক্রমণ করিলেন (তাবাকাত ইবন সা'দ, ২খ., পৃ. ১২৫; তারীখ তাবারী, ৩খ., পৃ. ১০২; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ২৫৩)। এক বর্ণনামতে এই আক্রমণ রাত্রির শেষাংশে সংঘটিত হইয়াছিল (সীরাত ইব্‌ন হিশাম, ৪খ., পৃ. ১৯০; আর-রাহীক, পৃ. ৪২৯; সীরাত ইবন ইসহাক, ৩খ., পৃ. ৩৬৪, ৩৬৫)। তাহারা উহাদিগের জান ও মালের ব্যাপক ক্ষতি সাধন করিতে সক্ষম হইলেন, উহাদিগের অনেককে হত্যা করিলেন এবং অনেককে বন্দী করিলেন। এই সংঘর্ষ চলাকালে মুসলিম সৈনিকগণের সংকেত ছিল امت (মারিয়া ফেল, মারিয়া ফেল) (সীরাত ইন্ন হিশাম, ৪খ., পৃ. ১৯১)।
তাহারা উহাদিগের বহু সংখ্যক বকরী ও উষ্ট্রী হস্তগত করিলেন। যুদ্ধশেষে উক্ত বন্দী গবাদিপশুসমূহ হাঁকাইয়া লইয়া তাহারা মদীনার উদ্দেশে প্রত্যাবর্তন করিলেন। কুদায়দে পৌছিয়া তাহারা পূর্বদিনের গ্রেফতারকৃত ইবনুল বার্সা ও তাহার প্রহরীকে সংগে লইলেন। ওদিকে উক্ত আক্রমণে পালাইয়া যাওয়া ও আক্রান্ত হওয়া কাফির মুশরিকগণ হাঁক-ডাক করিয়া উহাদিগের মিত্র ও পড়শীদিগকে দ্রুত জড়ো করিল। উহারা সবাই একজোট হইয়া অবিলম্বে মুসলিম বাহিনীর পশ্চাদ্ধাবন করিল এবং কুদায়দের কাছাকাছি আসিয়া পৌছিল। এই মুশরিক বাহিনী সংখ্যায় এত অধিক ছিল যে, স্বল্প-সংখ্যক মুসলিম বাহিনীর পক্ষে উহাদিগের প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল না। এই দুই বাহিনী এক পর্যায়ে এত কাছাকাছি হইল যে, উভয় বাহিনীর মধ্যে কেবল কুদায়দ উপত্যকার ব্যবধান ছিল।
মুসলিম সৈন্যগণের এই নাযুক পরিস্থিতিতে আল্লাহ তা'আলা সাহায্য করিলেন। তিনি কুদায়দ উপত্যকায় অকস্মাৎ ঢল প্রবাহিত করিলেন। হযরত জুনদুব (রা) বলেন, 'আল্লাহই ভাল জানেন সেই ঢল কোথা হইতে কিভাবে আসিল। কোন মেঘ বা বৃষ্টি আমাবা দেখিতে পাই নাই। আল্লাহ এমন মারাত্মক ঢল প্রবাহিত করিলেন যাহা প্রতিহত করার ক্ষমতা উহাদিগের কাহারও ছিল না এবং তাহা অতিক্রম করিয়া আমাদের নাগাল পাওয়ার সাধ্যও উহাদিগের ছিল না। উহারা নিরূপায় ইহয়া দাঁড়াইয়া রহিল এবং শুধু তাকাইয়া দেখিল, মুসলমানগণ উহাদিগের বকরী ও উষ্ট্রী হাঁকাইয়া লইয়া আসিতেছি। উহাদিগের একজনও আমাদিগের কাছে আসিতে সক্ষম হইল না। অবশেষে আমরা মদীনায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট চলিয়া আসিলাম (তাবাকাত ইবন সা'দ, ২খ., পৃ. ১২৫; সীরাত আল-হালাবী, ৩খ., পৃ. ১৮৯; সীরাত ইন্ন হিশাম, ৪খ., পৃ. ১৯০. ১৯১)।
মুহাম্মাদ ইবন উমার (র)-এর রিওয়ায়াতে জানা যায়, এই যুদ্ধাভিযান হইতে ফিরিয়া আসিবার পথে একজন মুজাহিদ সাহাবী যুদ্ধলব্ধ উষ্ট্রীগুলি হাঁকাইয়া লইয়া আসিবার সময় নিম্নোক্ত কবিতা আবৃত্তি করিতেছিলেন:
أَبِي أَبُوا الْقَاسِمِ أَنْ تَغَزَّبِي + فِي خَضْلٍ نَبَاتُهُ مُغْلُولُب صَفَرَ أَعَالِيَهُ كَلَوْنَ الْمُذْهَبَ + وَذَالِكَ قَوْلُ صَادِقٍ لَمْ يَكْذِبِ
"আবুল কাসিম অস্বীকৃতি জানায় তোমার (উষ্ট্রীর) হারাইয়া যাইতে সবুজ বুনো ঘাসের জঙ্গলে যাহার উপরিভাগে হলুদ সোনালী আভা সাচ্চা লোকের কথা ইহা, বলেনি মিথ্যা" (তাবাকাত ইবন সা'দ, ২খ., পৃ. ১২৪; তারীখ তাবারী, ৩খ., পৃ. ১০২; শারহ আল-মাওয়াহিব, ১খ., পৃ. ২৬৪; সীরাত ইবন হিশাম, ৪খ., পৃ. ১৯১; সীরাত ইবন ইসহাক, ৩খ., পৃ. ৬৬৫)।
কুদায়দে গ্রেফতারকৃত ইবনুল বারসা আল-লায়ছী (রা) তাহার পূর্বোক্ত দাবির সত্যতা প্রমাণ করিয়াছিলেন। তিনি সত্যই ইসলামের আকর্ষণে মুসলিম মুজাহিদগণের সহিত সাক্ষাত করিয়াছিলেন। পরবর্তী কালে তিনি একনিষ্ঠ মুসলিমরূপে জীবন যাপন করিয়া হযরত মু'আবিয়া (রা)-এর খিলাফতের শেষভাগে ইনতিকাল করেন (আল-ইসাবা, ১খ., পৃ. ২৮৯)।

রাসূলুল্লাহ (স) সংবাদ পাইলেন যে, বানু লায়ছের একটি শাখা বানুল মুলাওওয়াহ, যাহারা আল-কাদীদ নামক স্থানে বাস করিত, ইসলাম বিরোধী চক্রান্তে লিপ্ত আছে। তাই তিনি ৮ম হিজরীর সফর (৬২৯ খৃ. -এর জুন মাসে) হযরত গালিব ইব্‌ন আব্দুল্লাহ আল-লায়ছী (রা)-এর নেতৃত্বে দশ, 'বার বা তদুর্ধ সংখ্যক সাহাবীর একটি ক্ষুদ্র বাহিনী 'আল-কাদীদ' নামক স্থানের বানু আল-মুলাওওয়াহ-এর উদ্দেশ্যে প্রেরণ করিলেন (তারীখ তাবারী, ৩খ., পৃ. ১০২; উয়নুল আছার, পৃ. ১৫০-৫১; আল-মাওয়াহিব, ১খ., পৃ. ১৪৪; তাবাকাত ইবন সা'দ, ২খ., পৃ. ১২৪)। কোন কোন সীরাত বিশারদের মতে, ইহার সময়কাল ৭ম হিজরীর সফর কিংবা রাবীউল আওয়াল (আর-রাহীকুল মাথূম, পৃ. ৪২৯)। হাফিজ আবু 'আমর বলিয়াছেন, উল্লিখিত অভিযান ৫ম হিজরীতে সংঘটিত হইয়াছিল (আল-ইসাবা, ৩খ., পৃ. ১৮৪; আল-ইসতী'আব, ৩খ., পৃ. ১২৫২)।
হাফিজ ইব্‌ন কাছীর (র) আল-ওয়াকিদী (র) সূত্রে বর্ণনা করিয়াছেন যে, এই অভিযানে সাহাবীগণের সৈন্যসংখ্যা ছিল ১৩০ জন (কিতাবুল-মাগাযী, ২খ., পৃ. ৭২৬; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ২৫৩)। সীরাতকার আশ্-শামী এই বর্ণনা প্রত্যাখ্যান করিয়া বলিয়াছেন, ১৩০ জন সৈন্য ছিল হযরত গালিব (রা)-এর আল-মায়ফা'আ অভিযানে। তাঁহার আল-কাদীদ অভিযানে সৈন্যসংখ্যা উপরিউক্ত দশোৰ্দ্ধই ছিল (শারহু মাওয়াহিব, ১খ., পৃ. ২৬৪; সীরাত হালাবী, ৩খ., পৃ. ১৮৮)। কোন কোন সূত্রে জানা যায়, তাঁহারা ছিলেন ৬০ জন অশ্বারোহী সৈন্য (উসদুল গাবা, ৪খ., পৃ. ১৬৮)।
উপরিউক্ত হযরত গালিব ইবন 'আব্দুল্লাহ (রা)-এর নাম উল্টাভাবে 'আব্দুল্লাহ ইব্‌ন গালিব' (রা) উল্লিখিত হইয়াছে একটি হাদীছ গ্রন্থে (সুনান আবূ দাউদ, ২খ., (ভারত), পৃ. ১৫, ৩খ., (লেবানন), পৃ. ১২৮]। এই সমস্যার সমাধানে বিজ্ঞ উলামা-ই কিরাম বলিয়াছেন, ক্ষেত্রবিশেষে পিতা-পুত্রের নাম এইভাবে পরস্পর উল্টাইয়া যাইতে পারে। বিশুদ্ধমতে তাঁহার নাম গালিব ইবন 'আবদুল্লাহ। হাদীছ ও সীরাতের অধিকাংশ সূত্র হইতে ইহার সমর্থন পাওয়া যায় (সুনান আবূ দাউদ, ২খ., ভারত, পৃ. ১৫; টীকা, ৩খ., লেবানন, পৃ. ১২৮; জামিউল উসূল, ৩খ., পৃ. ২২১-এর ১নং টীকা; আল-ইসাবা, ৩খ., পৃ. ১৮৪; আওনুল মা'বূদ, ৭খ., পৃ. ৩৩৮)। অবশ্য হযরত আবদুল্লাহ ইব্‌ন গালিব আল-লায়ছী (রা) নামক একজন সাহাবীর নেতৃত্বে একটি বাহিনীকে রাসূলুল্লাহ (স) দ্বিতীয় হিজরীতে ফাদাক অঞ্চলে প্রেরণ করিয়াছিলেন
বলিয়া হাফিজ আবূ 'আমর (র) সূত্রে জানা যায় (উসদুল গাবা, ৩খ., পৃ. ২৪১; বাযলুল মাজহুদ, ১২খ., পৃ. ২৯৪; আওনুল মা'বুদ, ৭খ., পৃ. ৩৩৮; আল-ইসাবা, ২খ., পৃ. ৩৫৭)।
আল-কাদীদ হইল মক্কা মুআজ্জামা নগরীর মোটামুটি নিকটবর্তী একটি বহুল প্রসিদ্ধ ঝরনার নাম-যাহ! কুদায়দ (قُدَید) ও উসফান (عُسْفَان) নামক দুইটি স্থানের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত (সহীহ বুখারী, ১খ., পৃ. ২৬০, ২খ., পৃ. ৬১৩; শারহু মুসলিম, নাওয়াবী, ২খ., পৃ. ৩৫৫)।
মক্কা বিজয়ের প্রাক্কালে রাসূলূল্লাহ (স) ও তাঁহার সাহাবা-ই কিরাম এই আল-কাদীদ নামক স্থানে পৌছিয়া সফরের কারণে তাঁহাদের সিয়াম ভংগ করিয়াছিলেন (সহীহ বুখারী, ২খ., পৃ. ৬১৩; সহীহ মুসলিম, ২খ., পৃ. ৩৫৫)। মক্কা হইতে আল-কাদীদের দূরত্ব হইল ৪২ মাইল, মতান্তরে ৪৮ মাইল আর আল-কাদীদ হইতে কুদায়দের দূরত্ব হইল ১৬ মাইল (উমদাতুল কারী, ১৭খ., পৃ. ২৭৬; মু'জামুল বুলদান, ৪খ., পৃ. ৩১৩ এবং পৃ. ৪৪২)।
আল-কাদীদে অবস্থানরত বানূল মুলাওওয়াহ ছিল ইসলাম ও মুসলিমগণের চরম দুশমন। এই গোত্রের লোকজন হযরত বাশীর ইব্‌ন সুওয়ায়দ (রা)-এর সংগী-সাথিগণকে হত্যা করিয়াছিল (আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৪২৯)। রাসূলুল্লাহ (স) ইহার প্রতিশোধ গ্রহণের জন্যই হযরত গালিব ইব্‌ন আব্দুল্লাহ (রা)-কে প্রেরণ করিলেন। তিনি তাঁহার বাহিনী লইয়া আল-কাদীদ-এর উদ্দেশে সফরকালে পথিমধ্যে কুদায়দ নামক স্থানে যাত্রাবিরতি করিলেন। এই অভিযানের অন্যতম সৈনিক হযরত জুনদুব ইব্‌ন মাকীছ (রা) বলেন, আমি এই সৈন্যবাহিনীর অন্তর্ভুক্ত ছিলাম। আমরা যখন কুদায়দে পৌছিলাম, হারিছ ইবন মালিক, মতান্তরে হযরত ইব্‌ন মালিক ইবনুল বারসা আল-লায়ছী নামক একজন লোককে আমরা নাগালে পাইলাম। আমরা তাহাকে পাকড়াও করিলাম। সে বলিল, "আমি ইসলাম গ্রহণের উদ্দেশ্যেই আসিয়াছি। রাসুলুল্লাহ (স)-এর সাক্ষাত লাভই আমার উদ্দেশ্য"। তাহার কথা শুনিয়া হযরত গালিব (রা) বলিলেন, তুমি যদি ইসলাম গ্রহণ করিয়া থাক কিংবা ইসলাম গ্রহণের জন্যই আসিয়া থাক তাহা হইলে একদিন একরাত আমাদের প্রহরাধীনে থাকিলে তোমার কোন ক্ষতি হইবে না। আর যদি তোমার অন্য কোন উদ্দেশ্য থাকে তাহা হইলে আমরা তোমা হইতে নিরাপদ থাকিলাম না। ইহার পর আমরা তাহাকে রশি দ্বারা বাঁধিলাম। তাহাকে এক কৃষ্ণাঙ্গ সৈনিকের প্রহরায় রাখিয়া তাহাকে বলিলাম, বন্দী লোকটির সহিত তুমি এখানে থাকিয়া যাও যতক্ষণ না আমরা ফিরিয়া আসি। লোকটি যদি তোমাকে কাবু করিতে চায় তুমি তাহাকে হত্যা করিও (সুনান আবু দাউদ, লেবানন, ৩খ., পৃ. ১২৮; মুসনাদ আহমাদ, ৩খ., পৃ. ৪৬৮; তারীখ তাবারী, ৩খ., পৃ. ১০২; সীরাত ইন্ন হিশাম, ৪খ., পৃ. ১৮৯-১৯১; তাবাকাত ইন্ন সা'দ, ২খ., পৃ. ১২৪; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ২৫৩)। তাহাকে পাহারা দেওয়ার জন্য যে কৃষ্ণাঙ্গ সৈনিককে নিয়োজিত করা হয় তাহার নাম সুওয়ায়দ ইব্‌ন সাখারী (সীরাত হালাবী, ৩খ, পৃ. ১৮৮)।
ইহার পর হযরত গালিব (রা) ও তাঁহার সেনাদল গন্তব্যের উদ্দেশে পথচলা আরম্ভ করিলেন এবং সন্ধ্যার পূর্বে আল-কাদীদ উপত্যকায় পৌছিয়া লোকচক্ষুর অন্তরালে শিবির স্থাপন করিলেন (তাবাকাত ইবন সা'দ, ২খ., পৃ. ১২৪)। কেবল সুনান আবু দাউদ সূত্রে জানা যায়, উল্লিখিত ইবনুল বারসা কে পাকড়াও করার ঘটনা এই আল-কাদীদে সংঘটিত হয়, কুদায়দে নহে।
আল-কাদীদে শিবির স্থাপন করিয়া হযরত গালিব (রা) তাঁহার অন্যতম সৈনিক হযরত জুনদুব ইব্‌ন মাকীছ (রা)-কে গুপ্তচররূপে বসতিতে প্রেরণ করিলেন। হযরত জুন্দুব (রা) পথ চলিতে চলিতে সূর্যাস্তকালে একটি টিলার উপর অবস্থান গ্রহণ করিলেন। টিলাটির নিকটেই ছিল বসতি। তিনি টিলায় মাথা গুঁজিয়া রাখিয়া দেখিতে পাইলেন, বসতির ছাউনি হইতে বাহির হইয়া এক ব্যক্তি তাঁহাকে অস্পষ্টভাবে অবলোকন করিতেছে এবং নিজ স্ত্রীকে বলিতেছে, আমি টিলার উপর একটি ছায়ামূর্তি দেখিতেছি, দিবসের প্রথম ভাগে তাহা আমি দেখিতে পাই নাই। তুমি অনুসন্ধান করিয়া দেখ তোমার তাঁবুর কিছু হারাইয়া গিয়াছে কি না! তোমার বাসনপত্রের কোনটি কুকুর লইয়া গিয়াছে কি না! স্ত্রী সবকিছু দেখিয়া শুনিয়া বলিল না, আল্লাহ্র কসম! কোন কিছুই হারাইয়া যায় নাই। ইহাতে লোকটির সন্দেহ বাড়িয়া গেল। সে তীর-ধনুক প্রস্তুত করিয়া একটি তীর নিক্ষেপ করিলে তীরটি হযরত জুন্দুব (রা)-এর পাঁজরে আসিয়া বিদ্ধ হইল। তিনি বিন্দুমাত্র নড়াচড়া না করিয়া অবিচল রহিলেন এবং তীরটি টানিয়া বাহির করিয়া ফেলিলেন। ইহার পর সে আরেকটি তীর নিক্ষেপ করিলে তীরটি তাঁহার কাঁধে বিদ্ধ হইল। তিনি ইহাও পূর্ববৎ টানিয়া বাহির করিয়া ফেলিলেন এবং বিন্দুমাত্র নড়াচড়া না করিয়া অবিচল রহিলেন। লোকটি তাহার স্ত্রীকে বলিল, 'ছায়ামূর্তিটি শত্রুদিগের গুপ্তচর হইয়া থাকিলে অবশ্যই নড়াচড়া করিত। আমার দুইট তীরই তো তাহার শরীরে বিধিয়াছে। তুমি প্রত্যূষে গিয়া তীর দুইটি কুড়াইয়া আনিবে, কুকুরকে তাহাতে মুখ লাগাইবার সুযোগ দিবে না।' ইহার পর তাহারা উভয়ে তাঁবুতে ঢুকিয়া পড়িল (সীরাত হালাবী, ৩খ., পৃ. ১৮৮; তাবাকাত ইব্‌ন সাঁদ, ২খ., পৃ. ১২৪-১২৫; সীরাত ইন্ন ইসহাক, ৩খ., পৃ. ৩৬৪-৩৬৫)।
হযরত গালিব (রা)-এর সেনাদল উক্ত বসতিতে আক্রমণের প্রস্তুতি গ্রহণ করিলেন। উহারা উহাদিগের বকরী ও উস্ত্রী যথানিয়মে আস্তাবলে ফিরাইয়া আনিল এবং দুধ দোহন করিল। ঘুমাইবার সময় হইলে উহারা নিশ্চিন্তে নির্বিঘ্নে ঘুমাইয়া পড়িল। রাত্রির প্রথম প্রহর অতিবাহিত হওয়ার পর হযরত গালিব (রা)-এর সেনাদল একযোগে অকস্মাৎ উহাদিগের উপর আক্রমণ করিলেন (তাবাকাত ইবন সা'দ, ২খ., পৃ. ১২৫; তারীখ তাবারী, ৩খ., পৃ. ১০২; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ২৫৩)। এক বর্ণনামতে এই আক্রমণ রাত্রির শেষাংশে সংঘটিত হইয়াছিল (সীরাত ইব্‌ন হিশাম, ৪খ., পৃ. ১৯০; আর-রাহীক, পৃ. ৪২৯; সীরাত ইবন ইসহাক, ৩খ., পৃ. ৩৬৪, ৩৬৫)। তাহারা উহাদিগের জান ও মালের ব্যাপক ক্ষতি সাধন করিতে সক্ষম হইলেন, উহাদিগের অনেককে হত্যা করিলেন এবং অনেককে বন্দী করিলেন। এই সংঘর্ষ
চলাকালে মুসলিম সৈনিকগণের সংকেত ছিল امت (মারিয়া ফেল, মারিয়া ফেল) (সীরাত ইন্ন হিশাম, ৪খ., পৃ. ১৯১)।
তাহারা উহাদিগের বহু সংখ্যক বকরী ও উষ্ট্রী হস্তগত করিলেন। যুদ্ধশেষে উক্ত বন্দী গবাদিপশুসমূহ হাঁকাইয়া লইয়া তাহারা মদীনার উদ্দেশে প্রত্যাবর্তন করিলেন। কুদায়দে পৌছিয়া তাহারা পূর্বদিনের গ্রেফতারকৃত ইবনুল বার্সা ও তাহার প্রহরীকে সংগে লইলেন। ওদিকে উক্ত আক্রমণে পালাইয়া যাওয়া ও আক্রান্ত হওয়া কাফির মুশরিকগণ হাঁক-ডাক করিয়া উহাদিগের মিত্র ও পড়শীদিগকে দ্রুত জড়ো করিল। উহারা সবাই একজোট হইয়া অবিলম্বে মুসলিম বাহিনীর পশ্চাদ্ধাবন করিল এবং কুদায়দের কাছাকাছি আসিয়া পৌছিল। এই মুশরিক বাহিনী সংখ্যায় এত অধিক ছিল যে, স্বল্প-সংখ্যক মুসলিম বাহিনীর পক্ষে উহাদিগের প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল না। এই দুই বাহিনী এক পর্যায়ে এত কাছাকাছি হইল যে, উভয় বাহিনীর মধ্যে কেবল কুদায়দ উপত্যকার ব্যবধান ছিল।
মুসলিম সৈন্যগণের এই নাযুক পরিস্থিতিতে আল্লাহ তা'আলা সাহায্য করিলেন। তিনি কুদায়দ উপত্যকায় অকস্মাৎ ঢল প্রবাহিত করিলেন। হযরত জুনদুব (রা) বলেন, 'আল্লাহই ভাল জানেন সেই ঢল কোথা হইতে কিভাবে আসিল। কোন মেঘ বা বৃষ্টি আমাবা দেখিতে পাই নাই। আল্লাহ এমন মারাত্মক ঢল প্রবাহিত করিলেন যাহা প্রতিহত করার ক্ষমতা উহাদিগের কাহারও ছিল না এবং তাহা অতিক্রম করিয়া আমাদের নাগাল পাওয়ার সাধ্যও উহাদিগের ছিল না। উহারা নিরূপায় ইহয়া দাঁড়াইয়া রহিল এবং আমাদিগকে দেখিতে লগিল যে, আমরা উহাদিগের বকরী ও উষ্ট্রী হাঁকাইয়া লইয়া আসিতেছি। উহাদিগের একজনও আমাদিগের কাছে আসিতে সক্ষম হইল না। অবশেষে আমরা মদীনায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট চলিয়া আসিলাম (তাবাকাত ইবন সা'দ, ২খ., পৃ. ১২৫; সীরাত আল-হালাবী, ৩খ., পৃ. ১৮৯; সীরাত ইন্ন হিশাম, ৪খ., পৃ. ১৯০. ১৯১)।
মুহাম্মাদ ইবন উমার (র)-এর রিওয়ায়াতে জানা যায়, এই যুদ্ধাভিযান হইতে ফিরিয়া আসিবার পথে একজন মুজাহিদ সাহাবী যুদ্ধলব্ধ উষ্ট্রীগুলি হাঁকাইয়া লইয়া আসিবার সময় নিম্নোক্ত কবিতা আবৃত্তি করিতেছিলেন:
أَبِي أَبُوا الْقَاسِمِ أَنْ تَغَزَّبِي + فِي خَضْلٍ نَبَاتُهُ مُغْلُولُب صَفَرَ أَعَالِيَهُ كَلَوْنَ الْمُذْهَبَ + وَذَالِكَ قَوْلُ صَادِقٍ لَمْ يَكْذِبِ
"আবুল কাসিম অস্বীকৃতি জানায় তোমার (উষ্ট্রীর) হারাইয়া যাইতে সবুজ বুনো ঘাসের জঙ্গলে
যাহার উপরিভাগে হলুদ সোনালী আভা সাচ্চা লোকের কথা ইহা, বলেনি মিথ্যা"।
(তাবাকাত ইবন সা'দ, ২খ., পৃ. ১২৪; তারীখ তাবারী, ৩খ., পৃ. ১০২; শারহ আল-মাওয়াহিব, ১খ., পৃ. ২৬৪; সীরাত ইবন হিশাম, ৪খ., পৃ. ১৯১; সীরাত ইবন ইসহাক, ৩খ., পৃ. ৬৬৫)।
কুদায়দে গ্রেফতারকৃত ইবনুল বারসা আল-লায়ছী (রা) তাহার পূর্বোক্ত দাবির সত্যতা প্রমাণ করিয়াছিলেন। তিনি সত্যই ইসলামের আকর্ষণে মুসলিম মুজাহিদগণের সহিত সাক্ষাত করিয়াছিলেন। পরবর্তী কালে তিনি একনিষ্ঠ মুসলিমরূপে জীবন যাপন করিয়া হযরত মু'আবিয়া (রা)-এর খিলাফতের শেষভাগে ইনতিকাল করেন (আল-ইসাবা, ১খ., পৃ. ২৮৯)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00