📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সারিয়‍্যা উম্মু কিরফা

📄 সারিয়‍্যা উম্মু কিরফা


রাসূলুল্লাহ (স) পঞ্চম হিজরী সনে যায়দ ইব্‌ন হারিছা (রা)-কে কিছু সাহাবীসহ ওয়াদিল কুরা অঞ্চলে প্রেরণ করেন। কিন্তু তাঁহারা সেখানে জয়লাভ করিতে পারেন নাই, বরং অধিকাংশই শাহাদাত বরণ করেন। ইহার পর দ্বিতীয়বার যায়দ ইব্‌ن হারিছা (রা)-কে কিছু সংখ্যক সাহাবীসহ উম্মু কিরফা নাম্নী মাই'লাকে দমন করার জন্য প্রেরণ করেন। তাঁহারা এইবার উম্মু কিরফাকে হত্যা করেন (তারীখুল (খুলাফা, ১খ., পৃ. ৭৭)। এই সম্পর্কে আবূ নু'আয়ম ধারাবাহিক সূত্রে উম্মুল মু'মিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন، বানু ফাযারা-এর উম্মু কিরফা নাম্নী এক নারী ত্রিশজন অশ্বারোহী প্রস্তুত করিল। ইহাতে তাহার সন্তানাদি ও প্রপৌত্রগণ অন্তর্ভুক্ত ছিল، যে উহাদিগকে রাসূলুল্লাহ (স)-কে হত্যা করার উদ্দেশ্যে প্রেরণ করিল। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের চক্রান্ত ও অভিযানের সংবাদ পাইয়া দু'আ করেন،: اللَّهُمَّ أَثْقَلُهَا بولدها . "হে আল্লাহ! তাহার সন্তানসহ তাহাকে কঠিন অবস্থায় নিপতিত করুন"।
অতঃপর তিনি তাহাদিগকে প্রতিহত করিতে যায়দ ইবন হারিছা (রা)-এর নেতৃত্বে অভিযান প্রেরণ করেন। তিনি উম্মু কিরফাকে হত্যা করেন এবং তাহার সন্তানদিগকেও হত্যা করেন (আল-খাসাইসুল কুবরা، ১খ.، পৃ. ৪২৯)۔
এই প্রসঙ্গে আরও বর্ণিত হইয়াছে، ওয়াদিল Кура অঞ্চলের পাশে ছিল উম্মু کیرفا-এর আবাসস্থল। ষষ্ঠ ہجری کے 6 রমজান زید ابن ہاریসা (رض) নবী کریم صلی اللہ علیہ وسلم کے ایک دستہ صحابیوں کے ساتھ व्यापार के उद्देश्य से সিরিয়া کی طرف روانہ ہوئے۔ مدینہ شریف سے سات راتوں کی مسافت پر، וادיל Куرا نامی جگہ پر، قبیلہ فازارا کے کچھ لوگوں نے اچانک ان پر حملہ کیا، انہیں মার مار کر زخمی کیا اور ان کا سامان چھین لیا۔ اس کے بعد سب سے پہلے حضرت زید (رض) نے رسول اللہ صلی اللہ علیہ وسلم کو یہ خبر دی اور প্রতিকار کی درخواست کی۔ پھر رسول اللہ صلی اللہ علیہ وسلم نے انہی کو ان کے خلاف مہم کی قیادت کے لیے نامزد کیا۔ حضرت زید (رض) صحابیوں کا ایک دستہ لے کر واديل Куرا کی طرف روانہ ہوئے۔ وہ دن میں آرام کرتے اور رات میں سفر کرتے تھے۔ ان کے ساتھ بنو بدر بھی شامل ہوئے۔ ایک دن صبح سویرے حضرت زید (رض) اور ان کے ساتھی উম্মু کیرفا کے رہائشی علاقے کے قریب پہنچے اور تکبیر کی آواز بلند کی۔ انہوں نے ان کے علاقے کو گھیر لیا اور উম্মু کیرفا کو گرفتار کر لیا۔ ان کی بیٹی جاریا بنت مالک ابن حزیفا ابن بدر کو بھی گرفتار کیا گیا۔ উম্মু کیرفا کو کیس ابن المحصیر نے گرفتار کیا۔ وہ ایک کمزور بوڑھی عورت تھیں۔ ان کے دونوں پاؤں کو دو اونٹوں سے رسی سے باندھا گیا، پھر دونوں اونٹوں کو دو سمتوں میں ہانک دیا گیا۔ اس سے ان کا جسم دو ٹکڑوں میں تقسیم ہو گیا اور وہ ہلاک ہو گئیں۔ اس مہم میں نومن اور عبید اللہ نامی مسادہ ابن ہکمہ ابن مالک ابن بدر کے دو بیٹے بھی ہلاک ہوئے۔
مہم کے اختتام پر حضرت زید ابن ہاریسا (رض) رسول اللہ صلی اللہ علیہ وسلم سے ملاقات کے لیے ان کے دروازے پر دستک دی۔ رسول اللہ صلی اللہ علیہ وسلم کی پشت ننگی تھی. انہوں نے چادر کھینچتے ہوئے دروازہ کھولا اور حضرت زید (رض) کو گلے لگایا اور چوما۔ حضرت زید (رض) نے اللہ کی مدد سے فتح کا مکمل حال بیان کیا (اٹ-تبقاتول کبریٰ، 2খ.، ص. 90)۔
ام کرفا کے واقعے کے بارے میں یہ بھی روایت ہے کہ وہ ایک حسد کرنے والی اور بدکار عورت تھی۔ وہ اپنے گھر میں 50 کھلی تلواریں رکھتی تھی۔ اس کا نام فاطمہ بنت حذیفہ ابن بدر تھا۔ اس کے بیٹے کرفا کے نام پر اسے ام کرفا (کرفا کی ماں) کا عرفی نام دیا گیا تھا۔ اس کے 9 بیٹے تھے۔ ان میں سے کچھ کے نام کرفا، ہکمہ، خراشہ، شریق، ولن، رمل اور حسین ہیں۔ دولت آباد کے مطابق، زید بن ہاریسا (رض) کی مہم میں ام کرفا ہلاک ہوئیں۔ اسے دو گھوڑوں سے باندھا گیا تھا۔ اس کے بعد گھوڑوں نے اسے لے کر کودنا شروع کیا تو وہ ہلاک ہو گئی۔ اسے یہ سزا رسول اللہ صلی اللہ علیہ وسلم کو گالی دینے کے جرم میں ملی تھی۔ وہ رسول اللہ صلی اللہ علیہ وسلم پر حملے کی سازش میں بھی بہت آگے بڑھ چکی تھی۔ لہذا یہ سزا اسے حقدار ملی تھی۔ (الروض العنيف، 4খ.، ص. 4.09)۔

গ্রন্থپঞ্জی : (1) ابو عمر خلیفہ ابن خیاات الثیصمی الاصفری، تاریخ الخلیفہ، دار الکلام-مؤسسة الرسالۃ، دمشق-بیروت 1397 ھ، 2nd ed.; (2) ابو بکر عبدالرحمن جلال الدین السیوطی، الخصائص الكبرى (کفایۃ الطالب اللبیب فی خصائص الحبیب ص)، دار الكتب العلمیہ، بیروت 1985 خृ.، 1st ed.; (3) ابو عبد اللہ محمد ابن سعد البصری، الطبقات الكبرى، دار صادر، بیروت، ط. ب.; (4) عبدالرحمن ابن عبد اللہ الخثعمی، الروض العنيف فی تفسير السیرۃ النبویۃ لابی ہشام، دار الكتب العلمیہ بیروت 1997/1418 ھ، 1st ed.

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সারিয়‍্যা আবদুল্লাহ ইবন 'আতীক

📄 সারিয়‍্যা আবদুল্লাহ ইবন 'আতীক


ইয়াহুদী নেতা আবূ রাফে'-এর হত্যা অভিযান
রাসূলুল্লাহ (স)-এর উপর মহান আল্লাহর পক্ষ হইতে অর্পিত দায়িত্বসমূহের অন্যতম ছিল ইসলাম নামক এই শাশ্বত দীনকে সমস্ত জীবনব্যবস্থার উপর বিজয়ী করা। ইরশাদ হইতেছে: هُوَ الَّذِي أَرْسَلَ رَسُولَهُ بِالْهُدى وَدِينِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّينِ كُلَّه.
"তিনিই তাঁহার রাসূলকে হিদায়াত ও সত্য দীনসহ প্রেরণ করিয়াছেন যাহাতে তিনি এই দীনকে অন্যান্য দীনের উপর বিজয়ী করিতে পারেন" (৯: ৩৩; ৪৮: ২৮, ৬১:৯)।
তাঁহার এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন নির্বিঘ্নে ও বাধা-বিপত্তিহীনভাবে সম্ভব হয় নাই। বিভিন্ন প্রকারের অজস্র শত্রু তাঁহাকে পদে পদে বাধা প্রদান করিয়াছে। মহান আল্লাহ্ এই পৃথিবীতে যাহাতে আল্লাহ্ দীন প্রতিষ্ঠিত না হইতে পারে সেজন্য তাহারা তাহাদের সার্বিক শক্তি ও সামর্থ্য নিয়োগ করিয়া সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাইয়াছে। ইয়াহুদী নেতা আবু রাফে' ছিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর এইসব শত্রুর অন্যতম।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সারিয়‍্যা 'আম্র ইবন উমায়্যা আদ-দামরী (রা)

📄 সারিয়‍্যা 'আম্র ইবন উমায়্যা আদ-দামরী (রা)


আবূ সুফয়ান ইব্‌ন হারব একদা মক্কায় কুরাশদের কয়েকজনকে বলিলেন, তোমাদের মধ্যে এমন কেহ কি নাই, যে মদীনায় গিয়া মুহাম্মাদ (স)-কে হত্যা করিতে পারে? কারণ তাঁহার কোন দেহরক্ষী নাই। তিনি বাজারে চলাফেরা করিয়া থাকেন। এক বেদুঈন আবূ সুফ্যানের ঘরে আসিয়া বলিল, আমাকে তুমি সহযোগিতা করিলে আমি মদীনায় গিয়া তাঁহাকে হত্যা করিয়া আসিতে পারি। আমার নিকট একখানা খঞ্জর আছে। ইহার সাহায্যেই আমি তাঁহাকে হত্যা করিব। আবূ সুফ্যান তাহাকে একটি উট ও রাহাখরচ দিয়া দিল এবং তাহাকে অর্থ সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিল, আর বলিয়া দিল, কেহ যাহাতে ইহা জানিতে না পারে। সেই বেদুঈন তাহাকে আশ্বস্ত করিল যে, কেহ ইহা জানিবে না (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া ৪খ., পৃ. ৭৬)।
অতঃপর সেই বেদুঈন পাঁচ দিন সফর করিয়া ষষ্ঠ দিবস সকালে মদীনায় পৌছিয়াই রাসূলুল্লাহ (স) সম্পর্কে লোকজনকে জিজ্ঞাসা করিতে লাগিল। কেহ একজন বলিল, বানু আবদুল আশহালে গিয়া খোঁজ করিয়া দেখ। সে তাহার সওয়ারীতে চড়িয়া বানু আবদুল আশহালে পৌঁছিল এবং তাহার সওয়ারী বাঁধিয়া রাখিল। তারপর রাসূলুল্লাহ (স)-কে সেখানকার মসজিদে দেখিতে পাইল। তিনি মসজিদে বসিয়া সাহাবায়ে কিরামের সহিত কোন বিষয়ে আলাপ করিতেছিলেন। সে রাসূলুল্লাহ (স)-এর দিকে অগ্রসর হইল। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে দেখিবামাত্র সাহাবায়ে কিরামকে বলিলেন,
ان هذا الرجل يريد غررا والله حائل بينه وبين ما يريده.
"এই লোক নিশ্চয় কোন ষড়যন্ত্রমূলক অভিপ্রায় লইয়া আসিয়াছে। মহান আল্লাহই তাহার এই ষড়যন্ত্রমূলক অভিপ্রায় ও তাহার মধ্যে অন্তরায় সৃষ্টি করিয়া দিবেন” (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, প্রাগুক্ত, ৪খ., পৃ. ৬৯)।
সে সেখানে দাঁড়াইয়াই জিজ্ঞাসা করিল, তোমাদের মধ্যে ইবন আবদুল মুত্তালিব কে? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, انا ابن عبد المطلب "আমিই ইব্‌ন আবদিল মুত্তালিব”। সে তখন রাসূলুল্লাহ (স)-এর কাছাকাছি যাইয়া তাঁহার দিকে ঝুঁকিল, কিন্তু হযরত উসায়দ ইব্‌ন হুদায়র (রা) তাহাকে টানিয়া ধরিলেন এবং বলিলেন, নবী করীম (স)-এর কাছে তুই ঘেঁষবি না। তিনি তাহাকে জাপটাইয়া ধরিয়া তাহার জামার মধ্যে হাত ঢুকাইয়া উহার ভিতর হইতে খঞ্জরটি উদ্ধার করিলেন এবং বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এই লোক তো এক বিশ্বাসঘাতক। বেদুঈনটি বলিল, ইয়া মুহাম্মাদ! আমাকে বাঁচান, আমাকে বাঁচান। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে বলিলেন,
اصدقني ما انت وما اقدمك فان صدقتنى نفعك الصدق وان كذبتني فقد اطلعت علی ماهممت به.
"আগে আমাকে সত্য সত্য বল, তুমি কে এবং কেনইবা এখানে আসিয়াছ? আমার সহিত যদি সত্য বল তবে উহাতে তোমার উপকার হইবে। আর যদি আমার সহিত মিথ্যা বল তাহা হইলে মনে রাখিও, আমি কিন্তু তোমার ষড়যন্ত্রমূলক অভিপ্রায় সম্বন্ধে অবগত হইয়াছি" (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, প্রাগুক্ত, ৪খ., পৃ. ৭৬-৭৭)।
বেদুঈন আরয করিল, তাহা হইলে কি আমি নিরাপত্তা পাইব? নবী করীম (স) বলিলেন, وانت امن "হাঁ তুমি নিরাপদ।" সে তখন আবূ সুফ্যান তাহাকে যে উদ্দেশ্যে পাঠাইয়াছে সেসব কথা খুলিয়া বলিল। নবী করীম (স) তাহাকে হযরত উসায়দ ইব্‌ন হুদায়র (রা)-এর নিকট আটক রাখিতে নির্দেশ দিলেন এবং পরদিন বেদুঈনকে তাঁহার নিকট লইয়া আসিতে বলিলেন। নবী করীম (স)-এর নিকট তাহাকে হাযির করা হইলে তিনি তাহাকে বলিলেন, قد افتك فاذهب حيث شئت اوخيرلك من ذالك "তুমি এখন সম্পূর্ণ নিরাপদ। যেখানে ইচ্ছা সেখানেই তুমি চলিয়া যাইতে পার। তোমাকে ইহার চেয়ে উত্তম কোন বিষয়ের কথা কি বলিয়া দিব?”
সে জিজ্ঞাসা করিল, সেই উত্তম বিষয়টা কি? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, ان تشهد أن لا اله لا الله وانى رسول الله। "তুমি এই কথার সাক্ষ্য দাও যে, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নাই এবং আমি আল্লাহ্র রাসূল।" সে তখন বলিল, اشهد ان لا اله الا الله وانك انت رسول الله والله يا محمد ماكنت افرق من الرجال فما هو الا ان رأيتك فذهب عقلى وضعفت ثم اطلعت على ما هممت به فما سبقت به الركبان ولم يطلع عليه احد فعرفت انك ممنوع وانك على حق وأن حزب ابي سفيان حزب الشيطان.
"আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নাই এবং আপনি নিশ্চয় আল্লাহ্ রাসূল। হে মুহাম্মদ! আল্লাহ্র শপথ করিয়া বলিতেছি, আমি কাহাকেও ভয় পাইবার পাত্র ছিলাম না। কিন্তু আপনাকে দেখিতেই আমার অবস্থা এমন হইল যে, আমার জ্ঞানবুদ্ধি সব স্থবির হইয়া গেল এবং আমার মনের সকল জোর উবিয়া গেল। উপরন্তু আপনি আমার দুরভিসন্ধির কথাও (অলৌকিকভাবে) জানিয়া ফেলিয়াছেন। আর ইহাও জানিয়াছেন আমি সওয়ারীতে থাকা অবস্থাতেই। অথচ এই কথা আর কেহ জানিত না। ইহার দ্বারাই আমি বুঝিয়া লইলাম যে, আপনি সার্বিকভাবেই নিরাপদ। আর ইহাতেও সন্দেহ রহিল না যে, আপনিই সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত আর আবূ সুফ্য়ানের দল শয়তানের দল" (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, প্রাগুক্ত, ৪খ., পৃ. ৭৭; শরহে মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়্যা, ২খ., পৃ. ১৭৭-৭৮)।"
ইহা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স) মুচকি হাসিতে থাকেন। অতঃপর সেই লোকটি কয়েক দিন সেখানেই অবস্থান করে, তারপর রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট হইতে অনুমতি লইয়া সেখান হইতে বাহির হইয়া পড়ে। ইহার পর তাহার আর কোন সংবাদ পাওয়া যায় নাই (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, প্রাগুক্ত, ৪খ., পৃ. ৭০)।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) হযরত আমর ইবন উমায়‍্যা আদ-দামরী (রা) ও সালামা ইব্‌ন আসলাম ইবন হারীশ (রা)-কে বলিলেন, তোমরা মক্কায় চলিয়া যাও এবং সুযোগ পাইলে আবূ সুফয়ানকে হত্যা করিয়া আস (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ৭৭)। ইবনে হিশামের রিওয়ায়াতে আছে, আমর ইবন উমায়্যা আদ-দামরী (রা)-এর সঙ্গে ছিলেন জাব্বার ইব্‌ন সা আল-আনসারী (সীরাত ইব্‌ন হিশাম, ৪খ., পৃ. ২৭৯)।
হযরত আমর ইবন উমায়‍্যা আদ-দামরী (রা) বলেন, আমি ও আমার সঙ্গী মক্কার উদ্দেশে রওয়ানা হইলাম। কিন্তু যখন ইয়াজাজ নামক স্থানে আসি তখন আমাদের উট আর সামনে অগ্রসর হইতে চাহিল না (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, প্রাগুক্ত, ৪খ., পৃ. ৭৭)। তাঁহারা উভয়ে রাত্রে মক্কায় প্রবেশ করেন (সীরাত ইবন হিশাম, প্রাগুক্ত, ৪খ., পৃ. ২৭৯)। আমর ইবন উমায়‍্যা বলেন, আমার সঙ্গী আমাকে বলিল, হে আমর! আমরা যেহেতু মক্কায় যাইতেছি, তাই চলো আমরা বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করিয়া বায়তুল্লাহ্র সম্মুখে দুই রাআত নামায পড়িয়া লই। আমি বলিলাম, দেখ, মক্কাবাসী সম্পর্কে আমি তোমার চাইতে ভাল জানি। তাহারা কোন ব্যাপারে ব্যর্থ হইলে তাহার পরিণাম সম্পর্কে চিন্তা করিতে বসিয়া যায় (তাই তাহারা চোখ-কান খোলা রাখিয়া বসিয়া আছে)। আর আমি একটি ঘোড়ার চাইতেও মক্কাকে আরো অধিক চিনি।।
কিন্তু আমার সঙ্গী আমার কোন কথাই শুনিল না। অগত্যা আমরা মক্কায় আসিয়া বায়তুল্লাহ সাতবার তাওয়াফ করিলাম এবং দুই রাআত নামায পড়িলাম। তাওয়াফ ও নামায শেষ করিয়া যখন পথে নামিলাম তখন মু'আবিয়া ইব্‌ন আবূ সুফ্যানের সহিত আমার সাক্ষাত হইল। সে আমাকে দেখিয়া চিনিয়া ফেলিল এবং বলিল, আমর ইবন উমায়‍্যার আগমন তো আমাদেরকে চিন্তায় ফেলিয়া দিয়াছে। তারপর সে মক্কাবাসীকে আমাদের সম্পর্কে সতর্ক করিয়া দিল। ইহা জানিতে পারিয়া তাহারা বলিল, আমর নিশ্চয় কোন ভাল উদ্দেশ্যে আসে নাই। আর 'আমর ইবন উমায়‍্যা (রা) জাহিলী যুগে কোন কিছু হইলে অতর্কিত হামলা করিয়া বসিতেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ৭৭; সীরাত ইব্‌ন হিশাম, ৪খ., পৃ. ২৭৯)।
আমর ইবন উমায়‍্যা (রা) বলেন, আমি তখন আমার সঙ্গীকে বলিলাম, এখন চলো আমরা নিজেদের আত্মরক্ষা করি। এই বলিয়া আমরা দ্রুত পাহাড়ে উঠিয়া উহার চূড়ায় আরোহণ করিলাম। তাহারাও আমাদের অনুসন্ধানে বাহির হইল। কিন্তু আমরা যখন পাহাড়ের আরো উঁচুতে আরোহণ করিলাম তাহারা তখন নিরাশ হইয়া গেল (সীরাত ইবনে হিশাম, ৪খ., পৃ. ২৭৯)। পরে আমরা পাহাড়ের এক গুহায় আশ্রয় নিলাম এবং সেখানেই রাত্রিযাপন করিলাম। তাহারাও আমাদের অনুসন্ধানে রাত্রে পাহাড়েই কাটাইল (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ৭৭)।
পরদিন সকালে দেখা গেল, উছমান ইবন মালিক ইবন উবায়দিল্লাহ আত-তায়মীকে তাহার ঘোড়ায় করিয়া শস্যদানা বহিয়া এইদিকেই আসিতেছে। আমি সালমা ইব্‌ন আসলামকে বলিলাম, সে যদি আমাদেরকে দেখিয়া ফেলে তাহা হইলে মক্কাবাসীকে আমাদের অবস্থান সম্পর্কে জানাইয়া দিবে। তাই তাহার একটা ব্যবস্থা করা দরকার। আমাদের গুহার নিকট তাহার আগমনের অপেক্ষা করিয়া আমরা বসিয়া রহিলাম। আমার নিকট একটি খঞ্জর ছিল, যাহা আমি আবূ সুফ্যানকে হত্যার জন্য প্রস্তুত করিয়া রাখিয়াছিলাম। আমি খঞ্জরটি বাহির করিলাম। সে যখন কাছাকাছি চলিয়া আসিল তখন আমার খঞ্জরটি তাহার বুকের নিচের অংশে আমূল বিদ্ধ করিয়া দিলাম। সে সঙ্গে সঙ্গে এক চিৎকার দিয়া পড়িয়া গেল।
তাহার চিৎকার ধ্বনি শুনিয়া মক্কার লোকজন তাহার চারিপাশে জমা হইল। আমি আমার পূর্ব স্থানে ফিরিয়া গিয়া আমার সঙ্গীকে বলিলাম, নড়াচড়া করিও না, স্থির হইয়া বসিয়া থাক। অতঃপর তাহারা তাহাকে জিজ্ঞাসা করিল, কে তোমাকে মারিয়াছে? সে বলিল, আমর ইব্‌ন উমায়‍্যা আদ-দামরী। আবূ সুফয়ান তখন বলিল, আমি জানিতাম, আমর কোন সৎ উদ্দেশ্যে আসে নাই। কিন্তু সে আর আমাদের অবস্থান সম্পর্কে তাহাদিগকে অবগত করিতে পারিল না। কারণ তখন তাহার এক মুহূর্তের নিঃশ্বাস মাত্র অবশিষ্ট ছিল। অতঃপর সে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করিল। অতঃপর তাহারা তাহাকে উঠাইয়া নিয়া গেল এবং আমাদের অনুসন্ধান করিতে লাগিল। তাই আমরা সেখানে দুই রাত্র আত্মগোপন করিয়া রহিলাম। তারপর যখন তাহারা আমাদের অনুসন্ধান হইতে বিরত হইল তখন আমরা সেখান হইতে বাহির হইয়া আসিলাম (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ৭৭; সীরাত ইন্ন হিশাম, ৪খ., পৃ. ২৮০)।
পরে তাহারা রাত্রিবেলা মদীনার পথে রওয়ানা হন। আমর ইবন উমায়‍্যা বলিলেন, আমরা শেষরাত্রে মদীনার পথে রওয়ানা হইলাম। পথে আমরা খুবায়ব ইবন 'আদী (রা)-এর লাশের পাহারাদারদের পার্শ্ব দিয়া যাইতেছিলাম (খুবায়ব ইব্‌ন আদী রজীর ঘটনার কিছু দিন পর বা কয়েক মাস পর কাফিরদের হাতে শহীদ হন, আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৩৭৪)। তাহাদের একজনকে বলিতে শুনিলাম, আল্লাহ্র কসম! আজ রাত্রিতে মনে হয় আমর ইবন উমায়‍্যা এই স্থানে দিয়া যাইবে। সে যদি মদীনায় না থাকিত তাহা হইলে নিশ্চিত করিয়াই বলিতাম, ইহা 'আমর ইবন উমায়‍্যা। তখন 'আমর ইবন উমায়‍্যা (রা) তাহাদের তীর-ধনুক ছিনাইয়া লইয়া ক্ষিপ্রগতিতে দৌঁড়াইতে শুরু করিলেন। তাহার সঙ্গীও দৌঁড়াইতে লাগিলেন। তাহারাও তাহাদের পিছু ধাওয়া করিল। অবশেষে তাহারা আল্লাহ্র অশেষ কৃপায় তাহাদের দৃষ্টি হইতে অদৃশ্য হইয়া গেলেন। 'আমর ইবন উমায়‍্যা বলিলেন, আমি আমার সঙ্গীকে বলিলাম, তুমি তোমার উটে সওয়ার হইয়া মদীনার উদ্দেশে রওয়ানা হইয়া যাও। আর আমি তাহাদের দৃষ্টি তোমার দিক হইতে ফিরাইয়া রাখিতেছি। আর ইনি পদব্রজে চলিতে সক্ষম ছিলেন না (সীরাত ইন্ন হিশাম, ৪খ., পৃ. ২৮০; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ৭৭-৭৮)।
'আমর ইবন উমায়‍্যা (রা) বলিলেন, পরে আমি যাজান নামক স্থানে আসিয়া এক পাহাড়ে আশ্রয় নিলাম। আমার সঙ্গে তখন তীর-ধনুক ও খঞ্জর ছিল। হঠাৎ বনী দীল ইন্ন বাক্সের এক অন্ধ (একচক্ষু) লোক আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, এখানে কে তুমি? আমি বলিলাম, বানু বকরের লোক আমি। তুমি কে? সে বলিল, আমিও বানু বাক্বরের লোক। আমি তাহাকে স্বাগত জানাইলাম। অতঃপর সে শায়িত অবস্থায় নিম্নোক্ত কবিতার পংক্তিটি উচ্চস্বরে আবৃত্তি করিতে লাগিল:
ولست بمسلم مادمت حيا - ولست ادين دين المسلمينا .
“যে পর্যন্ত আমার জীবন আছে সে পর্যন্ত আমি কখনও মুসলমান হইব না এবং কখনও মুসলমানগণের দীন গ্রহণ করিব না।"
আমি তখন মনে মনে বলিলাম, অচিরেই টের পাইবে। আমি তোমাকে অবশ্যই হত্যা করিব। সে যখন ঘুমাইয়া পড়িল, আমি তখন তাহার সুস্থ চোখে আমার ধনুক ঢুকাইয়া দিলাম এবং উহা তাহার হাড় পর্যন্ত পৌঁছাইয়া দিলাম। এইভাবে তাহাকে হত্যা করিলাম (সীরাত ইব্‌ন হিশাম, ৪খ., পৃ. ২৮০; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ৭৮)।
অতঃপর আমি পাহাড়-হইতে নামিয়া মদীনার পথে রওয়ানা হইলাম। পথে দুইজন গুপ্তচরকে পাইলাম। কুরায়শরা তাহাদিগকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর অবস্থা জানিবার জন্য পাঠাইয়াছিল। আমি তাহাদিগকে বলিলাম, তোমরা উভয়ে আত্মসমর্পণ কর। কিন্তু তাহাদের একজন আত্মসমর্পণ করিতে অস্বীকার করিলে আমি তীর নিক্ষেপ করিয়া তাহাকে হত্যা করিলাম। দ্বিতীয়জন এই অবস্থা দেখিয়া আত্মসমর্পণ করিল। আমি তাহাকে গ্রেফতার করিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট লইয়া আসিলাম। রাসূলুল্লাহ (স) পূর্ণ বৃত্তান্ত শুনিয়া হাসিয়া দিলেন এবং আমার কল্যাণ কামনায় দু'আ করিলেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, প্রাগুক্ত, ৪খ., পৃ. ৭৮; সীরাত ইন্ন হিশাম, প্রাগুক্ত, ৪খ., পৃ. ২৮০-৮১; শারহু মাওয়াহিবিল লাদুন্নিয়া, ২খ., পৃ. ১৭৭-৭৯; আল-মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়া, ১খ., পৃ. ১২৫; 'উয়ুনুল আছার, ২খ., পৃ. ১১২; তাবাকাত ইবন সা'দ, ২খ., পৃ. ৯৩-৯৪; আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ৩৭৪)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সারিয়‍্যা আবূ বাক্ সিদ্দীক (রা)

📄 সারিয়‍্যা আবূ বাক্ সিদ্দীক (রা)


খায়বার যুদ্ধ হইতে ফিরিয়া আসিয়া রাসূলুল্লাহ (স) শাওয়াল মাস পর্যন্ত মদীনায় অতিবাহিত করিলেন। এই সময় তিনি কয়েকটি ছোটখাট অভিযান প্রেরণ করেন। তাহার মধ্যে একটি সারিয়‍্যা প্রেরণ করিলেন নদের কাছাকাছি বানু ফাজারার এলাকায়। তাহার নেতৃত্ব দিলেন হযরত আবূ বাক্স সিদ্দীক (রা)। তাঁহার সহিত ছিলেন হযরত সালামা ইবনুল আকওয়া (রা) (যাদুল মা'আদ, ২খ., পৃ. ১৪৮)। আসাহহুস সিয়ার গ্রন্থের বর্ণনামতে, এই অভিযান পরিচালিত হয় ৬ষ্ঠ হিজরীতে কারণ ছিল এই যে, যায়দ (রা) ব্যবসায়ের উদ্দেশে সিরিয়া গমন করেন এবং সংগী-সাথীদের বাণিজ্য-সম্ভারও তাঁহার নিকট ছিল। সেখান হইতে প্রত্যাবর্তনের প্রাক্কালে ওয়াদিউল কুরায় বানু ফাজারার একটি শাখাগোত্র বানু বদর তাঁহাদের সমস্ত বাণিজ্য সামগ্রী লুণ্ঠন করে। তাঁহারা সংখ্যায় কম ছিলেন। ডাকাত দল তাঁহাদিগকে বেদম প্রহার করে।
তাঁহারা মদীনায় প্রত্যাবর্তন করিলে রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাদের সাহায্যার্থে আরও একদল লোক প্রেরণ করেন। এইবার তাঁহারা সেখানে পৌঁছিয়া প্রতিশোধ গ্রহণ করেন, কতিপয় ব্যক্তিকে হত্যা করেন, অবশিষ্ট লোক পলায়ন করে। তাহাদের নারীদেরকে গ্রেফতার করিয়া মদীনায় নিয়া আসা হইল (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ১৯৫)।
কোন কোন ঐতিহাসিকের বর্ণনামতে হযরত আবূ বাক্স সিদ্দীক (রা) অথবা হযরত যায়দ ইবন হারিছা (রা)-এর নেতৃত্বে ষষ্ঠ হিজরীর রমযান মাসে এই অভিযান পরিচালিত হয়। অভিযানের কারণ ছিল এই যে, বানু ফাজারা গোত্রের একটি শাখা প্রতারণার আশ্রয় নিয়া আল্লাহর রাসূলকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করে। তাই আল্লাহর রাসূল (স) হযরত আবূ বাক্সকে প্রেরণ করিয়াছিলেন (আর-রাহীকুল মাখতুম, অনু., পৃ. ৩৭০)।
হযরত সালামা ইবনুল আকওয়া বলেন, আমরা ফাজার গোত্রের সহিত যুদ্ধ করিয়াছিলাম। আমাদের আমীর ছিলেন হযরত আবূ বাক্স সিদ্দীক (রা)। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে আমাদের আমীর নিযুক্ত করিয়াছিলেন। যখন আমাদের এবং পানির স্থানের মাঝে এক ঘণ্টা সময়ের ব্যবধান ছিল, তখন হযরত আবু বাক্স সিদ্দীক (রা) আমাদিগকে রাতের শেষের দিকে সেখানে অবতরণের নির্দেশ দিলেন। সুতরাং আমরা রাতের শেষাংশেই সেখানে অবতরণ করিলাম। ইহার পর বিভিন্ন দিক হইতে আক্রমণ চালানো হইল। তাহাদিগকে পানি পর্যন্ত পৌঁছানো হইল। যাহাদিগকে সামনে পাওয়া গেল হত্যা করা হইল। কিছু সংখ্যককে বন্দী করা হইল। আমি তাহাদের একটি দলের দিকে তাকাইয়াছিলাম যাহাদের মধ্যে নারী ও শিশুরা ছিল। আমি আশঙ্কা করিলাম যে, তাহারা হয়ত আমার পূর্বেই পাহাড়ে পৌঁছিয়া যাইবে। অতঃপর আমি তাহাদের ও পাহাড়ের মাঝে তীর নিক্ষেপ করিতে লাগিলাম। তাহারা তীর দেখিয়া থামিয়া গেল। তখন আমি তাহাদেরকে হাঁকাইয়া লাইয়া আসিলাম। তাহাদের মধ্যে চামড়ার পোশাক পরিহিত বানু ফাযারার এক মহিলাও ছিল এবং তাহার সহিত তাহার এক কন্যাও ছিল। সে ছিল আরবের অন্যতম সুন্দরী কন্যা। আমি সকলকেই হাঁকাইয়া লইয়া আসিলাম হযরত আবূ বকর (রা)-এর নিকট। তিনি কন্যাটি আমাকে উপঢৌকন হিসাবে প্রদান করিলেন। ইহার পর আমি মদীনায় ফিরিয়া আসিলাম। আমি তখনও তাহার বস্ত্র উন্মোচন করি নাই। পরে বাজারে আমার সহিত রাসূলুল্লাহ (স)-এর সাক্ষাৎ হইলে তিনি বলিলেন, হে সালামা! তুমি মহিলাটি আমাকে দিয়া দাও। আমি বলিলাম, তাহাকে আমার খুবই পসন্দ হইয়াছে এবং এখনও আমি তাহার বস্ত্র উন্মোচন করি নাই। পরের দিন আবারও বাজারে আমার সহিত রাসূলুল্লাহ (স)-এর সাক্ষাৎ হইলে তিনি বলিলেন, হে সালামা! তুমি মহিলাটি আমাকে দিয়া দাও। আল্লাহ তোমার পিতার কল্যাণ করুন। আমি বলিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! সে আপনার জন্যই। আল্লাহ্র কসম! আমি তাহার বস্ত্র উন্মোচন করি নাই। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) ঐ কন্যাটিকে মক্কায় পাঠাইয়া দিয়া তাহার বিনিময়ে কয়েকজন মুসলমান বন্দীকে মুক্ত করিয়া আনিলেন যাহারা মক্কায় বন্দী অবস্থায় ছিলেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ২৫০-৫১; মুসলিম, কিতাবুল জিহাদ ওয়াস-সিয়ার ২ খ., পৃ. ৮৯)।
ইবন হিশামের বর্ণনা কিছুটা ভিন্নরকম। তিনি বলেন, বানু ফাযারার সহিত যুদ্ধ করেন যায়দ ইবন হারিছা (রা)। এই যুদ্ধে তাঁহার অনেক সঙ্গীসাথী নিহত হন। যায়দকেও নিহতদের মধ্য হইতে আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। এই যুদ্ধে সা'দ ইব্‌ন হু্যায়ল, ওয়ারদ ইব্‌ন আমর ইব্‌ন মা'দান নিহত হন। বানু বদরের জনৈক ব্যক্তি তাহাকে আঘাত করিয়াছিল। ইবন ইসহাক বলেন, যায়দ ইব্‌ন হারিছা (রা) ফিরিয়া আসিয়া শপথ করিলেন যে, বানু ফাযারার সহিত যুদ্ধ না করিয়া স্ত্রী গমন জনিত গোসল করিবেন না। তাঁহার যখম ভাল হওয়ার পর অর্থাৎ তিনি সুস্থ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (স) একদল সৈন্যসহ তাঁহাকে বানু ফাযারার বিরুদ্ধে প্রেরণ করিলেন। তিনি ওয়াদিউল কুরায় পৌঁছিয়া তাহাদিগকে আঘাত করিলেন, তাহাদিগকে চরমভাবে নাজেহাল করিয়া ছাড়িলেন। কায়স ইব্‌ন মুসাহ্হার ইয়া'মূরী (রা) মাস্'আদা ইব্‌ন হাকামা ইবন মালিক ইবন হুযায়ফা ইব্‌ন বাদ্রকে হত্যা করেন। উম্মু কিরফা ফাতিমা বিন্ত রবীআ ইব্‌ন বদরকে বন্দী করেন। এই অশীতিপর বৃদ্ধা ছিল মালিক ইবন হুযায়ফা ইব্‌ন বদরের স্ত্রী। তাহার এক কন্যাও তাহার সহিত বন্দী হয়। আরও বন্দী হইয়াছিল আবদুল্লাহ ইবন মাসআদা। যায়দ ইব্‌ن হারিছা (রা) উন্মু কিরফাকে হত্যা করার জন্য কায়স ইব্‌ন মুসাহহারকে নির্দেশ দিলেন। তিনি তাহাকে কঠোরভাবে হত্যা করিলেন। ইহার পর তাহারা উম্মু কিরফার কন্যা ও আবদুল্লাহ ইব্‌ন মাস'আদকে নিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট উপস্থিত হইলেন। উম্মু কিরফার মেয়েটি সালামা ইবনুল আকওয়া (রা)-এব ভাগে পড়িয়াছিল। তিনিই তাহাকে বন্দী করিয়াছিলেন। সে ছিল তাহাদের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দরী রমণী। সালামা (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট হইতে তাহাকে চাহিয়া নিয়া স্বীয় মামা হাসন ইব্‌ন আবূ ওয়াহ্ একে দান করিলেন। তাহার গর্ভেই আবদুর রহমান ইবন হাযনের জন্ম।
কায়স ইবন মুসাহ্হার (রা) মাস'আদা হত্যা সম্পর্কে বলেন, سعیت بورد مثل سعی ابن امه + وانی بورد في الحياه لثائر. كررت عليه المهر لما رأيته + على بطل من ال بدر مفاور. فركيت فيه تعصبيا كانه + شهار بمعراة يزكي لناظر.
"আমি ওয়ারদের বদলা নিতে তেমনই চেষ্টা করিয়াছি, যেমন চেষ্টা করিয়াছে তাহার সহোদর। আমি তো তাহার রক্তের প্রতিশোধ এই জীবনেই লইতে চাহিয়াছিলাম। আমি যখন তাহাকে দেখিলাম উপর্যুপরি হাঁকাইলাম তাহার উপর আমার নবীন শ্ব। বদর খান্দানের এক লড়াকু বীরের উপর আমি তাহার দেহের অনাবৃত অংশে বিদ্ধ করিলাম চকচকে বর্শা, উজ্জ্বল তারকার মত, ধাঁধাঁইয়া দেয় যাহা দর্শকের চোখ (ইব্‌ন হিশাম, আস্-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, ৪খ., পৃ. ১৯০)।"
আর-রাহীকুল মাখতূম প্রণেতা বলেন, উন্মু বিরফা ছিল চক্রান্তকারী নারী। সে রাসূলুল্লাহ (স)-কে হত্যার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকিত। রাসূলুল্লাহ (স)-কে হত্যার উদ্দেশ্যে সে তাহার গোত্রের ত্রিশজন সওয়ারকে প্রস্তুত করিয়া রাখিয়াছিল। এই অভিযানে সে যথার্থ বদলা পাইয়াছিল এবং তাহার ত্রিশজন সওয়ার নিহত হইয়াছিল (আর-রাহীকুল মাতৃম, বাংলা অনু., পৃ. ৩৭১)।

খায়বার যুদ্ধ হইতে ফিরিয়া আসিয়া রাসূলুল্লাহ (স) শাওয়াল মাস পর্যন্ত মদীনায় অতিবাহিত করিলেন। এই সময় তিনি কয়েকটি ছোটখাট অভিযান প্রেরণ করেন। তাহার মধ্যে একটি সারিয়‍্যা প্রেরণ করিলেন নদের কাছাকাছি বানু ফাজারার এলাকায়। তাহার নেতৃত্ব দিলেন হযরত আবূ বাক্স সিদ্দীক (রা)। তাঁহার সহিত ছিলেন হযরত সালামা ইবনুল আকওয়া (রা) (যাদুল মা'আদ, ২খ., পৃ. ১৪৮)। আসাহহুস সিয়ার গ্রন্থের বর্ণনামতে, এই অভিযান পরিচালিত হয় ৬ষ্ঠ হিজরীতে কারণ ছিল এই যে, যায়দ (রা) ব্যবসায়ের উদ্দেশে সিরিয়া গমন করেন এবং সংগী-সাথীদের বাণিজ্য-সম্ভারও তাঁহার নিকট ছিল। সেখান হইতে প্রত্যাবর্তনের প্রাক্কালে ওয়াদিউল কুরায় বানু ফাজারার একটি শাখাগোত্র বানু বদর তাঁহাদের সমস্ত বাণিজ্য সামগ্রী লুণ্ঠন করে। তাঁহারা সংখ্যায় কম ছিলেন। ডাকাত দল তাঁহাদিগকে বেদম প্রহার করে।
তাঁহারা মদীনায় প্রত্যাবর্তন করিলে রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাদের সাহায্যার্থে আরও একদল লোক প্রেরণ করেন। এইবার তাঁহারা সেখানে পৌঁছিয়া প্রতিশোধ গ্রহণ করেন, কতিপয় ব্যক্তিকে হত্যা করেন, অবশিষ্ট লোক পলায়ন করে। তাহাদের নারীদেরকে গ্রেফতার করিয়া মদীনায় নিয়া আসা হইল (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ১৯৫)।
কোন কোন ঐতিহাসিকের বর্ণনামতে হযরত আবূ বাক্স সিদ্দীক (রা) অথবা হযরত যায়দ ইবন হারিছা (রা)-এর নেতৃত্বে ষষ্ঠ হিজরীর রমযান মাসে এই অভিযান পরিচালিত হয়। অভিযানের কারণ ছিল এই যে, বানু ফাজারা গোত্রের একটি শাখা প্রতারণার আশ্রয় নিয়া আল্লাহর রাসূলকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করে। তাই আল্লাহর রাসূল (স) হযরত আবূ বাক্সকে প্রেরণ করিয়াছিলেন (আর-রাহীকুল মাখতুম, অনু., পৃ. ৩৭০)।
হযরত সালামা ইবনুল আকওয়া বলেন, আমরা ফাজার গোত্রের সহিত যুদ্ধ করিয়াছিলাম। আমাদের আমীর ছিলেন হযরত আবূ বাক্স সিদ্দীক (রা)। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে আমাদের আমীর নিযুক্ত করিয়াছিলেন। যখন আমাদের এবং পানির স্থানের মাঝে এক ঘণ্টা সময়ের ব্যবধান ছিল, তখন হযরত আবু বাক্স সিদ্দীক (রা) আমাদিগকে রাতের শেষের দিকে সেখানে অবতরণের নির্দেশ দিলেন। সুতরাং আমরা রাতের শেষাংশেই সেখানে অবতরণ করিলাম। ইহার পর বিভিন্ন দিক হইতে আক্রমণ চালানো হইল। তাহাদিগকে পানি পর্যন্ত পৌঁছানো হইল। যাহাদিগকে সামনে পাওয়া গেল হত্যা করা হইল। কিছু সংখ্যককে বন্দী করা হইল।
আমি তাহাদের একটি দলের দিকে তাকাইয়াছিলাম যাহাদের মধ্যে নারী ও শিশুরা ছিল। আমি আশঙ্কা করিলাম যে, তাহারা হয়ত আমার পূর্বেই পাহাড়ে পৌঁছিয়া যাইবে। অতঃপর আমি তাহাদের ও পাহাড়ের মাঝে তীর নিক্ষেপ করিতে লাগিলাম। তাহারা তীর দেখিয়া থামিয়া গেল। তখন আমি তাহাদেরকে হাঁকাইয়া লাইয়া আসিলাম। তাহাদের মধ্যে চামড়ার পোশাক পরিহিত বানু ফাযারার এক মহিলাও ছিল এবং তাহার সহিত তাহার এক কন্যাও ছিল। সে ছিল আরবের অন্যতম সুন্দরী কন্যা। আমি সকলকেই হাঁকাইয়া লইয়া আসিলাম হযরত আবূ বকর (রা)-এর নিকট। তিনি কন্যাটি আমাকে উপঢৌকন হিসাবে প্রদান করিলেন। ইহার পর আমি মদীনায় ফিরিয়া আসিলাম। আমি তখনও তাহার বস্ত্র উন্মোচন করি নাই। পরে বাজারে আমার সহিত রাসূলুল্লাহ (স)-এর সাক্ষাৎ হইলে তিনি বলিলেন, হে সালামা! তুমি মহিলাটি আমাকে দিয়া দাও। আমি বলিলাম, তাহাকে আমার খুবই পসন্দ হইয়াছে এবং এখনও আমি তাহার বস্ত্র উন্মোচন করি নাই। পরের দিন আবারও বাজারে আমার সহিত রাসূলুল্লাহ (স)-এর সাক্ষাৎ হইলে তিনি বলিলেন, হে সালামা! তুমি মহিলাটি আমাকে দিয়া দাও। আল্লাহ তোমার পিতার কল্যাণ করুন। আমি বলিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! সে আপনার জন্যই। আল্লাহ্র কসম! আমি তাহার বস্ত্র উন্মোচন করি নাই। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) ঐ কন্যাটিকে মক্কায় পাঠাইয়া দিয়া তাহার বিনিময়ে কয়েকজন মুসলমান বন্দীকে মুক্ত করিয়া আনিলেন যাহারা মক্কায় বন্দী অবস্থায় ছিলেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ২৫০-৫১; মুসলিম, কিতাবুল জিহাদ ওয়াস-সিয়ার ২ খ., পৃ. ৮৯)।
ইবন হিশামের বর্ণনা কিছুটা ভিন্নরকম। তিনি বলেন, বানু ফাযারার সহিত যুদ্ধ করেন যায়দ ইবন হারিছা (রা)। এই যুদ্ধে তাঁহার অনেক সঙ্গীসাথী নিহত হন। যায়দকেও নিহতদের মধ্য হইতে আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। এই যুদ্ধে সা'দ ইব্‌ন হু্যায়ল, ওয়ারদ ইব্‌ন আমর ইব্‌ন মা'দান নিহত হন। বানু বদরের জনৈক ব্যক্তি তাহাকে আঘাত করিয়াছিল। ইবন ইসহাক বলেন, যায়দ ইব্‌ন হারিছা (রা) ফিরিয়া আসিয়া শপথ করিলেন যে, বানু ফাযারার সহিত যুদ্ধ না করিয়া স্ত্রী গমন জনিত গোসল করিবেন না। তাঁহার যখম ভাল হওয়ার পর অর্থাৎ তিনি সুস্থ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (স) একদল সৈন্যসহ তাঁহাকে বানু ফাযারার বিরুদ্ধে প্রেরণ করিলেন। তিনি ওয়াদিউল কুরায় পৌঁছিয়া তাহাদিগকে আঘাত করিলেন, তাহাদিগকে চরমভাবে নাজেহাল করিয়া ছাড়িলেন। কায়স ইব্‌ন মুসাহ্হার ইয়া'মূরী (রা) মাস্'আদা ইব্‌ন হাকামা ইবন মালিক ইবন হুযায়ফা ইব্‌ন বাদ্রকে হত্যা করেন। উম্মু কিরফা ফাতিমা বিন্ত রবীআ ইব্‌ন বদরকে বন্দী করেন। এই অশীতিপর বৃদ্ধা ছিল মালিক ইবন হুযায়ফা ইব্‌ন বদরের স্ত্রী। তাহার এক কন্যাও তাহার সহিত বন্দী হয়। আরও বন্দী হইয়াছিল আবদুল্লাহ ইবন মাসআদা। যায়দ ইব্‌ন হারিছা (রা) উন্মু কিরফাকে হত্যা করার জন্য কায়স ইব্‌ন মুসাহহারকে নির্দেশ দিলেন। তিনি তাহাকে কঠোরভাবে হত্যা করিলেন। ইহার পর তাহারা উম্মু কিরফার কন্যা ও আবদুল্লাহ ইব্‌ন
মাস'আদকে নিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট উপস্থিত হইলেন। উম্মু কিরফার মেয়েটি সালামা ইবনুল আকওয়া (রা)-এব ভাগে পড়িয়াছিল। তিনিই তাহাকে বন্দী করিয়াছিলেন। সে ছিল তাহাদের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দরী রমণী। সালামা (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট হইতে তাহাকে চাহিয়া নিয়া স্বীয় মামা হাসন ইব্‌ন আবূ ওয়াহ্ একে দান করিলেন। তাহার গর্ভেই আবদুর রহমান ইবন হাযনের জন্ম।
কায়স ইবন মুসাহ্হার (রা) মাস'আদা হত্যা সম্পর্কে বলেন, سعیت بورد مثل سعی ابن امه + وانی بورد في الحياه لثائر. كررت عليه المهر لما رأيته + على بطل من ال بدر مفاور. فركيت فيه تعصبيا كانه + شهار بمعراة يزكي لناظر.
"আমি ওয়ারদের বদলা নিতে তেমনই চেষ্টা করিয়াছি, যেমন চেষ্টা করিয়াছে তাহার সহোদর। আমি তো তাহার রক্তের প্রতিশোধ এই জীবনেই লইতে চাহিয়াছিলাম।
আমি যখন তাহাকে দেখিলাম উপর্যুপরি হাঁকাইলাম তাহার উপর আমার নবীন শ্ব। বদর খান্দানের এক লড়াকু বীরের উপর আমি তাহার দেহের অনাবৃত অংশে বিদ্ধ করিলাম চকচকে বর্শা, উজ্জ্বল তারকার মত, ধাঁধাঁইয়া দেয় যাহা দর্শকের চোখ (ইব্‌ন হিশাম, আস্-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, ৪খ., পৃ. ১৯০)।
আর-রাহীকুল মাখতূম প্রণেতা বলেন, উন্মু বিরফা ছিল চক্রান্তকারী নারী। সে রাসূলুল্লাহ (স)-কে হত্যার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকিত। রাসূলুল্লাহ (স)-কে হত্যার উদ্দেশ্যে সে তাহার গোত্রের ত্রিশজন সওয়ারকে প্রস্তুত করিয়া রাখিয়াছিল। এই অভিযানে সে যথার্থ বদলা পাইয়াছিল এবং তাহার ত্রিশজন সওয়ার নিহত হইয়াছিল (আর-রাহীকুল মাতৃম, বাংলা অনু., পৃ. ৩৭১)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00