📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সারিয়‍্যা উক্বাশা ইন্ন মিহসান (রা)

📄 সারিয়‍্যা উক্বাশা ইন্ন মিহসান (রা)


ইহা ৬ষ্ঠ হিজরী সনের রবীউল আওয়াল মাসে সংঘটিত হইয়াছিল। রাসূলুল্লাহ (স) হযরত উক্বাশা ইব্‌ন মিহসান আল-আসাদী (রা)-কে চল্লিশজনের একটি দলসহ বানু আসাদের মুকাবিলায় গামার নামক স্থানে প্রেরণ করেন। গামার বানু আসাদের কূপের নাম। মদীনা হইতে তাহা দুই রাত্রের দূরত্বে অবস্থিত ('উয়ূনুল আছার, ২খ., পৃ. ১০৩-৪; শারহু মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়‍্যা, ২খ., পৃ. ১৫৩-৫৪)। এই অভিযানে ছাবিত ইব্‌ন আকরাম, সিবা' ইব্‌ন ওয়াহ্হ্ব (মতান্তরে শুয়া ইন্ন ওয়াত্ব) ও ইয়াযীদ ইব্‌ন্ন রুকায়শও ছিলেন (কিতাবুল-মাগাযী ২খ., পৃ. ৫৫০; 'উয়ূনুল আছার, ২খ., পৃ. ১০৪)। তাহারা অতি ক্ষিপ্রতার সহিত গামার অভিমুখে রওয়ানা হন। কিন্তু বানু আসাদের লোকেরা তাহাদের আগমন সংবাদ পাইয়া স্বীয় ঘরবাড়ি শূন্য করিয়া পাহাড়ের দিকে পলায়ন করে। মুসলিম বাহিনী তথায় পৌঁছিয়া বানু আসাদের ঘরবাড়ি শূন্য দেখিতে পান এবং কাহাকেও খুঁজিয়া না পাইয়া শুজা' ইব্‌ন ওয়াহ্হ্বকে প্রকৃত ব্যাপার জানিবার জন্য প্রেরণ করেন। তিনি তাহাদের কাহাকেও পাইলেন না, তবে এক ব্যক্তিকে পাকড়াও করেন এবং তাহাদের গৃহপালিত পশু ও উহার চারণভূমির সন্ধান পান। আর সেই ব্যক্তিকে নিরাপত্তা প্রদান করা হয়। অতঃপর তাহাকে লইয়া বানু আসাদের চারণভূমিতে গিয়া দুই শত উট গনীমত হিসাবে লাভ করেন। পরে সেইগুলি মদীনায় লইয়া আসেন এবং রাসুলুল্লাহ (স)-এর নিকট পেশ করেন। পথে তাহারা আর কোন প্রতিরোধের সম্মুখীন হন নাই (উয়ূনুল আছার, ২খ., পৃ. ১০৩-৪; শারহু মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়্যা, ২খ., পৃ. ১৫৩-৫৪; তাবাকাতে ইবন সা'দ, ২খ., পৃ. ৮৪-৮৫; কিতাবুল মাগাযী, ২খ., পৃ. ৫৫০; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ১৯৪)।
ইব্‌ন আয়্যব বলেন, এই সারিয়ার আমীর ছিলেন ছাবিত ইন্ন আকরাম (রা) এবং তাঁহার সঙ্গে উককাশা ইন্ন মিহসান আল-আসাদী (রা)। সম্ভবত তাঁহারা উভয়ে আমীর ছিলেনঃ অভিযানের শুরুতে ছিলেন একজন এবং অভিযানের শেষদিকে ছিলেন আরেকজন আমীর (শারহু মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়্যা, ২খ., পৃ. ১৫৩)।

গ্রন্থপঞ্জী: বরাত নিবন্ধগর্ভে প্রদত্ত হইয়াছে।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সারিয়‍্যা আবূ উবায়দা ইবনুল জাররাহ (রা)

📄 সারিয়‍্যা আবূ উবায়দা ইবনুল জাররাহ (রা)


অষ্টম হিজরীর রজব মাসে এই অভিযান পরিচালিত হইয়াছিল। এই অভিযানের প্রসিদ্ধ নাম সারিয়‍্যাতুল-খাত। খাত কাঁটাযুক্ত গাছ, শুক্ক পাতা, অর্থ বাবুল গাছের পাতা। রসদের অভাবে মুজাহিদগণকে বাবুল গাছের পাতা ভক্ষণ করিতে হইয়াছিল বলিয়া উক্ত নামকরণ করা হইয়াছে। বুখারী শরীফে এই অভিযান 'সায়ফুল বাহ্' বা 'সীফুল বাহ্' নামে পরিচিত। ইহা মদীনা হইতে পাঁচ দিনের পথের দূরত্বে সমুদ্রোপকূলে সংঘটিত হইয়াছে বলিয়া এই নামকরণ করা হয়। সেখানে জুহায়না কবিলার একটি গোত্র বাস করিত। কাহারও অভিমত এই যে, কুরায়শ কাফেলার গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য উক্ত অভিযান পরিচালিত হইয়াছিল। মুজাহিদগণ সেখানে এক পক্ষকাল অবস্থান করেন। বাহিনীর আমীর ছিলেন আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ (রা)।
জাবির ইব্‌ন আবদিল্লাহ্ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (স) সমুদ্র সৈকতের দিকে একটি সৈন্যবাহিনী পাঠাইলেন। আবূ উবায়দা ইবনুল জাররাহ্ (রা)-কে তাহাদের আমীর নিযুক্ত করেন। তাহারা সংখ্যায় ছিল তিন শত, তন্মধ্যে আমিও ছিলাম। আমরা যুদ্ধের জন্য বাহির হইলাম। আমরা পথ চলিতেছিলাম; পথিমধ্যে আমাদের রসদপত্র নিঃশেষ হইয়া গেল। তাই আবু উবায়দা (রা) সমগ্র সেনাদলের অবশিষ্ট পাথেয় একত্র করিতে আদেশ দিলেন। অতএব সকল খাদ্যসামগ্রী একত্র করা হইল। দেখা গেল, মাত্র দুই থলে খেজুর রহিয়াছে। ইহার পর তিনি অল্প অল্প করিয়া আমাদের মধ্যে খাদ্য বণ্টন করিতে লাগিলেন। পরিশেষে তাহাও শেষ হইয়া গেল। তখন আমাদের প্রত্যেকের জন্য একটি মাত্র খেজুর রহিল। বর্ণনাকারী বলেন, আমি জাবির (রা)-কে বলিলাম, একটি করিয়া খেজুর খাইয়া আপনাদের কতটুকু ক্ষুধা নিবারণ হইত? তিনি বলিলেন, আল্লাহ্র কসম! একটি খেজুর পাওয়াও বন্ধ হইয়া গেলে আমরা একটির কদরও অনুভব করিতে লাগিলাম। ইহার পর আমরা সমুদ্র পর্যন্ত পৌঁছিয়া গেলাম। তখন আমরা পাহাড়ের মত বড় মাছ পাইয়া গেলাম। আমরা সকলে আঠার দিন পর্যন্ত তাহা খাইলাম। তারপর আবূ উবায়দা (রা) মাছটির পাঁজরের দুইটি হাড় আনিতে হুকুম দিলেন। দুইটি হাড় আনা হইলে সেগুলি দাঁড় করানো হইল। ইহার পর তিনি একটি সওয়ারী তৈয়ার করিতে বলিলেন; সওয়ারী তৈয়ার হইল এবং হাড় দুইটির নিচে দিয়া সওয়ারীটি অতিক্রম করিল, কিন্তু হাড় দুইটি স্পর্শ করিল না (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ৩১৪, ৩১৫; বুখারী, কিতাবুল মাগাযী, ২খ., পৃ. ৬২৫)।
জাবির ইব্‌ন আবদিল্লাহ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) আমাদের তিন শত সওয়ারীর একটি সৈন্যবাহিনীকে কুরায়শদের একটি কাফেলার উপর সুযোগমত আক্রমণ করার জন্য পাঠাইয়াছিলেন। আবূ উবায়দা ইবনুল জাররাহ (রা) ছিলেন আমাদের সেনাপতি। আমরা অর্ধমাস পর্যন্ত সমুদ্র সৈকতে অবস্থান করিলাম। ইতোমধ্যে রসদপত্র নিঃশেষ হইয়া গেল। আমরা ভীষণ দুর্ভিক্ষের শিকার হইলাম। অবশেষে ক্ষুধার যন্ত্রণায় আমরা গাছের পাতা পর্যন্ত খাইতে থাকিলাম। এইজন্যই এই সৈন্যবাহিনীর নাম রাখা হইয়াছে জায়শুল খাবাত অর্থাৎ পাতাওয়ালা সেনাদল। ইহার পর সমুদ্র আমাদের জন্য আম্বর (তিমি মাছ) নামক একটি প্রাণী নিক্ষেপ করিল। আমরা অর্ধমাস পর্যন্ত তাহা খাইলাম। ইহার চর্বি শরীরে লাগাইলাম। ফলে আমাদের শরীর পূর্বের ন্যায় হৃষ্টপুষ্ট হইয়া গেল।
জাবির (রা) বলেন, সেনাদলের এক ব্যক্তি খাদ্যের অভাব দেখিয়া প্রথমে তিনটি উট যবেহ করিলেন, তারপর আরও তিনটি উট যবেহ্ করিলেন, তারপর আরও তিনটি উট যবেহ করিলেন। ইহার পর আবু উবায়দা (রা) তাহাকে উট যবেহ্ করিতে নিষেধ করিলেন। আমর ইবন দীনার (রা) বলিতেন, আবূ সালিহ্ (র) আমাদিগকে জানাইয়াছেন যে, কায়স ইবন সা'দ (রা) অভিযান হইতে ফিরিয়া আসিয়া তাঁহার পিতার নিকট বর্ণনা করিয়াছিলেন, সেনাদলে আমিও ছিলাম। এক সময় সমগ্র সেনাদল ক্ষুধার্ত হইয়া পড়িল। কথাটি শুনিবামাত্র কায়সের পিতা সা'দ (রা) বলিলেন, এমতাবস্থায় তুমি উট যবেহ করিয়া দিতে। কায়স কলিলেন, হাঁ, আমি উট যবেহ করিয়াছিলাম। তিনি বলিলেন, তারপর আবার সবাই খাদ্যসংকটে পড়িল। আবারও পিতা বলিলেন, তুমি উট যবেহ্ করিতে। তিনি বলিলেন, হাঁ, করিয়াছি। তিনি বলিলেন, ইহার পরও সবাই খাদ্যসংকটে পড়িল। সা'দ (রা) বলিলেন, উট যবেহ করিতে। তখন কায়স ইবন সা'দ (রা) বলিলেন, সেনাপতি আমাকে উট যবেহ করিতে নিষেধ করিলেন (বুখারী, কিতাবুল মাগাযী, ২খ., পৃ. ৬২৫-৬২৬)।
সেনাপতি আবূ উবায়দা (রা)-কে রাসূলাল্লাহ (স) রসদ হিসাবে দিয়াছিলেন মাত্র এক থলি খেজুর। তাহা হইতেই সমগ্র বাহিনীর খাদ্য সরবরাহ হইত। এক থলি খেজুরে আর কত দিন চলে! তাহা নিঃশেষ হইয়া আসিল। খাদ্যসংকট চরমে পৌছিল; কিন্তু বীর মুজাহিদগণ বিন্দুমাত্র বিচলিত হইলেন না। কাহারও মুখে প্রতিবাদের কোন শব্দ নাই। হযরত উমার (রা) এই বাহিনীর অন্যতম মুজাহিদ। খাদ্য পরিস্থিতি এত জটিল হইল যে, দিবারাত্র চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে প্রত্যেক মুজাহিদকে একটিমাত্র খেজুর চুষিতে দেওয়া হইত। তারপর তাহারা পেট ভরিয়া পানি পান করিতেন। কিন্তু এই পদ্ধতিতেও সমস্যার সমাধান হইল না। এমন একদিন আসিল যখন শেষ খেজুরটি পর্যন্ত নিঃশেষ হইল। নিরুপায় হইয়া তাহারা বাবুল পাতা ভিজাইয়া খাইতে লাগিলেন। ফলে মুজাহিদগণের চোয়াল ক্ষত-বিক্ষত হইয়া গেল। এইরূপ গুরুতর পরিস্থিতি দেখিয়া জনৈক সাহাবী বলিলেন, এখন শত্রুর সম্মুখীন হইবার শক্তি আমাদের কাহারও নাই। এই উক্তি শ্রবণে হযরত কায়স ইবন সা'দ (রা) অত্যন্ত ব্যথিত হইলেন। তিনি স্থানীয় লোকদের নিট গিয়া বলিলেন, কে এখানে আমার নিকট উট বিক্রয় করিবে? মদীনায় প্রত্যাবর্তন করিলে তাহাকে খেজুর দেওয়া হইবে। জনৈক ব্যক্তি বলিল, আমি তোমার পরিচয় পাইলে দিতে পারি। তিনি পরিচয় দিলেন। ঐ ব্যক্তি তিনটি, মতান্তরে নয়টি উট দিলেন। প্রত্যেকটির মূল্য এক ওয়াসাক বা ষাট সা' খেজুর। কায়স প্রত্যহ একটি উট যবেহ করিতে লাগিলেন। আমীর (অধিনায়ক) তাহাকে তাহা করিতে নিষেধ করিলেন। কারণ তিনি নিজে নিঃস্ব এবং পিতাও জীবিত। সদাশয় কায়স (রা) বলিলেন, আমার পিতা মানুষকে ঋণের দায় হইতে মুক্ত করেন, ক্ষুধার্তকে আহার দান করেন। আমি আল্লাহর পথে মুজাহিদগণের জন্য যে ঋণ গ্রহণ করিয়াছি তাহা কি তিনি আদায় করিবেন না (আবদুল খালেক এম. এ., সাইয়েদুল মুরসালীন, ২খ., পৃ. ৮৫০-৫১)?
হযরত জাবির (রা) বলেন, আমরা জায়শুল খাবাতের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিয়াছিলাম। আবূ উবায়দা (রা)-কে আমাদের সেনাপতি নিযুক্ত করা হইয়াছিল। পথে আমরা ভীষণ খাদ্যাভাবে আক্রান্ত হইয়া পড়ি। তখন সমুদ্র আমাদের জন্য আম্বর নামের একটি মরা মাছ তীরে নিক্ষেপ করিল। আমীর দেখিলেন, ক্ষুধা নিবৃত্তির একটা অভাবনীয় উপায় হইয়া গিয়াছে। তিনি মুজাহিদগণকে বলিলেন, "তাহা মৃত অথচ তোমরাও নিরুপায়। কাজেই তোমরা তাহা ভক্ষণ কর।" আমীরের নির্দেশ পাইয়া তাহারা তাহা ভক্ষণ করিতে শুরু করিলেন। মাছটি আমরা অর্ধমাস আহার করিলাম। আবূ উবায়দা (রা) বলেন, আমরা মদীনায় ফিরিয়া আসিলে রাসূলুল্লাহ্ (স)-কে বিষয়টি অবগত করিলাম। তিনি বলিলেন, উহা তোমাদের জন্য রিযিক; আল্লাহই তোমাদের জন্য পাঠাইয়া দিয়াছেন। তোমাদের নিকট উহার কিছু অবশিষ্ট থাকিলে আমাদিগকেও উহার স্বাদ গ্রহণ করিতে দাও। একজন সাহাবী মাছটির কিছু অংশ রাসূলুল্লাহ্ (স)-কে হাদিয়া পেশ করিলেন। তিনি তাহা খাইলেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ৩১৫; বুখারী, কিতাবুল মাগাযী, ২খ., পৃ. ৬২৬)।
হযরত জাবির (রা) আরো বলেন, মাছটি ছিল বিশালাকার। আমরা উহার চোখের গর্ত হইতে সূর্য তাপে উহার গলিত তৈল কলস ভরিয়া ভরিয়া উঠাইতাম এবং এত এত কলস উঠাইয়াছিলাম। একদা আমাদের আমীর আবু উবায়দা (রা) আমাদের মধ্য হইতে তেরজন লোককে উহার চোখের গর্তের মধ্যে বসাইয়া দিলেন (বুখারী, কিতাবুশ শিরকা, ১খ., পৃ. ৩৩৭)। ইমাম শাফিঈ (র) বলেন, তাহা এক প্রকার সামুদ্রিক জীব। কেহ বলিয়াছেন, আম্বর সামুদ্রিক মৎস।
আরো উল্লেখ্য রহিয়াছে যে, বাহিনী মদীনায় পৌছিবার পূর্বেই নিদারুন খাদ্য সংকটের কথা হযরত সা'د (রা)-এর কর্ণগোচর হইল। হযরত সা'দ (রা) তাঁহার পুত্রের নিকট হইতে দান-খয়রাতের কথা শ্রবণ করিয়া চারটি খেজুর বাগান দান করিয়া দিলেন। সর্বাপেক্ষা ছোটটি হইতে উটের মূল্য পরিশোধ হইল। কায়স (রা)-এর দানশীলতার কথা অবগত হইয়া রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিলেন, দানশীল বংশে তাহার জন্ম। দানশীলতাই ঐ বংশের বৈশিষ্ট্য (সাইয়েদুল মুরসালীন, ২খ., পৃ. ৮৫২)।
ইবনুল কায়্যিম ও ইবন হাজার আল-আসকালানী বলেন, অষ্টম হিজরীতে এই যুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার কথাটি সঠিক নয়। এইজন্য যে, হুদায়বিয়ার সন্ধির পর রাসূলুল্লাহ্ (স) কোন যুদ্ধ অভিযান কুরায়শ বা তাহাদের কোন চুক্তিবদ্ধ বন্ধু গোত্রের বিরুদ্ধে প্রেরণ করিয়াছেন বলিয়া জানা যায় না। রসূলুল্লাহ্ (স) কখনও তাঁহার পক্ষ হইতে কোন চুক্তি ভঙ্গ করিতেন না, বরং এই জাতীয় চুক্তিভঙ্গকে তিনি অত্যন্ত গর্হিত কাজ বলিয়া মনে করিতেন। সুতরাং এই ঘটনাটি সম্ভবত হুদায়বিয়া সন্ধির পূর্বে ষষ্ঠ হিজরীতেই সংঘটিত হইয়াছিল। কিন্তু মাওলানা শাহ আবদুল হক শায়খুল ইসলাম ইবনুল ইরাকীর বরাতে বর্ণনা করেন যে, এই ঘটনা মক্কা বিজয়ের সামান্য পূর্বে এবং কুরায়শদের চুক্তিভঙ্গের পরই সংঘটিত হয়। তাই ইহাতে কোন অসামঞ্জস্য নাই। বাহ্যত ইহাই বিশুদ্ধ মত। কেননা রাসূলুল্লাহ (স) মক্কা বিজয়ের জন্য রমযান মাসেই বাহির হইয়াছিলেন। আর রজব মাসে তিনি এই অভিযান প্রেরণ করিয়াছিলেন। মাঝখানে থাকে কেবল শা'বান মাস। তাই কুরায়শদের চুক্তিভঙ্গের অব্যবহিত পরেই মক্কা বিজয়ের প্রস্তুতি রজব মাসেই শুরু করিয়া থাকিবেন। আর সেই প্রস্তুতিরই একটি অংশ হয়ত এই অভিযানটি (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ২৬২-৬৩)।
এই যুদ্ধ এই কথার সুস্পষ্ট দলীল যে, শত্রু কর্তৃক আক্রান্ত হওয়ার আশংকা থাকিলে হারাম (নিষিদ্ধ) মাসেও যুদ্ধ করা জায়েয। কেননা রাসূলুল্লাহ (স) রজব মাসে এই অভিযান প্রেরণ করিয়াছিলেন। দ্বিতীয়ত, সমুদ্রের মাছ মৃত হইলেও তাহা খাওয়া জায়েয। কেননা সাহাবীগণ যদিও তাহা নিরুপায় হইয়া খাইয়াছিলেন, কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) একান্ত স্বাভাবিক অবস্থায় তাহা ভক্ষণ করিয়াছিলেন। তৃতীয়ত, যে ব্যাপারে শরীআতের সুস্পষ্ট বিধান না পাওয়া যায়, প্রয়োজনে সেখানে নিজেদের বিবেকবুদ্ধি প্রয়োগ করিতে হয়। সাহাবীগণ এই ক্ষেত্রে তাহাই করিয়াছিলেন এবং রাসূলুল্লাহ (স) তাহা অনুমোদনও করিয়াছেন (আসাহ্হুস সিয়ার, পৃ. ২৬৪)।
শান্তি-শৃংখলা প্রতিষ্ঠার জন্য রাসূলুল্লাহ (স)-এর শুদ্ধি অভিযান শুধু মুসলমানদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। হুদায়বিয়ার সন্ধি চুক্তির পর রাসূলুল্লাহ (স) কুরায়শ কাফিরদের বাণিজ্যিক কাফেলাকেও হেফাযত করিতেন। হিজরী অষ্টম সালে কুরায়শদের বাণিজ্যিক কাফেলা সিরিয়া হইতে প্রত্যাবর্তন করিতেছিল। পথিমধ্যে জুহায়না গোত্র সম্পর্কে তাহাদের ভয় ছিল। তাই রাসূলুল্লাহ (স) অর্থাৎ আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহের নেতৃত্বে তিন শত মুসলমানের এক বাহিনীকে তাঁহাদের নিরাপত্তা বিধানের নিমিত্ত পাঠাইয়াছিলেন। এই বাহিনীতে হযরত উমার (রা)-ও ছিলেন (শিবলী নু'মানী ও সায়্যিদ সুলায়মান নদবী, সীরাতুন নবী, ১খ., পৃ. ৩৪১)।
এই অভিযানের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বিভিন্ন মত রহিয়াছে। (১) মূল রাবী হযরত জাবির (রা) খোদ এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন। তিনি বলেন, জুহায়না গোত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিবার জন্য এই বাহিনী প্রেরণ করা হইয়াছিল। (২) কুরায়শদের বাণিজ্যিক কাফেলার প্রতি দৃষ্টি রাখিবার জন্য এই বাহিনী প্রেরণ করা হইয়াছিল।
ইহা দ্বারা বাহ্যত বুঝা যায় যে, এই বাহিনী প্রেরণের উদ্দেশ্য ছিল কুরায়শদের বাণিজ্যিক কাফেলা লুণ্ঠন করা। কিন্তু ইহা গুরতর ভুল। কারণ ইহা ছিল হুদায়বিয়া সন্ধি চুক্তির পরবর্তী সময়। এইজন্য উপরিউক্ত উদ্ধৃতির মর্ম এই হইবে যে, এই অভিযান কুরায়শদের বাণিজ্যিক কাফেলা হেফাজতকল্পে এবং জুহায়না গোত্রের আক্রমণ প্রতিরোধকল্পে প্রেরিত হইয়াছিল। হাফেজ ইব্‌ن হাজার এই মতই প্রকাশ করিয়াছেন (ফাতহুল বারী, ৮খ., পৃ. ৬১-৬২)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সারিয়‍্যা জামূম / জামূহ

📄 সারিয়‍্যা জামূম / জামূহ


৬ষ্ঠ হিজরীর রবীউল আখির মাস। রাসূলুল্লাহ (স) হযরত যায়দ ইব্‌ن হারিছা (রা)-র নেতৃত্বে বানু সুলায়মের বিরুদ্ধে একদল সৈন্য প্রেরণ করেন। হযরত যা'য়দ ইব্‌ن হারিছা মদীনা হইতে ৪ মাইল দূরে বাতনে নাখলার উত্তর পার্শ্বে জামূম নামক স্থানে যাত্রাবিরতি করিলেন। হালীমা নাম্নী এক মহিলার সঙ্গে তাহাদের সাক্ষাত হইল। তাহারই দিকনির্দেশনায় বানু সুলায়মের জনপদের সন্ধান মিলিল। হযরত যায়দ ইব্‌ন হারিছা (রা) বানু সুলায়ম-এর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করিলেন। শত্রুপক্ষ পরাজিত হইল। প্রচুর পরিমাণে যুদ্ধলব্ধ সামগ্রী ও বন্দী হস্তগত হইল। হযরত যায়েদ ইবন হারিছা যুদ্ধবন্দী ও যুদ্ধলব্ধ সামগ্রী লইয়া রাত্রেই মদীনায় প্রত্যাবর্তন করিলেন। বন্দীদের মধ্যে হালীমার স্বামীও ছিল। রাসূলুল্লাহ (স) উভয়কে ক্ষমা করিয়াছেন (ইবন সা'দ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, ২খ., পৃ. ৬৮; শায়খ আবদুল হক, মাদারিজুন নুবুওয়াহ, ২খ., পৃ. ৩৩২; মহানবী (স)-এর জীবনী বিশ্বকোষ, ১খ., পৃ. ৩৬৩ ২০০০ সাল; ইবন হিশাম, সীরাতুন নবী, ২খ., প. ২৭; হাফেজ ইব্‌ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ১৮০; ইব্‌ন সায়্যিদিন্নাস, 'উয়ূনুল আছার, ২খ., পৃ. ১৪৪)।

প্রন্থপঞ্জীঃ (১) ইবন সা'দ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, ২খ., দারু সাদির, বৈরূত তা. বি.; (২) শায়খ আবদুল হক মুহাদ্দিছ দিহাবী, মাদারিজুন নুবওয়াহ (উর্দু) ২খ., আদবী দুনিয়া, ৫১০, মাটিয়া মহল, ১৯৯২ খৃ.; (৩) মহানবী (স)-এর জীবনী বিশ্বকোষ, ১খ., দারুল ওয়ানীলা প্রকাশনী, ঢাকা; (৪) ইন্ন হিশাম, সীরাতুন নবী, ২খ., ই'তিকাদ পাবলিশিং হাউস, দিল্লী ১৯৮২; (৫) ইন্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, কায়রো, তা. বি.; (৬) ইন সায়্যিদিন্নাস, 'উয়ুনুল আছার, দারুল কালাম, বৈরূত ১৯৯৩ খৃ.)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সারিয়‍্যা আল-ঈস

📄 সারিয়‍্যা আল-ঈস


৬ষ্ঠ হিজরী জুমাদাল উলা মাস। মহানবী (স) জানিতে পারিলেন, কুরায়শদের একটি কাফেলা সিরিয়া হইতে প্রত্যাগমন করিতেছে। তিনি হযরত যায়দ ইবন হারিছার নেতৃত্বে একশত সত্তরজন উষ্ট্রারোহী সাহাবীর একটি দল উক্ত কুরায়শ কাফেলাকে প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে প্রেরণ করিলেন। মদীনা হইতে চারি দিনের পথ অতিক্রম করিলে আল-ঈস নামক স্থানে হযরত যায়দ ইবন হারিছার বাহিনী কুরায়শদের 'মুখামুখী হইল। ঝটিকা আক্রমণে মুসলিম বাহিনী কুরায়শদিগকে পর্যুদস্ত করিল। প্রচুর যুদ্ধলব্ধ সামগ্রী ও বন্দী মুসলমানগণের হস্তগত হইল। যুদ্ধলব্ধ সামগ্রীর মধ্যে রৌপ্য ছিল প্রচুর পরিমাণে। আর সেই রৌপ্যের মালিক ছিল কুরায়শ ধনকুবের সাফওয়ান ইবন উমায়্যা।
মহানবী (স)-এর কন্যা হযরত যয়নাবের স্বামী ছিল আবুল আস ইব্‌নুর রবী'। ইব্‌ن ইসহাক (র) বলেন, আবুল আস বসবাস করিতেন মক্কা নগরীতে। মহানবী (স) স্বীয় কন্যা হযরত যয়নাবকে তাহার সহিত বিবাহ দেন। রাসূলুল্লাহ (স)-এর নুবুওয়াত প্রাপ্তির পর ধর্মীয় বিধানানুসারে আবুল আস ও হযরত যয়নাবের বৈবাহিক সম্পর্কে বিচ্ছেদ ঘটে। হযরত যয়নাব মহানবী (স)-এর নিকট মদীনাতে ফিরিয়া যান।
মক্কা বিজয়ের কিছুদিন পূর্বে আবুল আস বাণিজ্য উপলক্ষ্যে কুরায়শ কাফেলার সহিত সিরিয়া গমন করেন। তাহার নিজস্ব পণ্যসামগ্রী ব্যতীত অন্যান্যদের পণ্যসামগ্রীও তাহার তত্ত্বাবধানে ছিল। বাণিজ্যিক কার্যক্রম সমাপ্তির পর সিরিয়া হইতে প্রত্যাবর্তনকালে কুরায়ش কাফেলা হযরত যায়দ ইব্‌ن হারিছার বাহিনী কর্তৃক আক্রান্ত হইলে তিনি রাত্রির অন্ধকারে বাহিনীর অগোচরে পালাইয়া প্রাণে রক্ষা পান। তাহার মালামাল বাহিনী কর্তৃক বাজেয়াপ্ত হয়। বন্দী ও যুদ্ধলব্ধ সামগ্রী মদীনায় আনয়ন করা হইল। আবুল আস রাত্রির অন্ধকারে মহানবী (س)-এর কন্যা হযرت যয়নাবের নিকট উপস্থিত হইয়া আশ্রয়প্রার্থী হন। তিনি তাহাকে আশ্রয় প্রদান করেন।
ইয়াযীদ ইব্‌ন রুমমানের বর্ণনানুসারে জানা যায়، হযرت যয়নাব فजर نامায সমাপনান্তে، মহিলাগণের نامায আদায়ের স্থান হইতে উচ্চস্বরে ঘোষণা দেন، 'হে জনতা! তোমরা জানিয়া রাখ، আমি আবুল আসকে আশ্রয় প্রদান করিলাম।' نامায শেষে মহানবী (স) উপস্থিত জনতাকে লক্ষ করিয়া বলিলেন، 'আমি যাহা শুনিয়াছি তোমরাও কি তাহা শুনিয়াছ?' জনগণ সমস্বরে বলিল، হাঁ। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন، 'ওহে জনতা! তোমরা জানিয়া রাখ، যাঁহার হস্তে আমার জীবন তাঁহার শপথ করিয়া বলিতেছি، "মুসলমানদের যে কোন ব্যক্তির জন্য অপর একজনকে আশ্রয় প্রادানের অধিকার রহিয়াছে"। অতঃপর তিনি তাঁহার কন্যার নিকট গমন করিলেন এবং বলিলেন، যয়নাব! আবুল আস তোমার সৌজন্যের অধিকার রাখে। তবে সে তোমার ঐকান্তিকতার অধিকার হইতে বঞ্চিত। এখন সে আর তোমার জন্য হালাল নহে।
হযرت আবদুল্লাহ ইব্‌ن আবূ বাকر-এর উদ্ধৃতিতে ইन्न ইসহাক বলেন، যাহারা আবুল আসের সম্পদগুলী বণ্টন করিয়া লইয়াছিল، তাহাদিগকে ডাকিয়া মহানবী (স) বলিলেন، "তোমরা উত্তমরূপে জান যে، আবুল আসের সহিত আমার কিরূপ সম্পর্ক। আজ তোমরা তাহার সম্পদগুলি বাজেয়াপ্ত করিয়া নিজেদের মধ্যে বণ্টন করিয়া লইয়াছ। যদি তোমরা তাহার প্রতি সৌজন্য প্রকাশ করিয়া সম্পদগুলি তাহাকে প্রত্যর্পণ কর، তাহা হইলে বিষয়টি আমার খুবই মনঃপূত হইবে। আর যদি তোমরা অস্বীকার কর সেই ক্ষেত্রেও তোমাদের কোন অপরাধ হইবে না। কারণ যুদ্ধলব্ধ সামগ্রীতে তোমাদের অবশ্যই অধিকার রহিয়াছে। সকল সাহাবা কিরামই তাহার সমুদয় সম্পদ ফেরত দিলেন।
ইহার পর আবুল আস তাহার যাবতীয় মালামালসহ মক্কায় পৌছিলেন। অপরের যাহা কিছু তাহার নিকট ছিল তাহাদিগকে তাহা প্রত্যর্পণ করিলেন। অতঃপর তিনি কুরায়شদিগকে ডাকিয়া বলিলেন، “হে কুরায়شগণ! আমার নিকট তোমাদের আর কোন দাবি আছে কি?” তাহারা সমস্বরে বলিল، আল্লাহ তোমাকে উত্তম বিনিময় দান করুন। তোমার নিকট আমাদের আর কোন প্রাপ্য নাই। এইবার আবুল আস সজোরে ঘোষণা দিলেন، 'এক আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ নাই، হযرت محمد (س) তাঁহার প্রেরিত রাসূল।'
হযرت ইব্‌ن আব্বাস সূত্রে ইন্ন ইসহাক বলেন, বিবাহ বিচ্ছেদের সুদীর্ঘ ছয় বৎসর পর আবুল আস মুসলমান হলে মহানবী (স) তাঁর কন্যা যয়নব ও আবুল আসের পূর্বের বৈবাহিক সম্পর্ক বহাল রাখেন। হযরত যয়নব পুনরায় স্বামীগৃহে গমন করেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00