📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 গাযওয়া বানু লিয়ান

📄 গাযওয়া বানু লিয়ান


বানু লিহয়ান (বা লাহয়ান) কুরায়শের অন্যতম পূর্বপুরুষ মুদার ইন্ন নিযারের প্রপৌত্র হুযায়লের বংশধর (ইবন হাম্, জামহারাতু আনসাবিল আরাব, ৩খ., পৃ. ১৯৬)। আরব বংশবিশারদ হামদানীর মতে, তাহারা মূলত জুরহুমের সন্তান-সন্ততি। কিন্তু হুযায়ল গোত্রে অনুপ্রবেশ করিয়াছিল বলিয়া তাহাদেরকেও হুযায়লের দিকে সম্বন্ধ করা হইত (আল-আয়নী, উমদাতুল কারী, ১৭খ., পৃ. ১৬৯)। বানু লিহয়ান হিজাযের বিস্তীর্ণ উপত্যকা গুরানে (غران) বসবাস করিত। ইহা ওয়াদিল-আযরাক (وادی الازرق) নামেও পরিচিত ছিল। ইহা মক্কার নিকটে আমজ (أمج) ও 'উসফানের (عسفان) মধ্যে সায়াহ (سایة) পর্যন্ত বিস্তৃত ৫ মাইল ব্যাপী একটি বিশাল জনপদ (ইয়াকৃত আল-হামাবী, মুজামুল বুলদান, ৪খ., পৃ. ১৯১)। তাহারা হিজরী ৪র্থ সালের সফর মাসে (মে ৬২৫ খৃ.) আর-রাজী' নামক স্থানে প্রতারণার মাধ্যমে হযরত 'আসিম ইব্‌ন ছাবিত (রা) ও তাঁহার সফর সঙ্গীকে গ্রেফতার করে, হযরত যায়দ ও খুবায়বকে বন্দী করিয়া মক্কায় লইয়া যায় এবং নৃশংসভাবে হত্যা করে। পরে ঐ দুইজনকেও হত্যা করে। ইহার অব্যবহিত পরে সেই একই মাসে, মতান্তরে ইহার পূর্ববর্তী (মুহাম্মাদ রিদা, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্, ১৯৭৫ খৃ., পৃ. ২৪৩) মুহাররম মাসে হুযায়ল গোত্রের এলাকার অন্তর্গত বি'রে মা'উনায় (بئر معونة)-ও ৭০ জন কুরআন বিশেষজ্ঞ সাহাবী অনুরূপভাবে প্রতারণার শিকার হইয়া নৃশংসভাবে শাহাদাত বরণ করেন (যুরকানী, শারহুল মাওয়াহিব, ২খ., পৃ. ১৪৭)। মহানবী (স) এই দুইটি ঘটনায় অত্যন্ত মর্মাহত হন। তাই তিনি এই শহীদদের রক্তের প্রতিশোধ লওয়ার জন্য মদীনায় আব্দুল্লাহ্ ইবনু উম্মে মাকতুম (রা)-কে তাঁহার স্থলাভিষিক্ত করিয়া নিজেই বিশজন অশ্বারোহীসহ দুই শতজন আনসার ও মুহাজির সমভিব্যাহারে বানু লিয়ানের উদ্দেশে অভিযানে বাহির হন (প্রাগুক্ত)।
এই অভিযান কোন সালে এবং কোন মাসে সংঘটিত হয় সেই সম্পর্কে সীরাতবিশারদ ও ইতিহাসবিদদের বিভিন্ন মত পরিলক্ষিত হয়। ইবন সা'দের মতে রাসূলুল্লাহ (স) ৬ষ্ঠ হিজরীর ১ রাবীউল আওয়াল (জুলাই ৬২৭ খৃ.) বান্ লিহয়ানের উদ্দেশে বাহির হন (যুরকানী, শারহুল মাওয়াহিব, ২খ., পৃ. ১৪৬)। ইন্ন ইসহাক, ইন্ন হিশাম, ইবনুল আছীর, তাবারী ও ইবন 'আবদুল-বারর প্রমুখ প্রসিদ্ধ সীরাতবেত্তাদের মতে, ইহা হিজরী ৫ম সালের যুল-হিজ্জা মাসে (এপ্রিল-মে ৬২৭ খৃ.) সংঘটিত বানু কুরায়মার যুদ্ধে জয়লাভ করার ছয়মাস পর হিজরী ৬ষ্ঠ সালের জুমাদাল-উলায় (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ৬২৭ খৃ.) সংঘটিত হয় (ইব্‌ন হিশাম, আস-সীরা)। হাফিজ ইবন হাযম বলেন, "বিশুদ্ধ অভিমত অনুসারে ইহা হিজরী ৫ম সালে সংঘটিত হয়” (প্রাগুক্ত; ইবনুল আছীর, আল-কামিল, ২খ., পৃ. ১৮৮)। যুরকানী বলেন, "কাহারো কাহারো মতে ইহা হিজরী ৪র্থ সালে সংঘটিত হয়। কাহারো মতে ইহা রজব মাসে, আর কাহারো মতে শা'বান মাসে সংঘটিত হয়” (প্রাগুক্ত)।
এই সফরে রাসূলুল্লাহ (স) কোনদিকে রওয়ানা হইবেন, যুদ্ধকৌশল হিসাবে তাহা প্রথমে প্রকাশ করেন নাই। কারণ, ইহাতে শত্রুরা তাঁহার অভিযানের উদ্দেশ্য জানিয়া ফেলার আশংকা ছিল। তাই তিনি মদীনা হইতে বাহির হওয়ার সময় মদীনার উত্তর প্রান্তে সিরিয়ার রাস্তায় অবস্থিত গুরাব (غراب) পর্বতের পথ ধরিয়া অগ্রসর হন। অতঃপর তিনি মাহীস (محيص) হইয়া রাত্রা (بتراء)-য় আসেন। এখানে পৌঁছিয়া তিনি বামদিকে গতি পরিবর্তন করেন এবং মদীনার বায়ন (بین) উপত্যকা হইয়া সুখায়রাতুল ইয়ামামে (صخيرات اليمام) গিয়া পৌঁছেন এখানে আসিয়া রাসূলুল্লাহ (স) দক্ষিণে সোজা মক্কার দিকে দ্রুত গতিতে চলিতে শুরু করেন। এইভাবে তিনি তাঁহার সৈন্যদল লইয়া বানু লিয়ানদের আবাসভূমি গুরান উপত্যকায় পৌঁছেন (ইব্‌ন হিশাম, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৩৩)। এইখানেই রাজী' নামক প্রস্রবণের পাশে আসিম ইন্ন ছাবিত (রা) ও তাঁহার সাথীগণ প্রতারণার শিকার হন এবং শাহাদাত বরণ করেন। রাসূলুল্লাহ (স) এখানে পৌঁছিয়া তাঁহাদের জন্য রহমত ও মাগফিরাতের দু'আ করেন (ইবন কায়্যিম, যাদুল মা'আদ, ২খ., পৃ. ১১৯)।
ঘটনাক্রমে বান্ লিয়ান গোত্রের লোকেরা অনেক আগে হইতেই রাসূলুল্লাহ (স)-এর আগমনের সংবাদ পাইয়া যায় (তাবারী, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩০৫)। সম্ভবত রাসূলুল্লাহ (স) যেই স্থান হইতে গতি পরিবর্তন করিয়া উত্তর দিক হইতে দক্ষিণ দিকে রওয়ানা হন সেখানে বানূ লিয়ান গোত্রের কোন লোক তাহা দেখিয়া ফেলে। সে অতি দ্রুত আসিয়া তাহার গোত্রের লোকদেরকে এই খবর দেয়। তাহারা এই খবর পাইয়া অত্যন্ত ভীত হইয়া পড়ে এবং নিজেদের গবাদিপশু ও প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র লইয়া বিভিন্ন পাহাড়ের চূড়ায় গিয়া আত্মগোপন করে (ড. মুহাম্মাদ হ'সায়ন হায়কাল, বাংলা অনু. মহানবীর জীবন চরিত, পৃ. ৪৫৯)। তিনি তাহাদের এলাকায় দুই দিন (হালাবী, প্রাগুক্ত, ১খ., পৃ. ৬৭৭), মতান্তরে একদিন (কান্ধলবী, সীরাতুল মুস্তাফা, ২খ., পৃ. ২৯) অবস্থান করেন এবং তাহাদের পশ্চাদ্ধাবনের উদ্দেশ্যে এখান হইতে বিভিন্ন দিকে ছোট ছোট কয়েকটি অভিযান প্রেরণ করেন। কিন্তু কোথাও তাহাদের খোঁজ পাওয়া যায় নাই (দানাপুরী, আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ১৫৩)।
অবশেষে তাহাদের সঙ্গে সাক্ষাতের আশা ত্যাগ করিয়া মক্কার দিকে অগ্রসর হন এবং উসফান উপত্যকায় গিয়া পৌঁছেন। ইহার পিছনে রাসূলুল্লাহ (স)-এর উদ্দেশ্য ছিল, মক্কাবাসীরা দেখিবে যে, মুসলমানগণ মক্কায় আসিয়াছেন এবং ইহার ফলে তাহারা বিচলিত ও ভীতসন্ত্রস্ত হইয়া পড়িবে (ইবনুল আছীর, প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ১৮৮)। উসফান হইতে রাসূলুল্লাহ (স) হযরত আবূ বাক্স (রা) (যুরকানী, প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ১৪৭) কিংবা হযরত সা'দ ইবন উবাদা'র নেতৃত্বে দুইজন (ইবন হিশাম, প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ৩৩৩), মতান্তরে দশজন (ইবনুল কায়্যিম, প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ১১৯) অশ্বারোহীকে অথবা দুইজনেরই নেতৃত্বে দুইটি পৃথক অশ্বারোহী দলকে আরও সম্মুখে প্রেরণ করেন (যুরকানী, প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ১৪৭)। তাহারা নির্বিঘ্নে কুরা'উল গামীম (كراع الغميم) পর্যন্ত গিয়া ফিরিয়া আসেন (মুখতাসার তারীখির রাসূল, পৃ. ২৯২)। রাসূলুল্লাহ (স) সম্পূর্ণ নিরাপদ ও নির্ঝঞ্ঝাট অবস্থায় সৈন্যবাহিনীসহ মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন (কান্ধলবী, প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ২৯)। এই সফরে রাসূলুল্লাহ (স) ১৪ দিন মদীনার বাহিরে অবস্থান করেন, (দানাপুরী, প্রাগুক্ত, ১৫৪)। হযরত জাবির ইবন 'আবদুল্লাহ (রা) বলেন, মদীনার দিকে প্রত্যাবর্তনের সময় আমি রাসূলুল্লাহ (স)-কে এই দু'আ পাঠ করিতে শুনিয়াছি: آئبون تائبون إن شاء الله لربنا حامدون أعوذ بالله من وعثاء السفر وكآبة المنقلب وسوء المنظر في الأهل والمال.
"আমরা ফিরিয়া আসিয়াছি। আল্লাহ চাহিলে আমরা ফিরিয়া গমন করিব। আমরা আমাদের প্রতিপালকের প্রশংসা করিতেছি। আমি সফরের দুঃখ-কষ্ট, খারাপ পরিণাম এবং পরিবার-পরিজন ও ধন-সম্পদের বেহাল অবস্থা দর্শন হইতে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করিতেছি” (ইবন হিশam, প্রাগুক্ত, ২খ., ৩৩৩)।

গ্রন্থপঞ্জীঃ (১) ইব্‌ন হাযম আল-আন্দালুসী, জামহারাতু আন্সابিল আরাব, বৈরূত ১৯৮৩ খৃ.; (২) আল-'আয়নী বাদরুদ্দীন আবূ মুহাম্মাদ, 'উমদাতুল কারী, বৈরূত, ১৭খ.; (৩) আবূ 'আবদুল্লাহ ইয়াকৃত, আল-হামাবী মু'জামুল বুলদান, বৈরূত ১৯৫৭ খৃ., ৪খ.; (৪) আয-যুরকানী, শারহুল মাওয়াহিবিল লাদুন্নিয়্যা, বৈরূত ১৯৭৩ খৃ., ২খ., (৫) মুহাম্মাদ রিদা, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ, বৈরূত ১৯৭৫ খৃ., পৃ. ২৪৩; (৬) ইব্‌ন হিশام, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা (অনু. 'আবদুল জলীল সিদ্দীকী ও অন্যান্য), দিল্লী ১৯৯৫ খৃ., ২খ.; (৭) আত-তাবারী, তারীখু তাবারী (অনু. সায়্যিদ মুহাম্মাদ ইব্রাহীম নাদনী), করাচী ১৯৮৭ খৃ., ১খ. (সীরাতুন্নবী), পৃ. ৩০৫; (৮) ইবনুল আহীর, আল-কামিল ফিত্-তারীখ, বৈরূত ১৯৬৫ খৃ., ২খ. পৃ. ১৮৮; (৯) ইবনুল কায়্যিম আল-জাওযিয়্যা, যাদুল মা'আদ, বৈরূত তা. বি, ২খ, পৃ. ১১৯; (১০) হায়কাল ডঃ মুহাম্মাদ হোসায়ন, The Life of Muhammad (বাংলা অনু. মহানবীর জীবন চরিত), বাংলাদেশ (ই.. ফা.বা), ১৯৯৮ খৃ., পৃ. ৪৫৯; (১১) কান্ধলাবী, মুহাম্মাদ ইদ্রীস, সীরাতুল মুসতাফা, দিল্লী ১৯৯৫ খৃ., ২খ.; (১২) আবুল বারাকাত আবদুর রাউফ, আসাহ্হুস সিয়ার, কলিকাতা ১৯৮২ খৃ.; (১৩) আবদুল্লাহ, মুখতাসারু সীরাতির, রাসূল, লাহোর ১৯৭৯খৃ., পৃ. ২৯২।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সারিয়‍্যা উক্বাশা ইন্ন মিহসান (রা)

📄 সারিয়‍্যা উক্বাশা ইন্ন মিহসান (রা)


ইহা ৬ষ্ঠ হিজরী সনের রবীউল আওয়াল মাসে সংঘটিত হইয়াছিল। রাসূলুল্লাহ (স) হযরত উক্বাশা ইব্‌ন মিহসান আল-আসাদী (রা)-কে চল্লিশজনের একটি দলসহ বানু আসাদের মুকাবিলায় গামার নামক স্থানে প্রেরণ করেন। গামার বানু আসাদের কূপের নাম। মদীনা হইতে তাহা দুই রাত্রের দূরত্বে অবস্থিত ('উয়ূনুল আছার, ২খ., পৃ. ১০৩-৪; শারহু মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়‍্যা, ২খ., পৃ. ১৫৩-৫৪)। এই অভিযানে ছাবিত ইব্‌ন আকরাম, সিবা' ইব্‌ন ওয়াহ্হ্ব (মতান্তরে শুয়া ইন্ন ওয়াত্ব) ও ইয়াযীদ ইব্‌ন্ন রুকায়শও ছিলেন (কিতাবুল-মাগাযী ২খ., পৃ. ৫৫০; 'উয়ূনুল আছার, ২খ., পৃ. ১০৪)। তাহারা অতি ক্ষিপ্রতার সহিত গামার অভিমুখে রওয়ানা হন। কিন্তু বানু আসাদের লোকেরা তাহাদের আগমন সংবাদ পাইয়া স্বীয় ঘরবাড়ি শূন্য করিয়া পাহাড়ের দিকে পলায়ন করে। মুসলিম বাহিনী তথায় পৌঁছিয়া বানু আসাদের ঘরবাড়ি শূন্য দেখিতে পান এবং কাহাকেও খুঁজিয়া না পাইয়া শুজা' ইব্‌ন ওয়াহ্হ্বকে প্রকৃত ব্যাপার জানিবার জন্য প্রেরণ করেন। তিনি তাহাদের কাহাকেও পাইলেন না, তবে এক ব্যক্তিকে পাকড়াও করেন এবং তাহাদের গৃহপালিত পশু ও উহার চারণভূমির সন্ধান পান। আর সেই ব্যক্তিকে নিরাপত্তা প্রদান করা হয়। অতঃপর তাহাকে লইয়া বানু আসাদের চারণভূমিতে গিয়া দুই শত উট গনীমত হিসাবে লাভ করেন। পরে সেইগুলি মদীনায় লইয়া আসেন এবং রাসুলুল্লাহ (স)-এর নিকট পেশ করেন। পথে তাহারা আর কোন প্রতিরোধের সম্মুখীন হন নাই (উয়ূনুল আছার, ২খ., পৃ. ১০৩-৪; শারহু মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়্যা, ২খ., পৃ. ১৫৩-৫৪; তাবাকাতে ইবন সা'দ, ২খ., পৃ. ৮৪-৮৫; কিতাবুল মাগাযী, ২খ., পৃ. ৫৫০; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ১৯৪)।
ইব্‌ন আয়্যব বলেন, এই সারিয়ার আমীর ছিলেন ছাবিত ইন্ন আকরাম (রা) এবং তাঁহার সঙ্গে উককাশা ইন্ন মিহসান আল-আসাদী (রা)। সম্ভবত তাঁহারা উভয়ে আমীর ছিলেনঃ অভিযানের শুরুতে ছিলেন একজন এবং অভিযানের শেষদিকে ছিলেন আরেকজন আমীর (শারহু মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়্যা, ২খ., পৃ. ১৫৩)।

গ্রন্থপঞ্জী: বরাত নিবন্ধগর্ভে প্রদত্ত হইয়াছে।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সারিয়‍্যা আবূ উবায়দা ইবনুল জাররাহ (রা)

📄 সারিয়‍্যা আবূ উবায়দা ইবনুল জাররাহ (রা)


অষ্টম হিজরীর রজব মাসে এই অভিযান পরিচালিত হইয়াছিল। এই অভিযানের প্রসিদ্ধ নাম সারিয়‍্যাতুল-খাত। খাত কাঁটাযুক্ত গাছ, শুক্ক পাতা, অর্থ বাবুল গাছের পাতা। রসদের অভাবে মুজাহিদগণকে বাবুল গাছের পাতা ভক্ষণ করিতে হইয়াছিল বলিয়া উক্ত নামকরণ করা হইয়াছে। বুখারী শরীফে এই অভিযান 'সায়ফুল বাহ্' বা 'সীফুল বাহ্' নামে পরিচিত। ইহা মদীনা হইতে পাঁচ দিনের পথের দূরত্বে সমুদ্রোপকূলে সংঘটিত হইয়াছে বলিয়া এই নামকরণ করা হয়। সেখানে জুহায়না কবিলার একটি গোত্র বাস করিত। কাহারও অভিমত এই যে, কুরায়শ কাফেলার গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য উক্ত অভিযান পরিচালিত হইয়াছিল। মুজাহিদগণ সেখানে এক পক্ষকাল অবস্থান করেন। বাহিনীর আমীর ছিলেন আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ (রা)।
জাবির ইব্‌ন আবদিল্লাহ্ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (স) সমুদ্র সৈকতের দিকে একটি সৈন্যবাহিনী পাঠাইলেন। আবূ উবায়দা ইবনুল জাররাহ্ (রা)-কে তাহাদের আমীর নিযুক্ত করেন। তাহারা সংখ্যায় ছিল তিন শত, তন্মধ্যে আমিও ছিলাম। আমরা যুদ্ধের জন্য বাহির হইলাম। আমরা পথ চলিতেছিলাম; পথিমধ্যে আমাদের রসদপত্র নিঃশেষ হইয়া গেল। তাই আবু উবায়দা (রা) সমগ্র সেনাদলের অবশিষ্ট পাথেয় একত্র করিতে আদেশ দিলেন। অতএব সকল খাদ্যসামগ্রী একত্র করা হইল। দেখা গেল, মাত্র দুই থলে খেজুর রহিয়াছে। ইহার পর তিনি অল্প অল্প করিয়া আমাদের মধ্যে খাদ্য বণ্টন করিতে লাগিলেন। পরিশেষে তাহাও শেষ হইয়া গেল। তখন আমাদের প্রত্যেকের জন্য একটি মাত্র খেজুর রহিল। বর্ণনাকারী বলেন, আমি জাবির (রা)-কে বলিলাম, একটি করিয়া খেজুর খাইয়া আপনাদের কতটুকু ক্ষুধা নিবারণ হইত? তিনি বলিলেন, আল্লাহ্র কসম! একটি খেজুর পাওয়াও বন্ধ হইয়া গেলে আমরা একটির কদরও অনুভব করিতে লাগিলাম। ইহার পর আমরা সমুদ্র পর্যন্ত পৌঁছিয়া গেলাম। তখন আমরা পাহাড়ের মত বড় মাছ পাইয়া গেলাম। আমরা সকলে আঠার দিন পর্যন্ত তাহা খাইলাম। তারপর আবূ উবায়দা (রা) মাছটির পাঁজরের দুইটি হাড় আনিতে হুকুম দিলেন। দুইটি হাড় আনা হইলে সেগুলি দাঁড় করানো হইল। ইহার পর তিনি একটি সওয়ারী তৈয়ার করিতে বলিলেন; সওয়ারী তৈয়ার হইল এবং হাড় দুইটির নিচে দিয়া সওয়ারীটি অতিক্রম করিল, কিন্তু হাড় দুইটি স্পর্শ করিল না (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ৩১৪, ৩১৫; বুখারী, কিতাবুল মাগাযী, ২খ., পৃ. ৬২৫)।
জাবির ইব্‌ন আবদিল্লাহ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) আমাদের তিন শত সওয়ারীর একটি সৈন্যবাহিনীকে কুরায়শদের একটি কাফেলার উপর সুযোগমত আক্রমণ করার জন্য পাঠাইয়াছিলেন। আবূ উবায়দা ইবনুল জাররাহ (রা) ছিলেন আমাদের সেনাপতি। আমরা অর্ধমাস পর্যন্ত সমুদ্র সৈকতে অবস্থান করিলাম। ইতোমধ্যে রসদপত্র নিঃশেষ হইয়া গেল। আমরা ভীষণ দুর্ভিক্ষের শিকার হইলাম। অবশেষে ক্ষুধার যন্ত্রণায় আমরা গাছের পাতা পর্যন্ত খাইতে থাকিলাম। এইজন্যই এই সৈন্যবাহিনীর নাম রাখা হইয়াছে জায়শুল খাবাত অর্থাৎ পাতাওয়ালা সেনাদল। ইহার পর সমুদ্র আমাদের জন্য আম্বর (তিমি মাছ) নামক একটি প্রাণী নিক্ষেপ করিল। আমরা অর্ধমাস পর্যন্ত তাহা খাইলাম। ইহার চর্বি শরীরে লাগাইলাম। ফলে আমাদের শরীর পূর্বের ন্যায় হৃষ্টপুষ্ট হইয়া গেল।
জাবির (রা) বলেন, সেনাদলের এক ব্যক্তি খাদ্যের অভাব দেখিয়া প্রথমে তিনটি উট যবেহ করিলেন, তারপর আরও তিনটি উট যবেহ্ করিলেন, তারপর আরও তিনটি উট যবেহ করিলেন। ইহার পর আবু উবায়দা (রা) তাহাকে উট যবেহ্ করিতে নিষেধ করিলেন। আমর ইবন দীনার (রা) বলিতেন, আবূ সালিহ্ (র) আমাদিগকে জানাইয়াছেন যে, কায়স ইবন সা'দ (রা) অভিযান হইতে ফিরিয়া আসিয়া তাঁহার পিতার নিকট বর্ণনা করিয়াছিলেন, সেনাদলে আমিও ছিলাম। এক সময় সমগ্র সেনাদল ক্ষুধার্ত হইয়া পড়িল। কথাটি শুনিবামাত্র কায়সের পিতা সা'দ (রা) বলিলেন, এমতাবস্থায় তুমি উট যবেহ করিয়া দিতে। কায়স কলিলেন, হাঁ, আমি উট যবেহ করিয়াছিলাম। তিনি বলিলেন, তারপর আবার সবাই খাদ্যসংকটে পড়িল। আবারও পিতা বলিলেন, তুমি উট যবেহ্ করিতে। তিনি বলিলেন, হাঁ, করিয়াছি। তিনি বলিলেন, ইহার পরও সবাই খাদ্যসংকটে পড়িল। সা'দ (রা) বলিলেন, উট যবেহ করিতে। তখন কায়স ইবন সা'দ (রা) বলিলেন, সেনাপতি আমাকে উট যবেহ করিতে নিষেধ করিলেন (বুখারী, কিতাবুল মাগাযী, ২খ., পৃ. ৬২৫-৬২৬)।
সেনাপতি আবূ উবায়দা (রা)-কে রাসূলাল্লাহ (স) রসদ হিসাবে দিয়াছিলেন মাত্র এক থলি খেজুর। তাহা হইতেই সমগ্র বাহিনীর খাদ্য সরবরাহ হইত। এক থলি খেজুরে আর কত দিন চলে! তাহা নিঃশেষ হইয়া আসিল। খাদ্যসংকট চরমে পৌছিল; কিন্তু বীর মুজাহিদগণ বিন্দুমাত্র বিচলিত হইলেন না। কাহারও মুখে প্রতিবাদের কোন শব্দ নাই। হযরত উমার (রা) এই বাহিনীর অন্যতম মুজাহিদ। খাদ্য পরিস্থিতি এত জটিল হইল যে, দিবারাত্র চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে প্রত্যেক মুজাহিদকে একটিমাত্র খেজুর চুষিতে দেওয়া হইত। তারপর তাহারা পেট ভরিয়া পানি পান করিতেন। কিন্তু এই পদ্ধতিতেও সমস্যার সমাধান হইল না। এমন একদিন আসিল যখন শেষ খেজুরটি পর্যন্ত নিঃশেষ হইল। নিরুপায় হইয়া তাহারা বাবুল পাতা ভিজাইয়া খাইতে লাগিলেন। ফলে মুজাহিদগণের চোয়াল ক্ষত-বিক্ষত হইয়া গেল। এইরূপ গুরুতর পরিস্থিতি দেখিয়া জনৈক সাহাবী বলিলেন, এখন শত্রুর সম্মুখীন হইবার শক্তি আমাদের কাহারও নাই। এই উক্তি শ্রবণে হযরত কায়স ইবন সা'দ (রা) অত্যন্ত ব্যথিত হইলেন। তিনি স্থানীয় লোকদের নিট গিয়া বলিলেন, কে এখানে আমার নিকট উট বিক্রয় করিবে? মদীনায় প্রত্যাবর্তন করিলে তাহাকে খেজুর দেওয়া হইবে। জনৈক ব্যক্তি বলিল, আমি তোমার পরিচয় পাইলে দিতে পারি। তিনি পরিচয় দিলেন। ঐ ব্যক্তি তিনটি, মতান্তরে নয়টি উট দিলেন। প্রত্যেকটির মূল্য এক ওয়াসাক বা ষাট সা' খেজুর। কায়স প্রত্যহ একটি উট যবেহ করিতে লাগিলেন। আমীর (অধিনায়ক) তাহাকে তাহা করিতে নিষেধ করিলেন। কারণ তিনি নিজে নিঃস্ব এবং পিতাও জীবিত। সদাশয় কায়স (রা) বলিলেন, আমার পিতা মানুষকে ঋণের দায় হইতে মুক্ত করেন, ক্ষুধার্তকে আহার দান করেন। আমি আল্লাহর পথে মুজাহিদগণের জন্য যে ঋণ গ্রহণ করিয়াছি তাহা কি তিনি আদায় করিবেন না (আবদুল খালেক এম. এ., সাইয়েদুল মুরসালীন, ২খ., পৃ. ৮৫০-৫১)?
হযরত জাবির (রা) বলেন, আমরা জায়শুল খাবাতের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিয়াছিলাম। আবূ উবায়দা (রা)-কে আমাদের সেনাপতি নিযুক্ত করা হইয়াছিল। পথে আমরা ভীষণ খাদ্যাভাবে আক্রান্ত হইয়া পড়ি। তখন সমুদ্র আমাদের জন্য আম্বর নামের একটি মরা মাছ তীরে নিক্ষেপ করিল। আমীর দেখিলেন, ক্ষুধা নিবৃত্তির একটা অভাবনীয় উপায় হইয়া গিয়াছে। তিনি মুজাহিদগণকে বলিলেন, "তাহা মৃত অথচ তোমরাও নিরুপায়। কাজেই তোমরা তাহা ভক্ষণ কর।" আমীরের নির্দেশ পাইয়া তাহারা তাহা ভক্ষণ করিতে শুরু করিলেন। মাছটি আমরা অর্ধমাস আহার করিলাম। আবূ উবায়দা (রা) বলেন, আমরা মদীনায় ফিরিয়া আসিলে রাসূলুল্লাহ্ (স)-কে বিষয়টি অবগত করিলাম। তিনি বলিলেন, উহা তোমাদের জন্য রিযিক; আল্লাহই তোমাদের জন্য পাঠাইয়া দিয়াছেন। তোমাদের নিকট উহার কিছু অবশিষ্ট থাকিলে আমাদিগকেও উহার স্বাদ গ্রহণ করিতে দাও। একজন সাহাবী মাছটির কিছু অংশ রাসূলুল্লাহ্ (স)-কে হাদিয়া পেশ করিলেন। তিনি তাহা খাইলেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ৩১৫; বুখারী, কিতাবুল মাগাযী, ২খ., পৃ. ৬২৬)।
হযরত জাবির (রা) আরো বলেন, মাছটি ছিল বিশালাকার। আমরা উহার চোখের গর্ত হইতে সূর্য তাপে উহার গলিত তৈল কলস ভরিয়া ভরিয়া উঠাইতাম এবং এত এত কলস উঠাইয়াছিলাম। একদা আমাদের আমীর আবু উবায়দা (রা) আমাদের মধ্য হইতে তেরজন লোককে উহার চোখের গর্তের মধ্যে বসাইয়া দিলেন (বুখারী, কিতাবুশ শিরকা, ১খ., পৃ. ৩৩৭)। ইমাম শাফিঈ (র) বলেন, তাহা এক প্রকার সামুদ্রিক জীব। কেহ বলিয়াছেন, আম্বর সামুদ্রিক মৎস।
আরো উল্লেখ্য রহিয়াছে যে, বাহিনী মদীনায় পৌছিবার পূর্বেই নিদারুন খাদ্য সংকটের কথা হযরত সা'د (রা)-এর কর্ণগোচর হইল। হযরত সা'দ (রা) তাঁহার পুত্রের নিকট হইতে দান-খয়রাতের কথা শ্রবণ করিয়া চারটি খেজুর বাগান দান করিয়া দিলেন। সর্বাপেক্ষা ছোটটি হইতে উটের মূল্য পরিশোধ হইল। কায়স (রা)-এর দানশীলতার কথা অবগত হইয়া রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিলেন, দানশীল বংশে তাহার জন্ম। দানশীলতাই ঐ বংশের বৈশিষ্ট্য (সাইয়েদুল মুরসালীন, ২খ., পৃ. ৮৫২)।
ইবনুল কায়্যিম ও ইবন হাজার আল-আসকালানী বলেন, অষ্টম হিজরীতে এই যুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার কথাটি সঠিক নয়। এইজন্য যে, হুদায়বিয়ার সন্ধির পর রাসূলুল্লাহ্ (স) কোন যুদ্ধ অভিযান কুরায়শ বা তাহাদের কোন চুক্তিবদ্ধ বন্ধু গোত্রের বিরুদ্ধে প্রেরণ করিয়াছেন বলিয়া জানা যায় না। রসূলুল্লাহ্ (স) কখনও তাঁহার পক্ষ হইতে কোন চুক্তি ভঙ্গ করিতেন না, বরং এই জাতীয় চুক্তিভঙ্গকে তিনি অত্যন্ত গর্হিত কাজ বলিয়া মনে করিতেন। সুতরাং এই ঘটনাটি সম্ভবত হুদায়বিয়া সন্ধির পূর্বে ষষ্ঠ হিজরীতেই সংঘটিত হইয়াছিল। কিন্তু মাওলানা শাহ আবদুল হক শায়খুল ইসলাম ইবনুল ইরাকীর বরাতে বর্ণনা করেন যে, এই ঘটনা মক্কা বিজয়ের সামান্য পূর্বে এবং কুরায়শদের চুক্তিভঙ্গের পরই সংঘটিত হয়। তাই ইহাতে কোন অসামঞ্জস্য নাই। বাহ্যত ইহাই বিশুদ্ধ মত। কেননা রাসূলুল্লাহ (স) মক্কা বিজয়ের জন্য রমযান মাসেই বাহির হইয়াছিলেন। আর রজব মাসে তিনি এই অভিযান প্রেরণ করিয়াছিলেন। মাঝখানে থাকে কেবল শা'বান মাস। তাই কুরায়শদের চুক্তিভঙ্গের অব্যবহিত পরেই মক্কা বিজয়ের প্রস্তুতি রজব মাসেই শুরু করিয়া থাকিবেন। আর সেই প্রস্তুতিরই একটি অংশ হয়ত এই অভিযানটি (আসাহহুস সিয়ার, পৃ. ২৬২-৬৩)।
এই যুদ্ধ এই কথার সুস্পষ্ট দলীল যে, শত্রু কর্তৃক আক্রান্ত হওয়ার আশংকা থাকিলে হারাম (নিষিদ্ধ) মাসেও যুদ্ধ করা জায়েয। কেননা রাসূলুল্লাহ (স) রজব মাসে এই অভিযান প্রেরণ করিয়াছিলেন। দ্বিতীয়ত, সমুদ্রের মাছ মৃত হইলেও তাহা খাওয়া জায়েয। কেননা সাহাবীগণ যদিও তাহা নিরুপায় হইয়া খাইয়াছিলেন, কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স) একান্ত স্বাভাবিক অবস্থায় তাহা ভক্ষণ করিয়াছিলেন। তৃতীয়ত, যে ব্যাপারে শরীআতের সুস্পষ্ট বিধান না পাওয়া যায়, প্রয়োজনে সেখানে নিজেদের বিবেকবুদ্ধি প্রয়োগ করিতে হয়। সাহাবীগণ এই ক্ষেত্রে তাহাই করিয়াছিলেন এবং রাসূলুল্লাহ (স) তাহা অনুমোদনও করিয়াছেন (আসাহ্হুস সিয়ার, পৃ. ২৬৪)।
শান্তি-শৃংখলা প্রতিষ্ঠার জন্য রাসূলুল্লাহ (স)-এর শুদ্ধি অভিযান শুধু মুসলমানদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। হুদায়বিয়ার সন্ধি চুক্তির পর রাসূলুল্লাহ (স) কুরায়শ কাফিরদের বাণিজ্যিক কাফেলাকেও হেফাযত করিতেন। হিজরী অষ্টম সালে কুরায়শদের বাণিজ্যিক কাফেলা সিরিয়া হইতে প্রত্যাবর্তন করিতেছিল। পথিমধ্যে জুহায়না গোত্র সম্পর্কে তাহাদের ভয় ছিল। তাই রাসূলুল্লাহ (স) অর্থাৎ আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহের নেতৃত্বে তিন শত মুসলমানের এক বাহিনীকে তাঁহাদের নিরাপত্তা বিধানের নিমিত্ত পাঠাইয়াছিলেন। এই বাহিনীতে হযরত উমার (রা)-ও ছিলেন (শিবলী নু'মানী ও সায়্যিদ সুলায়মান নদবী, সীরাতুন নবী, ১খ., পৃ. ৩৪১)।
এই অভিযানের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বিভিন্ন মত রহিয়াছে। (১) মূল রাবী হযরত জাবির (রা) খোদ এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন। তিনি বলেন, জুহায়না গোত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিবার জন্য এই বাহিনী প্রেরণ করা হইয়াছিল। (২) কুরায়শদের বাণিজ্যিক কাফেলার প্রতি দৃষ্টি রাখিবার জন্য এই বাহিনী প্রেরণ করা হইয়াছিল।
ইহা দ্বারা বাহ্যত বুঝা যায় যে, এই বাহিনী প্রেরণের উদ্দেশ্য ছিল কুরায়শদের বাণিজ্যিক কাফেলা লুণ্ঠন করা। কিন্তু ইহা গুরতর ভুল। কারণ ইহা ছিল হুদায়বিয়া সন্ধি চুক্তির পরবর্তী সময়। এইজন্য উপরিউক্ত উদ্ধৃতির মর্ম এই হইবে যে, এই অভিযান কুরায়শদের বাণিজ্যিক কাফেলা হেফাজতকল্পে এবং জুহায়না গোত্রের আক্রমণ প্রতিরোধকল্পে প্রেরিত হইয়াছিল। হাফেজ ইব্‌ن হাজার এই মতই প্রকাশ করিয়াছেন (ফাতহুল বারী, ৮খ., পৃ. ৬১-৬২)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সারিয়‍্যা জামূম / জামূহ

📄 সারিয়‍্যা জামূম / জামূহ


৬ষ্ঠ হিজরীর রবীউল আখির মাস। রাসূলুল্লাহ (স) হযরত যায়দ ইব্‌ن হারিছা (রা)-র নেতৃত্বে বানু সুলায়মের বিরুদ্ধে একদল সৈন্য প্রেরণ করেন। হযরত যা'য়দ ইব্‌ن হারিছা মদীনা হইতে ৪ মাইল দূরে বাতনে নাখলার উত্তর পার্শ্বে জামূম নামক স্থানে যাত্রাবিরতি করিলেন। হালীমা নাম্নী এক মহিলার সঙ্গে তাহাদের সাক্ষাত হইল। তাহারই দিকনির্দেশনায় বানু সুলায়মের জনপদের সন্ধান মিলিল। হযরত যায়দ ইব্‌ন হারিছা (রা) বানু সুলায়ম-এর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করিলেন। শত্রুপক্ষ পরাজিত হইল। প্রচুর পরিমাণে যুদ্ধলব্ধ সামগ্রী ও বন্দী হস্তগত হইল। হযরত যায়েদ ইবন হারিছা যুদ্ধবন্দী ও যুদ্ধলব্ধ সামগ্রী লইয়া রাত্রেই মদীনায় প্রত্যাবর্তন করিলেন। বন্দীদের মধ্যে হালীমার স্বামীও ছিল। রাসূলুল্লাহ (স) উভয়কে ক্ষমা করিয়াছেন (ইবন সা'দ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, ২খ., পৃ. ৬৮; শায়খ আবদুল হক, মাদারিজুন নুবুওয়াহ, ২খ., পৃ. ৩৩২; মহানবী (স)-এর জীবনী বিশ্বকোষ, ১খ., পৃ. ৩৬৩ ২০০০ সাল; ইবন হিশাম, সীরাতুন নবী, ২খ., প. ২৭; হাফেজ ইব্‌ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ., পৃ. ১৮০; ইব্‌ন সায়্যিদিন্নাস, 'উয়ূনুল আছার, ২খ., পৃ. ১৪৪)।

প্রন্থপঞ্জীঃ (১) ইবন সা'দ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, ২খ., দারু সাদির, বৈরূত তা. বি.; (২) শায়খ আবদুল হক মুহাদ্দিছ দিহাবী, মাদারিজুন নুবওয়াহ (উর্দু) ২খ., আদবী দুনিয়া, ৫১০, মাটিয়া মহল, ১৯৯২ খৃ.; (৩) মহানবী (স)-এর জীবনী বিশ্বকোষ, ১খ., দারুল ওয়ানীলা প্রকাশনী, ঢাকা; (৪) ইন্ন হিশাম, সীরাতুন নবী, ২খ., ই'তিকাদ পাবলিশিং হাউস, দিল্লী ১৯৮২; (৫) ইন্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, কায়রো, তা. বি.; (৬) ইন সায়্যিদিন্নাস, 'উয়ুনুল আছার, দারুল কালাম, বৈরূত ১৯৯৩ খৃ.)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00