📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর নৈশ প্রহরী

📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর নৈশ প্রহরী


অভিযানশেষে মদীনায় ফিরিবার পথে কোন একটি ঘাটিতে রাসূলুল্লাহ (স) রাত্রি যাপন করিলেন। সেখানে তিনি শত্রুগণের অতর্কিত আক্রমণের আশংকা করেন। উপস্থিত সাহাবীদেরকে তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমাদের মধ্যে আজ রাত্রে আমাদের প্রহরা নিয়োজিত থাকিতে কাহারা আগ্রহী? সে রাত্রে প্রচণ্ড বেগে মৌসুমী বায়ু প্রবাহিত হইতেছিল। হযরত আব্বাদ ইব্‌ন বিশর (রা) ও হযরত আম্মার ইব্‌ন ইয়াসির (রা) বলিলেন, 'হে আল্লাহ্র রাসূল! আমরা সর্বাত্মকভাবে আপনাদের পাহারায় নিয়োজিত থাকিব'। অতঃপর তাহারা দুইজন ঘাটির প্রবেশ দ্বারে অবস্থান নিলেন।
রাত্রি কিয়দ্বংশ অতিক্রান্ত হইলে আব্বাদ ইব্‌ন বিশর (রা) বলিলেন, আমি রাত্রির প্রথমভাগে পাহারার জন্য একাই যথেষ্ট। আপনি শেষভাগে পাহারা দিবেন। পাহারার সময় ভাগ- বণ্টন করিবার পর 'আম্মার ইব্‌ন ইয়াসির (রা) ঘুমাইয়া পড়িলেন। অতঃপর আব্বাদ ইব্‌ন বিশ্র (রা) একাগ্রতার সহিত সালাতে দাঁড়াইয়া গেলেন।
শত্রুপক্ষের অনুসরণকারী এক ব্যক্তি 'আব্বাদ ইব্‌ন বিশর (রা)-এর ছায়া দেখিয়া তাঁহার উদ্দেশে তীর ছুড়িল। তীরটি তাঁহার শরীরে বিদ্ধ হইলে তিনি তাহা খুলিয়া ফেলিলেন। অতঃপর শত্রু আরও একটি তীর মারিল। তিনি তাহাও খুলিয়া ফেলিলেন। পরপর তিনটি তীর বিদ্ধ হইবার পর তাহার শরীর দিয়া ফিনকি দিয়া রক্ত প্রবাহিত হইতে লাগিল। অতঃপর রুকু-সিজদার মাধ্যমে সালাত শেষ করিয়া তিনি আম্মার (রা)-কে ডাকিয়া জাগ্রত করিলেন। আম্মার (রা)-কে জাগ্রত দেখিয়া তীর নিক্ষেপকারী শত্রুটি পালাইয়া গেল। আম্মার (রা) জাগ্রত হইয়া আব্বাদ (রা)-কে তাঁহাকে পূর্বেই না জাগানোর কারণ জিজ্ঞাসা করিলেন। তিনি বলিলেন, প্রথম তীর নিক্ষেপের সময়ই যদি আমাকে জাগাইতেন, তাহা হইলে কি এমন অবস্থা হইত? আব্বাদ (রা) জওয়াবে বলিলেন, আমি সালাতে সূরা আল-কাহফ পাঠ করিতেছিলাম। আমি উহার তিলাওয়াত পরিহার করিয়া অন্য কিছুতে মনোনিবেশ করাকে পসন্দ করি নাই। এইজন্য আমি আপনাকে জাগ্রত করি নাই (হালাবী, প্রাগুক্ত)
রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর শত্রুর আশংকা হইয়াছিল কেন এবং শত্রু মুসলিম বাহিনীর পশ্চাৎ অনুসরণে উদ্যত হইয়াছিল কেন? এই সম্পর্কে সীরাত গ্রন্থাবলীর ভাষ্য এক রকম নহে। আল্লামা দানাপুরী বলেন, অভিযানশেষে ফিরিবার প্রাক্কালে জনৈক মুসলিম ব্যক্তি একটি কাফিরের স্ত্রীকে কটু বাক্য বলিয়াছিলেন। লোকটি তখন বাড়ীতে ছিল না। সে বাড়ীতে ফিরিবার পর যখন বিষয়টি জানিতে পারিল তখন সে শপথ করিল যে, যতক্ষণ পর্যন্ত একজন মুসলিমকে হত্যা করিয়া উহার প্রতিশোধ গ্রহণ না করিবে ততক্ষণ সে ক্ষান্ত হইবে না। এই সংকল্পেই সে রাসূলুল্লাহ্ (স) ও সাহাবীগণের পশ্চাৎ অনুসরণ করিয়াছিল (আসাহহুস সিয়ার, প্রাগুক্ত)।
এখানে উল্লেখ্য যে, কেহ কেহ বলিয়াছেন, প্রহরী দুই সাহাবীর একজনের নাম ছিল উমারা ইবন হাযম (রা)। তবে ওয়াকিদী বলেন, আমাদের নিকট সবচেয়ে প্রামাণ্য অভিমত হইল, তিনি আম্মার ইব্‌ন ইয়াসির (রা)-ই ছিলেন (ওয়াকিদী, প্রাগুক্ত)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 রাসূলুল্লাহ (স)-কে হত্যার উদ্যোগ

📄 রাসূলুল্লাহ (স)-কে হত্যার উদ্যোগ


গাতাফান গোত্রের এক লোকের নাম ছিল গওরাছ। মতান্তরে শব্দ সংকোচনের (تصغير) মাধ্যমে তাহার নাম ছিল গুওয়ায়রিছ ইব্‌দুল হারিছ। সে একদা তাহার গোত্রীয় লোকদের বলিল, আমি তোমাদের পক্ষ হইতে মুহাম্মাদকে হত্যা করি? তাহারা বলিল, হাঁ, করিতে পার। তবে তাহা কি করিয়া সম্ভব হইবে? সে বলিল, তিনি যখন অসতর্ক অবস্থায় থাকিবেন তখন অতর্কিত আক্রমণ করিয়া তাহাকে খতম করি। এই উদ্দেশ্য লইয়া সে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিল। সঙ্গী সাহাবায়ে কিরাম (রা) বিক্ষিপ্তভাবে বৃক্ষরাজির শীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করেন। হযরত জাবির (রা) বর্ণনা করেন, এমতাবস্থায় আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-কে একাকী রাখিয়া নিজ নিজ সুবিধামত স্থানে আশ্রয় লই। রাসূলুল্লাহ (স) স্বীয় তরবারি গাছের সহিত ঝুলাইয়া রাখিয়া শুইয়া পড়েন। আমরা সবাই ঘুমাইয়া পড়িলে রাসূলুল্লাহ (স) আমাদেরকে আহবান করেন। আমরা তৎক্ষণাৎ উপস্থিত হইয়া দেখিতে পাইলাম, এক বেদুঈন উপবিষ্ট রহিয়াছে। তিনি ঐ লোকটির প্রতি ইঙ্গিত করিয়া বলিলেন, সে আমার তরবারি ছিনতাই করিয়াছে। আমার ঘুমন্ত অবস্থায় সে তাহা হাতে লইয়া আমাকে জিজ্ঞাসা করে, 'আমার হাত হইতে আপনাকে এখন কে বাঁচাইবে'? আমি বলিলাম, আল্লাহ। সে তিনবার তাহা আমাকে জিজ্ঞাসা করিল এবং তিনবারই আমি একই উত্তর দিলাম। ইহারই প্রেক্ষিতে আল্লাহ্ তা'আলা অবতীর্ণ করেন:
يأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اذْكُرُوا نِعْمَةَ اللهِ عَلَيْكُمْ إِذْ هَمَّ قَوْمٌ أَنْ يَبْسُطُوا إِلَيْكُمْ أَيْدِيَهُمْ فَكَفَّ أَيْدِيَهُمْ عَنْكُمْ.
"হে মু'মিনগণ! তোমাদের প্রতি আল্লাহ্র অনুগ্রহ স্মরণ কর যখন এক সম্প্রদায় তোমাদের বিরুদ্ধে হস্ত উত্তোলন করিতে চাহিয়াছিল। তখন তিনি তাহাদের হাত সংযত করিয়াছিলেন" (৫: ১১)।
হালাবী বলেন, যদিও এই ব্যাপারে উক্তি রহিয়াছে যে, আয়াতটি বানু নাযীর গোত্রের জনৈক লোক যখন পাথর নিক্ষেপ করিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-কে হত্যা করিবার পায়তারা করিয়াছিল তখন অবতীর্ণ হয়। এই উভয় উক্তির মধ্যে কোন বিরোধ নাই। কারণ একটি আয়াত একাধিক ঘটনার সহিত সম্পর্কিত হইতে পারে।
এখানে একটি প্রশ্ন উত্থাপিত হয় যে, রাসূলুল্লাহ (স) এই লোকটির বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ হইতে বিরত থাকিলেন কেন? উহার উত্তর এই যে, উহার দ্বারা রাসূলুল্লাহ্ (স) ইসলামের প্রতি অবিশ্বাসীদের আকর্ষণ বৃদ্ধির উদ্দেশ্যেই তাহা করিয়াছিলেন (হালাবী, প্রাগুক্ত)। বাস্তবেও লোকটি মুক্তিপ্রাপ্তির পর তাহার গোত্রের কাছে ফিরিয়া গিয়া বলে, আমি দুনিয়ার সর্বোত্তম ব্যক্তির নিকট হইতে ফিরিয়া আসিয়াছি। অতঃপর সে ইসলাম গ্রহণ করিয়া একজন সাহাবীর মর্যাদা লাভ করে।
হযরত জাবির (রা) বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর সঙ্গেই ছিলাম। ইত্যবসরে আমরা দেখিতে পাইলাম একজন সাহাবী একটি পাখির ছানা ধরিয়া লইয়া আসিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) ছানাটির দিকে তাকাইতেছিলেন। ছানাটি এই সাহাবীর হাতে থাকা অবস্থায় উহার মাতা-পিতা কিংবা উহাদের যে কোন একজন তাহার সম্মুখে আসিয়া শুইয়া পড়িল। লোকজন এই দৃশ্য দেখিয়া বিস্ময়াভিভূত হইয়া গেল। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তোমরা পাখিটির তদীয় ছানার প্রতি দয়ামায়া দেখিয়া বিস্মিত হইতেছ? আমি শপথ করিয়া বলিতেছি, এই পাখি তাহার ছানার জন্য যতটুকু দয়ামায়া দেখাইতেছে, আল্লাহ তাঁহার বান্দাদের প্রতি ইহা হইতে অধিক দয়াবান (ওয়াকিদী, প্রাগুক্ত)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00