📄 রাসূলুল্লাহ (স) কর্তৃক হুঁশিয়ারি
ইবন ইসহাক বর্ণনা করেন, নবী করীম (স) বনূ নাযীর সম্প্রদায়কে মদীনা থেকে বহিষ্কার করিয়া দেওয়ার জন্য ১০জন সাহাবীকে পাঠাইলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদিগকে বলিয়া পাঠাইলেন, "তোমাদিগকে দশ দিনের সময় দেওয়া গেল। এই সময়ের মধ্যে তোমরা মদীনা ত্যাগ করিয়া চলিয়া যাইবে, অন্যথায় দশ দিন পর তোমাদের মধ্যে হইতে যাহাকেই মদীনার ত্রি-সীমানার ভিতরে পাওয়া যাইবে তাহাকেই হত্যা করা হইবে।"
তাহারা মদীনা ত্যাগ করিয়া চলিয়া যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হইয়াছিল (মওলানা মুহাম্মদ তফাজ্জল হোছাইন, সম্পা. ডঃ এ. এইচ. এম. মুজতবা হোছাইন, হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (স): সমকালীন পরিবেশ ও জীবন, পৃ. ৫৮৪)। এই সময় মুনাফিক সর্দার আবদুল্লাহ ইবন উবাই সংবাদ পাইয়া ইয়াহূদীদিগকে এই বলিয়া প্ররোচনা দিল, তোমরা নিজেদের জায়গায় অটল থাক, বাড়িঘর ছাড়িয়া যাইও না। আমার নিয়ন্ত্রণে দুই হাজার যোদ্ধা রহিয়াছে, যাহারা তোমাদের সঙ্গে দুর্গে প্রবেশ করিবে। তাহারা তোমাদের নিরাপত্তায় জীবন পর্যন্ত দিয়া দিবে। ইহার পরও যদি তোমাদিগকে বাহির করিয়া দেওয়া হয় তাহা হইলে আমরাও তোমাদের সাথে বাহির হইয়া যাইব। তোমাদের ব্যাপারে কাহারও হুমকিতে আমরা প্রভাবিত হইব না। যদি তোমাদের সহিত যুদ্ধ করা হয় তবে আমরা তোমাদের সাহায্য করিব। বানু কুরায়যা এবং বানু গাতাফান তোমাদের মিত্র। তাহারাও তোমাদের সাহায্য করিবে।
আবদুল্লাহ্ ইবন উবাই প্রেরিত এই খবর পাইয়া ইয়াহুদীরা দ্বিধান্বিত হইয়া পড়িল।
তাহাদের মধ্যে অনেকেরই আবদুল্লাহ্ কথার প্রতি আস্থা ছিল না। কারণ ইহার পূর্বে বানু কায়নুকাকে বহিষ্কারের প্রাক্কালে আবদুল্লাহ্ তাহাদিগকে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়াও শেষ পর্যন্ত তাহদিগকে অসহায় অবস্থায় ফেলিয়া নিজের পথ ধরিয়াছিল। তাই তাহারা তাহাদের সন্ধিচুক্তি থাকায় অপারগতা প্রকাশ করিল। তাহারা চিন্তা করিল, "আমাদেরকে যদি মদীনা হইতে বহিষ্কৃত হইতেই হয় তাহা হইলে আমরা খায়বার কিংবা মদীনার আশেপাশে কোন স্থানে গিয়া বসবাস করিব যাহাতে মদীনায় আমাদের বাগানগুলি হইতে ফল-ফলাদি সংগ্রহ করিতে পারি। এইরূপ অবস্থায় মদীনা হইতে নির্বাসিত হইলে আমাদের খুব একটা ক্ষতি হইবে না" (ডঃ মুহাম্মাদ হুসায়ন হায়কাল, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪০১)।
ইয়াহুদীদের একাংশ যখন এই সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করিতেছিল ঠিক এই সময় আবদুল্লাহ ইবন উবাইর সাহায্যের প্রতিশ্রুতির প্রেক্ষিতে তাহারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিল যে, বহিষ্কৃত হওয়ার পরিবর্তে তাহারা যুদ্ধ করিবে। ইয়াহূদী নেতা হুয়াই ইব্ন আখতার আশা করিয়াছিল যে, মুনাফিক নেতা তাহার কথা রাখিবে। তাই তাহাদের সবচেয়ে বড় নেতা হুয়াই ইব্ন আখতাব বলিল, "না, তাহা হইবে না, আমি মুহাম্মাদকে জানাইয়া দিতেছি যে, আমরা আমাদের ঘরবাড়ি কখনও ত্যাগ করিব না, বিষয়-সম্পত্তিও ছাড়িব না। আমাদের বিরুদ্ধে আপনি যাহা ইচ্ছা করিতে পারেন” (মহানবী (স)-এর জীবন চরিত, পৃ. ৪০২)।
বানু নাযীর গোত্রের ইয়াহুদীগণ রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করিলে তিনি মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা)-কে তাহাদের নিকট পাঠাইলেন। তিনি তাহাদেরকে নির্দেশ দিলেন, তোমরা আমার শহর হইতে বাহির হইয়া যাও। তোমরা এইখানে বসবাস করিতে পারিবে না। তাহাদেরকে দশ দিনের সময় দেওয়া হইল। এর মধ্যে যাহারা থাকিবে তাহাদের गर्दन (গর্দান) কাটিয়া ফেলা হইবে (মুহাম্মাদ হুসায়ন হায়কাল, হায়াত মুহাম্মাদ, পৃ. ২৯৮)।
মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা)-কে রাসূলুল্লাহ (স) বানু নাযীর গোত্রের মিত্র বানু আওস গোত্রের লোক হওয়ায় তাহাদের নিকট পাঠাইয়াছিলেন (সায়্যিদ সুলায়মান নাদবী, সীরাতুন্নবী, ২খ, পৃ. ২৭৬)।
ইবন ইসহাক বর্ণনা করেন, নবী করীম (স) বনূ নাযীর সম্প্রদায়কে মদীনা থেকে বহিষ্কার করিয়া দেওয়ার জন্য ১০জন সাহাবীকে পাঠাইলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদিগকে বলিয়া পাঠাইলেন, "তোমাদিগকে দশ দিনের সময় দেওয়া গেল। এই সময়ের মধ্যে তোমরা মদীনা ত্যাগ করিয়া চলিয়া যাইবে, অন্যথায় দশ দিন পর তোমাদের মধ্যে হইতে যাহাকেই মদীনার ত্রি-সীমানার ভিতরে পাওয়া যাইবে তাহাকেই হত্যা করা হইবে।"
তাহারা মদীনা ত্যাগ করিয়া চলিয়া যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হইয়াছিল (মওলানা মুহাম্মদ তফাজ্জল হোছাইন, সম্পা. ডঃ এ. এইচ. এম. মুজতবা হোছাইন, হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (স): সমকালীন পরিবেশ ও জীবন, পৃ. ৫৮৪)। এই সময় মুনাফিক সর্দার আবদুল্লাহ ইবন উবাই সংবাদ পাইয়া ইয়াহূদীদিগকে এই বলিয়া প্ররোচনা দিল, তোমরা নিজেদের জায়গায় অটল থাক, বাড়িঘর ছাড়িয়া যাইও না। আমার নিয়ন্ত্রণে দুই হাজার যোদ্ধা রহিয়াছে, যাহারা তোমাদের সঙ্গে দুর্গে প্রবেশ করিবে। তাহারা তোমাদের নিরাপত্তায় জীবন পর্যন্ত দিয়া দিবে। ইহার পরও যদি তোমাদিগকে বাহির করিয়া দেওয়া হয় তাহা হইলে আমরাও তোমাদের সাথে বাহির হইয়া যাইব। তোমাদের ব্যাপারে কাহারও হুমকিতে আমরা প্রভাবিত হইব না। যদি তোমাদের সহিত যুদ্ধ করা হয় তবে আমরা তোমাদের সাহায্য করিব। বানু কুরায়যা এবং বানু গাতাফান তোমাদের মিত্র। তাহারাও তোমাদের সাহায্য করিবে।
আবদুল্লাহ্ ইবন উবাই প্রেরিত এই খবর পাইয়া ইয়াহুদীরা দ্বিধান্বিত হইয়া পড়িল।
তাহাদের মধ্যে অনেকেরই আবদুল্লাহ্ কথার প্রতি আস্থা ছিল না। কারণ ইহার পূর্বে বানু কায়নুকাকে বহিষ্কারের প্রাক্কালে আবদুল্লাহ্ তাহাদিগকে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়াও শেষ পর্যন্ত তাহদিগকে অসহায় অবস্থায় ফেলিয়া নিজের পথ ধরিয়াছিল। তাই তাহারা তাহাদের সন্ধিচুক্তি থাকায় অপারগতা প্রকাশ করিল। তাহারা চিন্তা করিল, "আমাদেরকে যদি মদীনা হইতে বহিষ্কৃত হইতেই হয় তাহা হইলে আমরা খায়বার কিংবা মদীনার আশেপাশে কোন স্থানে গিয়া বসবাস করিব যাহাতে মদীনায় আমাদের বাগানগুলি হইতে ফল-ফলাদি সংগ্রহ করিতে পারি। এইরূপ অবস্থায় মদীনা হইতে নির্বাসিত হইলে আমাদের খুব একটা ক্ষতি হইবে না" (ডঃ মুহাম্মাদ হুসায়ন হায়কাল, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪০১)।
ইয়াহুদীদের একাংশ যখন এই সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করিতেছিল ঠিক এই সময় আবদুল্লাহ ইবন উবাইর সাহায্যের প্রতিশ্রুতির প্রেক্ষিতে তাহারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিল যে, বহিষ্কৃত হওয়ার পরিবর্তে তাহারা যুদ্ধ করিবে। ইয়াহূদী নেতা হুয়াই ইব্ন আখতার আশা করিয়াছিল যে, মুনাফিক নেতা তাহার কথা রাখিবে। তাই তাহাদের সবচেয়ে বড় নেতা হুয়াই ইব্ন আখতাব বলিল, "না, তাহা হইবে না, আমি মুহাম্মাদকে জানাইয়া দিতেছি যে, আমরা আমাদের ঘরবাড়ি কখনও ত্যাগ করিব না, বিষয়-সম্পত্তিও ছাড়িব না। আমাদের বিরুদ্ধে আপনি যাহা ইচ্ছা করিতে পারেন” (মহানবী (স)-এর জীবন চরিত, পৃ. ৪০২)।
📄 রাসূলুল্লাহ (স)-কে হত্যার ষড়যন্ত্র
রাসূলুল্লাহ (স) সাহাবী আমর ইবন উমায়্যা (রা) কর্তৃক নিহত বানু আমেরের দুইজন লোকের জন্য রক্তপণ আদায় করিবার ব্যাপারে সাহায্য চাহিতে বানু নাযীরের কাছে গেলেন। কেননা রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের সাথে মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ ছিলেন। বানু নাযীর ও বানু আমেরের মধ্যেও অনুরূপ চুক্তি ছিল। রাসূলুল্লাহ (স) যখন বানু নাযীরের কাছে গেলেন তখন তাহারা তাহাকে স্বাগত জানাইল এবং রক্তপণের ব্যাপারে তাহাকে সাহায্য করিতে সম্মত হইল। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই তাহাদের মনে এক কুটিল ষড়যন্ত্রের কথা জাগিল। তাহারা গোপনে শলাপরামর্শ করিতে লাগিল, কিভাবে রাসূলুল্লাহ্ (স)-কে হত্যা করা যায়। তাহারা মনে করিল, এমন মোক্ষম সুযোগ আর পাওয়া যাইবে না। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (স) একটা প্রাচীরের পাশে বসাছিলেন। তাঁহার সাথে ছিলেন হযরত আবূ বাক্স, হযরত উমার ও হযরত আলী (রাদিয়াল্লাহু আনহুম)।
বানু নাযীরের লোকেরা পরস্পর শলাপরামর্শ করিল। তাহারা বলিল, কে আছ যে পাশের ঘরের ছাদে উঠিয়া বড় একটি পাথর মুহাম্মাদের উপর ফেলিয়া দিতে পারিবে এবং তাহার কবল হইতে আমাদিগকে মুক্তি দিবে? বানু নাযীরের এক ব্যক্তি আমর ইব্ন জাহশ ইব্ন কা'ব এই কাজের জন্য প্রস্তুত হইল। সে রাসূলুল্লাহ (স)-এর উপর পাথর ফেলিয়া দেওয়ার জন্য ছাদের উপর আরোহণ করিল। সালাম ইব্ন মিশকাম নামের এক ইয়াহুদী বলিল, "সাবধান! এমন কাজ করিও না। আল্লাহ্র কসম! তোমাদের ইচ্ছার খবর আল্লাহ্র রাসূল পাইয়া যাইবেন। আল্লাহ পাকই তাঁহাকে খবর দিবেন। তাহা ছাড়া মুসলমানদের সাথে আমাদের যে অঙ্গীকার রহিয়াছে তাহাও লংঘন করা হইবে"। কিন্তু দুর্বৃত্ত স্বভাবে দুর্ভাগা ইয়াহুদীরা কোন কথাই কানে তুলিল না। তাহারা নিজেদের অসদুদ্দেশ্য বাস্তবায়নে অটল রহিল। রাসূলুল্লাহ্ (স) পূর্ব হইতেই এসব ব্যাপার গভীরভাবে ও সতর্ক দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করিতেছিলেন। এইদিকে রাব্বুল আলামীন আল্লাহ্ পাক তাঁহার প্রিয় রাসূলের নিকট হযরত জিবরাঈল (আ)-কে প্রেরণ করিলেন। আল্লাহর রাসূল দ্রুত সেই জায়গা হইতে উঠিয়া মদীনার পথে রওয়ানা হইলেন। তাঁহার সঙ্গী সাহাবীগণ তখনও টের পান নাই যে, রাসূলুল্লাহ (স) কোথায় গিয়াছেন। কিন্তু বানু নাযীরের লোকেরা ব্যাপারটি বুঝিয়া ফেলিল। তাহারা বুঝিতে পারিল যে, তাহাদের পরিকল্পনা ব্যর্থ হইয়া গিয়াছে। এখন রাসূলুল্লাহ (স)-এর সাহাবীগণের সহিতও একই ব্যবহার করিবে কিনা তাহা লইয়া দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়িল। তাহাদের একটি অংশ ভাবিল, "আমরা যদি মুহাম্মাদ (স)-এর সাহাবীগণের সহিতও একই ব্যবহার করি, তাহা হইলে অবশ্যই তিনি আমাদের উপর প্রতিশোধ গ্রহণ করিবেন।" তাহারা আরও ভাবিল যে, "যদি তাহার সাথীগণ নিরাপদে ফিরিয়া যান তাহা হইলে তাহারা হয়ত আমাদের ষড়যন্ত্রের কথা বুঝিতেই পারিবেন না। তাহাতে মুসলমানদের সহিত আমাদের পুরাতন চুক্তি বহাল থাকিবে (মুহাম্মাদ হুসায়ন হায়কাল, পৃ. ৪০০)।
এদিকে সাহাবীগণ অনেকক্ষণ অপেক্ষা করিয়াও যখন দেখিলেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) ফিরিতেছেন না, তখন তাঁহারা তাঁহার খোঁজে বাহির হইলেন। তাঁহারা প্রথমে মনে করিয়াছিলেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) প্রাকৃতিক প্রয়োজনে বাহিরে গিয়াছেন। কিন্তু পথিমধ্যে এক ব্যক্তিকে পাইলেন, যে মদীনা হইতে ফিরিয়া আসিতেছিল। তাঁহারা তাহার কাছে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সন্ধান চাহিলেন। সে বলিল, "রাসূলুল্লাহ (স)-কে আমি মদীনায় প্রবেশ করিতে দেখিয়াছি।" অন্য বর্ণনায় রহিয়াছে, "আমি মহানবী (স)-কে মসজীদে নববীতে প্রবেশ করিতে দেখিয়াছি” (ড. মুহাম্মাদ হুসায়ন হায়কাল, পৃ. ৪০০)।
সাহাবীগণ তৎক্ষণাৎ রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট পৌছিলেন। অন্য এক বর্ণনায় রহিয়াছে, সাহাবায়ে কিরাম তাঁহাকে অনুসরণ করিলেন এবং রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি এত দ্রুত চলিয়া আসিলেন যে, আমরা কিছুই বুঝিতে পারি নাই। রাসূলুল্লাহ (স) কুচক্রী ইয়াহুদীদের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সাহবীদিগকে অবহিত করিলেন। তিনি তাহাদিগকে বানু নাযীরের উপর আক্রমণ করিবার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ দিলেন। মদীনায় ফিরিয়া আসিবার পর আল্লাহর রাসূল (স) মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা)-কে বান্ নাযীর গোত্রের নিকট প্রেরণ করেন এবং তাহাদিগকে এই নোটিশ দেন, "তোমরা অবিলম্বে মদীনা হইতে বাহির হইয়া যাও। এইখানে তোমরা আমাদের সহিত থাকিতে পারিবে না। তোমাদিগকে দশ দিনের সময় দেওয়া হইল। ইহার পর তোমাদের মধ্যে যাহাকে পাওয়া যাইবে তাহার শিরশ্ছেদ করা হইবে।"
রাসূলুল্লাহ (স) বানু নাযীর গোত্রের নিকট গিয়াছিলেন। তিনি তাহাদের নিকট হইতে একটি রক্তপণ আদায়ের জন্য গিয়াছিলেন। তাহারা বলিল, হ্যাঁ, আমরা আপনার জন্য রক্তপণ দিব। আমরা আপনার জন্য একশত উট দিব। তিনি তাহাদের নিকট একটি দেয়ালের নিকট বসিলেন। তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-কে হত্যার জন্য ষড়যন্ত্র করিল। তাহারা বলিল, আমরা এই দেয়ালের নিকট রাসূলুল্লাহ (স)-কে হত্যার জন্য উপর হইতে পাথর নিক্ষেপ করিব। তিনি দেওয়ালের নিকট বসিলেন (বুখারী, ২খ, পৃ. ৫৯৪; মুসলিম, ২খ, পৃ. ১০০)।
তারা একে অপরকে বলল, তোমরা কেহ এই কাজটি করিবে না, কারণ সে যদি জানিতে পারে, সে তো আল্লাহ্ নবী। আল্লাহ তো তাহাকে এই বিষয়ে জানাইয়া দিবেন। সুতরাং তোমরা এই কাজটি করিবে না (সীরাত ইবন হিশাম, ২খ, পৃ. ১৯০)।
রাসূলুল্লাহ (স) সাহাবী আমর ইবন উমায়্যা (রা) কর্তৃক নিহত বানু আমেরের দুইজন লোকের জন্য রক্তপণ আদায় করিবার ব্যাপারে সাহায্য চাহিতে বানু নাযীরের কাছে গেলেন। কেননা রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের সাথে মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ ছিলেন। বানু নাযীর ও বানু আমেরের মধ্যেও অনুরূপ চুক্তি ছিল। রাসূলুল্লাহ (স) যখন বানু নাযীরের কাছে গেলেন তখন তাহারা তাহাকে স্বাগত জানাইল এবং রক্তপণের ব্যাপারে তাহাকে সাহায্য করিতে সম্মত হইল। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই তাহাদের মনে এক কুটিল ষড়যন্ত্রের কথা জাগিল। তাহারা গোপনে শলাপরামর্শ করিতে লাগিল, কিভাবে রাসূলুল্লাহ্ (স)-কে হত্যা করা যায়। তাহারা মনে করিল, এমন মোক্ষম সুযোগ আর পাওয়া যাইবে না। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (স) একটা প্রাচীরের পাশে বসাছিলেন। তাঁহার সাথে ছিলেন হযরত আবূ বাক্স, হযরত উমার ও হযরত আলী (রাদিয়াল্লাহু আনহুম)।
বানু নাযীরের লোকেরা পরস্পর শলাপরামর্শ করিল। তাহারা বলিল, কে আছ যে পাশের ঘরের ছাদে উঠিয়া বড় একটি পাথর মুহাম্মাদের উপর ফেলিয়া দিতে পারিবে এবং তাহার কবল হইতে আমাদিগকে মুক্তি দিবে? বানু নাযীরের এক ব্যক্তি আমর ইব্ন জাহশ ইব্ন কা'ব এই কাজের জন্য প্রস্তুত হইল। সে রাসূলুল্লাহ (স)-এর উপর পাথর ফেলিয়া দেওয়ার জন্য ছাদের উপর আরোহণ করিল। সালাম ইব্ন মিশকাম নামের এক ইয়াহুদী বলিল, "সাবধান! এমন কাজ করিও না। আল্লাহ্র কসম! তোমাদের ইচ্ছার খবর আল্লাহ্র রাসূল পাইয়া যাইবেন। আল্লাহ পাকই তাঁহাকে খবর দিবেন। তাহা ছাড়া মুসলমানদের সাথে আমাদের যে অঙ্গীকার রহিয়াছে তাহাও লংঘন করা হইবে"। কিন্তু দুর্বৃত্ত স্বভাবে দুর্ভাগা ইয়াহুদীরা কোন কথাই কানে তুলিল না। তাহারা নিজেদের অসদুদ্দেশ্য বাস্তবায়নে অটল রহিল। রাসূলুল্লাহ্ (স) পূর্ব হইতেই এসব ব্যাপার গভীরভাবে ও সতর্ক দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করিতেছিলেন। এইদিকে রাব্বুল আলামীন আল্লাহ্ পাক তাঁহার প্রিয় রাসূলের নিকট হযরত জিবরাঈল (আ)-কে প্রেরণ করিলেন। আল্লাহর রাসূল দ্রুত সেই জায়গা হইতে উঠিয়া মদীনার পথে রওয়ানা হইলেন। তাঁহার সঙ্গী সাহাবীগণ তখনও টের পান নাই যে, রাসূলুল্লাহ (স) কোথায় গিয়াছেন। কিন্তু বানু নাযীরের লোকেরা ব্যাপারটি বুঝিয়া ফেলিল। তাহারা বুঝিতে পারিল যে, তাহাদের পরিকল্পনা ব্যর্থ হইয়া গিয়াছে। এখন রাসূলুল্লাহ (স)-এর সাহাবীগণের সহিতও একই ব্যবহার করিবে কিনা তাহা লইয়া দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়িল। তাহাদের একটি অংশ ভাবিল, "আমরা যদি মুহাম্মাদ (স)-এর সাহাবীগণের সহিতও একই ব্যবহার করি, তাহা হইলে অবশ্যই তিনি আমাদের উপর প্রতিশোধ গ্রহণ করিবেন।" তাহারা আরও ভাবিল যে, "যদি তাহার সাথীগণ নিরাপদে ফিরিয়া যান তাহা হইলে তাহারা হয়ত আমাদের ষড়যন্ত্রের কথা বুঝিতেই পারিবেন না। তাহাতে মুসলমানদের সহিত আমাদের পুরাতন চুক্তি বহাল থাকিবে (মুহাম্মাদ হুসায়ন হায়কাল, পৃ. ৪০০)।
এদিকে সাহাবীগণ অনেকক্ষণ অপেক্ষা করিয়াও যখন দেখিলেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) ফিরিতেছেন না, তখন তাঁহারা তাঁহার খোঁজে বাহির হইলেন। তাঁহারা প্রথমে মনে করিয়াছিলেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) প্রাকৃতিক প্রয়োজনে বাহিরে গিয়াছেন। কিন্তু পথিমধ্যে এক ব্যক্তিকে পাইলেন, যে মদীনা হইতে ফিরিয়া আসিতেছিল। তাঁহারা তাহার কাছে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সন্ধান চাহিলেন। সে বলিল, "রাসূলুল্লাহ (স)-কে আমি মদীনায় প্রবেশ করিতে দেখিয়াছি।" অন্য বর্ণনায় রহিয়াছে, "আমি মহানবী (স)-কে মসজীদে নববীতে প্রবেশ করিতে দেখিয়াছি” (ড. মুহাম্মাদ হুসায়ন হায়কাল, পৃ. ৪০০)।
সাহাবীগণ তৎক্ষণাৎ রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট পৌছিলেন। অন্য এক বর্ণনায় রহিয়াছে, সাহাবায়ে কিরাম তাঁহাকে অনুসরণ করিলেন এবং রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি এত দ্রুত চলিয়া আসিলেন যে, আমরা কিছুই বুঝিতে পারি নাই। রাসূলুল্লাহ (স) কুচক্রী ইয়াহুদীদের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সাহবীদিগকে অবহিত করিলেন। তিনি তাহাদিগকে বানু নাযীরের উপর আক্রমণ করিবার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ দিলেন। মদীনায় ফিরিয়া আসিবার পর আল্লাহর রাসূল (স) মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা)-কে বান্ নাযীর গোত্রের নিকট প্রেরণ করেন এবং তাহাদিগকে এই নোটিশ দেন, "তোমরা অবিলম্বে মদীনা হইতে বাহির হইয়া যাও। এইখানে তোমরা আমাদের সহিত থাকিতে পারিবে না। তোমাদিগকে দশ দিনের সময় দেওয়া হইল। ইহার পর তোমাদের মধ্যে যাহাকে পাওয়া যাইবে তাহার শিরশ্ছেদ করা হইবে।"
📄 ইয়াহূদীদের ঔদ্ধত্বের কারণ
বানু নাযীরের ঔদ্ধত্বের বহু কারণ ছিল। তাহারা অত্যন্ত মজবুত দুর্গে অবস্থান করিত, যাহা অবরোধ করা সহজসাধ্য ছিল না। দ্বিতীয়ত, আবদুল্লাহ্ ইব্ন উবাই বার্তা পাঠাইয়াছিল, তোমরা আত্মসমর্পণ করিও না। বানু কুরায়যা তোমাদের সহযোগিতা করিবে এবং আমিও দুই হাজার লোক লইয়া তোমাদের সাহায্যের জন্য আসির (শিবলী নু'মানী, সীরাতুন নবী, ১খ., পৃ. ৪০৮)। আল-কুরআনে এই সম্পর্কে বলা হইয়াছে:
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ تَافَقُوا يَقُولُونَ لِإِخْوَانِهِمُ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ لَئِنْ أُخْرِجْتُمْ لَتَخْرُ جَنَّ مَعَكُمْ وَلَا تُطِيعُ فِيكُمْ أَحَدًا أَبَدًا وَإِنْ قُوتِلْتُمْ لَتَنْصُرَنَّكُمْ وَاللَّهُ يَشْهَدُ إِنَّهُمْ لَكَاذِبُونَ. لَئِنْ أَخْرِجُوا لَا يَخْرُجُونَ مَعَهُمْ وَلَئِنْ قُوتِلُوا لَا يَنْصُرُونَهُمْ وَلَئِنْ نَّصَرُوهُمْ لَيُوَلُنَّ الْأَدْبَارَ ثُمَّ لَا يُنْصَرُونَ لَا أَنْتُمْ أَشَدُّ رَهْبَةً فِي صُدُورِهِمْ مِنَ اللَّهِ ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ قَوْمٌ لَا يَفْقَهُونَ.
"তুমি কি মুনাফিকদিগকে দেখ নাই? উহারা কিতাবীদের মধ্যে যাহারা কুফরী করিয়াছে উহাদের সেইসব সংগীকে বলে, 'তোমরা যদি বহিষ্কৃত হও, আমরা অবশ্যই তোমাদের সংগে দেশত্যাগী হইব এবং আমরা তোমাদের ব্যাপারে কখনও কাহারও কথা মানিব না এবং যদি তোমরা আক্রান্ত হও, আমরা অবশ্যই তোমাদিগকে সাহায্য করিব।' কিন্তু আল্লাহ সাক্ষ্য দিতেছেন যে, উহারা অবশ্যই মিথ্যাবাদী। বস্তুত উহারা বহিষ্কৃত হইলে মুনাফিকগণ তাহাদের সহিত দেশত্যাগ করিবে না এবং উহারা আক্রান্ত হইলে ইহারা উহাদেরকে সাহায্য করিলেও অবশ্যই পৃষ্ঠপ্রদর্শন করিবে; অতঃপর তাহারা কোন সাহায্যই পাইবে না। প্রকৃতপক্ষে ইহাদের অন্তরে আল্লাহ অপেক্ষা তোমাদের ভয়ই অধিকতর। ইহা এইজন্য যে, ইহারা এক অবুঝ সম্প্রদায়" (৫৯:১১-১৩)।
ইয়াহুদীগণ তাহাদের সংখ্যাধিক্য এবং কুরায়শদের সাথে মিত্রতা থাকার কারণে অহংকারী হইয়াছিল (সীরাতুন্নবী, ২খ, পৃ. ২৭৮)।
বানু নাযীরের ঔদ্ধত্বের বহু কারণ ছিল। তাহারা অত্যন্ত মজবুত দুর্গে অবস্থান করিত, যাহা অবরোধ করা সহজসাধ্য ছিল না। দ্বিতীয়ত, আবদুল্লাহ্ ইব্ন উবাই বার্তা পাঠাইয়াছিল, তোমরা আত্মসমর্পণ করিও না। বানু কুরায়যা তোমাদের সহযোগিতা করিবে এবং আমিও দুই হাজার লোক লইয়া তোমাদের সাহায্যের জন্য আসির (শিবলী নু'মানী, সীরাতুন নবী, ১খ., পৃ. ৪০৮)। আল-কুরআনে এই সম্পর্কে বলা হইয়াছে:
“তুমি কি মুনাফিকদিগকে দেখ নাই? উহারা কিতাবীদের মধ্যে যাহারা কুফরী করিয়াছে উহাদের সেইসব সংগীকে বলে, 'তোমরা যদি বহিষ্কৃত হও, আমরা অবশ্যই তোমাদের সংগে দেশত্যাগী হইব এবং আমরা তোমাদের ব্যাপারে কখনও কাহারও কথা মানিব না এবং যদি তোমরা আক্রান্ত হও, আমরা অবশ্যই তোমাদিগকে সাহায্য করিব।' কিন্তু আল্লাহ সাক্ষ্য দিতেছেন যে, উহারা অবশ্যই মিথ্যাবাদী। বস্তুত উহারা বহিষ্কৃত হইলে মুনাফিকগণ তাহাদের সহিত দেশত্যাগ করিবে না এবং উহারা আক্রান্ত হইলে ইহারা উহাদেরকে সাহায্য করিবে আসিলেও অবশ্যই পৃষ্ঠপ্রদর্শন করিবে; অতঃপর তাহারা কোন সাহায্যই পাইবে না। প্রকৃতপক্ষে ইহাদের অন্তরে আল্লাহ অপেক্ষা তোমাদের ভয়ই অধিকতর। ইহা এইজন্য যে, ইহারা এক অবুঝ সম্প্রদায়" (৫৯:১১-১৩)।
📄 ইয়াহুদীদের রণপ্রস্তুতি
ইয়াহুদী নেতা হুয়াই ইব্ন আখতাব তাহার সঙ্গী-সাথীদের লইয়া দুর্গবন্দী হওয়ার প্রস্তুতি শুরু করিল এবং তাহার সঙ্গী-সাথীদেরকে বলিল, "আস! আমরা সবাই নিজ নিজ দুর্গ মজবুত করিয়া সেখানে বসিয়া পড়ি। দুর্গ অবরোধকারীদের উপর ছুড়িয়া মারিবার জন্য ছাদে ছাদে পাথরের টুকরা জমা করিয়া রাখিতে হইবে। আমাদের অবরোধ করা হইলে তাহাতে ভয়ের কিছু নাই। কারণ আমাদের গোলাভরা খাদ্যশস্য রহিয়াছে। এক বৎসরেও এইসব শেষ হইবে না। পানির প্রাকৃতিক উৎসও আমাদের দখলে রহিয়াছে। মুহাম্মাদ (স) এক বৎসর পর্যন্ত আমাদের অবরোধ করিয়া রাখিতে পারিবে না" (মহানবী (স)-এর জীবন চরিত, পৃ. ৪০২)।
রাসূলুল্লাহ (স) যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হইলেন। তিনি তাহাদের নিকট হইতে বাহির হইবার পর মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা)-কে বানু নাযীর গোত্রের নিকট পাঠাইলেন। তিনি তাহাদেরকে দশ দিনের মধ্যে মদীনা হইতে বাহির হইয়া যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। তাহারা ইহা গ্রহণ করিল। কিন্তু আবদুল্লাহ ইবন উবাই তাহাদেরকে উৎসাহিত করিল যে, তোমরা মদীনা হইতে বাহির হইবে না। আমি তোমাদেরকে সাহায্য করিব। কুরায়শ গোত্রও তোমাদেরকে সাহায্য করিবে। বানু নাযীর গোত্র অহংকারী হইয়া উঠিল। তাহারা যুদ্ধ করার জন্য প্রস্তুত হইল (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ, পৃ. ৭৪)।
রাসূলুল্লাহ (স) বানু নাযীর গোত্রের নিকট হইতে ফিরিয়া আসার পর তাহাদেরকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত দেখিতে পাইলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য প্রস্তুত হইলেন (আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪খ, পৃ. ৭২)।
ইয়াহুদী নেতা হুয়াই ইব্ন আখতাব তাহার সঙ্গী-সাথীদের লইয়া দুর্গবন্দী হওয়ার প্রস্তুতি শুরু করিল এবং তাহার সঙ্গী-সাথীদেরকে বলিল, "আস! আমরা সবাই নিজ নিজ দুর্গ মজবুত করিয়া সেখানে বসিয়া পড়ি। দুর্গ অবরোধকারীদের উপর ছুড়িয়া মারিবার জন্য ছাদে ছাদে পাথরের টুকরা জমা করিয়া রাখিতে হইবে। আমাদের অবরোধ করা হইলে তাহাতে ভয়ের কিছু নাই। কারণ আমাদের গোলাভরা খাদ্যশস্য রহিয়াছে। এক বৎসরেও এইসব শেষ হইবে না। পানির প্রাকৃতিক উৎসও আমাদের দখলে রহিয়াছে। মুহাম্মাদ (স) এক বৎসর পর্যন্ত আমাদের অবরোধ করিয়া রাখিতে পারিবে না" (মহানবী (স)-এর জীবন চরিত, পৃ. ৪০২)।