📄 বানু নাযীরের বিরুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (স)-এর যুদ্ধ
উহুদের পর বি'র মা'ঊনার ঘটনায় মদীনার ইয়াহুদী ও মুনাফিকরা আরও বেশী আনন্দিত হইল। তাহারা এইসব ঘটনায় মুসলমানদের প্রভাব কিছুটা হ্রাস পাইয়াছে বলিয়া মনে করিতে লাগিল। এইদিকে মুসলমানদের গুরুত্ব হ্রাস পাওয়া মদীনাবাসীদের জন্য ভয়ের কারণ ছিল। তাহা ছাড়া মদীনার আশেপাশের রাষ্ট্রগুলি মদীনার অভ্যন্তরের এই পারস্পরিক বিরোধের খবর জানিতে পারিলে তাহারাও মদীনা আক্রমণ করিয়া বসিবে। এমনি অবস্থার পাশাপাশি ইয়াহুদীরাও সেই সময়ের অপেক্ষা করিতেছু, মহানবী (স) তাহা ভাল করিয়াই জানিতেন। শিবলী নু'মানী বলেন, কুরায়শগণ পত্র লিখিয়াছিল, মুহাম্মাদ (স)-কে হত্যা কর। অন্যথায় আমরা নিজেরাই আসিয়া তোমাদিগকে সমূলে উচ্ছেদ করিব।
বান্ নাযীর প্রথম হইতেই ইসলামের শত্রু ছিল। কুরায়শদের এই বার্তা পাইয়া তাহারা আরও ক্ষিপ্ত হইয়া উঠিল। তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট সংবাদ পাঠাইল, আপনি ত্রিশজন লোক লইয়া আসুন, আমরাও আমাদের পাদ্রীদের সঙ্গে রাখিব। আপনার কথা শুনিয়া যদি আমাদের পাদ্রীগণ বিশ্বাস করিতে পারেন তাহা হইলে আপনার ধর্ম গ্রহণ করিবার ব্যাপারে আমাদের কোন দ্বিধা থাকিবে না। ইয়াহুদীদের গোপন ষড়যন্ত্রের কথা অনুমান করিয়া রাসূলুল্লাহ (স) লিখিয়া পাঠাইলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা একটি চুক্তিপত্র না লিখিয়া দিবে ততক্ষণ আমি তোমাদের উপর বিশ্বাস স্থাপন করিতে পারি না। কিন্তু তাহারা এই প্রস্তাবে রাজি হইল না।
রাসূলুল্লাহ (স) মুসলমানদের বন্ধু বাভাপন্ন বানু কুরায়যার নিকট গমন করিয়া তাহাদিগকে চুক্তিপত্র পুনঃস্বাক্ষর করিতে বলিলে তাহারা পুনরায় স্বাক্ষর করিল। বানু নাযীরের জন্য ইহা একটা হুমকিস্বরূপ ছিল যে, তাহাদের বন্ধুগণ সন্ধি করিল কিন্তু তাহারা করিতে পারিল না (আল্লামা শিবলী নুমানী, সীরাতুন নবী গ্রন্থে আবূ দাউদ শরীফের রেফারেন্সে এই ঘটনা বর্ণনা করিয়াছেন, পৃ. ৪০৭-৪৯৮)। তদুপরি তাহারা পুনরায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট বার্তা পাঠাইয়াছিল আপনি তিনজন লোক লইয়া আসুন, আমরাও তিনজন আলিম লইয়া আসিতেছি। এই আলিমগণ যদি আপনার কথায় বিশ্বাস স্থাপন করিতে পারেন তাহা হইলে আমরাও আপনার উপর বিশ্বাস স্থাপন করিব। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের এই প্রস্তাবে সম্মত হইলেন। কিন্তু পথিমধ্যে বিশ্বস্ত সূত্রে জানিতে পারিলেন, ইয়াহুদীগণ অস্ত্রশস্ত্র লইয়া প্রস্তুত রহিয়াছে, রাসূলুল্লাহ্ (স) সেখানে উপস্থিত হইলেই তাহাকে হত্যা করা হইবে (ফাতহুল বারী, ৭খ., পৃ. ১৫৫)।
তাই রাসূলুল্লাহ (স) ইয়াহুদীদের অবস্থা জানিবার সিদ্ধান্ত লইলেন। তিনি ইতোপূর্বে বানূ কিলার গোত্রের ভুলবশত দুই ব্যক্তির হত্যার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যাপারে আলাপ ও পরামর্শের জন্য মদীনা শহরের দুই মাইল দূরে কুবার উপকণ্ঠে বানু নাযীরের বসতীতে গমন করিলেন। এই সময় মহানবী (স)-এর সহিত দশজন সাহাবী ছিলেন। তাহাদের মধ্যে ছিলেন হযরত আবূ বকর, হযরত উমার, হযরত আলী ইব্ন আবু তালিব (রা) প্রমুখ শীর্ষস্থানীয় সাহাবী। মহানবী (স) মূল উদ্দেশ্য গোপন করিয়া বানু নাযীরকে জিজ্ঞাসা করিলেন, "আচ্ছা বানু কিলাব গোত্রের একজন নিহত ব্যক্তির হত্যার ক্ষতিপূরণ কি হওয়া উচিত" (মূল ডঃ মুহাম্মাদ হুসাইন হায়কাল, মহানবী (স)-এর জীবন-চরিত, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ঢাকা ১৯৯৮ খৃ.)।
রাসূলুল্লাহ (স) বানু নাযীর গোত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। এই যুদ্ধের নাম ছিল গাযওয়া বানু নাযীর (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪খ, পৃ. ৭২)।
উহুদের পর বি'র মা'ঊনার ঘটনায় মদীনার ইয়াহুদী ও মুনাফিকরা আরও বেশী আনন্দিত হইল। তাহারা এইসব ঘটনায় মুসলমানদের প্রভাব কিছুটা হ্রাস পাইয়াছে বলিয়া মনে করিতে লাগিল। এইদিকে মুসলমানদের গুরুত্ব হ্রাস পাওয়া মদীনাবাসীদের জন্য ভয়ের কারণ ছিল। তাহা ছাড়া মদীনার আশেপাশের রাষ্ট্রগুলি মদীনার অভ্যন্তরের এই পারস্পরিক বিরোধের খবর জানিতে পারিলে তাহারাও মদীনা আক্রমণ করিয়া বসিবে। এমনি অবস্থার পাশাপাশি ইয়াহুদীরাও সেই সময়ের অপেক্ষা করিতেছু, মহানবী (স) তাহা ভাল করিয়াই জানিতেন। শিবলী নু'মানী বলেন, কুরায়শগণ পত্র লিখিয়াছিল, মুহাম্মাদ (স)-কে হত্যা কর। অন্যথায় আমরা নিজেরাই আসিয়া তোমাদিগকে সমূলে উচ্ছেদ করিব।
বান্ নাযীর প্রথম হইতেই ইসলামের শত্রু ছিল। কুরায়শদের এই বার্তা পাইয়া তাহারা আরও ক্ষিপ্ত হইয়া উঠিল। তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট সংবাদ পাঠাইল, আপনি ত্রিশজন লোক লইয়া আসুন, আমরাও আমাদের পাদ্রীদের সঙ্গে রাখিব। আপনার কথা শুনিয়া যদি আমাদের পাদ্রীগণ বিশ্বাস করিতে পারেন তাহা হইলে আপনার ধর্ম গ্রহণ করিবার ব্যাপারে আমাদের কোন দ্বিধা থাকিবে না। ইয়াহুদীদের গোপন ষড়যন্ত্রের কথা অনুমান করিয়া রাসূলুল্লাহ (স) লিখিয়া পাঠাইলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা একটি চুক্তিপত্র না লিখিয়া দিবে ততক্ষণ আমি তোমাদের উপর বিশ্বাস স্থাপন করিতে পারি না। কিন্তু তাহারা এই প্রস্তাবে রাজি হইল না।
রাসূলুল্লাহ (স) মুসলমানদের বন্ধু বাভাপন্ন বানু কুরায়যার নিকট গমন করিয়া তাহাদিগকে চুক্তিপত্র পুনঃস্বাক্ষর করিতে বলিলে তাহারা পুনরায় স্বাক্ষর করিল। বানু নাযীরের জন্য ইহা একটা হুমকিস্বরূপ ছিল যে, তাহাদের বন্ধুগণ সন্ধি করিল কিন্তু তাহারা করিতে পারিল না (আল্লামা শিবলী নুমানী, সীরাতুন নবী গ্রন্থে আবূ দাউদ শরীফের রেফারেন্সে এই ঘটনা বর্ণনা করিয়াছেন, পৃ. ৪০৭-৪৯৮)। তদুপরি তাহারা পুনরায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট বার্তা পাঠাইয়াছিল আপনি তিনজন লোক লইয়া আসুন, আমরাও তিনজন আলিম লইয়া আসিতেছি। এই আলিমগণ যদি আপনার কথায় বিশ্বাস স্থাপন করিতে পারেন তাহা হইলে আমরাও আপনার উপর বিশ্বাস স্থাপন করিব। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের এই প্রস্তাবে সম্মত হইলেন। কিন্তু পথিমধ্যে বিশ্বস্ত সূত্রে জানিতে পারিলেন, ইয়াহুদীগণ অস্ত্রশস্ত্র লইয়া প্রস্তুত রহিয়াছে, রাসূলুল্লাহ্ (স) সেখানে উপস্থিত হইলেই তাহাকে হত্যা করা হইবে (ফাতহুল বারী, ৭খ., পৃ. ১৫৫)।
তাই রাসূলুল্লাহ (স) ইয়াহুদীদের অবস্থা জানিবার সিদ্ধান্ত লইলেন। তিনি ইতোপূর্বে বানূ কিলার গোত্রের ভুলবশত দুই ব্যক্তির হত্যার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যাপারে আলাপ ও পরামর্শের জন্য মদীনা শহরের দুই মাইল দূরে কুবার উপকণ্ঠে বানু নাযীরের বসতীতে গমন করিলেন। এই সময় মহানবী (স)-এর সহিত দশজন সাহাবী ছিলেন। তাহাদের মধ্যে ছিলেন হযরত আবূ বকর, হযরত উমার, হযরত আলী ইব্ন আবু তালিব (রা) প্রমুখ শীর্ষস্থানীয় সাহাবী। মহানবী (স) মূল উদ্দেশ্য গোপন করিয়া বানু নাযীরকে জিজ্ঞাসা করিলেন, "আচ্ছা বানু কিলাব গোত্রের একজন নিহত ব্যক্তির হত্যার ক্ষতিপূরণ কি হওয়া উচিত" (মূল ডঃ মুহাম্মাদ হুসাইন হায়কাল, মহানবী (স)-এর জীবন-চরিত, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ঢাকা ১৯৯৮ খৃ.)।
📄 গাযওয়া বানু নাযীর-এর সময়কাল
হিজরী ৪র্থ সালের প্রথমদিকে গাবওয়া উহুদের পরে ও গাযওয়া আহযাব-এর পূর্বে গাযওয়া বানু নাবীর সংঘটিত হয়। ইবন ইসহাকের মতে, বি'রে মা'উনা ও উহুদের পর গাযওয়া বানু নাবীর সংঘটিত হয়। ইমাম যুহরী উরওয়া ইব্ন যুবায়রের উদ্ধৃতি দিয়া বর্ণনা করিয়াছেন যে, এই যুদ্ধ বদর যুদ্ধের ছয় মাস পর সংঘটিত হইয়াছিল। কিন্তু ইবন সা'দ, ইবন হিশাম ও বালাযুরী ইহাকে হিজরী চতুর্থ সনের রবীউল আওয়াল মাসের ঘটনা বলিয়া বর্ণনা করিয়াছেন। আর ইহাই সঠিক বলিয়া মনে করা হয়। কারণ সমস্ত বর্ণনা অনুসারে এই যুদ্ধ বি'রে মা'উনার দুঃখজনক ঘটনার পরে সংঘটিত হইয়াছিল। এই বিষয়টিও ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত যে, বি'রে মা' উনার মর্মান্তিক ঘটনা উহুদ যুদ্ধের পরে ঘটিয়াছিল (সায়্যিদ আবুল আলা মওদূদী, প্রাগুক্ত, পৃ. ১)।
গাযওয়া বানু নাযীর হিজরী চতুর্থ সনের রবিউল আউয়াল মাসে সংঘটিত হয় (ফিকহুস সীরাহ, পৃ. ৩২৬)। মুহাম্মাদ ইবন ইসহাকের মতে এই যুদ্ধ উহুদ যুদ্ধের পরে সংঘটিত হয়। মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক বলেন, বানু নাযীরের যুদ্ধ উহুদ যুদ্ধের পরে সংঘটিত হয় (সীরাত ইবন হিশাম, ২খ, পৃ. ১৯০)।
হিজরী ৪র্থ সালের প্রথমদিকে গাবওয়া উহুদের পরে ও গাযওয়া আহযাব-এর পূর্বে গাযওয়া বানু নাবীর সংঘটিত হয়। ইবন ইসহাকের মতে, বি'রে মা'উনা ও উহুদের পর গাযওয়া বানু নাবীর সংঘটিত হয়। ইমাম যুহরী উরওয়া ইব্ন যুবায়রের উদ্ধৃতি দিয়া বর্ণনা করিয়াছেন যে, এই যুদ্ধ বদর যুদ্ধের ছয় মাস পর সংঘটিত হইয়াছিল। কিন্তু ইবন সা'দ, ইবন হিশাম ও বালাযুরী ইহাকে হিজরী চতুর্থ সনের রবীউল আওয়াল মাসের ঘটনা বলিয়া বর্ণনা করিয়াছেন। আর ইহাই সঠিক বলিয়া মনে করা হয়। কারণ সমস্ত বর্ণনা অনুসারে এই যুদ্ধ বি'রে মা'উনার দুঃখজনক ঘটনার পরে সংঘটিত হইয়াছিল। এই বিষয়টিও ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত যে, বি'রে মা' উনার মর্মান্তিক ঘটনা উহুদ যুদ্ধের পরে ঘটিয়াছিল (সায়্যিদ আবুল আলা মওদূদী, প্রাগুক্ত, পৃ. ১)।
📄 রাসূলুল্লাহ (স) কর্তৃক হুঁশিয়ারি
ইবন ইসহাক বর্ণনা করেন, নবী করীম (স) বনূ নাযীর সম্প্রদায়কে মদীনা থেকে বহিষ্কার করিয়া দেওয়ার জন্য ১০জন সাহাবীকে পাঠাইলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদিগকে বলিয়া পাঠাইলেন, "তোমাদিগকে দশ দিনের সময় দেওয়া গেল। এই সময়ের মধ্যে তোমরা মদীনা ত্যাগ করিয়া চলিয়া যাইবে, অন্যথায় দশ দিন পর তোমাদের মধ্যে হইতে যাহাকেই মদীনার ত্রি-সীমানার ভিতরে পাওয়া যাইবে তাহাকেই হত্যা করা হইবে।"
তাহারা মদীনা ত্যাগ করিয়া চলিয়া যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হইয়াছিল (মওলানা মুহাম্মদ তফাজ্জল হোছাইন, সম্পা. ডঃ এ. এইচ. এম. মুজতবা হোছাইন, হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (স): সমকালীন পরিবেশ ও জীবন, পৃ. ৫৮৪)। এই সময় মুনাফিক সর্দার আবদুল্লাহ ইবন উবাই সংবাদ পাইয়া ইয়াহূদীদিগকে এই বলিয়া প্ররোচনা দিল, তোমরা নিজেদের জায়গায় অটল থাক, বাড়িঘর ছাড়িয়া যাইও না। আমার নিয়ন্ত্রণে দুই হাজার যোদ্ধা রহিয়াছে, যাহারা তোমাদের সঙ্গে দুর্গে প্রবেশ করিবে। তাহারা তোমাদের নিরাপত্তায় জীবন পর্যন্ত দিয়া দিবে। ইহার পরও যদি তোমাদিগকে বাহির করিয়া দেওয়া হয় তাহা হইলে আমরাও তোমাদের সাথে বাহির হইয়া যাইব। তোমাদের ব্যাপারে কাহারও হুমকিতে আমরা প্রভাবিত হইব না। যদি তোমাদের সহিত যুদ্ধ করা হয় তবে আমরা তোমাদের সাহায্য করিব। বানু কুরায়যা এবং বানু গাতাফান তোমাদের মিত্র। তাহারাও তোমাদের সাহায্য করিবে।
আবদুল্লাহ্ ইবন উবাই প্রেরিত এই খবর পাইয়া ইয়াহুদীরা দ্বিধান্বিত হইয়া পড়িল।
তাহাদের মধ্যে অনেকেরই আবদুল্লাহ্ কথার প্রতি আস্থা ছিল না। কারণ ইহার পূর্বে বানু কায়নুকাকে বহিষ্কারের প্রাক্কালে আবদুল্লাহ্ তাহাদিগকে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়াও শেষ পর্যন্ত তাহদিগকে অসহায় অবস্থায় ফেলিয়া নিজের পথ ধরিয়াছিল। তাই তাহারা তাহাদের সন্ধিচুক্তি থাকায় অপারগতা প্রকাশ করিল। তাহারা চিন্তা করিল, "আমাদেরকে যদি মদীনা হইতে বহিষ্কৃত হইতেই হয় তাহা হইলে আমরা খায়বার কিংবা মদীনার আশেপাশে কোন স্থানে গিয়া বসবাস করিব যাহাতে মদীনায় আমাদের বাগানগুলি হইতে ফল-ফলাদি সংগ্রহ করিতে পারি। এইরূপ অবস্থায় মদীনা হইতে নির্বাসিত হইলে আমাদের খুব একটা ক্ষতি হইবে না" (ডঃ মুহাম্মাদ হুসায়ন হায়কাল, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪০১)।
ইয়াহুদীদের একাংশ যখন এই সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করিতেছিল ঠিক এই সময় আবদুল্লাহ ইবন উবাইর সাহায্যের প্রতিশ্রুতির প্রেক্ষিতে তাহারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিল যে, বহিষ্কৃত হওয়ার পরিবর্তে তাহারা যুদ্ধ করিবে। ইয়াহূদী নেতা হুয়াই ইব্ন আখতার আশা করিয়াছিল যে, মুনাফিক নেতা তাহার কথা রাখিবে। তাই তাহাদের সবচেয়ে বড় নেতা হুয়াই ইব্ন আখতাব বলিল, "না, তাহা হইবে না, আমি মুহাম্মাদকে জানাইয়া দিতেছি যে, আমরা আমাদের ঘরবাড়ি কখনও ত্যাগ করিব না, বিষয়-সম্পত্তিও ছাড়িব না। আমাদের বিরুদ্ধে আপনি যাহা ইচ্ছা করিতে পারেন” (মহানবী (স)-এর জীবন চরিত, পৃ. ৪০২)।
বানু নাযীর গোত্রের ইয়াহুদীগণ রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করিলে তিনি মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা)-কে তাহাদের নিকট পাঠাইলেন। তিনি তাহাদেরকে নির্দেশ দিলেন, তোমরা আমার শহর হইতে বাহির হইয়া যাও। তোমরা এইখানে বসবাস করিতে পারিবে না। তাহাদেরকে দশ দিনের সময় দেওয়া হইল। এর মধ্যে যাহারা থাকিবে তাহাদের गर्दन (গর্দান) কাটিয়া ফেলা হইবে (মুহাম্মাদ হুসায়ন হায়কাল, হায়াত মুহাম্মাদ, পৃ. ২৯৮)।
মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা)-কে রাসূলুল্লাহ (স) বানু নাযীর গোত্রের মিত্র বানু আওস গোত্রের লোক হওয়ায় তাহাদের নিকট পাঠাইয়াছিলেন (সায়্যিদ সুলায়মান নাদবী, সীরাতুন্নবী, ২খ, পৃ. ২৭৬)।
ইবন ইসহাক বর্ণনা করেন, নবী করীম (স) বনূ নাযীর সম্প্রদায়কে মদীনা থেকে বহিষ্কার করিয়া দেওয়ার জন্য ১০জন সাহাবীকে পাঠাইলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদিগকে বলিয়া পাঠাইলেন, "তোমাদিগকে দশ দিনের সময় দেওয়া গেল। এই সময়ের মধ্যে তোমরা মদীনা ত্যাগ করিয়া চলিয়া যাইবে, অন্যথায় দশ দিন পর তোমাদের মধ্যে হইতে যাহাকেই মদীনার ত্রি-সীমানার ভিতরে পাওয়া যাইবে তাহাকেই হত্যা করা হইবে।"
তাহারা মদীনা ত্যাগ করিয়া চলিয়া যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হইয়াছিল (মওলানা মুহাম্মদ তফাজ্জল হোছাইন, সম্পা. ডঃ এ. এইচ. এম. মুজতবা হোছাইন, হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (স): সমকালীন পরিবেশ ও জীবন, পৃ. ৫৮৪)। এই সময় মুনাফিক সর্দার আবদুল্লাহ ইবন উবাই সংবাদ পাইয়া ইয়াহূদীদিগকে এই বলিয়া প্ররোচনা দিল, তোমরা নিজেদের জায়গায় অটল থাক, বাড়িঘর ছাড়িয়া যাইও না। আমার নিয়ন্ত্রণে দুই হাজার যোদ্ধা রহিয়াছে, যাহারা তোমাদের সঙ্গে দুর্গে প্রবেশ করিবে। তাহারা তোমাদের নিরাপত্তায় জীবন পর্যন্ত দিয়া দিবে। ইহার পরও যদি তোমাদিগকে বাহির করিয়া দেওয়া হয় তাহা হইলে আমরাও তোমাদের সাথে বাহির হইয়া যাইব। তোমাদের ব্যাপারে কাহারও হুমকিতে আমরা প্রভাবিত হইব না। যদি তোমাদের সহিত যুদ্ধ করা হয় তবে আমরা তোমাদের সাহায্য করিব। বানু কুরায়যা এবং বানু গাতাফান তোমাদের মিত্র। তাহারাও তোমাদের সাহায্য করিবে।
আবদুল্লাহ্ ইবন উবাই প্রেরিত এই খবর পাইয়া ইয়াহুদীরা দ্বিধান্বিত হইয়া পড়িল।
তাহাদের মধ্যে অনেকেরই আবদুল্লাহ্ কথার প্রতি আস্থা ছিল না। কারণ ইহার পূর্বে বানু কায়নুকাকে বহিষ্কারের প্রাক্কালে আবদুল্লাহ্ তাহাদিগকে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়াও শেষ পর্যন্ত তাহদিগকে অসহায় অবস্থায় ফেলিয়া নিজের পথ ধরিয়াছিল। তাই তাহারা তাহাদের সন্ধিচুক্তি থাকায় অপারগতা প্রকাশ করিল। তাহারা চিন্তা করিল, "আমাদেরকে যদি মদীনা হইতে বহিষ্কৃত হইতেই হয় তাহা হইলে আমরা খায়বার কিংবা মদীনার আশেপাশে কোন স্থানে গিয়া বসবাস করিব যাহাতে মদীনায় আমাদের বাগানগুলি হইতে ফল-ফলাদি সংগ্রহ করিতে পারি। এইরূপ অবস্থায় মদীনা হইতে নির্বাসিত হইলে আমাদের খুব একটা ক্ষতি হইবে না" (ডঃ মুহাম্মাদ হুসায়ন হায়কাল, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪০১)।
ইয়াহুদীদের একাংশ যখন এই সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করিতেছিল ঠিক এই সময় আবদুল্লাহ ইবন উবাইর সাহায্যের প্রতিশ্রুতির প্রেক্ষিতে তাহারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিল যে, বহিষ্কৃত হওয়ার পরিবর্তে তাহারা যুদ্ধ করিবে। ইয়াহূদী নেতা হুয়াই ইব্ন আখতার আশা করিয়াছিল যে, মুনাফিক নেতা তাহার কথা রাখিবে। তাই তাহাদের সবচেয়ে বড় নেতা হুয়াই ইব্ন আখতাব বলিল, "না, তাহা হইবে না, আমি মুহাম্মাদকে জানাইয়া দিতেছি যে, আমরা আমাদের ঘরবাড়ি কখনও ত্যাগ করিব না, বিষয়-সম্পত্তিও ছাড়িব না। আমাদের বিরুদ্ধে আপনি যাহা ইচ্ছা করিতে পারেন” (মহানবী (স)-এর জীবন চরিত, পৃ. ৪০২)।
📄 রাসূলুল্লাহ (স)-কে হত্যার ষড়যন্ত্র
রাসূলুল্লাহ (স) সাহাবী আমর ইবন উমায়্যা (রা) কর্তৃক নিহত বানু আমেরের দুইজন লোকের জন্য রক্তপণ আদায় করিবার ব্যাপারে সাহায্য চাহিতে বানু নাযীরের কাছে গেলেন। কেননা রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের সাথে মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ ছিলেন। বানু নাযীর ও বানু আমেরের মধ্যেও অনুরূপ চুক্তি ছিল। রাসূলুল্লাহ (স) যখন বানু নাযীরের কাছে গেলেন তখন তাহারা তাহাকে স্বাগত জানাইল এবং রক্তপণের ব্যাপারে তাহাকে সাহায্য করিতে সম্মত হইল। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই তাহাদের মনে এক কুটিল ষড়যন্ত্রের কথা জাগিল। তাহারা গোপনে শলাপরামর্শ করিতে লাগিল, কিভাবে রাসূলুল্লাহ্ (স)-কে হত্যা করা যায়। তাহারা মনে করিল, এমন মোক্ষম সুযোগ আর পাওয়া যাইবে না। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (স) একটা প্রাচীরের পাশে বসাছিলেন। তাঁহার সাথে ছিলেন হযরত আবূ বাক্স, হযরত উমার ও হযরত আলী (রাদিয়াল্লাহু আনহুম)।
বানু নাযীরের লোকেরা পরস্পর শলাপরামর্শ করিল। তাহারা বলিল, কে আছ যে পাশের ঘরের ছাদে উঠিয়া বড় একটি পাথর মুহাম্মাদের উপর ফেলিয়া দিতে পারিবে এবং তাহার কবল হইতে আমাদিগকে মুক্তি দিবে? বানু নাযীরের এক ব্যক্তি আমর ইব্ন জাহশ ইব্ন কা'ব এই কাজের জন্য প্রস্তুত হইল। সে রাসূলুল্লাহ (স)-এর উপর পাথর ফেলিয়া দেওয়ার জন্য ছাদের উপর আরোহণ করিল। সালাম ইব্ন মিশকাম নামের এক ইয়াহুদী বলিল, "সাবধান! এমন কাজ করিও না। আল্লাহ্র কসম! তোমাদের ইচ্ছার খবর আল্লাহ্র রাসূল পাইয়া যাইবেন। আল্লাহ পাকই তাঁহাকে খবর দিবেন। তাহা ছাড়া মুসলমানদের সাথে আমাদের যে অঙ্গীকার রহিয়াছে তাহাও লংঘন করা হইবে"। কিন্তু দুর্বৃত্ত স্বভাবে দুর্ভাগা ইয়াহুদীরা কোন কথাই কানে তুলিল না। তাহারা নিজেদের অসদুদ্দেশ্য বাস্তবায়নে অটল রহিল। রাসূলুল্লাহ্ (স) পূর্ব হইতেই এসব ব্যাপার গভীরভাবে ও সতর্ক দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করিতেছিলেন। এইদিকে রাব্বুল আলামীন আল্লাহ্ পাক তাঁহার প্রিয় রাসূলের নিকট হযরত জিবরাঈল (আ)-কে প্রেরণ করিলেন। আল্লাহর রাসূল দ্রুত সেই জায়গা হইতে উঠিয়া মদীনার পথে রওয়ানা হইলেন। তাঁহার সঙ্গী সাহাবীগণ তখনও টের পান নাই যে, রাসূলুল্লাহ (স) কোথায় গিয়াছেন। কিন্তু বানু নাযীরের লোকেরা ব্যাপারটি বুঝিয়া ফেলিল। তাহারা বুঝিতে পারিল যে, তাহাদের পরিকল্পনা ব্যর্থ হইয়া গিয়াছে। এখন রাসূলুল্লাহ (স)-এর সাহাবীগণের সহিতও একই ব্যবহার করিবে কিনা তাহা লইয়া দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়িল। তাহাদের একটি অংশ ভাবিল, "আমরা যদি মুহাম্মাদ (স)-এর সাহাবীগণের সহিতও একই ব্যবহার করি, তাহা হইলে অবশ্যই তিনি আমাদের উপর প্রতিশোধ গ্রহণ করিবেন।" তাহারা আরও ভাবিল যে, "যদি তাহার সাথীগণ নিরাপদে ফিরিয়া যান তাহা হইলে তাহারা হয়ত আমাদের ষড়যন্ত্রের কথা বুঝিতেই পারিবেন না। তাহাতে মুসলমানদের সহিত আমাদের পুরাতন চুক্তি বহাল থাকিবে (মুহাম্মাদ হুসায়ন হায়কাল, পৃ. ৪০০)।
এদিকে সাহাবীগণ অনেকক্ষণ অপেক্ষা করিয়াও যখন দেখিলেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) ফিরিতেছেন না, তখন তাঁহারা তাঁহার খোঁজে বাহির হইলেন। তাঁহারা প্রথমে মনে করিয়াছিলেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) প্রাকৃতিক প্রয়োজনে বাহিরে গিয়াছেন। কিন্তু পথিমধ্যে এক ব্যক্তিকে পাইলেন, যে মদীনা হইতে ফিরিয়া আসিতেছিল। তাঁহারা তাহার কাছে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সন্ধান চাহিলেন। সে বলিল, "রাসূলুল্লাহ (স)-কে আমি মদীনায় প্রবেশ করিতে দেখিয়াছি।" অন্য বর্ণনায় রহিয়াছে, "আমি মহানবী (স)-কে মসজীদে নববীতে প্রবেশ করিতে দেখিয়াছি” (ড. মুহাম্মাদ হুসায়ন হায়কাল, পৃ. ৪০০)।
সাহাবীগণ তৎক্ষণাৎ রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট পৌছিলেন। অন্য এক বর্ণনায় রহিয়াছে, সাহাবায়ে কিরাম তাঁহাকে অনুসরণ করিলেন এবং রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি এত দ্রুত চলিয়া আসিলেন যে, আমরা কিছুই বুঝিতে পারি নাই। রাসূলুল্লাহ (স) কুচক্রী ইয়াহুদীদের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সাহবীদিগকে অবহিত করিলেন। তিনি তাহাদিগকে বানু নাযীরের উপর আক্রমণ করিবার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ দিলেন। মদীনায় ফিরিয়া আসিবার পর আল্লাহর রাসূল (স) মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা)-কে বান্ নাযীর গোত্রের নিকট প্রেরণ করেন এবং তাহাদিগকে এই নোটিশ দেন, "তোমরা অবিলম্বে মদীনা হইতে বাহির হইয়া যাও। এইখানে তোমরা আমাদের সহিত থাকিতে পারিবে না। তোমাদিগকে দশ দিনের সময় দেওয়া হইল। ইহার পর তোমাদের মধ্যে যাহাকে পাওয়া যাইবে তাহার শিরশ্ছেদ করা হইবে।"
রাসূলুল্লাহ (স) বানু নাযীর গোত্রের নিকট গিয়াছিলেন। তিনি তাহাদের নিকট হইতে একটি রক্তপণ আদায়ের জন্য গিয়াছিলেন। তাহারা বলিল, হ্যাঁ, আমরা আপনার জন্য রক্তপণ দিব। আমরা আপনার জন্য একশত উট দিব। তিনি তাহাদের নিকট একটি দেয়ালের নিকট বসিলেন। তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-কে হত্যার জন্য ষড়যন্ত্র করিল। তাহারা বলিল, আমরা এই দেয়ালের নিকট রাসূলুল্লাহ (স)-কে হত্যার জন্য উপর হইতে পাথর নিক্ষেপ করিব। তিনি দেওয়ালের নিকট বসিলেন (বুখারী, ২খ, পৃ. ৫৯৪; মুসলিম, ২খ, পৃ. ১০০)।
তারা একে অপরকে বলল, তোমরা কেহ এই কাজটি করিবে না, কারণ সে যদি জানিতে পারে, সে তো আল্লাহ্ নবী। আল্লাহ তো তাহাকে এই বিষয়ে জানাইয়া দিবেন। সুতরাং তোমরা এই কাজটি করিবে না (সীরাত ইবন হিশাম, ২খ, পৃ. ১৯০)।
রাসূলুল্লাহ (স) সাহাবী আমর ইবন উমায়্যা (রা) কর্তৃক নিহত বানু আমেরের দুইজন লোকের জন্য রক্তপণ আদায় করিবার ব্যাপারে সাহায্য চাহিতে বানু নাযীরের কাছে গেলেন। কেননা রাসূলুল্লাহ (স) তাহাদের সাথে মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ ছিলেন। বানু নাযীর ও বানু আমেরের মধ্যেও অনুরূপ চুক্তি ছিল। রাসূলুল্লাহ (স) যখন বানু নাযীরের কাছে গেলেন তখন তাহারা তাহাকে স্বাগত জানাইল এবং রক্তপণের ব্যাপারে তাহাকে সাহায্য করিতে সম্মত হইল। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই তাহাদের মনে এক কুটিল ষড়যন্ত্রের কথা জাগিল। তাহারা গোপনে শলাপরামর্শ করিতে লাগিল, কিভাবে রাসূলুল্লাহ্ (স)-কে হত্যা করা যায়। তাহারা মনে করিল, এমন মোক্ষম সুযোগ আর পাওয়া যাইবে না। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (স) একটা প্রাচীরের পাশে বসাছিলেন। তাঁহার সাথে ছিলেন হযরত আবূ বাক্স, হযরত উমার ও হযরত আলী (রাদিয়াল্লাহু আনহুম)।
বানু নাযীরের লোকেরা পরস্পর শলাপরামর্শ করিল। তাহারা বলিল, কে আছ যে পাশের ঘরের ছাদে উঠিয়া বড় একটি পাথর মুহাম্মাদের উপর ফেলিয়া দিতে পারিবে এবং তাহার কবল হইতে আমাদিগকে মুক্তি দিবে? বানু নাযীরের এক ব্যক্তি আমর ইব্ন জাহশ ইব্ন কা'ব এই কাজের জন্য প্রস্তুত হইল। সে রাসূলুল্লাহ (স)-এর উপর পাথর ফেলিয়া দেওয়ার জন্য ছাদের উপর আরোহণ করিল। সালাম ইব্ন মিশকাম নামের এক ইয়াহুদী বলিল, "সাবধান! এমন কাজ করিও না। আল্লাহ্র কসম! তোমাদের ইচ্ছার খবর আল্লাহ্র রাসূল পাইয়া যাইবেন। আল্লাহ পাকই তাঁহাকে খবর দিবেন। তাহা ছাড়া মুসলমানদের সাথে আমাদের যে অঙ্গীকার রহিয়াছে তাহাও লংঘন করা হইবে"। কিন্তু দুর্বৃত্ত স্বভাবে দুর্ভাগা ইয়াহুদীরা কোন কথাই কানে তুলিল না। তাহারা নিজেদের অসদুদ্দেশ্য বাস্তবায়নে অটল রহিল। রাসূলুল্লাহ্ (স) পূর্ব হইতেই এসব ব্যাপার গভীরভাবে ও সতর্ক দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করিতেছিলেন। এইদিকে রাব্বুল আলামীন আল্লাহ্ পাক তাঁহার প্রিয় রাসূলের নিকট হযরত জিবরাঈল (আ)-কে প্রেরণ করিলেন। আল্লাহর রাসূল দ্রুত সেই জায়গা হইতে উঠিয়া মদীনার পথে রওয়ানা হইলেন। তাঁহার সঙ্গী সাহাবীগণ তখনও টের পান নাই যে, রাসূলুল্লাহ (স) কোথায় গিয়াছেন। কিন্তু বানু নাযীরের লোকেরা ব্যাপারটি বুঝিয়া ফেলিল। তাহারা বুঝিতে পারিল যে, তাহাদের পরিকল্পনা ব্যর্থ হইয়া গিয়াছে। এখন রাসূলুল্লাহ (স)-এর সাহাবীগণের সহিতও একই ব্যবহার করিবে কিনা তাহা লইয়া দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়িল। তাহাদের একটি অংশ ভাবিল, "আমরা যদি মুহাম্মাদ (স)-এর সাহাবীগণের সহিতও একই ব্যবহার করি, তাহা হইলে অবশ্যই তিনি আমাদের উপর প্রতিশোধ গ্রহণ করিবেন।" তাহারা আরও ভাবিল যে, "যদি তাহার সাথীগণ নিরাপদে ফিরিয়া যান তাহা হইলে তাহারা হয়ত আমাদের ষড়যন্ত্রের কথা বুঝিতেই পারিবেন না। তাহাতে মুসলমানদের সহিত আমাদের পুরাতন চুক্তি বহাল থাকিবে (মুহাম্মাদ হুসায়ন হায়কাল, পৃ. ৪০০)।
এদিকে সাহাবীগণ অনেকক্ষণ অপেক্ষা করিয়াও যখন দেখিলেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) ফিরিতেছেন না, তখন তাঁহারা তাঁহার খোঁজে বাহির হইলেন। তাঁহারা প্রথমে মনে করিয়াছিলেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) প্রাকৃতিক প্রয়োজনে বাহিরে গিয়াছেন। কিন্তু পথিমধ্যে এক ব্যক্তিকে পাইলেন, যে মদীনা হইতে ফিরিয়া আসিতেছিল। তাঁহারা তাহার কাছে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সন্ধান চাহিলেন। সে বলিল, "রাসূলুল্লাহ (স)-কে আমি মদীনায় প্রবেশ করিতে দেখিয়াছি।" অন্য বর্ণনায় রহিয়াছে, "আমি মহানবী (স)-কে মসজীদে নববীতে প্রবেশ করিতে দেখিয়াছি” (ড. মুহাম্মাদ হুসায়ন হায়কাল, পৃ. ৪০০)।
সাহাবীগণ তৎক্ষণাৎ রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট পৌছিলেন। অন্য এক বর্ণনায় রহিয়াছে, সাহাবায়ে কিরাম তাঁহাকে অনুসরণ করিলেন এবং রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি এত দ্রুত চলিয়া আসিলেন যে, আমরা কিছুই বুঝিতে পারি নাই। রাসূলুল্লাহ (স) কুচক্রী ইয়াহুদীদের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সাহবীদিগকে অবহিত করিলেন। তিনি তাহাদিগকে বানু নাযীরের উপর আক্রমণ করিবার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ দিলেন। মদীনায় ফিরিয়া আসিবার পর আল্লাহর রাসূল (স) মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা)-কে বান্ নাযীর গোত্রের নিকট প্রেরণ করেন এবং তাহাদিগকে এই নোটিশ দেন, "তোমরা অবিলম্বে মদীনা হইতে বাহির হইয়া যাও। এইখানে তোমরা আমাদের সহিত থাকিতে পারিবে না। তোমাদিগকে দশ দিনের সময় দেওয়া হইল। ইহার পর তোমাদের মধ্যে যাহাকে পাওয়া যাইবে তাহার শিরশ্ছেদ করা হইবে।"