📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 তদানীন্তন মুসলিম সমাজে এই যুদ্ধের প্রভাব

📄 তদানীন্তন মুসলিম সমাজে এই যুদ্ধের প্রভাব


এই যুদ্ধের সকল মুজাহিদের শাহাদাত লাভ মুসলমানদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস। 'জান দেওয়া যায় তবুও বাতিলের সাথে আপোষ করা যায় না', এই শাশ্বত সত্যের জ্বলন্ত সাক্ষী হইয়া শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরিয়া মুসলমানদের হৃদয়ে হৃদয়ে বিরাজ করিয়াছেন এই যুদ্ধের অমর শহীদগণ। শত্রুপক্ষ এই যুদ্ধের মুজাহিদগণের সাথে অমানবিক ও বর্বরোচিত আচরণ করিয়া তাহদিগকে শহীদ করিয়াছিল। এই ঘটনার খবর তদানীন্তন মদীনা মুনাওয়ারায় মুসলিম সমাজে পৌছিলে সারামদীনায় শোকের ছায়া নামিয়া আসিল। সমগ্র পরিবেশ দীর্ঘ দিন যাবত ছিল শোকার্ত ও বেদনা বিধুর। প্রায় একই সময়ে সংঘটিত বি'র মা'উনা (بئر معونة)-এর ঘটনাও ছিল অত্যন্ত মর্মান্তিক। সেই ঘটনায়ও বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হইয়া শহীদ হইয়াছিলেন প্রায় সত্তরজন সাহাবী। রাসূলুল্লাহ (স) ও সাহাবীগণ (রা) এই দুইটি ঘটনায় এত বেশী শোকার্ত হইয়াছিলেন যে, দীর্ঘ প্রায় একটি মাস ধরিয়া তাঁহারা এই উভয় ঘটনার সাথে জড়িত বিশ্বাসঘাতকদের বিরুদ্ধে প্রত্যহ বদদু'আ করিতেন (দা. মা. ই., ১০খ., পৃ. ২১৬)। তিনি আর-রাজী' ও বি'র মা'উনার শহীদদের জন্যও দু'আ করিতেন (ইসলামী বিশ্বকোষ, ২২খ., পৃ. ২২৫)।
রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর কবি হাসসান ইন্ন ছাবিত (রা) আর-রাজী'-এর ঘটনায় খুবই মর্মাহত হন। ইন্ন ইসহাক বলিয়াছেন, হাসসান (রা) শহীদদের উদ্দেশ্যে একটি শোকগাথা (الرثاء) রচনা করেনঃ
صلى الإله على الذين تتابعوا يوم الرجيع فأكرموا وأثيبوا رأس السرية مرثد وأميرهم وابن البكير إمامهم وخبيب وابن الطارق وابن دثنة منهم وافاه ثم حمامه المكتوب والعاصم المقتول عند رجيعهم كسب المعالي إنه لكسوب منع المقادة أن ينالوا ظهره حتى يـجـالـد إنه لنجيب.
* "আর-রাজী'-এর দিন যাহারা পর্যায়ক্রমে যুদ্ধ করিয়াছেন তাহাদের প্রতি আল্লাহ্র রহমত বর্ষিত হইয়াছে, তাহারা সম্মানিত হইয়াছেন এবং তাহাদিগকে সওয়াব দান করা হইয়াছে।
* মারছাদ ছিলেন তাহাদের দলপতি, সম্মুখে ছিলেন ইব্‌ন বুকায়র আরো ছিলেন খুবায়ব, ইব্‌ন তারিক, ইব্‌ন দাছিনা, তাহাদের উপর নির্ধারিত মৃত্যুই আসিয়া পড়িল।
* তাহাদের সহিত আরো ছিলেন 'আসিম যিনি রাজী'-তে শহীদ হইলেন, যিনি উচ্চ মর্যাদা অর্জন করিলেন এবং তিনি ছিলেন উচ্চ মর্যাদার আগ্রহী।
* শত্রুরা তাহার নাগাল পাইবে তিনি সেরূপ আত্মসমর্পণকে গ্রহণ না করিয়াই তরবারি পরিচালনা করিলেন। আর তিনি হইলেন মহৎ ও সম্ভ্রান্ত" (ইব্‌ন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৯৮৫-৯৮৬)।
উল্লেখ্য যে, ইব্‌ন হিশাম বলিয়াছেন যে, অধিকাংশ মনীষী এই শোকগাথাটি হাসসান ইব্‌ন ছাবিত (রা) রচিত বলিয়া মানিয়া লইতে অস্বীকার করিয়াছেন (ইব্‌ন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৯৮৬)। এই কবিতাংশে মারছাদকে দলপতি বলা হইলেও আসলে দলপতি ছিলেন 'আসিম ইব্‌ন ছাবিত (রা), যেমনটি পূর্বে উল্লেখ করা হইয়াছে।
হাসসান ইব্‌ন ছাবিত (রা) যেমন আর-রাজী'-এর যুদ্ধে শহীদদের শোকে শোকার্ত হইয়া শোকগাথা রচনা করিয়াছেন, তেমনি যাহারা প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতার প্রশ্রয় লইয়া আল্লাহর এই সকল নিবেদিতপ্রাণ সৈনিককে শহীদ করিয়াছিল তাহাদের জন্যও বিদ্রূপাত্মক ব্যঙ্গ কবিতাও ( الهجاء ) রচনা করিয়াছেন। উদাহরণস্বরূপ কিছু চরণ এখানে উল্লেখ করা হইলঃ لعمري لقد شانت هذيل بن مدرك أحاديث كانت في خبيب وعاصم ولحيان جرامون شر الجرائم أحاديث لحيان صلوا بقبيحها أناس هم من قومهم في صميمهم بمنزلة الزمعان دبر القوادم أمانتهم ذا عفة ومكارم هم غدروا يوم الرجيع وأسلمت هذيل توقى منكرات المحارم رسول رسول الله غدرا ولم تكن بقتل الذي تحميه دون الجرائم فسوف يرون النصر يوماً عليهم حمت لحم شهاد عظام الملاحم أبابيل دبر شمس دون لحمه مصارع قتلى أو مقاما لما تم لعل هذيلا أن يروا بمصابه
* "আমার জীবনের শপথ! হুযায়ল ইব্‌ন মুদরিককে কলংকিত করিয়াছে সেইসব আচরণ যাহা তাহারা খুবায়ব ও আসিমের সঙ্গে করিয়াছে।
* লিয়ানদের আচরণের পরিণতি তাহারা ভোগ করিয়াছে। আর লিয়ানরা তো জঘন্য অপরাধে অপরাধী।
* লিয়ানরা যদিও মূল হুযায়লদের অংশ তাহার পরও তাহারা অন্যদের তুলনায় পশুর সম্মুখ পায়ের পশমের মতই নিকৃষ্ট।
* তাহারা আর-রাজী'র দিন বিশ্বাসঘাতকতা করিয়াছে। পবিত্র ও উচ্চ বংশীয়দের সহিত প্রতারণা করিয়া তাহারা নিজেদের বিশ্বস্ততাকে জলাঞ্জলি দিয়াছে।
* তাহারা আল্লাহ্র রাসূল (স)-এর দূতের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করিয়াছে, আর হুযায়লরা তো নিষিদ্ধ হারাম থেকে কখনও বাঁচিয়া থাকে নাই।
* শীঘ্রই তাহারা একদিন দেখিবে যে, তাহাদের বিরুদ্ধে অন্যদের সাহায্য করা হইতেছে এমন মহান ব্যক্তিকে হত্যা করার কারণে যাহার লাশকে অপরাধীদের হইতে রক্ষা করা হইয়াছে।
* তাহার মাংসে ভোমরার দল পাহারা দিয়াছে যিনি বড় বড় রণাঙ্গনে নৈপুণ্য দেখাইয়াছেন।
* হুযায়লগণ অন্যদেরকে আহত করিয়াছে, সম্ভবত তাহারা তাহার পরিবর্তে নিজেদেরকে নিহতের বধ্যভূমি অথবা শোক প্রকাশের স্থলে দেখিতে পাইবে। অর্থাৎ তাহাদের অনেকেই অল্প দিনের ভিতরেই নিহত হইবে" (ইব্‌ন হিশাম, ৩খ., ৯৮২-৯৮৩)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 এই যুদ্ধ সম্পর্কে অবতীর্ণ আয়াতসমূহ

📄 এই যুদ্ধ সম্পর্কে অবতীর্ণ আয়াতসমূহ


আর-রাজী'-এর হৃদয়বিদারক ঘটনাকে লইয়া মুনাফিকরা বিভিন্ন প্রকার আজেবাজে কথাবার্তা বলিতে লাগিল। একদিকে তাহাদের এই অবাঞ্ছিত কথাবার্তার কঠোর প্রতিবাদ, অপরদিকে এই ঘটনায় যাহারা শাহাদাত বরণ করিয়াছেন তাহাদের ভূয়সী প্রশংসা করিয়া কুরআনের কয়েকটি আয়াত অবতীর্ণ হইয়াছে। আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আব্বাস (রা) বলিয়াছেন, মক্কা ও মদীনার মাঝে আর-রাজী' নামক স্থানে যখন খুবায়ব (রা)-এর সাথীগণ (তাবারী, ২খ., পৃ. ৩২৫), যাহাদের মধ্যে মারছাদ, 'আসিম ইব্‌ন ছাবিত ও ইন্সুদ দাছিনা ছিলেন (আবূ হায়‍্যান, ২খ., ১২২), তাঁহারা দুর্ঘটনায় পতিত হইলে মুনাফিকরা বলিতে লাগিলঃ
يا ويح هولاء المفتونين الذين هلكوا هكذا لاهم قعدوا في بيوتهم ولاهم أدوا رسالة صاحبهم.
“ঐ সমস্ত বিশৃঙখলা সৃষ্টিকারীর ধ্বংস অনিবার্য যাহারা এইভাবে ধ্বংস হইয়া গেল। না তাহারা নিজেদের ঘরে বসিয়া রহিল, না তাহারা তাহাদের সাথীর (রাসূলুল্লাহ) দেওয়া দায়িত্ব পালন করিল।"
তখন আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন তাহাদের প্রচারণার প্রতি-উত্তরে নিম্নোক্ত আয়াতসমূহ অবতীর্ণ করিলেন (তাবারী, ২খ., ৩২৫; ইব্‌ন কাছীর, ৪খ., ৬৯; ইব্‌ন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৯৭৮; আবু হায়‍্যান, ২খ., ১২২):
وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يُعْجِبُكَ قَوْلُهُ فِي الْحَيَوةِ الدُّنْيَا وَيُشْهِدُ اللَّهَ عَلَى مَا فِي قَلْبِهِ وَهُوَ الدُّ الْخِصَامِ. وَإِذَا تَوَلَّى سَعَى فِي الْأَرْضِ لِيُفْسِدَ فِيهَا وَيُهْلِكَ الْحَرْثَ وَالنَّسْلَ وَاللَّهُ لَا يُحِبُّ الْفَسَادَ، وَإِذَا قِيلَ لَهُ اتَّقِ اللهَ أَخَذَتْهُ الْعِزَّةُ بِالْإِثْمِ فَحَسْبُهُ جَهَنَّمُ وَلَبِئْسَ الْمِهَادُ. وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَشْرِى نَفْسَهُ ابْتِغَاءَ مَرْضَاتِ اللَّهِ وَاللَّهُ رَءُوفٌ بِالْعِبَادِ.
"মানুষের মধ্যে এমন ব্যক্তি আছে, পার্থিব জীবন সম্বন্ধে যাহার কথাবার্তা তোমাকে চমৎকৃত করে এবং তাহার অন্তরে যাহা রহিয়াছে তাহা সম্পর্কে আল্লাহকে সাক্ষী বানায়। প্রকৃতপক্ষে সে ভীষণ কলহপ্রিয়। যখন সে ফিরিয়া যায় তখন সে পৃথিবীতে কি করিয়া বিপর্যয় সৃষ্টি করিবে, কি করিয়া শস্য ক্ষেত ও বংশ ধ্বংস করিবে সেই চেষ্টায় নিয়োজিত হয়। অথচ আল্লাহ অশান্তি পছন্দ করেন না। এই ব্যক্তিকে যখন বলা হয়, তুমি আল্লাহকে ভয় কর তখন তাহার আত্মাভিমান তাহাকে পাপের মধ্যে লিপ্ত রাখে। সুতরাং তাহার জন্য জাহান্নামই যথেষ্ট। নিশ্চয় তাহা অত্যন্ত খারাপ স্থান। মানুষের মধ্যে এমন লোকও রহিয়াছে যে কেবল আল্লাহ্ সন্তোষ লাভের উদ্দেশ্যেই নিজের জীবন উৎসর্গ করে। আল্লাহ বান্দাদের প্রতি খুবই অনুগ্রহশীল" (২: ২০৪-২০৭)।
মূলত এখানে শেষ আয়াতটিতে ইব্‌ন 'আব্বাস-এর বর্ণনা অনুযায়ী আর-রাজী'-এর শহীদদের আত্মত্যাগের কথাই বলা হইয়াছে (তাবারী, ২খ., পৃ. ৩২৫)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00