📄 খুবায়ব ইবন 'আদী (রা)-এর শাহাদাত
যায়দ ইবনুদ দাছিনা (রা)-এর সহিত জাহজাবী ইন্ন যুলফা ইবন 'আমর ইবন আওফ গোত্রের (আল-আয়নী, ৯খ, ১০০) খুবায়ব ইব্ন 'আদী (রা)-কেও হুযালীগণ মক্কাতে লইয়া আসিল। তাঁহাকে হুদায়র ইব্ন আবী ইহাব আত-তামীমীর ভ্রাতুষ্পুত্র (আল-ওয়াকিদী, ১খ., পৃ. ৩৫৭) 'উকবা ইবনুল হারিছ ইবন 'আমের ইব্ন নাওফালের নিকট একটি কালো ক্রীতদাসী (ইবন হাজার, ৭খ., পৃ. ৩৮১, বৈরূত তা. বি.; আল-আয়নী, ৯খ., পৃ. ১৬৮) অথবা আশি মিছকাল স্বর্ণ বা পঞ্চাশটি উটের বিনিময়ে বিক্রয় করা হইল (আল-ওয়াকিদী, ১খ., পৃ. ৩৫৭, আল-আয়নী, ৯খ., পৃ. ১০০)। অন্য বর্ণনায় বলা হইয়াছে যে, তাঁহাকে হুযালীগণ মক্কায় তাহাদের গোত্রের একজন বন্দীর বিনিময়ে বিক্রয় করিয়াছিল (দানাপুরী, পৃ. ১১৬)। আরও কথিত আছে যে, তাঁহাকে আল-হারিছ ইব্ন নাওফলের এক কন্যার নিকট এক শত উটের বিনিময়ে বিক্রয় করা হইয়াছিল (আল-ওয়াকিদী, ১খ., পৃ. ৩৫৭)। এখানে বিভিন্ন প্রকার বর্ণনা উল্লেখ করা হইয়াছে। তবে কিসের বিনিময়ে তাঁহাকে বিক্রি করা হইয়াছিল ও কে ক্রেতা ছিল তাহা লইয়া মতপার্থক্য সৃষ্টি হইলেও তাঁহাকে যে বিক্রয় করা হইয়াছিল সে বিষয়ে কোন মতপার্থক্য নাই।
খুবায়ব ইব্ন 'আদী (রা) বদরের যুদ্ধে 'উকবা-এর পিতা হারিছ ইবন 'আমের ইব্ন নাওফালকে হত্যা করিয়াছিলেন (দানাপুরী, পৃ. ১৭৭; মুহাম্মদ ইব্ন আবদুল ওয়াহহাব, পৃ. ৩৩৫; E.I.2, vol. v, p. 40)। খুবায়বকে হত্যা করিয়া হারিছের হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ করিবার জন্যই তাহারা তাঁহাকে ক্রয় করিয়াছিল (আল-ওয়াকিদী, ১খ., পৃ. ৩৫৭; শিবলী নু'মানী, ১খ., পৃ. ২২৫)। অন্যত্র বর্ণিত হইয়াছে, যাহাদের পিতারা বদরের যুদ্ধে মুসলমানদের হাতে নিহত হইয়াছিল তাহারা সকলে মিলিয়া সম্মিলিতভাবে তাহাদের পিতৃ হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণের আকাঙ্ক্ষায় খুবায়বকে ক্রয় করিয়াছিল। তাহারা হইল আবূ ইহাব ইব্ন 'আযীয, 'ইকরামা ইব্ন আবী জাহল, আল-আখনাস ইব্ন শারীক, 'উবায়দা ইব্ন হাকীম ইবনিল আওকাস, উমায়্যা ইব্ন আবী 'উতবা, ইবনুল হাদরামী, শু'বা ইব্ন আবদিল্লাহ ও সাফওয়ান ইবন উমায়্যা (আল-আয়নী, ৯খ., পৃ. ১০০; ইবনুল আছীর, উসদুল গাবা, ২খ., ১০৪)। হযরত খুবায়ব ইবন 'আদী (রা) উল্লিখিত সকল কুরায়শ-এর পিতাদিগকে হত্যা করেন নাই। তিনি শুধু 'উকবা ইবন হারিছের পিতাকে হত্যা করিয়াছিলেন। যেহেতু তাহাদের পিতাগণ মুসলমানদের হাতেই নিহত হইয়াছিল সেহেতু প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য তাহারা খুবায়বকে হত্যা করিবার আকাঙ্ক্ষায় ক্রয় করিয়াছিল।
কোন কোন ঐতিহাসিক খুবায়ব ইব্ন 'আদী (রা) বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন নাই বলিয়া মত প্রকাশ করিয়াছেন। ঐতিহাসিক দিময়াতী বলিয়াছেন, খুবায়ব ইব্ন 'আদী (রা) বদরের যুদ্ধে উপস্থিত ছিলেন না, তিনি ছিলেন আওস গোত্রের লোক। যে খুবায়ব হারিস ইব্ন 'আমেরকে হত্যা করিয়াছিলেন তিনি হইলেন খুবায়ব ইব্ন্ন ইসাফ। তিনি ছিলেন খাযরাজ গোত্রের লোক (ইব্ন হাজার, ৭খ., পৃ. ৩৮২; মুহাম্মাদ আমীন, পৃ. ১৩৪; আল-আয়নী, ৯খ., পৃ. ১৬৮)। দিময়াত-এর এই ধারণা ঠিক নহে। বুখারী শরীফের বিশুদ্ধ হাদীছ দ্বারাই প্রমাণিত যে, খুবায়ব ইব্ন 'আদী বদরের যুদ্ধেই হারিছ ইব্ন আমের ইব্ন নাওফালকে হত্যা করিয়াছিলেন (বুখারী, ৫খ., পৃ. ৪১)। বিশুদ্ধ এই বর্ণনার উপর ভিত্তি করিয়া সন্দেহাতীতভাবে বলা যায় যে, খুবায়ব ইব্ন 'আদী বদরের যুদ্ধে উপস্থিত ছিলেন।
অন্য একটি যৌক্তিক কারণেও এই বাস্তব সত্য প্রমাণিত হয়। অসংখ্য বর্ণনায় বলা হইয়াছে যে, বদরের যুদ্ধে হত্যাকারী হিসাবেই প্রতিশোধ গ্রহণের লক্ষ্যে খুবায়ব ইব্ন 'আদীকে মক্কাতে হত্যা করা হইয়াছিল। দলীল-প্রমাণের মাধ্যমে হন্তা প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত প্রতিশোধ-মূলকভাবে কাহারও হত্যা আরবদের সেই সমাজে প্রচলিত ছিল না। যেহেতু কুরায়শরা তাঁহাকে হত্যাকারী হিসাবে প্রতিশোধপরায়ণ হইয়া হত্যা করিয়াছিল, সেহেতু ইহা দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, খুবায়ব ইব্ন 'আদী বদরের যুদ্ধে উপস্থিত ছিলেন এবং তাহাদের কাহাকেও না কাহাকে হত্যাও করিয়াছিলেন। অবশ্য এই সমস্ত বর্ণনা ও দিময়াতীর মতামতের এই পার্থক্যকে দূর করিবার জন্য কেহ কেহ বলিয়াছেন, "এমনও হইতে পারে যে, খুবায়ব ইব্ন 'আদী ও খুবায়ব ইব্ন্ন ইসাফ উভয়েই হারিছ ইব্ন আমেরকে হত্যা করিয়াছিলেন (ইব্ন হাজার, ৭খ., পৃ. ৩৮২)। বাহ্যত এই কথাটি দুইটি সাংঘর্ষিক মতকে সমন্বয় সাধনের প্রয়াস হিসাবে গ্রহণযোগ্য মনে হইলেও ইহার কোন প্রমাণ কোন গ্রহণযোগ্য বর্ণনায় না পাওয়া যাওয়ার কারণে তাহা প্রশ্নাতীতভাবে গ্রহণ করা যায় না।
যুল-কা'দা মাস নিষিদ্ধ মাসসমূহের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কারণে এই সময় খুবায়ব ইব্ন 'আদীকে হত্যা না করিয়া তাহারা তাঁহাকে হারিছ ইব্ন আমেরের বাড়িতে বন্দী করিয়া রাখিল (মানসূরপুরী, ১খ., পৃ. ১২২)। অন্য বর্ণনায় আসিয়াছে, তাঁহাকে বানু আবদে মানাফের হুদাইর ইব্ন আবী ইহাবের ক্রীতদাসী (আল-ওয়াকিদী, ১খ., পৃ. ৩৫৭; ইব্ন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৯৭২) মাবীয়া (ইবন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৯৭২; মুহাম্মাদ আমীন, পৃ. ১৩৩), মতান্তরে হুজায়ন ইব্ন আবী ইহাবের ক্রীতদাসী মারিয়া (ইব্ন হাজার, ৭খ., আল-আয়নী, ৯খ., পৃ. ১৬৮), ইব্ন বাত্তালের বর্ণনানুযায়ী হুজায়ন ইব্ন আবী ইহাবের ক্রীতদাসী জুওয়ায়রিয়া (ইব্ন হাজার, ৭খ., পৃ. ৪৪২; আল-আয়নী, ৯খ., পৃ. ১৬৮)-এর গৃহে বন্দী করিয়া রাখা হইয়াছিল। মারিয়া পরে ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিলেন (ইব্ন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৯৭২)।
মারিয়া বলিয়াছেন, খুবায়ব ইবন 'আদী সুললিত কণ্ঠে কুরআন তিলাওয়াত করিয়া সালাতুত তাহাজ্জুদ আদায় করিতেন। আশেপাশের মহিলারা তাঁহার আকর্ষণীয় এই তিলাওয়াত বিমুগ্ধ হইয়া শ্রবণ করিত। ধীরে ধীরে তাহারা খুবায়বের প্রতি কিছুটা দুর্বল হইয়া পড়িল। তাহারা তাঁহার প্রতি নমনীয় ব্যবহার শুরু করিল। আমি ছিলাম তাহাদের অন্যতম। আমি দয়ার্দ্র হইয়া খুবায়বকে জিজ্ঞাসা করিলাম, হে খুবায়ব! আপনি কি কোন কিছুর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করিতেছেন? প্রয়োজনে আমি আপনাকে সাহায্য করিতে প্রস্তুত রহিয়াছি। তিনি বলিলেন, হাঁ, আমি সুমিষ্ট পানির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করিতেছি। আশা করি তুমি তাহা আমাকে সরবরাহ করিবে। আমি আরো আশা করি যে, শুধু আল্লাহর নামে যবেহকৃত পশু ব্যতীত অন্য কাহারও নামে যবেহকৃত পশুর গোশত আমাকে কখনও খাওয়াইবে না। আর তাহারা আমাকে যখন হত্যা করিবার সময় নির্ধারণ করিবে, তুমি আমাকে তাহা আগাম জানাইয়া দিবে (ইবন হাজার, ৭খ., পৃ. ৩৮২; আল-ওয়াকিদী, ১খ., পৃ. ৩৫৭-৩৫৮)। অন্যত্র বর্ণিত হইয়াছে যে, খুবায়ব (রা)-কে জিজ্ঞাসা করা হয় নাই, তিনি উপযাচক হইয়া হারিছ ইব্ন আমেরের ক্রীতদাস মাওহাব-এর নিকট হইতে এই তিনটি জিনিস চাহিয়াছিলেন (মুহাম্মাদ ইবন সা'দ, ১খ., পৃ. ৩৮৫)।
কুরায়শগণ বন্দী অবস্থায় খুবায়ব ইব্ন্ন 'আদীর প্রতি অত্যন্ত নিষ্ঠুর আচরণ করিত। অতিষ্ঠ হইয়া এক সময় খুবায়ব (রা) বলিলেন, "হায়! সম্মানিত লোক বলিয়া যাহারা নিজেদেরকে দাবি করে তাহারা কি তাহাদের বন্দীর সহিত ভাল আচরণ করিতে পারে না"? খুবায়ব (রা)-এর এই নীতিবাক্য তাহাদের বিবেককে কশাঘাত করিল। বাধ্য হইয়া তাহারা খুবায়ব (রা)-এর প্রতি ভাল ব্যবহার শুরু করিল এবং তাঁহার দেখাশুনা করিবার জন্য একজন নারীকে পরিচারিকা হিসাবে নিয়োগ করিল (ইবন হাজার, ৭খ., পৃ. ৩৮২)। সম্ভবত সেই মহিলাটি হইল উপরোল্লিখিত মারিয়া।
খুবায়ব ইব্ন 'আদী (রা) লৌহ বেষ্টিত ঘরে বন্দি জীবন যাপন করিয়া দিন অতিবাহিত করিতেছিলেন। যয়নব বিনত হারিছ ইবন 'আমের ইবন নাওফাল (কান্ধলাবী, ২খ., পৃ. ৭৫৬; আল-আয়নী, ৯খ., পৃ. ১৬৮), মতান্তরে হুজায়ন ইন্ন আবী ইহাবের ক্রীতদাসী মাবিয়া অথবা মারিয়া হঠাৎ তাহার নিকট উপস্থিত হইল এবং দেখিল, তিনি মানুষের মাথার মত বড় আঙুরের থোকা হইতে সুন্দর সুন্দর আঙুর ভক্ষণ করিতেছেন। বর্ণনাকারী বলেন, সে সময় মক্কাতে এ ধরনের কোন ফল পাওয়া যাইত না। এমনকি ভূ-পৃষ্ঠে উৎপাদিত কোন আঙুর হইতে এই আঙুর ছিল একেবারেই ভিন্ন (আল-ওয়াকিদী, ১খ., পৃ. ৩৫৭; দানাপুরী, পৃ. ৩১১; মুহাম্মাদ ইব্ন আবদুল ওয়াহহাব, পৃ. ৩৩৫)। নিঃসন্দেহে ইহা একটি অলৌকিক ঘটনা। এই আঙুর আসলে আল্লাহর পক্ষ হইতে সরবরাহ করা হইয়াছিল। যাহারা আল্লাহ্ জন্যই নিবেদিত, আল্লাহ্ দীনের জন্যই যাহারা নিজেদেরকে উৎসর্গ করেন, স্বয়ং রাব্বুল আলামীনের পক্ষ হইতে তাহাদিগকে এই ধরনের সম্মানিত রিযিক সরবরাহ করা অস্বাভাবিক কিছু নহে।
ইব্ন বাত্তালের মতে খুবায়ব (রা)-কে আল্লাহ্ পক্ষ হইতে রিযিক সরবরাহ আল্লাহ্ কুদরতের ও রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর নবুওয়াতের আকাট্যতা প্রমাণের জন্য একটি জ্বলন্ত নিদর্শন ছিল। তবে সচরাচর সংঘটিত হয় না নিয়ম বহির্ভূত এমন যে কোন অলৌকিক ঘটনা যাহা দেখিয়া মানুষ বিস্ময়ে হতবাক হইয়া যায়, যাহা এমন আশ্চর্য যে, মানুষের চক্ষুকে স্থির করিয়া ফেলে, এ ধরনের কোন ঘটনা নবীরা ব্যতীত অন্যদের নিকট হইতে সংঘটিত হওয়া সম্ভবপর নহে। ইবন হাজারের দৃষ্টিতে ইন্ন বাত্তালের এই মতামত দুই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গিকে সমন্বয় করিয়াছে। তিনি যেমন কারামাতকে অস্বীকার করেন নাই, আবার আহলুস-সুন্নাহ আল-জামা'আতের যে কোন কারামাত সংঘটিত হওয়া সম্ভব, মতামতকেও গ্রহণ করেন নাই (ফাতহুল বারী, ৭খ., পৃ. ৩৮৩)। একজন মহিলা এই আঙুর তাঁহাকে খাইতে দেখিয়াছিল, বুখারী শরীফে উক্ত মহিলার নাম উল্লেখ করা হয় নাই (বুখারী, ৫খ., পৃ. ৪০)। ইবনুল আছীরও তাহার নাম উল্লেখ করেন নাই, শুধু একজন মহিলার কথা বলা হইয়াছে (২খ., পৃ. ১১৫-১১৬)। অপরদিকে ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনায় ভিন্ন মহিলার নাম, কোথাও যয়নব বিনত হারিছ, কোথাও ক্রীতদাসী মাবিয়া, মতান্তরে মারিয়া-এর নাম উল্লিখিত হইয়াছে (কানধাহলাবী, ২খ., পৃ. ২৫৮; আল-আয়নী, ৯খ., পৃ. ১৬৮; আল-ওয়াকিদী, ১খ., পৃ. ৩৫৭)। ইব্ন হাজার ভিন্নমুখী এই দুই বর্ণনাকে এইভাবে সমন্বয় করিয়াছেন যে, হইতে পারে যয়নব বিনত হারিছ ও ক্রীতদাসী মারিয়া উভয়েই খুবায়বের হাতে আঙুর দেখিয়াছিলেন। ইহাও সম্ভব যে, খুবায়বকে উক্ত ক্রীতদাসীর ঘরে বন্দী করা হইয়াছিল আর যয়নব বিনত হারিছকে তাঁহাকে পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হইয়াছিল (ইন্ন হাজার, ঐ, ৭খ., পৃ. ৪৪২)।
আশহুরুল হুরুম (যে সকল মাসে যুদ্ধ ও হত্যা নিষিদ্ধ) অতিবাহিত হইলে (ইন্ন হাজার, ৭খ., পৃ. ৪৪২) খুবায়ব ইবন 'আদী (রা) ক্রীতদাসীর মাধ্যমে জানিতে পারিলেন যে, কয়েক দিনের মধ্যেই তাহারা তাহাকে হত্যা করিবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিয়াছে (আল-ওয়াকিদী, ১খ., পৃ. ৩৫৮)। তখন তিনি যয়নব বিনত হারিছ (ইবন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৯৭৩)-এর নিকট ক্ষৌরকার্য সম্পন্ন করিয়া পবিত্র হইবার জন্য একটি ক্ষুর চাহিলেন। তাঁহাকে ক্ষুর সরবরাহ করা হইল। মক্কার প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিছ আবদুল্লাহ্ ইব্ন আবদুর রহমান ইব্ন আবুল হুসায়নের দাদা আবুল হুসায়ন ইবন হারিছ ইবন 'আদী ইবন নাওফাল তখনও ছিলেন শিশু (আল-আয়নী, ৯খ., পৃ. ১৬৮)। তাহার মাতা দেখিল, খুবায়ব (রা) -এর হাতে ক্ষুর শোভা পাইতেছে আর তাহার এই শিশু ছেলেটি খুবায়ব (রা)-এর একটি রানের উপর বসিয়া রহিয়াছে। মায়ের অমনোযোগিতার সুযোগেই শিশুটি নিজেই খুবায়ব (রা)-এর নিকট গিয়াছিল। মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত বন্দীর হাতে ধারাল ক্ষুর। এমনি অবস্থায় শত্রু পক্ষের কোন শিশু তাঁহার হাতে মোটেও নিরাপদ হওয়ার কথা নয়। যে কোন মুহূর্তে তাহাকে হত্যা করিয়া বন্দী প্রতিশোধ গ্রহণ করিবে ইহাই স্বাভাবিক। শিশুটির মাতা নিজের কলিজার ধন শিশুকে এমন একটি বিপদের মুখে অবস্থান করিতে দেখিয়া সাপ দেখিবার মত চমকাইয়া উঠিল। তীক্ষ্ণ ধীশক্তিসম্পন্ন সাহাবী খুবায়ব (রা) মহিলাটির এই সন্ত্রস্ত অবস্থা উপলব্ধি করিলেন। তিনি ছেলেটিকে এই বলিয়া দৌঁড় দিতে বলিলেন, তোমরা আমাকে হত্যার সিদ্ধান্ত লইয়াছ। এই অবস্থায় তোমার মাতা আমার হাতে ক্ষুর থাকার পরেও তোমাকে আমার কাছে কি করিয়া পাঠাইল! তোমার মাতা কি আমার পক্ষ হইতে বিশ্বাসঘাতকতার ভয় পায় নাই? তাঁহার এই কথা শুনিয়া ছেলেটির মাতা বলিল, আমার ছেলেকে তো হত্যা করিবার জন্য আপনাকে ক্ষুর সরবরাহ করা হয় নাই। খুবায়ব (রা) বলিলেন:
أتخشين أن أقتله ماكنت لأفعل ذلك وما تستحل في ديننا الغدر.
"তুমি কি ভয় করিতেছ যে, আমি তাহাকে হত্যা করিব? আমি কখনও তাহা করিব না (বুখারী, ৫খ., পৃ. ৪১)। আমাদের দীন ইসলাম এ ধরনের বিশ্বাসঘাতকতাকে বৈধ মনে করে না" (আল-ওয়াকিদী, ১খ., পৃ. ৩৫৮; আল-'উমারী, ২খ., পৃ. ৩৯৯)।
অন্য বর্ণনায় বলা হইয়াছে, ছেলেটি খুবায়ব (রা)-এর নিকট যখন গিয়াছিল তখন তাঁহার হাতে ক্ষুর ছিল বলিয়া ছেলেটির মাতা চমকিয়া উঠে নাই, বরং ছেলেটি নিজেই একটি ধারালো ছুরি লইয়া খেলিতে খেলিতে মায়ের অমনোযোগিতার সুযোগে খুবায়ব (রা)-এর নিকট পৌছিয়া গিয়াছিল। বন্দী অবস্থায় বন্দীর পাশে ছুরি হাতে নিজের শিশু ছেলেকে দেখিয়া তাহার মাতা সন্তানের আশু বিপদ উপলব্ধি করিয়া আতঙ্কিত হইয়া চিৎকার করিয়া উঠিল (মানসূরপুরী, ১খ., পৃ. ১২৩)। তখন খুবায়ব (রা) উপরোল্লিখিত কথাগুলি বলিয়াছিলেন।
খুবায়ব (রা) ক্ষুর পাইয়া ক্ষৌরকার্য সম্পন্ন করিয়া পবিত্রতা অর্জন করিলেন। কুরায়শরা তাঁহাকে শূলবিদ্ধ করিয়া হত্যা করিবার জন্য হারামের বাহিরে তানঈম নামক স্থানে লইয়া আসিল (ইব্ন কায়্যিম, ৩খ., পৃ. ২৪৫; মুবারকপুরী, পৃ. ২৯২; ইবন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৯৭২)। লোমহর্ষক এই হত্যাকাণ্ডের দৃশ্য দেখিবার জন্য মক্কা নগরী হইতে অনেকে তানঈমে উপস্থিত হইল (আল-ওয়াকিদী, ১খ., পৃ. ৩৫৮)। উপস্থিত ব্যক্তিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য যাহারা ছিল তাহারা হইল, ইহাব ইব্ন্ন 'আযীয, আল-আখনাস ইব্ন শারীক, 'উবায়দা ইব্ন হাকীম আস-সুলামী, উমায়্যা ইবন 'উতবা (ইব্ন্ন হাজার, ৭খ., পৃ. ৪৪৩), ইবনুল হাদরামী, সা'ঈদ ইব্ন আবদুল্লাহ্ (ইব্ন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৯৮০), আবু সুফয়ান ইব্ন হারব ও তাহার পুত্র মু'আবিয়া (ইব্ন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৯৭২)।
কুরায়শরা খুবায়ব (রা)-কে মৃত্যুর পূর্বে তাঁহার কোন আকাঙ্ক্ষা রহিয়াছে কিনা জানিতে চাহিল (মানসূরপুরী, ১খ., পৃ. ১২৩)। দুই রাক'আত সালাত আদায় করিবার জন্য তখন তিনি অনুমতি চাহিলেন। তাহারা তাঁহাকে দুই রাক্'আত সালাত আদায় করিবার অনুমতি দান করিল। তিনি অত্যন্ত বিনয়ের সাথে দুই রাক'আত সালাত আদায় করিলেন (ইবন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৯৭৩; E.I.2, vol. v, p.40; ইন্ন কায়্যিম, ৩খ., পৃ. ২৪৫; আবূ দাউদ, ৩খ., পৃ. ১১৬)। তানঈমে যে প্রসিদ্ধ মসজিদ পরে নির্মিত হইয়াছে তিনি ঐ স্থানটিতেই উক্ত সালাত আদায় করিয়াছিলেন (ইন্ন হাজার, ৭খ., পৃ. ৪৪৩)। প্রশান্তচিত্ত ও উদ্বেগহীন মন লইয়া সালাত শেষ করিয়া তিনি বলিলেন, "আমি মৃত্যুর ভয়ে শঙ্কিত হইয়া সালাত দীর্ঘায়িত করিয়াছি বলিয়া তোমরা ধারণা করিতে পার; যদি আমার এই ভয় না হইত তাহা হইলে আমি সালাত আরও দীর্ঘায়িত করিতাম (বুখারী, ৫খ., পৃ. ৪১; মুহাম্মদ ইব্ন আবদুল ওয়াহহাব, পৃ. ৩৩৫; শিবলী নু'মানী, ৫খ., পৃ. ৪১; ইব্ন কায়্যিম, ৩খ., পৃ. ২৪৫; মানসূরপুরী, ১খ., পৃ. ১২৩; আবূ যাহরা, ২খ., পৃ. ৮৮৩; ইব্ন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৯৭৩)। খুবায়ব (রা) মুসলমানদের কাহাকেও মৃত্যুদণ্ড দিতে চাহিলে মৃত্যুর পূর্বে দুই রাক্'আত সালাত আদায়ের সুন্নত প্রবর্তন করিলেন (বুখারী, ৫খ., পৃ. ৪০)। সুহায়লী বলিয়াছেন, হুজর ইব্ন 'আদী ইবনুল আদবার (রা)-ও খুবায়ব (রা)-এর মত মৃত্যুর পূর্বে দুই রাক'আত সালাত আদায় করিয়াছিলেন।
যখন খুবায়ব (রা)-কে শূলে চড়াইবার জন্য শক্ত করিয়া বাঁধা হইল তখন তিনি বলিলেন, “হে আল্লাহ! আমি আপনার রাসূল (স)-এর রিসালাতকে যথাযথভাবে পৌঁছাইয়াছি। তাহারা আমার সহিত যে অমানবিক আচরণ করিতেছে তাহার সংবাদ আপনি আপনার রাসূল (স)-কে পৌঁছাইয়া দিন" (ইব্ন হিশাম, ৩খ, পৃ. ৯৭৩)। রাসূলুল্লাহ্ (স) তখন বসা অবস্থায়ই ছিলেন। তাঁহার নিকট খুবায়ব (রা)-এর মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর পৌঁছানো হইল। তিনি বলিলেন, “হে খুবায়ব! তোমার উপর শান্তি বর্ষিত হউক" (ইব্ন হাজার, ৭খ, পৃ. ৪৪৩)।
যখন তাঁহাকে শূলবিদ্ধ করিবার জন্য উচু কাঠে উঠানো হইল, তিনি দু'আ করিলেন: اللهم احصهم عددا وأقتلهم بردا ولا تغادر فيهم أحدا .
"হে আল্লাহ! আপনি তাহাদের সংখ্যা গণনা করুন এবং তাহাদিগকে পৃথক পৃথকভাবে হত্যা করুন। তাহাদের কাহাকেও আপনি ছাড়িবেন না" (ইবন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৯৭৩; ইবনুল আছীর, ২খ., পৃ. ১১৬; ইব্ন কায়্যিম, ৩খ., পৃ. ২৪৫; মুবারকপুরী, পৃ. ২৯২; আবূ যুহরা, ২খ., পৃ. ৮৮৩)।
এক নিষ্ঠুর প্রকৃতির মুশরিক লোমহর্ষক এই হত্যাকাণ্ডের সকল আয়োজন স্বচক্ষে দেখিয়াও খুবায়ব (রা)-কে জিজ্ঞাসা করিল, "তুমি কি চাও না যে, তোমাকে আমরা ছাড়িয়া দেই, আর মুহাম্মাদ তোমার এই করুণ পরিণতির স্থানে উপনীত হউক"? খুবায়ব (রা) অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে উত্তর দিলেন, “আল্লাহ্ ইহা অবশ্যই জানেন, মুহাম্মাদ (স)-এর পায়ে একটি কাঁটা বিদ্ধ করিয়া তাহার বিনিময়ে আমি খুবায়ব প্রাণে বাঁচিয়া যাইব; আমি তাহা কখনও চাহি না" (মানসূরপুরী, ১খ., পৃ. ১২৩; মুহাম্মাদ ইব্ন আবদুল ওয়াহহাব, পৃ. ৩৩৬)। তিনি কবিতা পাঠ করিলেন যার প্রতিটি ছন্দে ঈমানী জযবার বহিপ্রকাশ হইয়াছে:
لقد جمع الأحزاب حولى وألبوا قبائلهم واستجمعوا كل مجمع وكلهم ميدى العداوة جاهد على لأنى في وثاق بمصيع وقد جمعوا أبناء هم ونساءهم وقربت من جذع طويل ممنع إلى الله أشكو غربتى ثم كربتي وما أرصد الاحزاب لي عند مصرعي فذا العرش صبرني على ما يراد بى فقد بضعوا لحمى وقد ياس مطمعي
وذلك في ذات الإله وإن يشأ يبارك على أوصال شلو ممزع وقد خيروني الكفر والموت دونه وقد هملت عيناي من غير مجزع وما بي حذار الموت إني لميت ولكن حذاری جحم نار ملفع فو الله ما أرجو إذا مت مسلما على أى جنب كان في الله مصرعي فلست يعبد للعدو تخشعا ولا جزعا إنى إلى الله مرجعي.
"* আমার চতুর্দিকে অনেক দল একত্র হইয়াছে, তাহারা তাহাদের গোত্রগুলিকে প্রতিটি লোকালয় হইতে সমবেত করিয়াছে।
* তাহাদের প্রত্যেকেই আমার প্রতি শত্রুতা প্রদর্শনকারী, সর্বশক্তি দিয়া আমাকে কষ্ট দানকারী। কেননা আমি তো বন্দীদশায় এমন ধ্বংসোম্মুখ একটি অস্ত্রে আবদ্ধ আছি যাহা আমার চামড়া ছিন্ন করে।
* তাহাদের সন্তান ও স্ত্রীদিগকে তাহারা একত্র করিয়াছে, নিষিদ্ধ লম্বা কাঠের (শূলের) নিকট আমাকে উপস্থিত করা হইয়াছে।
* আমি আমার দেশ হইতে দূরে, বিপদগ্রস্ত ও বধ্যভূমিতে আমার জন্য দলগুলি যাহা তৈরি করিয়াছে তাহার জন্য আল্লাহর নিকট ফরিয়াদ করিতেছি।
* হে আরশের অধিপতি! তাহারা আমাকে লইয়া যাহা করিতে চায় সে বিষয়ে আপনি আমাকে ধৈর্য দিন। তাহারা আমরা মাংস টুকরা টুকরা করিয়াছে, আমার আশা নিরাশায় পরিণত হইয়াছে।
* ইনি আল্লাহ্ই উদ্দেশ্যে, তিনি চাহিলে হাড়ের প্রতিটি গিরায় ও মাংসের প্রতিটি অংশকে বরকতময় করিবেন।
* তাহারা আমাকে কুফরী এখতিয়ার করিতে বলিয়াছিল, কিন্তু মৃত্যুকে উহার তুলনায় আমি সহজ মনে করিলাম। আমার দুইটি চক্ষু হইতে অশ্রু প্রবাহিত হইতেছিল, কোন প্রকার অস্থিরতা ছাড়া।
* আমি মৃত্যুভয়ে ভীত ছিলাম না; কারণ মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। তবে জাহান্নামের দাউ দাউ করিয়া প্রজ্জলিত আগুনকেই আমি ভয় করি।
* আল্লাহ্র শপথ। আমি মুসলিম অবস্থায় আল্লাহর উদ্দেশ্যেই যদি মারা যাই তাহা হইলে আমি বধ্যভূমিতে কোনপাশে পড়িয়া মারা গেলাম সে বিষয়ে আমার কোন পরওয়া নাই।
* আমি শত্রুর নিকট নতি স্বীকার করিব না, অস্থিরতাও প্রকাশ করিব না। কেননা আমার প্রত্যাবর্তন হইতেছে আল্লাহ্র নিকটে (ইব্ন কাছীর, ৪খ., পৃ. ৬৯; ইব্ন হিশাম, ৪খ., পৃ. ৯৭৬-৯৭৭; ইব্ন কায়্যিম, ৩খ., পৃ. ২৪৫)।
ইহার পর 'উকবা ইব্ন হারিছ তাঁহাকে নির্মমভাবে হত্যা করিল (বুখারী, ৫খ., পৃ. ৪১; ইবন হাজার, ৭খ., পৃ. ৪৪৫)। অন্য বর্ণনায় আছে, 'উকবা ইবন হারিছ বলিয়াছেন যে, আল্লাহ্ শপথ, আমি খুবায়বকে হত্যা করি নাই। তবে বানু আবদিদ দারের আবূ মায়সারা আল-আবদারী (ইবন হাজার, ৭খ., পৃ. ৪৪৫) একটি বর্শা আমার হাতে উঠাইয়া দেয়। আমি বর্শা ধরিয়া রাখিলাম, আর সে আমার হাতে ধরিয়া থাকা বর্শা দ্বারাই খুবায়ব ইব্ন আদীকে আঘাত করিয়া হত্যা করিল (আল-আয়নী, ৯খ., পৃ. ১০১; ইব্ন হাজার, ৭খ., পৃ. ৪৪৫; ইন্ন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৯৭৪)।
৪০ দিন পর্যন্ত খুবায়ব (রা)-এর লাশ শূলে ঝুলান ছিল (মানসূরপুরী, ২খ., পৃ. ৩০২)। রাসূলুল্লাহ (স) এই মর্মান্তিক খবর পাইয়া অত্যন্ত মর্মাহত হইলেন। তিনি উদাত্ত কণ্ঠে ঘোষণা করিলেনঃ
أيكم ينزل خبيبا من خشبته وله الجنة. "তোমাদের মধ্যে যেই খুবায়বকে শূল হইতে নামাইবে সেই জান্নাত লাভ করিবে” (আল-আয়নী, ৯খ., পৃ. ১০১)।
যুবায়র (রা) ও মিকদাদ (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-কে এই গুরুদায়িত্ব পালন করিবার জন্য প্রতিশ্রুতি দিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাদের দুইজনকে শূল হইতে খুবায়ব (রা)-এর মৃতদেহ নামাইবার জন্য মক্কাতে পাঠাইলেন। তাঁহারা যখন তাঁহার মৃতদেহের অবস্থানস্থল মক্কার তানঈমে পৌঁছিলেন তখন চল্লিশজন লোককে এই মৃতদেহ পাহারা দিতে দেখিলেন। তাঁহারা সুযোগের অপেক্ষা করিতে লাগিলেন। পাহারায় নিযুক্ত ব্যক্তিগণ ঘুমাইয়া গেল। আল্লাহ্র পথে শহীদ খুবায়ব (রা)-এর এই মৃতদেহ প্রায় চল্লিশ দিন পরেও ছিল অবিকৃত তো বটেই, এমনকি একেবারে তরতাজা। আল-কুরআনের ভাষায়, "আল্লাহ্র রাস্তায় যাহারা শহীদ হইয়াছে তাহাদিগকে তোমরা মৃত বলিও না" (২: ১৫৪)-এর জাজ্বল্য প্রমাণ ছিল খুবায়ব (রা)-এর মৃতদেহ। সুযোগ বুঝিয়া যুবায়র (রা) ও মিন্দাদ (রা) খুবায়ব (রা)-এর মৃতদেহকে শূল হইতে নামাইয়া ঘোড়ার পিঠে লইয়া মদীনার পথে রওয়ানা হইলেন। কাফিররা ঘুম হইতে জাগিয়া উঠিল। খুবায়ব (রা)-এর মৃতদেহ না দেখিয়া তাহারা চতুর্দিকে ছড়াইয়া পড়িল ও খোঁজাখুঁজি শুরু করিল। এক পর্যায়ে তাহারা যুবায়র (রা) ও মিকদাদ (রা)-কে দূর হইতে এই মৃতদেহ লইয়া যাইতে দেখিল। তাহারা তাঁহাদের নিকট হইতে মৃতদেহ ছিনাইয়া লইবার জন্য তাঁহাদের পশ্চাত অনুসরণ করিল। যুবায়র (রা) আশু বিপদ উপলব্ধি করিয়া অত্যন্ত সম্মানের সহিত মৃতদেহটি ঘোড়ার পিঠ হইতে মাটিতে নামাইলেন। আল্লাহ্ সৈনিক খুবায়ব (রা)-এর মৃতদেহকে আল্লাহ্ অপবিত্র কাফিরদের হাত হইতে হিফাজত করিলেন। আকস্মিকভাবে সেই স্থানের মাটি দুই ভাগে বিভক্ত হইয়া খুবায়ব (রা)-এর মৃতদেহকে মাটি নিজের বুকের মধ্যে এমনভাবে ধারণ করিল যে, এখানে যে এই মৃতদেহ সংরক্ষণ করা হইল তাহা বুঝিবার কোন উপায় অবশিষ্ট রহিল না। খুবায়ব (রা)-কে সেইজন্য বালী'উল আরদ অর্থাৎ মাটি যাঁহাকে ভক্ষণ করিয়াছে উপাধিতে ভূষিত করা হয় (আল-'আয়নী, ৯খ., পৃ. ১০১; কান্দেহলাবী, ২খ., পৃ. ৭৬১)। যুগ যুগ ধরিয়া খুবায়ব (রা)-এর এই কবর অনাবিষ্কৃতই রহিয়া গিয়াছে। অন্য বর্ণনায় আছে, 'আমর ইবন উমায়্যা আদ-দামরী (রা) খুবায়ব (র)-কে শূল হইতে নামাইয়া গভীর রাত্রিতে অত্যন্ত সংগোপনে দাফনের ব্যবস্থা করিয়াছিলেন (ইন্ন কায়্যিম, ৩খ., পৃ. ২৪৬; মুবারকপুরী, পৃ. ২৯২; দানাপুরী, পৃ. ১১৮)।
📄 তদানীন্তন মুসলিম সমাজে এই যুদ্ধের প্রভাব
এই যুদ্ধের সকল মুজাহিদের শাহাদাত লাভ মুসলমানদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস। 'জান দেওয়া যায় তবুও বাতিলের সাথে আপোষ করা যায় না', এই শাশ্বত সত্যের জ্বলন্ত সাক্ষী হইয়া শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরিয়া মুসলমানদের হৃদয়ে হৃদয়ে বিরাজ করিয়াছেন এই যুদ্ধের অমর শহীদগণ। শত্রুপক্ষ এই যুদ্ধের মুজাহিদগণের সাথে অমানবিক ও বর্বরোচিত আচরণ করিয়া তাহদিগকে শহীদ করিয়াছিল। এই ঘটনার খবর তদানীন্তন মদীনা মুনাওয়ারায় মুসলিম সমাজে পৌছিলে সারামদীনায় শোকের ছায়া নামিয়া আসিল। সমগ্র পরিবেশ দীর্ঘ দিন যাবত ছিল শোকার্ত ও বেদনা বিধুর। প্রায় একই সময়ে সংঘটিত বি'র মা'উনা (بئر معونة)-এর ঘটনাও ছিল অত্যন্ত মর্মান্তিক। সেই ঘটনায়ও বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হইয়া শহীদ হইয়াছিলেন প্রায় সত্তরজন সাহাবী। রাসূলুল্লাহ (স) ও সাহাবীগণ (রা) এই দুইটি ঘটনায় এত বেশী শোকার্ত হইয়াছিলেন যে, দীর্ঘ প্রায় একটি মাস ধরিয়া তাঁহারা এই উভয় ঘটনার সাথে জড়িত বিশ্বাসঘাতকদের বিরুদ্ধে প্রত্যহ বদদু'আ করিতেন (দা. মা. ই., ১০খ., পৃ. ২১৬)। তিনি আর-রাজী' ও বি'র মা'উনার শহীদদের জন্যও দু'আ করিতেন (ইসলামী বিশ্বকোষ, ২২খ., পৃ. ২২৫)।
রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর কবি হাসসান ইন্ন ছাবিত (রা) আর-রাজী'-এর ঘটনায় খুবই মর্মাহত হন। ইন্ন ইসহাক বলিয়াছেন, হাসসান (রা) শহীদদের উদ্দেশ্যে একটি শোকগাথা (الرثاء) রচনা করেনঃ
صلى الإله على الذين تتابعوا يوم الرجيع فأكرموا وأثيبوا رأس السرية مرثد وأميرهم وابن البكير إمامهم وخبيب وابن الطارق وابن دثنة منهم وافاه ثم حمامه المكتوب والعاصم المقتول عند رجيعهم كسب المعالي إنه لكسوب منع المقادة أن ينالوا ظهره حتى يـجـالـد إنه لنجيب.
* "আর-রাজী'-এর দিন যাহারা পর্যায়ক্রমে যুদ্ধ করিয়াছেন তাহাদের প্রতি আল্লাহ্র রহমত বর্ষিত হইয়াছে, তাহারা সম্মানিত হইয়াছেন এবং তাহাদিগকে সওয়াব দান করা হইয়াছে।
* মারছাদ ছিলেন তাহাদের দলপতি, সম্মুখে ছিলেন ইব্ন বুকায়র আরো ছিলেন খুবায়ব, ইব্ন তারিক, ইব্ন দাছিনা, তাহাদের উপর নির্ধারিত মৃত্যুই আসিয়া পড়িল।
* তাহাদের সহিত আরো ছিলেন 'আসিম যিনি রাজী'-তে শহীদ হইলেন, যিনি উচ্চ মর্যাদা অর্জন করিলেন এবং তিনি ছিলেন উচ্চ মর্যাদার আগ্রহী।
* শত্রুরা তাহার নাগাল পাইবে তিনি সেরূপ আত্মসমর্পণকে গ্রহণ না করিয়াই তরবারি পরিচালনা করিলেন। আর তিনি হইলেন মহৎ ও সম্ভ্রান্ত" (ইব্ন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৯৮৫-৯৮৬)।
উল্লেখ্য যে, ইব্ন হিশাম বলিয়াছেন যে, অধিকাংশ মনীষী এই শোকগাথাটি হাসসান ইব্ন ছাবিত (রা) রচিত বলিয়া মানিয়া লইতে অস্বীকার করিয়াছেন (ইব্ন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৯৮৬)। এই কবিতাংশে মারছাদকে দলপতি বলা হইলেও আসলে দলপতি ছিলেন 'আসিম ইব্ন ছাবিত (রা), যেমনটি পূর্বে উল্লেখ করা হইয়াছে।
হাসসান ইব্ন ছাবিত (রা) যেমন আর-রাজী'-এর যুদ্ধে শহীদদের শোকে শোকার্ত হইয়া শোকগাথা রচনা করিয়াছেন, তেমনি যাহারা প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতার প্রশ্রয় লইয়া আল্লাহর এই সকল নিবেদিতপ্রাণ সৈনিককে শহীদ করিয়াছিল তাহাদের জন্যও বিদ্রূপাত্মক ব্যঙ্গ কবিতাও ( الهجاء ) রচনা করিয়াছেন। উদাহরণস্বরূপ কিছু চরণ এখানে উল্লেখ করা হইলঃ لعمري لقد شانت هذيل بن مدرك أحاديث كانت في خبيب وعاصم ولحيان جرامون شر الجرائم أحاديث لحيان صلوا بقبيحها أناس هم من قومهم في صميمهم بمنزلة الزمعان دبر القوادم أمانتهم ذا عفة ومكارم هم غدروا يوم الرجيع وأسلمت هذيل توقى منكرات المحارم رسول رسول الله غدرا ولم تكن بقتل الذي تحميه دون الجرائم فسوف يرون النصر يوماً عليهم حمت لحم شهاد عظام الملاحم أبابيل دبر شمس دون لحمه مصارع قتلى أو مقاما لما تم لعل هذيلا أن يروا بمصابه
* "আমার জীবনের শপথ! হুযায়ল ইব্ন মুদরিককে কলংকিত করিয়াছে সেইসব আচরণ যাহা তাহারা খুবায়ব ও আসিমের সঙ্গে করিয়াছে।
* লিয়ানদের আচরণের পরিণতি তাহারা ভোগ করিয়াছে। আর লিয়ানরা তো জঘন্য অপরাধে অপরাধী।
* লিয়ানরা যদিও মূল হুযায়লদের অংশ তাহার পরও তাহারা অন্যদের তুলনায় পশুর সম্মুখ পায়ের পশমের মতই নিকৃষ্ট।
* তাহারা আর-রাজী'র দিন বিশ্বাসঘাতকতা করিয়াছে। পবিত্র ও উচ্চ বংশীয়দের সহিত প্রতারণা করিয়া তাহারা নিজেদের বিশ্বস্ততাকে জলাঞ্জলি দিয়াছে।
* তাহারা আল্লাহ্র রাসূল (স)-এর দূতের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করিয়াছে, আর হুযায়লরা তো নিষিদ্ধ হারাম থেকে কখনও বাঁচিয়া থাকে নাই।
* শীঘ্রই তাহারা একদিন দেখিবে যে, তাহাদের বিরুদ্ধে অন্যদের সাহায্য করা হইতেছে এমন মহান ব্যক্তিকে হত্যা করার কারণে যাহার লাশকে অপরাধীদের হইতে রক্ষা করা হইয়াছে।
* তাহার মাংসে ভোমরার দল পাহারা দিয়াছে যিনি বড় বড় রণাঙ্গনে নৈপুণ্য দেখাইয়াছেন।
* হুযায়লগণ অন্যদেরকে আহত করিয়াছে, সম্ভবত তাহারা তাহার পরিবর্তে নিজেদেরকে নিহতের বধ্যভূমি অথবা শোক প্রকাশের স্থলে দেখিতে পাইবে। অর্থাৎ তাহাদের অনেকেই অল্প দিনের ভিতরেই নিহত হইবে" (ইব্ন হিশাম, ৩খ., ৯৮২-৯৮৩)।
📄 এই যুদ্ধ সম্পর্কে অবতীর্ণ আয়াতসমূহ
আর-রাজী'-এর হৃদয়বিদারক ঘটনাকে লইয়া মুনাফিকরা বিভিন্ন প্রকার আজেবাজে কথাবার্তা বলিতে লাগিল। একদিকে তাহাদের এই অবাঞ্ছিত কথাবার্তার কঠোর প্রতিবাদ, অপরদিকে এই ঘটনায় যাহারা শাহাদাত বরণ করিয়াছেন তাহাদের ভূয়সী প্রশংসা করিয়া কুরআনের কয়েকটি আয়াত অবতীর্ণ হইয়াছে। আবদুল্লাহ্ ইব্ন আব্বাস (রা) বলিয়াছেন, মক্কা ও মদীনার মাঝে আর-রাজী' নামক স্থানে যখন খুবায়ব (রা)-এর সাথীগণ (তাবারী, ২খ., পৃ. ৩২৫), যাহাদের মধ্যে মারছাদ, 'আসিম ইব্ন ছাবিত ও ইন্সুদ দাছিনা ছিলেন (আবূ হায়্যান, ২খ., ১২২), তাঁহারা দুর্ঘটনায় পতিত হইলে মুনাফিকরা বলিতে লাগিলঃ
يا ويح هولاء المفتونين الذين هلكوا هكذا لاهم قعدوا في بيوتهم ولاهم أدوا رسالة صاحبهم.
“ঐ সমস্ত বিশৃঙখলা সৃষ্টিকারীর ধ্বংস অনিবার্য যাহারা এইভাবে ধ্বংস হইয়া গেল। না তাহারা নিজেদের ঘরে বসিয়া রহিল, না তাহারা তাহাদের সাথীর (রাসূলুল্লাহ) দেওয়া দায়িত্ব পালন করিল।"
তখন আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন তাহাদের প্রচারণার প্রতি-উত্তরে নিম্নোক্ত আয়াতসমূহ অবতীর্ণ করিলেন (তাবারী, ২খ., ৩২৫; ইব্ন কাছীর, ৪খ., ৬৯; ইব্ন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৯৭৮; আবু হায়্যান, ২খ., ১২২):
وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يُعْجِبُكَ قَوْلُهُ فِي الْحَيَوةِ الدُّنْيَا وَيُشْهِدُ اللَّهَ عَلَى مَا فِي قَلْبِهِ وَهُوَ الدُّ الْخِصَامِ. وَإِذَا تَوَلَّى سَعَى فِي الْأَرْضِ لِيُفْسِدَ فِيهَا وَيُهْلِكَ الْحَرْثَ وَالنَّسْلَ وَاللَّهُ لَا يُحِبُّ الْفَسَادَ، وَإِذَا قِيلَ لَهُ اتَّقِ اللهَ أَخَذَتْهُ الْعِزَّةُ بِالْإِثْمِ فَحَسْبُهُ جَهَنَّمُ وَلَبِئْسَ الْمِهَادُ. وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَشْرِى نَفْسَهُ ابْتِغَاءَ مَرْضَاتِ اللَّهِ وَاللَّهُ رَءُوفٌ بِالْعِبَادِ.
"মানুষের মধ্যে এমন ব্যক্তি আছে, পার্থিব জীবন সম্বন্ধে যাহার কথাবার্তা তোমাকে চমৎকৃত করে এবং তাহার অন্তরে যাহা রহিয়াছে তাহা সম্পর্কে আল্লাহকে সাক্ষী বানায়। প্রকৃতপক্ষে সে ভীষণ কলহপ্রিয়। যখন সে ফিরিয়া যায় তখন সে পৃথিবীতে কি করিয়া বিপর্যয় সৃষ্টি করিবে, কি করিয়া শস্য ক্ষেত ও বংশ ধ্বংস করিবে সেই চেষ্টায় নিয়োজিত হয়। অথচ আল্লাহ অশান্তি পছন্দ করেন না। এই ব্যক্তিকে যখন বলা হয়, তুমি আল্লাহকে ভয় কর তখন তাহার আত্মাভিমান তাহাকে পাপের মধ্যে লিপ্ত রাখে। সুতরাং তাহার জন্য জাহান্নামই যথেষ্ট। নিশ্চয় তাহা অত্যন্ত খারাপ স্থান। মানুষের মধ্যে এমন লোকও রহিয়াছে যে কেবল আল্লাহ্ সন্তোষ লাভের উদ্দেশ্যেই নিজের জীবন উৎসর্গ করে। আল্লাহ বান্দাদের প্রতি খুবই অনুগ্রহশীল" (২: ২০৪-২০৭)।
মূলত এখানে শেষ আয়াতটিতে ইব্ন 'আব্বাস-এর বর্ণনা অনুযায়ী আর-রাজী'-এর শহীদদের আত্মত্যাগের কথাই বলা হইয়াছে (তাবারী, ২খ., পৃ. ৩২৫)।