📄 এক অলৌকিক ঘটনা
এক অলৌকিক ঘটনা: উহুদের যুদ্ধে সুলাফার দুই পুত্র আসিম কর্তৃক নিহত হওয়ায় সুলাফা শপথ করিয়াছিল যে, সে আসিমের মাথার খুলিতে মদ পান করিবে। এইজন্য যে তাঁহার মাথা তাহাকে আনিয়া দিবে তাহাকে এক শত উট পুরস্কার দিবে বলিয়া সে ঘোষণা দেয় (বিস্তারিত দ্র. আসিম প্রবন্ধ, ইসলামী বিশ্বকোষ, ইফা. ২খ.; আল-ওয়াকিদী, ১খ., পৃ. ৩৫৬)। 'আসিম (রা) ছিলেন আবূ সুফয়ান ইবন হারবের স্বগোত্রীয় চাচাত ভাই। কথিত আছে যে, এই ঘোষণার পর জনৈক ব্যক্তি আবূ সুফয়ান ইব্ন হারবকে বলিল, "তোমারই চাচাত ভাইয়ের মাথার খুলিতে অন্যে মদপান করিবে ইহা কেমন করিয়া হয়! বংশের তো একটা মর্যাদা রহিয়াছে।” এতদসত্ত্বেও কুফরীতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত আবূ সুফ্যানের মনে এই কথা কোন রেখাপাত করিল না (আবূ যাহরা, ২খ., পৃ. ৮৮১)। লোভনীয় এই পুরস্কারের খবর সমগ্র আরব গোত্রের মধ্যে বাতাসের বেগে ছড়াইয়া পড়িল। এই মহামূল্য পুরস্কারের লোভে অনেক কাফিরই 'আসিমকে হত্যার জন্য আসিমের মাথা অর্জনের আকাঙ্খায় প্রহর গুণিতেছিল।
📄 আবদুল্লাহ ইবন তারিক (রা)-এর শাহাদাত
যায়দ ইবনুদ দাছিনা ও খুবায়ব ইবন 'আদী (রা)-কে অর্থলিঙ্গু কাফিররা মক্কা নগরীতে বিক্রয় করিবার পূর্বেই আবদুল্লাহ্ ইব্ন তারিককে শহীদ করিল। তবে তাঁহাকে কোথায় কিভাবে শহীদ করা হইল তাহাতে মতভেদ রহিয়াছে। কাফিরদের অভয়বাণী ও প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস করিয়া যায়দ ইবনুদ দাছিনা, খুবায়ব ইবন 'আদী ও আব্দুল্লাহ্ ইব্ন তারিক (রা) কাফিরদের নিকট আত্মসমর্পণ করিলেন। কাফিররা তাঁহাদিগকে নিজেদের আওতায় পাইয়া ধনুকের রশি খুলিয়া তাহা দ্বারা তাঁহাদিগকে বাঁধা শুরু করিল (বুখারী, ৫খ., পৃ. ৪০)। আবদুল্লাহ্ ইব্ন তারিক (রা) তাহাদের প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতাকে বুঝিতে পারিলেন। তিনি পরিষ্কার ভাষায় বলিলেন, "আমাদেরকে তোমরা যে এখনই বাঁধিয়া ফেলিতেছ ইহাই হইতেছে তোমাদের প্রথম বিশ্বাসঘাতকতা।" ঘটনাটি জাহরান নামক স্থানে সংঘটিত হইয়াছিল। তিনি তাহাদের সঙ্গে যাইতে অস্বীকার করিলেন। তাহারা সেখানেই আল্লাহ্ এই আপোষহীন মুজাহিদকে শহীদ করিল (ইবনুল আছীর, ২খ., ১১৫; আবূ দাউদ, ৩খ., পৃ. ১১৬; মুহাম্মদ ইব্ন আব্দুল ওয়াহ্হাব, ৩৩৫)। ইব্ন হাজার পাহাড়ের চূড়া হইতে অবতরণের সাথে সাথেই আবদুল্লাহকে হত্যা করিবার বর্ণনাকে বিশুদ্ধ বলিয়া মত দিয়াছেন। (ইব্ন হাজার, ৭খ., পৃ. ৪৪১)। অন্য বর্ণনায় আসিয়াছে, যায়দ ইব্ন দাছিনা, খুবায়ব ইন্ন 'আদী ও আবদুল্লাহ্ ইব্ন তারিক (রা) পাহাড়ের চূড়া হইতে নিচে অবতরণ করিলে তাহারা তাঁহাদিগকে বাঁধিয়া ফেলিল। বাঁধা অবস্থাতেই তাঁহাদিগকে বিক্রয় করিবার জন্য মক্কায় লইয়া যাইতেছিল। পথিমধ্যে আজ-জাহরান (الظهران) (ইব্ন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৯৭১), মতান্তরে মাররুজ জাহরান (مر الظهران ওয়াকিদী, ১খ., পৃ. ৩৫৭; মুহাম্মদ ইবন সা'দ, ১খ., পৃ. ৩৮৫; ইব্ন হাযম, পৃ. ২১৬) নামক স্থানে আসিলে আবদুল্লাহ্ ইব্ন তারিক তাঁহার হাতের বাঁধন খুলিয়া ফেলিলেন এবং নিজের তরবারি কোষমুক্ত করিলেন। তখন কাফিররা তাঁহাকে পাথর নিক্ষেপ করিয়া অত্যন্ত মর্মান্তিকভাবে শহীদ করিল (ইবন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৯৭১; আবূ যাহরা, ১খ., পৃ. ৮৮২; দানাপুরী, পৃ. ১১৬; ইব্ন হাজার, ৭খ., পৃ. ৪৪১; ই.বি., ২২খ., পৃ. ২২৫)। অন্য বর্ণনায় বলা হইয়াছে যে, কাফিররা তাঁহাদিগকে না বাঁধিয়াই মক্কাতে লইয়া যাইতেছিল। পথিমধ্যে আজ-জাহরান (الظهران) নামক স্থানে উপস্থিত হইলে সতর্কতার জন্য ধনুকের রশি ছিঁড়িয়া তাহা দ্বারা তাঁহাদিগকে বাঁধিয়া ফেলিল। 'আবদুল্লাহ্ ইব্ন তারিক (রা) বলিলেন :
هذا أول الغدر والله لا أصاحبكم إن لي في هؤلاء الأسوة.
"ইহাই হইতেছে প্রথম বিশ্বাসঘাতকতা। আল্লাহর শপথ! আমি তোমাদের সাথে যাইব না। নিশ্চয় ঐ সমস্ত শহীদের মধ্যেই আমার অনুকরণীয় আদর্শ নিহিত রহিয়াছে” (আল-ওয়াকিদী, ১খ., ৩৫৭)।
তিনি এক পর্যায়ে তাঁহার নিজের হাত বাঁধনমুক্ত করিলেন, উন্মুক্ত করিলেন নিজের তরবারি। দুর্ধর্ষ শত্রুরা তাঁহাকে পরাজিত করিল। তাহারা পুনরায় তাঁহাকে বাঁধিবার চেষ্টা চালাইল। তিনি সুকৌশলে তাহাদের হাত হইতে ছুটিয়া গেলেন। তখন কাফিররা তাঁহাকে পাথর নিক্ষেপ করিয়া নির্মমভাবে শহীদ করিল (আল-ওয়াকিদী, ১খ., পৃ. ৩৫৭; ইব্ন হাযম, পৃ. ২১৬)। 'আব্দুল্লাহ্ ইব্ন্ন তারিকের কবর উক্ত আজ-জাহরানেই অবস্থিত (দামাই, ১০খ., পৃ. ২১৬; ইব্ন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৯৭১)। অবশেষে কাফিররা অবশিষ্ট দুইজন যায়দ ইন্সুদ দাছিনা ও খুবায়ব ইব্ন 'আদীকে মক্কাতে লইয়া গেল (আল-ওয়াকিদী, ১খ., পৃ. ৩৫৭; ইব্ন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৯৭১)।
📄 যায়দ ইবনুদ দাছিনা (রা)-এর শাহাদাত
কাফিরগণ যায়দ ইবনুদ দাছিনাকে লইয়া মক্কা নগরীতে উপস্থিত হইল। তাহারা তাঁহাকে সাফওয়ান ইবন উমায়্যার নিকট ৫০টি উটের বিনিময়ে (ইবন হাজার, ৭খ., পৃ. ৪৪১; আল-ওয়াকিদী, ১খ., পৃ. ৩৫৭; শিবলী নু'মানী, ১খ., ২২৬), মতান্তরে মক্কাতে অবরুদ্ধ হুযায়লদের বন্দীর বিনিময়ে (দানাপুরী, পৃ. ১১৬) বিক্রয় করিল। খুবায়ব ও যায়দ দুইজনকে হুযায়লদের দুই বন্দীর বিনিময়ে বিক্রয়ের কথাও অন্যত্র বর্ণিত হইয়াছে (আবূ যাহরা, ২খ., পৃ. ৮৮৩)। সাফওয়ান ইবন উমায়্যা ইব্ন খালাফ তাঁহাকে তাহার পিতৃহত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ করিবার জন্য ক্রয় করিয়াছিল (ইবন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৯৭২)। উমায়্যা ইব্ন খালাফ মুসলমানদের হাতে বদর যুদ্ধে নিহত হইয়াছিল। যখন যায়দ ইবনুদ দাছিনা (রা)-কে বিক্রয় করা হইয়াছিল তখন ছিল যুল-কা'দা মাস। এই মাসে হত্যাকে তাহারা বৈধ মনে করিত না। সেজন্য সাফওয়ান ইবন 'উমায়্যা যায়দ ইবনুদ দাছিনা (রা)-কে তাহার ক্রীতদাস নাসতাস-এর নিকট (আল-ওয়াকিদী, ১খ., পৃ. ৩৫৭) অথবা বানু জুমাহ্-এর কিছু লোকের নিকট বন্দী করিয়া রাখিল (আল-ওয়াকিদী, ১খ., পৃ. ৩৫৭)।
নিষিদ্ধ মাস যুল-কা'দা অতিবাহিত হইল। মক্কার হারাম শরীফের বাহিরে লইয়া তাঁহাকে হত্যা করিবার জন্য সাফওয়ান ইবন উমায়্যা নাসতাসের হাতে তাঁহাকে অর্পণ করিল। নাসতাস হারাম শরীফের বাহিরে তানঈম নামক স্থানে তাঁহাকে হত্যা করিবার জন্য লইয়া গেল। শত্রু নিধনের তামাশা উপভোগ করিবার জন্য বেশ কিছু কুরায়শ তানঈমে একত্র হইল। তাহাদের মধ্যে আবূ সুফয়ান ইবন হারবও ছিলেন। তিনি তখনও ছিলেন অমুসলিম। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হইবার পূর্বে আবূ সুফয়ান ইবন হারব যায়দ ইবনুদ দাছিনা (রা)-কে জিজ্ঞাসা করিলেন, أنشدك الله يا زيد أتحب أن محمدا عندنا الآن في مكانك نضرب عنقه وانك في أهلك.
"আল্লাহ্ শপথ করিয়া আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করিতেছি হে যায়দ! তুমি কি পছন্দ কর যে, মুহাম্মাদ (স) তুমি যেখানে এখন রহিয়াছ তোমার স্থলে হউক এবং আমরা তাঁহার গর্দান উড়াইয়া দেই, আর তাহার বিনিময়ে তুমি তোমার পরিবার-পরিজনের মধ্যে ফিরিয়া যাও?” অন্য বর্ণনায় এই কথাটি নাসতাসের বলিয়া বর্ণিত হইয়াছে (ইবনুল আছীর, ২খ., পৃ. ১১৬)। ঈমানের তেজে দীপ্ত রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর প্রতি অনাবিল ভালবাসার চূড়ান্ত নমুনাস্বরূপ যায়দ (রা) দ্বিধাহীন চিত্তে ঘোষণা করিলেন : والله ما أحب أن محمدا الآن مكانه الذي هو فيه تصيبه شوكة تؤذيه وإني جالس في أهلي.
"আল্লাহ্র শপথ! যেই স্থানে মুহাম্মাদ (স) এখন অবস্থান করিতেছেন, তিনি যদি সেখানেই অবস্থান করেন আর তাঁহাকে এমন একটি কাঁটা আঘাত হানে যাহা তাঁহাকে কষ্ট দিবে এইটুকুর বিনিময়েও আমাকে আমার পরিবারের সাথে বসিবার সুযোগ গ্রহণকে আমি পছন্দ করি না"। তাঁহার এই বলিষ্ঠ বক্তব্য শুনিয়া আবু সুফয়ান বিস্মিত হইয়া বলিলেন: ما رأيت من الناس أحدا يحب أحدا كحب أصحاب محمد محمدا ...
"আমি কখনও একজন মানুষকে অন্যকে এত বেশী ভালবাসিতে দেখি নাই, মুহাম্মাদ (স)-এর সাহাবীদিগকে যেমন মুহাম্মাদকে ভালবাসিতে দেখিয়াছি” (ইবন সা'দ, ১খ., পৃ. ৩৫৮; ইব্ন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৯৭২)।
আবূ সুফয়ান ইব্ন হারব ও যায়দ ইবনুদ দাছিনা (রা)-এর মধ্যকার বাক্যবিনিময় কি তাহাদের দুইজনের মধ্যেই হইয়াছিল, না আবূ সুফয়ান ও খুবায়ব ইব্ন আদী (রা)-এর মধ্যে হইয়াছিল তাহাতে ইব্ন হাযম সন্দেহ পোষণ করিয়াছেন (ইবন হাযম, পৃ. ২১৬)। সম্ভবত আবূ সুফয়ান ইবন হারব-এর এই একই কথোপকথন খুবায়ব ইবন 'আদী ও যায়দ ইবনুদ দাছিনা (রা) উভয়ের সাথেই হইয়াছিল (ইব্ন কাছীর, ২খ., পৃ. ৬৮)। অবশেষে নাসতাস অত্যন্ত নির্মমভাবে আল্লাহ্র এই শার্দুল মুজাহিদকে শহীদ করিল (দানাপুরী, পৃ. ১১৭; ইবন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৯৭২; শিবলী নু'মানী, ১খ., পৃ. ২২৬; কান্ধলাবী, ২খ., পৃ. ৭৫২; মাজমা আল-বুহুছ আল-ইসলামিয়্যা, পৃ. ৮৩)। উল্লেখ্য যে, সাফওয়ান ইবন উমায়্যার এই ক্রীতদাস নাসতাস পরে ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছিল।
📄 খুবায়ব ইবন 'আদী (রা)-এর শাহাদাত
যায়দ ইবনুদ দাছিনা (রা)-এর সহিত জাহজাবী ইন্ন যুলফা ইবন 'আমর ইবন আওফ গোত্রের (আল-আয়নী, ৯খ, ১০০) খুবায়ব ইব্ন 'আদী (রা)-কেও হুযালীগণ মক্কাতে লইয়া আসিল। তাঁহাকে হুদায়র ইব্ন আবী ইহাব আত-তামীমীর ভ্রাতুষ্পুত্র (আল-ওয়াকিদী, ১খ., পৃ. ৩৫৭) 'উকবা ইবনুল হারিছ ইবন 'আমের ইব্ন নাওফালের নিকট একটি কালো ক্রীতদাসী (ইবন হাজার, ৭খ., পৃ. ৩৮১, বৈরূত তা. বি.; আল-আয়নী, ৯খ., পৃ. ১৬৮) অথবা আশি মিছকাল স্বর্ণ বা পঞ্চাশটি উটের বিনিময়ে বিক্রয় করা হইল (আল-ওয়াকিদী, ১খ., পৃ. ৩৫৭, আল-আয়নী, ৯খ., পৃ. ১০০)। অন্য বর্ণনায় বলা হইয়াছে যে, তাঁহাকে হুযালীগণ মক্কায় তাহাদের গোত্রের একজন বন্দীর বিনিময়ে বিক্রয় করিয়াছিল (দানাপুরী, পৃ. ১১৬)। আরও কথিত আছে যে, তাঁহাকে আল-হারিছ ইব্ন নাওফলের এক কন্যার নিকট এক শত উটের বিনিময়ে বিক্রয় করা হইয়াছিল (আল-ওয়াকিদী, ১খ., পৃ. ৩৫৭)। এখানে বিভিন্ন প্রকার বর্ণনা উল্লেখ করা হইয়াছে। তবে কিসের বিনিময়ে তাঁহাকে বিক্রি করা হইয়াছিল ও কে ক্রেতা ছিল তাহা লইয়া মতপার্থক্য সৃষ্টি হইলেও তাঁহাকে যে বিক্রয় করা হইয়াছিল সে বিষয়ে কোন মতপার্থক্য নাই।
খুবায়ব ইব্ন 'আদী (রা) বদরের যুদ্ধে 'উকবা-এর পিতা হারিছ ইবন 'আমের ইব্ন নাওফালকে হত্যা করিয়াছিলেন (দানাপুরী, পৃ. ১৭৭; মুহাম্মদ ইব্ন আবদুল ওয়াহহাব, পৃ. ৩৩৫; E.I.2, vol. v, p. 40)। খুবায়বকে হত্যা করিয়া হারিছের হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ করিবার জন্যই তাহারা তাঁহাকে ক্রয় করিয়াছিল (আল-ওয়াকিদী, ১খ., পৃ. ৩৫৭; শিবলী নু'মানী, ১খ., পৃ. ২২৫)। অন্যত্র বর্ণিত হইয়াছে, যাহাদের পিতারা বদরের যুদ্ধে মুসলমানদের হাতে নিহত হইয়াছিল তাহারা সকলে মিলিয়া সম্মিলিতভাবে তাহাদের পিতৃ হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণের আকাঙ্ক্ষায় খুবায়বকে ক্রয় করিয়াছিল। তাহারা হইল আবূ ইহাব ইব্ন 'আযীয, 'ইকরামা ইব্ন আবী জাহল, আল-আখনাস ইব্ন শারীক, 'উবায়দা ইব্ন হাকীম ইবনিল আওকাস, উমায়্যা ইব্ন আবী 'উতবা, ইবনুল হাদরামী, শু'বা ইব্ন আবদিল্লাহ ও সাফওয়ান ইবন উমায়্যা (আল-আয়নী, ৯খ., পৃ. ১০০; ইবনুল আছীর, উসদুল গাবা, ২খ., ১০৪)। হযরত খুবায়ব ইবন 'আদী (রা) উল্লিখিত সকল কুরায়শ-এর পিতাদিগকে হত্যা করেন নাই। তিনি শুধু 'উকবা ইবন হারিছের পিতাকে হত্যা করিয়াছিলেন। যেহেতু তাহাদের পিতাগণ মুসলমানদের হাতেই নিহত হইয়াছিল সেহেতু প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য তাহারা খুবায়বকে হত্যা করিবার আকাঙ্ক্ষায় ক্রয় করিয়াছিল।
কোন কোন ঐতিহাসিক খুবায়ব ইব্ন 'আদী (রা) বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন নাই বলিয়া মত প্রকাশ করিয়াছেন। ঐতিহাসিক দিময়াতী বলিয়াছেন, খুবায়ব ইব্ন 'আদী (রা) বদরের যুদ্ধে উপস্থিত ছিলেন না, তিনি ছিলেন আওস গোত্রের লোক। যে খুবায়ব হারিস ইব্ন 'আমেরকে হত্যা করিয়াছিলেন তিনি হইলেন খুবায়ব ইব্ন্ন ইসাফ। তিনি ছিলেন খাযরাজ গোত্রের লোক (ইব্ন হাজার, ৭খ., পৃ. ৩৮২; মুহাম্মাদ আমীন, পৃ. ১৩৪; আল-আয়নী, ৯খ., পৃ. ১৬৮)। দিময়াত-এর এই ধারণা ঠিক নহে। বুখারী শরীফের বিশুদ্ধ হাদীছ দ্বারাই প্রমাণিত যে, খুবায়ব ইব্ন 'আদী বদরের যুদ্ধেই হারিছ ইব্ন আমের ইব্ন নাওফালকে হত্যা করিয়াছিলেন (বুখারী, ৫খ., পৃ. ৪১)। বিশুদ্ধ এই বর্ণনার উপর ভিত্তি করিয়া সন্দেহাতীতভাবে বলা যায় যে, খুবায়ব ইব্ন 'আদী বদরের যুদ্ধে উপস্থিত ছিলেন।
অন্য একটি যৌক্তিক কারণেও এই বাস্তব সত্য প্রমাণিত হয়। অসংখ্য বর্ণনায় বলা হইয়াছে যে, বদরের যুদ্ধে হত্যাকারী হিসাবেই প্রতিশোধ গ্রহণের লক্ষ্যে খুবায়ব ইব্ন 'আদীকে মক্কাতে হত্যা করা হইয়াছিল। দলীল-প্রমাণের মাধ্যমে হন্তা প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত প্রতিশোধ-মূলকভাবে কাহারও হত্যা আরবদের সেই সমাজে প্রচলিত ছিল না। যেহেতু কুরায়শরা তাঁহাকে হত্যাকারী হিসাবে প্রতিশোধপরায়ণ হইয়া হত্যা করিয়াছিল, সেহেতু ইহা দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, খুবায়ব ইব্ন 'আদী বদরের যুদ্ধে উপস্থিত ছিলেন এবং তাহাদের কাহাকেও না কাহাকে হত্যাও করিয়াছিলেন। অবশ্য এই সমস্ত বর্ণনা ও দিময়াতীর মতামতের এই পার্থক্যকে দূর করিবার জন্য কেহ কেহ বলিয়াছেন, "এমনও হইতে পারে যে, খুবায়ব ইব্ন 'আদী ও খুবায়ব ইব্ন্ন ইসাফ উভয়েই হারিছ ইব্ন আমেরকে হত্যা করিয়াছিলেন (ইব্ন হাজার, ৭খ., পৃ. ৩৮২)। বাহ্যত এই কথাটি দুইটি সাংঘর্ষিক মতকে সমন্বয় সাধনের প্রয়াস হিসাবে গ্রহণযোগ্য মনে হইলেও ইহার কোন প্রমাণ কোন গ্রহণযোগ্য বর্ণনায় না পাওয়া যাওয়ার কারণে তাহা প্রশ্নাতীতভাবে গ্রহণ করা যায় না।
যুল-কা'দা মাস নিষিদ্ধ মাসসমূহের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কারণে এই সময় খুবায়ব ইব্ন 'আদীকে হত্যা না করিয়া তাহারা তাঁহাকে হারিছ ইব্ন আমেরের বাড়িতে বন্দী করিয়া রাখিল (মানসূরপুরী, ১খ., পৃ. ১২২)। অন্য বর্ণনায় আসিয়াছে, তাঁহাকে বানু আবদে মানাফের হুদাইর ইব্ন আবী ইহাবের ক্রীতদাসী (আল-ওয়াকিদী, ১খ., পৃ. ৩৫৭; ইব্ন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৯৭২) মাবীয়া (ইবন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৯৭২; মুহাম্মাদ আমীন, পৃ. ১৩৩), মতান্তরে হুজায়ন ইব্ন আবী ইহাবের ক্রীতদাসী মারিয়া (ইব্ন হাজার, ৭খ., আল-আয়নী, ৯খ., পৃ. ১৬৮), ইব্ন বাত্তালের বর্ণনানুযায়ী হুজায়ন ইব্ন আবী ইহাবের ক্রীতদাসী জুওয়ায়রিয়া (ইব্ন হাজার, ৭খ., পৃ. ৪৪২; আল-আয়নী, ৯খ., পৃ. ১৬৮)-এর গৃহে বন্দী করিয়া রাখা হইয়াছিল। মারিয়া পরে ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিলেন (ইব্ন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৯৭২)।
মারিয়া বলিয়াছেন, খুবায়ব ইবন 'আদী সুললিত কণ্ঠে কুরআন তিলাওয়াত করিয়া সালাতুত তাহাজ্জুদ আদায় করিতেন। আশেপাশের মহিলারা তাঁহার আকর্ষণীয় এই তিলাওয়াত বিমুগ্ধ হইয়া শ্রবণ করিত। ধীরে ধীরে তাহারা খুবায়বের প্রতি কিছুটা দুর্বল হইয়া পড়িল। তাহারা তাঁহার প্রতি নমনীয় ব্যবহার শুরু করিল। আমি ছিলাম তাহাদের অন্যতম। আমি দয়ার্দ্র হইয়া খুবায়বকে জিজ্ঞাসা করিলাম, হে খুবায়ব! আপনি কি কোন কিছুর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করিতেছেন? প্রয়োজনে আমি আপনাকে সাহায্য করিতে প্রস্তুত রহিয়াছি। তিনি বলিলেন, হাঁ, আমি সুমিষ্ট পানির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করিতেছি। আশা করি তুমি তাহা আমাকে সরবরাহ করিবে। আমি আরো আশা করি যে, শুধু আল্লাহর নামে যবেহকৃত পশু ব্যতীত অন্য কাহারও নামে যবেহকৃত পশুর গোশত আমাকে কখনও খাওয়াইবে না। আর তাহারা আমাকে যখন হত্যা করিবার সময় নির্ধারণ করিবে, তুমি আমাকে তাহা আগাম জানাইয়া দিবে (ইবন হাজার, ৭খ., পৃ. ৩৮২; আল-ওয়াকিদী, ১খ., পৃ. ৩৫৭-৩৫৮)। অন্যত্র বর্ণিত হইয়াছে যে, খুবায়ব (রা)-কে জিজ্ঞাসা করা হয় নাই, তিনি উপযাচক হইয়া হারিছ ইব্ন আমেরের ক্রীতদাস মাওহাব-এর নিকট হইতে এই তিনটি জিনিস চাহিয়াছিলেন (মুহাম্মাদ ইবন সা'দ, ১খ., পৃ. ৩৮৫)।
কুরায়শগণ বন্দী অবস্থায় খুবায়ব ইব্ন্ন 'আদীর প্রতি অত্যন্ত নিষ্ঠুর আচরণ করিত। অতিষ্ঠ হইয়া এক সময় খুবায়ব (রা) বলিলেন, "হায়! সম্মানিত লোক বলিয়া যাহারা নিজেদেরকে দাবি করে তাহারা কি তাহাদের বন্দীর সহিত ভাল আচরণ করিতে পারে না"? খুবায়ব (রা)-এর এই নীতিবাক্য তাহাদের বিবেককে কশাঘাত করিল। বাধ্য হইয়া তাহারা খুবায়ব (রা)-এর প্রতি ভাল ব্যবহার শুরু করিল এবং তাঁহার দেখাশুনা করিবার জন্য একজন নারীকে পরিচারিকা হিসাবে নিয়োগ করিল (ইবন হাজার, ৭খ., পৃ. ৩৮২)। সম্ভবত সেই মহিলাটি হইল উপরোল্লিখিত মারিয়া।
খুবায়ব ইব্ন 'আদী (রা) লৌহ বেষ্টিত ঘরে বন্দি জীবন যাপন করিয়া দিন অতিবাহিত করিতেছিলেন। যয়নব বিনত হারিছ ইবন 'আমের ইবন নাওফাল (কান্ধলাবী, ২খ., পৃ. ৭৫৬; আল-আয়নী, ৯খ., পৃ. ১৬৮), মতান্তরে হুজায়ন ইন্ন আবী ইহাবের ক্রীতদাসী মাবিয়া অথবা মারিয়া হঠাৎ তাহার নিকট উপস্থিত হইল এবং দেখিল, তিনি মানুষের মাথার মত বড় আঙুরের থোকা হইতে সুন্দর সুন্দর আঙুর ভক্ষণ করিতেছেন। বর্ণনাকারী বলেন, সে সময় মক্কাতে এ ধরনের কোন ফল পাওয়া যাইত না। এমনকি ভূ-পৃষ্ঠে উৎপাদিত কোন আঙুর হইতে এই আঙুর ছিল একেবারেই ভিন্ন (আল-ওয়াকিদী, ১খ., পৃ. ৩৫৭; দানাপুরী, পৃ. ৩১১; মুহাম্মাদ ইব্ন আবদুল ওয়াহহাব, পৃ. ৩৩৫)। নিঃসন্দেহে ইহা একটি অলৌকিক ঘটনা। এই আঙুর আসলে আল্লাহর পক্ষ হইতে সরবরাহ করা হইয়াছিল। যাহারা আল্লাহ্ জন্যই নিবেদিত, আল্লাহ্ দীনের জন্যই যাহারা নিজেদেরকে উৎসর্গ করেন, স্বয়ং রাব্বুল আলামীনের পক্ষ হইতে তাহাদিগকে এই ধরনের সম্মানিত রিযিক সরবরাহ করা অস্বাভাবিক কিছু নহে।
ইব্ন বাত্তালের মতে খুবায়ব (রা)-কে আল্লাহ্ পক্ষ হইতে রিযিক সরবরাহ আল্লাহ্ কুদরতের ও রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর নবুওয়াতের আকাট্যতা প্রমাণের জন্য একটি জ্বলন্ত নিদর্শন ছিল। তবে সচরাচর সংঘটিত হয় না নিয়ম বহির্ভূত এমন যে কোন অলৌকিক ঘটনা যাহা দেখিয়া মানুষ বিস্ময়ে হতবাক হইয়া যায়, যাহা এমন আশ্চর্য যে, মানুষের চক্ষুকে স্থির করিয়া ফেলে, এ ধরনের কোন ঘটনা নবীরা ব্যতীত অন্যদের নিকট হইতে সংঘটিত হওয়া সম্ভবপর নহে। ইবন হাজারের দৃষ্টিতে ইন্ন বাত্তালের এই মতামত দুই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গিকে সমন্বয় করিয়াছে। তিনি যেমন কারামাতকে অস্বীকার করেন নাই, আবার আহলুস-সুন্নাহ আল-জামা'আতের যে কোন কারামাত সংঘটিত হওয়া সম্ভব, মতামতকেও গ্রহণ করেন নাই (ফাতহুল বারী, ৭খ., পৃ. ৩৮৩)। একজন মহিলা এই আঙুর তাঁহাকে খাইতে দেখিয়াছিল, বুখারী শরীফে উক্ত মহিলার নাম উল্লেখ করা হয় নাই (বুখারী, ৫খ., পৃ. ৪০)। ইবনুল আছীরও তাহার নাম উল্লেখ করেন নাই, শুধু একজন মহিলার কথা বলা হইয়াছে (২খ., পৃ. ১১৫-১১৬)। অপরদিকে ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনায় ভিন্ন মহিলার নাম, কোথাও যয়নব বিনত হারিছ, কোথাও ক্রীতদাসী মাবিয়া, মতান্তরে মারিয়া-এর নাম উল্লিখিত হইয়াছে (কানধাহলাবী, ২খ., পৃ. ২৫৮; আল-আয়নী, ৯খ., পৃ. ১৬৮; আল-ওয়াকিদী, ১খ., পৃ. ৩৫৭)। ইব্ন হাজার ভিন্নমুখী এই দুই বর্ণনাকে এইভাবে সমন্বয় করিয়াছেন যে, হইতে পারে যয়নব বিনত হারিছ ও ক্রীতদাসী মারিয়া উভয়েই খুবায়বের হাতে আঙুর দেখিয়াছিলেন। ইহাও সম্ভব যে, খুবায়বকে উক্ত ক্রীতদাসীর ঘরে বন্দী করা হইয়াছিল আর যয়নব বিনত হারিছকে তাঁহাকে পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হইয়াছিল (ইন্ন হাজার, ঐ, ৭খ., পৃ. ৪৪২)।
আশহুরুল হুরুম (যে সকল মাসে যুদ্ধ ও হত্যা নিষিদ্ধ) অতিবাহিত হইলে (ইন্ন হাজার, ৭খ., পৃ. ৪৪২) খুবায়ব ইবন 'আদী (রা) ক্রীতদাসীর মাধ্যমে জানিতে পারিলেন যে, কয়েক দিনের মধ্যেই তাহারা তাহাকে হত্যা করিবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিয়াছে (আল-ওয়াকিদী, ১খ., পৃ. ৩৫৮)। তখন তিনি যয়নব বিনত হারিছ (ইবন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৯৭৩)-এর নিকট ক্ষৌরকার্য সম্পন্ন করিয়া পবিত্র হইবার জন্য একটি ক্ষুর চাহিলেন। তাঁহাকে ক্ষুর সরবরাহ করা হইল। মক্কার প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিছ আবদুল্লাহ্ ইব্ন আবদুর রহমান ইব্ন আবুল হুসায়নের দাদা আবুল হুসায়ন ইবন হারিছ ইবন 'আদী ইবন নাওফাল তখনও ছিলেন শিশু (আল-আয়নী, ৯খ., পৃ. ১৬৮)। তাহার মাতা দেখিল, খুবায়ব (রা) -এর হাতে ক্ষুর শোভা পাইতেছে আর তাহার এই শিশু ছেলেটি খুবায়ব (রা)-এর একটি রানের উপর বসিয়া রহিয়াছে। মায়ের অমনোযোগিতার সুযোগেই শিশুটি নিজেই খুবায়ব (রা)-এর নিকট গিয়াছিল। মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত বন্দীর হাতে ধারাল ক্ষুর। এমনি অবস্থায় শত্রু পক্ষের কোন শিশু তাঁহার হাতে মোটেও নিরাপদ হওয়ার কথা নয়। যে কোন মুহূর্তে তাহাকে হত্যা করিয়া বন্দী প্রতিশোধ গ্রহণ করিবে ইহাই স্বাভাবিক। শিশুটির মাতা নিজের কলিজার ধন শিশুকে এমন একটি বিপদের মুখে অবস্থান করিতে দেখিয়া সাপ দেখিবার মত চমকাইয়া উঠিল। তীক্ষ্ণ ধীশক্তিসম্পন্ন সাহাবী খুবায়ব (রা) মহিলাটির এই সন্ত্রস্ত অবস্থা উপলব্ধি করিলেন। তিনি ছেলেটিকে এই বলিয়া দৌঁড় দিতে বলিলেন, তোমরা আমাকে হত্যার সিদ্ধান্ত লইয়াছ। এই অবস্থায় তোমার মাতা আমার হাতে ক্ষুর থাকার পরেও তোমাকে আমার কাছে কি করিয়া পাঠাইল! তোমার মাতা কি আমার পক্ষ হইতে বিশ্বাসঘাতকতার ভয় পায় নাই? তাঁহার এই কথা শুনিয়া ছেলেটির মাতা বলিল, আমার ছেলেকে তো হত্যা করিবার জন্য আপনাকে ক্ষুর সরবরাহ করা হয় নাই। খুবায়ব (রা) বলিলেন:
أتخشين أن أقتله ماكنت لأفعل ذلك وما تستحل في ديننا الغدر.
"তুমি কি ভয় করিতেছ যে, আমি তাহাকে হত্যা করিব? আমি কখনও তাহা করিব না (বুখারী, ৫খ., পৃ. ৪১)। আমাদের দীন ইসলাম এ ধরনের বিশ্বাসঘাতকতাকে বৈধ মনে করে না" (আল-ওয়াকিদী, ১খ., পৃ. ৩৫৮; আল-'উমারী, ২খ., পৃ. ৩৯৯)।
অন্য বর্ণনায় বলা হইয়াছে, ছেলেটি খুবায়ব (রা)-এর নিকট যখন গিয়াছিল তখন তাঁহার হাতে ক্ষুর ছিল বলিয়া ছেলেটির মাতা চমকিয়া উঠে নাই, বরং ছেলেটি নিজেই একটি ধারালো ছুরি লইয়া খেলিতে খেলিতে মায়ের অমনোযোগিতার সুযোগে খুবায়ব (রা)-এর নিকট পৌছিয়া গিয়াছিল। বন্দী অবস্থায় বন্দীর পাশে ছুরি হাতে নিজের শিশু ছেলেকে দেখিয়া তাহার মাতা সন্তানের আশু বিপদ উপলব্ধি করিয়া আতঙ্কিত হইয়া চিৎকার করিয়া উঠিল (মানসূরপুরী, ১খ., পৃ. ১২৩)। তখন খুবায়ব (রা) উপরোল্লিখিত কথাগুলি বলিয়াছিলেন।
খুবায়ব (রা) ক্ষুর পাইয়া ক্ষৌরকার্য সম্পন্ন করিয়া পবিত্রতা অর্জন করিলেন। কুরায়শরা তাঁহাকে শূলবিদ্ধ করিয়া হত্যা করিবার জন্য হারামের বাহিরে তানঈম নামক স্থানে লইয়া আসিল (ইব্ন কায়্যিম, ৩খ., পৃ. ২৪৫; মুবারকপুরী, পৃ. ২৯২; ইবন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৯৭২)। লোমহর্ষক এই হত্যাকাণ্ডের দৃশ্য দেখিবার জন্য মক্কা নগরী হইতে অনেকে তানঈমে উপস্থিত হইল (আল-ওয়াকিদী, ১খ., পৃ. ৩৫৮)। উপস্থিত ব্যক্তিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য যাহারা ছিল তাহারা হইল, ইহাব ইব্ন্ন 'আযীয, আল-আখনাস ইব্ন শারীক, 'উবায়দা ইব্ন হাকীম আস-সুলামী, উমায়্যা ইবন 'উতবা (ইব্ন্ন হাজার, ৭খ., পৃ. ৪৪৩), ইবনুল হাদরামী, সা'ঈদ ইব্ন আবদুল্লাহ্ (ইব্ন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৯৮০), আবু সুফয়ান ইব্ন হারব ও তাহার পুত্র মু'আবিয়া (ইব্ন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৯৭২)।
কুরায়শরা খুবায়ব (রা)-কে মৃত্যুর পূর্বে তাঁহার কোন আকাঙ্ক্ষা রহিয়াছে কিনা জানিতে চাহিল (মানসূরপুরী, ১খ., পৃ. ১২৩)। দুই রাক'আত সালাত আদায় করিবার জন্য তখন তিনি অনুমতি চাহিলেন। তাহারা তাঁহাকে দুই রাক্'আত সালাত আদায় করিবার অনুমতি দান করিল। তিনি অত্যন্ত বিনয়ের সাথে দুই রাক'আত সালাত আদায় করিলেন (ইবন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৯৭৩; E.I.2, vol. v, p.40; ইন্ন কায়্যিম, ৩খ., পৃ. ২৪৫; আবূ দাউদ, ৩খ., পৃ. ১১৬)। তানঈমে যে প্রসিদ্ধ মসজিদ পরে নির্মিত হইয়াছে তিনি ঐ স্থানটিতেই উক্ত সালাত আদায় করিয়াছিলেন (ইন্ন হাজার, ৭খ., পৃ. ৪৪৩)। প্রশান্তচিত্ত ও উদ্বেগহীন মন লইয়া সালাত শেষ করিয়া তিনি বলিলেন, "আমি মৃত্যুর ভয়ে শঙ্কিত হইয়া সালাত দীর্ঘায়িত করিয়াছি বলিয়া তোমরা ধারণা করিতে পার; যদি আমার এই ভয় না হইত তাহা হইলে আমি সালাত আরও দীর্ঘায়িত করিতাম (বুখারী, ৫খ., পৃ. ৪১; মুহাম্মদ ইব্ন আবদুল ওয়াহহাব, পৃ. ৩৩৫; শিবলী নু'মানী, ৫খ., পৃ. ৪১; ইব্ন কায়্যিম, ৩খ., পৃ. ২৪৫; মানসূরপুরী, ১খ., পৃ. ১২৩; আবূ যাহরা, ২খ., পৃ. ৮৮৩; ইব্ন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৯৭৩)। খুবায়ব (রা) মুসলমানদের কাহাকেও মৃত্যুদণ্ড দিতে চাহিলে মৃত্যুর পূর্বে দুই রাক্'আত সালাত আদায়ের সুন্নত প্রবর্তন করিলেন (বুখারী, ৫খ., পৃ. ৪০)। সুহায়লী বলিয়াছেন, হুজর ইব্ন 'আদী ইবনুল আদবার (রা)-ও খুবায়ব (রা)-এর মত মৃত্যুর পূর্বে দুই রাক'আত সালাত আদায় করিয়াছিলেন।
যখন খুবায়ব (রা)-কে শূলে চড়াইবার জন্য শক্ত করিয়া বাঁধা হইল তখন তিনি বলিলেন, “হে আল্লাহ! আমি আপনার রাসূল (স)-এর রিসালাতকে যথাযথভাবে পৌঁছাইয়াছি। তাহারা আমার সহিত যে অমানবিক আচরণ করিতেছে তাহার সংবাদ আপনি আপনার রাসূল (স)-কে পৌঁছাইয়া দিন" (ইব্ন হিশাম, ৩খ, পৃ. ৯৭৩)। রাসূলুল্লাহ্ (স) তখন বসা অবস্থায়ই ছিলেন। তাঁহার নিকট খুবায়ব (রা)-এর মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর পৌঁছানো হইল। তিনি বলিলেন, “হে খুবায়ব! তোমার উপর শান্তি বর্ষিত হউক" (ইব্ন হাজার, ৭খ, পৃ. ৪৪৩)।
যখন তাঁহাকে শূলবিদ্ধ করিবার জন্য উচু কাঠে উঠানো হইল, তিনি দু'আ করিলেন: اللهم احصهم عددا وأقتلهم بردا ولا تغادر فيهم أحدا .
"হে আল্লাহ! আপনি তাহাদের সংখ্যা গণনা করুন এবং তাহাদিগকে পৃথক পৃথকভাবে হত্যা করুন। তাহাদের কাহাকেও আপনি ছাড়িবেন না" (ইবন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৯৭৩; ইবনুল আছীর, ২খ., পৃ. ১১৬; ইব্ন কায়্যিম, ৩খ., পৃ. ২৪৫; মুবারকপুরী, পৃ. ২৯২; আবূ যুহরা, ২খ., পৃ. ৮৮৩)।
এক নিষ্ঠুর প্রকৃতির মুশরিক লোমহর্ষক এই হত্যাকাণ্ডের সকল আয়োজন স্বচক্ষে দেখিয়াও খুবায়ব (রা)-কে জিজ্ঞাসা করিল, "তুমি কি চাও না যে, তোমাকে আমরা ছাড়িয়া দেই, আর মুহাম্মাদ তোমার এই করুণ পরিণতির স্থানে উপনীত হউক"? খুবায়ব (রা) অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে উত্তর দিলেন, “আল্লাহ্ ইহা অবশ্যই জানেন, মুহাম্মাদ (স)-এর পায়ে একটি কাঁটা বিদ্ধ করিয়া তাহার বিনিময়ে আমি খুবায়ব প্রাণে বাঁচিয়া যাইব; আমি তাহা কখনও চাহি না" (মানসূরপুরী, ১খ., পৃ. ১২৩; মুহাম্মাদ ইব্ন আবদুল ওয়াহহাব, পৃ. ৩৩৬)। তিনি কবিতা পাঠ করিলেন যার প্রতিটি ছন্দে ঈমানী জযবার বহিপ্রকাশ হইয়াছে:
لقد جمع الأحزاب حولى وألبوا قبائلهم واستجمعوا كل مجمع وكلهم ميدى العداوة جاهد على لأنى في وثاق بمصيع وقد جمعوا أبناء هم ونساءهم وقربت من جذع طويل ممنع إلى الله أشكو غربتى ثم كربتي وما أرصد الاحزاب لي عند مصرعي فذا العرش صبرني على ما يراد بى فقد بضعوا لحمى وقد ياس مطمعي
وذلك في ذات الإله وإن يشأ يبارك على أوصال شلو ممزع وقد خيروني الكفر والموت دونه وقد هملت عيناي من غير مجزع وما بي حذار الموت إني لميت ولكن حذاری جحم نار ملفع فو الله ما أرجو إذا مت مسلما على أى جنب كان في الله مصرعي فلست يعبد للعدو تخشعا ولا جزعا إنى إلى الله مرجعي.
"* আমার চতুর্দিকে অনেক দল একত্র হইয়াছে, তাহারা তাহাদের গোত্রগুলিকে প্রতিটি লোকালয় হইতে সমবেত করিয়াছে।
* তাহাদের প্রত্যেকেই আমার প্রতি শত্রুতা প্রদর্শনকারী, সর্বশক্তি দিয়া আমাকে কষ্ট দানকারী। কেননা আমি তো বন্দীদশায় এমন ধ্বংসোম্মুখ একটি অস্ত্রে আবদ্ধ আছি যাহা আমার চামড়া ছিন্ন করে।
* তাহাদের সন্তান ও স্ত্রীদিগকে তাহারা একত্র করিয়াছে, নিষিদ্ধ লম্বা কাঠের (শূলের) নিকট আমাকে উপস্থিত করা হইয়াছে।
* আমি আমার দেশ হইতে দূরে, বিপদগ্রস্ত ও বধ্যভূমিতে আমার জন্য দলগুলি যাহা তৈরি করিয়াছে তাহার জন্য আল্লাহর নিকট ফরিয়াদ করিতেছি।
* হে আরশের অধিপতি! তাহারা আমাকে লইয়া যাহা করিতে চায় সে বিষয়ে আপনি আমাকে ধৈর্য দিন। তাহারা আমরা মাংস টুকরা টুকরা করিয়াছে, আমার আশা নিরাশায় পরিণত হইয়াছে।
* ইনি আল্লাহ্ই উদ্দেশ্যে, তিনি চাহিলে হাড়ের প্রতিটি গিরায় ও মাংসের প্রতিটি অংশকে বরকতময় করিবেন।
* তাহারা আমাকে কুফরী এখতিয়ার করিতে বলিয়াছিল, কিন্তু মৃত্যুকে উহার তুলনায় আমি সহজ মনে করিলাম। আমার দুইটি চক্ষু হইতে অশ্রু প্রবাহিত হইতেছিল, কোন প্রকার অস্থিরতা ছাড়া।
* আমি মৃত্যুভয়ে ভীত ছিলাম না; কারণ মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। তবে জাহান্নামের দাউ দাউ করিয়া প্রজ্জলিত আগুনকেই আমি ভয় করি।
* আল্লাহ্র শপথ। আমি মুসলিম অবস্থায় আল্লাহর উদ্দেশ্যেই যদি মারা যাই তাহা হইলে আমি বধ্যভূমিতে কোনপাশে পড়িয়া মারা গেলাম সে বিষয়ে আমার কোন পরওয়া নাই।
* আমি শত্রুর নিকট নতি স্বীকার করিব না, অস্থিরতাও প্রকাশ করিব না। কেননা আমার প্রত্যাবর্তন হইতেছে আল্লাহ্র নিকটে (ইব্ন কাছীর, ৪খ., পৃ. ৬৯; ইব্ন হিশাম, ৪খ., পৃ. ৯৭৬-৯৭৭; ইব্ন কায়্যিম, ৩খ., পৃ. ২৪৫)।
ইহার পর 'উকবা ইব্ন হারিছ তাঁহাকে নির্মমভাবে হত্যা করিল (বুখারী, ৫খ., পৃ. ৪১; ইবন হাজার, ৭খ., পৃ. ৪৪৫)। অন্য বর্ণনায় আছে, 'উকবা ইবন হারিছ বলিয়াছেন যে, আল্লাহ্ শপথ, আমি খুবায়বকে হত্যা করি নাই। তবে বানু আবদিদ দারের আবূ মায়সারা আল-আবদারী (ইবন হাজার, ৭খ., পৃ. ৪৪৫) একটি বর্শা আমার হাতে উঠাইয়া দেয়। আমি বর্শা ধরিয়া রাখিলাম, আর সে আমার হাতে ধরিয়া থাকা বর্শা দ্বারাই খুবায়ব ইব্ন আদীকে আঘাত করিয়া হত্যা করিল (আল-আয়নী, ৯খ., পৃ. ১০১; ইব্ন হাজার, ৭খ., পৃ. ৪৪৫; ইন্ন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৯৭৪)।
৪০ দিন পর্যন্ত খুবায়ব (রা)-এর লাশ শূলে ঝুলান ছিল (মানসূরপুরী, ২খ., পৃ. ৩০২)। রাসূলুল্লাহ (স) এই মর্মান্তিক খবর পাইয়া অত্যন্ত মর্মাহত হইলেন। তিনি উদাত্ত কণ্ঠে ঘোষণা করিলেনঃ
أيكم ينزل خبيبا من خشبته وله الجنة. "তোমাদের মধ্যে যেই খুবায়বকে শূল হইতে নামাইবে সেই জান্নাত লাভ করিবে” (আল-আয়নী, ৯খ., পৃ. ১০১)।
যুবায়র (রা) ও মিকদাদ (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-কে এই গুরুদায়িত্ব পালন করিবার জন্য প্রতিশ্রুতি দিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাদের দুইজনকে শূল হইতে খুবায়ব (রা)-এর মৃতদেহ নামাইবার জন্য মক্কাতে পাঠাইলেন। তাঁহারা যখন তাঁহার মৃতদেহের অবস্থানস্থল মক্কার তানঈমে পৌঁছিলেন তখন চল্লিশজন লোককে এই মৃতদেহ পাহারা দিতে দেখিলেন। তাঁহারা সুযোগের অপেক্ষা করিতে লাগিলেন। পাহারায় নিযুক্ত ব্যক্তিগণ ঘুমাইয়া গেল। আল্লাহ্র পথে শহীদ খুবায়ব (রা)-এর এই মৃতদেহ প্রায় চল্লিশ দিন পরেও ছিল অবিকৃত তো বটেই, এমনকি একেবারে তরতাজা। আল-কুরআনের ভাষায়, "আল্লাহ্র রাস্তায় যাহারা শহীদ হইয়াছে তাহাদিগকে তোমরা মৃত বলিও না" (২: ১৫৪)-এর জাজ্বল্য প্রমাণ ছিল খুবায়ব (রা)-এর মৃতদেহ। সুযোগ বুঝিয়া যুবায়র (রা) ও মিন্দাদ (রা) খুবায়ব (রা)-এর মৃতদেহকে শূল হইতে নামাইয়া ঘোড়ার পিঠে লইয়া মদীনার পথে রওয়ানা হইলেন। কাফিররা ঘুম হইতে জাগিয়া উঠিল। খুবায়ব (রা)-এর মৃতদেহ না দেখিয়া তাহারা চতুর্দিকে ছড়াইয়া পড়িল ও খোঁজাখুঁজি শুরু করিল। এক পর্যায়ে তাহারা যুবায়র (রা) ও মিকদাদ (রা)-কে দূর হইতে এই মৃতদেহ লইয়া যাইতে দেখিল। তাহারা তাঁহাদের নিকট হইতে মৃতদেহ ছিনাইয়া লইবার জন্য তাঁহাদের পশ্চাত অনুসরণ করিল। যুবায়র (রা) আশু বিপদ উপলব্ধি করিয়া অত্যন্ত সম্মানের সহিত মৃতদেহটি ঘোড়ার পিঠ হইতে মাটিতে নামাইলেন। আল্লাহ্ সৈনিক খুবায়ব (রা)-এর মৃতদেহকে আল্লাহ্ অপবিত্র কাফিরদের হাত হইতে হিফাজত করিলেন। আকস্মিকভাবে সেই স্থানের মাটি দুই ভাগে বিভক্ত হইয়া খুবায়ব (রা)-এর মৃতদেহকে মাটি নিজের বুকের মধ্যে এমনভাবে ধারণ করিল যে, এখানে যে এই মৃতদেহ সংরক্ষণ করা হইল তাহা বুঝিবার কোন উপায় অবশিষ্ট রহিল না। খুবায়ব (রা)-কে সেইজন্য বালী'উল আরদ অর্থাৎ মাটি যাঁহাকে ভক্ষণ করিয়াছে উপাধিতে ভূষিত করা হয় (আল-'আয়নী, ৯খ., পৃ. ১০১; কান্দেহলাবী, ২খ., পৃ. ৭৬১)। যুগ যুগ ধরিয়া খুবায়ব (রা)-এর এই কবর অনাবিষ্কৃতই রহিয়া গিয়াছে। অন্য বর্ণনায় আছে, 'আমর ইবন উমায়্যা আদ-দামরী (রা) খুবায়ব (র)-কে শূল হইতে নামাইয়া গভীর রাত্রিতে অত্যন্ত সংগোপনে দাফনের ব্যবস্থা করিয়াছিলেন (ইন্ন কায়্যিম, ৩খ., পৃ. ২৪৬; মুবারকপুরী, পৃ. ২৯২; দানাপুরী, পৃ. ১১৮)।