📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 রণাঙ্গন

📄 রণাঙ্গন


রণাঙ্গণ : সাহাবীগণ যখন আর-রাজী' নামক স্থানে উপনীত হইলেন তখন 'আদাল ও আল-কারা গোত্রের যাহারা তাহাদের সাথী ছিল তাহারা বিশ্বাসঘাতকতা করিল। তাহারা হুযায়ল গোত্রকে তাহাদেরকে আক্রমণ করিবার জন্য চিৎকার করিয়া আহবান জানাইল। মতান্তরে তাহাদেরকে হত্যা করিবার জন্য ইঙ্গিত করিল। ইহার পর ঐ গোত্রের সকল পুরুষ তরবারি লইয়া বাহির হইল। তাহারা ছিল সংখ্যায় দুই শত। কোন কোন বর্ণনায় বলা হইয়াছে যে, তখন তাহাদের মধ্য হইতে এক শত যোদ্ধা হাতে তীর-তরবারি লইয়া বাহির হইয়া পড়িল। সাহাবীগণ (রা) সংবাদ সংগ্রহের জন্য আসিয়াছিলেন, যোদ্ধা হিসাবে নহে। আত্মরক্ষার জন্য সামান্য কিছু সরঞ্জাম ছাড়া তাঁহাদের নিকট কিছুই ছিল না। অবস্থার ভয়াবহতা উপলব্ধি করিয়া সাহাবীগণ (রা) পাহাড়ের উঁচু চূড়ায় আশ্রয় গ্রহণ করিলেন (বুখারী, ২খ, মাগাযী; গাযওয়াতুর রাজী, শিবলী নোমানী, ১খ., পৃ. ২২৫)।
শত্রু পক্ষ তাঁহাদের খুঁজিতে লাগিল। এক পর্যায়ে তাহারা এক স্থানে শুধুমাত্র মদীনা মুনাওয়ারাতে উৎপাদিত খেজুরের দানা (ইব্‌ন হাজার, ৭খ., পৃ. ৪৪০) ছড়াইয়া থাকিতে দেখিল। তাহাদের মোটেও বুঝিতে কষ্ট হইল না যে, শুধু মদীনাতে যে ধরনের খেজুর উৎপন্ন হইয়া থাকে ইহা সেই খেজুরেরই দানা। তখন তাহাদের ধারণা আরও পাকাপোক্ত হইল যে, আশেপাশে কোথায়ও মুহাম্মাদের সাথীরা আত্মগোপন করিয়া রহিয়াছেন। অবশেষে তাহারা তাঁহাদের সন্ধান পাইল। যে পাহাড়ের চূড়াতে তাঁহারা আশ্রয়গ্রহণ করিয়াছিলেন সেই স্থান অবরোধ করিল (মুহাম্মাদ ইব্‌ন আবদুল ওয়াহহাব, পৃ. ৩৩৫; ইব্‌ন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৯৬৯)।
এই সময় শত্রুপক্ষ তাঁহাদিগকে বলিতে লাগিল, "তোমরা যদি আত্মসমর্পণ কর তাহা হইলে আমরা তোমাদের কাহাকেও হত্যা না করিবার অঙ্গীকার করিতেছি (মুহাম্মাদ ইব্‌ন আবদুল ওয়াহহাব, পৃ. ৩৩৫; আবু দাউদ, ৩খ., পৃ. ১১৬)। আমরা তোমাদের সহিত যুদ্ধ করিতে চাহি না। তোমাদেরকে মক্কার অধিবাসীদের নিকট বিক্রয় করিয়া কিছু অর্থ উপার্জন করিবার ইচ্ছা পোষণ করিতেছি মাত্র" (ইসলামী বিশ্বকোষ, ২২খ., পৃ. ২২৫; ইব্‌ন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৯৬৯; মুহাম্মাদ ইবন সা'দ, ১খ., পৃ. ৩৮৪; আবূ যাহরা, ২খ., পৃ. ৮৮১)। শত্রুপক্ষের এই প্রতিশ্রুতি শুনিয়া 'আসিম ইব্‌ন ছাবিত, মারছাদ ইব্‌ন আবী মারছাদ ও খালিদ ইব্‌ন বুকায়র (রা) বলিলেন, "আল্লাহ্র শপথ! আমরা কোন মুশরিকের প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকারকে বিশ্বাসযোগ্য মনে করিতে পারি না" (ইবন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৯৬৯; মুহাম্মাদ ইব্‌ন আবদুল ওয়াহহাব, পৃ. ৩৩৫)। সাহাবীগণ আল্লাহ্র উপর ভরসা করিয়া যুদ্ধে অবতীর্ণ হইলেন।
'আসিম (রা) তীর শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁহার অন্যান্য সঙ্গীসহ (৭ জন) প্রাণপণে তীর নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন। এক সময় তীর শেষ হইয়া গেল। তিনি ক্ষান্ত হইলেন না। বীর বিক্রমে বর্শা দিয়া শত্রুদিগকে সজোরে আঘাত হানিত লাগিলেন। যখন বর্শা ভাঙিয়া গেল, তখন শাহাদাতের নেশায় উদ্দীপ্ত হইয়া সর্বশক্তি ব্যয় করিয়া তরবারি চালাইতে লাগিলেন (আল-ওয়াকিদী, ১খ., পৃ. ৩৫৬)। প্রথমে তীর নিক্ষেপ করিয়া, পরে বর্শা ব্যবহার করিয়া, সর্বশেষে তরবারি ব্যবহার করিয়া শত্রুপক্ষকে ঘায়েল করিবার এই যে অভিনব পদ্ধতি এই যুদ্ধে 'আসিম (রা) অনুসরণ করিয়াছিলেন বদরের যুদ্ধেও আসিমের এই বিজ্ঞানসম্মত যুদ্ধ পদ্ধতিকে রাসূলুল্লাহ (স) ভূয়সী প্রশংসা করিয়াছিলেন (বিস্তাবিত বিবরণের জন্য দ্র. নিবন্ধ আসিম, ইসলামী বিশ্বকোষ)।
আল্লাহর শার্দুল আসিম ইব্‌ন ছাবিত তরবারি লইয়া বীরদর্পে যুদ্ধ করিতে করিতে এক পর্যায়ে তাঁহার তরবারির হাতল ভাঙিয়া গেল। তিনি সেই ভাঙা তরবারি লইয়া লড়াই অব্যাহত রাখিলেন। দুইজন শত্রুকে শক্ত আঘাত হানিয়া আহত করিলেন, অন্য একজনকে হত্যা করিলেন। সবশেষে শত্রুরা তাহাকে তীক্ষ্ণ বর্শার নির্মম আঘাতে জর্জরিত করিল। আল্লাহ্ এই নির্ভীক সৈনিক জান্নাতের সুগন্ধ স্পর্শ করিলেন। তখন তিনি দু'আ করিলেন:
اللهم أخبرنا رسول الله اللهم حميت دينك أول نهاري فاحم لحمي اخره.
“হে আল্লাহ্! আমাদের অবস্থার সংবাদ আপনার রাসূল (স)-কে পৌছাইয়া দিন। হে আল্লাহ! আমি আপনার দীনকে দিনের প্রথম অংশে রক্ষা করিয়াছি, আপনি আমার দেহকে দিনের শেষে রক্ষা করুন" (ইবনুল আছীর, ২খ., পৃ. ১১৫; মুহাম্মদ ইব্‌ন আবদিল ওয়াহহাব, পৃ. ৩৩৫; E.I.2, vol.v, p. 40-41; আল-ওয়াকিদী, ১খ., পৃ. ৩৫৬; কান্ধলাবী, ২খ., পৃ. ২৪৮)। উল্লেখ্য যে, তিনি যেইদিন শাহাদাত বরণ করিয়াছিলেন এই দু'আয় মহান রাব্বুল আলামীন তাঁহার শাহাদাতের খবর রাসূল (স)-কে তৎক্ষণাৎ পৌঁছাইয়া দিয়াছিলেন (ইব্‌ন হাজার, ৭খ., ৪৪১; শিবলী নু'মানী, ১খ., পৃ. ২২৫)।
'আসিম (রা) এইভাবে শাহাদাত লাভ করিলেন (আল-ওয়াকিদী, ১খ., পৃ. ৩৫৬)। তাঁহার পর মু'আত্তিব ইবন 'উবায়দ মরণপণ লড়িয়া যাইতে লাগিলেন। হঠাৎ তিনি শত্রুদের তরবারির আঘাতে আহত হইলেন। সুযোগ পাইয়া শত্রুরা তাঁহাকেও শহীদ করিল (আল-ওয়াকিদী, ১খ., পৃ. ৩৫৭)। তাঁহারা দুইজনসহ আটজন (গোলাম মোস্তফা, পৃ. ১৮৬), ৪জনকে (Nadbi, p. 94-95) অথবা ৬ জন (আল-উমারী, ২খ., পৃ. ৩৯৯; C.E. Bosworth & others, vol.v, 40), মতান্তরে সাতজনকে অত্যন্ত নির্মমভাবে শহীদ করিল (মুহাম্মাদ ইব্‌ন আব্দুল ওয়াহহাব, পৃ. ৩৩৫; শিবলী নু'মানী, ১খ., পৃ. ২২৫)। এই শহীদদের ৪জনের নাম উল্লেখ করা হইয়াছে। তাঁহারা হইলেন— 'আসিম, মারছাদ, খালিদ ও মু'আত্তিব (আল-ওয়াকিদী, ১খ., পৃ. ৩৫৫)। প্রতিশোধপরায়ণ শত্রুরা আসিম ব্যতীত অন্য শহীদদের শাহাদাত বরণের পর তাঁহাদের শরীর হইতে কাপড় খুলিয়া ফেলিল (আল-ওয়াকিদী, ১খ., পৃ. ৩৫৬)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 এক অলৌকিক ঘটনা

📄 এক অলৌকিক ঘটনা


এক অলৌকিক ঘটনা: উহুদের যুদ্ধে সুলাফার দুই পুত্র আসিম কর্তৃক নিহত হওয়ায় সুলাফা শপথ করিয়াছিল যে, সে আসিমের মাথার খুলিতে মদ পান করিবে। এইজন্য যে তাঁহার মাথা তাহাকে আনিয়া দিবে তাহাকে এক শত উট পুরস্কার দিবে বলিয়া সে ঘোষণা দেয় (বিস্তারিত দ্র. আসিম প্রবন্ধ, ইসলামী বিশ্বকোষ, ইফা. ২খ.; আল-ওয়াকিদী, ১খ., পৃ. ৩৫৬)। 'আসিম (রা) ছিলেন আবূ সুফয়ান ইবন হারবের স্বগোত্রীয় চাচাত ভাই। কথিত আছে যে, এই ঘোষণার পর জনৈক ব্যক্তি আবূ সুফয়ান ইব্‌ন হারবকে বলিল, "তোমারই চাচাত ভাইয়ের মাথার খুলিতে অন্যে মদপান করিবে ইহা কেমন করিয়া হয়! বংশের তো একটা মর্যাদা রহিয়াছে।” এতদসত্ত্বেও কুফরীতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত আবূ সুফ্যানের মনে এই কথা কোন রেখাপাত করিল না (আবূ যাহরা, ২খ., পৃ. ৮৮১)। লোভনীয় এই পুরস্কারের খবর সমগ্র আরব গোত্রের মধ্যে বাতাসের বেগে ছড়াইয়া পড়িল। এই মহামূল্য পুরস্কারের লোভে অনেক কাফিরই 'আসিমকে হত্যার জন্য আসিমের মাথা অর্জনের আকাঙ্খায় প্রহর গুণিতেছিল।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আবদুল্লাহ ইবন তারিক (রা)-এর শাহাদাত

📄 আবদুল্লাহ ইবন তারিক (রা)-এর শাহাদাত


যায়দ ইবনুদ দাছিনা ও খুবায়ব ইবন 'আদী (রা)-কে অর্থলিঙ্গু কাফিররা মক্কা নগরীতে বিক্রয় করিবার পূর্বেই আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন তারিককে শহীদ করিল। তবে তাঁহাকে কোথায় কিভাবে শহীদ করা হইল তাহাতে মতভেদ রহিয়াছে। কাফিরদের অভয়বাণী ও প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস করিয়া যায়দ ইবনুদ দাছিনা, খুবায়ব ইবন 'আদী ও আব্দুল্লাহ্ ইব্‌ন তারিক (রা) কাফিরদের নিকট আত্মসমর্পণ করিলেন। কাফিররা তাঁহাদিগকে নিজেদের আওতায় পাইয়া ধনুকের রশি খুলিয়া তাহা দ্বারা তাঁহাদিগকে বাঁধা শুরু করিল (বুখারী, ৫খ., পৃ. ৪০)। আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন তারিক (রা) তাহাদের প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতাকে বুঝিতে পারিলেন। তিনি পরিষ্কার ভাষায় বলিলেন, "আমাদেরকে তোমরা যে এখনই বাঁধিয়া ফেলিতেছ ইহাই হইতেছে তোমাদের প্রথম বিশ্বাসঘাতকতা।" ঘটনাটি জাহরান নামক স্থানে সংঘটিত হইয়াছিল। তিনি তাহাদের সঙ্গে যাইতে অস্বীকার করিলেন। তাহারা সেখানেই আল্লাহ্ এই আপোষহীন মুজাহিদকে শহীদ করিল (ইবনুল আছীর, ২খ., ১১৫; আবূ দাউদ, ৩খ., পৃ. ১১৬; মুহাম্মদ ইব্‌ন আব্দুল ওয়াহ্হাব, ৩৩৫)। ইব্‌ন হাজার পাহাড়ের চূড়া হইতে অবতরণের সাথে সাথেই আবদুল্লাহকে হত্যা করিবার বর্ণনাকে বিশুদ্ধ বলিয়া মত দিয়াছেন। (ইব্‌ন হাজার, ৭খ., পৃ. ৪৪১)। অন্য বর্ণনায় আসিয়াছে, যায়দ ইব্‌ন দাছিনা, খুবায়ব ইন্ন 'আদী ও আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন তারিক (রা) পাহাড়ের চূড়া হইতে নিচে অবতরণ করিলে তাহারা তাঁহাদিগকে বাঁধিয়া ফেলিল। বাঁধা অবস্থাতেই তাঁহাদিগকে বিক্রয় করিবার জন্য মক্কায় লইয়া যাইতেছিল। পথিমধ্যে আজ-জাহরান (الظهران) (ইব্‌ন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৯৭১), মতান্তরে মাররুজ জাহরান (مر الظهران ওয়াকিদী, ১খ., পৃ. ৩৫৭; মুহাম্মদ ইবন সা'দ, ১খ., পৃ. ৩৮৫; ইব্‌ন হাযম, পৃ. ২১৬) নামক স্থানে আসিলে আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন তারিক তাঁহার হাতের বাঁধন খুলিয়া ফেলিলেন এবং নিজের তরবারি কোষমুক্ত করিলেন। তখন কাফিররা তাঁহাকে পাথর নিক্ষেপ করিয়া অত্যন্ত মর্মান্তিকভাবে শহীদ করিল (ইবন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৯৭১; আবূ যাহরা, ১খ., পৃ. ৮৮২; দানাপুরী, পৃ. ১১৬; ইব্‌ন হাজার, ৭খ., পৃ. ৪৪১; ই.বি., ২২খ., পৃ. ২২৫)। অন্য বর্ণনায় বলা হইয়াছে যে, কাফিররা তাঁহাদিগকে না বাঁধিয়াই মক্কাতে লইয়া যাইতেছিল। পথিমধ্যে আজ-জাহরান (الظهران) নামক স্থানে উপস্থিত হইলে সতর্কতার জন্য ধনুকের রশি ছিঁড়িয়া তাহা দ্বারা তাঁহাদিগকে বাঁধিয়া ফেলিল। 'আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন তারিক (রা) বলিলেন :
هذا أول الغدر والله لا أصاحبكم إن لي في هؤلاء الأسوة.
"ইহাই হইতেছে প্রথম বিশ্বাসঘাতকতা। আল্লাহর শপথ! আমি তোমাদের সাথে যাইব না। নিশ্চয় ঐ সমস্ত শহীদের মধ্যেই আমার অনুকরণীয় আদর্শ নিহিত রহিয়াছে” (আল-ওয়াকিদী, ১খ., ৩৫৭)।
তিনি এক পর্যায়ে তাঁহার নিজের হাত বাঁধনমুক্ত করিলেন, উন্মুক্ত করিলেন নিজের তরবারি। দুর্ধর্ষ শত্রুরা তাঁহাকে পরাজিত করিল। তাহারা পুনরায় তাঁহাকে বাঁধিবার চেষ্টা চালাইল। তিনি সুকৌশলে তাহাদের হাত হইতে ছুটিয়া গেলেন। তখন কাফিররা তাঁহাকে পাথর নিক্ষেপ করিয়া নির্মমভাবে শহীদ করিল (আল-ওয়াকিদী, ১খ., পৃ. ৩৫৭; ইব্‌ন হাযম, পৃ. ২১৬)। 'আব্দুল্লাহ্ ইব্‌ন্ন তারিকের কবর উক্ত আজ-জাহরানেই অবস্থিত (দামাই, ১০খ., পৃ. ২১৬; ইব্‌ন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৯৭১)। অবশেষে কাফিররা অবশিষ্ট দুইজন যায়দ ইন্সুদ দাছিনা ও খুবায়ব ইব্‌ন 'আদীকে মক্কাতে লইয়া গেল (আল-ওয়াকিদী, ১খ., পৃ. ৩৫৭; ইব্‌ন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৯৭১)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 যায়দ ইবনুদ দাছিনা (রা)-এর শাহাদাত

📄 যায়দ ইবনুদ দাছিনা (রা)-এর শাহাদাত


কাফিরগণ যায়দ ইবনুদ দাছিনাকে লইয়া মক্কা নগরীতে উপস্থিত হইল। তাহারা তাঁহাকে সাফওয়ান ইবন উমায়্যার নিকট ৫০টি উটের বিনিময়ে (ইবন হাজার, ৭খ., পৃ. ৪৪১; আল-ওয়াকিদী, ১খ., পৃ. ৩৫৭; শিবলী নু'মানী, ১খ., ২২৬), মতান্তরে মক্কাতে অবরুদ্ধ হুযায়লদের বন্দীর বিনিময়ে (দানাপুরী, পৃ. ১১৬) বিক্রয় করিল। খুবায়ব ও যায়দ দুইজনকে হুযায়লদের দুই বন্দীর বিনিময়ে বিক্রয়ের কথাও অন্যত্র বর্ণিত হইয়াছে (আবূ যাহরা, ২খ., পৃ. ৮৮৩)। সাফওয়ান ইবন উমায়‍্যা ইব্‌ন খালাফ তাঁহাকে তাহার পিতৃহত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ করিবার জন্য ক্রয় করিয়াছিল (ইবন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৯৭২)। উমায়্যা ইব্‌ন খালাফ মুসলমানদের হাতে বদর যুদ্ধে নিহত হইয়াছিল। যখন যায়দ ইবনুদ দাছিনা (রা)-কে বিক্রয় করা হইয়াছিল তখন ছিল যুল-কা'দা মাস। এই মাসে হত্যাকে তাহারা বৈধ মনে করিত না। সেজন্য সাফওয়ান ইবন 'উমায়‍্যা যায়দ ইবনুদ দাছিনা (রা)-কে তাহার ক্রীতদাস নাসতাস-এর নিকট (আল-ওয়াকিদী, ১খ., পৃ. ৩৫৭) অথবা বানু জুমাহ্-এর কিছু লোকের নিকট বন্দী করিয়া রাখিল (আল-ওয়াকিদী, ১খ., পৃ. ৩৫৭)।
নিষিদ্ধ মাস যুল-কা'দা অতিবাহিত হইল। মক্কার হারাম শরীফের বাহিরে লইয়া তাঁহাকে হত্যা করিবার জন্য সাফওয়ান ইবন উমায়্যা নাসতাসের হাতে তাঁহাকে অর্পণ করিল। নাসতাস হারাম শরীফের বাহিরে তানঈম নামক স্থানে তাঁহাকে হত্যা করিবার জন্য লইয়া গেল। শত্রু নিধনের তামাশা উপভোগ করিবার জন্য বেশ কিছু কুরায়শ তানঈমে একত্র হইল। তাহাদের মধ্যে আবূ সুফয়ান ইবন হারবও ছিলেন। তিনি তখনও ছিলেন অমুসলিম। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হইবার পূর্বে আবূ সুফয়ান ইবন হারব যায়দ ইবনুদ দাছিনা (রা)-কে জিজ্ঞাসা করিলেন, أنشدك الله يا زيد أتحب أن محمدا عندنا الآن في مكانك نضرب عنقه وانك في أهلك.
"আল্লাহ্ শপথ করিয়া আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করিতেছি হে যায়দ! তুমি কি পছন্দ কর যে, মুহাম্মাদ (স) তুমি যেখানে এখন রহিয়াছ তোমার স্থলে হউক এবং আমরা তাঁহার গর্দান উড়াইয়া দেই, আর তাহার বিনিময়ে তুমি তোমার পরিবার-পরিজনের মধ্যে ফিরিয়া যাও?” অন্য বর্ণনায় এই কথাটি নাসতাসের বলিয়া বর্ণিত হইয়াছে (ইবনুল আছীর, ২খ., পৃ. ১১৬)। ঈমানের তেজে দীপ্ত রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর প্রতি অনাবিল ভালবাসার চূড়ান্ত নমুনাস্বরূপ যায়দ (রা) দ্বিধাহীন চিত্তে ঘোষণা করিলেন : والله ما أحب أن محمدا الآن مكانه الذي هو فيه تصيبه شوكة تؤذيه وإني جالس في أهلي.
"আল্লাহ্র শপথ! যেই স্থানে মুহাম্মাদ (স) এখন অবস্থান করিতেছেন, তিনি যদি সেখানেই অবস্থান করেন আর তাঁহাকে এমন একটি কাঁটা আঘাত হানে যাহা তাঁহাকে কষ্ট দিবে এইটুকুর বিনিময়েও আমাকে আমার পরিবারের সাথে বসিবার সুযোগ গ্রহণকে আমি পছন্দ করি না"। তাঁহার এই বলিষ্ঠ বক্তব্য শুনিয়া আবু সুফয়ান বিস্মিত হইয়া বলিলেন: ما رأيت من الناس أحدا يحب أحدا كحب أصحاب محمد محمدا ...
"আমি কখনও একজন মানুষকে অন্যকে এত বেশী ভালবাসিতে দেখি নাই, মুহাম্মাদ (স)-এর সাহাবীদিগকে যেমন মুহাম্মাদকে ভালবাসিতে দেখিয়াছি” (ইবন সা'দ, ১খ., পৃ. ৩৫৮; ইব্‌ন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৯৭২)।
আবূ সুফয়ান ইব্‌ন হারব ও যায়দ ইবনুদ দাছিনা (রা)-এর মধ্যকার বাক্যবিনিময় কি তাহাদের দুইজনের মধ্যেই হইয়াছিল, না আবূ সুফয়ান ও খুবায়ব ইব্‌ন আদী (রা)-এর মধ্যে হইয়াছিল তাহাতে ইব্‌ন হাযম সন্দেহ পোষণ করিয়াছেন (ইবন হাযম, পৃ. ২১৬)। সম্ভবত আবূ সুফয়ান ইবন হারব-এর এই একই কথোপকথন খুবায়ব ইবন 'আদী ও যায়দ ইবনুদ দাছিনা (রা) উভয়ের সাথেই হইয়াছিল (ইব্‌ন কাছীর, ২খ., পৃ. ৬৮)। অবশেষে নাসতাস অত্যন্ত নির্মমভাবে আল্লাহ্র এই শার্দুল মুজাহিদকে শহীদ করিল (দানাপুরী, পৃ. ১১৭; ইবন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৯৭২; শিবলী নু'মানী, ১খ., পৃ. ২২৬; কান্ধলাবী, ২খ., পৃ. ৭৫২; মাজমা আল-বুহুছ আল-ইসলামিয়্যা, পৃ. ৮৩)। উল্লেখ্য যে, সাফওয়ান ইবন উমায়‍্যার এই ক্রীতদাস নাসতাস পরে ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছিল।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00