📄 অংশগ্রহণকারী সাহাবীগণ
অংশগ্রহণকারী সাহাবীগণঃ এই যুদ্ধে কতজন সাহাবী অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন সেই প্রসংগে ঐতিহাসিক ও সীরাত বিশারদগণের মধ্যে মতভেদ রহিয়াছে। ইমাম বুখারী (র)-এর আর-রাজী' অনুচ্ছেদে বর্ণিত এই প্রসংগের হাদীছে সংখ্যার কথা উল্লেখ না থাকিলেও অন্যত্র (বুখারী, ৫খ., পৃ. ১১) তাঁহাদের সংখ্যা দশ উল্লেখ করা হইয়াছে।
عن أبي هريرة رضى الله عنه قال بعث رسول الله صلى الله عليه وسلم عشرة عينا .
"হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) দশজন গুপ্তচর প্রেরণ করিয়াছিলেন" (বুখারী, ৫খ., পৃ. ১১)
তাহাদের ছয়জন ছিলেন মুহাজির ও চারজন ছিলেন আনসারী (মাজমা' আল-বুহুছ আল-ইসলামিয়্যা, পৃ. ৪৮৩)। গোলাম মোস্তফা (পৃ. ১৮৬) ও আল-উমারী (২খ., পৃ. ৩৯৮) দশজন প্রেরণের মতকে সমর্থন করিয়াছেন। The Encyclopaedia of Islam বলা হইয়াছে, ...a small body of ten of the prophet's followers was discovered and surrounded between Mecea and Usfan (C.E. Bosworth & others, vol. v, P. 40)। উর্দু দাইরা মা'আরিফি ইসলামিয়াতে সাতজন উল্লেখ করা হইয়াছে (১০খ., পৃ. ২১৫)। ইব্ন হিশাম (৩খ., পৃ. ৯৬৮) ও ইব্ন হাযম্ (পৃ. ২১৪) এই যুদ্ধে প্রেরিত সাহাবীদের সংখ্যা ছয়জন বলিয়াছেন। নদভী এই মতকে সমর্থন করিয়া বলেন, The Messenger of Allah sent six of his Companions including Asim ibn Thabit, Khubayb ibn Adi and Zayd ibn al-Dathinah (p. 94)। যাহারা ছয়জন প্রেরণের মতকে গ্রহণ করিয়াছেন তাহারা সেই ছয়জনের নামও উল্লেখ করিয়াছেন। তাঁহারা হইলেন :
১। মারছাদ ইব্ন আবী মারছাদ কাননায ইব্ন হুসায়ন ইব্ن য়ারবু' ইবন খারাশা ইবন সা'د, আল-গানাবী (রা) (উদুল আছীর, ৪খ., পৃ. ৫০০)।
২। 'আসিম ইব্ন ছাবিত ইব্ন আফিল আকলাহ (রা), তিনি ছিলেন 'আসিম ইবন উমার ইবনুল খাত্তাবের নানা। হযরত উমার (রা) জামিলা বিনত 'আসিম ইব্ن ছাবিতকে বিবাহ করিয়াছিলেন। তাঁহার গর্ভেই 'আসিম ইবন উমার জন্মগ্রহণ করেন (ইব্ন হাজার, ৭খ., পৃ. ৪৪০)। অন্য বর্ণনায় আসিয়াছে, তাঁহার মাতা ছিলেন, শামূস বিন্ত আবী আমের (ই.বি. ৩খ., পৃ. ১৭২)। কাহারও মতে তিনি ছিলেন 'আসিম ইবন উমার ইবন খাত্তাবের মামা (আল-আয়নী, ৯খ., পৃ. ১৬৮)। তবে নানা হওয়াটাই গ্রহণযোগ্য। ইমাম বুখারী (র)-এর বর্ণিত হাদীছও ইহাকে সমর্থন করে (৫খ., পৃ. ১০-১১)।
৩। খালিদ ইব্ن বুকায়র ইব্ن 'আবদ ইয়ালীল ইব্ন নাশিব আল-লায়ছী (রা) আল-কিনানী (ইবনুল আছীর, উসদুল গাবা, ২খ., পৃ. ৯১)। তিনি ৩৪ বৎসর বয়সে শহীদ হন।
৪। খুবায়ব ইব্ন 'আদী আল-আনসারী।
৫। যায়দ ইবনুদ দাছিনা ইব্ন মু'আবিয়া আল-বায়াদী।
৬। আবদু স্নাহ ইব্ن তারিক।
মুহাম্মাদ আবদুল ওয়াহ্হাব (পৃ. ৩৩৪) ও দানাপুরী (পৃ. ১১৬) ছয়জন প্রেরিত হইয়াছেন বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। ইবন সা'দ দশজন প্রেরণের তথ্যটির প্রতি জোর সমর্থন দিয়াছেন। তবে তিনি উপরোল্লিখিত ছয় ব্যক্তির সাথে শুধু সপ্তম ব্যক্তির নাম উল্লেখ করিয়াছেন (ইব্ن হিশام, ৩খ., পৃ. ৯৬৮), অবশিষ্ট তিনজনের নাম উল্লেখ করেন নাই। তিনি যে সপ্তম ব্যক্তির নাম উল্লেখ করিয়াছেন তিনি হইতেছেন:
৭। মু'আত্তিব ইব্ن 'উবায়د (রা) (ইবন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৯৬৮) অথবা মু'আত্তিব ইব্ن আওف (ইবন হাজার, ৭খ., পৃ. ৪৪০)। তিনি ছিলেন আবদুল্লাহ্ ইব্ن তারিকের বৈপিত্রেয় ভাই। মুহাম্মাদ ইব্ن আবদুল ওয়াহ্হাব (পৃ. ৩৮৪), ইব্ন হাজার (৭খ., পৃ. ৪৪০) ও কান্ধলাবী (২খ., পৃ. ৭৫৫) ১০জনকে প্রেরণের প্রতি সমর্থন দিয়া উপরোল্লিখিত সাতজনের নামই উল্লেখ করিয়াছে। ইসলামী বিশ্বকোষেও এই সাতজনের নাম উল্লেখ করা হইয়াছে (ই.বি., ২২খ., পৃ. ২২৫)।
মূসা ইবন 'উকবা সপ্তম নম্বরে মু'আত্তিবের পরিবর্তে মুগীছ ইব্ن 'আওফ (রা)-এর নাম উল্লেখ করিয়াছেন (ইব্ن হিশাম, ৩খ., পৃ. ৯৬৮)। আমরা এই ব্যক্তিকে অষ্টম ব্যক্তি হিসাবে গণ্য করিতে পারি। তাহা হইলে অষ্টম ব্যক্তি হইলেন মুগীছ ইব্ن 'আওফ (রা)।
রাহমাতুল-লিল আলামীন গ্রন্থে আর-রাজী'-এর শহীদদের যে তালিকা দেওয়া হইয়াছে সেখানে অত্র উল্লিখিত প্রথম ছয় ব্যক্তির সাথে অন্য দুইটি নাম সংযোজন করিয়া আট জনের নামই উল্লেখ করা হইয়াছে (মানসূরপুরী, ২খ., পৃ. ২৫১)। আমরা উপরে বর্ণিত আটজন সাহাবী (রা)-এর নামের সহিত ঐ দুইটি নাম সংযুক্ত করিলে এই যুদ্ধে বুখারীর বর্ণনা অনুযায়ী যে দশজন সাহাবীকে পাঠান হইয়াছিল তাহাদের নামের সংখ্যা পূর্ণ হয়। উক্ত দুইজন সাহাবী হইলেন:
৯। যায়দ ইবন মুযায়িয়ন আনসারী বায়াদী (রা);
১০। মুগীছ ইবন 'উবায়দা ইব্ন আবী ইয়াস মালাবী (রা) (মাসসূরপুরী, ২খ, পৃ. ২৫১-২)।
এই দশজন সাহাবী (রা)-র দলপতি কে ছিলেন এ বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন দুইটি বর্ণনা পাওয়া যায়। কাহারও মতে তাঁহাদের দলপতি ছিলেন মারছাদ ইবন আবী মারছাদ (রা) (ইবন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৯৬৮; মুহাম্মাদ আবদুল ওয়াহ্হাব, পৃ. ৩৩৪; দানাপুরী, পৃ. ১১৬; দা.মা.ই., ১০খ., পৃ. ২১৫)। অন্য বর্ণনায় তাঁহাদের দলপতি ছিলেন 'আসিম ইব্ন ছাবিত (রা) (আবু দাউদ ৩খ., পৃ. ১১৬; ইব্ن হাজার, ৭খ., পৃ. ৪০৯; E. I.2, vol. v, p. 40; শিবলী নু'মানী, ১খ., পৃ. ২২৫; কান্ধলাবী, ২খ., পৃ. ৭৫৫; বুখারী, ৫খ., পৃ. ১১, পৃ. ৪০; গোলাম মোস্তফা, পৃ. ১৮৬; 'আল-উমারী, ২খ., পৃ. ৩৭৮)। ইমাম বুখারী বিশুদ্ধ বর্ণনায় যেহেতু 'আসিম (রা)-কে দলপতি করার কথা উল্লিখিত হইয়াছে এবং মূল রণাঙ্গণের যে চিত্র বিভিন্ন বর্ণনায় পরিলক্ষিত হয় সেখানে হযরত 'আসিম (রা)-এর অগ্রগণ্য ভূমিকাও এই কথার বাস্তব প্রমাণ যে, তিনিই ছিলেন এই যুদ্ধের দলপতি।
📄 রণাঙ্গন
রণাঙ্গণ : সাহাবীগণ যখন আর-রাজী' নামক স্থানে উপনীত হইলেন তখন 'আদাল ও আল-কারা গোত্রের যাহারা তাহাদের সাথী ছিল তাহারা বিশ্বাসঘাতকতা করিল। তাহারা হুযায়ল গোত্রকে তাহাদেরকে আক্রমণ করিবার জন্য চিৎকার করিয়া আহবান জানাইল। মতান্তরে তাহাদেরকে হত্যা করিবার জন্য ইঙ্গিত করিল। ইহার পর ঐ গোত্রের সকল পুরুষ তরবারি লইয়া বাহির হইল। তাহারা ছিল সংখ্যায় দুই শত। কোন কোন বর্ণনায় বলা হইয়াছে যে, তখন তাহাদের মধ্য হইতে এক শত যোদ্ধা হাতে তীর-তরবারি লইয়া বাহির হইয়া পড়িল। সাহাবীগণ (রা) সংবাদ সংগ্রহের জন্য আসিয়াছিলেন, যোদ্ধা হিসাবে নহে। আত্মরক্ষার জন্য সামান্য কিছু সরঞ্জাম ছাড়া তাঁহাদের নিকট কিছুই ছিল না। অবস্থার ভয়াবহতা উপলব্ধি করিয়া সাহাবীগণ (রা) পাহাড়ের উঁচু চূড়ায় আশ্রয় গ্রহণ করিলেন (বুখারী, ২খ, মাগাযী; গাযওয়াতুর রাজী, শিবলী নোমানী, ১খ., পৃ. ২২৫)।
শত্রু পক্ষ তাঁহাদের খুঁজিতে লাগিল। এক পর্যায়ে তাহারা এক স্থানে শুধুমাত্র মদীনা মুনাওয়ারাতে উৎপাদিত খেজুরের দানা (ইব্ন হাজার, ৭খ., পৃ. ৪৪০) ছড়াইয়া থাকিতে দেখিল। তাহাদের মোটেও বুঝিতে কষ্ট হইল না যে, শুধু মদীনাতে যে ধরনের খেজুর উৎপন্ন হইয়া থাকে ইহা সেই খেজুরেরই দানা। তখন তাহাদের ধারণা আরও পাকাপোক্ত হইল যে, আশেপাশে কোথায়ও মুহাম্মাদের সাথীরা আত্মগোপন করিয়া রহিয়াছেন। অবশেষে তাহারা তাঁহাদের সন্ধান পাইল। যে পাহাড়ের চূড়াতে তাঁহারা আশ্রয়গ্রহণ করিয়াছিলেন সেই স্থান অবরোধ করিল (মুহাম্মাদ ইব্ন আবদুল ওয়াহহাব, পৃ. ৩৩৫; ইব্ন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৯৬৯)।
এই সময় শত্রুপক্ষ তাঁহাদিগকে বলিতে লাগিল, "তোমরা যদি আত্মসমর্পণ কর তাহা হইলে আমরা তোমাদের কাহাকেও হত্যা না করিবার অঙ্গীকার করিতেছি (মুহাম্মাদ ইব্ন আবদুল ওয়াহহাব, পৃ. ৩৩৫; আবু দাউদ, ৩খ., পৃ. ১১৬)। আমরা তোমাদের সহিত যুদ্ধ করিতে চাহি না। তোমাদেরকে মক্কার অধিবাসীদের নিকট বিক্রয় করিয়া কিছু অর্থ উপার্জন করিবার ইচ্ছা পোষণ করিতেছি মাত্র" (ইসলামী বিশ্বকোষ, ২২খ., পৃ. ২২৫; ইব্ন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৯৬৯; মুহাম্মাদ ইবন সা'দ, ১খ., পৃ. ৩৮৪; আবূ যাহরা, ২খ., পৃ. ৮৮১)। শত্রুপক্ষের এই প্রতিশ্রুতি শুনিয়া 'আসিম ইব্ন ছাবিত, মারছাদ ইব্ন আবী মারছাদ ও খালিদ ইব্ন বুকায়র (রা) বলিলেন, "আল্লাহ্র শপথ! আমরা কোন মুশরিকের প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকারকে বিশ্বাসযোগ্য মনে করিতে পারি না" (ইবন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৯৬৯; মুহাম্মাদ ইব্ন আবদুল ওয়াহহাব, পৃ. ৩৩৫)। সাহাবীগণ আল্লাহ্র উপর ভরসা করিয়া যুদ্ধে অবতীর্ণ হইলেন।
'আসিম (রা) তীর শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁহার অন্যান্য সঙ্গীসহ (৭ জন) প্রাণপণে তীর নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন। এক সময় তীর শেষ হইয়া গেল। তিনি ক্ষান্ত হইলেন না। বীর বিক্রমে বর্শা দিয়া শত্রুদিগকে সজোরে আঘাত হানিত লাগিলেন। যখন বর্শা ভাঙিয়া গেল, তখন শাহাদাতের নেশায় উদ্দীপ্ত হইয়া সর্বশক্তি ব্যয় করিয়া তরবারি চালাইতে লাগিলেন (আল-ওয়াকিদী, ১খ., পৃ. ৩৫৬)। প্রথমে তীর নিক্ষেপ করিয়া, পরে বর্শা ব্যবহার করিয়া, সর্বশেষে তরবারি ব্যবহার করিয়া শত্রুপক্ষকে ঘায়েল করিবার এই যে অভিনব পদ্ধতি এই যুদ্ধে 'আসিম (রা) অনুসরণ করিয়াছিলেন বদরের যুদ্ধেও আসিমের এই বিজ্ঞানসম্মত যুদ্ধ পদ্ধতিকে রাসূলুল্লাহ (স) ভূয়সী প্রশংসা করিয়াছিলেন (বিস্তাবিত বিবরণের জন্য দ্র. নিবন্ধ আসিম, ইসলামী বিশ্বকোষ)।
আল্লাহর শার্দুল আসিম ইব্ন ছাবিত তরবারি লইয়া বীরদর্পে যুদ্ধ করিতে করিতে এক পর্যায়ে তাঁহার তরবারির হাতল ভাঙিয়া গেল। তিনি সেই ভাঙা তরবারি লইয়া লড়াই অব্যাহত রাখিলেন। দুইজন শত্রুকে শক্ত আঘাত হানিয়া আহত করিলেন, অন্য একজনকে হত্যা করিলেন। সবশেষে শত্রুরা তাহাকে তীক্ষ্ণ বর্শার নির্মম আঘাতে জর্জরিত করিল। আল্লাহ্ এই নির্ভীক সৈনিক জান্নাতের সুগন্ধ স্পর্শ করিলেন। তখন তিনি দু'আ করিলেন:
اللهم أخبرنا رسول الله اللهم حميت دينك أول نهاري فاحم لحمي اخره.
“হে আল্লাহ্! আমাদের অবস্থার সংবাদ আপনার রাসূল (স)-কে পৌছাইয়া দিন। হে আল্লাহ! আমি আপনার দীনকে দিনের প্রথম অংশে রক্ষা করিয়াছি, আপনি আমার দেহকে দিনের শেষে রক্ষা করুন" (ইবনুল আছীর, ২খ., পৃ. ১১৫; মুহাম্মদ ইব্ন আবদিল ওয়াহহাব, পৃ. ৩৩৫; E.I.2, vol.v, p. 40-41; আল-ওয়াকিদী, ১খ., পৃ. ৩৫৬; কান্ধলাবী, ২খ., পৃ. ২৪৮)। উল্লেখ্য যে, তিনি যেইদিন শাহাদাত বরণ করিয়াছিলেন এই দু'আয় মহান রাব্বুল আলামীন তাঁহার শাহাদাতের খবর রাসূল (স)-কে তৎক্ষণাৎ পৌঁছাইয়া দিয়াছিলেন (ইব্ন হাজার, ৭খ., ৪৪১; শিবলী নু'মানী, ১খ., পৃ. ২২৫)।
'আসিম (রা) এইভাবে শাহাদাত লাভ করিলেন (আল-ওয়াকিদী, ১খ., পৃ. ৩৫৬)। তাঁহার পর মু'আত্তিব ইবন 'উবায়দ মরণপণ লড়িয়া যাইতে লাগিলেন। হঠাৎ তিনি শত্রুদের তরবারির আঘাতে আহত হইলেন। সুযোগ পাইয়া শত্রুরা তাঁহাকেও শহীদ করিল (আল-ওয়াকিদী, ১খ., পৃ. ৩৫৭)। তাঁহারা দুইজনসহ আটজন (গোলাম মোস্তফা, পৃ. ১৮৬), ৪জনকে (Nadbi, p. 94-95) অথবা ৬ জন (আল-উমারী, ২খ., পৃ. ৩৯৯; C.E. Bosworth & others, vol.v, 40), মতান্তরে সাতজনকে অত্যন্ত নির্মমভাবে শহীদ করিল (মুহাম্মাদ ইব্ন আব্দুল ওয়াহহাব, পৃ. ৩৩৫; শিবলী নু'মানী, ১খ., পৃ. ২২৫)। এই শহীদদের ৪জনের নাম উল্লেখ করা হইয়াছে। তাঁহারা হইলেন— 'আসিম, মারছাদ, খালিদ ও মু'আত্তিব (আল-ওয়াকিদী, ১খ., পৃ. ৩৫৫)। প্রতিশোধপরায়ণ শত্রুরা আসিম ব্যতীত অন্য শহীদদের শাহাদাত বরণের পর তাঁহাদের শরীর হইতে কাপড় খুলিয়া ফেলিল (আল-ওয়াকিদী, ১খ., পৃ. ৩৫৬)।
📄 এক অলৌকিক ঘটনা
এক অলৌকিক ঘটনা: উহুদের যুদ্ধে সুলাফার দুই পুত্র আসিম কর্তৃক নিহত হওয়ায় সুলাফা শপথ করিয়াছিল যে, সে আসিমের মাথার খুলিতে মদ পান করিবে। এইজন্য যে তাঁহার মাথা তাহাকে আনিয়া দিবে তাহাকে এক শত উট পুরস্কার দিবে বলিয়া সে ঘোষণা দেয় (বিস্তারিত দ্র. আসিম প্রবন্ধ, ইসলামী বিশ্বকোষ, ইফা. ২খ.; আল-ওয়াকিদী, ১খ., পৃ. ৩৫৬)। 'আসিম (রা) ছিলেন আবূ সুফয়ান ইবন হারবের স্বগোত্রীয় চাচাত ভাই। কথিত আছে যে, এই ঘোষণার পর জনৈক ব্যক্তি আবূ সুফয়ান ইব্ন হারবকে বলিল, "তোমারই চাচাত ভাইয়ের মাথার খুলিতে অন্যে মদপান করিবে ইহা কেমন করিয়া হয়! বংশের তো একটা মর্যাদা রহিয়াছে।” এতদসত্ত্বেও কুফরীতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত আবূ সুফ্যানের মনে এই কথা কোন রেখাপাত করিল না (আবূ যাহরা, ২খ., পৃ. ৮৮১)। লোভনীয় এই পুরস্কারের খবর সমগ্র আরব গোত্রের মধ্যে বাতাসের বেগে ছড়াইয়া পড়িল। এই মহামূল্য পুরস্কারের লোভে অনেক কাফিরই 'আসিমকে হত্যার জন্য আসিমের মাথা অর্জনের আকাঙ্খায় প্রহর গুণিতেছিল।
📄 আবদুল্লাহ ইবন তারিক (রা)-এর শাহাদাত
যায়দ ইবনুদ দাছিনা ও খুবায়ব ইবন 'আদী (রা)-কে অর্থলিঙ্গু কাফিররা মক্কা নগরীতে বিক্রয় করিবার পূর্বেই আবদুল্লাহ্ ইব্ন তারিককে শহীদ করিল। তবে তাঁহাকে কোথায় কিভাবে শহীদ করা হইল তাহাতে মতভেদ রহিয়াছে। কাফিরদের অভয়বাণী ও প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস করিয়া যায়দ ইবনুদ দাছিনা, খুবায়ব ইবন 'আদী ও আব্দুল্লাহ্ ইব্ন তারিক (রা) কাফিরদের নিকট আত্মসমর্পণ করিলেন। কাফিররা তাঁহাদিগকে নিজেদের আওতায় পাইয়া ধনুকের রশি খুলিয়া তাহা দ্বারা তাঁহাদিগকে বাঁধা শুরু করিল (বুখারী, ৫খ., পৃ. ৪০)। আবদুল্লাহ্ ইব্ন তারিক (রা) তাহাদের প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতাকে বুঝিতে পারিলেন। তিনি পরিষ্কার ভাষায় বলিলেন, "আমাদেরকে তোমরা যে এখনই বাঁধিয়া ফেলিতেছ ইহাই হইতেছে তোমাদের প্রথম বিশ্বাসঘাতকতা।" ঘটনাটি জাহরান নামক স্থানে সংঘটিত হইয়াছিল। তিনি তাহাদের সঙ্গে যাইতে অস্বীকার করিলেন। তাহারা সেখানেই আল্লাহ্ এই আপোষহীন মুজাহিদকে শহীদ করিল (ইবনুল আছীর, ২খ., ১১৫; আবূ দাউদ, ৩খ., পৃ. ১১৬; মুহাম্মদ ইব্ন আব্দুল ওয়াহ্হাব, ৩৩৫)। ইব্ন হাজার পাহাড়ের চূড়া হইতে অবতরণের সাথে সাথেই আবদুল্লাহকে হত্যা করিবার বর্ণনাকে বিশুদ্ধ বলিয়া মত দিয়াছেন। (ইব্ন হাজার, ৭খ., পৃ. ৪৪১)। অন্য বর্ণনায় আসিয়াছে, যায়দ ইব্ন দাছিনা, খুবায়ব ইন্ন 'আদী ও আবদুল্লাহ্ ইব্ন তারিক (রা) পাহাড়ের চূড়া হইতে নিচে অবতরণ করিলে তাহারা তাঁহাদিগকে বাঁধিয়া ফেলিল। বাঁধা অবস্থাতেই তাঁহাদিগকে বিক্রয় করিবার জন্য মক্কায় লইয়া যাইতেছিল। পথিমধ্যে আজ-জাহরান (الظهران) (ইব্ন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৯৭১), মতান্তরে মাররুজ জাহরান (مر الظهران ওয়াকিদী, ১খ., পৃ. ৩৫৭; মুহাম্মদ ইবন সা'দ, ১খ., পৃ. ৩৮৫; ইব্ন হাযম, পৃ. ২১৬) নামক স্থানে আসিলে আবদুল্লাহ্ ইব্ন তারিক তাঁহার হাতের বাঁধন খুলিয়া ফেলিলেন এবং নিজের তরবারি কোষমুক্ত করিলেন। তখন কাফিররা তাঁহাকে পাথর নিক্ষেপ করিয়া অত্যন্ত মর্মান্তিকভাবে শহীদ করিল (ইবন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৯৭১; আবূ যাহরা, ১খ., পৃ. ৮৮২; দানাপুরী, পৃ. ১১৬; ইব্ন হাজার, ৭খ., পৃ. ৪৪১; ই.বি., ২২খ., পৃ. ২২৫)। অন্য বর্ণনায় বলা হইয়াছে যে, কাফিররা তাঁহাদিগকে না বাঁধিয়াই মক্কাতে লইয়া যাইতেছিল। পথিমধ্যে আজ-জাহরান (الظهران) নামক স্থানে উপস্থিত হইলে সতর্কতার জন্য ধনুকের রশি ছিঁড়িয়া তাহা দ্বারা তাঁহাদিগকে বাঁধিয়া ফেলিল। 'আবদুল্লাহ্ ইব্ন তারিক (রা) বলিলেন :
هذا أول الغدر والله لا أصاحبكم إن لي في هؤلاء الأسوة.
"ইহাই হইতেছে প্রথম বিশ্বাসঘাতকতা। আল্লাহর শপথ! আমি তোমাদের সাথে যাইব না। নিশ্চয় ঐ সমস্ত শহীদের মধ্যেই আমার অনুকরণীয় আদর্শ নিহিত রহিয়াছে” (আল-ওয়াকিদী, ১খ., ৩৫৭)।
তিনি এক পর্যায়ে তাঁহার নিজের হাত বাঁধনমুক্ত করিলেন, উন্মুক্ত করিলেন নিজের তরবারি। দুর্ধর্ষ শত্রুরা তাঁহাকে পরাজিত করিল। তাহারা পুনরায় তাঁহাকে বাঁধিবার চেষ্টা চালাইল। তিনি সুকৌশলে তাহাদের হাত হইতে ছুটিয়া গেলেন। তখন কাফিররা তাঁহাকে পাথর নিক্ষেপ করিয়া নির্মমভাবে শহীদ করিল (আল-ওয়াকিদী, ১খ., পৃ. ৩৫৭; ইব্ন হাযম, পৃ. ২১৬)। 'আব্দুল্লাহ্ ইব্ন্ন তারিকের কবর উক্ত আজ-জাহরানেই অবস্থিত (দামাই, ১০খ., পৃ. ২১৬; ইব্ন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৯৭১)। অবশেষে কাফিররা অবশিষ্ট দুইজন যায়দ ইন্সুদ দাছিনা ও খুবায়ব ইব্ন 'আদীকে মক্কাতে লইয়া গেল (আল-ওয়াকিদী, ১খ., পৃ. ৩৫৭; ইব্ন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৯৭১)।