📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 প্রেক্ষাপট

📄 প্রেক্ষাপট


১১ শাওয়াল, ৩য় হি. / ৬২৫ খৃ. ঐতিহাসিক উহুদ প্রান্তরে মুসলমান ও কুরায়শদের মধ্যে এক ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ইতিহাসে ইহা উহুদের যুদ্ধ নামে খ্যাত। এই যুদ্ধে মুসলমানগণ প্রথমে বিজয় লাভ করিলেও কতিপয় তীরন্দাজ মুজাহিদ সাহাবীর একটি ভুল সিদ্ধান্তের কারণে যুদ্ধের গতি পাল্টাইয়া যায়। মুসলমানগণ কিছুক্ষণের জন্য আক্রমণকারীর ভূমিকা হইতে আক্রান্তের ভূমিকায় অবতীর্ণ। ফলে মুসলমানগণ ছত্রভঙ্গ হইয়া যান এবং সত্তরজন সাহাবী শাহাদাত বরণ করেন।
রণাঙ্গনে গুটিকয়েক মুসলমান অবশিষ্ট ছিলেন। তাহারাও কম বেশী আহত হইয়াছেন। এই অবস্থায় কুরায়শ বাহিনী মুসলমানদের উপর আক্রমণ করিলে অতি সহজেই তাহারা তাহাদের কাংখিত লক্ষ্যে পৌছিতে পারিত। কিন্তু আল্লাহ্ তা'আলা তাহাদের অন্তরে ভীতির সঞ্চার করিয়া দিলেন। তাই কুরায়শগণ রণাঙ্গনে সামান্য সংখ্যক আহত মুসলমানের উপরও আক্রমণ করিতে সাহস পাইল না, বরং তাহারা দ্রুতপদে রণাঙ্গন ত্যাগ করিয়া মক্কার দিকে ছুটিয়া চলিল। তাহারা কয়েক মাইল পথ অতিক্রম করার পর রাওহা (الروحاء) নামক স্থানে পৌঁছিয়া যাত্রা বিরতি করিল।
দিনটি ছিল ১৫ শাওয়াল শনিবার। সন্ধ্যার পর কাফেলার অনেকেই বলিতে লাগিল, আমরা কি করিতেই বা আসিলাম আর কি করিয়াই বা ফিরিলাম। আসিলাম মুসলমানদেরকে সমূলে ধ্বংস করিতে, মদীনা আক্রমণ করিয়া সর্বস্বান্ত করিতে; কিন্তু তাহা হইল কোথায়? এমন সুযোগও কি কেহ ছাড়ে? মুসলমানগণ এখন আঘাত-জর্জরিত, আর মদীনা এখন অরক্ষিত।
তবে কেন আমরা ফিরিয়া যাইতেছি? চল আমরা পুনরায় মদীনায় ফিরিয়া যাই এবং মদীনার উপর অতর্কিতে হামলা করিয়া মুসলমানদেরকে পর্যুদস্ত করিয়া দেই।
কুরায়শদের বিশিষ্ট নেতা সাফওয়ান ইব্‌ন উমাইয়্যা বলিল, না, মদীনায় আক্রমণ করিলে বিপদ আছে। মুসলমানগণ এখন চরম ক্ষুব্ধ ও উত্তেজিত। দেখ নাই মুসলমানদের কি অপূর্ব শৌর্য-বীর্য? মদীনায় গেলে আর প্রাণে ফিরিতে পারিবে না; কাজেই মক্কায় ফিরিয়া চল।
কুরায়শ দলপতি আবূ সুফয়ান সকলের মতামত শুনার পর মুসলমানদেরকে সমূলে ধ্বংস করার মানসে পুনরায় মদীনায় আক্রমণ করিবার দৃঢ় সংকল্প ঘোষণা করিল।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মদীনার পুনরায় যুদ্ধযাত্রার ঘোষণা

📄 মদীনার পুনরায় যুদ্ধযাত্রার ঘোষণা


শনিবার দিবাগত রাত্র। শাওয়ালের ১৬তম রজনী। রাসূলুল্লাহ (স) ৭০জন সাহাবীকে উহুদে দাফন করিয়া সজল নয়নে আঘাত জর্জরিত দেহে শোক-সন্তপ্ত হৃদয়ে মাত্র মদীনায় পদার্পণ করিয়াছেন। এমন সময় তিনি ওহীর মাধ্যমে কুরায়শদের পুনরায় মদীনা আক্রমণের অভিপ্রায় জানিতে পারিলেন। কেহ কেহ বলিয়াছেন যে, হযরত আবদুর রহমান ইব্‌ন আওফ (রা) রাওহা হইতে আসিতেছিলেন। তিনি কুরায়শদের এই অভিপ্রায় জানিতে পারিয়া মহানবী (স)-কে অবহিত করেন। কেহ কেহ এই সংবাদবাহক সাহাবীর নাম হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আমর আল-মুযানী বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন।
রাসূলুল্লাহ (স) এই সংবাদের যথার্থতা যাচাই এবং কুরায়শদের গতিবিধি জানার জন্য বানু আসলাম গোত্রের তিনজনের একটি অগ্রবর্তী বাহিনী প্রেরণ করেন। এই অগ্রবর্তী দলটি হামরাউল আসাদে আসিয়া পৌছিলে অজ্ঞাত শত্রু দ্বারা আক্রান্ত হন এবং তাঁহাদের দুইজন শাহাদাত বরণ করেন।
রাসূলুল্লাহ (স) হযরত বিলাল (রা)-কে দিয়া মদীনায় ঘোষণা করিয়া দিলেন যে, “এখনই সকলে প্রস্তুত হইয়া যাও। কুরায়শদেরকে পশ্চাদ্ধাবন করিতে হইবে। যাহারা উহুদ যুদ্ধে যোগ'দান করিয়াছিল শুধু তাহারাই এই যুদ্ধে যোগদান করিতে পারিবে।" একদিকে পুনরায় যুদ্ধ যাত্রার ঘোষণা হইয়াছে, অপরদিকে মুসলমানদের অবস্থা এই যে, উহুদে অংশগ্রহণকারী প্রত্যেক সাহাবী কোন না কোনভাবে আহত হইয়াছেন। হযরত উসায়দ ইব্‌ন হুদায়র (রা)-এর দেহে ছিল নয়টি জখম, আর হযরত তুফায়ল ইব্‌ন নু'মান (রা)-এর দেহে আঘাত ছিল তেরটি। তখনও অনেকের ক্ষতস্থান হইতে রক্ত প্রবাহিত হইতেছিল। সকলেই চরমভাবে ক্লান্ত-শ্রান্ত। ইহা ছাড়া মদীনার ঘরে ঘরে স্বজন হারাইবার বেদনায় কান্নার রোল শুনা যাইতেছিল। এমন কঠিন মুহূর্তে ঘোষিত হইল পুনঃ যুদ্ধযাত্রার আহবান! মুসলমানগণ অবনত মস্তকে রাসূলের নির্দেশ মানিয়া লইলেন। আল্লাহ তা'আলা সাহাবা-ই কিরামের এই অকুণ্ঠ আনুগত্যের কথা এইভাবে বর্ণনা করিয়াছেন: الَّذِينَ اسْتَجَابُوا لِلَّهِ وَالرَّسُولِ مِنْ بَعْدِ مَا أَصَابَهُمُ الْقَرْحُ لِلَّذِينَ أَحْسَنُوا مِنْهُمْ وَاتَّقَوا أَجْرٌ عَظِيمٌ.
"জখম হওয়ার পর যাহারা আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলের ডাকে সাড়া দিয়াছে তাহাদের মধ্যে যাহারা সৎকার্য করে এবং তাকওয়া অবলম্বন করিয়া চলে তাহাদের জন্য মহাপুরস্কার রহিয়াছে” (৩: ১৭২)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মদীনা হইতে যুদ্ধযাত্রা

📄 মদীনা হইতে যুদ্ধযাত্রা


১৬ শাওয়াল রবিবার। রাসূলুল্লাহ (স) উহুদে অংশগ্রহণকারী সাহাবাগণকে সঙ্গে লইয়া পূর্ব ঘোষণানুসারে কুরায়শদের পশ্চাদ্ধাবনের উদ্দেশ্যে মদীনা হইতে রওয়ানা হওয়ার প্রস্তুতি লইলেন। তিনি হযরত ছাবিত ইবনুদ্‌ দাহ্হাক (রা)-কে রাহবার (পথপ্রদর্শক) এবং হযরত আলী, মতান্তরে হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা)-কে পতাকাধারী নিযুক্ত করিলেন। রসদপত্রের মধ্যে ছিল হযরত সা'দ ইব্‌ন উবাদা (রা) প্রদত্ত ত্রিশটি উট সওয়ারী হিসাবে আর কিছু পশু কাফেলার আহারের জন্য। মুসলমান সৈন্যের সংখ্যা ছিল উহুদ ফেরত ছয় শত ত্রিশজন।
রাসূলুল্লাহ (স) রওয়ানা হইয়া গেলেন। উহুদে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে একজনও বাদ থাকিলেন না। হযরত জাবির ইব্‌ন আবদুল্লাহ (রা) তাঁহার পিতার আদেশে তাঁহার সাতটি বোনের তত্ত্বাবধানে নিযুক্ত থাকায় উহুদে শরীক হইতে পারেন নাই। তাঁহার পিতা উহুদে শাহাদাত লাভ করেন। এইবার যুদ্ধযাত্রার ঘোষণা শুনিয়া তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে উপস্থিত হইয়া যুদ্ধে যাইবার অনুমতি প্রার্থনা করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) শুধু তাঁহার প্রার্থনা মঞ্জুর করিলেন। হযরত জাবির (রা) বলেন, মুজাহিদদের মধ্যে কেবল আমিই একমাত্র ব্যক্তি যে পূর্ব দিনের যুদ্ধে (উহুদে) শরীক ছিল না।
মুনাফিক নেতা আবদুল্লাহ ইব্‌ন উবাই ইতোপূর্বে উহুদ যুদ্ধে যাত্রাপথ হইতে ফিরিয়া গিয়াছিল। সেও দরবারে রিসালাতে হাযির হইয়া এই যুদ্ধে শরীক হইবার অনুমতি চাহিল। মহানবী (স) তাহার প্রার্থনা নামঞ্জুর করিলেন।
মদীনার শাসনভার হযরত আবদুল্লাহ ইব্‌ন উম্মে মাকতূম (রা)-এর উপর ন্যস্ত করিয়া রাসূলুল্লাহ (স) রওয়ানা হইলেন। আঘাত জর্জরিত দেহ লইয়া মহানবী (স) ও সাহাববীগণ অতিকষ্টে পথ চলিতেছিলেন। যন্ত্রণা, ক্লান্তি ও দৌর্বল্যের কারণে তাঁহাদের পায়ে হাঁটার শক্তি নাই। আল্লাহ তা'আলা তাঁহাদেরকে উৎসাহ দান করিয়া ইরশাদ করিলেন:
وَلَا تَهِنُوا فِي ابْتِغَاءِ الْقَوْمِ إِنْ تَكُونُوا تَأْلَمُونَ فَإِنَّهُمْ يَالْمُونَ كَمَا تَأْلَمُونَ وَتَرْجُونَ مِنَ اللهِ مَا لَا يَرْجُونَ وَكَانَ اللهُ عَلِيمًا حَكِيمًا.
"শত্রু সম্প্রদায়ের সন্ধানে তোমরা হতোদ্যম হইও না। যদি তোমরা যন্ত্রণা পাও, তবে তাহারাও তো তোমাদের মতই যন্ত্রণা পায় এবং আল্লাহর নিকট তোমর। যাহা আশা কর, উহারা তাহা আশা করে না; আল্লাহ্ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়" (৪: ১০৪)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হামরাউল আসাদে শিবির স্থাপন

📄 হামরাউল আসাদে শিবির স্থাপন


রাসূলুল্লাহ (স) হামরাউল আসাদে পৌঁছিয়া শিবির স্থাপন করিলেন। কাফিরদেরকে ভয় প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে প্রত্যেক রাত্রিতে মুসলমানগণ অগ্নিকুণ্ডলী প্রজ্জ্বলিত করিয়া রাখিতেন। অগ্নি কুণ্ডলীর আলোয় বহু দূর আলোকিত হইয়া পড়িত। দূর হইতে মনে হইত যেন সেখানে সহস্র সহস্র সৈন্যবাহিনী অবস্থান করিতেছে। প্রতি দিন এইরূপ পাঁচ শত অগ্নিকুণ্ডলী প্রজ্জ্বলিত করা হইত। ইহা ছিল রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর একটি দূরদর্শী রণকৌশল। ইহাতে আরও একটি উপকার ছিল এই যে, প্রত্যেক সাহাবীই কিছু না কিছু আহত ছিলেন। তাঁহারা এই আগুন দ্বারা নিজেদের ক্ষত স্থানটি সে'ক দিতেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00