📄 ঘটনা বিস্তারিত বিবরণ
বদরের যুদ্ধে শোচনীয় পরাজয়ে কুরায়শরা দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগের মধ্য দিয়া কালাতিপাত করিতে লাগিল। গ্রীষ্মকালে শাম বা সিরিয়ায় বাণিজ্যিক সফরের সময় সমাগত হইলে তাহাদের দুশ্চিন্তা ও উৎকণ্ঠা বৃদ্ধি পাইয়া অধিক তীব্রতর হইল। কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় তাহারা ভীত-বিহ্বল হইয়া পড়িল। ঐ বৎসর সাফওয়ান ইবন উমায়্যাকে সিরিয়ায় গমনকারী বাণিজ্যিক কাফেলার আমীর (দলনেতা) নিযুক্ত করা হইয়াছিল। সাফওয়ান কুরায়শদের সমবেত করিয়া বলিল, নবী মুহাম্মাদ (স) ও তাঁহার অকুতোভয় সঙ্গীরা আমাদের বাণিজ্য রাস্তা কণ্টকাকীর্ণ করিয়া তুলিয়াছে। তাহারা সমুদ্র উপকূলবর্তী রাস্তাসমূহের প্রতি তীক্ষ্ণ নজর রাখিতেছে। উপরন্তু উপকূলের বাসিন্দারা তাহাদের সাথে সন্ধিসূত্রে আবদ্ধ হইয়া মিত্র শক্তিতে রূপান্তরিত হইয়াছে। সাধারণ লোকেরাও তাহাদের সমর্থনে আগাইয়া আসিয়াছে। এমতাবস্থায় তাহাদের সহিত কিভাবে মুকাবিলা করিব বা বাণিজ্যিক ব্যাপদেশে নূতন কোন রাস্তা অবলম্বন করিব তাহা আমার বোধগম্য হইতেছে না। আর বাণিজ্যিক সফর পরিহার করিয়া যদি আমরা নিজ নিজ বাড়ীতেই বসিয়া থাকি তবে যাইতে যাইতে এক দিন মূলধনও শেষ হইয়া যাইবে, কিছুই বাকী থাকিবে না। কারণ গ্রীষ্ম মৌসুমে সিরিয়ার সাথে এবং শীতকালে আবিসিনিয়ার সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য সচল রাখিবার উপরই আমাদের জীবিকা নির্ভরশীল (আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ২৭৪; ওয়াকিদী, কিতাবুল মাগাযী, ১খ., পৃ. ১৯৭)।
সাফওয়ান ইবন উমায়্যার এই উক্তি ও প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি লইয়া কুরায়শদের মাঝে ব্যাপক আলোচনা ও চিন্তা-গবেষণা শুরু হইয়া গেল। শেষ পর্যায়ে আসওয়াদ ইব্ন আবদুল মুত্তালিব সাফওয়ানকে এই বলিয়া পরামর্শ দিল যে, তুমি উপকূলের আশংকাময় ও বিপদসংকুল রাস্তা ছাড়িয়া দিয়া ইরাকের রাস্তা ধরিয়া বাণিজ্য বহর পরিচালনা কর। ইরাকের এই রাস্তাটি ছিল অত্যন্ত সুদীর্ঘ। রাস্তাটি মদীনার পূর্ব দিক দিয়া অতিক্রান্ত হইয়াছে এবং নাজদ হইয়া সিরিয়া পর্যন্ত চলিয়া গিয়াছে। রাস্তাটি কুরায়শদের কাছে অনেকটা অপরিচিত ছিল। তাই আসওয়াদ ইব্ন আবদুল মুত্তালিব সাফওয়ানকে পরামর্শ দিল, বাক্স ইবন ওয়াইল গোত্রের ফুরাত ইব্ন হায়্যানকে পথপ্রদর্শক হিসাবে গ্রহণ করিবার জন্য (আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ২৭৪)।
সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করিয়া কুরায়শদের বাণিজ্য কাফেলা ইরাকের নূতন পথ ধরিয়া সাফওয়ান ইবন উমায়্যার নেতৃত্বে সিরিয়াভিমুখে যাত্রা শুরু করিল। পরামর্শ মুতাবিক তাহারা বনূ বাক্স ইব্ন ওয়াইল গোত্রের ফুরাত ইব্ন হায়্যানকে অর্থের বিনিময়ে পথপ্রদর্শক হিসাবে সাথে নিল। ইব্ন হিশাম বলেন, ফুরাত ইব্ন হায়্যান ছিল বানু উজাল গোত্রের লোক ও বানু সাহমের মিত্র (ইব্ন হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, ১খ., পৃ. ৬৫১)।
কুরায়শদের এই বাণিজ্য সফরে আবূ সুফয়ান ইব্ন হারব, হুয়ায়তিব ইব্ن 'আবদুল উযযা এবং আবদুল্লাহ্ ইব্ن আবূ রাবী'আও অংশগ্রহণ করিয়াছিল। এই কাফেলায় অনেক রৌপ্য ও রৌপ্যের বাসনপত্র ছিল, যাহার ওজন ছিল ত্রিশ হাজার দিরহামের সমপরিমাণ (ইবনুল আছীর, তারীখুল কামিল, ২খ., পৃ. ৪০; আত-তাবাকাতুল কুবরা, ২খ, ৩৬)। কুরায়শদের এই অভিযানের সংবাদ সালীত ইন্ন নু'মানের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (স) দ্রুত অবহিত হইলেন।
ঘটনার বিবরণ এইরূপ যে, নাঈম ইবন মাসউদ মদীনায় আসিল। তাহার কাছে কুরায়শদের বাণিজ্য অভিযানের সংবাদ ছিল। সে ছিল বিধর্মী, মদীনায় আসিয়া বানু নাযীর গোত্রের কিনানা ইব্ن আবুল হুকায়ক-এর সাথে সখ্যতা স্থাপন করিল। তাহাদের সাথে ছিল সম্প্রতি ইসলাম কবুলকারী সালীত ইব্ন নু'মান (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ, ৬)। তাহারা এক মদ্যপানের আসরে উপস্থিত হইয়া শরাব পান করে (ঘটনাটি মদ নিষিদ্ধ হওয়ার পূর্বের)। যখন না'ঈম মাদকতায় চরমভাবে আচ্ছন্ন হইয়া হিতাহিত জ্ঞানহীন হইয়া পড়িল তখন সে নূতন পথে কুরায়শ কাফেলার বাণিজ্যিক সফর ও তাহাদের অভিপ্রায়ের কথা ফাঁস করিয়া দিল। সালীত ইন্ন নু'মান (রা) বর্ণনা শুনিয়া তৎক্ষণাৎ দ্রুত গতিতে নবী করীম (স)-এর খিদমতে উপস্থিত হইয়া সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করিলেন।
রাসূলুল্লাহ (স) সংবাদ জানিতে পারিয়া সাথে সাথে আক্রমণের সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ করিলেন। তিনি এক শতজন অশ্বারোহীর একটি বাহিনী যায়দ ইব্ন হারিছা (রা)-এর নেতৃত্বে তাহদিগকে প্রতিহত করিবার জন্য প্রেরণ করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) নিজে এই সমরাভিযানে অংশগ্রহণ করেন নাই। যায়দ ইবন হারিছা (রা) অশ্বারোহী বাহিনী লইয়া দ্রুত গতিতে তাহাদের পশ্চাৎধাবন করিলেন। কুরায়শ কাফেলা সম্পূর্ণ অসতর্ক অবস্থায় কারাদা নাম একটি প্রস্রবণের নিকট শিবির স্থাপনের নিমিত্ত অবতরণ করিয়াছিল। কারাদা হইল যাতু-ইক্ক প্রান্তরের নজদ এলাকার রাবাযাহ ও গামারাহ-এর মধ্যবর্তী একটি জলাশয়ের নাম (আত-তাবাকাতুল কুবরা, ২খ, ৩৬; ইবন ইসহাক, সীরাতে রাসূলুল্লাহ (বাংলা), ৩খ., পৃ. ২২১)। ইবনুল-আছীর ঐ স্থানটির নাম 'ফারদা' বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন (তারীখুল কামিল, ২খ., পৃ. ৪১)।
যায়দ ইবন হারিছা (রা)-এর বাহিনী ঐ জলাশয়ের কাছে কুরায়শ কাফেলার মুকাবিলা করিলেন। অতর্কিত আক্রমণ চালাইয়া তাহারা কাফেলার উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ লাভ করিলেন। দলনেতা সাফওয়ানসহ অধিকাংশ কুরায়শ সদস্য সকল মালামাল ছাড়িয়া পালায়ন পূর্বক জীবন রক্ষা করিল। কিন্তু কাফেলার পথপ্রদর্শক ফুরাত ইবন হায়্যান এবং কথিতমতে অন্য আরও দুইজন লোক মুসলিম বাহিনীর হাতে ধৃত হইল।
কাফেলা হইতে প্রাপ্ত আনুমানিক এক লক্ষ দিরহাম মূল্যের রৌপ্য সম্পদ মুসলমানগণ গনীমতরূপে লাভ করিলেন এবং উট বোঝাই করিয়া সমস্ত মালামাল রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে আনিয়া উপস্থিত করিলেন। মহানবী (স) বিধি মুতাবিক এক-পঞ্চমাংশ পৃথক করিয়া বাকী সম্পদ অভিযানে শরীক সৈনিকদের মধ্যে বণ্টন করিলেন। বণ্টিত ঐ এক-পঞ্চমাংশ সম্পদের মূল্যের পরিমাণ ছিল তেইশ বা পঁচিশ হাজার দিরহাম (সীরাতে মুহাম্মাদিয়া, আল-মাওয়াহিবুল-লাদুন্নিয়্যা, ১খ., ৩৫৪)। ফুরাত ইব্ন হায়্যানকে বন্দী অবস্থায় নবী করীম (স)-এর নিকট উপস্থিত করা হয়। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে বলিলেন, যদি তুমি ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হও তবে তোমাকে ছাড়িয়া দিব, অন্যথায় মৃত্যুদণ্ডই হইবে তোমার একমাত্র শাস্তি। অতঃপর ফুরাত নবী করীম (স)-এর হাতে ইসলাম কবুল করিলেন (তাবাকাতুল কুবرا, ২খ., পৃ. ৩৬; তারীখুত তাবারী, ২খ, পৃ. ১৮৩)।
ইব্ن হিশাম বলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর কবি হাসসান ইব্ন্ন ছাবিত (রা) উহুদের পর দ্বিতীয় বদরের যুদ্ধে কুরায়শদের ঐ ভিন্ন ও নূতন পথ অবলম্বনের কারণে ভর্ৎসনা করিয়া নিম্নোক্ত কবিতা আবৃত্তি করেন:
دعوا فلجات الشام قدحال دونها - جلاد كافواه المخاض الأوراك بأيدى رجال هاجروا نحو ربهم - وانصاره حقا وايدى الملائك اذا سلكت للغور من بطن عالج - فقولا لها ليس الطريق هنالك
"তোমরা সিরিয়ার ক্ষুদ্র নির্ঝরণীগুলি এখন ছাড়িয়া দাও, কেননা তাহার (এবং তোমাদের) মাঝে এমন তীক্ষ্ণ (তরবারি) অন্তরায় হইয়া গিয়াছে যাহা পিলুবৃক্ষ ভক্ষণকারিনী অন্তঃসত্তা উটনীর মুখের ন্যায় ভয়ংকর। (সেইসব তরবারি) ঐসব লোকের হাতে রহিয়াছে যাহারা স্বীয় প্রতিপালক ও প্রকৃত সাহায্যকারীদের দিকে হিজরত করিয়াছেন এবং তাহা রহিয়াছে ফেরেশতাদের হাতে। মরু এলাকার নিম্ন ভূমির দিকে যে কাফেলা চলিবে, তাহাদিগকে বলিয়া দাও যে, এই দিকে কোন রাস্তা নাই" (সীরাতে ইব্ن হিশাম, ২খ., পৃ. ৩০৯)।
বদর যুদ্ধের পরে এই ঘটনাই ছিল কুরায়শদের নিকট সর্বাপেক্ষা বেদনাদায়ক ও মর্মান্তিক। এই পরাজয় ও ব্যর্থতার পর তাহাদের উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা ও উৎকণ্ঠা বহু গুণ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়। তাহাদের সামনে দুইটি মাত্র পথ খোলা থাকে। হয় তাহারা গর্ব ও অহংকার পরিত্যাগ করিয়া মুসলমানদের সাথে সন্ধিসূত্রে আবদ্ধ হইবে, নতুবা ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করিয়া পরবর্তী যুদ্ধে বিরাট সাফল্য অর্জন পূর্বক নিজেদের হৃত গৌরব ও মর্যাদা ফিরাইয়া আনিবে এবং মুসলমানদিগকে মূলোৎপাটিত করিবে। মক্কাবাসী কুরায়শগণ এই দ্বিতীয় পথটিই বাছিয়া লইল। সুতরাং এই ঘটনার পর কুরায়শদের প্রতিশোধ গ্রহণের উত্তেজনা আরও তীব্রতর হইল। তাহারা মুসলমানদের সাথে মুকাবিলা করিবার জন্য পূর্ণ মাত্রায় যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করিয়া দিল। পরবর্তীতে অনুষ্ঠিত উহুদ যুদ্ধের ইহাও একটি কারণ ছিল (আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ২৪৭)।
এই যুদ্ধাভিযানের ফলে মুসলমানদের শক্তি-সাহস সকল দিক হইতে বাড়িয়া গেল। অনেক মুশরিক ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় লইতে লাগিল। ফলে ক্রমান্বয়ে ইসলামের প্রচার ও প্রসার বেগবান হইতে থাকে।