📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বদর যুদ্ধে কুরায়শদের পরাজয়ে কা'ব-এর প্রতিক্রিয়া

📄 বদর যুদ্ধে কুরায়শদের পরাজয়ে কা'ব-এর প্রতিক্রিয়া


বদর যুদ্ধে (২য় হি.) মুসলমানদের বিজয় এবং কুরায়শদের পরাজয়ের সংবাদ লইয়া যায়দ ইব্‌ন হারিছা (রা) মদীনার নিম্নভূমির লোকদের নিকট এবং ‘আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন রাওয়াহা (রা) উচ্চ ভূমির লোকদের নিকট আগমন করিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) মদীনার মুসলমানদের কাছে বিজয়বার্তা এবং মুশরিক নেতৃবৃন্দের নিহত হওয়ার সংবাদ প্রেরণ করিলেন (ইব্‌ন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৭)। কুরায়শদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের নিহত হওয়ার খবর শুনিয়া কা'ব আশ্চর্যান্বিত হইয়া বলিল, সত্যিই কি এইরূপ ঘটিয়াছে? ইহারা তো আরবের সম্ভ্রান্ত লোক এবং জনগণের রাজা। আল্লাহর শপথ! যদি সত্যিই মুহাম্মাদ (স) তাহাদিগকে হত্যা করিয়া থাকে তবে পৃথিবীর অভ্যন্তর ভাগ উহার উপরিভাগ হইতে উত্তম (তারীখ তাবারী, ২খ., পৃ. ১৭৮; ইব্‌ন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৮; সীরাতুল মুসতাফা, ২খ., ১৭৫; তাফহীমুল কুরআন, ৫খ., পৃ. ৩৭৭)। কা'ব যখন নিশ্চিত হইল যে, বদর যুদ্ধে কুরায়শদের শোচনীয় পরাজয় ও নেতৃবর্গের নিহত হওয়ার সংবাদ সত্য, তখন সে ক্ষোভে, দুঃখে ও বিদ্বেষে ফাটিয়া পড়িল। সে রাসূলুল্লাহ (স) ও মুসলমানদের ভর্ৎসনা ও নিন্দা করিতে এবং ইসলামের শত্রুপক্ষের প্রশংসা ও তাহাদিগকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করিতে লাগিল। সে তাহার তৎপরতার অংশ হিসাবে মক্কায় গমন করিয়া আবদুল মুত্তালিব ইব্‌ন আবী ওয়াদা'আর গৃহে উঠিল, তাহার স্ত্রী আতিকা বিন্ত আবূ আয়াস ইবন উমায়্যা কা'বের যথেষ্ট সেবা-যত্ন ও সমাদর করিল। অতঃপর সে রাসূলুল্লাহ (স)-এর বিরুদ্ধে কুরায়শদিগকে প্ররোচিত করিতে লাগিল। সে বদর যুদ্ধে নিহত কুরায়শ নেতাদের সম্পর্কে শোকগাথা রচনা করিয়া তাহাদের শোকাভিভূত আত্মীয়-স্বজনদিগকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য উত্তেজিত করিয়া তুলিল (ইবন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৮; আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ২৬৯)। বদরে নিহত কুরায়শ সর্দারদের এবং পর্বতের গুহায় নিক্ষিপ্ত তাহাদের লাশসমূহ সম্পর্কে তাহার রচিত শোকগাথার কিছু অংশ নিম্নরূপ:

طحنت رحى بدر لمهلك أهله + ولمثل بدر تستهل وتدمع قتلت سراة الناس حول حياضيهم + لا تبعدوا ان الملوك تصرع كم قد اصيب به من ابيض مساجد + ذى بهجة يأوي اليه الضريع طلق اليدين أذا الكواكب اخلفت + حمال اثقال يسود ويربع ويقول اقوام اسر بسخطهم + ان ابن الاشرف ظل كعبا يجزع صدقوا فليت الارض ساعة قتلوا + ظلت تسوخ بأهلها وتصدع صار الذي اثر الحديث بطعنة + او عاش اعمى مرعشا لا يسمع نبئت أن بني المغيرة كلهم + خشعوا لقتل ابي الحكيم وجدعوا وابنا ربيعة عنده ومنبه + ما نال مثل المهلكين وتبع نبئت ان الحارث ابن هشامهم + في الناس يبنى الصالحات ويجمع وليزور يثرب بالجمعو وانما + يحمى على الحسب الكريم الأروع.

"বদরের যাতা আপন লোকদিগকে পিষিয়া মারিল। বদরের অনুরূপ ঘটনায় চক্ষুগুলি অশ্রু ঝরায় এবং ঝরিতে থাকে। জনগণের নেতৃবৃন্দ নিজেদেরই হাওযের পাশে নিহত হইল। তবে ইহা অস্বাভাবিক কিছু মনে করিও না, কারণ বাদশাহগণও পরাজিত হইয়া থাকে। কত সম্ভ্রান্ত, শুভ্র চেহারাবিশিষ্ট ও জাঁকজমকপূর্ণ ব্যক্তিরা বিপদগ্রস্ত হইয়াছে যাহাদের কাছে নিঃস্ব লোক আশ্রয় গ্রহণ করিয়া থাকে।

অনাবৃষ্টির সময় (দুর্ভিক্ষে) দুই হাতে দানকারী অন্যের বোঝা নিজের মাথায় বহনকারী সর্দার, যাহারা খাজনা আদায় করিয়া থাকে।

জাতির লোকেরা বলে যে, তাহাদের ক্ষোভে আমি সন্তুষ্ট হই (ইহা মোটেই ঠিক নয়, বরং) কা'ব ইব্‌ন আশরাফ ভীত-সন্ত্রস্ত হইয়া পড়িয়াছে। তাহারা সত্যই বলিয়াছে, কিন্তু যখন তাহারা নিহত হইয়াছিল, তখন যমীন যদি তাহার লোকদিগকে ধ্বসাইয়া দিত এবং টুকরা টুকরা হইয়া যাইত তাহা হইলে কতই না উত্তম হইত!

এই কথা সে প্রচার করিয়াছে, হায়, যদি সে-ই বর্শার লক্ষ্যবস্তু হইয়া যাইত কিংবা অন্ধ হইয়া বাঁচিয়া থাকিত অথবা বধির হইয়া যাইত, কিছুই শুনিতে না পাইত, কতই না ভাল হইত!

খবর পাইয়াছি যে, আবুল হাকামের নিহত হওয়ার কারণে গোটা মুগীরা বংশের নাক কাটা গিয়াছে এবং তাহারা অপদস্থ ও লাঞ্ছিত হইয়াছে। আর রবী'আর দুই পুত্রও তাহার নিকট চলিয়া গিয়াছে, আর মুনাব্বিহও। এই নিহত ব্যক্তিরা ছিল এমন যে, কেহ তাহাদের মত (মর্যাদা ও গুণ) অর্জন করিতে পারে নাই, আর না (ইয়ামানের বাদশাহ) তুব্বা'ও। শুনিলাম, তাহাদের মধ্যকার হারিছ ইব্‌ন হিশাম জনতার মধ্যে সৎকর্ম করিয়াছে এবং লোকদিগকে একত্র করিয়াছে, সৈন্যদল লইয়া ইয়াছরিবের (মদীনা) মুকাবিলা করিবার উদ্দেশ্যে। সত্য কথা এই যে, অভিজাত মহৎ লোকেরাই পিতৃপুরুষের মর্যাদা রক্ষা করিয়া থাকে” (সীরাত ইবন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৮; ইব্‌ন ইসহাক, ৩খ., পৃ. ২২৩)।

ইবন হিশাম বলেন, অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ এই কবিতাগুলি হাসসান (রা)-এর নয় বলিয়া মন্তব্য করিয়াছেন (সীরাতে ইবন হিশাম, ৩খ, পৃ. ৯)।

ইবন ইসহাক বলেন, বানু বালীর শাখা বানু মুরাদ-এর মায়মূনা বিন্ত আবদুল্লাহ নাম্নী এক মুসলিম মহিলা কা'বের কবিতার প্রতিউত্তরে নিম্নোক্ত কবিতা রচনা করেন:

تحنن هذا العبد كل تحنن + يبكى على قتلى وليس بناصب بكت عين من يبكي لبدر وأهله + وعلت بمثليها لوى بن غالب فليت الذين خرجوا بدمائهم + يرى ما بهم من كان بين الاخاشب فيعلم حقا عن يقين ويبصروا + مجرهم فوق اللحى والحواجب

"এই গোলাম নিহতদের উদ্দেশ্যে প্রদর্শনীমূলক বিলাপ করিয়াছে এবং অন্যদিগকেও কাঁদাইয়াছে, আসলে সে মোটেই চিন্তিত ও দুঃখিত নয়। বদর ও বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের যাহাদের জন্য সে কাঁদিতেছে, তাহাদের চক্ষু তো কাঁদিয়াছে, কিন্তু লুওয়ায় ইব্‌ন গালিবদের তাহাদের অশ্রুর দ্বিগুণ দান করানো হইয়াছে।

হায়! যাহারা স্বীয় রক্তে রঞ্জিত হইয়াছে, মক্কার দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী লোকেরা যদি তাহাদের দুরবস্থা দেখিতে পাইত, তাহা হইলে তাহারা নিশ্চিতভাবে জানিতে সক্ষম হইত এবং তাহারা তাহাদের অধঃমুখে উপুড় অবস্থায় দেখিতে পাইত" (ইবন ইসহাক, ৩খ.?)।

অবশ্য অনেকেই এই কবিতাগুলি কা'বের উদ্দেশ্যে এবং মায়মুনার রচিত নয় বলিয়া অভিমত প্রকাশ করিয়াছেন (ইন্ন হিশাম, ৩খ., পৃ. ৯)।

কা'ব-এর প্ররোচনায় আবু সুফ্যান হারাম শরীফের পর্দা ধরিয়া মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ গ্রহণ করিবার প্রতিজ্ঞা করিল (ইসলামী বিশ্বকোষ, ৬খ., পৃ. ৬২৮)। অন্য বর্ণনা মতে, মক্কার চল্লিশজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি আবূ সুফ্যানের নিকট গিয়া বদরের প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য তাহাকে উত্তেজিত করিয়া তুলিলে আবু সুফ্যান সকলকে লইয়া হারাম শরীফে আসিয়া কা'বা ঘরের পর্দা ধরিয়া বদরের প্রতিশোধ গ্রহণের প্রতিজ্ঞা করিল। এমনকি তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-কে গুপ্তহত্যা করিবারও সংকল্প করিল (ফাতহুল বারী, ৭খ., পৃ. ২৫৯; সীরাতে শিবলী নু'মানী, ১খ., পৃ. ২৩৭)।

ইহার পর কা'ব ইব্‌ন আশরাফ মদীনায় প্রত্যাবর্তন করিয়া রাসূলুল্লাহ (স) সম্পর্কে ব্যঙ্গাত্মক কবিতা রচনা করিতে লাগিল এবং লোকদিগকে তাঁহার বিরুদ্ধে উত্তেজিত করিয়া তুলিতে শুরু করিল। আবূ দাউদের বর্ণনা:

وكان كعب بن الاشرف يهجو النبى ﷺ واصحابه ويحرض عليه كفار قريش .

(সুনান আবূ দাউদ, কিতাবুল খারাজ ওয়াল-ইমারা, বাব কায়ফা কানা ইখরাজুল ইয়াহুদ মিনাল মাদীনা, ২খ., পৃ. ৪২২, নং ৩০০০)।

সে মুসলিম মহিলাদের দুর্নাম করিয়া অত্যন্ত আপত্তিজনক কবিতা রচনা করিতে লাগিল এবং তাহাদিগকে ভীষণভাবে কষ্ট দিতে শুরু করিল (আল-কামিল ফিত-তারীখ, ২খ., পৃ. ১৪৩; আল-জামে' লিআহকামিল কুরআন, ৩খ., পৃ. ৩০৩)। A Guillaume এই সম্পর্কে বলেন, Then he composed amatory verses of insulting nature about the Muslim women (The Life of Mohammad, P. 367)।

আল্লাহ তা'আলা মুসলমানদিগকে ধৈর্য ধারণের উপদেশ দিলেন এবং ইয়াহুদীদের সম্বন্ধে নিম্নের আয়াত নাযিল করেন (কিতাবুল মাগাযী, ১৮৪)ঃ

وَلَتَسْمَعُنَّ مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَمِنَ الَّذِينَ أَشْرَكُوا أَذًى كَثِيرًا .

“তোমাদের পূর্বে যাহাদিগকে কিতাব দেওয়া ইহয়াছিল তাহাদের এবং মুশরিকদের নিকট হইতে তোমরা অনেক কষ্টদায়ক কথা শুনিবে" (৩: ১৮৬)।

ইমাম যুহরী বলেন, এই আয়াতে وَمِنَ الَّذِيْنَ أَشْرَكُوا দ্বারা কা'ব ইব্‌ن আশরাফকে বুঝানো হইয়াছে (আত-তাবাকাতুল কুবরা, ২খ., পৃ. ৩৩; তাফসীরে কুরতুবী, ৩খ., পৃ. ৩০৩)।

আল্লামা ইয়া'কূবী তাঁহার তারীখ গ্রন্থে বলেন:

كعب بن الاشرف اليهودي الذي اراد ان يمكر رسول الله ﷺ .

"ইয়াহুদী কা'ব ইবনুল আশরাফ রাসূলুল্লাহ (স)-কে ধোঁকা দিয়া হত্যা করার ষড়যন্ত্র করিয়াছিল" (শিবলী, সীরাতুন নবী, ১খ., পৃ. ২৩৭)।

আল্লামা ইবন হাজার আসকালানী বলেন, কা'ব ইবনুল আশরাফ মহানবী (স)-কে বিবাহভোজের অনুষ্ঠানে যোগদানের দাওয়াত দিল এবং কয়েক ব্যক্তি এই উদ্দেশ্যে নিযুক্ত করিল যে, মহানবী (স) আগমন করিলে তাহারা তাঁহাকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলিয়া হত্যা করিবে (ফাতহুল বারী, ৭খ., পৃ. ৩৩৮)। এখানে ঘটনাটি সবিস্তারে আলোচিত হইয়াছে।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 কা'ব ইবনুল আশরাফ হত্যার পরিকল্পনা

📄 কা'ব ইবনুল আশরাফ হত্যার পরিকল্পনা


কা'ব ইব্‌ন আশরাফ রাসূলুল্লাহ (স) ও মুসলমানদিগকে অব্যাহতভাবে ভর্ৎসনা ও কাব্যিক কটূক্তির মাধ্যমে ভীষণভাবে কষ্ট দিতে লাগিল। তাহার সীমাহীন কাব্যাত্যাচার ও দুর্ব্যবহারে অতীষ্ঠ ইইয়া তিনি বলিলেন: "কা'ব ইব্‌ন আশরাফকে কে দমন করিতে পারিবে? সে আল্লাহ ও তদীয় রাসূলকে কষ্ট দিয়াছে" (বিদায়া, ২খ., পৃ. ৬)।
বনূ আবদুল আশহালের মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা) বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি ইহার জন্য প্রস্তুত আছি। আমি কি তাহাকে হত্যা করিব? নবী করীম (স) বলিলেন, সম্ভব হইলে তাহাই কর (আল-কামিল ফিত-তারীখ, ২খ., পৃ. ১৪৩)।
মুহাম্মাদ ইব্‌ন মাসলামা (রা) ফিরিয়া আসিয়া চিন্তিত অবস্থায় খাওয়া-দাওয়া ছাড়িয়া দিয়া তিন দিন অতিবাহিত করিলেন। ইহা অবগত হইয়া রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, পানাহার ত্যাগ করিলে কেন? তিনি বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার সামনে একটি কথা বলিয়া ফেলিয়াছি সত্য, কিন্তু তাহা বাস্তবায়ন করিতে পারিব কিনা জানি না। নবী করীম (স) বলিলেন, চেষ্টা করাই শুধু তোমার দায়িত্ব (তারীখুত তাবারী, ২খ., পৃ. ১৭৯; ইব্‌ন হিশাম, ৩খ., পৃ. ১০)।
পরিকল্পনা কার্যকর করিবার জন্য মুহাম্মাদ ইব্‌ন মাসলামা (রা) আওস গোত্রীয় আরও চার ব্যক্তিকে সঙ্গে লইলেন। তাহারা হইলেন: মিলকান ইব্‌ন সালামা ইব্‌ন ওয়াক্‌শ আবূ নাইলা, কা'ব ইব্‌ন আশরাফের দুধভ্রাতা; 'আব্বাদ ইব্‌ন বিশ্‌র ইব্‌ন ওয়াক্‌শ (রা); হারিছ ইব্‌ن আওস ইব্‌ن মু'আয এবং আৰু 'আবস ইব্‌ن জাবর (রা) (তাবাকাতুল কুবরা, ২খ., পৃ. ৩২; আল-মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়‍্যা, ১খ., পৃ. ৩৫১-৩৫২; ইব্‌ن হিশাম, ৩খ., পৃ. ১০)।
কা'ব ইব্‌ن আশরাফের হত্যাকাণ্ডের যেই বর্ণনা হাদীছের বিভিন্ন কিতাবে (সামান্য শাব্দিক পার্থক্য সহকারে) উল্লিখিত হইয়াছে তাহা নিম্নরূপ:

عن جابر بن عبد الله يقول قال رسول الله ﷺ من لكعب بن الاشرف فانه قد اذى الله ورسوله فقام محمد بن مسلمة فقال يا رسول الله اتحب ان اقتله قال نعم قال فأذن لى ان اقول شيئا قال قل فاتاه محمد بن مسلمة فقال ان هذا الرجل قد سالنا صدقة وانه قد عنانا واني قد اتيتك استسلفك قال وايضا والله لتملنه قال انا قد اتبعناه فلا نحب أن ندعه حتى ننظر الى شيئى يصير شأنه وقد اردنا ان تسلفنا وسقا أو وسقين فقال نعم ارهنونی قالوا ای شیئی ترید قال ارهنونى نساءكم قال كيف نرهنك نساءنا وانت اجمل العرب قال فارهنوني ابناءكم قالوا كيف نرهنك ابنا ءنا فيسب أحدهم فيقال رهن بوسق او وسقين هذا عار علينا ولكنا نرهنك اللامة يعنى السلاح فواعده ان ياتيه فجاءه ليلا ومعه ابو نائلة وهو اخو كعب من الرضاعة فدعاهم الى الحصن فنز اليهم فقالت له مرأته اين تخرج هذه الساعة فقال انما هو محمد بن مسلمة واخي ابو نائلة قالت اسمع صوتا كأنه يقطر الدم قال انما هو اخي محمد بن مسلمة ورضيعي ابو نائلة ان الكريم لو دعى الى طعنة بليل لاجاب قال ويدخل محمد بن مسلمة قال عمرو جاء معه رجلين وقال غير عمرو ابو عبس بن جبر والحارث بن اوس وعباد بن بشر فقال اذا ماجاء فاني قائل بشعره فأشمه فاذا رايتموني استمكنت من راسه فدونكم فاضربوه فنز اليهم متوشحا وهو ينفح منه ريح الطيب فقال ما رأيت كاليوم ريحا اى اطيب فقال اتاذن لى ان اشم رأسك قال نعم فشمه ثم اشم اصحابه ثم قال اتأذن لي قال نعم فلما استمكن منه قال دونكم فقتلوه ثم اتوا النبي ﷺ فاخبروه.

"জাবির ইবন 'আবদিল্লাহ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন: কা'ব ইব্‌ন আশরাফের (নিধনের) জন্য কে আছে? কারণ সে আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলকে খুবই কষ্ট দিতেছে। মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা) দাঁড়াইয়া বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি যদি তাহাকে হত্যা করি তবে তাহা কি আপনি পছন্দ করিবেন? তিনি বলিলেন, হাঁ। তিনি বলিলেন, তাহা হইলে আমাকে কিছু উল্টাপাল্টা বলিবার অনুমতি দিন। তিনি বলেন, বলিও। অতএব মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা) তাহার নিকট গিয়া বলিল, এই লোকটি আমাদের নিকট সদাকা (যাকাত) দাবি করিয়াছে। সে আমাদিগকে উত্যক্ত করিয়া তুলিয়াছে। আমি তোমার নিকট কিছু ঋণ চাহিবার জন্য আসিয়াছি। সৈ বলিল, আরও দেখ। আল্লাহর শপথ! সে তোমাদিগকে অতিষ্ঠ করিয়া তুলিবে। ইবন মাসলামা বলেন, যাহা হউক, আমরা তো তাঁহার আনুগত্য স্বীকার করিয়াছি। শেষ পর্যন্ত কি দাঁড়ায় তাহা না দেখা পর্যন্ত এখনই তাঁহাকে ত্যাগ করা উত্তম মনে করি না। আমি তোমার নিকট এক বা দুই ওয়াস্ক খাদ্যশস্য ধার চাই। সে বলিল, আচ্ছা! আমার নিকট কিছু বন্ধক রাখ। তাহারা বলিলেন, কি জিনিস বন্ধক চাও? সে বলিল, তোমাদের স্ত্রীলোকদিগকে আমার নিকট বন্ধক রাখ। তাহারা বলিলেন, তোমার নিকট আমাদের স্ত্রীলোকদিগকে কিভাবে বন্ধক রাখিতে পারি? অথচ তুমি আরবের সর্বাধিক সুশ্রী পুরুয়। সে বলিল, তাহা হইলে তোমাদের সন্তানদিগকে আমার নিকট বন্ধক রাখ। তাহারা বলিলেন, আমরা কি করিয়া আমাদের সন্তানদিগকে তোমার নিকট বন্ধক রাখিতে পারি? ইহাতে তাহাদেরকে গালমন্দ করা হইবে এবং বলা হইবে, এক বা দুই ওয়াস্ক-এর জন্য (তাহাদেরকে) বন্ধক রাখা হইয়াছিল। ইহা আমাদের জন্য অপমানজনক; বরং আমরা তোমার নিকট আমাদের যুদ্ধাস্ত্র বন্ধক রাখিব। অতএব ইবন মাসলামা পুনরায় তাহার নিকট আসিবার ওয়াদা করিলেন।

এক রাত্রে তিনি কা'ব-এর দুধভ্রাতা আবূ নাইলা (রা)-কে সঙ্গে লইয়া আসিলেন। সে তাহাদিগকে দুর্গের মধ্যে ডাকিয়া নিল এবং সেও (উপর হইতে) তাহাদের নিকট নামিয়া আসিল। তাহার স্ত্রী জিজ্ঞাসা করিল, এই মুহূর্তে তুমি কোথায় বাহির হইতেছ? সে বলিল, এই তো মুহাম্মাদ ইব্‌ন মাসলামা এবং আমার ভাই আবু নাইলা। স্ত্রী বলিল, আমি এই ডাকের মধ্যে রক্তের গন্ধ পাইতেছি। সে বলিল, অভিজাত ব্যক্তিকে রাত্রিবেলা বর্শাবিদ্ধ করিবার জন্য ডাকা হইলেও সে অবশ্যই সাড়া দেয়। মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা) আবূ আক্স ইব্‌ন জাত্র, আল-হারিছ ইব্‌ন আওস ও 'আব্বাদ ইব্‌ন বিশর (রা)-কে সঙ্গে লইয়া প্রবেশ করিলেন। ইন্ন মাসলামা বলিলেন, সে আসিয়া পৌঁছিলে আমি তাহার মাথার চুল ধরিয়া ঝুঁকিতে থাকিব। তোমরা যখন দেখিবে যে, আমি তাহার মাথা শক্ত করিয়া ধরিয়াছি তখনই তোমরা তাহাকে হত্যা করিবে।

কা'ব চাদর পরিহিত অবস্থায় তাহাদের নিকট আসিল এবং তাহার দেহ হইতে সুগন্ধি ছড়াইতেছিল। ইবন মাসলামা (রা) বলেন, আমি আজিকার মত এত উত্তম খোশবু কখনও দেখি নাই। তিনি বলিলেন, তুমি কি আমাকে তোমার মাথার ঘ্রাণ শুঁকিবার অনুমতি দিবে? সে বলিল, হাঁ। অতএব তিনি তাহার মাথার ঘ্রাণ শুঁকিলেন, অতঃপর তাহার সঙ্গীগণকেও শুঁকাইলেন। পুনরায় তিনি বলিলেন, আমাকে পুনর্বার শুঁকিবার অনুমতি দিবে কি? সে বলিল, হাঁ। অতএব তিনি তাহার মাথা শক্ত করিয়া ধরিয়া বলিলেন, এবার আঘাত হানো। অতএব তাহারা তাহাকে হত্যা করিল, অতঃপর মহানবী (স)-এর নিকট উপস্থিত হইয়া তাঁহাকে অবহিত করিলেন" (বুখারী, কিতাবুল মাগাযী, বাব কাতলি কা'ব ইবনিল আশরাফ, নং ৪০৩৭; মুসলিম, জিহাদ, বাব ঐ, নং ৪৬৬৪/১১৯; আবূ দাউদ, জিহাদ, বাব ১৫৭, নং ২৭৬৮)।

সীরাত ও ইতিহাসের গ্রন্থাবলীতে উক্ত ঘটনা কিছুটা বিস্তারিতভাবে বর্ণিত আছে। তদনুসারে মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর সমীপে আরয করিলেন, আমাকে অস্বাভাবিক কিছু বলিবার অনুমতি দিবেন কি? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, হাঁ, তুমি বলিতে পার। ঐতিহাসিকগণ বলেন, এই কথার দ্বারা তাহারা কা'বের সহিত মিথ্যা বাক্যালাপের অনুমতি প্রার্থনা করিয়াছিলেন (নূরুল ইয়াকীন, পৃ. ১২২)। নবী করীম (স) তাহাদিগকে অনুমতি দিলেন। কেননা যুদ্ধে প্রতিপক্ষকে ফাঁকি দেয়া বৈধ (শিবলী নু'মানী, ১খ., পৃ. ২৩৮)।

অতঃপর মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা) কা'ব ইব্‌ন আশরাফের নিকট উপস্থিত হইয়া বলিলেন, আমরা মুহাম্মাদ (স)-কে আশ্রয় দিয়া ভীষণ অসুবিধায় পড়িয়াছি। এই ব্যক্তি আমাদের নিকট সদাকা চাহিতেছে। এখন আমরা অভাবগ্রস্ত হইয়া পড়িয়াছি। সে আমাদিগকে কষ্টের মধ্যে ফেলিয়া দিয়াছে। এই কথা শুনিয়া কা'ব বলিল, আল্লাহ্র কসম! সে তোমাদিগকে আরও দুর্ভোগে ফেলিবে। মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা) বলিলেন, আমরা যেহেতু তাঁহার অনুসারী হইয়াই গিয়াছি, এখন আকস্মিক তাঁহার সঙ্গ ত্যাগ করা সমীচীন মনে করিতেছি না। অপেক্ষা করিয়া দেখি, পরিণামে কি হয়? আমি আপনার নিকট এক ওয়াস্ক বা দুই ওয়াস্ক (এক ওয়াস্ক-১৫০ কেজি) খাদ্য-দ্রব্য ধার চাহিতেছি।

কা'ব বলিল, আমার নিকট কিছু বন্ধক রাখ। মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা) বলিলেন, তুমি কি জিনিস বন্ধক রাখা পছন্দ কর? কা'ব বলিল, তোমাদের স্ত্রীলোকদিগকে আমার নিকট বন্ধক রাখ। ইবন মাসলামা (রা) বলিলেন, তুমি আরবের সর্বাপেক্ষা সুদর্শন পুরুষ। সুতরাং কিভাবে আমাদের স্ত্রীদিগকে তোমার নিকট বন্ধক রাখিতে পারি? সে বলিল, তাহা হইলে তোমাদের পুত্রদিগকে বন্ধক রাখ। ইবন মাসলামা (রা) বলিলেন, এইরূপ করিলে তাহাদিগকে এক বা দুই ওয়াস্ক খাদ্যদ্রব্যের বিনিময়ে বন্ধক রাখা হইয়াছিল বলিয়া গালি দেওয়া হইবে। ইহা আমাদের জন্য খুবই লজ্জাজনক হইবে। আমরা অবশ্য তোমার নিকট অস্ত্র বন্ধক রাখিতে পারি (শারহুল মাওয়াহিবিল লাদুনিয়্যা, ২খ, পৃ. ১৩; আত-তাবাকাতুল কুবরা, ২খ., পৃ. ৩৩-৩৪)। ইহার পর উভয়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত হইল যে, ইবন মাসলামা (রা) অস্ত্র লইয়া তাহার নিকট আসিবেন।

অপরদিকে কা'বের দুধভ্রাতা আবু নাইলা (রা)-ও তাহার নিকট আসিয়া গল্প-গুজব শুরু করিলেন এবং একজন অন্যজনকে কবিতা শুনাইতে লাগিলেন। এক পর্যায়ে আবূ নাইলা (রা) বলিলেন, ভাই কা'ব! বিশেষ প্রয়োজনে আমি তোমার নিকট আসিয়াছি। গোপনীয়তা রক্ষার প্রতিশ্রুতি পাইলে উহা ব্যক্ত করিব। কা'ব বলিল, ঠিক আছে, বল। আবূ নাইলা (রা) বলিলেন, মুহাম্মাদের আগমন আমাদের জন্য পরীক্ষা হইয়া দাঁড়াইয়াছে। সমগ্র আরব বিশ্ব আমাদের শত্রু হইয়া গিয়াছে। আমাদের রাস্তা-ঘাট বন্ধ হইবার উপক্রম হইয়াছে। পরিবার-পরিজন ধ্বংসের মুখামুখী, সন্তান-সন্ততি ভীষণ কষ্টে নিপতিত। আমাদের জীবন দুর্বিসহ হইয়া পড়িয়াছে (সীরাত ইবন হিশাম, ৩খ., পৃ. ১০)।

ইহার পর তিনি মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা)-এর অনুরূপ কিছু আলোচনা করিলেন। বাক্যালাপের মধ্যে আবূ নাইলা (রা) এই কথাও বলিয়াছিলেন, আমার কয়েকজন বন্ধু আছে, যাহারা আমার মতই চিন্তাধারা লালন করে। আমি তাহাদিগকেও তোমার নিকট হাযির করিতে আগ্রহী। তুমি তাহাদের নিকটও কিছু খাদ্য বিক্রয় কর (আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ২৭১)।

মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা ও আবূ নাইলা (রা) নিজ নিজ বাক্যালাপে উদ্দেশ্য সাধনে সফল হইলেন। কেননা ইহার পর সশস্ত্রভাবে তাহাদের আগমনে কা'বের কোন সংশয় থাকিবে না (ইবন হিশাম, ৩খ., পৃ. ১০)।

মুহাম্মাদ ইব্‌ন মাসলামা (রা)-এর নেতৃত্ব এই ক্ষুদ্র বাহিনী তৃতীয় হিজরীর রবীউল আওয়াল মাসের ১৪ তারিখ/ ৩-৪ সেপ্টেম্বর, ৬২৫ খৃ. রাত্রিবেলা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট একত্র হইলেন। নবী করীম (স) 'বাকীউল গার'কাদ' পর্যন্ত তাঁহাদের সহগামী হইয়া বলিলেন, আল্লাহ্ নামে রওয়ানা হও। অতঃপর তিনি তাঁহাদের জন্য আল্লাহ্র নিকট সাহায্য প্রার্থনাপূর্বক গৃহে প্রত্যাবর্তন করিলেন (ইবন হিশাম, ৩খ., পৃ. ১১)।

ইবন মাসলামা (রা)-এর বাহিনী কা'ব ইব্‌ন আশরাফের দুর্গের দ্বারপ্রান্তে আসিয়া পৌঁছিলে আবূ নাইলা (রা) উচ্চস্বরে তাহাকে ডাক দিলেন। সে ছিল সদ্য বিবাহিত। ডাক শুনিয়াই বাহিরে আসিতে উদ্ধত হইলে তাহার স্ত্রী তাহাকে বাধা দিয়া বলিল, তুমি একজন যোদ্ধা, আর যোদ্ধাদের এই সময় বাহিরে যাওয়া সমীচীন নয়। আমি শুনিতে পাইতেছি যে, এই আওয়াজ হইতে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত ঝরিতেছে। অন্য বর্ণনামতে আল্লাহর কসম! আমি তাহার আহ্বানে অনিষ্ট অনুভব করিতেছি।

স্ত্রীর এই আপত্তি শুনিয়া কা'ব বলিল, আগন্তুক তো আমার ভাই মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা এবং দুধভাই আবূ নাইলা। সম্ভ্রান্ত লোককে সশস্ত্র যুদ্ধে যোগদানের আহ্বান জানানো হইলেও সে অবশ্যই সাড়া দেয়। ইহার পর সে বাহিরে আসিল। তাহার দেহ ও মাথা হইতে অপূর্ব সুঘ্রাণ বিকশিত হইতেছিল (ইবন হিশাম, ৩খ., পৃ. ১১)।

আবূ নাইলা (রা) তাঁহার সাথীদিগকে পূর্বেই বলিয়া রাখিয়াছিলেন, সে বাহির হইয়া আসিলে আমি তাহার মাথার চুল ধরিয়া শুঁকিব। তোমরা যখন বুঝিতে পারিবে যে, আমি তাহার মাথা ধরিয়া তাহাকে আমার আয়ত্তে নিয়া আসিয়াছি, সেই সুযোগে তোমরা তাহাকে হত্যা করিবে (সীরাতুল মুসতাফা, ২খ., পৃ. ১৭৮)।

কা'ব তাহাদের নিকট আসিবার পর বেশ কিছুক্ষণ তাহারা বিভিন্ন গল্প-গুজবে মাতিয়া থাকিল। ইহার পর আবূ নাইলা (রা) বলিলেন, হে ইব্‌ন আশরাফ! চল আজুয ঘাঁটি পর্যন্ত যাই। অবশিষ্ট রাত আমরা সেখানেই গল্প করিয়া অতিবাহিত করিব। সে বলিল, তোমাদের যদি ইচ্ছা হয় চল। তাঁহারা কা'বকে সঙ্গে লইয়া হাঁটিতে লাগিল। পথিমধ্যে আবূ নাইলা (রা) তাহাকে বলিলেন, আজিকার মত এত উত্তম সুগন্ধি আমি আর কখনও অনুভব করি নাই। ইহা শুনিয়া কা'বের হৃদয় গর্বে ফুলিয়া উঠিল। সে বলিল, আমার নিকট আরবের সর্বাপেক্ষা অধিক সুগন্ধি ব্যবহারকারিণী রহিয়াছে। আবু নাইলা (রা) বলিলেন, সদয় অনুমতি পাইলে আপনার মাথাটি একটু শুঁকিব। সে বলিল, হাঁ, নিশ্চয়। আবূ নাইলা (রা) তখন কা'বের মাথায় হাত রাখিলেন, অতঃপর তাহার মাথা শুঁকিলেন এবং সঙ্গীদিগকেও শুঁকাইলেন। কিছু দূর অতিক্রম করিবার পর আবু নাইলা বলিলেন, ভাই! আর একবার শুঁকিতে পারি কি? কা'ব ইতিবাচক উত্তর দিলে তিনি আবার তাহার মাথা শুঁকিলেন। ফলে সে নিশ্চিন্ত হইয়া গেল (ইব্‌ন ইসহাক, ৩খ., পৃ. ২২৮)।

কিছুক্ষণ চলিবার পর আবু নাইলা (রা) পুনরায় বলিলেন, ভাই! আর একবার শুঁকিব কি? কা'ب বলিল, হাঁ, শুঁকিতে পার। এইবার আবু নাইলা (রা) তাহার মাথায় হাত রাখিয়া তাহাকে সম্পূর্ণরূপে আয়ত্তে নিয়া আসিলেন এবং সাথীদিগকে বলিলেন, আল্লাহ ও রাসূলের এই শত্রুকে খতম কর। সকলে একযোগে তাহাকে আঘাত করিলেন, কিন্তু তাঁহাদের তরবারির আঘাত পরস্পরের তরবারির উপর পড়িতেছিল। ফলে কোন কাজ হইল না। মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা) বলেন, যখন আমি লক্ষ্য করিলাম, আমাদের তরবারিগুলি কোনই কাজে আসিতেছে না, তখন আমার তরবারিতে রাখা ছুরিটির কথা আমার মনে পড়িল। আমি উহা তাহার নাভীর নিচে পূর্ণ শক্তিতে চাপিয়া ধরিলাম এবং তাহা নাভী ভেদ করিয়া পেটের ভিতর পৌঁছিয়া গেল।

আক্রান্ত হইয়া সে উচ্চস্বরে চিৎকার দিল এবং চর্তুদিকে উহার শব্দ পৌঁছিয়া গেল। এমন কোন দুর্গ বাকী ছিল না যেখানে অগ্নি প্রজ্জ্বলিত করা হয় নাই। কিন্তু উহা আমাদের কোন ক্ষতির কারণ হয় নাই (বিদায়া, ২খ., পৃ. ৮-৯)।

এইভাবে কা'ব নিহত হইল। হারিছ ইব্‌ন আওস ইব্‌ن মু'আয (রা)-ও আহত হইলেন। তাঁহার মাথা কিংবা পায়ে আমাদের তরবারির আঘাত লাগিয়াছিল। ইহার পর আমরা রওয়ানা হইয়া বানু উমায়্যা ইব্‌ন যায়দ, বানু কুরায়যা ও বু'আছ-এর এলাকা অতিক্রম করিয়া হাররাতুল উরায়জে আসিয়া পৌঁছিলাম। আমাদের সঙ্গী হারিছ ইব্‌ন আওস (রা) আহত হওয়ার কারণে পিছনে পড়িয়া গেলেন। আমরা তাহার জন্য কিছুক্ষণ অপেক্ষা করিলে তিনি আমাদের পদচিহ্ন ধরিয়া আমাদের পর্যন্ত আসিয়া পৌঁছিলেন। আমরা তাহাকে সঙ্গে লইয়া পুনরায় যাত্রা করিলাম (ইব্‌ন হিশাম, ৩খ., পৃ. ১১-২২; আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ২৭১)।

রাত্রের শেষাংশে মুসলিম বাহিনী বাকী আল-গারকাদে পৌঁছিয়া এমন জোরে তাকবীর ধ্বনি দিল যে, রাসূলুল্লাহ (স)-ও তাহা শুনিতে পাইলেন। তিনি বুঝিতে পারিলেন যে, কা'ব নিহত হইয়াছে। সুতরাং তিনিও তাকবীর ধ্বনি দিতে লাগিলেন। অতঃপর এই মুসলিম বাহিনী তাঁহার সমীপে উপস্থিত হইলে তিনি বলিলেনঃ افلحت الوجوه )এই চেহারাগুলি সফল থাকুক)। তাঁহারাও বলিলেন, ووجهك يارسول الله )হে আল্লাহ্র রাসূল! আপনার চেহারাও সফলতা লাভ করুক)। তাঁহারা কা'বের কর্তিত মস্তক রাসূলুল্লাহ (স)-এর সামনে রাখিয়া দিলেন। তিনি আল্লাহ তা'আলার প্রশংসা করিলেন (ফাতহুল বারী, ৭খ., পৃ. ২৬২; সীরাতুল মুসতাফা, ২খ., পৃ. ১৭৯; বিদায়া, ২খ., পৃ. ৯)।

অতঃপর মহানবী (স) হারিছ ইব্‌ن আওস (রা)-এর ক্ষত স্থানে নিজ মুখ নিঃসৃত লালা লাগাইয়া দিলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে তিনি আরোগ্য লাভ করিলেন।

ইব্‌ন আশরাফের নিহত হওয়ার পর কা'ب ইবন মালিক (রা) নিম্নোক্ত কবিতা আবৃত্তি করেন:

فغودر منهم كعب صريعا + فذلت بعد مصرعه النضير على الكفين ثم وقد علته + بأيدينا مشهورة ذكور بأمر محمد إذ دس ليلا + الى كعب اخا كعب يسير فما كره فأنزله بمكر + ومحمود أخو ثقة جسور

"অবশেষে তাহাদের মধ্যকার কা'بকে ধরাশায়ী করা হইল এবং তাহার ধরাশায়ী হওয়ার পর বনূ নাযীর অপদস্ত হইল।
সে তথায় তাহার দুই হাতের উপর পড়িয়াছিল এবং আমাদের হাতের তীক্ষ্ণ তরবারি তাহাকে আঘাত করিয়াছিল।
যখন মুহাম্মাদ (স)-এর আদেশক্রমে বনূ কা'বের জনৈক ব্যক্তি রাত্রের অন্ধকারে গোপনে কা'বের দিকে যাইতেছিল। সে কৌশলে তাহাকে ঘর হইতে বাহির করিয়া আনিল। আত্মনির্ভরশীল ও সাহসী ব্যক্তি প্রশংসার উপযুক্ত হইয়া থাকে” (ইব্‌ن হিশাম, ৩খ., পৃ. ১২)।
সকালবেলা ইয়াহুদীদের নিকট কা'ب ইব্‌ن আশরাফের নিহত হওয়ার সংবাদ প্রচারিত হইলে তাহাদের শঠতাপূর্ণ অন্তরে ভীতি, আতংক ও ত্রাসের সৃষ্টি হইল। তাহারা বুঝিতে পারিল যে, রাসূলুল্লাহ (স) যখন অনুধাবন করিবেন যে, শান্তি ভঙ্গকারী, বিপর্যয় ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী এবং প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারীদিগকে উপদেশ দিয়া কোন ফলোদয় হইতেছে না তখন তিনি তাহাদের উপর শক্তি প্রয়োগ করিতেও দ্বিধাবোধ করিবেন না। এইজন্যই ইয়াহুদীগণ তাহাদের স্বগোত্রীয় এই নেতার নিহত হওয়ার প্রতিবাদে কোন কিছু করিবার সাহস পায় নাই। তাহারা একেবারে নীরব হইয়া গেল। তাহারা পুনরায় মুসলমানদিগকে অঙ্গীকার পূরণের প্রতিশ্রুতি প্রদান করিল। প্রত্যেক ইয়াহুদী নিজ নিজ জীবনের আশংকা করিতে লাগিল। তাহারা ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধাচরণের সাহস সম্পূর্ণরূপে হারাইয়া ফেলিল (ইবন ইসহাক, ৩খ., পৃ. ২২৯; ইব্‌ن হিশাম, ৩খ., পৃ. ১২)। যেহেতু এই অভিযানে মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা) নেতৃত্ব দিয়াছিলেন, তাই ইহা সারিয়‍্যা মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা নামে অভিহিত হইয়াছে।
কা'ব ইব্‌ن আশরাফের এই হত্যাকাণ্ড ইসলামের ইতিহাসে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। রাসূলুল্লাহ (স) মদীনার বিরুদ্ধে বহিরাক্রমণের মুকাবিলা করিবার অপূর্ব সুযোগ লাভ করিলেন এবং মুসলমানগণ অভ্যন্তরীণ গোলযোগ হইতে অনেকাংশে নিরাপদ হইয়া ইসলামের প্রচার ও প্রসারে আত্মনিয়োগ করিলেন। ক্রমান্বয়ে ইসলামের অগ্রযাত্রা সুগম ও প্রসারিত হইল। বিরুদ্ধবাদীদের শক্তি ও সাহস দুর্বল হইয়া পড়িল। বিশেষত ইয়াহুদীদের ইসলাম বিরোধী অপতৎপরতা হ্রাস পাইল।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00