📄 ঘটনাস্থল
অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে গাযওয়া বানু সুলায়ম সংঘটিত হইয়াছিল মদীনার পূর্ববর্তী অঞ্চলসমূহের অন্তর্গত বানু সুলায়ম এলাকার কুদর নামক একটি স্থানে। কুদ্র (الكدر - ك বর্ণটি পেশবিশিষ্ট) প্রকৃতপক্ষে ধূসর রঙের একটি পাখি। কিন্তু এই ক্ষেত্রে বানু সুলায়ম গোত্রের একটি রূপকে বুঝানো হইয়াছে। মক্কা হইতে সিরিয়া যাওয়ার বাণিজ্যিক পথে উহা অবস্থিত (দ্র. আর-রাহীক, পৃ. ২৩৮)। স্থানটিকে কুদ্র বলা হয় এইজন্য যে, কথিত আছে, ঐস্থানে ঐ পাখির বাস ছিল, সেই নামেই স্থানটির নামকরণ করা হইয়াছে (দ্র. মুহাম্মাদ আলী, সীরাতে মুহাম্মাদীয়া)। ইহা ছাড়া নির্ভরযোগ্য অন্যান্য সব বর্ণনার মধ্যে ঘটনাস্থলের নাম কারকারাতুল কুদ্র বা কারারাতুল কুদ্র বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে। কারকারাতুল কুদ্র-এর বর্ণনা প্রসঙ্গে ওয়াকিদী বলেন, উহা মা'দানে বানু সুলায়ম (معدن بنی سلیم)-এর দিকের আরহাদিয়া (ارحضية) নামক স্থানের নিকটবর্তী একটি স্থান, মদীনা এবং উহার মধ্যে প্রায় ৯৬ মাইলের দূরত্ব (ثمانية برد) (দ্র. ইমাম শিহাবুদ্দীন, মু'জামুল বুলদান, ৫খ, ৪৪২)। কেহ কেহ উহাকে বীরে মা'ঊনা (بئر معونة) এর নিকটবর্তী স্থান বলিয়াও উল্লেখ করিয়াছেন (দ্র. প্রাগুক্ত, ১খ., পৃ. ১৪৪)।
📄 গাযওয়ার বিবরণ
মাহমূদ শাকের বলেন যে, আবওয়া অভিযান সমাপ্ত হওয়ার কয়েক দিন পরই এই গাযওয়া সংঘটিত হইয়াছিল। রাসূলুল্লাহ (স)-কে ওহীর মাধ্যমে জানানো হইয়াছিল যে, কুরায়শদের একটি বাণিজ্যিক কাফেলা সিরিয়া হইতে মক্কায় ফিরিয়া যাইতেছে। মহানবী (স) তখন দুই শত সৈন্যের এক বাহিনী লইয়া ঐ কাফেলার পথরোধ করার উদ্দেশ্যে মদীনা হইতে বাহির হইলেন। ইন্ন কাছীরের বর্ণনানুযায়ী, এই সময় রাসূলুল্লাহ (স) সাইব ইব্ন উছমান ইবন মাজ'ঊন (রা)-কে মদীনায় তাঁহার প্রতিনিধি নিযুক্ত করিয়া যান। তবে ওয়াকিদীর বর্ণনায় এই ক্ষেত্রে সা'দ ইব্ন মু'আয (রা)-এর নাম উল্লেখ করা হইয়াছে। এই অভিযানে হযরত 'আলী (রা)-এর হস্তে পতাকা ছিল এবং পতাকার রং ছিল সাদা। যাত্রার এক পর্যায়ে তিনি বানু সুলায়মের কুন্দ্র নামক স্থানে পৌঁছিলেন। স্থানটি একটি সমতল ভূমি। ওয়াকিদী বলেন, তথায় রাসূলুল্লাহ (স) উটের এবং উট চলাচলের চিহ্ন পাইলেন, কিন্তু ঘটনাস্থলে কাহাকেও পাইলেন না। মাহমূদ শাকির বলেন, শত্রুরা অতর্কিত হামলা বুঝিতে পারিয়া পালাইয়া গেল। কারণ তাহারা এই আকস্মিক হামলার জন্য প্রস্তুত ছিল না। যাইবার সময় তাহারা উপত্যকার মাঝে ৫০০ উট রাখিয়া ঘায় যাহা রাসূলুল্লাহ (স) গনীমত হিসাবে লাভ করেন। অপর বর্ণনায় ইব্ন খালদুন তাঁহার তারীখে বলেন, বানূ সুলায়মের লোকজনকে ঘটনাস্থলে না পাইয়া রাসূলুল্লাহ (স) গালিব ইব্ন আবদুল্লাহ্ আল-লায়ছীর নেতৃত্বে একটি সারিয়্যা পাঠান। উক্ত সারিয়্যা শত্রুদের পরিত্যক্ত বহু সংখ্যক উট গনীমত হিসাবে লাভ করিয়া লইয়া আসে। ঐ গনীমতের মালের মধ্যে ইয়াসার নামক একটি গোলামও ছিল। ইবন সা'দ এবং ওয়াকিদীর বর্ণনায় গনীমত লাভের প্রসঙ্গটি এইভাবে বলা হইয়াছে যে, যখন রাসূলুল্লাহ (স) ঘটনাস্থলে পৌঁছিয়া কাহাকেও পাইলেন না তখন তাঁহার কয়েকজন সাহাবীকে উপত্যকার ঊর্ধ্ব দিকে পাঠাইলেন এবং তিনি স্বয়ং তাহাদের প্রতি লক্ষ্য রাখিয়া উপত্যকার মধ্যভাগ পর্যন্ত অগ্রসর হইয়া গেলেন। সেখানে তিনি কতিপয় রাখালকে পাইলেন যাহাদের মধ্যে একটি ছেলের নাম ছিল ইয়াসার। রাসূলুল্লাহ (স) তাহার নিকট লোকজন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিলে ইয়াসার বলিল, তাহাদের সম্পর্কে আমার জানা নাই, আমরা উট চরানোর জন্য বিদেশী রাখাল মাত্র। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) উটগুলি গ্রহণ করিয়া ফিরিয়া আসিলেন। অধিকাংশ সীরাতের কিতাবে এই অভিযানে কোন রূপ যুদ্ধ সংঘটিত না হওয়ার কথা বলা হইলেও ইবনুল আছীর উল্লেখ করিয়াছেন যে, রাসূল্লাহ (স) কুদর নামক স্থানে পৌছিয়া গালিব ইবন আবদুল্লাহর নেতৃত্বে যে সারিয়্যাটি বানু সুলায়ম ও গাতাফানের বিরুদ্ধে পাঠাইয়াছিলেন তাহাদের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং তাহাতে তিনজন মুসলমান শহীদ হন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) বানু সুলায়মে তিন দিন অবস্থান করিলেন, কাহারও মতে দশ দিন। অতঃপর তিনি গনীমতের মালসহ মদীনা অভিমুখে রওয়ানা হইলেন। যখন তিনি মদীনা হইতে তিন মাইল দূরবর্তী সিরার (صرار) নামক স্থানে পৌঁছিছিলেন তখন গনীমতের মাল বণ্টন করিয়া দিলেন। ইবন সা'দ বলেন, যখন রাসূলুল্লাহ (স) সিরার নামক স্থানে পৌঁছিলেন তখন সৈন্যরা বলিলেন যে, এই উটগুলি একসাথে চালাইয়া যাওয়া আমাদের জন্য খুব কঠিন হইতেছে। যদি প্রত্যেকের অংশ হিসাবমত তাহাকে দিয়া দেওয়া হয়, তবে তাহা চালাইয়া যাওয়া সকলের জন্য সহজ হইবে। তখন রাসূলুল্লাহ (স) এক-পঞ্চমাংশ বাহির করিয়া লইয়া বাকী চার-পঞ্চমাংশ সৈন্যদের মধ্যে বণ্টন করিয়া দিলেন। ইহাতে প্রত্যেকেই দুইটি করিয়া উট পাইয়াছিলেন। যেহেতু মোট উটের সংখ্যা ছিল পাঁচ শত। ওয়াকিদীর বর্ণনায় উটের সংখ্যা অনেক বেশী। তাঁহার বর্ণনামতে প্রত্যেক ব্যক্তি ৭টি করিয়া উট পাইয়াছিল। গনীমতের মধ্যে ইয়াসার নামক যে গোলামটি ছিল সে নামাযী হওয়ায় সাহাবীরা তাহাকে নবী কারীম (স) কর্তৃক গ্রহণ করিবার জন্য আবেদন জানাইলে তিনি তাহাকে গ্রহণ করিয়া আযাদ করিয়া দিলেন। অবশেষে মদীনা হইতে বাহির হইবার পর পনের দিন অতিবাহিত করিয়া রাসূলুল্লাহ (স) মদীনায় ফিরিয়া আসেন। গাযওয়া বানু সুলায়ম সম্পর্কে প্রায় সকল ঐতিহাসিক উপরিউক্ত ঘটনার বর্ণনা দিয়াছেন, কিন্তু ইবন সা'দ তাঁহার তাবাকাতে গাযওয়া বানু সুলায়ম শিরোনামে যে ঘটনার বিবরণ উল্লেখ করিয়াছেন তাহা উপরিউক্ত গাযওয়া বানু সুলায়মের ঘটনার বিবরণ নয়, বরং তাঁহার "গাযওয়া বানু সুলায়ম" শিরোনামে বর্ণিত ঘটনাটি অন্যান্য ঐতিহাসিক "গাযওয়া বুহরান” শিরোনামে বর্ণনা করিয়াছেন, যাহা একটি ভিন্ন গাযওয়া এবং তাহা ছিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর ১২তম গাযওয়া। অর্থাৎ ইবন সা'দ "গাযওয়া বানু সুলায়ম” শিরোনাম দিয়া উল্লেখ করিয়াছেন যে, রাসূলুল্লাহ (স)-এর গাযওয়া বানু সুলায়ম ২৪ জুমাদাল উলা "বুহরান” নামক স্থানে সংঘটিত হয়। ইহার কারণ এই ছিল যে, রাসূলুল্লাহ (স) উক্ত স্থানে সুলায়ম গোত্রের লোকদের একত্র হওয়ার সংবাদ পাইয়াছিলেন। ফলে তিনি তিন শত সৈন্য লইয়া ইন্ন উম্মে মাকতুম (র)-কে প্রতিনিধি হিসাবে রাখিয়া মদীনা হইতে বাহির হইয়া পড়িলেন। অপরদিকে অন্যান্য ঐতিহাসিকের বর্ণনামুযায়ী, “গাযওয়া বানু সুলায়ম" শিরোনামের বক্ষমাণ আলোচনাকে ইবন সা'দ "গাযওয়া কারকারাতিল কুদ্র" নামে আলোচনা করিয়াছেন। এমতাবস্থায় উভয় বর্ণনার সামঞ্জস্য বিধানে আমরা এই কথা বলিতে পারি যে, গাযওয়া বানু সুলায়ম সম্পর্কে প্রায় সকল ঐতিহাসিক উপরিউক্ত বর্ণনা দিলেও ইবন সা'দ তাঁহার তাবাকাতে গাযওয়া বানু সুলায়ম শিরোনামে যে গাযওয়ার বিবরণ দিয়াছেন তাহা সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি ঘটনার বিবরণ। অর্থাৎ তিনি গাযওয়া বানু সুলায়মের বর্ণনায় উল্লেখ করিয়াছেন যে, উহা ২৪ জুমাদাল উলা বুহরান নামক স্থানে সংঘটিত হয়। ইবন সা'দ বর্ণিত গাযওয়া বানু সুলায়ম-এর এই বর্ণনা অন্যান্য সীরাতের কিতাবে "গাযওয়া বুহরান" শিরোনামে উল্লিখিত হইয়াছে। অবশ্য অধিকাংশ ঐতিহাসিকের বর্ণিত গাযওয়া বানু সুলায়ম এবং ইবন সা'দের বর্ণিত গাযওয়া বানু সুলায়ম একই নামের হইলেও মূলত পৃথক দুইটি গাযওয়া, দুইটি পৃথক স্থানে সংঘটিত হওয়ার কারণে কেহ গাযওয়ার নামকরণে স্থানের নামের প্রতি গুরুত্ব দিয়াছেন। এই হিসাবে গাযওয়া দুইটির শিরোনামে ভিন্নতা সাধিত হইয়াছে। যথা গাযওয়া কারকারাতিল কুদ্র এবং গাযওয়া বুহরান। কিন্তু স্থান দুইটি একই অঞ্চল অর্থাৎ বানু সুলায়ম অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ার কারণে এতদুভয়ের নামকরণে অঞ্চলের নামের অনুসরণ করাতেও কোন ত্রুটি নাই বিধায় উভয় গাযওয়াই গাযওয়া বানু সুলায়ম শিরোনামে আখ্যায়িত হইতে পারে। এইজন্যই ঐতিহাসিক ভেদে উভয় গাযওয়াই গাযওয়া বানু সুলায়ম নামে আখ্যায়িত হইয়াছে। তবে এই কথা সত্য যে, অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে গাযওয়া কুদ্র বা গাযওয়া কারকারাতুল কুদ্রই গাযওয়া বানু সুলায়ম নামে প্রসিদ্ধ।
📄 গাযওয়ার ফলাফল
গাযওয়া বানু সুলায়ম রাসূলুল্লাহ (স)-এর গাযওয়াসমূহের মধ্যে অত্যন্ত স্বল্প পরিসরের একটি গাযওয়া। এই গাযওয়ায় পূর্বেই বর্ণিত হইয়াছে যে, মুসলমান এবং কাফির সৈন্যদের মাঝে কোন যুদ্ধ সংঘটিত হয় নাই। কেবল গালিব ইব্ন আবদুল্লাহর নেতৃত্বে পাঠানো সারিয়ার ব্যাপারে কিছুটা সংঘর্ষের কথা জানা যায়। তাহারা পালাইয়া যাওয়ায় মুসলিমগণ বিপুল পরিমাণে গনীমত পাইয়া আর্থিক দিক দিয়া লাভবান হন। তাহা ছাড়া রাসূলুল্লাহ (স)- এর আক্রমণাত্মক পদক্ষেপে মদীনা দুশমনদের হাত হইতে রক্ষা পায়। তবে রাসূলুল্লাহ (স)-এর এই আকস্মিক হামলায় কাফিররা ইতস্তত বিক্ষিপ্ত হইয়া গেলেও বদr যুদ্ধের কারণে তাহাদের অন্তরে যে জ্বালা আরম্ভ হইয়াছিল উহা প্রশমিত হইতে পারে নাই, বরং সেই সঞ্চিত জ্বালারই প্রকাশ পরবর্তীতে বহু যুদ্ধে ঘটিয়াছিল।