📄 পরিচিতি
গাযওয়া বানু সুলায়ম রাসূলুল্লাহ (স)-এর জীবনের ২৮টি গাযওয়ার মধ্যে ৮ম গাযওয়া (দ্র. মুহাম্মদ ইয়াসীন মাজহার সিদ্দীকী, রাসূল মুহাম্মদ (স)-এর সরকার কাঠামো, ইফাবা, ১সং, ঢাকা, ১৯৯৪ খৃ. পৃ. ১৫৩)। বদর এবং উহুদ যুদ্ধের মাঝে যে কতিপয় স্বল্প পরিসরের যুদ্ধ সংঘটিত হয় তাহার একটি হইল গাযওয়া বানু সুলায়ম। সুলায়ম গোত্রের নামানুসারে এই গাযওয়ার নামকরণ করা হইয়াছে। বানু সুলায়ম মদীনার চার মাইল পূর্বে অবস্থিত একটি গোত্র (দ্র. মুহাম্মাদ সফীউর রহমান, আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ২৩৭)। মদীনার পূর্বাঞ্চলীয় গোত্রসমূহের মধ্যে প্রধান প্রধান গোত্রগুলি ছিল গাত্রফান, আসাদ, সুলায়ম, হাওয়াযিন, আশজা', তায়ী, কায়স আয়লান প্রভৃতি। তন্মধ্যে বানু সুলায়ম মূলত গাতাফানের অন্যতম শাখাগোত্র। প্রকৃতপক্ষে মদীনার নিকটবর্তী অঞ্চল হিসাবে উহার পূর্বাঞ্চলীয় গোত্রগুলি প্রথম হইতেই ইসলামের ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে আসা সত্ত্বেও ঐ সকল গোত্রের প্রায় সকলে দীর্ঘকাল যাবত মহানবী (স) এবং তাঁহার ইসলাম প্রচারের তীব্র বিরোধিতা করিয়াছিল। ৬২২ খৃ. মদীনায় হিজরতের পরপরই এই বিরোধিতা শুরু হয় এবং ৬৩০ খৃ.-এর গোড়ার দিক পর্যন্ত তাহা অব্যাহত থাকে। মহানবী (স) -এর ছোট-বড় অভিযানগুলির একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে, প্রায় ৯০টি অভিযানের মধ্যে ২৮টিই মদীনার পূর্বাঞ্চীলয় গোত্রগুলীর বিরুদ্ধে পরিচালিত হয় (মুহাম্মদ (স)- এর সরকার কাঠামো, পৃ. ৬০)। সীরাতের কিতাবসমূহে এই গাযওয়াকে একাধিক নামে অভিহিত করা হইয়াছে। সীরাতের প্রসিদ্ধ কিতাবসমূহের মধ্যে ইবন কাছীর তাঁহার আল-ফুসুল ফী সীরাতির রাসূল, মাহমূদ শাকির তাঁহার আত-তারীখুল ইসলামী, সফীউর রহমান তাঁহার আর-রাহীকুল মাখতুম, মুহাম্মাদ রিদা তাঁহার মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ প্রভৃতি কিতাবে বানু সুলায়ম গোত্রের নামানুসারে এই গাযওয়াকে গাযওয়া বানু সুলায়ম নামে অভিহিত করা হইয়াছে। তবে ইবন সা'দ তাঁহার তাবাকাতে বানু সুলায়ম শিরোনামে একটি গাযওয়ার বিবরণ দিয়াছেন, কিন্তু তাঁহার বর্ণিত ঘটনার সহিত প্রসিদ্ধ ও প্রকৃত ঘটনার ভিন্নতা রহিয়াছে। আলোচ্য প্রবন্ধের গাযওয়ার বিবরণ-স্থলে এই সম্পর্কে আলোচনা করা হইবে। সীরাতের অন্যান্য কিতাবে এই গাযওয়ার আরও একাধিক নাম পাওয়া যায়। যেমন (ক) গাযওয়া কারকারাতি আল-কুদর (দ্র. ইবনুল আছীর, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ১সং., ২খ., পৃ. ৩৫; ইবন সা'দ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, ২খ., পৃ. ৩১)।
📄 গাযওয়ার তারিখ
(খ) গাযওয়া কুদর (দ্র. ইব্ন খালদুন, আত-তারীখ, ২খ, (অবশিষ্টাংশ), পৃ. ২২; ওয়াকিদী, কিতাবুল মাগাযী, ১খ., পৃ. ১৮২)। মূল ঘটনার অঞ্চল এবং স্থানের নামের ভিন্নতার কারণেই গাযওয়ার নামে এই ভিন্নতা সৃষ্টি হইয়াছে। যেহেতু ঘটনাঞ্চলটি বানু সুলায়ম, তদনুসারে উহার নাম গাযওয়া বানু সুলায়ম এবং ঘটনাস্থলের নাম কারকারাতুল কুদর বা কারারাতুল কুদর অথবা শুধু কুদর, সেই অনুযায়ী গাযওয়ার নাম বিভিন্ন হইয়াছে। গাযওয়া বানু সুলায়মের তারিখের ব্যাপারে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতপার্থক্য রহিয়াছে। তবে প্রসিদ্ধ যে মতগুলি পাওয়া যায় তাহা হইল: (ক) বদরের যুদ্ধের ৭ দিন পরে ২য় হিজরীতে (দ্র. ইব্ন কাছীর, আল-ফুসুল ফী সীরাতির রাসূল, ২ খ., পৃ. ১৪০)। (খ) পহেলা শাওয়াল রাসূলুল্লাহ (স) ঈদের নামায সমাপনান্তে (দ্র. মুহাম্মাদ 'আলী, সীরাতে মুহাম্মাদীয়া; আল-মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়া, ১ খ., পৃ. ৩৪২)। (গ) শাওয়ালের প্রথম দিকে (দ্র. প্রাগুক্ত)। (ঘ) ১১ মুহাররম, তৃতীয় হিজরী (ইমাম শিহাবুদ্দীন, মু'জামুল বুলদান, ৫খ., পৃ. ৪৪২)। (ঙ) ইবন সা'দ তাঁহার আত-তাবাকাতে উল্লেখ করিয়াছেন ১৫ মুহাররম তৃতীয় হিজরী (দ্র. আত-তাবাকাত, ২ খ., পৃ. ৩১)। এইখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, ইবন সা'দ গাযওয়া বানু সুলায়ম (তাঁহার শিরোনামানুসারে গাযওয়া কারকারাতিল কুদর)-কে অন্যান্য সকল ঐতিহাসিক হইতে ভিন্নভাবে গাযওয়া বানু কায়নুকা এবং গাযওয়া সাবীক- এর পরে উল্লেখ করিয়াছেন। গাযওয়া বানু কায়নুকা সংঘটিত হইয়াছিল হিজরতের ২০ মাস পর ১৫ শাওয়াল শনিবার এবং গাযওয়া সাবীক হিজরতের ২২ মাস পর ২৫ যিলহজ্জ রবিবার (দ্র. আত-তাবাকাত, ২খ., পৃ. ৩১)। সুতরাং ইবন সা'দের বর্ণনা দ্বারা স্পষ্টভাবেই প্রতীয়মান হয় যে, গাযওয়া বানু সুলায়ম বা গাযওয়া কারকারাতুল কুদ্র, গাযওয়া বানু কায়নুকা এবং গাযওয়া সাবীক-এর পরে সংঘটিত হইয়াছিল। তবে অন্যান্য ঐতিহাসিক এই মতের সমর্থক নহেন, বরং সফীউর রহমান তাঁহার কিতাবে সুস্পষ্টভাবেই উল্লেখ করিয়াছেন যে, বদরের যুদ্ধের পর মদীনার তথ্যবিভাগ সর্বপ্রথম যে সংবাদ সংগ্রহ করে তাহা হইল, "বানু সুলায়ম এবং গাতাফান গোত্রের লোকেরা মদীনায় হামলা করিবার জন্য সৈন্য সমাবেশ করিয়াছে" (দ্র. সফীউর রহমান, আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ২৬০)।
📄 গাযওয়ার প্রেক্ষাপট
এমনিতেই দীন ইসলামের আবির্ভাবই যেন বজ্ররূপে পতিত হইয়াছিল পথভ্রষ্ট, ধর্মভ্রান্ত, মূর্তিপূজারী, মুশরিক, অন্ধ ও সত্য বিবর্জিত আরবীয় জনগোষ্ঠীর উপর। তাহার উপর আবার এই সত্য দীনের ক্রমবর্ধমান উন্নতি দেখিয়া হিংসায় উন্মত্ত হইয়া উঠিয়াছিল গোটা আরব। প্রতিরোধ স্পৃহায় মাতিয়া এই দীনকে সমূলে ধ্বংস করিবার পরিকল্পনা মাথায় লইয়া একবার হযরতকে হত্যার পদক্ষেপ গ্রহণ করিয়া মদীনায় হিজরতের পথ উন্মোচন করিয়াছে। মদীনা হিজরত সত্য দীনের উন্নতির ধারাকে আরও বেগবান করিলে মক্কাবাসী হিংসুকদের অন্তর্জালা অদম্য হইয়া ওঠে। ফলে তাহারা বদর যুদ্ধের পরিকল্পনা হাতে নেয় ইসলাম ও মুসলিমদেরকে ধুলায় লুটাইয়া দিতে। সৈন্য, শক্তি ও সরঞ্জামের প্রাচুর্য থাকা সত্ত্বেও এই যাত্রায়ও তাহারা কোন সুফল লাভ করিতে পারে নাই, বরং পরাজয়ের গ্লানি লইয়া বিমূঢ় হইয়া ছিটকাইয়া পড়িতে বাধ্য হইয়াছিল শক্তির দম্ভে উদভ্রান্ত আরব জাতি। জনবল ও ধনবল হারানোর পরিণাম লইয়া প্রত্যেকে নিজ ভূমিতে পালাইয়া কোন রকমে জান- মান বাঁচাইতে চেষ্টা করিল। কিন্তু এই পরাজয়ও তাহাদিগকে দমাইয়া সত্য দীনের প্রতি অবনমিত করাইতে পারে নাই। ক্ষোভে-জিদে উত্তেজিত হইয়া মুশরিক-ইয়াহুদী সমবেতভাবে এক প্রতিশোধ স্পৃহায় অস্থির হইয়া উঠিয়াছিল। এই সম্পর্কে আল্লাহ পাক বলেন, "অবশ্য মু'মিনদের প্রতি শত্রুতায় মানুষের মধ্যে ইয়াহুদী ও মুশরিকদিগকেই তুমি সর্বাধিক উগ্র দেখিবে" (৫: ৮২)। এক্ষেত্রে মক্কার মুশরিকরা হইল বদরের যুদ্ধে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত, ইয়াহুদীরা ছিল নিজেদের ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক অস্তিত্ব বিপন্ন হওয়ার আশংকাগ্রস্ত (দ্র. আর-রাহীক, পৃ. ২৩৭)। ইহা ছাড়া বানু সুলায়ম এবং গাতাফানসহ কতিপয় অঞ্চল ছিল মক্কায় বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার স্বীকার। ইহারা মক্কা কেন্দ্রিক ব্যবসায়িক কায়কারবার দ্বারা উপকৃত হইত (দ্র. মহানবী (স)-এর জীবনী বিশ্বকোষ, পৃ. ৪২৫)। তাহারা প্রতিশোধ গ্রহণের হুমকি দিতে লাগিল এবং হুমকির পাশাপাশি যুদ্ধ প্রস্তুতিও শুরু করিল। এমনি এক পরিস্থিতিতে সর্বপ্রথম যে সংবাদ রাসূলুল্লাহ (স)- এর নিকট পৌঁছিল তাহা হইল, প্রতিশ্রুতিবদ্ধভাবে যুদ্ধের প্রস্তুতি লইয়া বানু সুলায়ম ও গাতাফানের কুদর নামক স্থানে সমবেত হওয়া। এই সংবাদের ভিত্তিতে তাহাদের হামলার পূর্বেই হামলা করিয়া তাহাদিগকে সূচনাতেই দমাইয়া দিবার পরিকল্পনা লইয়া রাসূলুল্লাহ (স) গাযওয়া বানু সুলায়মের কর্মসূচী হাতে নেন (দ্র. ওয়াকিদী, কিতাবুল মাগাযী, পৃ. ১৮২; অনুরূপ বর্ণনার জন্য আরও দ্র. আর-রাহীক, পৃ. ২৬০; আত-তাবাকাত, পৃ. ২৬৫; ইব্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ৪১৪)।
📄 ঘটনাস্থল
অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে গাযওয়া বানু সুলায়ম সংঘটিত হইয়াছিল মদীনার পূর্ববর্তী অঞ্চলসমূহের অন্তর্গত বানু সুলায়ম এলাকার কুদর নামক একটি স্থানে। কুদ্র (الكدر - ك বর্ণটি পেশবিশিষ্ট) প্রকৃতপক্ষে ধূসর রঙের একটি পাখি। কিন্তু এই ক্ষেত্রে বানু সুলায়ম গোত্রের একটি রূপকে বুঝানো হইয়াছে। মক্কা হইতে সিরিয়া যাওয়ার বাণিজ্যিক পথে উহা অবস্থিত (দ্র. আর-রাহীক, পৃ. ২৩৮)। স্থানটিকে কুদ্র বলা হয় এইজন্য যে, কথিত আছে, ঐস্থানে ঐ পাখির বাস ছিল, সেই নামেই স্থানটির নামকরণ করা হইয়াছে (দ্র. মুহাম্মাদ আলী, সীরাতে মুহাম্মাদীয়া)। ইহা ছাড়া নির্ভরযোগ্য অন্যান্য সব বর্ণনার মধ্যে ঘটনাস্থলের নাম কারকারাতুল কুদ্র বা কারারাতুল কুদ্র বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে। কারকারাতুল কুদ্র-এর বর্ণনা প্রসঙ্গে ওয়াকিদী বলেন, উহা মা'দানে বানু সুলায়ম (معدن بنی سلیم)-এর দিকের আরহাদিয়া (ارحضية) নামক স্থানের নিকটবর্তী একটি স্থান, মদীনা এবং উহার মধ্যে প্রায় ৯৬ মাইলের দূরত্ব (ثمانية برد) (দ্র. ইমাম শিহাবুদ্দীন, মু'জামুল বুলদান, ৫খ, ৪৪২)। কেহ কেহ উহাকে বীরে মা'ঊনা (بئر معونة) এর নিকটবর্তী স্থান বলিয়াও উল্লেখ করিয়াছেন (দ্র. প্রাগুক্ত, ১খ., পৃ. ১৪৪)।