📄 বন্দীদের মদীনায় উপস্থিতি
অতঃপর মদীনায় পৌছিবার একদিন পর ২৩ রামাদান বন্দীদের মদীনায় আনয়ন করা হয়। তাহারা যখন মদীনা পৌঁছিল তখন উম্মুল মুমিনীন সাওদা বিন্ত যাম্'আ (রা) আফরা পরিবারের নিকট ছিলেন। তাহারা আওফ ও মুআওবিয ইব্ন আফরার শাহাদাতে মাতম করিতেছিল। ইহা ছিল পর্দার বিধান নাযিল হওয়ার পূর্বের ঘটনা। সাওদা (রা) বলেন, আল্লাহ্র কসম! আমি তাহাদের নিকট থাকিতেই সংবাদ পাইলাম যে, বন্দীদিগকে আনা হইয়াছে। আমি আমার ঘরে ফিরিয়া আসিলাম, রাসূলুল্লাহ (স) সেখানে ছিলেন। আমি আসিয়াই দেখিলাম, আবূ ইয়াযীদ সুহায়ল ইব্ন আমর হুজরা প্রাঙ্গণে উভয় হাত গলার সহিত রশি দ্বারা বাঁধা অবস্থায় রহিয়াছে। আবূ ইয়াযীদকে এই অবস্থায় দেখিয়া আমি আমার নফসকে সংবরণ করিতে পারিলাম না। বলিলাম, হে আবূ ইয়াযীদ! তোমাদিগকে হাত দেওয়া হইয়াছে, তোমরা কি সম্মানিত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করিতে পার না? আল্লাহ্র কসম! তখন গৃহের অভ্যন্তর হইতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর বাণীই আমার সম্বিত ফিরাইয়া দিল। তিনি বলিলেন, হে সাওদা! আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলের সিদ্ধান্তের উপর তুমি কি তাহাদিগকে অনুপ্রাণিত করিতেছ? আমি বলিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! সেই সত্তার কসম যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করিয়াছেন! আমি আবূ ইয়াযীদকে তাহার হস্তদ্বয় গলার সহিত বাঁধা অবস্থায় দেখিয়া আর নিজেকে সম্বরণ করিতে পারি নাই, তাই যাহা ইচ্ছা বলিয়া ফেলিয়াছি (আত-তাবারী, তারীখ, ২খ., পৃ. ৪৬০; ইব্ন হিশাম, আস-সীরা, ২খ., পৃ. ২৮৬-৮৭)। এক বর্ণনায় ইহাও আছে যে, তিনি বলিয়াছিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করুন (ইউসুফ সালিহী আশ-শামী, প্রাগুক্ত, ৪খ., পৃ. ৬৫)। আবূ ইয়াযীদ সুহায়ল ইব্ন আমরকে দেখিয়া উসামা ইব্ন যায়দ (রা) বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এই ব্যক্তি লোকজনকে ছারীদ (গোশতের ঝোল মিশ্রিত রুটি) আহার করাইত। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, এই আবূ ইয়াযীদ লোকজনকে খাদ্য প্রদান করিত ঠিকই, কিন্তু আল্লাহর নূর নির্বাপিত করার চেষ্টাও করিয়াছিল। তাই আল্লাহ তাহাকে পাকড়াও করাইয়াছেন (প্রাগুক্ত, ৪খ., পৃ. ৬৫-৬৬)।
📄 বন্দীদের সহিত সদ্ব্যবহার
বন্দীগণ মদীনায় পৌছিবার পর রাসূলুল্লাহ (স) সঙ্গীদের হইতে তাহাদিগকে পৃথক করিয়া দিলেন এবং সকলকে নির্দেশ দিলেন বন্দীদের সহিত সদ্ব্যবহার করিতে। মদীনার প্রথম দাঈ ও মু'আল্লিম মুস'আব ইবন উমায়র (রা)-এর সহোদর (এক বর্ণনামতে বৈমাত্রেয় ভ্রাতা) আবূ আযীয ইবন উমায়র ইবন হিশাম ছিলেন একজন বন্দী। তিনি বলেন, আমার ভ্রাতা মুস'আব ইবন উমায়র আমার নিকট দিয়া যাইতেছিলেন। তখন আনসারদের এক লোক আমাকে বাঁধিতেছিল। মুস'আব সেই আনসারীকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, তোমার উভয় হস্ত তাহার সহিত মজবুত করিয়া বাঁধ। কারণ তাহার মাতা সম্পদশালিনী। সে হয়ত বা মোটা অংকের পণ দিয়া তোমার নিকট হইতে উহাকে ছাড়াইয়া লইবে। আমি বলিলাম, হে ভ্রাত! আমার তুলনায় ইহারাই কি তোমার আপনজন? মুস'আব বলিলেন, তুমি ছাড়া সে-ই আমার ভাই। অতঃপর তাহার মাতা জিজ্ঞাসা করিয়া পাঠাইল যে, একজন বন্দীর বিনিময়ে সর্বোচ্চ কত পণ দেওয়া হইয়াছে? তাহাকে বলা হইল, চার হাজার দিরহাম। অতএব তিনি তাহার পণস্বরূপ চার হাজার দিরহাম পাঠাইয়া দিলেন। আবূ আযীয বলেন, আমাকে যখন বদর প্রান্তর হইতে লইয়া আসা হয় তখন আমি আনসারদের একটি দলের সহিত ছিলাম। দুপুর এবং রাত্রের খাবার যখন দেওয়া হইত তখন আমাকে রুটি প্রদান করিয়া তাহারা কেবল খেজুর খাইত। কারণ রাসূলুল্লাহ (স) আমাদের সহিত ভাল ব্যবহার করার জন্য তাহাদিগকে উপদেশ দিয়াছিলেন। তাহাদের কাহারও ভাগে এক টুকরা রুটি মিলিলে সে তাহা আমাকে দিয়া দিত। ইহাতে আমি লজ্জাবোধ করিয়া তাহাদের কাহাকেও উহা ফেরত দিতাম। কিন্তু সে উহা স্পর্শও করিত না; বরং আমাকে আবার ফিরাইয়া দিত (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ৩০৬; ইব্ন হিশাম, আসী-সীরা, ২খ., পৃ. ২৮৬-৮৭)।
📄 বন্দীদের সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণ
বন্দীদের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (স) সাহাবীদের নিকট পরামর্শ চাহিয়া বলিলেন, এই সকল বন্দীর ব্যাপারে তোমাদের মতামত কি? আল্লাহ তাহাদের ব্যাপারে তোমাদিগকে কর্তৃত্ব প্রদান করিয়াছেন। তাহারা গতকল্যও ছিল তোমাদের ভাই। আবূ বাক্ (রা) বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! ইহারা আপনার আহ্ল ও আপনার কওম। আল্লাহ আপনাকে সফলতা দান করিয়াছেন এবং তাহাদের উপর আপনাকে বিজয় দান করিয়াছেন। উহারা আমাদের চাচার বংশধর, নিকটাত্মীয় ও আপনজন। তাহাদিগকে বাঁচাইয়া রাখুন। আমার মত হইল, তাহাদের নিকট হইতে ফিদইয়া (মুক্তিপণ) গ্রহণ করা হউক। তাহাদের নিকট হইতে আমরা যাহা গ্রহণ করিব তাহা কাফিরদের বিরুদ্ধে আমাদের জন্য শক্তি হইবে। আর হয়ত বা আল্লাহ আপনার মাধ্যমে তাহাদিগকে হিদায়াত দান করিবেন, যাহার ফলে তাহারা আপনার জন্য সাহায্যকারী হইবে।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তুমি কি বল, হে ইবনুল খাত্তাব? উমার (রা) বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তাহারা আপনাকে বহিষ্কার করিয়াছে এবং আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিয়াছে। আবূ বাক্ (রা) যেমত ব্যক্ত করিয়াছেন, আমার মত তাহা নহে। আমার মত হইল, অমুকের (উমার-এর নিকটাত্মীয়) ব্যাপারে আমাকে ক্ষমতা দিন। আমি তাহার গর্দান উড়াইয়া দেই। আলীকে আকীলের ব্যাপারে ক্ষমতা দিন, সে তাহার গর্দান উড়াইয়া দিক। হামযাকে অমুকের (তাহার ভ্রাতা) ব্যাপারে ক্ষমতা দিন, সে তাহার গর্দান উড়াইয়া দিক যাহাতে জানিতে পারেন যে, মুশরিকদের ব্যাপারে আমাদের অন্তরে কোনরূপ ভালবাসা ও সহানুভূতি নাই। ইহারা কুরায়শদের সরদার, নেতা ও নীতি নির্ধারক। তাই ইহাদের গর্দান উড়াইয়া দিন।
আবদুল্লাহ ইব্ন রাওয়াহা (রা) বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এমন একটি উপত্যকা খোঁজ করুন যেখানে বহু কাষ্ঠখণ্ড রহিয়াছে। ইহাদিগকে সেখানে নিয়া আগুনে জ্বালাইয়া দিন। আব্বাস (রা) তাহার কথা শুনিতেছিলেন। তিনি বলিলেন, তুমি আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করিলে (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ২৯৬-৯৭; ইউসুফ সালিহী আশ-শামী, প্রাগুক্ত, ৪খ., পৃ. ৬০)।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) গৃহে প্রবেশ করিলেন। তখন কিছু লোক বলিল, তিনি উমার (রা)-এর মতই গ্রহণ করিবেন। আর কিছু লোক বলিল, তিনি আবদুল্লাহ ইব্ন রাওয়াহা (রা)-এর মতই গ্রহণ করিবেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) বাহির হইয়া আসিয়া বলিলেন, আল্লাহ তা'আলা কিছু লোকের অন্তর নরম করিয়া দেন, এমনকি তাহা দুধের তুলনায়ও নরম হইয়া যায়। আবার আল্লাহ তা'আলা কিছু লোকের অন্তর শক্ত করিয়া দেন, এমনকি তাহা পাথরের তুলনায়ও শক্ত হইয়া যায়। হে আবূ বাক্! ফেরেশতাদের মধ্যে তোমার উদাহরণ হইল মীকাঈল (আ); তিনি রহমতসহ নাযিল হন এবং নবীদের মধ্যে তোমার উদাহরণ হইল ইবরাহীম (আ)। তিনি বলিয়াছেন: فَمَنْ تَبِعَنِي فَإِنَّهُ مِنِّى وَمَنْ عَصَانِي فَإِنَّكَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ.
"সুতরাং যে আমার অনুসরণ করিবে সেই আমার দলভুক্ত, কিন্তু কেহ আমার অবাধ্য হইলে তুমি তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু" (১৪:৩৬)।
আবূ বাক্স! তোমার আরও উদাহরণ হইল ঈসা ইবন মারয়াম (আ)। তিনি বলিয়াছেন: إِنْ تُعَذِّبْهُمْ فَإِنَّهُمْ عِبَادُكَ وَأَنْ تَغْفِرْ لَهُمْ فَإِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ.
"তুমি যদি তাহাদিগকে শান্তি দাও তবে তাহারা তো তোমারই বান্দা। আর তুমি যদি তাহাদিগকে ক্ষমা কর তবে তুমি তো পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়" (৫: ১১৮)।
আর হে উমার! ফেরেশতাদের মধ্যে তোমার উদাহরণ হইল, জিবরীল (আ)। তিনি আল্লাহ্ শত্রুদের প্রতি কঠোর। তিনি প্রতিশোধের মনোভাব লইয়া অবতরণ করেন। আর নবীদের মধ্যে তোমার উদাহরণ হইল নূহ (আ)। তিনি বলিয়াছেন: رَبِّ لَا تَذَرْ عَلَى الْأَرْضِ مِنَ الْكَافِرِينَ دَيَّارًا.
"হে আমার প্রতিপালক! পৃথিবীতে কাফিরগণের মধ্য হইতে কোন গৃহবাসীকে অব্যাহতি দিও না” (৭১: ৩৬)।
নবীদের মধ্যে তোমার আরও উদাহরণ হইল মূসা (আ)। তিনি বলিয়াছেন: ربَّنَا اطْمِسَ عَلَى أَمْوَالِهِمْ وَاشْدُدْ عَلى قُلُوبِهِمْ فَلَا يُؤْمِنُوا حَتَّى يَرَوْا الْعَذَابَ الْأَلِيمَ.
“হে আমাদের প্রতিপালক! উহাদের সম্পদ বিনষ্ট কর, উহাদের হৃদয় মোহর করিয়া দাও, উহারা তো মর্মন্তুদ শাস্তি প্রত্যক্ষ না করা পর্যন্ত ঈমান আনিবে না" (১০:৮৮)।
তোমরা উভয়ে যদি একমত হইতে তবে আমি তোমাদের মতের খেলাফ করিতাম না। তোমরা ছায়াতুল্য। তাই তোমাদের কেহ মুক্তিপণ অথবা হত্যা করা ব্যতীত ছাড়িবে না।
আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! সুহায়ল ইব্ন বায়দা ব্যতীত। কারণ আমি তাহাকে ইসলামের কথা বলিতে শুনিয়াছি। রাসূলুল্লাহ (সা) চুপ করিয়া রহিলেন।
আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) বলেন, ইহাতে আমি ভীত হইয়া পড়িলাম এই কারণে যে, আমার উপর আকাশ হইতে প্রস্তর বর্ষিত হয় কিনা! অবশেষে রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, সুহায়ল ইব্ন বায়দা ব্যতীত (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ২৯৭-৯৮; সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৪খ., পৃ. ৬০-৬১)।
অতঃপর মুক্তিপণ লইয়া তাহাদিগকে ছাড়িয়া দেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হইলে আল্লাহ তা'আলা এই আয়াত নাযিল করিলেন:
مَا كَانَ لِلنَّبِيِّ أَنْ يَكُونَ لَهُ أَسْرَى حَتَّى يُشْخِنَ فِي الْأَرْضِ تُرِيدُونَ عَرَضَ الدُّنْيَا وَاللَّهُ يَرِيدُ الْآخِرَةَ وَاللهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ لَوْلا كِتَابٌ مِّنَ اللَّهِ سَبَقَ لَمَسَّكُمْ فِيْمَا أَخَذْتُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ.
“দেশে ব্যাপকভাবে শত্রুকে পরাভূত না করা পর্যন্ত বন্দী রাখা কোন নবীর জন্য সংগত নহে। তোমরা কামনা কর পার্থিব সম্পদ এবং আল্লাহ চাহেন পরলোকের কল্যাণ। আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। আল্লাহ্র পূর্ব বিধান না থাকিলে তোমরা যাহা গ্রহণ করিয়াছ তজ্জন্য তোমাদের উপর মহাশান্তি আপতিত হইত" (৮:৬৭-৬৮)।
পরদিন সকালবেলা উমার (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট গিয়া দেখিলেন যে, তিনি ও আবূ বাক্র উভয়ে কাঁদিতেছেন। তিনি বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনারা কিজন্য কাঁদিতেছেন? তাহা শুনিয়া আমার যদি ক্রন্দন আসে তবে আমিও কাঁদিব, আর না আসিলে আপনাদের ক্রন্দনের কারণে আমি ক্রন্দনের ভান করিব। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, ইবনুল খাত্তাবের মতের বিরোধিতা করার কারণে আমাদের উপর প্রায় আযাব আসিয়াই পড়িয়াছিল! যদি আযাব আসিয়াই পড়িত তবে ইবনুল খাত্তাব ব্যতীত আর কেহই রক্ষা পাইত না। তিনি নিকটবর্তী একটি বৃক্ষ দেখাইয়া বলিলেন, শান্তি আমার নিকট পেশ করা হইয়াছিল যাহা ছিল এই বৃক্ষ হইতেও নিকটবর্তী (সুবুলুল হুদা, ৪খ, ৬১)।
📄 বন্দীদের নিকট হইতে মুক্তিপণ আদায়
বন্দীদের সকলের নিকট হইতে একই হারে মুক্তিপণ গ্রহণ করা হয় নাই, সামর্থ্য অনুযায়ী ইহার তারতম্য হইয়াছিল। ইব্ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (স) বদর যুদ্ধের বন্দীদের জন্য চারি শত দিরহাম মুক্তিপণ নির্ধারণ করেন। ইহা ছিল সর্বনিম্ন মুক্তিপণ। আর সর্বোচ্চ মুক্তিপণ ছিল চারি হাজার দিরহাম (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ২৯৯)। সর্বপ্রথম মুক্তিপণ গ্রহণ করা হয় আবূ ওয়াদা'আ ইব্ন দুবায়রা আস-সাহমীর। রাসূলুল্লাহ (স) তাহার সম্পর্কে বলিয়াছিলেন, মক্কায় তাহার একজন বুদ্ধিমান ব্যবসায়ী ও সম্পদশালী পুত্র রহিয়াছে। সে-ই হয়তবা তোমাদের নিকট তাহার পিতার মুক্তিপণ লইয়া আসিবে।
অতঃপর কুরায়শগণ পরস্পর আলোচনা করিল এবং বলিল, তোমরা তোমাদের বন্দীদের মুক্তিপণ দেওয়ার ক্ষেত্রে তাড়াহুড়া করিও না। তাহা হইলে মুহাম্মাদ ও তাঁহার সঙ্গীবৃন্দ তোমাদের নিকট বেশী বেশী মুক্তিপণ দাবি করিবে। আল-মুত্তালিব ইব্ন আরী ওয়াদা'আ (ইহার প্রতিই রাসূলুল্লাহ (স) ইঙ্গিত করিয়াছিলেন। তিনি মক্কা বিজয়ের দিন ইসলাম গ্রহণ করেন) বলিলেন, তোমরা সত্য বলিয়াছ, তাড়াহুড়া করিও না। অতঃপর রাত্রিবেলা তিনি চুপিচুপি মদীনা চলিয়া আসিলেন এবং চার হাজার দিরহামের বিনিময়ে স্বীয় পিতাকে মুক্ত করিয়া লইয়া গেলেন (ইবন হিশাম, আস-সীরা, ২খ., পৃ. ২৯০; আত-তাবারী, তারীখ, ২খ., পৃ. ৪৬৪-৬৫)।
অতঃপর মিকরায ইব্ন হাম্স ইবনুল আখয়াফ আসিল সুহায়ল ইব্ন আমরের মুক্তিপণের জন্য যাহাকে বন্দী করিয়াছিলেন বানু সালিম ইব্ন আওফ-এর ভ্রাতা মালিক ইবনুদ দুখশুম (রা)। সুহায়লের উপরের ঠোঁট ছিল কাটা। তিনি ভাল বক্তৃতা দিতে পারিতেন। উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে অনুমতি দিন, আমি তাহার সম্মুখের দন্তদ্বয় উপড়াইয়া ফেলি যাহাতে তাহার জিহ্বা বাহির হইয়া পড়ে এবং জীবনে আর কখনও আপনার বিরুদ্ধে কোথায়ও বক্তৃতা দিতে না পারে। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আমি কাহারও অঙ্গহানি করিতে চাই না যাহার ফলে আল্লাহ আমার অঙ্গহানি করিয়া দিবেন, যদিও আমি নবী হই না কেন। সে হয়তবা এমন এক অবস্থানে পৌঁছিবে যে, তুমি আর তাহাকে মন্দ বলিবে না। অতঃপর মিকরায তাহার ব্যাপারে আলাপ-আলোচনা করিল এবং একটি সন্তোষজনক পরিমাণ মুক্তিপণ নির্ধারিত হইল। মুসলমানগণ উক্ত পরিমাণ দাবি করিলে মিকরায বলিল, আমাকে তাহার স্থলে আটক রাখিয়া উহাকে ছাড়িয়া দাও। সে তোমাদের নিকট তাহার মুক্তিপণ পাঠাইয়া দিবে। অতঃপর মুসলমানগণ মিকরাযকে নিজেদের নিকট আটক রাখিয়া সুহায়লকে ছাড়িয়া দিল (ইব্ন কাছীর, প্রাগুক্ত, ৩খ., পৃ. ৩১০; আত-তাবারী, তারীখ, ২খ., পৃ. ৪৬৫)।
হাফিজ ইব্ন কাছীর (র) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) সুহায়লের যে অবস্থানের প্রতি ইঙ্গিত করেন তাহা হইল, রাসূলুল্লাহ (স)-এর ইনতিকালের পর আরবের লোকজন যখন মুরতাদ্দ হইয়া যাইতেছিল তখন সুহায়ল ইব্ন আমর (রা) মক্কায় এক জ্বালাময়ী বক্তৃতা দেন এবং আপ্রাণ চেষ্টা করিয়া লোকজনকে দীনে হানীফের উপর অটল রাখেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ৩১০)।
যুদ্ধবন্দীদের মধ্যে আবূ সুফয়ান ইবন হারব-এর পুত্র 'আমরও ছিল। আলী ইব্ন আবী তালিব (রা) তাহাকে বন্দী করিয়াছিলেন। আবূ সুফ্যানকে বলা হইল, তোমার পুত্র 'আমরের মুক্তিপণ দাও। তিনি বলিলেন, আমি কি জান ও মাল উভয় দিক হইতেই ক্ষতিগ্রস্ত হইব? তাহারা হানজালাকে (আবূ সুফ্যানের পুত্র) হত্যা করিয়াছে। আবার আমরের মুক্তিপণও দিব? রাখ, উহাকে তাহাদের হাতে ছাড়িয়া দাও। যত দিন ইচ্ছা তাহারা উহাকে বন্দী করিয়া রাখুক। অতএব সে মদীনায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট বন্দী জীবন কাটাইতে লাগিল। ইতোমধ্যে বানু আমর ইব্ন আওফের ভ্রাতা সা'দ ইবনুন নু'মান ইব্ন আক্কাল তাহার ছোট এক কন্যাকে লইয়া 'উমরা করিবার জন্য মক্কা গমন করিলেন। তিনি ছিলেন মদীনার নিকটবর্তী নাকী নামক স্থানে বসবাসকারী একজন বৃদ্ধ মুসলমান। সেখান হইতেই তিনি রওয়ানা হন। তাহার সহিত পরে যেরূপ আচরণ করা হইয়াছে সে সম্পর্কে তাহার কোনও আশংকাই ছিল না। তিনি ধারণাই করিতে পারেন নাই যে, মক্কায় তাহাকে বন্দী করা হইবে। কুরায়শদের একটি অঙ্গীকার ছিল যে, কেহ হজ্জ বা 'উমরা করিতে মক্কায় গমন করিলে তাহারা তাহার সহিত কোনরূপ খারাপ আচরণ করিবে না। কিন্তু আবূ সুফ্য়ান ইহা ভঙ্গ করিয়া তাহার পুত্র আমরের বদলে সা'দকে বন্দী করিল। আমর ইব্ন আওফের লোকজন রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট গিয়া ঘটনা অবহিত করিল এবং আবূ সুফ্য়ানের পুত্র 'আমরকে তাহাদের নিকট অর্পণ করিতে আবেদন করিল যাহাতে তাহারা তাহার বিনিময়ে তাহাদের বৃদ্ধকে ছাড়াইয়া আনিতে পারে। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাই করিলেন। অতঃপর তাহারা আমরকে পাঠাইয়া দিলে আবূ সুফ্য়ানও সা'দকে ছাড়িয়া দেন (আত-তাবারী, তারীখ, ২খ., পৃ. ৪৬৬-৬৭; ইব্ন হিশাম, আস-সীরা, ২খ., পৃ. ২৯২-৯৩)।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর চাচা আব্বাস ছিলেন বন্দীদের অন্যতম। আবুল ইয়াসার নামক এক আনসার সাহাবী তাহাকে বন্দী করেন। ইব্ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত যে, বদর যুদ্ধে বিজয়ী হওয়ার পর বন্দীদিগকে মজবুত করিয়া বাঁধা হয়। রাসূলুল্লাহ (স) রাত্রের প্রথমভাগে ঘুমাইতে পারিতেছিলেন না। সাহাবায়ে কিরাম জিজ্ঞাসা করিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার কি হইয়াছে যে, ঘুমাইতে পারিতেছেন না? তিনি বলিলেন, আমি আমার চাচা আব্বাসের (জোরে বাঁধার কারণে) ক্রন্দনের আওয়ায শুনিতে পাইতেছি। তখন তাহারা তাহার বন্ধন ঢিলা করিয়া দেন। ইহাতে তিনি চুপ হইয়া গেলেন এবং রাসূলুল্লাহ (স)-ও নিদ্রা গেলেন (ইব্ন কাছীর, প্রাগুক্ত, ৩খ., পৃ. ২৯৯)।
ইবন উমার (রা) হইতে অপর এক বর্ণনায় জানা যায় যে, আব্বাসকে একজন আনসার সাহাবী বন্দী করিয়াছিলেন এবং আনসারগণ অঙ্গীকার করিয়াছিলেন যে, তাহারা তাহাকে হত্যা করিবে। এই সংবাদ রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট পৌঁছিয়াছিল। তিনি বলিলেন, আমার চাচা আব্বাসের চিন্তায় আমি রাত্রে ঘুমাইতে পারি নাই। আনসারগণ তাহাকে হত্যা করিতে চাহিতেছে। উমার (রা) বলিলেন, আমি কি তাহাদের নিকট যাইব? তিনি বলিলেন, হাঁ! অতএব উমার (রা) আনসারদের নিকট গিয়া বলিলেন, আব্বাসকে ছাড়িয়া দাও। তাহারা বলিল, না, আল্লাহ্র কসম! আমরা তাহাকে ছাড়িব না। উমার (রা) তাহাদিগকে বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) যদি ইহাতে সন্তুষ্ট হন? তাহারা বলিল, তিনি ইহাতে সন্তুষ্ট হইলে উহাকে লইয়া যাও। অতঃপর উমার (রা) তাঁহাকে লইয়া আসিলেন। আব্বাস তাঁহার হাতে থাকিতে তিনি তাঁহাকে বলিলেন, হে আব্বাস! ইসলাম গ্রহণ কর। আল্লাহ্র কসম! খাত্তাবের ইসলাম গ্রহণ হইতেও তোমার ইসলাম গ্রহণ আমার নিকট বেশী আনন্দদায়ক হইবে। ইহা এইজন্য যে, আমি অনুভব করিয়াছি, রাসূলুল্লাহ (স) তোমার ইসলাম গ্রহণে খুশী হইবেন (সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৪খ., পৃ. ৬০)। উভয় বর্ণনার সামঞ্জস্য বিধান এইভাবে সম্ভব যে, প্রথম বর্ণনাটি যুদ্ধক্ষেত্রে এবং শেষোক্ত ইবন উমার (রা)-এর বর্ণনাটি মদীনায় পৌঁছিবার পরের।
মদীনায় আনয়নের পর রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে বলিলেন, হে আব্বাস! আপনি আপনার নিজের, দুই ভ্রাতুষ্পুত্র আকীল ইন্ন আবী তালিব ও নাওফাল ইবনুল হারিছ-এর এবং মিত্র 'উতবা ইবন 'আমর-এর পক্ষ হইতে মুক্তিপণ প্রদান করুন। কারণ আপনি সম্পদশালী। তিনি বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি তো মুসলমানই হইয়াছিলাম, কিন্তু কওম আমাকে জোর করিয়া যুদ্ধে লইয়া আসিয়াছে। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আল্লাহই আপনার ইসলাম সম্পর্কে ভাল জানেন। আপনি যাহা বলিতেছেন তাহা যদি সত্য হয় তবে আল্লাহ আপনাকে উহার বিনিময় দান করিবেন। তবে আপনার বাহ্যিক অবস্থান তো আমাদের বিপক্ষে ছিল। তাই আপনার মুক্তিপণ প্রদান করুন। এই সম্পর্কে কুরআন কারীমের এই আয়াত নাযিল হয় :
يَا يُّهَا النَّبِيُّ قُلْ لِمَنْ فِي أَيْدِيكُمْ مِّنَ الْأَسْرَى إِنْ يُعْلَمُ اللَّهُ فِي قُلُوبِكُمْ خَيْرًا يُؤْتِكُمْ خَيْرًا مِّمَّا أُخِذَ مِنْكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ. وَإِنْ يُرِيدُوا خِيَانَتَكَ فَقَدْ خَانُوا اللَّهَ مِنْ قَبْلُ فَأَمْكَنَ مِنْهُمْ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ.
"হে নবী! তোমাদের করায়ত্ত যুদ্ধবন্দীদিগকে বল, আল্লাহ যদি তোমাদের হৃদয়ে ভাল কিছু দেখেন তবে তোমাদের নিকট হইতে যাহা লওয়া হইয়াছে তাহা অপেক্ষা উত্তম কিছু তোমাদিগকে দান করিবেন এবং তোমাদিগকে ক্ষমা করিবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। তাহারা তোমার সহিত বিশ্বাসভঙ্গ করিতে চাহিলে তাহারা তো পূর্বে আল্লাহ্র সহিতও বিশ্বাসভঙ্গ করিয়াছে; অতঃপর তিনি তোমাদিগকে তাহাদের উপর শক্তিশালী করিয়াছেন; আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়" (৮: ৭০-৭১)।
ইতোপূর্বে রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার নিকট হইতে ২০ উকিয়া স্বর্ণ গ্রহণ করিয়াছিলেন। আব্বাস বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি তো মনে করিয়াছি উহাই বুঝি আমার মুক্তিপণ। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, না, উহা তো আল্লাহ আপনার নিকট হইতে আমাদেরকে প্রদান করিয়াছেন। আব্বাস বলিলেন, আমার তো আর কোনও সম্পদ নাই। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আপনি মক্কা হইতে বাহির হইবার সময় উম্মুল ফাদল বিনতুল হারিছের (আব্বাসের স্ত্রী) উপস্থিতিতে যে সম্পদ মাটির নিচে রাখিয়া আসিয়াছেন এবং তাহাকে বলিয়া আসিয়াছেন, এই যাত্রায় যদি আমি নিহত হই তবে ফযলের জন্য এত...এত..., আবদুল্লাহর জন্য এত...এত..., কুছাম-এর জন্য এত.... এত.... এবং উবায়দুল্লাহর জন্য এত...এত..., সেই সম্পদ কোথায়? তখন আব্বাস বলিলেন, সেই সত্তার কসম, যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করিয়াছেন। ইহা আমি ও উম্মুল ফাদল ব্যতীত আর কেহ জানে না। আমি নিশ্চিতরূপেই জানি যে, আপনি আল্লাহ্র রাসূল। অতঃপর আব্বাস নিজের পক্ষ হইতে দুই ভ্রাতুষ্পুত্র ও মিত্রের পক্ষ হইতে এক শত উকিয়া স্বর্ণ মুক্তিপণ হিসাবে প্রদান করেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ২৯৯; তারীখ, তাবারী ২খ., পৃ. ৪৬৫-৬৬)। কোনও কোনও রিওয়ায়াতে ৪০ উকিয়ার কথা উল্লেখ আছে (ইউসুফ সালিহী আশ-শামী, প্রাগুক্ত, ৪খ., পৃ. ৭১)। উহা সম্ভবত শুধু তাঁহার নিজের মুক্তিপণ ছিল। আর সকলের পক্ষ হইতে সম্মিলিত মুক্তিপণ ছিল ১০০ উকিয়া।
যয়নব (রা)-র স্বামী রাসূলুল্লাহ (স)-এর জামাতা আবুল আস ইবনুর রাবী' ইব্ন আবদিল উয্যাও বন্দী হইয়া আসেন। বানূ হারাম-এর খিরাশ ইবনুস সিম্মা (রা) তাহাকে বন্দী করেন। আবুল আস ছিলেন মক্কাবাসীদের সম্পদ আমানত রক্ষক ও অন্যতম ধনাঢ্য ব্যক্তি। তাঁহার মাতা হালা বিন্ত খুওয়ায়লিদ ছিলেন উম্মুল মুমিনীন খাদীজা বিন্ত খুওয়ায়লিদ (রা)-এর ভগ্নী। নবুওয়াত লাভের পূর্বেই খাদীজা (রা)-এর প্রস্তাবক্রমে তাঁহার সহিত যয়নব (রা)-র বিবাহ হয়। খাদীজা (রা) ও তাঁহার সকল কন্যা ইসলাম গ্রহণ করেন, কিন্তু আবুল আস মুশরিকই থাকিয়া যান।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর ইসলাম প্রচার শুরু করিলে মুশরিকগণ তাঁহাকে অসুবিধায় ফেলিবার এবং মানসিকভাবে নির্যাতন করিবার জন্য তাঁহার কন্যাগণকে তালাক দেওয়ার প্রচেষ্টা চালায়। উতবাকে সবচেয়ে সুন্দরী মহিলার সহিত বিবাহ দেওয়ার কথা বলিলে সে রুকায়্যাকে তালাক দেয়। অতঃপর উছমান ইব্ন আফফান (রা) তাঁহাকে বিবাহ করেন। অনুরূপভাবে তাহারা আবুল আসকেও কুরায়শদের সর্বাধিক সুন্দরী মহিলার সহিত বিবাহ দেওয়ার প্রলোভন দেখাইয়া যয়নব (রা)-কে তালাক দিতে বলে। কিন্তু তিনি উক্ত প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করিয়া যয়নবকে তালাক দিতে অস্বীকার করেন। অতঃপর যয়নব (রা) তাঁহার নিকটই থাকিয়া যান।
বদর যুদ্ধে আবুল আস মুশরিকদের সহিত অংশগ্রহণ করিয়া বন্দী হন এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর হেফাজতে থাকেন। অতঃপর মক্কাবাসিগণ যখন বন্দীদের মুক্তিপণ প্রেরণ করেন তখন রাসূলুল্লাহ (স)-এর কন্যা যয়নব (রা)-ও স্বামী আবুল আসের মুক্তিপণ স্বরূপ কিছু সম্পদ প্রেরণ করেন যাহার মধ্যে তাঁহার বিবাহের সময় খাদীজা (রা) কর্তৃক প্রদত্ত স্বর্ণের একটি হারও ছিল। রাসূলুল্লাহ (স) উহা দেখিয়া খুবই আবেগপ্রবণ হইয়া পড়েন এবং বলেন, তোমরা যদি তাহার বন্দীকে ছাড়িয়া দিতে এবং তাহার সম্পদ ফেরৎ দিতে ভাল মনে কর তবে তাহা করিতে পার। সাহাবায়ে কিরাম বলিলেন, হাঁ, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা তাহা অনুমোদন করিলাম। তারপর তাহারা আবুল আসকে ছাড়িয়া দিল এবং যয়নব (রা) প্রেরিত সম্পদও ফেরত দিল।
এদিকে রাসূলুল্লাহ (স) আবুল আসের নিকট হইতে অঙ্গীকার লইয়াছিলেন অথবা তাহার মুক্তির জন্য শর্তারোপ করিয়াছিলেন যে, মক্কায় পৌঁছিয়া তিনি যয়নবকে মদীনায় পাঠাইয়া দিবেন। বিষয়টি রাসূলুল্লাহ (স) ও তাহার মধ্যে গোপন ছিল। আবুল আস মক্কায় রওয়ানা হইয়া গেলে রাসূলুল্লাহ (স) যায়দ ইব্ন হারিছা (রা) ও অন্য একজন সাহাবীকে পাঠাইয়া বলিলেন, তোমরা ইয়াজাজ উপত্যকায় অবস্থান করিবে। যয়নব তোমাদের নিকট আসিবে, তাহাকে সঙ্গে লইয়া আমার নিকট চলিয়া আসিবে। ইহা ছিল বদর যুদ্ধের একমাস বা উহার কাছাকাছি সময়ের কথা।
আবুল আস মক্কায় পৌঁছিয়া যয়নব (রা)-কে তাঁহার পিতার নিকট চলিয়া যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। যয়নব (রা) সফরের প্রস্তুতি গ্রহণ করিয়া তাঁহার দেবর কিনানা ইবনুর রাবী'র সহিত দিনের বেলা রওয়ানা হইলেন। কিন্তু কাফির কুরায়শগণ সংবাদ পাইয়া প্রবলভাবে প্রতিরোধ করিল, এমনকি বর্শা দ্বারা আঘাত করিয়া তাঁহাকে আহত করিল। ফলে তাঁহার গর্ভের বাচ্চা নষ্ট হইয়া যায়। অবশেষে আবূ সুফ্যানের পরামর্শে রাত্রিবেলা তাঁহারা রওয়ানা হন এবং মদীনায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট পৌঁছেন। মক্কা বিজয়ের সামান্য পূর্বে আবুল আস ইসলাম গ্রহণ করেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) যয়নব (রা)-কে তাঁহার নিকট ফিরাইয়া দেন (ইবন হিশাম, আস-সীরা, ২খ., পৃ. ২৯৩-৩০০, তারীখ, তাবারী ২খ., পৃ. ৪৬৭-৪৭২)।
যুদ্ধবন্দীদের কিছু লোককে রাসূলুল্লাহ (স) বিশেষভাবে অনুগ্রহ করেন এবং বিনা মুক্তিপণে মুক্তি দেন। তন্মধ্যে একজন হইলেন আবূ আয্যা আমর ইব্ন আবদুল্লাহ আল-জুমাহী। তিনি ছিলেন দরিদ্র ও অধিক সন্তানের জনক। তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার কতটুকু সম্পদ আছে তাহা আপনি জানেন। আমি দরিদ্র ও অনেক সন্তানের জনক। তাই আমার প্রতি অনুগ্রহ করুন। রাসূলুল্লাহ (স) তাহার প্রতি অনুগ্রহ করেন এবং তাহাকে কোনরূপ মুক্তিপণ ছাড়াই মুক্তি দেন। তবে এই ব্যাপারে অঙ্গীকার গ্রহণ করেন যে, তাঁহার বিরুদ্ধে কাহাকেও সে সাহায্য করিবে না। অতঃপর আবূ আয্যা রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রশংসা করিয়া এবং তাঁহার মাহাত্ম্য বর্ণনা করিয়া একটি কবিতা আবৃত্তি করে।
কিন্তু পরবর্তী কালে আবূ 'আযযা রাসূলুল্লাহ (স)-কে ধোঁকা দিয়া এই অঙ্গীকার ভঙ্গ করিয়া কাফিরদের পক্ষে উহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে এবং পুনরায় মুসলিম বাহিনীর হাতে বন্দী হয়। সেইবারও তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর অনুগ্রহ প্রার্থনা করেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, আমি তোমাকে এইভাবে ছাড়িব না যে, তুমি তোমার গণ্ডদ্বয় স্পর্শ করিবে আর বলিবে, আমি মুহাম্মাদকে দুইবার ধোঁকা দিয়াছি। এক বর্ণনামতে রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছিলেন, মুমিন ব্যক্তি একই গর্ত হইতে দুইবার দংশিত হয় না। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স)-এর নির্দেশে তাহাকে হত্যা করা হয় (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ৩১২; ইব্ন হিশাম, প্রাগুক্ত, ২খ., পৃ. ৩০১)।
ওয়াহ্হ্ব ইবন উমায়র ইবন ওয়াহ্হ্বকেও রাসূলুল্লাহ (স) মুক্তিপণ ছাড়াই মুক্তি দেন। ওয়াহ্হ্ব-এর পিতা 'উমায়র ইব্ন ওয়াহ্হ্ব ছিল চরম মুসলিম বিদ্বেষী। সাফওয়ান ইবন উমায়্যার সহিত মক্কায় সে শলাপরামর্শ করে। সাফওয়ান তাহার ঋণ পরিশোধ এবং পরিবার-পরিজনের দেখাশুনার দায়িত্ব গ্রহণ করিলে উমায়র রাসূলুল্লাহ (স)-কে হত্যা করিবার জন্য রওয়ানা হয়। মদীনায় আগমনের পর রাসূলুল্লাহ (স) তাহার গোপন তত্ত্ব তথা সাফওয়ানের সহিত যে কথোপকথন হইয়াছিল তাহা ফাঁস করিয়া দিলে তিনি খাঁটিভাবে ইসলাম গ্রহণ করেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাহার পুত্র ওয়াহ্হ্বকে বিনা মুক্তিপণেই ছাড়িয়া দেন। অতঃপর উমায়র মক্কা পৌঁছিয়া ইসলাম প্রচারের কাজে আত্মনিয়োগ করেন (তারীখ, তাবারী, ২খ., পৃ. ৪৭২-৭৪; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ, ৩১৩-১৪)।