📄 রাসূলুল্লাহ (স) ও মুসলমানদের মদীনায় প্রত্যাবর্তন
পূর্বেই উল্লিখিত হইয়াছে যে, বদর যুদ্ধ শুরু হয় দ্বিতীয় হি. ১৭ই রামাদান শুক্রবার সকালবেলা। সূর্য হেলিয়া পড়িবার পূর্বেই মুসলমানগণ বিজয়লাভ করেন। তিনদিন সেখানে অবস্থানের পর সোমবার রাত্রিবেলা রাসূলুল্লাহ (স) সকলকে লইয়া রওয়ানা হন। উষ্ট্রে আরোহণ করিয়া তিনি বদরের কূপের নিকট দাঁড়াইয়া কুরায়শ নেতৃবন্দকে সম্বোধন করেন। অতঃপর বন্দী ও গনীমতসহ তিনি সম্মুখে অগ্রসর হন। বন্দীদের সংখ্যা সম্পর্কে কিছুটা মতভেদ রহিয়াছে। ইবন জারীর আত-তাবারী ৪৪ জনের কথা উল্লেখ করিয়াছেন (আত-তাবারী, তারীখ, ২খ, পৃ. ৪৫৯)। তবে প্রসিদ্ধ বর্ণনামতে ৭০ জন। বন্দীদের মধ্যে উকবা ইব্ন আবী মু'আয়ত ও আন-নাদর ইবনুল হারিছ ইব্ন কালাদাও ছিল। অতঃপর তিনি মাদীক ও নাযিয়া-এর মধ্যবর্তী সায়র নামক স্থানে একটি বড় বৃক্ষের নিচে অবতরণ করিয়া গনীমত বণ্টন করেন। অতঃপর সেখান হইতে রওয়ানা হইয়া আস-সাফরা নামক স্থানে আসিলে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নির্দেশে বন্দী আন-নাদর ইব্নুল হারিছকে হত্যা করা হয়। আলী ইব্ন আবী তালিব (রা) তাহাকে হত্যা করেন (ইব্ন হিশাম, আস-সীরা, ২খ., পৃ. ২৮৫)। পরবর্তী কালে তাহার কন্যা কুতায়লা বিনতুন নাদর স্বীয় পিতার শোকে এক মর্মস্পর্শী কবিতা রচনা ও আবৃত্তি করেন। তাহা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর হৃদয় বিগলিত হইয়াছিল এবং অশ্রুতে তাঁহার দাড়ি মুবারক ভিজিয়া গিয়াছিল। তিনি আবূ বকর (রা)-কে বলিয়াছিলেন, আমি পূর্বে তাহার এই কবিতা শুনিলে তাহার পিতাকে হত্যা করিবার নির্দেশ দিতাম না (সুবুলুল হুদা, প্রাগুক্ত, ৪খ., পৃ. ৬৩-৬৪)।
অতঃপর ইরকুজ জাবয়া নামক স্থানে পৌছিয়া রাসূলুল্লাহ (স) অপর এক বন্দী উকবা ইব্ন আবী মু'আয়তকে হত্যার নির্দেশ দেন। উকবা বলিল, হে মুহাম্মাদ! বাচ্চাদের কে দেখাশুনা করিবে? তিনি বলিলেন, জাহান্নামের আগুন। আসিম ইবন হাবিত আনসারী (রা) ইব্ন হিশাম-এর এক বর্ণনামতে আলী (রা) তাহাকে হত্যা করেন (ইব্ন হিশাম, আস-সীরা, ২খ., পৃ. ২৮৬)। হত্যার জন্য আসিম ইন্ন ছাবিত প্রস্তুত হইতেই উকবা বলিল, ওহে কুরায়শ দল! আমি কিসের অপরাধে তোমাদের সম্মুখে নিহত হইতেছি? আসিম (রা) বলিলেন, আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলের প্রতি শত্রুতা পোষণের কারণে। রাসূলুল্লাহ (স) যখন তাহাকে হত্যা করার নির্দেশ দেন তখন উকবা বলিল, হে মুহাম্মাদ! তুমি কি কুরায়শদের সম্মুখেই আমাকে হত্যা করিবে? তিনি বলিলেন, হাঁ। তোমরা কি জান, এই লোক আমার সহিত কিরূপ আচরণ করিয়াছিল? আমি মাকামে ইবরাহীমের পিছনে সিজদারত ছিলাম। সে আমার ঘাড়ে পা রাখিয়া এমন জোর চাপ দিতে ছিল যে, আমি মনে করিলাম, আমার চক্ষুদ্বয় বুঝি ঠিকরাইয়া বাহির হইয়া যাইবে।
"আর একদিন আমি সিজদারত থাকা অবস্থায় সে বকরীর নাড়ীভুঁড়ি আনিয়া আমার মাথার উপর ফেলিয়া রাখিল। অতঃপর ফাতিমা আসিয়া উহা সরাইয়া ফেলে এবং আমার মাথা ধুইয়া দেয়। প্রকৃতপক্ষে এই দুই ব্যক্তি ছিল আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে সর্বনিকৃষ্ট নরাধম এবং ইসলামের প্রতি সর্বাধিক হিংসা-বিদ্বেষ ও শত্রুতা পোষণকারী, ইসলাম ও মুসলমানদের উদ্দেশ্যে সর্বাধিক ব্যঙ্গকারী কাফির। এইজন্যই রাসূলুল্লাহ (স) ইহাদিগকে হত্যার নির্দেশ দেন। এই দুইজন (অপর এক বর্ণনামতে তুআয়মা ইব্ন আদীসহ ৩ জন বন্দী) ব্যতীত অন্য কোনও বন্দীকে এইভাবে হত্যা করা হয় নাই (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ৩০৫-৩০৬; সুবুলুল হুদা, ৪খ., পৃ. ৬৩-৬৪)।
এই স্থানে রাসূলুল্লাহ (স) ফারওয়া ইন্ন আমর আল-বায়াদীর দাস আবূ হিন্দ-এর সাক্ষাত পান যিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ (স)-এর ক্ষৌরকার। তিনি খেজুর, ছাতু ও ঘি সমন্বয়ে তৈরীকৃত হায়স নামক খাবার রাসূলুল্লাহ (স)-কে হাদিয়া দেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাহা গ্রহণ করেন। আবূ হিন্দ বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন নাই। পরবর্তী সকল যুদ্ধেই তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত অংশগ্রহণ করেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার সম্পর্কে আনসারদিগকে ওসিয়াত করিয়া বলেন, আবূ হিন্দ আনসারদেরই লোক। তোমরা তাহাকে বিবাহ করাও এবং তাহার নিকট বিবাহ দাও। আনসারগণ এই নির্দেশ পালন করেন (ইন্ন হিশাম, আস-সীরা, ২খ., পৃ. ২৮৬; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ৩০৬)।
রাসূলুল্লাহ (স) সাহাবীগণসহ আর-রাওহা নামক স্থানে পৌঁছিলে মদীনার মুসলমানগণ বিজয়লাভের জন্য রাসূলুল্লাহ (স) ও বিজয়ী বীরদের স্বাগত জানাইতে থাকে। অতঃপর সালামা ইন্ন সালামা ইব্ন ওয়াশ তাহাদিগকে বলিলেন, তোমরা কিসের জন্য আমাদিগকে স্বাগত জানাইতেছ? আল্লাহর কসম! আমরা তো রক্তপণে দেওয়া মোটাসোটা পশুর ন্যায় একদল বৃদ্ধকে পাইয়াছিলাম, যাহাদের মস্তকের সম্মুখভাগের চুল পড়িয়া গিয়াছে। অতঃপর তাহাদিগকে আমরা যবেহ করিয়াছি। ইহা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স) মুচকি হাসিয়া বলিলেন, ওহে ভ্রাতুষ্পুত্র! উহারা তো কওমের সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি ও নেতা (আত-তাবারী, তারীখ, ২খ., পৃ. ৪৫৯; ইউসুফ সালিহী আশ-শামী, প্রাগুক্ত, ৪খ., পৃ. ৬২-৬৪)।
উসায়দ ইবন হুদায়র (রা) স্বাগত জানাইতে আসিয়া বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! সকল প্রশংসা আল্লাহ্ যিনি আপনাকে সফলতা দান করিয়াছেন এবং আপনার চক্ষু শীতল করিয়াছেন। ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহ্র কসম, আমি এই ধারণা করিয়া বদর যুদ্ধ হইতে পিছাইয়া থাকি নাই যে, আপনি শত্রুদের মুকাবিলা করিবেন, বরং আমি ধারণা করিয়াছিলাম যে, আপনি বাণিজ্য কাফেলার মুখামুখী হইবেন। যদি জানিতাম যে, শত্রুসৈন্যের মুকাবিলা করিবেন, তবে কখনও আমি পিছাইয়া থাকিতাম না। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তুমি সত্য বলিয়াছ (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ৩০৫)।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) রওয়ানা হইয়া বন্দীদের পৌঁছিবার একদিন পূর্বেই মদীনা পৌঁছিলেন। মদীনা ও উহার পার্শ্ববর্তী এলাকার সকল শত্রু তাঁহাকে ভয় পাইতে ও সমীহ করিয়া চলিতে লাগিল এবং মদীনার বহু লোক ইসলাম গ্রহণ করিল। এই সময় আবদুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সালূলও বাহ্যিকভাবে ইসলাম গ্রহণ করে। ইয়াহুদীগণ বলিল, আমরা নিশ্চিত হইলাম যে, তিনি সেই নবী যাঁহার প্রশংসা আমরা আমাদের তাওরাত কিতাবে পাইয়াছি। রাসূলুল্লাহ (স) ২২শে রামাদান বুধবার ছানিয়্যাতুল-ওয়াদা হইতে মদীনায় প্রবেশ করেন। মদীনার বালক-বালিকাগণ দফ বাজাইয়া এই শ্লোক গাহিয়া তাঁহাকে স্বাগত জানাইতে লাগিল: طلع البدر علينا + من ثنية الوداع وجب الشكر علينا + ما دعا لله داع "পূর্ণিমার পূর্ণ চন্দ্র ছানিয়্যাতুল ওয়াদা হইতে আমাদের নিকট উদিত হইয়াছে। তাই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা আমাদের জন্য অত্যাবশ্যক ঐ আহবানকারীর জন্য যিনি আল্লাহ্র প্রতি আহবান করিয়াছেন” (সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৪খ., পৃ. ৬৪)।
📄 বন্দীদের মদীনায় উপস্থিতি
অতঃপর মদীনায় পৌছিবার একদিন পর ২৩ রামাদান বন্দীদের মদীনায় আনয়ন করা হয়। তাহারা যখন মদীনা পৌঁছিল তখন উম্মুল মুমিনীন সাওদা বিন্ত যাম্'আ (রা) আফরা পরিবারের নিকট ছিলেন। তাহারা আওফ ও মুআওবিয ইব্ন আফরার শাহাদাতে মাতম করিতেছিল। ইহা ছিল পর্দার বিধান নাযিল হওয়ার পূর্বের ঘটনা। সাওদা (রা) বলেন, আল্লাহ্র কসম! আমি তাহাদের নিকট থাকিতেই সংবাদ পাইলাম যে, বন্দীদিগকে আনা হইয়াছে। আমি আমার ঘরে ফিরিয়া আসিলাম, রাসূলুল্লাহ (স) সেখানে ছিলেন। আমি আসিয়াই দেখিলাম, আবূ ইয়াযীদ সুহায়ল ইব্ন আমর হুজরা প্রাঙ্গণে উভয় হাত গলার সহিত রশি দ্বারা বাঁধা অবস্থায় রহিয়াছে। আবূ ইয়াযীদকে এই অবস্থায় দেখিয়া আমি আমার নফসকে সংবরণ করিতে পারিলাম না। বলিলাম, হে আবূ ইয়াযীদ! তোমাদিগকে হাত দেওয়া হইয়াছে, তোমরা কি সম্মানিত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করিতে পার না? আল্লাহ্র কসম! তখন গৃহের অভ্যন্তর হইতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর বাণীই আমার সম্বিত ফিরাইয়া দিল। তিনি বলিলেন, হে সাওদা! আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলের সিদ্ধান্তের উপর তুমি কি তাহাদিগকে অনুপ্রাণিত করিতেছ? আমি বলিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! সেই সত্তার কসম যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করিয়াছেন! আমি আবূ ইয়াযীদকে তাহার হস্তদ্বয় গলার সহিত বাঁধা অবস্থায় দেখিয়া আর নিজেকে সম্বরণ করিতে পারি নাই, তাই যাহা ইচ্ছা বলিয়া ফেলিয়াছি (আত-তাবারী, তারীখ, ২খ., পৃ. ৪৬০; ইব্ন হিশাম, আস-সীরা, ২খ., পৃ. ২৮৬-৮৭)। এক বর্ণনায় ইহাও আছে যে, তিনি বলিয়াছিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করুন (ইউসুফ সালিহী আশ-শামী, প্রাগুক্ত, ৪খ., পৃ. ৬৫)। আবূ ইয়াযীদ সুহায়ল ইব্ন আমরকে দেখিয়া উসামা ইব্ন যায়দ (রা) বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এই ব্যক্তি লোকজনকে ছারীদ (গোশতের ঝোল মিশ্রিত রুটি) আহার করাইত। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, এই আবূ ইয়াযীদ লোকজনকে খাদ্য প্রদান করিত ঠিকই, কিন্তু আল্লাহর নূর নির্বাপিত করার চেষ্টাও করিয়াছিল। তাই আল্লাহ তাহাকে পাকড়াও করাইয়াছেন (প্রাগুক্ত, ৪খ., পৃ. ৬৫-৬৬)।
📄 বন্দীদের সহিত সদ্ব্যবহার
বন্দীগণ মদীনায় পৌছিবার পর রাসূলুল্লাহ (স) সঙ্গীদের হইতে তাহাদিগকে পৃথক করিয়া দিলেন এবং সকলকে নির্দেশ দিলেন বন্দীদের সহিত সদ্ব্যবহার করিতে। মদীনার প্রথম দাঈ ও মু'আল্লিম মুস'আব ইবন উমায়র (রা)-এর সহোদর (এক বর্ণনামতে বৈমাত্রেয় ভ্রাতা) আবূ আযীয ইবন উমায়র ইবন হিশাম ছিলেন একজন বন্দী। তিনি বলেন, আমার ভ্রাতা মুস'আব ইবন উমায়র আমার নিকট দিয়া যাইতেছিলেন। তখন আনসারদের এক লোক আমাকে বাঁধিতেছিল। মুস'আব সেই আনসারীকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, তোমার উভয় হস্ত তাহার সহিত মজবুত করিয়া বাঁধ। কারণ তাহার মাতা সম্পদশালিনী। সে হয়ত বা মোটা অংকের পণ দিয়া তোমার নিকট হইতে উহাকে ছাড়াইয়া লইবে। আমি বলিলাম, হে ভ্রাত! আমার তুলনায় ইহারাই কি তোমার আপনজন? মুস'আব বলিলেন, তুমি ছাড়া সে-ই আমার ভাই। অতঃপর তাহার মাতা জিজ্ঞাসা করিয়া পাঠাইল যে, একজন বন্দীর বিনিময়ে সর্বোচ্চ কত পণ দেওয়া হইয়াছে? তাহাকে বলা হইল, চার হাজার দিরহাম। অতএব তিনি তাহার পণস্বরূপ চার হাজার দিরহাম পাঠাইয়া দিলেন। আবূ আযীয বলেন, আমাকে যখন বদর প্রান্তর হইতে লইয়া আসা হয় তখন আমি আনসারদের একটি দলের সহিত ছিলাম। দুপুর এবং রাত্রের খাবার যখন দেওয়া হইত তখন আমাকে রুটি প্রদান করিয়া তাহারা কেবল খেজুর খাইত। কারণ রাসূলুল্লাহ (স) আমাদের সহিত ভাল ব্যবহার করার জন্য তাহাদিগকে উপদেশ দিয়াছিলেন। তাহাদের কাহারও ভাগে এক টুকরা রুটি মিলিলে সে তাহা আমাকে দিয়া দিত। ইহাতে আমি লজ্জাবোধ করিয়া তাহাদের কাহাকেও উহা ফেরত দিতাম। কিন্তু সে উহা স্পর্শও করিত না; বরং আমাকে আবার ফিরাইয়া দিত (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ৩০৬; ইব্ন হিশাম, আসী-সীরা, ২খ., পৃ. ২৮৬-৮৭)।
📄 বন্দীদের সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণ
বন্দীদের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (স) সাহাবীদের নিকট পরামর্শ চাহিয়া বলিলেন, এই সকল বন্দীর ব্যাপারে তোমাদের মতামত কি? আল্লাহ তাহাদের ব্যাপারে তোমাদিগকে কর্তৃত্ব প্রদান করিয়াছেন। তাহারা গতকল্যও ছিল তোমাদের ভাই। আবূ বাক্ (রা) বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! ইহারা আপনার আহ্ল ও আপনার কওম। আল্লাহ আপনাকে সফলতা দান করিয়াছেন এবং তাহাদের উপর আপনাকে বিজয় দান করিয়াছেন। উহারা আমাদের চাচার বংশধর, নিকটাত্মীয় ও আপনজন। তাহাদিগকে বাঁচাইয়া রাখুন। আমার মত হইল, তাহাদের নিকট হইতে ফিদইয়া (মুক্তিপণ) গ্রহণ করা হউক। তাহাদের নিকট হইতে আমরা যাহা গ্রহণ করিব তাহা কাফিরদের বিরুদ্ধে আমাদের জন্য শক্তি হইবে। আর হয়ত বা আল্লাহ আপনার মাধ্যমে তাহাদিগকে হিদায়াত দান করিবেন, যাহার ফলে তাহারা আপনার জন্য সাহায্যকারী হইবে।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তুমি কি বল, হে ইবনুল খাত্তাব? উমার (রা) বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তাহারা আপনাকে বহিষ্কার করিয়াছে এবং আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিয়াছে। আবূ বাক্ (রা) যেমত ব্যক্ত করিয়াছেন, আমার মত তাহা নহে। আমার মত হইল, অমুকের (উমার-এর নিকটাত্মীয়) ব্যাপারে আমাকে ক্ষমতা দিন। আমি তাহার গর্দান উড়াইয়া দেই। আলীকে আকীলের ব্যাপারে ক্ষমতা দিন, সে তাহার গর্দান উড়াইয়া দিক। হামযাকে অমুকের (তাহার ভ্রাতা) ব্যাপারে ক্ষমতা দিন, সে তাহার গর্দান উড়াইয়া দিক যাহাতে জানিতে পারেন যে, মুশরিকদের ব্যাপারে আমাদের অন্তরে কোনরূপ ভালবাসা ও সহানুভূতি নাই। ইহারা কুরায়শদের সরদার, নেতা ও নীতি নির্ধারক। তাই ইহাদের গর্দান উড়াইয়া দিন।
আবদুল্লাহ ইব্ন রাওয়াহা (রা) বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এমন একটি উপত্যকা খোঁজ করুন যেখানে বহু কাষ্ঠখণ্ড রহিয়াছে। ইহাদিগকে সেখানে নিয়া আগুনে জ্বালাইয়া দিন। আব্বাস (রা) তাহার কথা শুনিতেছিলেন। তিনি বলিলেন, তুমি আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করিলে (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ২৯৬-৯৭; ইউসুফ সালিহী আশ-শামী, প্রাগুক্ত, ৪খ., পৃ. ৬০)।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) গৃহে প্রবেশ করিলেন। তখন কিছু লোক বলিল, তিনি উমার (রা)-এর মতই গ্রহণ করিবেন। আর কিছু লোক বলিল, তিনি আবদুল্লাহ ইব্ন রাওয়াহা (রা)-এর মতই গ্রহণ করিবেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) বাহির হইয়া আসিয়া বলিলেন, আল্লাহ তা'আলা কিছু লোকের অন্তর নরম করিয়া দেন, এমনকি তাহা দুধের তুলনায়ও নরম হইয়া যায়। আবার আল্লাহ তা'আলা কিছু লোকের অন্তর শক্ত করিয়া দেন, এমনকি তাহা পাথরের তুলনায়ও শক্ত হইয়া যায়। হে আবূ বাক্! ফেরেশতাদের মধ্যে তোমার উদাহরণ হইল মীকাঈল (আ); তিনি রহমতসহ নাযিল হন এবং নবীদের মধ্যে তোমার উদাহরণ হইল ইবরাহীম (আ)। তিনি বলিয়াছেন: فَمَنْ تَبِعَنِي فَإِنَّهُ مِنِّى وَمَنْ عَصَانِي فَإِنَّكَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ.
"সুতরাং যে আমার অনুসরণ করিবে সেই আমার দলভুক্ত, কিন্তু কেহ আমার অবাধ্য হইলে তুমি তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু" (১৪:৩৬)।
আবূ বাক্স! তোমার আরও উদাহরণ হইল ঈসা ইবন মারয়াম (আ)। তিনি বলিয়াছেন: إِنْ تُعَذِّبْهُمْ فَإِنَّهُمْ عِبَادُكَ وَأَنْ تَغْفِرْ لَهُمْ فَإِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ.
"তুমি যদি তাহাদিগকে শান্তি দাও তবে তাহারা তো তোমারই বান্দা। আর তুমি যদি তাহাদিগকে ক্ষমা কর তবে তুমি তো পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়" (৫: ১১৮)।
আর হে উমার! ফেরেশতাদের মধ্যে তোমার উদাহরণ হইল, জিবরীল (আ)। তিনি আল্লাহ্ শত্রুদের প্রতি কঠোর। তিনি প্রতিশোধের মনোভাব লইয়া অবতরণ করেন। আর নবীদের মধ্যে তোমার উদাহরণ হইল নূহ (আ)। তিনি বলিয়াছেন: رَبِّ لَا تَذَرْ عَلَى الْأَرْضِ مِنَ الْكَافِرِينَ دَيَّارًا.
"হে আমার প্রতিপালক! পৃথিবীতে কাফিরগণের মধ্য হইতে কোন গৃহবাসীকে অব্যাহতি দিও না” (৭১: ৩৬)।
নবীদের মধ্যে তোমার আরও উদাহরণ হইল মূসা (আ)। তিনি বলিয়াছেন: ربَّنَا اطْمِسَ عَلَى أَمْوَالِهِمْ وَاشْدُدْ عَلى قُلُوبِهِمْ فَلَا يُؤْمِنُوا حَتَّى يَرَوْا الْعَذَابَ الْأَلِيمَ.
“হে আমাদের প্রতিপালক! উহাদের সম্পদ বিনষ্ট কর, উহাদের হৃদয় মোহর করিয়া দাও, উহারা তো মর্মন্তুদ শাস্তি প্রত্যক্ষ না করা পর্যন্ত ঈমান আনিবে না" (১০:৮৮)।
তোমরা উভয়ে যদি একমত হইতে তবে আমি তোমাদের মতের খেলাফ করিতাম না। তোমরা ছায়াতুল্য। তাই তোমাদের কেহ মুক্তিপণ অথবা হত্যা করা ব্যতীত ছাড়িবে না।
আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! সুহায়ল ইব্ন বায়দা ব্যতীত। কারণ আমি তাহাকে ইসলামের কথা বলিতে শুনিয়াছি। রাসূলুল্লাহ (সা) চুপ করিয়া রহিলেন।
আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) বলেন, ইহাতে আমি ভীত হইয়া পড়িলাম এই কারণে যে, আমার উপর আকাশ হইতে প্রস্তর বর্ষিত হয় কিনা! অবশেষে রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, সুহায়ল ইব্ন বায়দা ব্যতীত (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ২৯৭-৯৮; সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৪খ., পৃ. ৬০-৬১)।
অতঃপর মুক্তিপণ লইয়া তাহাদিগকে ছাড়িয়া দেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হইলে আল্লাহ তা'আলা এই আয়াত নাযিল করিলেন:
مَا كَانَ لِلنَّبِيِّ أَنْ يَكُونَ لَهُ أَسْرَى حَتَّى يُشْخِنَ فِي الْأَرْضِ تُرِيدُونَ عَرَضَ الدُّنْيَا وَاللَّهُ يَرِيدُ الْآخِرَةَ وَاللهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ لَوْلا كِتَابٌ مِّنَ اللَّهِ سَبَقَ لَمَسَّكُمْ فِيْمَا أَخَذْتُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ.
“দেশে ব্যাপকভাবে শত্রুকে পরাভূত না করা পর্যন্ত বন্দী রাখা কোন নবীর জন্য সংগত নহে। তোমরা কামনা কর পার্থিব সম্পদ এবং আল্লাহ চাহেন পরলোকের কল্যাণ। আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। আল্লাহ্র পূর্ব বিধান না থাকিলে তোমরা যাহা গ্রহণ করিয়াছ তজ্জন্য তোমাদের উপর মহাশান্তি আপতিত হইত" (৮:৬৭-৬৮)।
পরদিন সকালবেলা উমার (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট গিয়া দেখিলেন যে, তিনি ও আবূ বাক্র উভয়ে কাঁদিতেছেন। তিনি বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনারা কিজন্য কাঁদিতেছেন? তাহা শুনিয়া আমার যদি ক্রন্দন আসে তবে আমিও কাঁদিব, আর না আসিলে আপনাদের ক্রন্দনের কারণে আমি ক্রন্দনের ভান করিব। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, ইবনুল খাত্তাবের মতের বিরোধিতা করার কারণে আমাদের উপর প্রায় আযাব আসিয়াই পড়িয়াছিল! যদি আযাব আসিয়াই পড়িত তবে ইবনুল খাত্তাব ব্যতীত আর কেহই রক্ষা পাইত না। তিনি নিকটবর্তী একটি বৃক্ষ দেখাইয়া বলিলেন, শান্তি আমার নিকট পেশ করা হইয়াছিল যাহা ছিল এই বৃক্ষ হইতেও নিকটবর্তী (সুবুলুল হুদা, ৪খ, ৬১)।