📄 মদীনায় বিজয়ের সুসংবাদ প্রেরণ
বদর যুদ্ধে জয়লাভের পর মদীনায় উহার সংবাদ প্রেরণের জন্য রাসূলুল্লাহ (স) আবদুল্লাহ ইন্ন রাওয়াহা (রা)-কে মদীনার উচ্চ ভূমিতে এবং যায়দ ইবন হারিছা (রা)-কে মদীনার নিম্নভূমিতে প্রেরণ করিলেন। তাঁহারা আল-আকীক নামক স্থান হইতে পৃথক হইয়া গেলেন এবং উভয়ে রবিবার বেলা বিদ্বপ্রহরের পূর্বেই মদীনায় আসিয়া পৌছিলেন। ইবন রাওয়াহা (রা) তাঁহার সওয়ারীতে থাকিয়া ঘোষণা করিতেছিলেন, হে আনসার সম্প্রদায়! তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ কর যে, রাসূলুল্লাহ (স) নিরাপদ আছেন এবং মুশরিকগণ নিহত ও বন্দী হইয়াছে। রাবী'আর পুত্রদ্বয় (উতবা ও শায়বা), আল-হাজ্জাজের পুত্রদ্বয় (নুবায়হ ও মুনাব্বিহ), আবূ জাহল ইব্ন হিশাম, যাম'আ ইবনুল আসওয়াদ ও উমায়্যা ইব্ন খালাফ নিহত হইয়াছে এবং সুহায়ল ইব্ন আমর বন্দী হইয়াছে। আসিম ইব্ন আদী (রা) বলেন, আমি তাঁহার মুখামুখী দাঁড়াইয়া বলিলাম, তুমি যাহা বলিতেছ তাহা কি ঠিক হে ইব্ন রাওয়াহা? তিনি বলিলেন, হাঁ, আল্লাহ্র কসম! আগামী কালই রাসূলুল্লাহ (স) বন্দীদের লইয়া ফিরিয়া আসিবেন। তিনি মদীনার উচ্চভূমিতে অবস্থিত আনসারদের বাড়ি বাড়ি গিয়া এই সংবাদ পৌঁছাইয়া দিতেছিলেন। বালকগণও তাঁহার সঙ্গে যাইতেছিল এবং বলিতেছিল, পাপিষ্ঠ আবু জাহল নিহত হইয়াছে। এইভাবে তিনি বনূ উমায়্যা ইবন যায়দ-এর বাড়ি পর্যন্ত গিয়া পৌছিলেন (ইউসুফ সালিহী আশ-শামী, প্রাগুক্ত, ৪খ., পৃ. ৫৭; ইব্ন হিশাম, আস-সীরা, ২খ., পৃ. ২৮৪)।
অপরদিকে যায়দ ইব্ন হারিছা (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর আল-কাসওয়া বা আল-আদবা নামক উষ্ট্রীর পিঠে আরোহণ করিয়া মদীনার নিম্নভূমিতে বসবাসকারী সাহাবীদিগকে সুসংবাদ শুনাইতে লাগিলেন। উসামা ইব্ন যায়দ (রা) বলেন, আমরা তখন জান্নাতুল বাকীতে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কন্যা রুকায়্যার কবরের মাটি সমান করিতেছিলাম। তিনি উছমান (রা)-এর স্ত্রী ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে ও উছমান (রা)-কে তাঁহার সেবা-শুশ্রূষার জন্য রাখিয়া গিয়াছিলেন। তখন আমাদের নিকট সংবাদ আসিল যায়দ ইব্ন্ন হারিছা (রা) আসিয়াছেন। আমি তাড়াতাড়ি তাঁহার নিকট গেলাম। তিনি তখন মসজিদে অবস্থান করিতেছিলেন, আর লোকজন তাঁহাকে ঘিরিয়া ধরিয়াছিল। তিনি বলিতেছিলেন, উতবা ইবন রাবী'আ, শায়বা ইবন রাবী'আ, আবু জাহল ইব্ন হিশাম, যাম'আ ইবনুল আসওয়াদ, আবুল বাখতারী, আল-আস ইবন হিশাম, উমায়্যা ইব্ন খালাফ, নুবায়হ ও মুনাব্বিহ ইবনুল হাজ্জাজ নিহত হইয়াছে এবং সুহায়ল ইব্ন আমরসহ অনেকে বন্দী হইয়াছে। উসামা (রা) বলেন, তখন আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, হে পিতা! ইহা কি সত্য? তিনি বলিলেন, হাঁ, আল্লাহর কসম। হে বৎস (প্রাগুক্ত)।
এক বর্ণনামতে কিছু লোক যায়দ ইব্ন হারিছা (রা)-এর কথা বিশ্বাস করিতেছিল না। তাহারা বলিতেছিল, যায়দ পরাজিত হইয়া ফিরিয়া আসিয়াছে। ইহাতে মুসলমানগণ রাগান্বিত ও শঙ্কিত হইয়া পড়িল। উসামা ইব্ন যায়দ (রা) বলেন, ইহার ফলে আমি বন্দীদিগকে না দেখা পর্যন্ত তাহার কথা বিশ্বাস করিতে পারি নাই। এক মুনাফিক আবু লুবাবা ইব্ন আবদিল মুনযিরকে বলিল, তোমাদের সঙ্গীগণ এমনভাবে বিভক্ত হইয়া পড়িয়াছে যে, আর কখনও একত্র হইতে পারিবে না। আর তাঁহার নেতৃস্থানীয় সাহাবীগণ নিহত হইয়াছে। মুহাম্মাদ নিহত হইয়াছে। এই তাঁহার উস্ত্রী, উহা আমরা চিনি। আর এই যায়দ, ভয় ও আতঙ্কের কারণে কি বলিতেছে তাহা সে নিজেই জানে না। সে পরাজিত হইয়াই আসিয়াছে। আবূ লুবাবা (রা) বলিলেন, আল্লাহ তোমার কথা মিথ্যা প্রতিপন্ন করুন। ইয়াহুদীগণও বলিত লাগিল, সে পরাজিত হইয়াই আসিয়াছে।
উসামা ইবন যায়দ (রা) বলেন, আমি একান্তে আমার পিতার নিকট গিয়া বলিলাম, হে পিত! আপনি যাহা বলিতেছেন তাহা কি সত্য? তিনি বলিলেন, হাঁ, আল্লাহর কসম! আমি যাহা বলিতেছি তাহা সত্য হে বৎস। তখন আমি মনে একটু শক্তি পাইলাম এবং উক্ত মুনাফিকের নিকট আসিয়া বলিলাম, তুমিই রাসূলুল্লাহ (স) ও মুসলমানদের সম্পর্কে অপপ্রচারকারী। রাসূলুল্লাহ (স) ফিরিয়া আসিলে আমরা অবশ্যই তোমাকে তাঁহার সম্মুখে হাযির করিব এবং তিনি তোমার গর্দান উড়াইয়া দিবেন। তখন সে বলিল, হে আবু মুহাম্মাদ! ইহা লোকজনের মুখে আমার শোনা কথা (সুবুলুল হুদা, প্রাগুক্ত, ৪খ., পৃ. ৫৭-৫৮)।
📄 রাসূলুল্লাহ (স) ও মুসলমানদের মদীনায় প্রত্যাবর্তন
পূর্বেই উল্লিখিত হইয়াছে যে, বদর যুদ্ধ শুরু হয় দ্বিতীয় হি. ১৭ই রামাদান শুক্রবার সকালবেলা। সূর্য হেলিয়া পড়িবার পূর্বেই মুসলমানগণ বিজয়লাভ করেন। তিনদিন সেখানে অবস্থানের পর সোমবার রাত্রিবেলা রাসূলুল্লাহ (স) সকলকে লইয়া রওয়ানা হন। উষ্ট্রে আরোহণ করিয়া তিনি বদরের কূপের নিকট দাঁড়াইয়া কুরায়শ নেতৃবন্দকে সম্বোধন করেন। অতঃপর বন্দী ও গনীমতসহ তিনি সম্মুখে অগ্রসর হন। বন্দীদের সংখ্যা সম্পর্কে কিছুটা মতভেদ রহিয়াছে। ইবন জারীর আত-তাবারী ৪৪ জনের কথা উল্লেখ করিয়াছেন (আত-তাবারী, তারীখ, ২খ, পৃ. ৪৫৯)। তবে প্রসিদ্ধ বর্ণনামতে ৭০ জন। বন্দীদের মধ্যে উকবা ইব্ন আবী মু'আয়ত ও আন-নাদর ইবনুল হারিছ ইব্ন কালাদাও ছিল। অতঃপর তিনি মাদীক ও নাযিয়া-এর মধ্যবর্তী সায়র নামক স্থানে একটি বড় বৃক্ষের নিচে অবতরণ করিয়া গনীমত বণ্টন করেন। অতঃপর সেখান হইতে রওয়ানা হইয়া আস-সাফরা নামক স্থানে আসিলে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নির্দেশে বন্দী আন-নাদর ইব্নুল হারিছকে হত্যা করা হয়। আলী ইব্ন আবী তালিব (রা) তাহাকে হত্যা করেন (ইব্ন হিশাম, আস-সীরা, ২খ., পৃ. ২৮৫)। পরবর্তী কালে তাহার কন্যা কুতায়লা বিনতুন নাদর স্বীয় পিতার শোকে এক মর্মস্পর্শী কবিতা রচনা ও আবৃত্তি করেন। তাহা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর হৃদয় বিগলিত হইয়াছিল এবং অশ্রুতে তাঁহার দাড়ি মুবারক ভিজিয়া গিয়াছিল। তিনি আবূ বকর (রা)-কে বলিয়াছিলেন, আমি পূর্বে তাহার এই কবিতা শুনিলে তাহার পিতাকে হত্যা করিবার নির্দেশ দিতাম না (সুবুলুল হুদা, প্রাগুক্ত, ৪খ., পৃ. ৬৩-৬৪)।
অতঃপর ইরকুজ জাবয়া নামক স্থানে পৌছিয়া রাসূলুল্লাহ (স) অপর এক বন্দী উকবা ইব্ন আবী মু'আয়তকে হত্যার নির্দেশ দেন। উকবা বলিল, হে মুহাম্মাদ! বাচ্চাদের কে দেখাশুনা করিবে? তিনি বলিলেন, জাহান্নামের আগুন। আসিম ইবন হাবিত আনসারী (রা) ইব্ন হিশাম-এর এক বর্ণনামতে আলী (রা) তাহাকে হত্যা করেন (ইব্ন হিশাম, আস-সীরা, ২খ., পৃ. ২৮৬)। হত্যার জন্য আসিম ইন্ন ছাবিত প্রস্তুত হইতেই উকবা বলিল, ওহে কুরায়শ দল! আমি কিসের অপরাধে তোমাদের সম্মুখে নিহত হইতেছি? আসিম (রা) বলিলেন, আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলের প্রতি শত্রুতা পোষণের কারণে। রাসূলুল্লাহ (স) যখন তাহাকে হত্যা করার নির্দেশ দেন তখন উকবা বলিল, হে মুহাম্মাদ! তুমি কি কুরায়শদের সম্মুখেই আমাকে হত্যা করিবে? তিনি বলিলেন, হাঁ। তোমরা কি জান, এই লোক আমার সহিত কিরূপ আচরণ করিয়াছিল? আমি মাকামে ইবরাহীমের পিছনে সিজদারত ছিলাম। সে আমার ঘাড়ে পা রাখিয়া এমন জোর চাপ দিতে ছিল যে, আমি মনে করিলাম, আমার চক্ষুদ্বয় বুঝি ঠিকরাইয়া বাহির হইয়া যাইবে।
"আর একদিন আমি সিজদারত থাকা অবস্থায় সে বকরীর নাড়ীভুঁড়ি আনিয়া আমার মাথার উপর ফেলিয়া রাখিল। অতঃপর ফাতিমা আসিয়া উহা সরাইয়া ফেলে এবং আমার মাথা ধুইয়া দেয়। প্রকৃতপক্ষে এই দুই ব্যক্তি ছিল আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে সর্বনিকৃষ্ট নরাধম এবং ইসলামের প্রতি সর্বাধিক হিংসা-বিদ্বেষ ও শত্রুতা পোষণকারী, ইসলাম ও মুসলমানদের উদ্দেশ্যে সর্বাধিক ব্যঙ্গকারী কাফির। এইজন্যই রাসূলুল্লাহ (স) ইহাদিগকে হত্যার নির্দেশ দেন। এই দুইজন (অপর এক বর্ণনামতে তুআয়মা ইব্ন আদীসহ ৩ জন বন্দী) ব্যতীত অন্য কোনও বন্দীকে এইভাবে হত্যা করা হয় নাই (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ৩০৫-৩০৬; সুবুলুল হুদা, ৪খ., পৃ. ৬৩-৬৪)।
এই স্থানে রাসূলুল্লাহ (স) ফারওয়া ইন্ন আমর আল-বায়াদীর দাস আবূ হিন্দ-এর সাক্ষাত পান যিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ (স)-এর ক্ষৌরকার। তিনি খেজুর, ছাতু ও ঘি সমন্বয়ে তৈরীকৃত হায়স নামক খাবার রাসূলুল্লাহ (স)-কে হাদিয়া দেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাহা গ্রহণ করেন। আবূ হিন্দ বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন নাই। পরবর্তী সকল যুদ্ধেই তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত অংশগ্রহণ করেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার সম্পর্কে আনসারদিগকে ওসিয়াত করিয়া বলেন, আবূ হিন্দ আনসারদেরই লোক। তোমরা তাহাকে বিবাহ করাও এবং তাহার নিকট বিবাহ দাও। আনসারগণ এই নির্দেশ পালন করেন (ইন্ন হিশাম, আস-সীরা, ২খ., পৃ. ২৮৬; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ৩০৬)।
রাসূলুল্লাহ (স) সাহাবীগণসহ আর-রাওহা নামক স্থানে পৌঁছিলে মদীনার মুসলমানগণ বিজয়লাভের জন্য রাসূলুল্লাহ (স) ও বিজয়ী বীরদের স্বাগত জানাইতে থাকে। অতঃপর সালামা ইন্ন সালামা ইব্ন ওয়াশ তাহাদিগকে বলিলেন, তোমরা কিসের জন্য আমাদিগকে স্বাগত জানাইতেছ? আল্লাহর কসম! আমরা তো রক্তপণে দেওয়া মোটাসোটা পশুর ন্যায় একদল বৃদ্ধকে পাইয়াছিলাম, যাহাদের মস্তকের সম্মুখভাগের চুল পড়িয়া গিয়াছে। অতঃপর তাহাদিগকে আমরা যবেহ করিয়াছি। ইহা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স) মুচকি হাসিয়া বলিলেন, ওহে ভ্রাতুষ্পুত্র! উহারা তো কওমের সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি ও নেতা (আত-তাবারী, তারীখ, ২খ., পৃ. ৪৫৯; ইউসুফ সালিহী আশ-শামী, প্রাগুক্ত, ৪খ., পৃ. ৬২-৬৪)।
উসায়দ ইবন হুদায়র (রা) স্বাগত জানাইতে আসিয়া বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! সকল প্রশংসা আল্লাহ্ যিনি আপনাকে সফলতা দান করিয়াছেন এবং আপনার চক্ষু শীতল করিয়াছেন। ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহ্র কসম, আমি এই ধারণা করিয়া বদর যুদ্ধ হইতে পিছাইয়া থাকি নাই যে, আপনি শত্রুদের মুকাবিলা করিবেন, বরং আমি ধারণা করিয়াছিলাম যে, আপনি বাণিজ্য কাফেলার মুখামুখী হইবেন। যদি জানিতাম যে, শত্রুসৈন্যের মুকাবিলা করিবেন, তবে কখনও আমি পিছাইয়া থাকিতাম না। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তুমি সত্য বলিয়াছ (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ৩০৫)।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) রওয়ানা হইয়া বন্দীদের পৌঁছিবার একদিন পূর্বেই মদীনা পৌঁছিলেন। মদীনা ও উহার পার্শ্ববর্তী এলাকার সকল শত্রু তাঁহাকে ভয় পাইতে ও সমীহ করিয়া চলিতে লাগিল এবং মদীনার বহু লোক ইসলাম গ্রহণ করিল। এই সময় আবদুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সালূলও বাহ্যিকভাবে ইসলাম গ্রহণ করে। ইয়াহুদীগণ বলিল, আমরা নিশ্চিত হইলাম যে, তিনি সেই নবী যাঁহার প্রশংসা আমরা আমাদের তাওরাত কিতাবে পাইয়াছি। রাসূলুল্লাহ (স) ২২শে রামাদান বুধবার ছানিয়্যাতুল-ওয়াদা হইতে মদীনায় প্রবেশ করেন। মদীনার বালক-বালিকাগণ দফ বাজাইয়া এই শ্লোক গাহিয়া তাঁহাকে স্বাগত জানাইতে লাগিল: طلع البدر علينا + من ثنية الوداع وجب الشكر علينا + ما دعا لله داع "পূর্ণিমার পূর্ণ চন্দ্র ছানিয়্যাতুল ওয়াদা হইতে আমাদের নিকট উদিত হইয়াছে। তাই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা আমাদের জন্য অত্যাবশ্যক ঐ আহবানকারীর জন্য যিনি আল্লাহ্র প্রতি আহবান করিয়াছেন” (সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৪খ., পৃ. ৬৪)।
📄 বন্দীদের মদীনায় উপস্থিতি
অতঃপর মদীনায় পৌছিবার একদিন পর ২৩ রামাদান বন্দীদের মদীনায় আনয়ন করা হয়। তাহারা যখন মদীনা পৌঁছিল তখন উম্মুল মুমিনীন সাওদা বিন্ত যাম্'আ (রা) আফরা পরিবারের নিকট ছিলেন। তাহারা আওফ ও মুআওবিয ইব্ন আফরার শাহাদাতে মাতম করিতেছিল। ইহা ছিল পর্দার বিধান নাযিল হওয়ার পূর্বের ঘটনা। সাওদা (রা) বলেন, আল্লাহ্র কসম! আমি তাহাদের নিকট থাকিতেই সংবাদ পাইলাম যে, বন্দীদিগকে আনা হইয়াছে। আমি আমার ঘরে ফিরিয়া আসিলাম, রাসূলুল্লাহ (স) সেখানে ছিলেন। আমি আসিয়াই দেখিলাম, আবূ ইয়াযীদ সুহায়ল ইব্ন আমর হুজরা প্রাঙ্গণে উভয় হাত গলার সহিত রশি দ্বারা বাঁধা অবস্থায় রহিয়াছে। আবূ ইয়াযীদকে এই অবস্থায় দেখিয়া আমি আমার নফসকে সংবরণ করিতে পারিলাম না। বলিলাম, হে আবূ ইয়াযীদ! তোমাদিগকে হাত দেওয়া হইয়াছে, তোমরা কি সম্মানিত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করিতে পার না? আল্লাহ্র কসম! তখন গৃহের অভ্যন্তর হইতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর বাণীই আমার সম্বিত ফিরাইয়া দিল। তিনি বলিলেন, হে সাওদা! আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলের সিদ্ধান্তের উপর তুমি কি তাহাদিগকে অনুপ্রাণিত করিতেছ? আমি বলিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! সেই সত্তার কসম যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করিয়াছেন! আমি আবূ ইয়াযীদকে তাহার হস্তদ্বয় গলার সহিত বাঁধা অবস্থায় দেখিয়া আর নিজেকে সম্বরণ করিতে পারি নাই, তাই যাহা ইচ্ছা বলিয়া ফেলিয়াছি (আত-তাবারী, তারীখ, ২খ., পৃ. ৪৬০; ইব্ন হিশাম, আস-সীরা, ২খ., পৃ. ২৮৬-৮৭)। এক বর্ণনায় ইহাও আছে যে, তিনি বলিয়াছিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করুন (ইউসুফ সালিহী আশ-শামী, প্রাগুক্ত, ৪খ., পৃ. ৬৫)। আবূ ইয়াযীদ সুহায়ল ইব্ন আমরকে দেখিয়া উসামা ইব্ন যায়দ (রা) বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এই ব্যক্তি লোকজনকে ছারীদ (গোশতের ঝোল মিশ্রিত রুটি) আহার করাইত। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, এই আবূ ইয়াযীদ লোকজনকে খাদ্য প্রদান করিত ঠিকই, কিন্তু আল্লাহর নূর নির্বাপিত করার চেষ্টাও করিয়াছিল। তাই আল্লাহ তাহাকে পাকড়াও করাইয়াছেন (প্রাগুক্ত, ৪খ., পৃ. ৬৫-৬৬)।
📄 বন্দীদের সহিত সদ্ব্যবহার
বন্দীগণ মদীনায় পৌছিবার পর রাসূলুল্লাহ (স) সঙ্গীদের হইতে তাহাদিগকে পৃথক করিয়া দিলেন এবং সকলকে নির্দেশ দিলেন বন্দীদের সহিত সদ্ব্যবহার করিতে। মদীনার প্রথম দাঈ ও মু'আল্লিম মুস'আব ইবন উমায়র (রা)-এর সহোদর (এক বর্ণনামতে বৈমাত্রেয় ভ্রাতা) আবূ আযীয ইবন উমায়র ইবন হিশাম ছিলেন একজন বন্দী। তিনি বলেন, আমার ভ্রাতা মুস'আব ইবন উমায়র আমার নিকট দিয়া যাইতেছিলেন। তখন আনসারদের এক লোক আমাকে বাঁধিতেছিল। মুস'আব সেই আনসারীকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, তোমার উভয় হস্ত তাহার সহিত মজবুত করিয়া বাঁধ। কারণ তাহার মাতা সম্পদশালিনী। সে হয়ত বা মোটা অংকের পণ দিয়া তোমার নিকট হইতে উহাকে ছাড়াইয়া লইবে। আমি বলিলাম, হে ভ্রাত! আমার তুলনায় ইহারাই কি তোমার আপনজন? মুস'আব বলিলেন, তুমি ছাড়া সে-ই আমার ভাই। অতঃপর তাহার মাতা জিজ্ঞাসা করিয়া পাঠাইল যে, একজন বন্দীর বিনিময়ে সর্বোচ্চ কত পণ দেওয়া হইয়াছে? তাহাকে বলা হইল, চার হাজার দিরহাম। অতএব তিনি তাহার পণস্বরূপ চার হাজার দিরহাম পাঠাইয়া দিলেন। আবূ আযীয বলেন, আমাকে যখন বদর প্রান্তর হইতে লইয়া আসা হয় তখন আমি আনসারদের একটি দলের সহিত ছিলাম। দুপুর এবং রাত্রের খাবার যখন দেওয়া হইত তখন আমাকে রুটি প্রদান করিয়া তাহারা কেবল খেজুর খাইত। কারণ রাসূলুল্লাহ (স) আমাদের সহিত ভাল ব্যবহার করার জন্য তাহাদিগকে উপদেশ দিয়াছিলেন। তাহাদের কাহারও ভাগে এক টুকরা রুটি মিলিলে সে তাহা আমাকে দিয়া দিত। ইহাতে আমি লজ্জাবোধ করিয়া তাহাদের কাহাকেও উহা ফেরত দিতাম। কিন্তু সে উহা স্পর্শও করিত না; বরং আমাকে আবার ফিরাইয়া দিত (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ৩০৬; ইব্ন হিশাম, আসী-সীরা, ২খ., পৃ. ২৮৬-৮৭)।