📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 কতিপয় কুরায়শ যুবকের পরিণতি

📄 কতিপয় কুরায়শ যুবকের পরিণতি


এই যুদ্ধে কাফির কুরায়শদের সহিত তাহাদের কিছু যুবক নিহত হয়, যাহাদের সম্পর্কে এই আয়াত নাযিল হয়: إِنَّ الَّذِينَ تَوَفَّهُمُ الْمَلَئِكَةُ ظَالِمِي أَنْفُسِهِمْ قَالُوا فِيمَ كُنْتُمْ قَالُوا كُنَّا مُسْتَضْعَفِينَ فِي الْأَرْضِ قَالُوا أَلَمْ تَكُنْ أَرْضُ اللَّهِ وَاسِعَةً فَتُهَاجِرُوا فِيهَا فَأُولَئِكَ مَأْوَاهُمْ جَهَنَّمُ وَسَاءَتْ مَصِيراً .
"যাহারা নিজেদের উপর জুলুম করে তাহাদের প্রাণ গ্রহণের সময় ফেরেশতাগণ বলে, তোমরা কী অবস্থায় ছিলে? তাহারা বলে, দুনিয়ায় আমরা অসহায় ছিলাম। তাহারা বলে, আল্লাহর যমীন কি এমন প্রশস্ত ছিল না যেথায় তোমরা হিজরত করিতে? ইহাদেরই আবাসস্থল জাহান্নাম, আর উহা কত মন্দ আবাস" (৪:৯৭)!

তাহারা হইল: (১) আসাদ ইব্‌ন আবদিল উয্যা ইন্ন কুসায়্যি গোত্রের আল-হারিছ ইবন যামআ ইবনুল আসওয়াদ; (২) মাখযূম গোত্রের আবু কায়স ইবনুল ফাকীহ ইব্‌দুল মুগীরা, (৩) একই গোত্রের আবূ কায়স ইবনুল ওয়ালীদ ইবনুল মুগীরা; (৪) জুমাহ গোত্রের আলী ইব্‌ উমায়া ইন্ন খালাফ; (৫) সাহম গোত্রের আল-আস ইব্‌ন মুনাব্বিহ ইবনুল হাজ্জাজ।
রাসূলুল্লাহ (স) মক্কায় থাকিতেই ইহারা ইসলাম গ্রহণ করে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) যখন মদীনায় হিজরত করেন তখন ইহাদের বাপ-দাদা ও নিকটাত্মীয়রা ইহাদিগকে মক্কায় আটক করিয়া রাখে এবং নির্যাতন ও চাপ প্রয়োগ করিয়া দীন ইসলাম ত্যাগ করায়। অতঃপর তাহারা তাহাদের কওমের সহিত বদর প্রান্তরে আগমন করে এবং যুদ্ধে সকলেই নিহত হয় (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ৩৯৬; উয়ূনুল আছার, ১খ., পৃ. ৩০৭)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 যুদ্ধলব্ধ সম্পদ (গনীমত) লাভ ও উহার সুষ্ঠু বণ্টন

📄 যুদ্ধলব্ধ সম্পদ (গনীমত) লাভ ও উহার সুষ্ঠু বণ্টন


এই যুদ্ধে কাফিরদের নিকট হইতে মুসলমানগণ প্রচুর গনীমত লাভ করেন। যুদ্ধশেষে রাসূলুল্লাহ (স) সেগুলি একত্র করার নির্দেশ দেন। অতএব তাহা একত্র করা হয়। উক্ত সম্পদের মধ্যে ছিল ১৫০টি উট, বহু আসবাবপত্র, কাপড়-চোপড় ও চামড়া যাহা মুশরিকগণ ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে লইয়াছিল, ১০টি ঘোড়া, বহু অস্ত্রশস্ত্র এবং আবু জাহলের উট যাহা পরবর্তী কালে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকটই থাকিত। তিনি উহাতে চড়িয়া যুদ্ধ করিতেন। মাদীক ও নাযিয়া-র মধ্যবর্তী সায়র নামক স্থানে পৌছিয়া গনীমতের সম্পদ বণ্টন করা হয় (ইউসুফ সালিহী আশ-শামী, প্রাগুক্ত, ৪খ., পৃ. ৬২)।

এই সময় ইহার বণ্টন লইয়া মুসলমানদের মধ্যে কিছুটা মতপার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। কাফিরগণ যখন পরাজয় বরণ করিতেছিল তখন মুসলমানগণ তিনভাগে বিভক্ত ছিলেন। একদল পলায়নপর কাফিরদের পশ্চাদ্ধধাবন করিয়া তাহাদিগকে বন্দী ও হত্যা করিতেছিলেন। একদল তাহাদের পরিত্যক্ত সম্পদ সংগ্রহ ও জড়ো করিতেছিলেন। আর একদল কাফিরদের পুন আক্রমণের আশংকায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রহরায় নিযুক্ত ছিলেন।

অতঃপর রাত্রিবেলা যখন সকলে একত্র হইলেন তখন যাহারা উহা সংগ্রহ করিয়াছিলেন তাহারা বলিলেন, উহা আমাদেরই প্রাপ্য।
আর যাহারা শত্রুদের পশ্চাদ্ধাবন করিয়া হত্যা ও বন্দী করিয়াছিলেন তাহারা বলিলেন, আল্লাহর কসম! আমরা না হইলে তোমরা ইহা পাইতে না। আমরা তাহাদিগকে তোমাদের হইতে ফিরাইয়া রাখিয়াছি, তাই তোমরা উহা লাভ করিয়াছ।
আর যাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রহরায় ছিলেন তাহারা বলিলেন, আল্লাহ্র কসম! তোমরা উহাতে আমাদের তুলনায় অধিক হকদার নহ। আল্লাহ যখন আমাদিগকে বিজয় দান করেন তখন ইচ্ছা করিলে আমরা শত্রুদিগকে হত্যা করিতে পারিতাম। আমরা ইচ্ছা করিলে সম্পদ সংগ্রহও করিতে পারিতাম, যখন উহাতে বাধা দেওয়ার কোনও লোকই ছিল না। কিন্তু আমরা রাসূলুল্লাহ (স) সম্পর্কে আশংকা করিয়াছিলাম যে, দুশমনগণ ফিরিয়া আসিয়া তাঁহাকে আক্রমণ করিয়া বসে কিনা। তাই আমরা তাঁহার সম্মুখে অবস্থান করিয়াছিলাম। সুতরাং উক্ত গনীমতের ব্যাপারে তোমরা আমাদের তুলনায় অধিক হকদার নহ। এই মতবিরোধ ও বাদানুবাদের অবসান ঘটাইয়া আল্লাহ তা'আলা ঘোষণা করিলেন যে, ইহার মালিক আল্লাহ ও তাঁহার রাসূল (ইব্‌ন হিশাম, আস-সীরা, ২খ., পৃ. ২৮৩)। আয়াত নাযিল হইল :
يَسْتَلُونَكَ عَنِ الْأَنْفَالِ قُلِ الْأَنْفَالُ لِلَّهِ وَالرَّسُولِ فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَصْلِحُوا ذَاتَ بَيْنِكُمْ وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ إِنْ كُنْتُمْ مُّؤْمِنِينَ.
“লোকে তোমাকে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ সম্বন্ধে প্রশ্ন করে। বল, যুদ্ধলব্ধ সম্পদ আল্লাহ ও রাসূলের। সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং নিজেদের মধ্যে সদ্ভাব স্থাপন কর এবং আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলের আনুগত্য কর, যদি তোমরা মুমিন হও” (৮: ১)।

অতঃপর আল্লাহ তা'আলা ইহা বণ্টনের দায়িত্ব রাসূলুল্লাহ (স)-এর উপর ন্যস্ত করিলেন। এই বিষয়ে আল্লাহ আরও ইরশাদ করিলেন :
وَاعْلَمُوا أَنَّمَا غَنِمْتُمْ مِّنْ شَيْءٍ فَأَنَّ لِلَّهِ خُمُسَهُ وَالرَّسُولِ وَلَذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَمَى وَالْمَسَاكِينِ وَابْنِ السَّبِيلِ إِنْ كُنْتُمْ أَمَنْتُمْ بِاللهِ وَمَا أَنْزَلْنَا عَلَى عَبْدِنَا يَوْمَ الْفُرْقَانِ يَوْمَ الْتَقَى الْجَمْعَانِ وَاللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ.
"তোমরা আরও জানিয়া রাখ যে, যুদ্ধে যাহা তোমরা লাভ কর তাহার এক-পঞ্চমাংশ আল্লাহর, রাসূলের, রাসূলের স্বজনদের, ইয়াতীমদের, মিসকীনদের এবং পথচারীদের যদি তোমরা ঈমান রাখ আল্লাহে এবং তাহাতে যাহা মীমাংসার দিন (বদর যুদ্ধের দিন) আমি আমার বান্দার প্রতি নাযিল করিয়াছি, যেই দিন দুই দল পরস্পরের সম্মুখীন হইয়াছিল এবং আল্লাহ সর্ববিষয়ে শক্তিমান” (৮ : ৪১)।

অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) সকল সাহাবীর মধ্যে তাহা সমভাবে বণ্টন করিলেন। আবূ উমামা (রা) বলেন, আমি উবাদা ইবনুস সামিত (রা)-কে গণীমত সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করিলে তিনি বলিলেন, বদর যুদ্ধ অংশগ্রহণকারী সাহাবীদের সম্পর্কেই গনীমতের আয়াত নাযিল হয়, যখন আমরা গনীমত লইয়া মতবিরোধ করিতেছিলাম। এই ব্যাপারে আমাদের স্বভাব কলুষিত হইতেছিল। তখন উহার কর্তৃত্ব আল্লাহ আমাদের হাত হইতে নিয়া তাঁহার রাসূলের উপর ন্যস্ত করিলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) মুসলমানদের মধ্যে সমভাবে উহা বণ্টন করিলেন (ইব্‌ন হিশাম, ২খ., পৃ. ২৮৩; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ৩০১-৩০২)। এক বর্ণনামতে খাব্বাব ইবনুল আরাত্ (রা)-কে তিনি উহা বণ্টনের দায়িত্ব প্রদান করেন (সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৪খ., পৃ. ৬২)।

রাসূলুল্লাহ (স) গনীমত সমভাবে বণ্টনের নির্দেশ দিলে সা'দ ইব্‌ন মুআয (রা) বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি কি জাতিকে রক্ষাকারী অশ্বারোহী সৈন্যদিগকে ও দুর্বলদিগকে একই সমান অংশ প্রদান করিবেন? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তোমার মাতার পুত্রবিয়োগ ঘটুক! দুর্বলদের কারণেই তো তোমাদিগকে সাহায্য করা হইয়াছে (সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৪খ., পৃ. ৬২)।

যুদ্ধের ময়দানে রাসূলুল্লাহ (স)-এর পক্ষ হইতে একজন লোক ঘোষণা করিলেন, যে ব্যক্তি কোনও শত্রুসৈন্যকে হত্যা করিবে, সে সেই নিহত ব্যক্তির সঙ্গে থাকা সম্পদ পাইবে। যে কাহাকেও বন্দী করিবে সে সেই বন্দীটির মালিক হইবে। ঐ সূত্র অনুযায়ী হত্যাকারীকে তিনি নিহত ব্যক্তির সম্পদ প্রদান করেন। ইহা ছাড়া যেসব সম্পদ যুদ্ধের ময়দানে পাওয়া গিয়াছে অথবা বিনা যুদ্ধে তাহারা সংগ্রহ করিয়াছে উহাই সকলের মধ্যে বণ্টন করা হয়।
গনীমতের সম্পদ ৩১৭ ভাগে বণ্টন করা হয়। মুজাহিদ ছিল ৩১৩ জন। অশ্বারোহীর দুইভাগ, দুইজন অশ্বারোহী থাকায় তাহাদের ৪ ভাগ। এতদ্ব্যতীত ৮ জন লোক যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করিলেও রাসূলুল্লাহ (স) সঙ্গত কারণেই তাহাদিগকে অংশ প্রদান করেন। তন্মধ্যে তিনজন মুহাজির। তাঁহারা হইলেন: (১) উছমান ইব্‌ন আফফান (রা) যাঁহাকে রাসূলুল্লাহ (স) স্বীয় অসুস্থ্য কন্যা রুকায়্যার সেবা-শুশ্রূষার জন্য রাখিয়া যান। যায়দ ইব্‌ন হারিছা (রা) যেদিন বিজয়ের সুসংবাদ লইয়া মদীনায় আগমন করেন সেই দিন তিনি ইনতিকাল করেন। (২) তালহা ইবন উবায়দিল্লাহ ও (৩) সাঈদ ইব্‌ন যায়দ (রা); রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাদিগকে মুশরিকদের বাণিজ্য প্রতিনিধি দলের সংবাদ সংগ্রহের জন্য গুপ্তচর হিসাবে প্রেরণ করিয়াছিলেন। আর পাঁচজন আনসার, তাহারা হইলেনঃ (১) আবু লুবাবা ইব্‌ন আবদিল মুনযির (রা), রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে মদীনার শাসক বানাইয়াছিলেন; (২) আসিম ইব্‌ন আদী (রা), রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁহাকে কুবাবাসী ও মদীনার উচ্চ ভূমির শাসক নিযুক্ত করিয়াছিলেন; (৩) আল-হারিছ ইব্‌ন হাতিব (রা), রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে বানু আমর ইব্‌ন আওফ-এর তদারকির দায়িত্ব দিয়াছিলেন; (৪) আল-হারিছ ইবনুস সিম্মা ও (৫) খাওওয়াত ইব্‌ন জুবায়র (রা); বদর রওয়ানা হওয়ার পথে আর-রাওহা নামক স্থানে পৌঁছিবার পর তাহাদের উভয়ের পা ভাঙ্গিয়া যায়। ফলে তাঁহারা বাধ্য হইয়া মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন। আর এক বর্ণনামতে সা'দ ইবন উবাদা ও সা'দ ইবন মালিক আস-সাইদী এবং আনসারদের অপর দুই ব্যক্তিকেও গনীমতের অংশ প্রদান করা হয় (প্রাগুক্ত)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মদীনায় বিজয়ের সুসংবাদ প্রেরণ

📄 মদীনায় বিজয়ের সুসংবাদ প্রেরণ


বদর যুদ্ধে জয়লাভের পর মদীনায় উহার সংবাদ প্রেরণের জন্য রাসূলুল্লাহ (স) আবদুল্লাহ ইন্ন রাওয়াহা (রা)-কে মদীনার উচ্চ ভূমিতে এবং যায়দ ইবন হারিছা (রা)-কে মদীনার নিম্নভূমিতে প্রেরণ করিলেন। তাঁহারা আল-আকীক নামক স্থান হইতে পৃথক হইয়া গেলেন এবং উভয়ে রবিবার বেলা বিদ্বপ্রহরের পূর্বেই মদীনায় আসিয়া পৌছিলেন। ইবন রাওয়াহা (রা) তাঁহার সওয়ারীতে থাকিয়া ঘোষণা করিতেছিলেন, হে আনসার সম্প্রদায়! তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ কর যে, রাসূলুল্লাহ (স) নিরাপদ আছেন এবং মুশরিকগণ নিহত ও বন্দী হইয়াছে। রাবী'আর পুত্রদ্বয় (উতবা ও শায়বা), আল-হাজ্জাজের পুত্রদ্বয় (নুবায়হ ও মুনাব্বিহ), আবূ জাহল ইব্‌ন হিশাম, যাম'আ ইবনুল আসওয়াদ ও উমায়‍্যা ইব্‌ন খালাফ নিহত হইয়াছে এবং সুহায়ল ইব্‌ন আমর বন্দী হইয়াছে। আসিম ইব্‌ন আদী (রা) বলেন, আমি তাঁহার মুখামুখী দাঁড়াইয়া বলিলাম, তুমি যাহা বলিতেছ তাহা কি ঠিক হে ইব্‌ন রাওয়াহা? তিনি বলিলেন, হাঁ, আল্লাহ্র কসম! আগামী কালই রাসূলুল্লাহ (স) বন্দীদের লইয়া ফিরিয়া আসিবেন। তিনি মদীনার উচ্চভূমিতে অবস্থিত আনসারদের বাড়ি বাড়ি গিয়া এই সংবাদ পৌঁছাইয়া দিতেছিলেন। বালকগণও তাঁহার সঙ্গে যাইতেছিল এবং বলিতেছিল, পাপিষ্ঠ আবু জাহল নিহত হইয়াছে। এইভাবে তিনি বনূ উমায়্যা ইবন যায়দ-এর বাড়ি পর্যন্ত গিয়া পৌছিলেন (ইউসুফ সালিহী আশ-শামী, প্রাগুক্ত, ৪খ., পৃ. ৫৭; ইব্‌ন হিশাম, আস-সীরা, ২খ., পৃ. ২৮৪)।

অপরদিকে যায়দ ইব্‌ন হারিছা (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-এর আল-কাসওয়া বা আল-আদবা নামক উষ্ট্রীর পিঠে আরোহণ করিয়া মদীনার নিম্নভূমিতে বসবাসকারী সাহাবীদিগকে সুসংবাদ শুনাইতে লাগিলেন। উসামা ইব্‌ন যায়দ (রা) বলেন, আমরা তখন জান্নাতুল বাকীতে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কন্যা রুকায়‍্যার কবরের মাটি সমান করিতেছিলাম। তিনি উছমান (রা)-এর স্ত্রী ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে ও উছমান (রা)-কে তাঁহার সেবা-শুশ্রূষার জন্য রাখিয়া গিয়াছিলেন। তখন আমাদের নিকট সংবাদ আসিল যায়দ ইব্‌ন্ন হারিছা (রা) আসিয়াছেন। আমি তাড়াতাড়ি তাঁহার নিকট গেলাম। তিনি তখন মসজিদে অবস্থান করিতেছিলেন, আর লোকজন তাঁহাকে ঘিরিয়া ধরিয়াছিল। তিনি বলিতেছিলেন, উতবা ইবন রাবী'আ, শায়বা ইবন রাবী'আ, আবু জাহল ইব্‌ন হিশাম, যাম'আ ইবনুল আসওয়াদ, আবুল বাখতারী, আল-আস ইবন হিশাম, উমায়‍্যা ইব্‌ন খালাফ, নুবায়হ ও মুনাব্বিহ ইবনুল হাজ্জাজ নিহত হইয়াছে এবং সুহায়ল ইব্‌ন আমরসহ অনেকে বন্দী হইয়াছে। উসামা (রা) বলেন, তখন আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, হে পিতা! ইহা কি সত্য? তিনি বলিলেন, হাঁ, আল্লাহর কসম। হে বৎস (প্রাগুক্ত)।

এক বর্ণনামতে কিছু লোক যায়দ ইব্‌ন হারিছা (রা)-এর কথা বিশ্বাস করিতেছিল না। তাহারা বলিতেছিল, যায়দ পরাজিত হইয়া ফিরিয়া আসিয়াছে। ইহাতে মুসলমানগণ রাগান্বিত ও শঙ্কিত হইয়া পড়িল। উসামা ইব্‌ন যায়দ (রা) বলেন, ইহার ফলে আমি বন্দীদিগকে না দেখা পর্যন্ত তাহার কথা বিশ্বাস করিতে পারি নাই। এক মুনাফিক আবু লুবাবা ইব্‌ন আবদিল মুনযিরকে বলিল, তোমাদের সঙ্গীগণ এমনভাবে বিভক্ত হইয়া পড়িয়াছে যে, আর কখনও একত্র হইতে পারিবে না। আর তাঁহার নেতৃস্থানীয় সাহাবীগণ নিহত হইয়াছে। মুহাম্মাদ নিহত হইয়াছে। এই তাঁহার উস্ত্রী, উহা আমরা চিনি। আর এই যায়দ, ভয় ও আতঙ্কের কারণে কি বলিতেছে তাহা সে নিজেই জানে না। সে পরাজিত হইয়াই আসিয়াছে। আবূ লুবাবা (রা) বলিলেন, আল্লাহ তোমার কথা মিথ্যা প্রতিপন্ন করুন। ইয়াহুদীগণও বলিত লাগিল, সে পরাজিত হইয়াই আসিয়াছে।
উসামা ইবন যায়দ (রা) বলেন, আমি একান্তে আমার পিতার নিকট গিয়া বলিলাম, হে পিত! আপনি যাহা বলিতেছেন তাহা কি সত্য? তিনি বলিলেন, হাঁ, আল্লাহর কসম! আমি যাহা বলিতেছি তাহা সত্য হে বৎস। তখন আমি মনে একটু শক্তি পাইলাম এবং উক্ত মুনাফিকের নিকট আসিয়া বলিলাম, তুমিই রাসূলুল্লাহ (স) ও মুসলমানদের সম্পর্কে অপপ্রচারকারী। রাসূলুল্লাহ (স) ফিরিয়া আসিলে আমরা অবশ্যই তোমাকে তাঁহার সম্মুখে হাযির করিব এবং তিনি তোমার গর্দান উড়াইয়া দিবেন। তখন সে বলিল, হে আবু মুহাম্মাদ! ইহা লোকজনের মুখে আমার শোনা কথা (সুবুলুল হুদা, প্রাগুক্ত, ৪খ., পৃ. ৫৭-৫৮)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 রাসূলুল্লাহ (স) ও মুসলমানদের মদীনায় প্রত্যাবর্তন

📄 রাসূলুল্লাহ (স) ও মুসলমানদের মদীনায় প্রত্যাবর্তন


পূর্বেই উল্লিখিত হইয়াছে যে, বদর যুদ্ধ শুরু হয় দ্বিতীয় হি. ১৭ই রামাদান শুক্রবার সকালবেলা। সূর্য হেলিয়া পড়িবার পূর্বেই মুসলমানগণ বিজয়লাভ করেন। তিনদিন সেখানে অবস্থানের পর সোমবার রাত্রিবেলা রাসূলুল্লাহ (স) সকলকে লইয়া রওয়ানা হন। উষ্ট্রে আরোহণ করিয়া তিনি বদরের কূপের নিকট দাঁড়াইয়া কুরায়শ নেতৃবন্দকে সম্বোধন করেন। অতঃপর বন্দী ও গনীমতসহ তিনি সম্মুখে অগ্রসর হন। বন্দীদের সংখ্যা সম্পর্কে কিছুটা মতভেদ রহিয়াছে। ইবন জারীর আত-তাবারী ৪৪ জনের কথা উল্লেখ করিয়াছেন (আত-তাবারী, তারীখ, ২খ, পৃ. ৪৫৯)। তবে প্রসিদ্ধ বর্ণনামতে ৭০ জন। বন্দীদের মধ্যে উকবা ইব্‌ন আবী মু'আয়ত ও আন-নাদর ইবনুল হারিছ ইব্‌ন কালাদাও ছিল। অতঃপর তিনি মাদীক ও নাযিয়া-এর মধ্যবর্তী সায়র নামক স্থানে একটি বড় বৃক্ষের নিচে অবতরণ করিয়া গনীমত বণ্টন করেন। অতঃপর সেখান হইতে রওয়ানা হইয়া আস-সাফরা নামক স্থানে আসিলে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নির্দেশে বন্দী আন-নাদর ইব্‌নুল হারিছকে হত্যা করা হয়। আলী ইব্‌ন আবী তালিব (রা) তাহাকে হত্যা করেন (ইব্‌ন হিশাম, আস-সীরা, ২খ., পৃ. ২৮৫)। পরবর্তী কালে তাহার কন্যা কুতায়লা বিনতুন নাদর স্বীয় পিতার শোকে এক মর্মস্পর্শী কবিতা রচনা ও আবৃত্তি করেন। তাহা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর হৃদয় বিগলিত হইয়াছিল এবং অশ্রুতে তাঁহার দাড়ি মুবারক ভিজিয়া গিয়াছিল। তিনি আবূ বকর (রা)-কে বলিয়াছিলেন, আমি পূর্বে তাহার এই কবিতা শুনিলে তাহার পিতাকে হত্যা করিবার নির্দেশ দিতাম না (সুবুলুল হুদা, প্রাগুক্ত, ৪খ., পৃ. ৬৩-৬৪)।

অতঃপর ইরকুজ জাবয়া নামক স্থানে পৌছিয়া রাসূলুল্লাহ (স) অপর এক বন্দী উকবা ইব্‌ন আবী মু'আয়তকে হত্যার নির্দেশ দেন। উকবা বলিল, হে মুহাম্মাদ! বাচ্চাদের কে দেখাশুনা করিবে? তিনি বলিলেন, জাহান্নামের আগুন। আসিম ইবন হাবিত আনসারী (রা) ইব্‌ন হিশাম-এর এক বর্ণনামতে আলী (রা) তাহাকে হত্যা করেন (ইব্‌ন হিশাম, আস-সীরা, ২খ., পৃ. ২৮৬)। হত্যার জন্য আসিম ইন্ন ছাবিত প্রস্তুত হইতেই উকবা বলিল, ওহে কুরায়শ দল! আমি কিসের অপরাধে তোমাদের সম্মুখে নিহত হইতেছি? আসিম (রা) বলিলেন, আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলের প্রতি শত্রুতা পোষণের কারণে। রাসূলুল্লাহ (স) যখন তাহাকে হত্যা করার নির্দেশ দেন তখন উকবা বলিল, হে মুহাম্মাদ! তুমি কি কুরায়শদের সম্মুখেই আমাকে হত্যা করিবে? তিনি বলিলেন, হাঁ। তোমরা কি জান, এই লোক আমার সহিত কিরূপ আচরণ করিয়াছিল? আমি মাকামে ইবরাহীমের পিছনে সিজদারত ছিলাম। সে আমার ঘাড়ে পা রাখিয়া এমন জোর চাপ দিতে ছিল যে, আমি মনে করিলাম, আমার চক্ষুদ্বয় বুঝি ঠিকরাইয়া বাহির হইয়া যাইবে।

"আর একদিন আমি সিজদারত থাকা অবস্থায় সে বকরীর নাড়ীভুঁড়ি আনিয়া আমার মাথার উপর ফেলিয়া রাখিল। অতঃপর ফাতিমা আসিয়া উহা সরাইয়া ফেলে এবং আমার মাথা ধুইয়া দেয়। প্রকৃতপক্ষে এই দুই ব্যক্তি ছিল আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে সর্বনিকৃষ্ট নরাধম এবং ইসলামের প্রতি সর্বাধিক হিংসা-বিদ্বেষ ও শত্রুতা পোষণকারী, ইসলাম ও মুসলমানদের উদ্দেশ্যে সর্বাধিক ব্যঙ্গকারী কাফির। এইজন্যই রাসূলুল্লাহ (স) ইহাদিগকে হত্যার নির্দেশ দেন। এই দুইজন (অপর এক বর্ণনামতে তুআয়মা ইব্‌ন আদীসহ ৩ জন বন্দী) ব্যতীত অন্য কোনও বন্দীকে এইভাবে হত্যা করা হয় নাই (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ৩০৫-৩০৬; সুবুলুল হুদা, ৪খ., পৃ. ৬৩-৬৪)।

এই স্থানে রাসূলুল্লাহ (স) ফারওয়া ইন্ন আমর আল-বায়াদীর দাস আবূ হিন্দ-এর সাক্ষাত পান যিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ (স)-এর ক্ষৌরকার। তিনি খেজুর, ছাতু ও ঘি সমন্বয়ে তৈরীকৃত হায়স নামক খাবার রাসূলুল্লাহ (স)-কে হাদিয়া দেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাহা গ্রহণ করেন। আবূ হিন্দ বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন নাই। পরবর্তী সকল যুদ্ধেই তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত অংশগ্রহণ করেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার সম্পর্কে আনসারদিগকে ওসিয়াত করিয়া বলেন, আবূ হিন্দ আনসারদেরই লোক। তোমরা তাহাকে বিবাহ করাও এবং তাহার নিকট বিবাহ দাও। আনসারগণ এই নির্দেশ পালন করেন (ইন্ন হিশাম, আস-সীরা, ২খ., পৃ. ২৮৬; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ৩০৬)।

রাসূলুল্লাহ (স) সাহাবীগণসহ আর-রাওহা নামক স্থানে পৌঁছিলে মদীনার মুসলমানগণ বিজয়লাভের জন্য রাসূলুল্লাহ (স) ও বিজয়ী বীরদের স্বাগত জানাইতে থাকে। অতঃপর সালামা ইন্ন সালামা ইব্‌ন ওয়াশ তাহাদিগকে বলিলেন, তোমরা কিসের জন্য আমাদিগকে স্বাগত জানাইতেছ? আল্লাহর কসম! আমরা তো রক্তপণে দেওয়া মোটাসোটা পশুর ন্যায় একদল বৃদ্ধকে পাইয়াছিলাম, যাহাদের মস্তকের সম্মুখভাগের চুল পড়িয়া গিয়াছে। অতঃপর তাহাদিগকে আমরা যবেহ করিয়াছি। ইহা শুনিয়া রাসূলুল্লাহ (স) মুচকি হাসিয়া বলিলেন, ওহে ভ্রাতুষ্পুত্র! উহারা তো কওমের সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি ও নেতা (আত-তাবারী, তারীখ, ২খ., পৃ. ৪৫৯; ইউসুফ সালিহী আশ-শামী, প্রাগুক্ত, ৪খ., পৃ. ৬২-৬৪)।

উসায়দ ইবন হুদায়র (রা) স্বাগত জানাইতে আসিয়া বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! সকল প্রশংসা আল্লাহ্ যিনি আপনাকে সফলতা দান করিয়াছেন এবং আপনার চক্ষু শীতল করিয়াছেন। ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহ্র কসম, আমি এই ধারণা করিয়া বদর যুদ্ধ হইতে পিছাইয়া থাকি নাই যে, আপনি শত্রুদের মুকাবিলা করিবেন, বরং আমি ধারণা করিয়াছিলাম যে, আপনি বাণিজ্য কাফেলার মুখামুখী হইবেন। যদি জানিতাম যে, শত্রুসৈন্যের মুকাবিলা করিবেন, তবে কখনও আমি পিছাইয়া থাকিতাম না। রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তুমি সত্য বলিয়াছ (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ৩০৫)।

অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) রওয়ানা হইয়া বন্দীদের পৌঁছিবার একদিন পূর্বেই মদীনা পৌঁছিলেন। মদীনা ও উহার পার্শ্ববর্তী এলাকার সকল শত্রু তাঁহাকে ভয় পাইতে ও সমীহ করিয়া চলিতে লাগিল এবং মদীনার বহু লোক ইসলাম গ্রহণ করিল। এই সময় আবদুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সালূলও বাহ্যিকভাবে ইসলাম গ্রহণ করে। ইয়াহুদীগণ বলিল, আমরা নিশ্চিত হইলাম যে, তিনি সেই নবী যাঁহার প্রশংসা আমরা আমাদের তাওরাত কিতাবে পাইয়াছি। রাসূলুল্লাহ (স) ২২শে রামাদান বুধবার ছানিয়্যাতুল-ওয়াদা হইতে মদীনায় প্রবেশ করেন। মদীনার বালক-বালিকাগণ দফ বাজাইয়া এই শ্লোক গাহিয়া তাঁহাকে স্বাগত জানাইতে লাগিল: طلع البدر علينا + من ثنية الوداع وجب الشكر علينا + ما دعا لله داع "পূর্ণিমার পূর্ণ চন্দ্র ছানিয়‍্যাতুল ওয়াদা হইতে আমাদের নিকট উদিত হইয়াছে। তাই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা আমাদের জন্য অত্যাবশ্যক ঐ আহবানকারীর জন্য যিনি আল্লাহ্র প্রতি আহবান করিয়াছেন” (সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৪খ., পৃ. ৬৪)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00