📄 মৃত ব্যক্তি শুনিতে পায় কিনা
উক্ত হাদীছের দ্বারা এই কথা সুস্পষ্টরূপে প্রমাণিত যে, বদরের কূপে নিক্ষিপ্ত লাশগুলি রাসূলুল্লাহ (স)-এর আহবান শুনিতে পাইয়াছিল। কিন্তু উম্মুল মুমিনীন আইশা (রা) এই ব্যাপারে ভিন্নমত পোষণ করেন। তিনি তাঁহার বর্ণিত হাদীছের ব্যাখ্যায় বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, لَقَدْ عَلَمُوا (তাহারা বুঝিতে পারিয়াছে)। এই কথা দ্বারা তিনি বুঝাইতে চাহিয়াছেন যে, তাহারা এখন জানিতে পারিয়াছে যে, আমি তাহাদিগকে যাহা বলিয়াছিলাম তাহাই সত্য।
মৃতগণ যে শুনিতে পায় না ইহার সমর্থনে তিনি কুরআন কারীমের নিম্নোক্ত আয়াতদ্বয় দলীল হিসাবে পেশ করেন:
إِنَّكَ لَا تُسْمِعُ الْمَوْتَى.
"মৃতকে তো তুমি কথা শুনাইতে পারিবে না" (২৭:৮০)।
وَمَا أَنْتَ بِمُسْمِعٍ مِّنْ فِي الْقُبُورِ.
"তুমি শুনাতে সক্ষম হইবে না যাহারা কবরে রহিয়াছে তাহাদিগকে" (৩৫: ২২)।
কিন্তু বদরের কূপে নিক্ষিপ্ত লাশগুলি যে রাসূলুল্লাহ (স)-এর আহবান ভালভাবে শুনিতে পাইয়াছিল এই ব্যাপারে সহীহ হাদীছসমূহে সুস্পষ্ট বর্ণনা (ما أنتم بأسمع لما أقول منهم) থাকায় বেশীর ভাগ সাহাবী ও তাবিঈ তাহাদের শুনিবার পক্ষে মত ব্যক্ত করিয়াছেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ২৯২)।
কুরআন কারীমের আয়াত ও সহীহ হাদীছের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানের লক্ষ্যে উলমায়ে কিরাম কিছু ব্যাখ্যার আশ্রয় লইয়াছেন। কাতাদা (র) বলেন, আল্লাহ তাহাদিগকে ঐ সময় জীবিত করিয়াছিলেন, যাহাতে তাহারা এই ধমক, অপমান, শাস্তি ও আক্ষেপ অনুভব করিতে পারে (সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৪খ., পৃ. ৫৫; আল-মাওয়াহিবুল-লাদুন্নিয়্যা, ১খ., পৃ. ৩৬৭; ইবনু কাছীর, প্রাগুক্ত, ৩খ., পৃ. ২৯৩)।
আল-ইসমাঈলী (র) বলেন, আইশা (রা)-এর মেধা ও হাদীছ সম্পর্কে গভীর পাণ্ডিত্যের বিষয়টি স্বীকার করিয়া লইয়াও বদরের মৃতদের শুনিতে পাওয়া সম্পর্কিত নির্ভরযোগ্য রিওয়ায়াত প্রত্যাখ্যান করা যায় না, যতক্ষণ না অনুরূপ শক্তিশালী রিওয়ায়াত দ্বারা উহা মনসূখ (রহিত) হওয়া বা সুনির্দিষ্ট (খাস) হওয়া প্রমাণিত হয়। তবে উভয় বর্ণনার মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করা সম্ভব। তাহা এইরূপে যে, আয়াত إِنَّكَ لَا تُسْمِعُ الْمَوْتَى রাসূলুল্লাহ (স)-এর বাণী انهم الان ليسمعون (তাহারা এখন অবশ্যই শুনিতেছে)-এর পরিপন্থী নহে। কারণ শুনাইবার অর্থ হইল বক্তার আওয়ায শ্রোতার কর্ণে পৌঁছানো। তাই রাসূলুল্লাহ (স) নহেন, বরং আল্লাহই রাসূলের আওয়ায বদর প্রাঙ্গণে অভিশপ্ত নিহতদের কর্ণে পৌছাইয়া দিয়াছিলেন। তিনি তো সর্ব বিষয়ে সামর্থ্যবান (আল-মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়্যা, ১খ., পৃ. ৩৬৮)।
আস-সুহায়লী (র) বলেন, আইশা (রা) ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না, তাই যাহারা উপস্থিত ছিলেন তাহাদের কথাই গ্রহণযোগ্য। কারণ রাসূলুল্লাহ (স)-এর বাণী তাহারাই ভালভাবে শ্রবণ ও হিফাজত করিয়াছিলেন। এতদ্ব্যতীত ঘটনাটি রাসূলুল্লাহ (স)-এর মুজিযার অন্তর্ভুক্ত, সাহাবীদের প্রশ্নের দ্বারা ইহা স্পষ্টরূপে বুঝা যায়। তাঁহারা প্রশ্ন করিয়াছিলেন, أتخاطب قوما قد جيفوا (আপনি কি এমন লোকদেরকে সম্বোধন করিতেছেন, যাহারা গলিত লাশ হইয়া গিয়াছে?) তিনি আরও বলেন, আইশা (রা) যে ব্যাখ্যা করিয়াছেন, "তাহারা জানিতে পারিয়াছে" ইহার অর্থ তাহারা শুনিতে পাইয়াছে। আর শ্রবণ দুইভাবে হইতে পারে : (১) তাহাদের শরীরের কান দ্বারা। এই ক্ষেত্রে আল্লাহ তাহাদের রূহ শরীরের মধ্যে প্রবিষ্ট করাইয়াছিলেন; (২) অন্তরের বা রূহের কান দ্বারা (প্রাগুক্ত; আর-রাওদুল উনুফ, ৫খ., পৃ. ১৭৫-৭৬)। মোটকথা রাসূলুল্লাহ (স)-এর আহ্বান সেই দিন বদরের কূপে নিক্ষিপ্ত কুরায়শ নেতৃবৃন্দ শুনিতে পাইয়াছিল।
📄 আবূ হুযায়ফা (রা)-কে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সান্ত্বনা দান
রাসূলুল্লাহ (স) যখন কুরায়শ নেতৃবৃন্দের লাশ বদরের কূপে নিক্ষেপ করার নির্দেশ দিলেন তখন উতবা ইব্ন আবী রাবী'আর লাশ কূপের দিকে লইয়া যাওয়া হইল। এই সময় রাসূলুল্লাহ (স) উতবার পুত্র সাহাবী আবূ হুযায়ফা (রা)-এর চেহারায় বিষণ্ণতার ছাপ দেখিতে পাইলেন। তিনি এতই দুঃখভারাক্রান্ত হইয়াছিলেন যে, তাহার মুখমণ্ডল বিবর্ণ হইয়া গিয়াছিল। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে স্নেহভরে ডাকিয়া বলিলেন, হে আবূ হুযায়ফা! তোমার মনে হয়তবা তোমার পিতা সম্পর্কে কোনও আঘাত লাগিয়াছে। তিনি বলিলেন, না। আল্লাহ্র কসম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি আমার পিতা সম্পর্কে বা তাহার নিহত হওয়া সম্পর্কে বেদনাহত নহি। তবে আমি আমার পিতার সঠিক সিদ্ধান্ত, প্রজ্ঞা, বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতা সম্পর্কে জানিতাম। তাই আমি আশা করিতাম যে, তাহার বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতাই তাহাকে ইসলামে দীক্ষিত করিবে। আমার এইরূপ আশাবাদী থাকার পর তাহার এই পরিণতি দেখিয়া এবং তাহার কুফরীর উপর নিহত হওয়ার কথা স্মরণ করিয়া দুঃখিত ও ব্যথিত হইয়াছি। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) তাহার মঙ্গলের জন্য দু'আ করিলেন এবং তাহাকে সান্ত্বনা দিলেন (ইবন হিশাম, আস-সীরা, ২খ., পৃ. ২৮২; সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৪খ., পৃ. ৫৬-৫৭)।
📄 কতিপয় কুরায়শ যুবকের পরিণতি
এই যুদ্ধে কাফির কুরায়শদের সহিত তাহাদের কিছু যুবক নিহত হয়, যাহাদের সম্পর্কে এই আয়াত নাযিল হয়: إِنَّ الَّذِينَ تَوَفَّهُمُ الْمَلَئِكَةُ ظَالِمِي أَنْفُسِهِمْ قَالُوا فِيمَ كُنْتُمْ قَالُوا كُنَّا مُسْتَضْعَفِينَ فِي الْأَرْضِ قَالُوا أَلَمْ تَكُنْ أَرْضُ اللَّهِ وَاسِعَةً فَتُهَاجِرُوا فِيهَا فَأُولَئِكَ مَأْوَاهُمْ جَهَنَّمُ وَسَاءَتْ مَصِيراً .
"যাহারা নিজেদের উপর জুলুম করে তাহাদের প্রাণ গ্রহণের সময় ফেরেশতাগণ বলে, তোমরা কী অবস্থায় ছিলে? তাহারা বলে, দুনিয়ায় আমরা অসহায় ছিলাম। তাহারা বলে, আল্লাহর যমীন কি এমন প্রশস্ত ছিল না যেথায় তোমরা হিজরত করিতে? ইহাদেরই আবাসস্থল জাহান্নাম, আর উহা কত মন্দ আবাস" (৪:৯৭)!
তাহারা হইল: (১) আসাদ ইব্ন আবদিল উয্যা ইন্ন কুসায়্যি গোত্রের আল-হারিছ ইবন যামআ ইবনুল আসওয়াদ; (২) মাখযূম গোত্রের আবু কায়স ইবনুল ফাকীহ ইব্দুল মুগীরা, (৩) একই গোত্রের আবূ কায়স ইবনুল ওয়ালীদ ইবনুল মুগীরা; (৪) জুমাহ গোত্রের আলী ইব্ উমায়া ইন্ন খালাফ; (৫) সাহম গোত্রের আল-আস ইব্ন মুনাব্বিহ ইবনুল হাজ্জাজ।
রাসূলুল্লাহ (স) মক্কায় থাকিতেই ইহারা ইসলাম গ্রহণ করে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) যখন মদীনায় হিজরত করেন তখন ইহাদের বাপ-দাদা ও নিকটাত্মীয়রা ইহাদিগকে মক্কায় আটক করিয়া রাখে এবং নির্যাতন ও চাপ প্রয়োগ করিয়া দীন ইসলাম ত্যাগ করায়। অতঃপর তাহারা তাহাদের কওমের সহিত বদর প্রান্তরে আগমন করে এবং যুদ্ধে সকলেই নিহত হয় (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ৩৯৬; উয়ূনুল আছার, ১খ., পৃ. ৩০৭)।
📄 যুদ্ধলব্ধ সম্পদ (গনীমত) লাভ ও উহার সুষ্ঠু বণ্টন
এই যুদ্ধে কাফিরদের নিকট হইতে মুসলমানগণ প্রচুর গনীমত লাভ করেন। যুদ্ধশেষে রাসূলুল্লাহ (স) সেগুলি একত্র করার নির্দেশ দেন। অতএব তাহা একত্র করা হয়। উক্ত সম্পদের মধ্যে ছিল ১৫০টি উট, বহু আসবাবপত্র, কাপড়-চোপড় ও চামড়া যাহা মুশরিকগণ ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে লইয়াছিল, ১০টি ঘোড়া, বহু অস্ত্রশস্ত্র এবং আবু জাহলের উট যাহা পরবর্তী কালে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকটই থাকিত। তিনি উহাতে চড়িয়া যুদ্ধ করিতেন। মাদীক ও নাযিয়া-র মধ্যবর্তী সায়র নামক স্থানে পৌছিয়া গনীমতের সম্পদ বণ্টন করা হয় (ইউসুফ সালিহী আশ-শামী, প্রাগুক্ত, ৪খ., পৃ. ৬২)।
এই সময় ইহার বণ্টন লইয়া মুসলমানদের মধ্যে কিছুটা মতপার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। কাফিরগণ যখন পরাজয় বরণ করিতেছিল তখন মুসলমানগণ তিনভাগে বিভক্ত ছিলেন। একদল পলায়নপর কাফিরদের পশ্চাদ্ধধাবন করিয়া তাহাদিগকে বন্দী ও হত্যা করিতেছিলেন। একদল তাহাদের পরিত্যক্ত সম্পদ সংগ্রহ ও জড়ো করিতেছিলেন। আর একদল কাফিরদের পুন আক্রমণের আশংকায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রহরায় নিযুক্ত ছিলেন।
অতঃপর রাত্রিবেলা যখন সকলে একত্র হইলেন তখন যাহারা উহা সংগ্রহ করিয়াছিলেন তাহারা বলিলেন, উহা আমাদেরই প্রাপ্য।
আর যাহারা শত্রুদের পশ্চাদ্ধাবন করিয়া হত্যা ও বন্দী করিয়াছিলেন তাহারা বলিলেন, আল্লাহর কসম! আমরা না হইলে তোমরা ইহা পাইতে না। আমরা তাহাদিগকে তোমাদের হইতে ফিরাইয়া রাখিয়াছি, তাই তোমরা উহা লাভ করিয়াছ।
আর যাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রহরায় ছিলেন তাহারা বলিলেন, আল্লাহ্র কসম! তোমরা উহাতে আমাদের তুলনায় অধিক হকদার নহ। আল্লাহ যখন আমাদিগকে বিজয় দান করেন তখন ইচ্ছা করিলে আমরা শত্রুদিগকে হত্যা করিতে পারিতাম। আমরা ইচ্ছা করিলে সম্পদ সংগ্রহও করিতে পারিতাম, যখন উহাতে বাধা দেওয়ার কোনও লোকই ছিল না। কিন্তু আমরা রাসূলুল্লাহ (স) সম্পর্কে আশংকা করিয়াছিলাম যে, দুশমনগণ ফিরিয়া আসিয়া তাঁহাকে আক্রমণ করিয়া বসে কিনা। তাই আমরা তাঁহার সম্মুখে অবস্থান করিয়াছিলাম। সুতরাং উক্ত গনীমতের ব্যাপারে তোমরা আমাদের তুলনায় অধিক হকদার নহ। এই মতবিরোধ ও বাদানুবাদের অবসান ঘটাইয়া আল্লাহ তা'আলা ঘোষণা করিলেন যে, ইহার মালিক আল্লাহ ও তাঁহার রাসূল (ইব্ন হিশাম, আস-সীরা, ২খ., পৃ. ২৮৩)। আয়াত নাযিল হইল :
يَسْتَلُونَكَ عَنِ الْأَنْفَالِ قُلِ الْأَنْفَالُ لِلَّهِ وَالرَّسُولِ فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَصْلِحُوا ذَاتَ بَيْنِكُمْ وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ إِنْ كُنْتُمْ مُّؤْمِنِينَ.
“লোকে তোমাকে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ সম্বন্ধে প্রশ্ন করে। বল, যুদ্ধলব্ধ সম্পদ আল্লাহ ও রাসূলের। সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং নিজেদের মধ্যে সদ্ভাব স্থাপন কর এবং আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলের আনুগত্য কর, যদি তোমরা মুমিন হও” (৮: ১)।
অতঃপর আল্লাহ তা'আলা ইহা বণ্টনের দায়িত্ব রাসূলুল্লাহ (স)-এর উপর ন্যস্ত করিলেন। এই বিষয়ে আল্লাহ আরও ইরশাদ করিলেন :
وَاعْلَمُوا أَنَّمَا غَنِمْتُمْ مِّنْ شَيْءٍ فَأَنَّ لِلَّهِ خُمُسَهُ وَالرَّسُولِ وَلَذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَمَى وَالْمَسَاكِينِ وَابْنِ السَّبِيلِ إِنْ كُنْتُمْ أَمَنْتُمْ بِاللهِ وَمَا أَنْزَلْنَا عَلَى عَبْدِنَا يَوْمَ الْفُرْقَانِ يَوْمَ الْتَقَى الْجَمْعَانِ وَاللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ.
"তোমরা আরও জানিয়া রাখ যে, যুদ্ধে যাহা তোমরা লাভ কর তাহার এক-পঞ্চমাংশ আল্লাহর, রাসূলের, রাসূলের স্বজনদের, ইয়াতীমদের, মিসকীনদের এবং পথচারীদের যদি তোমরা ঈমান রাখ আল্লাহে এবং তাহাতে যাহা মীমাংসার দিন (বদর যুদ্ধের দিন) আমি আমার বান্দার প্রতি নাযিল করিয়াছি, যেই দিন দুই দল পরস্পরের সম্মুখীন হইয়াছিল এবং আল্লাহ সর্ববিষয়ে শক্তিমান” (৮ : ৪১)।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) সকল সাহাবীর মধ্যে তাহা সমভাবে বণ্টন করিলেন। আবূ উমামা (রা) বলেন, আমি উবাদা ইবনুস সামিত (রা)-কে গণীমত সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করিলে তিনি বলিলেন, বদর যুদ্ধ অংশগ্রহণকারী সাহাবীদের সম্পর্কেই গনীমতের আয়াত নাযিল হয়, যখন আমরা গনীমত লইয়া মতবিরোধ করিতেছিলাম। এই ব্যাপারে আমাদের স্বভাব কলুষিত হইতেছিল। তখন উহার কর্তৃত্ব আল্লাহ আমাদের হাত হইতে নিয়া তাঁহার রাসূলের উপর ন্যস্ত করিলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) মুসলমানদের মধ্যে সমভাবে উহা বণ্টন করিলেন (ইব্ন হিশাম, ২খ., পৃ. ২৮৩; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ৩০১-৩০২)। এক বর্ণনামতে খাব্বাব ইবনুল আরাত্ (রা)-কে তিনি উহা বণ্টনের দায়িত্ব প্রদান করেন (সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৪খ., পৃ. ৬২)।
রাসূলুল্লাহ (স) গনীমত সমভাবে বণ্টনের নির্দেশ দিলে সা'দ ইব্ন মুআয (রা) বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি কি জাতিকে রক্ষাকারী অশ্বারোহী সৈন্যদিগকে ও দুর্বলদিগকে একই সমান অংশ প্রদান করিবেন? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, তোমার মাতার পুত্রবিয়োগ ঘটুক! দুর্বলদের কারণেই তো তোমাদিগকে সাহায্য করা হইয়াছে (সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৪খ., পৃ. ৬২)।
যুদ্ধের ময়দানে রাসূলুল্লাহ (স)-এর পক্ষ হইতে একজন লোক ঘোষণা করিলেন, যে ব্যক্তি কোনও শত্রুসৈন্যকে হত্যা করিবে, সে সেই নিহত ব্যক্তির সঙ্গে থাকা সম্পদ পাইবে। যে কাহাকেও বন্দী করিবে সে সেই বন্দীটির মালিক হইবে। ঐ সূত্র অনুযায়ী হত্যাকারীকে তিনি নিহত ব্যক্তির সম্পদ প্রদান করেন। ইহা ছাড়া যেসব সম্পদ যুদ্ধের ময়দানে পাওয়া গিয়াছে অথবা বিনা যুদ্ধে তাহারা সংগ্রহ করিয়াছে উহাই সকলের মধ্যে বণ্টন করা হয়।
গনীমতের সম্পদ ৩১৭ ভাগে বণ্টন করা হয়। মুজাহিদ ছিল ৩১৩ জন। অশ্বারোহীর দুইভাগ, দুইজন অশ্বারোহী থাকায় তাহাদের ৪ ভাগ। এতদ্ব্যতীত ৮ জন লোক যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করিলেও রাসূলুল্লাহ (স) সঙ্গত কারণেই তাহাদিগকে অংশ প্রদান করেন। তন্মধ্যে তিনজন মুহাজির। তাঁহারা হইলেন: (১) উছমান ইব্ন আফফান (রা) যাঁহাকে রাসূলুল্লাহ (স) স্বীয় অসুস্থ্য কন্যা রুকায়্যার সেবা-শুশ্রূষার জন্য রাখিয়া যান। যায়দ ইব্ন হারিছা (রা) যেদিন বিজয়ের সুসংবাদ লইয়া মদীনায় আগমন করেন সেই দিন তিনি ইনতিকাল করেন। (২) তালহা ইবন উবায়দিল্লাহ ও (৩) সাঈদ ইব্ন যায়দ (রা); রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাদিগকে মুশরিকদের বাণিজ্য প্রতিনিধি দলের সংবাদ সংগ্রহের জন্য গুপ্তচর হিসাবে প্রেরণ করিয়াছিলেন। আর পাঁচজন আনসার, তাহারা হইলেনঃ (১) আবু লুবাবা ইব্ন আবদিল মুনযির (রা), রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে মদীনার শাসক বানাইয়াছিলেন; (২) আসিম ইব্ন আদী (রা), রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁহাকে কুবাবাসী ও মদীনার উচ্চ ভূমির শাসক নিযুক্ত করিয়াছিলেন; (৩) আল-হারিছ ইব্ন হাতিব (রা), রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে বানু আমর ইব্ন আওফ-এর তদারকির দায়িত্ব দিয়াছিলেন; (৪) আল-হারিছ ইবনুস সিম্মা ও (৫) খাওওয়াত ইব্ন জুবায়র (রা); বদর রওয়ানা হওয়ার পথে আর-রাওহা নামক স্থানে পৌঁছিবার পর তাহাদের উভয়ের পা ভাঙ্গিয়া যায়। ফলে তাঁহারা বাধ্য হইয়া মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন। আর এক বর্ণনামতে সা'দ ইবন উবাদা ও সা'দ ইবন মালিক আস-সাইদী এবং আনসারদের অপর দুই ব্যক্তিকেও গনীমতের অংশ প্রদান করা হয় (প্রাগুক্ত)।