📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 যুদ্ধক্ষেত্রের বিশেষ অলৌকিক ঘটনাবলী

📄 যুদ্ধক্ষেত্রের বিশেষ অলৌকিক ঘটনাবলী


যুদ্ধক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (স)-এর বহু মু'জিযা সংঘটিত হইয়াছিল। আব্দ শামস ইব্‌ন আব্দ মানাফ-এর মিত্র ছিলেন উককাশা ইব্‌ন মিহসান আল-আসাদী। বদরের দিন যুদ্ধ করিতে করিতে তাঁহার তরবারি ভাঙ্গিয়া যায়। অতঃপর তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আগমন করিলে তিনি তাহাকে বৃক্ষের একটি শুষ্ক কাণ্ড দিয়া বলিলেন, হে উক্বাশা! ইহা দ্বারা যুদ্ধ কর। তিনি উহা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট হইতে লইয়া নাড়াচাড়া করিতেই উহা তাহার হাতে দীর্ঘ মজবুত ও তীক্ষ্ণ ধারালো তরবারিতে রূপান্তরিত হইয়া গেল। তিনি উহা দ্বারা মুসলমানদের বিজয় হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ করিতে লাগিলেন। উক্ত তরবারির নাম রাখা হয় আল-'আওন (সাহায্য)। ইহা উক্বাশা ইব্‌ন মিহসান (রা)-এর নিকটই রক্ষিত ছিল। রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত প্রতিটি যুদ্ধেই তিনি উহা দ্বারা বীরত্বের সহিত যুদ্ধ করেন। আবূ বাক্স (রা)-এর খিলাফত আমলে রিদ্দা যুদ্ধে ভণ্ড নবী তুলায়হা আল-আসাদীর হাতে শহীদ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তিনি উক্ত তরবারি দ্বারা যুদ্ধ করেন (ইব্‌ন হিশাম, আস-সীরা, ২খ., পৃ. ২৭৮; ইব্‌ন আবদিল বারর, আদ-দুরার ফী ইখতিসারিল মাগাযী ওয়াস-সিয়ার, পৃ. ১১৪)।
আল-ওয়াকিদী বর্ণনা করেন যে, বদর যুদ্ধের ময়দানে সালামা ইব্‌ন আসলাম ইবনুল হুবায়শ (রা)-এর তরবারি ভাঙ্গিয়া গেলে তিনি নিরস্ত্র হইয়া পড়েন। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে খেজুরের কাঁদির একটি ডাল দিয়া বলিলেন, ইহা দ্বারা যুদ্ধ কর। সঙ্গে সঙ্গে উহা একটি উন্মুক্ত তরবারি হইয়া গেল। আবূ উবায়দার নেতৃত্বে পুল (জাসর)-এর যুদ্ধে (১৪/৬৩৫ সন) শাহাদাত লাভের পূর্ব পর্যন্ত উক্ত তরবারি তাঁহার নিকট ছিল (কিতাবুল মাগাযী, ১খ., পৃ. ৯৩-৯৪; 'উয়ূনুল আছার, ১খ., পৃ. ৩০৬)।
কাতাদা ইবনুন নু'মান (রা) হইতে বর্ণিত যে, বদর যুদ্ধের দিন তাহার চোখে আঘাত লাগিয়া চক্ষুগোলক বাহির হইয়া ঝুলিয়া পড়ে। লোকজন উহা কাটিয়া ফেলিতে চাহিল। তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট জিজ্ঞাসা করিলে তিনি বলিলেন, না, উহা কাটিও না। তিনি তাহাকে ডাকাইয়া আনিয়া সাধারণভাবে উহা যথাস্থানে স্থাপন করিয়া দিলেন। অতঃপর উহা এমনভাবে ভাল হইয়া গেল যে, পরবর্তী কালে তিনি বুঝিতেই পারিতেন না যে, তাহার কোন চক্ষুতে আঘাত লাগিয়াছিল। এই বর্ণনামতে সেইটিই হইয়াছিল তাহার সবচাইতে ভাল চক্ষু (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ২৯১; ইউসুফ সালিহী আশ-শামী, ৪খ., পৃ. ৫৩)।
মুসলমানদের হাতে কুরায়শ নেতৃবৃন্দের কে কোথায় নিহত হইবে পূর্বের দিনই রাসূলুল্লাহ (স) সুনির্দিষ্টভাবে উহা দেখাইয়া দিয়াছিলেন। আবূ তালহা, আনাস, আইশা, উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) প্রমুখ হইতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (স) পূর্বের দিন বিকালবেলা কুরায়শ নেতৃবৃন্দের কে কোথায় নিহত হইবে উহা তাহাদিগকে দেখাইয়া বলিয়াছিলেন, আগামী কল্য ইনশাআল্লাহ এই স্থানে অমুক ধরাশায়ী হইবে; এই হইল আগামী কল্য ইনশাআল্লাহ অমুকের ধরাশায়ী হওয়ার স্থান; ইহা হইল অমুকের ধরাশায়ী হওয়ার স্থান- ইহা বলিয়া তাঁহার হাত মাটিতে রাখিয়াছিলেন এবং সুনির্দিষ্টভাবে সেই স্থান নির্দেশ করিয়াছিলেন। উমার (রা) বলেন, সেই সত্তার কসম যিনি তাঁহাকে সত্যসহ প্রেরণ করিয়াছেন : রাসূলুল্লাহ (স) যে সীমানা নির্দেশ করিয়াছিলেন তাহার একটুও এদিক সেদিক হয় নাই। সেখানেই তাহারা নিহত হইয়া পড়িয়া ছিল। অতঃপর তাহাদিগকে বদরের অভিশপ্ত কূপে একজনের উপর একজনকে ফেলিয়া রাখা হয় (ইউসুফ সালিহী আশ-শামী, ৪খ., ৫৪; উম্বুনুল আছার, ১খ., পৃ. ৩০৬)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 কুরায়শ নেতৃবৃন্দের লাশ বদরের কূপে নিক্ষেপ

📄 কুরায়শ নেতৃবৃন্দের লাশ বদরের কূপে নিক্ষেপ


বদর যুদ্ধ সমাপ্তির পর রাসূলুল্লাহ (স) নিহত কুরায়শ নেতৃবৃন্দের লাশ বদরের কূপে নিক্ষেপ করার নির্দেশ দিলেন। তদনুযায়ী ২৪ জনের লাশ কূপের মধ্যে নিক্ষেপ করা হয় (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ২৯৩)। অতঃপর তিনি তাহাদিগকে সম্বোধন করিয়া কিছু কথা বলেন। এই সম্পর্কে বিভিন্ন ধরনের রিওয়ায়াত পাওয়া যায়। আইশা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর নির্দেশে তাহাদিগকে (কুরায়শ নেতৃবৃন্দকে) কূপের মধ্যে নিক্ষেপ করা হইল। তবে তাহাদের এক নেতা উমায়‍্যা ইব্‌ন খালাফ-এর বিষয়টি ছিল ভিন্ন। কারণ তাহার লাশ লৌহবর্মের মধ্যে ফুলিয়া উহা পূর্ণ হইয়া গিয়াছিল। সাহাবীগণ উহা ধরিয়া নাড়া দিতেই তাহার গোশত শরীর হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া যাইতেছিল। সেইজন্য তাহারা উহা ঐভাবে রাখিয়া মাটি ও পাথরচাপা দিলেন। অন্যদেরকে কূপে নিক্ষেপের পর রাসূলুল্লাহ (স) সেখানে দাঁড়াইয়া বলিলেন, হে কূপবাসিগণ! তোমরা 'কি তোমাদের প্রতিপালক তোমাদেরকে যে ওয়াদা দিয়াছিলেন তাহা সত্যরূপে পাইয়াছ? আমি তো আমার প্রতিপালক আমাকে যে অঙ্গীকার করিয়াছিলেন তাহা বাস্তবে পাইয়াছি। সাহাবীগণ বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি কি মৃত লোকদের সহিত কথা বলিতেছেন? রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, উহারা জানিতে পারিয়াছে যে, উহাদের প্রতিপালক উহাদের সহিত যে অঙ্গীকার করিয়াছেন তাহা সত্য (ইব্‌ন হিশাম, আস-সীরা, ২খ., পৃ. ২৮০; 'উয়ূনুল আছার, ১খ., পৃ. ৩০৬)।

আনাস ইবন মালিক (রা) হইতে বর্ণিত যে, সাহাবায়ে কিরাম মধ্যরাত্রে রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিতে শুনিলেন, হে কূপবাসী, হে উতবা ইবন রাবী'আ! হে শায়বা ইবন রাবী'আ! হে উমায়্যা ইব্‌ন খালাফ! হে আবু জাহল ইব্‌ন হিশাম! এইভাবে কূপে যাহাদেরকে নিক্ষেপ করা হইয়াছিল সকলের নাম লইয়া বলিলেন, তোমরা কি ... (পূর্বের হাদীছের অনুরূপ বর্ণনা)। তখন মুসলমানগণ বলিলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি কি এমন এক কওমকে আহবান করিতেছেন, যাহারা গলিত লাশ হইয়া গিয়াছে? তিনি বলিলেন, আমি যাহা বলিতেছি তাহা তাহাদের তুলনায় তোমরা বেশী শ্রবণকারী নহ। তবে তাহারা আমার ডাকে সাড়া দিতে সক্ষম নহে (ইব্‌ন হিশাম, আস-সীরা, ২খ., পৃ. ২৮০-৮১; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ২৯২)। এই ব্যাপারে আনাস ইব্‌ন মালিক, আবূ তালহা, ইবন উমার (রা) প্রমুখ হইতে আরও দীর্ঘ রিওয়ায়াত পাওয়া যায়। প্রাপ্ত সকল রিওয়ায়াত একত্র করিলে উহার মর্ম দাঁড়ায় নিম্নরূপঃ

রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিয়ম ছিল যে, তিনি যুদ্ধে কোনও কওমের উপর বিজয়ী হইলে তিনদিন সেই যুদ্ধক্ষেত্রে অবস্থান করিতেন। বদর যুদ্ধে জয়লাভের পর নিয়ম মাফিক তৃতীয় দিবসে তিনি সওয়ারী প্রস্তুত করিবার নির্দেশ দিলেন। সওয়ারী প্রস্তুত হইলে তিনি রওয়ানা হইলেন। সাহাবায়ে কিরামও তাঁহার অনুসরণ করিলেন। তাঁহারা পরস্পর বলাবলি করিতে লাগিলেন, মনে হয় তিনি কোনও প্রয়োজনে কোথায়ও যাইতেছেন। অতঃপর তিনি উক্ত কূপের কিনারায় গিয়া দাঁড়াইলেন। আনাস (রা)-এর এক বর্ণনামতে তখন ছিল রাত্রিবেলা। তিনি সেখানে দাঁড়াইয়া নিহত কাফির নেতৃবৃন্দের নাম ও পিতার নাম ধরিয়া ডাকিতে লাগিলেন, হে অমুকের পুত্র অমুক! হে অমুকের পুত্র অমুক! আনাস (রা)-এর এক বর্ণনায় তাহাদের নামোল্লেখ করা হইয়াছে যে, তিনি ডাকিলেন, হে উমায়‍্যা ইব্‌ন খালাফ! হে আবু জাহল ইব্‌ন হিশাম! হে উতবা ইবন রাবীআ! হে শায়বা ইবন রাবী'আ! তোমাদের জন্য কি ইহা খুশীর বিষয় ছিল না যে, তোমরা আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলের আনুগত্য করিতে! আমরা তো আমাদের প্রতিপালক আমাদের জন্য যে ওয়াদা করিয়াছিলেন তাহা সত্য সত্যই পাইয়াছি। তোমরা কি তোমাদের প্রতিপালক যে ওয়াদা করিয়াছিলেন তাহা সত্যরূপে পাইয়াছ?
এক বর্ণনামতে এই সময় তিনি ইহাও বলিয়াছিলেন, তোমরা তোমাদের নবীর খারাপ আত্মীয় ছিলে। তোমরা আমাকে মিথ্যা সাব্যস্ত করিয়াছ, অথচ অন্যরা আমাকে সত্য বলিয়া স্বীকার করিয়াছে। তোমরা আমাকে আমার জন্মভূমি হইতে বহিষ্কার করিয়াছ, অথচ অন্যরা আমাকে আশ্রয় দিয়াছে। তোমরা আমার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিয়াছ, অথচ অন্যরা আমাকে সাহায্য করিয়াছে। অতঃপর তিনি বলিলেন, তোমরা কি তোমাদের প্রতিপালকের কৃত অঙ্গীকার বাস্তবে পাইয়াছ? তখন উমার (রা) বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি কি তিন দিন পর উহাদিগকে সম্বোধন করিতেছেন? উহারা কি শুনিতে পাইবে?
এক বর্ণনামতে তিনি ইহাও বলিলেন, আপনি কিভাবে এমন কিছু লাশের সহিত কথা বলিতেছেন, যাহাদের মধ্যে প্রাণ নাই? তাহারা কিভাবে শুনিবে বা উত্তর দিবে যখন তাহারা গলিত লাশ হইয়া গিয়াছে। তখন রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আমি যাহা বলিতেছি তাহা তাহাদের তুলনায় তোমরা বেশী শুনিতেছ না। তবে তাহারা উত্তর দিতে সক্ষম নহে (ইব্‌ন কাছীর, প্রাগুক্ত, ৩খ., পৃ. ২৯২-৯২; সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৪খ., পৃ. ৫৫)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মৃত ব্যক্তি শুনিতে পায় কিনা

📄 মৃত ব্যক্তি শুনিতে পায় কিনা


উক্ত হাদীছের দ্বারা এই কথা সুস্পষ্টরূপে প্রমাণিত যে, বদরের কূপে নিক্ষিপ্ত লাশগুলি রাসূলুল্লাহ (স)-এর আহবান শুনিতে পাইয়াছিল। কিন্তু উম্মুল মুমিনীন আইশা (রা) এই ব্যাপারে ভিন্নমত পোষণ করেন। তিনি তাঁহার বর্ণিত হাদীছের ব্যাখ্যায় বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, لَقَدْ عَلَمُوا (তাহারা বুঝিতে পারিয়াছে)। এই কথা দ্বারা তিনি বুঝাইতে চাহিয়াছেন যে, তাহারা এখন জানিতে পারিয়াছে যে, আমি তাহাদিগকে যাহা বলিয়াছিলাম তাহাই সত্য।

মৃতগণ যে শুনিতে পায় না ইহার সমর্থনে তিনি কুরআন কারীমের নিম্নোক্ত আয়াতদ্বয় দলীল হিসাবে পেশ করেন:
إِنَّكَ لَا تُسْمِعُ الْمَوْتَى.
"মৃতকে তো তুমি কথা শুনাইতে পারিবে না" (২৭:৮০)।

وَمَا أَنْتَ بِمُسْمِعٍ مِّنْ فِي الْقُبُورِ.
"তুমি শুনাতে সক্ষম হইবে না যাহারা কবরে রহিয়াছে তাহাদিগকে" (৩৫: ২২)।

কিন্তু বদরের কূপে নিক্ষিপ্ত লাশগুলি যে রাসূলুল্লাহ (স)-এর আহবান ভালভাবে শুনিতে পাইয়াছিল এই ব্যাপারে সহীহ হাদীছসমূহে সুস্পষ্ট বর্ণনা (ما أنتم بأسمع لما أقول منهم) থাকায় বেশীর ভাগ সাহাবী ও তাবিঈ তাহাদের শুনিবার পক্ষে মত ব্যক্ত করিয়াছেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ২৯২)।
কুরআন কারীমের আয়াত ও সহীহ হাদীছের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানের লক্ষ্যে উলমায়ে কিরাম কিছু ব্যাখ্যার আশ্রয় লইয়াছেন। কাতাদা (র) বলেন, আল্লাহ তাহাদিগকে ঐ সময় জীবিত করিয়াছিলেন, যাহাতে তাহারা এই ধমক, অপমান, শাস্তি ও আক্ষেপ অনুভব করিতে পারে (সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৪খ., পৃ. ৫৫; আল-মাওয়াহিবুল-লাদুন্নিয়্যা, ১খ., পৃ. ৩৬৭; ইবনু কাছীর, প্রাগুক্ত, ৩খ., পৃ. ২৯৩)।

আল-ইসমাঈলী (র) বলেন, আইশা (রা)-এর মেধা ও হাদীছ সম্পর্কে গভীর পাণ্ডিত্যের বিষয়টি স্বীকার করিয়া লইয়াও বদরের মৃতদের শুনিতে পাওয়া সম্পর্কিত নির্ভরযোগ্য রিওয়ায়াত প্রত্যাখ্যান করা যায় না, যতক্ষণ না অনুরূপ শক্তিশালী রিওয়ায়াত দ্বারা উহা মনসূখ (রহিত) হওয়া বা সুনির্দিষ্ট (খাস) হওয়া প্রমাণিত হয়। তবে উভয় বর্ণনার মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করা সম্ভব। তাহা এইরূপে যে, আয়াত إِنَّكَ لَا تُسْمِعُ الْمَوْتَى রাসূলুল্লাহ (স)-এর বাণী انهم الان ليسمعون (তাহারা এখন অবশ্যই শুনিতেছে)-এর পরিপন্থী নহে। কারণ শুনাইবার অর্থ হইল বক্তার আওয়ায শ্রোতার কর্ণে পৌঁছানো। তাই রাসূলুল্লাহ (স) নহেন, বরং আল্লাহই রাসূলের আওয়ায বদর প্রাঙ্গণে অভিশপ্ত নিহতদের কর্ণে পৌছাইয়া দিয়াছিলেন। তিনি তো সর্ব বিষয়ে সামর্থ্যবান (আল-মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়্যা, ১খ., পৃ. ৩৬৮)।

আস-সুহায়লী (র) বলেন, আইশা (রা) ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না, তাই যাহারা উপস্থিত ছিলেন তাহাদের কথাই গ্রহণযোগ্য। কারণ রাসূলুল্লাহ (স)-এর বাণী তাহারাই ভালভাবে শ্রবণ ও হিফাজত করিয়াছিলেন। এতদ্ব্যতীত ঘটনাটি রাসূলুল্লাহ (স)-এর মুজিযার অন্তর্ভুক্ত, সাহাবীদের প্রশ্নের দ্বারা ইহা স্পষ্টরূপে বুঝা যায়। তাঁহারা প্রশ্ন করিয়াছিলেন, أتخاطب قوما قد جيفوا (আপনি কি এমন লোকদেরকে সম্বোধন করিতেছেন, যাহারা গলিত লাশ হইয়া গিয়াছে?) তিনি আরও বলেন, আইশা (রা) যে ব্যাখ্যা করিয়াছেন, "তাহারা জানিতে পারিয়াছে" ইহার অর্থ তাহারা শুনিতে পাইয়াছে। আর শ্রবণ দুইভাবে হইতে পারে : (১) তাহাদের শরীরের কান দ্বারা। এই ক্ষেত্রে আল্লাহ তাহাদের রূহ শরীরের মধ্যে প্রবিষ্ট করাইয়াছিলেন; (২) অন্তরের বা রূহের কান দ্বারা (প্রাগুক্ত; আর-রাওদুল উনুফ, ৫খ., পৃ. ১৭৫-৭৬)। মোটকথা রাসূলুল্লাহ (স)-এর আহ্বান সেই দিন বদরের কূপে নিক্ষিপ্ত কুরায়শ নেতৃবৃন্দ শুনিতে পাইয়াছিল।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আবূ হুযায়ফা (রা)-কে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সান্ত্বনা দান

📄 আবূ হুযায়ফা (রা)-কে রাসূলুল্লাহ (স)-এর সান্ত্বনা দান


রাসূলুল্লাহ (স) যখন কুরায়শ নেতৃবৃন্দের লাশ বদরের কূপে নিক্ষেপ করার নির্দেশ দিলেন তখন উতবা ইব্‌ন আবী রাবী'আর লাশ কূপের দিকে লইয়া যাওয়া হইল। এই সময় রাসূলুল্লাহ (স) উতবার পুত্র সাহাবী আবূ হুযায়ফা (রা)-এর চেহারায় বিষণ্ণতার ছাপ দেখিতে পাইলেন। তিনি এতই দুঃখভারাক্রান্ত হইয়াছিলেন যে, তাহার মুখমণ্ডল বিবর্ণ হইয়া গিয়াছিল। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে স্নেহভরে ডাকিয়া বলিলেন, হে আবূ হুযায়ফা! তোমার মনে হয়তবা তোমার পিতা সম্পর্কে কোনও আঘাত লাগিয়াছে। তিনি বলিলেন, না। আল্লাহ্র কসম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি আমার পিতা সম্পর্কে বা তাহার নিহত হওয়া সম্পর্কে বেদনাহত নহি। তবে আমি আমার পিতার সঠিক সিদ্ধান্ত, প্রজ্ঞা, বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতা সম্পর্কে জানিতাম। তাই আমি আশা করিতাম যে, তাহার বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতাই তাহাকে ইসলামে দীক্ষিত করিবে। আমার এইরূপ আশাবাদী থাকার পর তাহার এই পরিণতি দেখিয়া এবং তাহার কুফরীর উপর নিহত হওয়ার কথা স্মরণ করিয়া দুঃখিত ও ব্যথিত হইয়াছি। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) তাহার মঙ্গলের জন্য দু'আ করিলেন এবং তাহাকে সান্ত্বনা দিলেন (ইবন হিশাম, আস-সীরা, ২খ., পৃ. ২৮২; সুবুলুল হুদা ওয়ার-রাশাদ, ৪খ., পৃ. ৫৬-৫৭)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00